শবেবরাত : করণীয়-বর্জনীয় / উবায়দুল হক খান

শব শব্দটি ফার্সি। তার অর্থ রাত। আর বরাত শব্দটি আরবি। তার অর্থ মুক্তি। অতএব, শবেবরাত অর্থ হলো মুক্তির রাত। মধ্য শাবানের এ রাতে মহান আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে এসে গোনাহের কাজে লিপ্ত, অভাব-অনটনে আচ্ছন্ন; রোগ-শোকে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মুক্তির আহ্বান করেন। তাই এ রাতকে ‘শবেবরাত’ বা ‘মুক্তির রজনী’ বলা হয়।
মহান আল্লাহ তাআলা এ রাতে বান্দাদের ডেকে বলেন, যারা পাপ থেকে মুক্তি পেতে চাও, মুক্তি প্রার্থনা করো; আমি মুক্তি দেবো। যারা রোগাক্রান্ত আছো, আমার কাছে সুস্থতা চাও; আমি সুস্থ করে দেবো। যারা শোকগ্রস্ত আছো, মুক্তি চাও; আমি মুক্তি দেবো।
এভাবে আল্লাহ তাআলা সারা রাত মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে ডাকতে থাকেন। আল্লাহর এ ডাকে যারা সাড়া দিয়ে তাঁর কাছে মা চায় বা কিছু প্রার্থনা করে, তিনি তাদের মা করেন এবং দান করেন।
হাদিসের ভাষ্যমতে, এ রাতে আল্লাহ তাআলা আগামি এক বছরের জন্য মানুষের ভাগ্য তথা হায়াত-মওত, রিযিক-সম্পদ ইত্যাদির ফায়সালা করেন। তবে এ সম্পর্কে হাদিসে দু’টি রাতের কথা পাওয়া যায়। শবেবরাত আবার শবেকদর সম্পর্কেও বর্ণিত হয়েছে।
কেউ কেউ বলেন, তাকদীর সংক্রান্ত বিষয়াদির প্রাথমিক ও সংরতি ফায়সালা শবেবরাতেই হয়ে যায়। অতঃপর তার বিশদ বিবরণ শবেকদরে লিপিবদ্ধ করা হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন,দুনিয়ার শুরু থেকে নিয়ে শেষ; বরং অনন্তকাল পর্যন্ত যা হবে, আল্লাহ তাআলা সবকিছুর ফায়সালা ‘লওহে মাহফুজে’ লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। নতুন করে এক বছরের জন্য লেখার কিছুই নেই। তবে শবেবরাতে শুধু এ কাজ করা হয়, আগামি এক বছরের জন্য কী বাজেট রয়েছে, তা লওহে মাহফুজ থেকে ফেরেশতাদের দিয়ে আলাদাভাবে নোট করানো হয় এবং আগামি এক বৎসরের সবকিছুর দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ফেরেশতাদের বুঝিয়ে দেয়া হয়।
শবেবরাতে করণীয় হিসেবে হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, তোমরা শাবানের মধ্য তারিখ রাতে জাগ্রত থাকো এবং দিনে রোযা রাখো।
অন্য হাদিসে রয়েছে, হযরত আয়েশা রা. বলেন, একদিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার গৃহে এসে গায়ের কাপড় খুলে না শুয়ে পুনরায় কাপড় পরিধান করে বেরিয়ে গেলেন। এতে আমার আত্মমর্যাদাবোধে আঘাত লাগলো।
আমি ভাবলাম, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয় তো অন্য কোন স্ত্রীর ঘরে নিশি যাপন করবেন। তাই আমি খুঁজতে বের হলাম। খুঁজে পেলাম মদিনার [জান্নাতুল বাকী] কবরস্তানে। গিয়ে দেখি তিনি আসমানের দিকে হাত উঠিয়ে মুমিন মুসলমান নর-নারী ও শহীদদের জন্য দোয়া করছেন। এটা ছিল বরাতের রাতের ঘটনা। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা এ রাতে প্রথম আসমানে এসে বান্দাদের ব্যাপকভাবে মা করেন। যার পরিমাণ কালব নামক গোত্রের বকরির পশমের চেয়েও বেশি। [উক্ত গোত্রের লোকেরা বেশি করে বকরী পালতো]।
শবেবরাতে আমরা কী আমল করব এ সম্পর্কে কুরআন-হাদিস ও ফিকহের কিতাবাদিতে যে কয়টি আমলের কথা বণির্ত হয়েছে তা হলো,
১. বেশি করে নফল ইবাদত করা। তবে এেেত্র বিশেষ কোন পদ্ধতি হাদিস শরিফে উল্লেখ নেই। তাই অন্যান্য নামাযের ন্যায়ই এ রাতের নামায পড়তে হবে। ২. পরের দিন নফল রোযা রাখা। ৩. এ রাতে বেশি বেশি দোয়া করা। সমস্ত রোগ-শোক, অভাব-অনটন ও দারিদ্র থেকে মুক্তি চাওয়া। বিশেষ করে গোনাহ থেকে মুক্তি চাওয়া। ৪. মৃত ব্যক্তিদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করা। ৫. জিয়ারতের জন্য কবরস্তানে যাওয়া। যেহেতু এ রাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতুল বাকীতে গিয়েছেন। তবে এ ক্ষেত্রে সদলবলে আড়ম্বরের সাথে যাওয়া নিষেধ। ৬. এ রাত ইবাদতের রাত। তাই ফুকাহায়ে কেরাম এ রাতে গোসল করা মুস্তাহাব বলেছেন।
শবেবরাত একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ রাত। এ রাতে যে কোন নেক কাজ করলে যেমন অনেক সাওয়াব পাওয়া যায়, ঠিক তদ্রূপ এ রাতে গোনাহ করলেও তা বড় গোনাহ হয়ে দাঁড়াবে। তাই বিশেষ করে এ রাতে সবরকম গোনাহ থেকে মুক্ত থাকতে হবে এবং বেশি করে আল্লাহর কাছে গোনাহ মাফের দোয়া করতে হবে। কেননা সব চাওয়ার মাঝে গোনাহ থেকে মুক্তিই হলো বড় চাওয়া। আর তা থেকে মুক্তি পাওয়াই হলো বড় পাওয়া।
অতএব, গোনাহ থেকে মুক্তি পেতে হলে আল্লাহর নিকট খাঁটিভাবে তাওবা করতে হবে। এেেত্র জেনে রাখতে হবে, তাওবা শুধু মুখে করলেই হবে না। এরকম  তাওবা দ্বারা পাপ থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব হবে না। তাই তাওবা করতে হবে খাঁটিভাবে, দরদ দিলে, লজ্জিত হয়ে; অনুতপ্ত হৃদয়ে।
মূলত যে তাওবা গোনাহ থেকে মুক্তি দেয়, নাজাত দেয় জাহান্নাম থেকে; সে তাওবার জন্য প্রধানত চারটি শর্ত রয়েছে। তা হলোÑ
১. অতীতের সকল গোনাহ সম্পর্কে অনুতপ্ত হওয়া। ২. যে গোনাহের তাওবা করা হচ্ছে, সে গোনাহ তখনই ত্যাগ করা। ৩. ভবিষ্যতে উক্ত গোনাহ না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া। ৪. গোনাহ যদি বান্দার হক সংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে তার হক আদায় করা বা মা চেয়ে নেয়া।
উল্লিখিত চারটি শর্তের সাথে বান্দা যদি আঁখি থেকে তপ্ত অশ্রু ঝরাতে পারে, তবেই তাওবা কবুলের নিশ্চিত আশা করতে পারে।
জেনে রাখা ভালো, দোয়া কবুল হওয়ার জন্য উক্ত চারটি শর্ত ছাড়াও আরও কতগুলো আমল রয়েছে, যা জীবনের সব সময় করতে হয়। তা হলো,
১. হালাল রিজিক খাওয়া। খাবার, পোশাক ও জীবিকা এ সবকিছুই হালাল উপায়ে হতে হবে। ২. মাতা-পিতার নাফরমানি না করা। ৩. সাধ্যানুযায়ী আমর বিল মারুফ, নাহি আনিল মুনকার করা। অর্থাৎ, মানুষকে ভাল কথা বলা, মন্দ কাজ থেকে বারণ করা। ৪. আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা, তাদের হক আদায় করা। ৫. গীবত না করা। অর্থাৎ, কোন মানুষের পেছনে তার বদনাম বা সমালোচনা না করা। ৬. হাসাদ তথা হিংসা না করা। ৭. বখিলী না করা, অর্থাৎ আল্লাহর দেয়া সম্পদ যেখানে ব্যয় করা দরকার, প্রয়োজন অনুযায়ী সেখানে ব্যয় করা।
শবেবরাতের বিশেষ একটি আমল হচ্ছে, মুরদাদের জন্য ঈসালে সাওয়াব। ঈসালে সাওয়াব অর্থ হচ্ছে, ‘সাওয়াব পৌঁছে দেয়া’। যারা দুনিয়া থেকে চলে যান তাদের কাছে আমরা বিভিন্নভাবে সাওয়াব পৌঁছাতে পারি। এর কয়েকটি পদ্ধতি হলো,
১. তাদের জন্য বেশি করে দোয়া করা। ২. যে কোন ইবাদত করে তাদের উদ্দেশে সাওয়াব পৌঁছে দেয়া। ৩. কুরআন তেলাওয়াত করা। ৪. জিকির-আজকার করা। ৫. দান-সদকা করা।
এছাড়াও যেকোনভাবে নফল ইবাদত করে এর সাওয়াব তাদের কাছে পৌঁছাতে পারি। এ রাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিন নর-নারী এবং শহীদদের জন্য দোয়া করেছেন, এটা ঈসালে সাওয়াবের অন্তর্ভুক্ত। তাই আমরাও এ রাতে মুরদাদের জন্য যে কোনভাবে শরয়ী পন্থায় ঈসালে সাওয়াব করতে পারি।
মুসলিম সমাজে শবেবরাতের এ মহান রাতে বিভিন্ন কুসংস্কার-কুসংস্কৃতি ও রসম-রেওয়াজ প্রচলিত হয়ে আসছে দীর্ঘ দিন ধরে। কুরআন-হাদিসে এর নির্ভরযোগ্য কোন প্রমাণাদি না থাকলেও কিছু লোক স্বীয় মূর্খতা ও অজ্ঞতার কারণে শরীয়ত পরিপন্থী কাজগুলো করেই যাচ্ছে। এরকম কাজগুলোকে তারা উক্ত রাতের বিশেষ আমল হিসেবেও মনে করছে। এ রাতের কুসংস্কারসমূহের অন্যতম হলো, হালুয়া-রুটি। এর প্রচলন কখন আরম্ভ হয়েছে, তা আমাদের জানা নেই। হয় তো কোন এক সময়, কোন এক গ্রামের কিছু লোক মৃত ব্যক্তিদের সাওয়াব পৌঁছানোর জন্য রুটির ব্যবস্থা করেছিল। আর রুটি যেহেতু হালুয়া দ্বারা ভালোভাবে খাওয়া যায়, তাই হালুয়ারও ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আর এভাবেই জন্ম নিল একটি কুপ্রথা। শরীয়তে যার কোন ভিত্তি নেই। নিঃসন্দেহে এটি একটি শরীয়ত গর্হিত কাজ। এ থেকে অবশ্যই সবাইকে বিরত থাকতে হবে।
এছাড়াও এ রাতকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে যেসব কুপ্রথা চালু রয়েছে, তা হলো,
১. পটকা ফুটানো। ২. মোমবাতি জ্বালানো। ৩. কবরে ফুল বা মালা দেয়া। ৪. মসজিদে বিস্কুট, মিষ্টি-জিলাপি ইত্যাদি নিয়ে হৈ-চৈ, ঝগড়াঝাটি করা। ৫. ছোট বাচ্চাদের আগরবাতি ও মোমবাতি নিয়ে খেলা করা। ৬. দৌড়াদৌড়ি করা ইত্যাদি।
এ সব প্রথাও শরীয়তবিরোধী। তাই শরীয়তবিরোধী সব কাজ থেকে নিজে বিরত থাকতে হবে এবং অন্যকেও বিরত রাখতে হবে।
একটি বিষয় আমাদের ভাল করে জেনে রাখতে হবে। তা হলো, এ রাতের ইবাদত-বন্দেগী ও জিকির-আজকার থেকে বিরত রাখার জন্য শয়তান আমাদের হালুয়া-রুটি এবং শরীয়তবিরোধী বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত রাখে। এমনকি অনেক মহিলা কর্মব্যস্ততার দরুন এ মহান রাতেও ফরয নামায পর্যন্ত ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তাই আমাদের সজাগ থাকতে হবে শয়তানের প্ররোচনা থেকে। সচেতন থাকতে হবে নামাযের প্রতি। কোনক্রমেই যেন নামায আদায়ে দুর্বলতা প্রকাশ না পায়। না হয় কিন্তু আমাদের ধ্বংস অনিবার্য।
মুমিন ভাই-বোনেরা! যে রসম পালন করতে গিয়ে আল্লাহর মহান হুকুম ছাড়তে হয়, সে রসম পালনের ঘোর আঁধারে আমরা আর কতকাল নিমজ্জিত থাকব? আর কতদিন এ অন্যায় কাজ করে যাব?
অতএব, আমরা যারা মা চাই, মুক্তি চাই জাহান্নাম থেকে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে এ রাতের গুরুত্ব দিতে চাই; তারা যেন কোনক্রমেই শরীয়ত গর্হিত এ সকল কাজে অংশ গ্রহণ না করি। বরং পূর্বোল্লিখিত ছয়টি আমলের মাধ্যমে সারা রাত অতিবাহিত করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে শরীয়তসম্মত কাজ করার ও শরীয়তবিরোধী রসমগুলো থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : বিভাগীয় সম্পাদক, মাসিক আন-নাবা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight