শয়তানের ডায়েরি : উম্মে হাবিবা আকলিমা

পূর্ব প্রকাশিতের পর……
শয়তান : এই সমস্ত কেন্দ্রে নাচ, গান, মদ, ভাঙ, আফিম, ইত্যাদি দ্রব্য সৌখিন জিনিষ হিসাবে ব্যবহর হইয়া থাকে। কোন কোন লোক নাচ গান উপভোগের জন্য আবার ছেলেমেয়ে দিগকে দুই এক মাসের জন্য ভাড়া করিয়া বাহিরেও নিয়ে যান। এই জন্য চিত্তবিনোদনের উদ্দেশ্যে দেশের সকল শ্রেণীর লোকেরা এ সমস্ত জায়গায় অবাধে যাতায়াত করে। একমাত্র যাহারা আমাদের ধর্মীয় মৌলভী বা ঠাকুর তারা এই সমস্ত স্থানে সহসা যতায়াত করেনা। আমাদের দেশের বড় অপরাধ হইল নর হত্যা ও চুরী করা। নর হত্যার জন্য শাস্তি হইল যাহাকে হত্যা করা হইয়াছে তাহার নিকটতম আত্মীয়ে প্রকাশ্যে জনসমাবেশে ডাকিয়া হন্তাকে নিহত করিয়া ফেলিবে এবং চুরির জন্য শাস্তি হইল একটি চক্ষু উত্তোলন করিয়া ফেলিবে।
এই সমস্ত বিচারাচার সাধারণত: মহল্লার ঠাকুরেরাই করিয়া থাকে। ঠাকুরেরা এই সমস্ত বিচারাচার করিতে অনেক সময় মহল্লার অথবা বাহিরের বিচক্ষণ ব্যক্তিদেরও পরামর্শ নিয়ে থাকেন।
বন্ধু! আমাদের দেশে লোক সংখ্যা অতি কম, সে অনুপাতে সম্পদ অনেক বেশী। তাই দেশের সকল মানুষ অতি স্বাচ্ছন্দে বসবাস করে। কাহারো কোন অভাব অভিযোগ নাই বলিলেই চলে। দেশে ফলমুল ও শষ্যাদির যথেষ্ট প্রাচুর্য্য থাকায় মানুষ অতি সুখে দিন কাটায়। বছরের তিন মাস এরা কৃষি কাজ করে বাকি নয় মাস ফুর্তি করিয়া কাটায়। আমাদের দেশে ফুর্তির জন্য বহু অনুষ্ঠান আছে। যেমন বছরে কয়েকবার নির্দিষ্ট তারিখে পূজা পার্বন হইয়া থাকে, গান বাজনার আসর হইয়া থাকে, ঠাকুরদের বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। শুকনার দিনে প্রায়ই বিভিন্ন স্থানে মেলা তেহার বসিয়া থাকে। ইহা ছাড়া বিবাহ অনুষ্ঠান, ছেলে মেয়ের জন্ম অনুষ্ঠান ইত্যাদি আকারে আরো অনেক আমোদ প্রমোদের অনুষ্ঠানাদি দেশে হইয়া থাকে। তবে ইহার মধ্যে আমরা দুইটি বড় পূজা ও বিবাহ উৎসব আমরা মহা সমারোহে পালন করিয়া থাকি। বিবাহ উৎসবে নিমন্ত্রিত অতিথীবর্গের চিত্ত বিনোদনের জন্য ব্যবসা কেন্দ্রের সুসজ্জিত ছেলেমেয়েদিগকে আনা হয়। বিবাহ বাড়ির আত্মীয় স্বজন ছোট বড় সকলে ব্যবসায়ী ছেলেমেয়েদিগকে উপভোগ করিয়া তৃপ্তি লাভ করিয়া থাকে। এই ব্যবসায়ী ছেলেমেয়েদিগকে না আনা হইলে বিবাহের উৎসব পর্ব একেবারে নিরানন্দ বলিয়া সকলের নিকট মনে হয়।অতএব বিবাহ অনুষ্ঠানে ইহাদের আমদানী করা বিবাহ কার্যের একটি অঙ্গ বলিয়াই সকলে ধরিয়া নিয়াছে। বিবাহের পর্বের সকল কার্য মেয়ে পক্ষের বাড়িতেই হয়ে থাকে। কিন্তু খরচের জিম্মাদারী থাকে ছেলে পক্ষের উপরে। অনেক সময় উভয় পক্ষ মিলিত হইয়াও করে।
বিবাহ কার্য সমাধার জন্য মহল্লার সকল লোকে আন্তরিক সাহায্য সহানুভূতি করিয়া থাকে। অনেক সময় তাহারা অতিথীদের জন্য নিজেদের ঘর ছাড়িয়া দিয়া এক ঘরে চাপাচাপি করিয়া বসবাস করে। বিবাহ উৎসব কমপক্ষে তিন দিন, উদ্ধপক্ষে ১৫ দিন চলিয়া থাকে।
বন্ধু! যখন কয়েকদিন আমাদের দেশে কাটানোর ইচ্ছা করিয়াছেন তখন কিছু সামাজিক নিয়ম কানুনও আপনার জানা দরকার। আমাদের দেশে সাধারনত মানুষ তেমন অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়না। যদি একান্ত কেহ অন্যায় কাজে লিপ্ত হয় তখন তাহাকে মহল্লার সর্দারেরা অথবা ঠাকুরেরা শাস্তি দিয়া থাকে। আমাদের দেশে একমাত্র বড় শহর ব্যতীত কোন থানা অফিস আদালত নাই। বৎসরে মাত্র পরিবার প্রতি একটি টাকা সরকার কে সেলামি হিসাবে দিতে হয়। এ জন্য সরকারের পক্ষ হতে নির্দিষ্ট সময়ে একজন সেলামী আদায়কারী আসে। সে এই অঞ্চলে ১০ দিন বা ১৫ দিন থাকিয়া সেলামি আদায় করিয়া থাকে। দেশের সার্বিক ভাল মন্দ সরকারণ দেখাশুনা করিয়া থাকে। উহাতে আমাদের কোন দায়িত্ব থাকেনা। যাহারা ছেলেমেয়েদিগকে শিক্ষা দিতে ইচ্ছা করে, তাহারা ছেলেমেয়েদিগকে শহরে পাঠায়। সেখানে থাকিয়া ছেলেমেয়েরা পড়াশুনা করে। তবে আজ কাল পল্লি অঞ্চলেও বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়িয়া উঠেছে। শিক্ষার দিক দিয়া আমাদের দেশ খুব উন্নত না হইলেও ভদ্রতা সত্যতা ন্যায়পরায়নতার দিক দিয়া পৃথিবীর বহু দেশ থেকে আমরা অনেক উন্নত। তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। আমাদের দেশে ইলেকশন হয়। মহল্লা প্রধান এই ইলেকশন দ্বারা নির্বাচিত হয়ে থাকে। একবার যিনি প্রধান হইবেন তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই পদে বহাল থাকবেন। রাষ্ট্রের দিক দিয়া তেমন কোন ইলেকশন আমাদের দেশে হয় না। যিনি রাজা তিনি ইচ্ছানুসারে মন্ত্রি পরিষদ গঠন করেন। এই হল আমাদের দেশের মোটামোটি হাল হাকিকত।
এই বলিয়া বন্ধুবর্গ সেই দিনের জন্য বিদায় হইলেন। বিদায় বেলা সকলে তাহাদের বাড়িতে অন্তত একদিন করিয়া বেরানোর জন্য আমাকে অনোরোধ করিল। আমি তাহাদের দাওয়াত কবুল করিয়া কয়েকদিন পরে সকলের বাড়িতে বেড়ানোর ওয়াদা দিলাম। বন্ধুবর্গ খুশি হইয়া বিদায় গ্রহণ করল।
হুজুর! বন্ধুদের মুখে ঐ দেশের হাল হাকিকত শুনিয়া আমার জ্ঞান বুদ্ধি একত্র হইয়া বরফের ন্যায় জমাট বাধিয়া গেল। মানব সমাজের মধ্যে এইরুপ যে নিয়ম পদ্ধতি থাকিতে পারে তা পূর্বে কখনও কল্পনা করি নাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight