শবে বরাত:বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি কাম্য নয়- মাও. মাহবুবুর রহমান নোমানি

ss copy

শাবান মাসের ১৫তম রাতটিকে ফার্সি ভাষায় শবে বরাত বলা হয়। হাদীস শরিফে এ রাতকে বলা হয়েছে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শা’বান’ অর্থাৎ অর্ধ শাবানের রাত্র। বরকতময় এ রাতটিকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে দুই শ্রেণীর মানুষ প্রান্থিকতার শিকার। এক শ্রেণীর লোক পূণ্যময় এ রাতটিকে এমনভাবে উদযাপন করে, যা এ রাতের মাহাত্মের সাথে আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। তারা এ পবিত্র রজনীতে এমনসব হিন্দুয়ানি কাজ-কর্ম করে যা সুস্পষ্ট বেদআত ও নাজায়েজ। অপরদিকে আরেক শ্রেণীর লোক এদের সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে রয়েছে। তারা এ মহিমান্বিত রাতের ফজিলত ও মর্যাদা অস্বীকার করে ব্যক্তিগত নফল ইবাদত বন্দেগি থেকে বিরত থাকেন এবং অপরকেও ইবাদতের প্রতি নিরূৎসাহিত করেন। তারা এ রাতের ইবাদত, নফল সালাত, কান্নাকাটি, যিকির-আযকার, দোআ-মুনাজাত, কবর জিয়ারত ইত্যাদি বিষয় কুরআন-সুন্নাহ সম্মত নয় বলে জন সাধারণের মাঝে প্রচার করেন। প্রকৃতপক্ষে এ উভয় শ্রেণীর লোক সঠিকপথ থেকে দূরে রয়েছে। এ রাতে ভারসাম্যপূর্ণ আমলের কথা বিভিন্ন হাদীস ও আছার (সাহাবাগণের বাণী) দ্বারা প্রমাণিত। সম্মিলিত কোনো রুপ না দিয়ে এবং সারা রাত উদযাপনের বিশেষ কোনো পন্থা উদ্ভাবন না করে নিজের শক্তি সামর্থ্য অনুযায়ী এ রাতে বেশি বেশি ইবাদত করা নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত রয়েছে। এখানে কয়েকটি হাদীস  প্রমাণসহ উল্লেখ করা হলো,  ‘মুয়াজ ইবনে জাবাল রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা মধ্য শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টিকুলের প্রতি মনোনিবেশ করেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত  পৃথিবীর অধিবাসীদেরকে ক্ষমা করে দেন। [সহিহ ইবনে হিব্বান: হাদীস নং ৫৬৬৫]

‘হযরত আবু সালাবা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন শাবান মাসের মধ্যবর্র্তী রাত এসে যায়, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির প্রতি মনোনিবেশ করেন। তারপর মুমিনদেরকে ক্ষমা করেন এবং  কাফেরদের শাস্তি বাড়িয়ে দেন। আর হিংসুকদেরকে অবকাশ দেন তাদের হিংসা পরিহার করা পর্যন্ত। [সুনানে বায়হাকি: হাদীস নং ১৪৫৮]
এই রাতের ফযীলত সম্পর্কে একটি বিশেষ ঘটনা উল্লেখ রয়েছে হাদীসের গ্রন্থসমূহে। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়শা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিছানায় পেলাম না। তাই আমি তাঁকে খুঁজতে বের হলাম। খুঁজতে খুঁজতে জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে তাঁকে পেলাম। তিনি বললেন, হে আয়শা! তুমি কি আশঙ্কা করছো যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার সাথে অন্যায় আচরণ করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি মনে করেছি আপনি অন্য কোনো স্ত্রীর নিকট গিয়েছেন। তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা মধ্য শাবানের রাত্রিতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন। তারপর কালব গোত্রের পালিত বকরীর পশমের চেয়েও অধিক পরিমাণ লোকদের ক্ষমা করে দেন। [তিরমিযি: হাদীস-৭৩৬]
‘হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন মধ্য শাবানের রাত্র আসে তখন তোমরা রাত্র জাগরণ করে ইবাদত- বন্দেগি করো এবং দিনের বেলায় রোযা রাখো। কেননা আল্লাহ তাআলা সূর্যাস্তের পর দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করে বলেন, আছে কি কোনো ক্ষমা প্রার্থনাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো। আছে কি কোনো রিযিক প্রার্থনাকারী? আমি তাকে রিযিক দান করবো। আছে কি কোনো বিপদগ্রস্ত? আমি তাকে বিপদমুক্ত করবো। এভাবে ফজর পর্যন্ত ডাকতে থাকেন। [ইবনে মাজাহ: হাদীস-১৩৮৮]
এতদসংক্রান্ত আরো অনেক হাদীস রয়েছে, যার কোনো কোনোটির সনদে কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে। তবে মুহাদ্দিসগণের ঐকমত্য ফায়সালা হলো, দুর্বল সনদের হাদীস যখন অন্য হাদীস দ্বারা সমর্থিত হয়, তখন সে দুর্বলতা কেটে যায়। তাছাড়া ফাজায়েলের ক্ষেত্রে যাঈফ হাদীস আমলযোগ্য। এটাও মুহাদ্দিসগণের সর্বসম্মত অভিমত।
ফুকাহায়ে কেরামের দৃষ্টিতে শবে বরাত
ফিকহে হানাফি : আল্লামা শামি, ইবনে নুজাইম, আল্লামা শারুম্বুলালি, শায়খ আব্দুল হক দেহলভি, মাও. আশরাফ আলী থানুভি, মুফতি মুহাম্মদ শফি, শায়খুল ইসলাম তকি উসমানিসহ ওলামায়ে হানাফিয়্যার রায় হলো, শবে বরাতে শক্তি সামর্থ অনুযায়ী জাগ্রত থেকে একাকীভাবে ইবাদত করা মুস্তাহাব। তবে এর জন্যে জামাতবদ্ধ হওয়া যাবে না। [আদ-দররুল মুখতার, ২য় খন্ড-২৪,২৫/ আল বাহরুর রায়েক: ২য় খন্ড ৫২পৃষ্ঠা/ মারাকিল ফালাহ-২১৯ পৃষ্ঠা।
ফিকহে শাফেয়ি : ইমাম শাফেঈ রহ. এর মতে শাবানের ১৫তম রাতে অধিক দোআ কবুল হয়ে থাকে। [ কিতাবুল উম্ম, ১ম খন্ড-২৩১ পৃষ্ঠা]
ফিকহে মালেকি:ইবনে হাজম মালেকি রহ. বলেন, সালফে সালেহীনগণ এ রাতকে যথেষ্ট সম্মান করতেন এবং এর জন্যে পূর্ব থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। [আল-মাদখাল,১ম খন্ড, ২৯২ পৃষ্ঠা]
ফিকহে হাম্বলি : শায়খ ইবনে মুফলিহ হাম্বলি রহ. আল্লামা মানসুর আলী আলবাহুতি এবং ইবনে রজম হাম্বলি রহ. প্রমুখ ওলামায়ে কেরামের নিকট শবে বরাতে ইবাদত করা মুস্তাহাব। [কাশফুল কিনা-১/৪৪৫, লাতায়িফুল মায়ারিফ, পৃষ্ঠা-১৫১]
শায়খ ইবনে তাইমিয়ার অভিমত
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, পনের শাবানের রাতের ফযিলত সম্পর্কে একাধিক মারফু’ হাদীস, আসারে সাহাবা বর্ণিত রয়েছে। এগুলো দ্বারা ওই রাতের ফজিলত ও মর্যাদা প্রমাণিত হয়। সালফে সালেহীনদের কেউ কেউ ওই রাতের নফল নামাযের ব্যাপারে যত্মবান হতেন। [ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকিম-২য় খন্ড,৬৩১ পৃষ্ঠা]
শবে বরাতের আমল ও করণীয় বিষয়
উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়শা রা. বর্ণনা করেন, একদা রাত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে নামায আদায় করছিলেন। সেজদা এত দীর্ঘ করলেন যে, আমি ধারণা করলাম তিনি হয়তো ইন্তেকাল করেছেন। আমি তখন ওঠে গিয়ে তাঁর পায়ের আঙ্গুল ধরে নাড়া দিলাম। আঙ্গুলটি নড়ে উঠলো। আমি বিছানায় চলে এলাম। যখন তিনি সালাত শেষ করলেন, আমাকে ডেকে বললেন, হে আয়শা! অথবা বললেন, হে হুমায়রা! তোমার কি এ আশঙ্কা হয়েছে যে, আল্লাহ ও তার রাসূল তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি বললাম, তা নয় হে আল্লাহর রাসূল! আপনার দীর্ঘ সেজদার কারণে আমার আশঙ্কা হয়েছে যে, আপনি ইন্তেকাল করেছেন কিনা। তারপর তিনি বললেন, তুমি কি জানো এটা কোন রাত? আমি বললাম আল্লাহ ও তার রাসূল ভাল জানেন। তিনি বললেন, এটা মধ্য শাবানের রাত। এ রাতে আল্লাহ পাক তার বান্দাদের প্রতি মনোনিবেশ করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন। কিন্তু হিংসুকদেরকে ছেড়ে দেন তাদের অবস্থার ওপর।  [বায়হাকি শরীফ: ৩য় খন্ড, ৩৮২ পৃষ্ঠা]
এ হাদীস থেকে জানা যায় যে, এ রাতে দীর্ঘ নফল নামায পড়া উত্তম, যাতে সেজদাও দীর্ঘ হবে। এছাড়া এ রাতে কুরআন তেলাওয়াত, তাসবীহ-তাহলীল ও যিকির-আযকার ইত্যাদি আমল করা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, এ রাতের আমল সম্মিলিত নয়, বরং নির্জনে একাকীভাবে পালনীয়। আমাদের সমাজে শবে বরাতে মানুষ নফল আমলের জন্যে যেভাবে দলে দলে মসজিদে সমবেত হয়, তার প্রমাণ হাদিসে নেই। সাহাবায়ে কেরামের যুগেও এর রেওয়াজ ছিল না। ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেছেন, নফল ইবাদত এমনভাবে করবে যে, সেখানে কেবল তুমি আছো আর আছে তোমার মালিক আল্লাহ। তৃতীয় কেউ নেই।
২.পরদিন রোযা রাখা। হযরত আলী রা.সূত্রে বর্ণিত হাদিসে এ ব্যাপারে নির্দেশ রয়েছে।
৩.বেশি বেশি দোআ করা। সমস্ত বিপদাপদ, রোগ-শোক, অভাব-অনটন থেকে মুক্তি চাওয়া। এই মর্মে হাদিসে বর্ণনা এসেছে।
৪. কবর যিয়ারত করা ও কবরবাসীদের জন্য দোআ করা। যেমন হাদিসে এসেছে-রাসূল সা. শবে বরাতে জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে গিয়েছেন এবং দোআ করেছেন। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরস্থানে একাকী গিয়েছেন। লোকজনকে ডেকে দলবল সহকারে যাননি। প্রত্যেকটা আমল সেভাবেই করতে হবে নবীজি সা. যেভাবে করেছেন বা করতে বলেছেন। কারণ তিনি আমাদের আদর্শ।
শবে বরাতের কিছু ভিত্তিহীন কাজ
শবে বরাতের জন্য বিশেষ কোনো নামায নেই। আমাদের সমাজের অনেকে মনে করেন, এ রাতের নামাযের বিশেষ নিয়ম পদ্ধতি রয়েছে। তারা মকসুদুল মুমিনীন নামক কিতাবের বরাত দিয়ে বলেন, এই নামাযের নিয়ম-পদ্ধতি ভিন্ন। যেমন-প্রথম রাকাতে অমুক সূরা পড়তে হবে। দ্বিতীয় রাকাতে অমুক সূরা পড়তে হবে। এ জাতীয় কথা সম্পুর্ণ ভিত্তিহীন ও  বানোয়াট। এমনিভাবে মসজিদ আলোকসজ্জা করা বা মসজিদে সমবেত হয়ে ওয়াজ করা, সম্মেলিত যিকির বা দরুদ পাঠ ইত্যাদির প্রমাণ কোনো নির্ভরযোগ্য কিতাবে পাওয়া যায় না।
মুবারক রাতে গুনাহ
এ কথা সত্য যে, বরকতময় স্থান ও সময়ে নেককাজ যেমন ফতিলতপূর্ণ, তেমনি তাতে গোনাহের কাজও মারাত্মক অন্যায়। যেমন, মসজিদের ভেতরে গোনাহের কাজ বাহিরে করা থেকে মারাত্মক গুরুতর। এমনিভাবে রমজান মাসে অন্যায় করা অন্য মাসের তুলনায় জগণ্য অপরাধ। এ হিসেবে শবে বরাতে অন্যায় কাজ করাও মারাত্মক অপরাধ হবে নিঃসন্দেহে। দুঃখজনক হলেও বাস্তব যে, এ বরকতময় রাতে আমাদের সমাজের কিছু লোক বুঝে বা না বুঝে অন্যায় ও গর্হিত কাজে জড়িয়ে পড়ে। যেমন, এ রাতে আতশবাজি ও ফটকা ফোটায়, যাতে জান ও মালের ক্ষতি সাধনের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে এতে গোনাহের পাশাপাশি দুনিয়াবি ক্ষতিও হতে পারে। দ্বিতীয়ত, কিছু লোক ইবাদতরূপে গোনাহ করে থাকেন। যেমন, খিচুড়ি পাকানো, হালুয়া-রুটি তৈরি করা, মসজিদে মিষ্টান্ন বিতরণ ইত্যাদি। অনেকে এগুলো জায়েয করার জন্যে তাবিলের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। কিন্তু এটা সত্য যে, নবীজি সা. সাহাবা ও পরবর্তী সালফে সালেহীনদের যামানায় এ নিয়ম ছিল না। তাই এ সকল কাজ সুস্পষ্ট বেদআত।

লেখক: মাহবুবুর রহমান নোমানি
মুহাদ্দিস, জামিয়া উসমানিয়া দারুল উলুম সাতাইশ, টঙ্গী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight