লাশ : ফারহানা সিরাজ

সুফিয়া আজই ফেরার কথা। সেই কাক ডাকা ভোরে রওয়ানা হবে। একটু সকাল হলেই আবার জ্যামে পড়তে হবে। এদিকে সুফিয়ার ছোট বোন আয়েশা গতকাল থেকে উল্লাসে উচ্ছ্বাসে বিভোর। বড়বোন আসবে। ঈদের নতুন পোশাক আনবে। জুতা আনবে। সাজগোজের জিনিস আনবে। সেই কি আনন্দ আর মাতামাতি। বারবার মাকে বলে সুফিয়াপু কখন আসবে? কখন আসবে? আমার যে আর ত্বর সইছেনা। ওপাড়ার মেয়েদের নতুন জমা নিয়ে এসেছে। সাদিয়ার মামা তার জন্য নতুন জুতা পাঠিয়েছে। মহিমার বড়ভাই তার জন্য লিপিস্টিক পাঠিয়েছে ঢাকা থেকে কতক্ষণ আর সময় লাগে।
সকালটা কেটে গেল সুফিয়া ফিরেনি। হয়তো একটু পরেই ফিরবে। সুফিয়ার মা তার পছন্দের সব তরিতরকারি রান্না করছে। চ্যাপা শুকটির ভর্তা তার প্রিয়। পুইশাক পুটিমাছের ঝাল জোল তার প্রিয়। একেক করে তার প্রিয় খাবারগুলো প্রস্তুত করে চলছে সুফিয়ার মা। সুফিয়ার মা সুফিয়াকে একটু বেশিই ভালোবাসেন। মা তার সন্তানকে ভালোবাসবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সুফিয়ার মার বিষয়টি এখানে ভিন্ন। কারণ, সেই দশ বছর আগে সুফিয়ার বয়স যখন ১৩/১৪ হবে। কাল বৈশাখের কালো ঝড়ে তার বাবা নদী থেকে ফেরার পথে মারা যায়। সেই কচি বয়স থেকে সুফিয়া সংসারের হাল ধরেছে। নিজের স্বপ্নস্বাদ আর আহলাদ গলা টিপে হত্যা করেছে। ছোট দুই ভাইবোনকে লেখাপড়া শিখিয়েছে, এখনো তাদের জন্য কাজ করে। সংসারের সব লেনাদেনা উঠিয়েছে। মাকে কাজ করতে দেয়নি। তাই সুফিয়ার মা; অন্য মাদের তুলনায় নিজের সন্তান সুফিয়াকে একটু বেশিই ভালোবাসে।
সকাল দশটা। হয়তো এখনই সুফিয়া আসবে। চিৎকার করে মা বলে উঠবে। আয়েশা কই বলে বাড়ী হৈ হুল্লোড় করবে। মা রান্নাঘরে। কিন্তু তার দেহমন আত্মা রাস্তায় পড়ে আছে। কখন সুফিয়া আসবে। মায়ের মন। একটু পর পর রাস্তায় নজর। ছোট বোনও হঠাৎ হঠাৎ এসে বলে- মা, সুফিয়াপু কি আইছে?। আবার খেলতে যায়। আবার আসে। জিজ্ঞাস করে সুফিয়াপু কি আইছে? তার এমন জিজ্ঞাসা মায়ের মনকে আরো বিষিয়ে তুলে। ছোট ভাই আরমান বলে, মা সকাল তো শেষ এখনো সুফিয়াপু আসে নাই ক্য? মা নিশ্চুপ। আসবো বলে রান্নায় মনোযোগী। পছন্দের সব খাবার রান্না শেষ। আকাশের সূর্যটা আগে বাড়ছে। সকাল শেষে দুপুরের কড়া রোদ ছড়াচ্ছে। সুফিয়া আসার নাম গন্ধও নেই। মার মনে আনচান। মার ভাবনায় হরেক রকম চিন্তা। রাস্তায় জ্যাম! না এক্সিডেন্ট বা অন্যকোনো সমস্যা? না, এমন অলক্ষণে ভাবনা ভাবাও ঠিক না। ঘর গোছানোর কাজে মন দেয় মা। এদিকে সকালে বের হওয়ার পর থেকেই সুফিয়ার মোবাইলটা বন্ধ। দুপুরের খাবার সময় হয়ে গেল। সুফিয়ার সাথে সেই সকালের খাবার কথা। সুফিয়া আসলো না। বাড়ীর পাশের বড় রাস্তাটায় কত মানুষের আসা যাওয়া। কিন্তু সুফিয়া নেই। সুফিয়া আসে না কেন! মা’র নীরব জিজ্ঞাসা। দুপুরের খাবারে বসে আরমান মাকে বলে- মা, হয়তো সুফিয়াপু আজকে আসবে না। না, আসবেই। ছোট বোন আয়েশার জবাব। আসলে তো এখনই আসতো, কই আসেনি তো? আয়েশা নীরব। কথা বলে না। গো ধরেছে। মনে মনে ভেবে রেখেছে সুফিয়াপুর সাথেও কথা বলবে না। বিকালটাও পাড় হয়ে গেল। মা বিষণœ। বিরহগ্রস্থ। কষ্টে রক্তাক্ত। সুফিয়া আসলোই না। আকাশটায় সন্ধ্যার আয়োজন চলছে। আরমান প্রতিদিনের মতো হাত পা ধুয়ে বই খাতা নিয়ে বসছে। যদিও তার মাদরাসা বন্ধ। মা, নিশ্চুপ বসে আছে। আয়েশাও আনচান করছে। ও বাড়ীর চাচী সন্ধ্যায় এসেছিল সুফিয়া আসছে কিনা খবর জানতে। আসলোই না। রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে কচিপ্রাণ আরমান আর আয়েশা।
বাহিরে কারো পায়ে শব্দ। মায়ের বুকে মৃদুকম্পন। সুফিয়া! ভাবতে না ভাবেতই দরজায় করাঘাত। সুফিয়ার মা ঘরে আছো নাকি। কণ্ঠে পুরুষ। চেনা কণ্ঠ। তারপরও সুফিয়ার মা’র ভয় ভয় জিজ্ঞাসা, কে? আমি সাদু মেম্বার, দরজাটা খোল। ভয় কেটে গেল। দরজা খোলে দিলো। সুফিয়ার মার নজর মেম্বারকে ভেদ করে উঠুনে। উঠুনে ‘লাশ’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight