শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড একটি পর্যালোচনা : মুফতী আলী হুসাইন

University

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড কথাটি স্বতসিদ্ধ একটি বাণী। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের শ্লোগান এটি। কিন্তু কী এর মর্ম, কিইবা এর দাবী? অনেকেরই হয়ত ভেবে দেখার সুযোগ হয়নি! কাজেই আসুন এ নিয়ে একটু ভেবে দেখি। দেখুন একজন মানুষের সমস্ত শক্তিমত্তার মূল হল এই শিক্ষা নামক মেরুদণ্ড। যে মানুষের মেরুদণ্ড নেই, তার কোন সৌর্য-বির্য নেই, নেই মাথা উচু করে দাঁড়াবার অধিকার। সে পরজীবি পরনির্ভরশীল। এমনকি সে একটি শিশু বাচ্চার সামনেও অসহায়। কোন আতœমর্যাদা বোধসম্পন্ন ব্যক্তির জন্য এমন জীবনের চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়। ঠিক তদরুপ একটি জাতির অবস্থা! কোন জাতি অপরাপর জাতির সামনে শিক্ষা দীক্ষায় অন্যদের তুলনায় প্রাগ্রসরমান। কারণ শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা ছাড়া জাতির অস্থিত্ব ঠুনকু ও নরবরে। যে জাতি শিক্ষা দীক্ষায় যতটা অগ্রসরতা অর্জন করবে অপরাপর জাতির তুলনায় সে ততটা সৌর্য বির্যের অধিকারী হবে। এ শিক্ষার আবার দুটি ধারা আছে: এক. ধর্মীয় শিক্ষা, দুই. আধুনিক শিক্ষা। প্রথমোক্ত শিক্ষাব্যবস্থায় প্রতিটি জাতি স্বতন্ত্র। আর শেষোক্ত শিক্ষাব্যবস্থায় সব জাতি সমান অংশীদার। এখানে সবার অবস্থান প্রতিযোগিতামূলক।  কে কার চেয়ে বেশি অগ্রগামিতা অর্জন করতে পারে। প্রথমোক্ত শিক্ষা দ্বারা জাতির স্বকীয়তা বজায় থাকার পাশাপাশি বিশ্বদরবারেও প্রতিষ্ঠা লাভ করা যায়। আর শেষোক্ত শিক্ষা দ্বারা শুধু বিশ্বদরবারে জাতি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রথমোক্ত শিক্ষার উপর পরকালীন মুক্তি নির্ভরশীল, আর শেষোক্ত শিক্ষার উপর দুনিয়াবি সফলতা নির্ভরশীল। এখন প্রশ্ন হলো জাতি বলতে কী বুঝায় এবং কোন শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড? এ দুটি প্রশ্নের সমাধান বের করতে পারলে আজকের আলোচনা সফল হবে। এবং জাতি আজ যে ধুম্রজালে আবদ্ধ তা থেকেও জাতির নিষ্কৃতি লাভ হবে।
জাতীয়তার পরিচয়: ইসলামের দৃষ্টিতে পৃথিবীতে দু’ধরনের জাতি বিদ্ধমান: এক. মুসলিম জাতি, দুই. অমুসলিম জাতি। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- তোমরা তোমাদের পিতা ইবরাহীমের ধর্মে কায়েম থাক।  তিনি তোমাদের নাম মুসলমান রেখেছেন। পূর্বেও এবং এই কুরআনেও। যাতে রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষ্যদাতা এবং তোমরা সাক্ষ্য দাতা হও মানব মণ্ডলীর জন্য। অন্য আয়াতে তিনি বলেন, মোহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদেরকে রুকু ও সেজদারত দেখবেন। তাদের মুখমন্ডলে রয়েছে সেজদার চিহ্ন। তাওরাতে তাদের অবস্থা এরূপ এবং ইঞ্জিলে তাদের অবস্থা যেমন একটি চারা গাছ যা থেকে নির্গত হয় কিশলয়, অতঃপর তা শক্ত ও মজবুত হয় এবং কান্ডের উপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে-চাষীকে আনন্দে অভিভুত করে-যাতে আল্লাহ তাদের দ্বারা কাফেরদের অন্তর্জ্বালা সৃষ্টি করেন। তাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের ওয়াদা দিয়েছেন। [সূরা ফাতাহ : ২৯]
কোন দল গোত্র বা দেশের ভিত্তিতে জাতির বিভক্তিকে ইসলাম কখনই সমর্থন করেনা। একবার কোন এক যুদ্ধে একজন মুহাজের ও একজন আনসার সাহাবীর মাঝে বাকবিতণ্ডা হয়। ঘটনাক্রমে মুহাজির ডাক দিয়ে বসে, ‘মুহাজির ভাইয়েরা কোথায়? আমার সাহায্যার্থে এগিয়ে আস।’ এ দেখে আনসার সাহাবীও স্বগোত্রীয়দের নিকট সাহায্যের আবেদন করে বসে। উত্তেজনাকর একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রাসূল সা. এ ঘটনা শোনামাত্রই দৌঁড়ে আসেন এবং বলেন, ‘তোমরা এসব অশুভ যুগের সম্প্রদায়প্রীতি এখনও ভুলতে পারনি বুঝি?’ ধূর্ত অমুসলিম শক্তি মুসলমানদের ঐক্য এবং উন্নতি কে কখনোই সহ্য করতে পারেনি। ফলে বার বার পায়তারা করছে কিভাবে মুসলমানদের ঐক্য সংহতিকে বিনষ্ট করা যায়। এতে তারা অনেক সফলও হয়েছে। আবার অনেক সময় সচেতন মুসলিম অভিবাবকদের কারণে সফল হতে পারেনি। একবার আওস ও খাযরাজের দুইজন সাহাবী একসাথে আলাপচারিতায় লিপ্ত ছিল। এমন সময় তাদের পাশ দিয়ে ইহুদি আখনাস ইবনে শরীক হেটে যাচ্ছিল। দুজন মুসলমানকে এভাবে খোশ গল্প করতে দেখে তার ভিতরটা জ্বলে উঠল। সে তাদের কাছে আসল এবং খাতির জমিয়ে বসল। অতঃপর সুনিপুণভাবে জাহেলী যুগের বিরাজমান এ দু সম্প্রদায়ের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কথা ফুটিয়ে তুলল। এক কথায় দু’কথায় দুজনের মাঝে মারমুখি পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। ধূর্ত আখনাস আপন দূরভিসন্ধি সফল হতে দেখে আস্তে আস্তে কেটে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর রাসূলের উপর আয়াত নাযিল হল- আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে  নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান করেছেন।  তোমরা পরস্পর শত্র“ ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্পৃীতি দান করেছেন। ফলে, এখন  তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুণ্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি  তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। [সূরা আল ইমরান : ১০৩] অনুরুপ একযুদ্ধ থেকে ফেরার পর হযরত আবু বকর রা. এর এক ছেলে তাকে সম্ভোধন করে বলল, আব্বা আপনিতো এই যুদ্ধে আমার দৃষ্টিসীমায় পড়েছিলেন, কিন্তু আপনি পিতা হিসেবে আমি আপনাকে ছেড়ে দিয়েছি। হযরত আবু বকর রা. বললেন, ভাগ্যিস যে, আমি তোমাকে দেখিনি, নয়তো আমি তোমাকে ছাড়তাম না। কারণ ইসলামের চেয়ে বড় আমার কাছে কিছু নেই। মুসলমান না হয়ে সে আমার সন্তান হলেও আমার শত্র“ আবার মুসলমান হলে আমার অনেক দূরের হলেও সে আমার কাছের, যা কুরআনে সুস্পষ্ট করে উল্লেখ আছে। প্রাচ্যের কবি আল্লামা ইকবাল বলেন- চীন ও আরব আমাদের, হিন্দুস্থানও আমাদের, আমরা মুসলমান সারা বিশ্ব আমাদের। সুতরাং জাতীয়তার বিভক্তি হবে একমাত্র কালিমার ভিত্তিতে। দল দেশ গোত্র বা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে নয়। সুতরাং মুসলমানরা হবে এক ও অভিন্ন। তাদের মধ্যে কোন দলাদলি থাকবেনা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আজ আমরা এ অনাকাংখিত পরিস্থিতিরই শিকার। দেশ ও গোত্রপ্রীতির বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে এক মুসলমানের হাত আজ অন্য মুসলমানের রক্তে রঞ্জিত। এসব ঠুনকু অজুহাতেই আজ আমরা শত বিভক্ত। আর  এ সুযোগগুলোকে উপপাদ্য করেই কাফের বেঈমানেরা শুরু করেছে মুসলমানদের রক্ত নিয়ে হলিখেলা।
কোন শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড আধুনিক শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তাহলে ধর্মীয় শিক্ষা হল জাতির সঞ্চিবণী শক্তি তথা অস্থিত্বদানকারী। কোন জিনিসের অস্থিত্ব থাকলেই না তার মেরুদণ্ডের প্রশ্ন। নচেৎ মেরুদণ্ডের প্রশ্নই অবান্তর। এ বিষয়টা হিন্দুরা বুঝতে পারে। ফলে তাদের কঁচি শিশুদেরকে প্রথমেই হিন্দু ধর্ম শিক্ষা দেয়। বৌদ্ধ খৃষ্টান  ও ইহুদিরা বুঝতে পারে ফলে তাদের সন্তানদেরকে গোড়াতেই ধর্মীয় শিক্ষা দান করে। কিন্তু আফসোস যে, মুসলমানরা এ বাস্তবতা বুঝতে ভুল করে। অথচ ইসলামই একমাত্র সত্য ধর্ম এবং এর উপরই পরকালীন মুক্তি ও ইহকালীন সফলতা নির্ভরশীল। আল্লাহ তাআলা বলেন- যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম (দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করে) তালাশ করে কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না [সূরা আল ইমরান : ৭৫] দুনিয়াতেই যেহেতু ইসলামের সামনে অন্য ধর্মগুলো টিকেনা। তাহলে পরকালে তো প্রশ্নই আসেনা।
আজ গোটা দুনিয়ার মানুষের চিন্তা নৈতিকভাবে তিনটি দলে বিভক্ত: এক. যাদের রাত দিনের ভাবনা হল কীভাবে শুধু সম্পদ কামানো যায়, পরকালে কী হবে তা পরে দেখা যাবে। দুই. যারা মনে করে দুনিয়া অস্পৃশ্য। এ উভয়ের প্রান্তিকতাকেই ইসলাম প্রত্যাখ্যান করেছে। ইসলাম বলে- আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতরাজি দ্বারা পরকালের মুক্তি অনুসন্ধান কর, সাথে সাথে দুনিয়াকেও অস্পৃশ্য মনে করোনা এবং তা দ্বারা উপকৃত হও। তার উপায় উপকরণ দ্বারা ভরণ-পোষণ, প্রয়োজনীয় আরাম আয়েশ ভোগ কর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight