শয়তানের ডায়েরি : মোছাঃ উম্মে হাবিবা

ec95_polar_ice_crystal_clear_ice_cube_tray_ice

পির আলী: আচ্ছা এই বোকা মুছল্লীর জীবিকা নির্বাহের কি সম্বল আছে?
শয়তান: হুজুর পূর্বে এই মুছল্লীর অর্থিক অবস্থা খুব ভাল ছিল। বহু  একর জমি নিজের চাষে ছিল। কিন্তু মাসান্তে এক একটি বিবাহের রুচী থাকায় উহার পিছনেই সর্বস্ব হারাইয়াছেন। বর্তমানে মাত্র ৪/৫ একর জমি আছে। উহা নিজেই চাষাবাদ করেন। আর একটি গাভী আছে উহার দুগ্ধ বিক্রয় করেন এবং নিজ বসত বাড়ীর ফল ফলাদি বিক্রয় করিয়া কোন রকম জীবিকার ব্যবস্থা করেন।
জমিন চাষের ব্যাপারে মুছল্লী কখনও হাল ব্যাবহার করেন না, কারণ তাহার বিশ্বাস মানুষ যেরুপ আল্লাহর বান্দাহ, গরু মহিষও তদ্রুপ আল্লাহর বান্দাহ। অতএব তাহাদীসকে কষ্ট দিয়া জমিন চাষ করিলে কিয়ামতে গরু মহিষের দাবী ছাড়াইয়া বেহেস্তে যাওয়া যাইবে না। তাই মুছল্লী মজুর ডাকিয়া কোদাল দ্বারা কৃষিকার্য সমাধা করেন। একদা মুছল্লীর একজন মজুর কৃষিকার্যের সময় ক্লান্ত হইয়া একটি গাছের ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণ করে এবং পূর্ব অভ্যাস অনুসারে হুক্কা টানিতে আরম্ভ করে। এমন সময় মুছল্লী সাহেব সেখানে উপস্থিত হইয়া মজুরের কার্য্য দর্শন করতঃ ভয়ানক হারাম খোর তুই আমার জমিন সর্বনাশ করিয়াছস। এই জমিনের ফসল যদি আমার পেটে যায় তাহলে আমার কলিযায় দাগ পড়িবে। অতএব এই বৎসর আর জমি চাষ করাইব না। বাস্তবিক পক্ষে মুছল্লী সে বৎসর সেই জমি আর চাষ করান নাই। অনুরুপ একদিন মুছল্লীর একজন মজুর খালি মাথায় মালকোচা দিয়ে ক্ষেতের কাজ করিতেছিল। এমন সময় মুছল্লী সাহেব সেখানে আসিয়া মজুরের কার্য্য দর্শন করিয়া ভয়ানক ক্রোধান্বিত হইলেন এবং বলিলেন, তোর স্ত্রী তালাক হইয়া গিয়াছে এবং তোর মুসলমানী ছুটিয়া গিয়াছে। অতএব তাওবা করার পূর্বে কিছু খাওয়া তোর জন্য জায়েজ হইবে না। অতঃপর দুপুর রৌদ্রে মাঠে বসিয়াই মুছল্লী তাহাকে তাওবা পড়াইলেন।
এই ভাবে মুছল্লী সাহেব গাভিটি নিয়াও বহু বিপদ পোহাইয়াছেন, গাভিটি যখন প্রথম যৌবন প্রাপ্ত হয় তখন বলদের সঙ্গ লাভের জন্য অত্যন্ত ব্যাকুল হইয়া উঠে। মুছল্লী সাহেব অবস্থা বুঝিতে পারিয়া অত্যন্ত চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। তাহার স্ত্রী বলিলেন, গাভিটিকে একটি বলদের নিকট নিয়া যান। মুছল্লী সাহেব বলিলেন, তোমাদের তো পর্দ্দা পুশিদার খেয়াল নাই। এই গাভীটিকে দিনের বেলায় বলদের সম্মুখে নিলে কোন খেলাপ কার্য্য ঘটিয়া যাইতে পারে, তখন ইহার জন্য খোদার নিকট জবাব দিবে কে? এই বলিয়া মুছল্লী সাহেব দিনের বেলায় ক্ষান্ত রহিলেন এবং রাত্রি বেলায় বলদের অন্বেষণে বাহির হইলেন।
বাড়িতে যাবতীয় ফল ফলাদি অত্যন্ত হেফাজতের সাথে রাখেন। স্ত্রী পুত্র কন্যা কাহাকেও কিছু খাইতে দেন না। একদিন মুছল্লী সাহেব তাহার বড় ছেলের নিকট কতগুলি পেয়ারা দিয়া বলিলেন, নেককার লোক দেখিয়া বিক্রয় করিবা এবং প্রতিটির মূল্য চারি  পয়সা আদায় করিবা। ছেলেটি বাজারে যাইবার পথে অত্যন্ত পরিশ্রান্ত হইয়া পড়ে তখন একটি পেয়ারা সে খাইয়া ফেলিল, অতঃপর বাড়ীতে আসিয়া পয়সার হিসাব দেওয়ার সময় মুছল্লীর নিকট ধরা পড়িল। তখন মুছল্লী ছেলেটিকে ভিষণ প্রহার করিলেন এবং বলিলেন, যাহারা পিতার বিনা এজাযতে কিছু খায় তাহারা ফাসেক হইয়া যায়। তাই ছেলেটিকে সত্বর গোছল করিয়া আসিতে হুকুম দিলেন এবং পরে তাহার হাত ধরিয়া তওবা করাইলেন,
পির আলী: এই জাতীয় মুছল্লীর খবর আরো দুই একটা জান কি ?
শয়তান: হুজুর দুই একটা নয়, এই জাতীয় মুছল্লীর খবর এক শ্বাসেই বলিতে পারি একশত। শুনুন তবে আরো দুইজন ধর্ম পরায়ণের কথা। মূলুকে হিন্দুস্থানের পশ্চিম সীমান্তে এক প্রসিদ্ধ মহল্লায় মৌলভী মোহাম্মদ ইনশা আল্লাহ ও মুনশী মোহাম্মদ মাশা আল্লাহ নামক দুইজন ধর্ম পরায়ন লোক বাস করিতেন। মৌলভী মো. ইনশা আল্লাহ কিছু শিক্ষিত ছিলেন, উর্দ্দু কিতাব পড়িয়া মাছলা মাছায়েল বেশ আয়ত্ব করিয়াছেন। দেশের মধ্যে অন্য কোন আলেম ছিলেন না বলিয়া মৌলভী মো. ইনশা আল্লাহই বড় আলেম ও মুফতী হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন। আর মুনশী মো. মাশা আল্লাহ খুব পরহেযগার লোক ছিলেন। বিদ্যার দিক দিয়া সগৌরবে বকলম ডিগ্রী লাভ করত সসম্মানে জীবন যাপন করিতেন। দেশের মধ্যে তিনি যথেষ্ট সুনাম আছে। ইহা ছাড়া পরহেযগারীর ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দেশের প্রদীপ। তাই দেশের যাবতীয় রোগ ব্যধির প্রাথমিক চিকিৎসা মুনশী সাহেবের হাতেই হইয়া থাকে।
একদা এক ব্যক্তি একটি ম্যালোরিয়ায় আক্রান্ত রোগীকে নিয়া মুনশী সাহেবের বাড়ীতে উপস্থিত হয়। মুনশী সাহেব তাহাকে নানাবিধ পরীক্ষা করিয়া বলিলেন, ইহাকে জেনে ধরিয়াছে। ভাল করিয়া তদবীর করিলে রোগী সুস্থ হইবে। তখন সে ব্যক্তি বলিল, হুজুর তবে মেহেরবাণী পূর্বক আপনিই একটু নজর করুন। যে খরচাদির প্রয়োজন তাহা আমিই বহন করিব। তখন মুনশী সাহেব বলিলেন, প্রথমে এক টাকা সোয়া পাঁচ আনা পয়সা ও একটি মুরগীর বাচ্চা ছদকা দিতে হইবে। উক্ত ব্যক্তি মুনশী সাহেবের কথা অনুসারে কাল বিলম্ব না করিয়া টাকা ও মুরগীর বাচ্চা নিয়া সেখানে হাজির হইল। মুনশী সাহেব তখন গম্ভির্য্যতার সাথে রোগীর তদবীর আরম্ভ করিলেন এবং বলিলেন, প্রতিদিন ভোরবেলায় আসিয়া তদবীর নিয়া যাইবা। এইভাবে সাতদিন তদবীর করিলে আল্লাহর রহমে রোগী ভাল হইয়া যাইবে।
মুনশী সাহেবের কথা অনুসারে রোগীর অভিবাবকেরা এক এক করিয়া সাতদিন যাবৎ তাহার নিকট হইতে তদবীর নিল। কিন্তু দূর্ভাগ্য রোগীর তেমন কোন পরিবর্তন দেখা গেল না। তখন রোগীর অভিবাবকেরা আসিয়া একদিন মুনশী সাহেবের নিকট বলিল, হুজুর তদবীর নেওয়াতো শেষ হইল কিন্তু রোগীর তেমন কেন পরিবর্তন দেখা গেল না। তখন মুনশি সাহেব বলিলেন, আচ্ছা আমি আগামী দিন একটু পরীক্ষা করিয়া দেখি এই বলিয়া পরের দিন ভোরবেলায় মুনশী সাহেব রোগীর নিকট উপস্থিত হইয়া রোগীর শরীরে একটু পানি ছিটাইয়া দিলেন ও মনে মনে কি যেন দোয়া কালাম পাঠ করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। সকলে জিজ্ঞাসা করিল হুজুর, হাসিলেন কেন? তখন মুনশী সাহেব বলিলেন, রোগীকে একটি বোবা জ্বিন ধরিয়াছে, তাই আমি যে সমস্ত আয়াত সমূহ পাঠ করিয়া উহার তদবীর করিয়াছি সে সমস্ত আয়াতের একটি হরফও জ্বীনের কানে পৌছে নাই। তাই রোগী ভাল হইবে কিরুপে? এখন এই বোবা জ্বিন ছাড়াইতে হইলে তদবীরে ধরিবে না, প্রথমে কিছু ডাক্তারী ঔষধ করিয়া জ্বীনের কানের চিকিৎসা কর। পরে যে তদবীর করা হইবে তাহাতেই ধরিবে, রোগীর আত্মীয় স্বজন সকলে মুনশী সাহেবের কথা তামিল করার জন্য সংকল্প করিল।
পির আলী: এই মুনশী সাহেব এতখানি শঠতামূলক কার্য্য করিয়া পুনরায় কার্য্য করিয়াও পরহেজগারীর দাবী করিল।
শয়তান- হুজুর ইহা তাহার শঠতামূলক কার্য্য নহে। কারণ তিনি জানেন যে, মোমেনের অন্তরে আল্লাহ পাক থাকেন। তাই মোমেনের অন্তরে যে কথা জাগরিত হয় উহা আল্লাহ তাআলারই কথা। সেই হিসাবে মুনশী মুনশী সাহেবের অন্তরে যে কথা জাগরিত হয় তখন তিনি তাহাই ব্যক্ত করেন ও উহার উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়া থাকেন। মুনশী সাহেব যে একজন পাকা পরহেজগার, তাহাতে আদৌ সন্দেহ নাই।

2 মন্তব্য রয়েছেঃ শয়তানের ডায়েরি : মোছাঃ উম্মে হাবিবা

  1. Nurol Haque says:

    sondor golp, Onek sikhar ase.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight