রাসূল সা.-এর উত্তম আদর্শ ও আমাদের অবস্থা : অন্যায় প্রতিরোধে রাসূল সা. / ড. আবদুল মুকীত আযহারী

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনি আল্লাহর দয়ায় তাদের জন্য নরম হয়েছেন। যদি আপনি কর্কশ ও কঠিন মনের হতেন তবে তারা আপনার পাশ থেকে সরে যেত। অতএব আপনি তাদেরকে ক্ষমা করুন, তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন ও তাদের সাথে বিষয় নিয়ে পরামর্শ করুন। যখন আপনি সিদ্ধান্ত নেন তখন আল্লাহর উপর ভরসা করুন।’ [সূরা আলে ইমরান : আয়াত ১৫৯-১৬০] রাসূল সা. বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা নরম এবং তিনি ন¤্রতাকে ভালবাসেন।’ রাসূল সা. বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা ন¤্রতার উপর যা (যে সফলতা, যে অর্জন) দান করেন তা কঠোরতার উপর দান করেন না।’ [আল-মুনযিরি, নাসিরুদ্দীন আলবানী, হাদীস ২৬৬৬]
রাসূল সা. ন¤্র ছিলেন এবং সকল কাজে ন¤্রতা প্রদর্শন করাকে আমাদের জন্য আদর্শরূপে ঘোষণা করেছেন। কেউ প্রশ্ন করতে পারে যে অন্যায় প্রতিরোধ করা বা প্রশাসনিক কাজ করাও ইসলামের নীতি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিরোধ করতে এবং প্রশাসনিক কাজ সফল শাসনিক কাজ সম্পাদন করা সম্ভব হয় না। আমরা ছোটবেলায় শুনেছি, যারা প্রশাসনে চাকুরি করে তাদেরকে মানুষের সাথে কিভাবে কঠোরতা করা যায় তা শিখানো হয় এবং তাদেরকে কঠোরতা প্রদর্শনের জন্য বিভিন্ন ধরনের গালিগালাজের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
রাসূল সা. পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অন্যায়ের প্রতিরোধ করেছেন। তিনি অন্ধকার যুগের সকল অন্যায়কে দমন করে স্বর্ণযুগে রূপান্তরিত করেছেন। তিনি সর্বদা সকল অন্যায়কে ন¤্র উপায়ে দমন করার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। তবে হাঁ, কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি বাধ্য হয়ে শেষ বিকল্পস্বরূপ কঠোরতা অবলম্বন করেছেন। রাসূল সা. বলেন, ‘তোমাদের কেউ কোন অন্যায় দেখলে তা হাত দ্বারা দমন করবে। যদি তা সম্ভব না হয় তবে তা মুখ দ্বারা দমন করবে আর যদি তাও সম্ভব না হয় তবে অন্তর দ্বারা পরিবর্তন করবে (ঘৃণা করবে ও পরিবর্তনের পরকিল্পনা করবে)।’ [মুসলিম শরীফ : ৭৩]
সম্ভব না হওয়ার অর্থ ক্ষমতা না থাকাই শুধু না, বরং ইসলামী চিন্তাবিদগণ বলেন, সম্ভব না হওয়ার অর্থ হলো, যদি সে অন্যায় দমন করতে যায় তবে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হবে অথবা অন্যায় দমন দ্বারা যে লাভের আশা করা হচ্ছে তা হবে না। এটার প্রতি আল্লাহ তাআলা ইঙ্গিত করে বলেন, আপনি আপনার পালনকর্তার পথে কৌশল ও সুন্দর ভাষায় আহবান করেন এবং তাদের সাথে উত্তম উপায়ে বিতর্ক করেন। যেখানে যে উপায় অবলম্বন করলে দাওয়াত কার্যকরী হবে সে উপায় অবলম্বন করাটাই হলো কৌশল। রাসূল সা. যে অন্যায়ের দমন কঠোর উপায়ে করেছেন – যেমন বদরের যুদ্ধ, উহুদের যুদ্ধ ইত্যাদি – তা একান্তই শেষ বিকল্প ছিল। ভাল কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধের ক্ষেত্রে সকল নবীগণের আদর্শই ন¤্রতা ছিল। আর কঠোরতা, শক্তি প্রয়োগ বা যুদ্ধ একমাত্র শেষ বিকল্প ছিল। ন¤্রতা, আপোস আলোচন ও শান্ত উপায়ের সকল পথ ব্যর্থ হলেই কেবল কঠোরতা বা শক্তি প্রয়োগের বিধান ছিল।
রাসূল সা.-এর মজলিসে এক যুবক দাঁড়িয়ে বলল, আমি ব্যভিচার করতে চাই, আমাকে ব্যভিচার করার অনুমতি দিন। মসজিদের ভরা মজলিসে আমাদের সামনে যদি কেউ এমন কথা বলত তখন আমরা কি করতাম? বেয়াদব, অসভ্য! ফাজলামো করার আর জায়গা পাও না। একে বের করে দিন। এরকম বেয়াদব মজলিসে থাকার যোগ্য না। রাসূল সা. কী করলেন? রাসূল সা. ন¤্র ভাষায় বললেন, হে যুবক! কাছে আস। যখন সে রাসূল সা.-এর কাছে আসল তখন মায়াকণ্ঠে রাসূল সা. বললেন, যদি কেউ তোমার মায়ের সাথে ব্যভিচার করতে চায়, তবে তুমি রাজি হবে? সে বলল, না, কখনো না। রাসূল সা. বললেন, এরকম কোন সন্তান তার মায়ের সাথে কারো ব্যভিচার করা পছন্দ করবে না। রাসূল সা. বললেন, যদি কেউ তোমার বোনের সাথে ব্যভিচার করতে চায়, তবে তুমি রাজি হবে? সে বলল, না, কখনো না। রাসূল সা. বললেন, এরকম কেউ তার বোনের সাথে ব্যভিচার করা সহ্য করবে না। রাসূল সা. আবার বললেন, যদি কেউ তোমার স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করতে চায় তবে তুমি রাজি হবে? সে বলল, না কখনো না। রাসূল সা. বললেন, কোন স্বামী এমনিভাবে তার স্ত্রীর সাথে কারো ব্যভিচার করা সহ্য করবে না। রাসূল সা. এভাবে খালা, ফুফু ইত্যাদি উল্লেখ করতে লাগলেন আর সে যুবক না না বলতে থাকল। অবশেষে রাসূল সা. তার বুকে হাত রেখে দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! আপনি এই যুবকের পাপ মাফ করে দিন, তার অন্তরকে পরিষ্কার করে দিন এবং তার লজ্জাস্থানকে সুরক্ষিত রাখুন। [মুসনাদের আহমাদ : ২১৬২৮]  সাহাবাগণ বলেন, অতঃপর এরকম ব্যভিচারের আগ্রহ সেই যুবকের চিন্তায়ও আর কখনো আসেনি। রাসূল সা. এভাবে ন¤্রতার মাধ্যমে অন্যায় দমন করতেন।
মক্কার প-িতদের মধ্যে হুসাইন বিন আবীদ একজন বড় প-িত ছিলেন। মক্কার লোকজন তার কাছে এসে বলল, মুহাম্মাদ সা. আমাদের বাপ-দাদাকে দোষারোপ করে, আমাদের বাপ-সন্তান, স্বামী-স্ত্রী এবং আত্মীয় স্বজনের মাঝে বিভেদ ও দূরত্ব সৃষ্টি করছে। আমাদের ধর্ম ও আমাদের দেব-দেবীকে নিয়ে কটাক্ষ করে। তাই তার কাছে গিয়ে তাকে বুদ্ধিভিত্তিক তথ্য ও যুক্তি দিয়ে ভাল করে একটু শায়েস্তা কর। সে একজন ইসলাম বিদ্বেষী বুদ্ধিজীবী যে ইসলামের ক্ষতি করতে রাসূল সা.-এর কাছে আসছে। অথচ সে যখন রাসূল সা.-এর কাছে আসে তখন রাসূল সা. তাকে সম্মান প্রদর্শন করে বলছেন, এই বুদ্ধিজীবী সুধীর জন্য জায়গা করে দাও এবং তাকে কাছে আসতে দাও। সে কাছে এসে বলছে, ভাতিজা! তুমি আমাদের বাপ-দাদাকে গাল-মন্দ করছ, আমাদের দেব-দেবী এবং আমাদের ধর্মকে গালিগালাজ করছ? অথচ তোমার বাবা তো এরকম ছিল না। তিনি তো একজন ভাল মানুষ ছিলেন ও কল্যাণকামী ছিলেন এবং আমাদের মত এরকম ধর্ম মেনেছেন ও দেব-দেবীর পূজা করেছেন। যখন তর্কের সময় কেউ কাউকে তিরস্কার করতে চায় তখন এমনই বলে যে, আপনি এমন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ঝগড়া-বিবাদ করছেন অথচ আপনার বাবাতো অনেক ভাল মানুষ ছিলেন। প্রতি উত্তরে তখন রাসূল সা. বললেন, হে হুসাইন! আমার বাবা এবং তোমার বাবা উভয়ের অবস্থানই জাহান্নামে। অর্থাৎ আমার বাবা ও তোমার বাবা সকলে ভুল করেছে তাই এখন তারা জাহান্নামে। তারা ভুল করেছে বলে আমরা সেটাকে ভুল বলব না বা তাদের মত ভুল আমরাও করব, এটাতো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। রাসূল সা.-এর বাবা ভুল করেছেন বলে রাসূল সা. সেটাকে ভুল বলবেন না সেটাতো কখনো সম্ভব না। যেমন আমাদের সমাজে আইন অন্যের জন্য আমার জন্য নয়। আমি ভুল করলে বা আমার পরিবার বা আমার দল ভুল করলে সেটাকে ভুল বলতে আমরা রাজি নই; বরং সে ভুলকে সঠিক সাব্যস্ত করতে আমরা হাজারো ছলচাতুরি করে থাকি। রাসূল সা. এভাবে তার সাথে বুদ্ধিভিত্তিক খোলামেলা আলোচনা করছেন এবং জিজ্ঞাসা করছেন, হে হুসাইন! আপনি কতজন দেবীর পূজা করেন? সে বলল, সাতজনের, তার মধ্যে ছয়জন পৃথিবীতে এবং একজন আকাশে। রাসূল সা.বললেন, যখন আপনার বিপদ হয় (যখন আপনি নৌকায় যাচ্ছেন আর সমুদ্রে ঝড় ওঠে) তখন কাকে ডাকেন? সে বলল, আকাশের খোদাকে ডাকি। যখন আপনার মসিবত আসে তখন কাকে ডাকেন? সে বলল, আকাশের আল্লাহকে ডাকি। আপনি পৃথিবীর দেবতাগুলোকে সুখের সময় ডাকেন আর বিপদের সময়ে তাদেরকে ডাকেন না এটা কি যুক্তির কথা? এটা কি বুদ্ধিমানের কাজ? আর বিপদের সময় আকাশের আল্লাহকে ডাকেন আর সুখের সময় সর্বদা তাকে ডাকেন না এটা কি বুদ্ধিমানের কাজ? যাকে আপনি বিপদের সময় ডাকেন তাকে তো সুখের সময় আরো বেশী করে ডাকাটাই তো বুদ্ধিমানের কাজ ছিল। তখন সে রাসূল সা.-এর সামনে বলল, আমি এরকম যুক্তির কথা আর কখনো শুনিনি। রাসূল সা. তখন সুযোগ পেয়ে বললেন, আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন তবে আপনি নিরাপদ থাকবেন ও শান্তি পেয়ে যাবেন। সে বলল, আমার সাথে আমার বংশ আছে। আমিতো একা ইসলাম গ্রহণ করতে পারি না। রাসূল সা. তখন বললেন, তাহলে কমপক্ষে এতটুকু করুন যে আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, হে আল্লাহ আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। সে বলল, হ্যাঁ, এটাতো বলতে পারি। রাসূল সা.-এর সাথে এরকম উম্মুক্ত সংলাপ ও খোলামেলা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা করতে করতে হযরত হুসাইনের মন গলে গেল এবং ইসলামই যে সঠিক পথ তা নিঃসন্দেহে বুঝতে পারলেন। তখন রাসূল সা.-এর সামনে তিনি ঘোষণা করলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ এক ও তার কোন শরীক নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল ও নবী। [তিরমিজী শারীফ : ৩৪৭৯] এই হুসাইন বিন আবীদের এক ছেলে ইমরান বিন হুসাইন আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তার বাবা যখন কাফের আর ইসলামের ক্ষতি করতে ও রাসূল সা.-কে তিরস্কার করতে এসেছিল সে তখন সে মজলিসেই ছিল। কিন্তু সে তার বাবার জন্য দাঁড়ায়নি, সালাম দেয়নি এবং তাকে না চেনার ভান করেছিল। অথচ তার বাবা যখন ইসলাম গ্রহণ করল তখন উপস্থিত সকলের মধ্যে সর্বপ্রথম তার ছেলে ইমরান তার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে বাবার কাছে গিয়ে বাবার কপালে, হাতে ও বুকে চুম্বন করল। রাসূল সা. এ দৃশ্য দেখে কেঁদে ফেললেন। সাহাবার জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কাঁদছেন কেন? রাসূল সা. বললেন, এই বৃদ্ধ যখন এল তখন তার ছেলে তার দিকে তাকায়নি আর এখন যখন সে ইসলাম গ্রহণ করেছে তখন তার ছেলে তাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করছে। আমি ছেলে ও তার বাবার মায়া দেখে কাঁদছি। রাসূল সা. তার সম্মানার্থে সকল সাহাবাদেরকে আদেশ করলেন যে, তোমরা এই বুদ্ধিজীবী বৃদ্ধকে তার বাসায় এগিয়ে দিয়ে আস। যখন তিনি রাসূল সা.-এর দরজা থেকে বের হলেন তখন তার অপেক্ষায় থাকা অন্যান্য কাফেররা দেখল যে তাদের প-িত ইসলাম গ্রহণ করেছে। তখন কি সকলে ইসলাম গ্রহণ করেছে? না। অহংকার মানুষকে অন্ধ করে ফেলে। তারা তাকে তিরস্কার করা শুরু করল আর বলল, তুমি এই বুড়া বয়সে বে-দীন হয়ে গেলে? তুমি ধর্মত্যাগী ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করা শুরু করল।
একজন মানুষ যখন ভাল কাজ করে তখন হাজারো মানুষ তার সে ভাল কাজে বাধা দিতে, তাকে তিরস্কার করতে দাঁড়িয়ে যায়। তখন সে ভাল কাজকে সমর্থন করা ও তার পাশে দাড়ানো সকল মুসলমানের ইমানী দায়িত্ব। রাসূল সা. বলেন, যখন তোমাদের কেউ কোন খারাপ কাজ দেখে তখন সে যেন তা হাত দ্বারা পরিবর্তন করে, যদি না পারে তবে যেন মুখ দ্বারা পরিবর্তন করে আর তাও যদি সম্ভব না হয় তবে যেন অন্তর দ্বারা ঘৃণা করে। খারাপ কাজকে ঘৃণা করা ও ভাল কাজকে পছন্দ করা সকলের ঈমানী দায়িত্ব। কেউ যদি খারাপ কাজকে ঘৃণা না করে তবে তার সামান্য ঈমানও থাকবে না।  রাসূল সা. বলেন, তোমরা ভাল কাজের আদেশ করতে থাক ও খারাপ কাজের নিষেধ করতে থাক। এমন একটা সময় হবে যখন কেউ ভাল কাজের আদেশ করবে না এবং খারাপ কাজের নিষেধ করবে না। সাহাবা কেরাম রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এমন কি হবে? তিনি বললেন, এমন তো হবেই বরং এর চেয়ে আরো বেশি খারাপ অবস্থা হবে। সাহাবাগণ বললেন, এর চেয়ে খারাপ অবস্থাটা কি? রাসূল সা. বললেন, মানুষজন ভাল কাজকে খারাপ মনে করবে আর খারাপ কাজকে ভাল মনে করবে। সাহাবাগণ বললেন, এমনটা কি হবে? রাসূল সা. বললেন, এর চেয়েও খারাপ অবস্থা হবে। (এমন এক যুগ আসবে যে, মানুষজন ভাল কাজ করতে নিষেধ করবে ও ভাল কাজ করতে বাধা দিবে এবং খারাপ কাজের আদেশ করবে ও খারাপ কাজ করতে উৎসাহ দিবে)। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি তাদেরকে এমন ফিতনা দিব যাতে সহনশীল ব্যক্তি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যাবেন। [ইবনে আবী দুনিয়া : ৩৩; মুসনাদে আবী ইয়ালা : ৬৩৮৪]
এজন্য হযরত সুফিয়ান রাহ. বলেন, যদি তুমি ভাল কাজের আদেশ করলে তবে তুমি মুমিনকে ও মুমিনের দলকে শক্তিশালী করলে। আর যদি খারাপ কাজকে খারাপ বললে তবে মুনাফিক-পাপীকে দুর্বল করলে। [মুসানদুল খাল্লাল : ৬৮]
সকল খারাপ মানুষ চায় সকল মানুষ তাদের মত খারাপ কাজ করুক আর ভাল মানুষ চায় সকল মানুষ তাদের মত ভাল কাজ করুক অথবা কমপক্ষে তাদের ভাল কাজকে সমর্থন করুক। ব্যভিচারী নির্লজ্জরা চায় সবাই তাদের মত বেলাল্লাপনা করুক। কোন হুজুর, ভদ্র মানুষ তাদের পরিবেশে আসুক তা তারা বরদাশত করে না এমনকি তাদেরকে মৌলবাদী, গ্রাম্য ইত্যাদি বলে গালমন্দ করে। মদখোররা চায় সবাই তাদের মত মদ খাক বা তাদের কাজকে আধুনিকতা ও সভ্যতা মনে করুক। তাদের মদ খাওয়াকে কেউ খারাপ বলবে সেটা তারা চায় না। যারা ঘুষ খায়, দুর্নীতি করে তারা চায় তার অফিসের সবাই দুর্নীতি করুক। কেউ তাদেরকে খারাপ বলুক সেটা তারা চায় না। বরং যে খারাপ বলে তার বিরুদ্ধে সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করে। একজন বাস মালিক বলল, দুর্নীতিবাজদের দাফটের কাছে আমাকে হার মানতে হয়েছে এবং ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হয়েছে। প্রথমে বাসের হেলপার দুর্নীতি করত সেটা ঠেকাতে চালকের সাহায্য নিলাম। কিছুদিন পর সে চালকও তার দুর্নীতির অংশীদার হল। তারপর পরিদর্শক নিয়োগ করলাম, কিছুদিন পর সেও দুর্নীতির অংশ পেল ও দুর্নীতি শুরু করল। তাদের দুর্নীতি বন্ধ করতে পরিদর্শকের পরিদর্শক নিয়োগ করলাম, কিছুদিন সেও দুর্নীতির অংশ পেল ও সবাই মিলে দুর্নীতি করল। ফলে আগে একজন দুর্নীতি করার পরও যতটুকু আয় পেতাম এখন দুর্নীতির অংশীদার একাধিক হওয়াতে ততটুকুও পাচ্ছি না। একপর্যায়ে দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের কাছে হার মেনে ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম। এভাবেই দুর্নীতিবাজরা চায় সবাই দুর্নীতি করুক, নচেৎ সবাই মিলে তার বিরোধিতা করে তাকে পরাজিত করবে।
তাই মন্দকে মন্দ বলা ও মন্দ কাজে বাধা দেওয়া ইমানী দায়িত্ব ও একজন মুসলমানের গুণ। তবে খারাপ কাজকে ন¤্র উপায়ে দমন করতে হবে। একবার এক সাহাবী রা. রাসূল সা.-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার একটি সন্তান হয়েছে তবে সেটি কালো অথচ আমরা ফর্সা। তাই আমার সন্দেহ, আমার স্ত্রীর অন্য কারো সাথে অবৈধ সম্পর্ক আছে। রাসূল সা. তার উপর রাগ হয়ে তাকে থাপ্পড় দেননি বা তার এ খারাপ সন্দেহকে কঠোর উপায়ে দমন করেননি। রাসূল সা. ন¤্র ভাষায় বলছেন, আচ্ছা! তোমার কি কোন উট আছে? সে বলল, হাঁ, আছে। তোমার উটের রং কি? সে বলল লাল। রাসূল সা. আবার বললেন, তোমার এই উটের কোন বাচ্চা কি কালো আছে। সে বলল, হাঁ। রাসূল সা. বললেন, উট লাল অথচ তার বাচ্চা কালো হল কিভাবে। সে বলল, এ উটের বংশে কোন কালো উট ছিল তার প্রভাবে হয়েছে। রাসূল সা. তখন বললেন, এরকমই তোমার এ ছেলেটিও তোমার বংশে কেউ কালো ছিল তার প্রভাবে কালো হয়েছে। [বুখারী শারীফ : ৪৯১৯] সে সাহাবীর সকল সন্দেহ দূরীভূত হয়ে গেল এবং খুশি মনে আপন বাড়িতে ফিরে গেল। রাসূল সা. ন¤্র উপায়ে এতবড় একটি পাপ (সতী নারীকে অপবাদ দেয়া) দমন করলেন যা কখনো কঠোর উপায়ে সম্ভব হত না।
রাসূল সা. সাধারণত মন্দকে ন¤্র উপায়ে দমন করতেন। তবে কঠোরতা দরকার হলে রাসূল সা. দরকার-পরিমাণ কঠোরতা অবলম্বন করতেন। রাসূল সা.-এর সাধারণ কঠোরতা প্রদর্শন হল তাঁর চেহারা লাল হয়ে যাওয়া। সাহাবাগণ বলেন, রাসূল সা.এর চেহারা যখন লাল হয়ে যেত আমরা বুঝে ফেলতাম রাসূল সা. কোন কারণে রাগ করেছেন। হযরত আয়েশা রা. বলেন, একবার একটি ছবি সম্বলিত কার্পেট ক্রয় করে আমার কক্ষে বিছালাম। রাসূল সা. যখন আমার বাসায় আসলেন তখন দরজার সামনে দাড়িয়ে রইলেন এবং প্রবেশ করছেন না। আমি রাসূল সা. এর দিকে তাকিয়ে দেখি, ওনার চেহারা লাল হয়ে গেছে তখন বুঝতে পারলাম আমার কোন ভুল হয়েছে। তখনই আমি বললাম, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আমার কোন অপরাধ হয়ে গেলে একটু বলে দেন। রাসূল সা. তখন বললেন, এটা কেমন কার্পেট? কোথা থেকে পেয়েছ এটা? তিনি বললেন, আমি এটা ক্রয় করেছি যাতে আপনি এটার উপর বসতে পারেন। রাসূল সা. বললেন, ছবিওয়ালাদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে আর বলা হবে,এই ছবির মধ্যে জীবন দান কর। রাসূল সা. বলেন, যে বাসায় ছবি থাকে সে বাসায় ফেরেশতা প্রবেশ করে না। [মুসনাদুর রাবী’ : ২৭৫; বুখারী শারীফ : ৭০২৬ ] তুমি ছবিওয়ালা এই কার্পেট বাসায় বিছিয়েছ অথচ ছবিওয়ালাদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে। এভাবে রাসূল সা. যখনই কোন অন্যায় বা অপরাধ দেখে রাগ ও কঠোর হতেন তখন তার চেহারা দেখেই সাহাবাগণ বুঝে ফেলতেন।
তাবুকের যুদ্ধের সময়ে সাহাবাগণের উদ্দেশে আদেশ হল, সকলকে তাবুকের যুদ্ধে যেতে হবে। সকল মুসলমান সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তখন প্রচ- গরম ও বার্ষিক ফসল কাটার সময় ছিল। তাই মুনাফিকরা বিভিন্ন ছল-চাতুরি করে ও মিথ্যা অজুহাত দিয়ে সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। তিনজন মুসলমান ‘আজ যাব’ ‘কাল যাব’ করে তারাও আর সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তার মধ্যে একজন ছিলেন হযরত কা’ব বিন মালিক রা.। তিনি বলেন, রাসূল সা. যখন তাবূক যুদ্ধ থেকে ফেরত এলেন তখন আমি রাসূল সা. এর কাছে আসলাম। রাসূল সা. আমাকে দেখে একটু রাগের হাসি হাসলেন। রাসূল সা. অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন, তবে তা হাসি দ্বারা। হযরত উবাই রা. বলেন, রাসূল সা. যখন আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন তখন আমি বুঝতে পেরেছি যে এ হাসি রাগের হাসি, খুশির হাসি না। রাসূল সা. আমাকে বললেন, তুমি পিছনে কেন রয়ে গেলে। আমি বললাম, অজুহাত ও যুক্তি উপস্থাপন করে আপনাকে খুশি করার উদ্দেশ্য থাকলে আমি আপনাকে মিথ্যা অজুহাত ও মিথ্যা যুক্তি উপস্থাপন করতে পারতাম। কিন্তু আমি জানি, আপনি সত্য নবী। আপনার সাথে মিথ্যা বললে আগামীকাল  আল্লাহ তাআলা সব সত্য আপনার কাছে প্রকাশ করে দেবেন। আর আমি যদি সত্য কথা বলি তবে হয়ত আল্লাহ তায়ালা আমাকে ক্ষমা করবেন এবং আল্লাহ আপনাকেও আমার ব্যাপারে সন্তুষ্ট করিয়ে দিবেন। হে আল্লাহর রাসূল! তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার কোন গ্রহণযোগ্য কারণ আমার ছিল না। রাসূল সা. বললেন, এই ব্যক্তি সত্য বলেছে। তবে তুমি এখন যাও যতক্ষণ না আল্লাহ তাআলা আমাদের মাঝে ফয়সালা না করেন। রাসূল সা. অন্যায়ের প্রতিবাদ ন¤্র উপায়ে হাসিমুখে করছেন। তবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছেন না। রাসূল সা. তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তাকে আলাদা থাকতে বললেন। সেই সাহাবী প্রায় ৫০ দিন সকল মুসলমানের কাছ থেকে বয়কটে ছিলেন। দীর্ঘ বয়কটের শাস্তি ভোগ করার পর অবশেষে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের তাওবা কবুল হওয়ার ঘোষণা আসে। [বুখারী শারীফ : ৪১৫৬]
হযরত হাতেব বিন বুলতাআ’ রা. মুসলিম জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। মুসলমানগণের মক্কা অভিযানের পরিকল্পনার খবর গোপনে এক মহিলার মাধ্যমে মক্কার কুরাইশদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেন। আল্লাহ তায়ালা এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর রাসূল সা.-কে জানিয়ে দেন। তখন রাসূল সা. হযরত আলী ও একজন সাহাবীকে পাঠালেন আর বললেন, মক্কার পথে ওমুক স্থানে একজন মহিলার কাছে একটি চিঠি আছে সেটা নিয়ে আসবে। সে স্থানে গিয়ে সে মহিলাকে পেয়ে তার কাছে থাকা চিঠি দিতে বললে সে মহিলা অস্বীকার করে। তখন হযরত আলী রা. বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমার কাছেই চিঠি আছে। যদি তুমি আপোসে না দাও তবে আমরা শক্তি প্রয়োগ করে নিতে বাধ্য হব। তখন সে মহিলা চিঠি বের করে দেয়। তারা সেই চিঠি রাসূল সা.এর কাছে নিয়ে এলেন। হযরত ওমর রা. এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর শুনে তলোয়ার বের করে রাসূল সা.-এর কাছে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দেন আমি বিশ্বাসঘাতক হাতেবের মাথা কেটে ফেলি। রাসূল সা. এত বড় অন্যায়কে কিভাবে দমন করেছেন? কঠোরভাবে না ন¤্রভাবে? রাসূল সা. বললেন, থামো হে ওমর! তুমি কি জান সে বদরী সাহাবী। আর আল্লাহ তাআলা বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল সাহাবার পূর্বের ও পরের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। হযরত হাতেব বিন বুলতাআ’ রা, বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি মুনাফিক হইনি। মক্কায় সকলের আত্মীয়-স্বজন আছে আর আমার কোন আত্মীয়-স্বজন নেই। তাই মক্কায় রয়ে যাওয়া আমার পরিবার ও ছেলেমেয়েদের নিরাপত্তার জন্য কোন অভিভাবক নেই। তাই আমি চেয়েছিলাম যে, আমি মক্কার কাফেরদেরকে গোপন পরিকল্পনার খবর দিয়ে উপকার করব যাতে তারা আমার পরিবারের উপর কোন নির্যাতন না চালায় ও বিপদের সময়ে আমার পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ায়। রাসূল সা. তার ওজর গ্রহণ করলেন এবং তাকে কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করেন নি। [(ঘটনার অর্থ) বুখারী শারীফ : ২৮০১]
বনু নাজীর গোত্রের দুর্গকে যখন মুসলমানগণ ঘেরাও করে রাখেন তখন বনু নাজীর গোত্রের সন্ত্রাসীদেরকে দ- দেয়া ও দুর্বলদেরকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যখন মুসলমানগণ তাদের সাথে কথাবার্তা বলছেন তখন আব্দুল্লাহ বিন মুনজির রা. বনু নাজিরের ইহুদীদেরকে ইশারা করে বললেন, যদি তোমরা আত্মসমর্পণে আস তবে তোমাদেরকে দ- দেয়া হবে তাই তোমরা আত্মসমর্পণ কর না। পরক্ষণেই হযরত আব্দুল্লাহ বিন মুনজির রা.-এর সুমতি ফিরে আসে এবং রাসূল সা.-এর কাছে গিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। আমাকে ক্ষমা করুন এবং তিনি নিজেকে মসজিদের খুঁটির সাথে বেঁধে ফেলেন এবং বলেন, রাসূল সা. যতক্ষণ আমাকে ক্ষমা করে আমার বাঁধন না খুলবেন আমি এভাবে বন্দি থাকব। রাসূল সা. তাকেও ক্ষমা করে দেন।
অনেক সময় অনেকে বলে, ভাল ব্যবহার কার সাথে করব? সে আমার সাথে শত্রুতা পোষণ করে তার সাথে শক্তি প্রদর্শন না করলে সে আরো বেশি শত্রুতা দেখাবে। যে আমাকে আঘাত করে তার সাথে কিভাবে ন¤্র ব্যবহার করব? ওমাইর ইবনে ওহাব মক্কায় নির্জনে বসে সাফওয়ান বিন মুআত্তালের সাথে বলছে, আমার ইচ্ছা হয়, মুহাম্মাদ সা. কে হত্যা করতে তবে আমার কিছু ঋণ আছে ও আমার পরিবারের ভরণ পোষণ করতে হয় তাই কোন ঝুঁকি নিতে পারছি না। তখন সাফওয়ান বিন মুআত্তাল বলল, আমি তোমার ঋণ পরিশোধ ও তোমার পরিবারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিচ্ছি। যাও মুহাম্মাদ সা.-কে হত্যা করে আস। তখন ওমাইর রাসূল সা.-কে হত্যার উদ্দেশ্যে মদীনায় পৌছল। রাসূল সা.-কে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, ওমাইর আপনাকে হত্য করতে এসেছে এবং বিনিময়ে সাফওয়ান তার ঋণ ও তার পরিবারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। রাসূল সা. যখন জেনেছেন তখন কি ওমাইরকে ধরার জন্য ও তার হাত থেকে বাঁচার পূর্ব সতর্কতাস্বরূপ তার উপর আক্রমণ করেছেন? না তাকে বন্দি করেছেন? কী করেছেন তার সাথে? আমরা এমন আক্রমণকারী শত্রুর সাথে কী করি। ওমাইর মদিনায় এসে খোলা তালোয়ার নিয়ে রাসূল সা.-কে খুঁজছে। হযরত ওমর রা. ওমাইর এর সন্দেহজনক ঘুরাফেরা দেখে তাকে ধরে রাসূল সা.-এর কাছে নিয়ে আসেন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দেন, আমরা ইসলামের এই শত্রুকে শায়েস্তা করি। রাসূল সা. বললেন, হে ওমর! তাকে আমার কাছে আসতে দাও ও তার তালোয়ার তার কাছে দাও। রাসূল সা. তাকে হাসিমুখে স্বাগত জানালেন ও বললেন, হে ওমাইর! তোমার তলোয়ার তোমার কাঁধে নিয়ে ঘুরছ কেন? সে ছলনা করে বলছে, হা, এই তলোয়ারই আমাদের সম্পর্ক নষ্ট করেছে। তারপর রাসূল সা. বললেন, তুমি মদিনায় কেন এসেছ? সে বলল, আমার ছেলে ওহাব আটক হয়েছে তাকে ছাড়াতে এসেছি। রাসূল সা. তখন বললেন, সত্য কথা বল। সে বলল, না, আল্লাহর শপথ! আমি এ জন্যই এসেছি। তখন রাসূল সা. বলেন, তুমি কি ওমুক স্থানে সাফওয়ানের সাথে বসে আমাকে হত্যা করতে ষড়যন্ত্র করনি? বিনিময়ে সাফওয়ান তোমার ঋণ ও তোমার পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছে। তখন সাফওয়ান বলল, আল্লাহর শপথ! আমি যখন সাফওয়ানের সাথে এ আলোচনা করি তখন আমি আর সে ছাড়া আর কেউ ছিল না। নিশ্চয় যে আল্লাহকে আমরা অস্বীকার করছি সেই আল্লাহই আপনাকে এসব জানিয়েছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর সত্য নবী। [তাবরানী শারীফ : ১৩৬০৪]  তিনি তো একজন ভাল মানুষ ছিলেন ও কল্যাণকামী ছিলেন এবং আমাদের মত এরকম ধর্ম মেনেছেন ও দেব-দেবীর পূজা করেছেন। যখন তর্কের সময় কেউ কাউকে তিরস্কার করতে চায় তখন এমনই বলে যে, আপনি এমন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ঝগড়া-বিবাদ করছেন অথচ আপনার বাবাতো অনেক ভাল মানুষ ছিলেন। প্রতি উত্তরে তখন রাসূল সা. বললেন, হে হুসাইন! আমার বাবা এবং তোমার বাবা উভয়ের অবস্থানই জাহান্নামে। অর্থাৎ আমার বাবা ও তোমার বাবা সকলে ভুল করেছে তাই এখন তারা জাহান্নামে। তারা ভুল করেছে বলে আমরা সেটাকে ভুল বলব না বা তাদের মত ভুল আমরাও করব, এটাতো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। রাসূল সা.-এর বাবা ভুল করেছেন বলে রাসূল সা. সেটাকে ভুল বলবেন না সেটাতো কখনো সম্ভব না। যেমন আমাদের সমাজে আইন অন্যের জন্য আমার জন্য নয়। আমি ভুল করলে বা আমার পরিবার বা আমার দল ভুল করলে সেটাকে ভুল বলতে আমরা রাজি নই; বরং সে ভুলকে সঠিক সাব্যস্ত করতে আমরা হাজারো ছলচাতুরি করে থাকি। রাসূল সা. এভাবে তার সাথে বুদ্ধিভিত্তিক খোলামেলা আলোচনা করছেন এবং জিজ্ঞাসা করছেন, হে হুসাইন! আপনি কতজন দেবীর পূজা করেন? সে বলল, সাতজনের, তার মধ্যে ছয়জন পৃথিবীতে এবং একজন আকাশে। রাসূল সা.বললেন, যখন আপনার বিপদ হয় (যখন আপনি নৌকায় যাচ্ছেন আর সমুদ্রে ঝড় ওঠে) তখন কাকে ডাকেন? সে বলল, আকাশের খোদাকে ডাকি। যখন আপনার মসিবত আসে তখন কাকে ডাকেন? সে বলল, আকাশের আল্লাহকে ডাকি। আপনি পৃথিবীর দেবতাগুলোকে সুখের সময় ডাকেন আর বিপদের সময়ে তাদেরকে ডাকেন না এটা কি যুক্তির কথা? এটা কি বুদ্ধিমানের কাজ? আর বিপদের সময় আকাশের আল্লাহকে ডাকেন আর সুখের সময় সর্বদা তাকে ডাকেন না এটা কি বুদ্ধিমানের কাজ? যাকে আপনি বিপদের সময় ডাকেন তাকে তো সুখের সময় আরো বেশী করে ডাকাটাই তো বুদ্ধিমানের কাজ ছিল। তখন সে রাসূল সা.-এর সামনে বলল, আমি এরকম যুক্তির কথা আর কখনো শুনিনি। রাসূল সা. তখন সুযোগ পেয়ে বললেন, আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন তবে আপনি নিরাপদ থাকবেন ও শান্তি পেয়ে যাবেন। সে বলল, আমার সাথে আমার বংশ আছে। আমিতো একা ইসলাম গ্রহণ করতে পারি না। রাসূল সা. তখন বললেন, তাহলে কমপক্ষে এতটুকু করুন যে আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, হে আল্লাহ আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। সে বলল, হ্যাঁ, এটাতো বলতে পারি। রাসূল সা.-এর সাথে এরকম উম্মুক্ত সংলাপ ও খোলামেলা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা করতে করতে হযরত হুসাইনের মন গলে গেল এবং ইসলামই যে সঠিক পথ তা নিঃসন্দেহে বুঝতে পারলেন। তখন রাসূল সা.-এর সামনে তিনি ঘোষণা করলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ এক ও তার কোন শরীক নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল ও নবী। [তিরমিজী শারীফ : ৩৪৭৯] এই হুসাইন বিন আবীদের এক ছেলে ইমরান বিন হুসাইন আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তার বাবা যখন কাফের আর ইসলামের ক্ষতি করতে ও রাসূল সা.-কে তিরস্কার করতে এসেছিল সে তখন সে মজলিসেই ছিল। কিন্তু সে তার বাবার জন্য দাঁড়ায়নি, সালাম দেয়নি এবং তাকে না চেনার ভান করেছিল। অথচ তার বাবা যখন ইসলাম গ্রহণ করল তখন উপস্থিত সকলের মধ্যে সর্বপ্রথম তার ছেলে ইমরান তার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে বাবার কাছে গিয়ে বাবার কপালে, হাতে ও বুকে চুম্বন করল। রাসূল সা. এ দৃশ্য দেখে কেঁদে ফেললেন। সাহাবার জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কাঁদছেন কেন? রাসূল সা. বললেন, এই বৃদ্ধ যখন এল তখন তার ছেলে তার দিকে তাকায়নি আর এখন যখন সে ইসলাম গ্রহণ করেছে তখন তার ছেলে তাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করছে। আমি ছেলে ও তার বাবার মায়া দেখে কাঁদছি। রাসূল সা. তার সম্মানার্থে সকল সাহাবাদেরকে আদেশ করলেন যে, তোমরা এই বুদ্ধিজীবী বৃদ্ধকে তার বাসায় এগিয়ে দিয়ে আস। যখন তিনি রাসূল সা.-এর দরজা থেকে বের হলেন তখন তার অপেক্ষায় থাকা অন্যান্য কাফেররা দেখল যে তাদের প-িত ইসলাম গ্রহণ করেছে। তখন কি সকলে ইসলাম গ্রহণ করেছে? না। অহংকার মানুষকে অন্ধ করে ফেলে। তারা তাকে তিরস্কার করা শুরু করল আর বলল, তুমি এই বুড়া বয়সে বে-দীন হয়ে গেলে? তুমি ধর্মত্যাগী ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করা শুরু করল।
একজন মানুষ যখন ভাল কাজ করে তখন হাজারো মানুষ তার সে ভাল কাজে বাধা দিতে, তাকে তিরস্কার করতে দাঁড়িয়ে যায়। তখন সে ভাল কাজকে সমর্থন করা ও তার পাশে দাড়ানো সকল মুসলমানের ইমানী দায়িত্ব। রাসূল সা. বলেন, যখন তোমাদের কেউ কোন খারাপ কাজ দেখে তখন সে যেন তা হাত দ্বারা পরিবর্তন করে, যদি না পারে তবে যেন মুখ দ্বারা পরিবর্তন করে আর তাও যদি সম্ভব না হয় তবে যেন অন্তর দ্বারা ঘৃণা করে। খারাপ কাজকে ঘৃণা করা ও ভাল কাজকে পছন্দ করা সকলের ঈমানী দায়িত্ব। কেউ যদি খারাপ কাজকে ঘৃণা না করে তবে তার সামান্য ঈমানও থাকবে না।  রাসূল সা. বলেন, তোমরা ভাল কাজের আদেশ করতে থাক ও খারাপ কাজের নিষেধ করতে থাক। এমন একটা সময় হবে যখন কেউ ভাল কাজের আদেশ করবে না এবং খারাপ কাজের নিষেধ করবে না। সাহাবা কেরাম রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এমন কি হবে? তিনি বললেন, এমন তো হবেই বরং এর চেয়ে আরো বেশি খারাপ অবস্থা হবে। সাহাবাগণ বললেন, এর চেয়ে খারাপ অবস্থাটা কি? রাসূল সা. বললেন, মানুষজন ভাল কাজকে খারাপ মনে করবে আর খারাপ কাজকে ভাল মনে করবে। সাহাবাগণ বললেন, এমনটা কি হবে? রাসূল সা. বললেন, এর চেয়েও খারাপ অবস্থা হবে। (এমন এক যুগ আসবে যে, মানুষজন ভাল কাজ করতে নিষেধ করবে ও ভাল কাজ করতে বাধা দিবে এবং খারাপ কাজের আদেশ করবে ও খারাপ কাজ করতে উৎসাহ দিবে)। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি তাদেরকে এমন ফিতনা দিব যাতে সহনশীল ব্যক্তি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যাবেন। [ইবনে আবী দুনিয়া : ৩৩; মুসনাদে আবী ইয়ালা : ৬৩৮৪]
এজন্য হযরত সুফিয়ান রাহ. বলেন, যদি তুমি ভাল কাজের আদেশ করলে তবে তুমি মুমিনকে ও মুমিনের দলকে শক্তিশালী করলে। আর যদি খারাপ কাজকে খারাপ বললে তবে মুনাফিক-পাপীকে দুর্বল করলে। [মুসানদুল খাল্লাল : ৬৮]
সকল খারাপ মানুষ চায় সকল মানুষ তাদের মত খারাপ কাজ করুক আর ভাল মানুষ চায় সকল মানুষ তাদের মত ভাল কাজ করুক অথবা কমপক্ষে তাদের ভাল কাজকে সমর্থন করুক। ব্যভিচারী নির্লজ্জরা চায় সবাই তাদের মত বেলাল্লাপনা করুক। কোন হুজুর, ভদ্র মানুষ তাদের পরিবেশে আসুক তা তারা বরদাশত করে না এমনকি তাদেরকে মৌলবাদী, গ্রাম্য ইত্যাদি বলে গালমন্দ করে। মদখোররা চায় সবাই তাদের মত মদ খাক বা তাদের কাজকে আধুনিকতা ও সভ্যতা মনে করুক। তাদের মদ খাওয়াকে কেউ খারাপ বলবে সেটা তারা চায় না। যারা ঘুষ খায়, দুর্নীতি করে তারা চায় তার অফিসের সবাই দুর্নীতি করুক। কেউ তাদেরকে খারাপ বলুক সেটা তারা চায় না। বরং যে খারাপ বলে তার বিরুদ্ধে সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করে। একজন বাস মালিক বলল, দুর্নীতিবাজদের দাফটের কাছে আমাকে হার মানতে হয়েছে এবং ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হয়েছে। প্রথমে বাসের হেলপার দুর্নীতি করত সেটা ঠেকাতে চালকের সাহায্য নিলাম। কিছুদিন পর সে চালকও তার দুর্নীতির অংশীদার হল। তারপর পরিদর্শক নিয়োগ করলাম, কিছুদিন পর সেও দুর্নীতির অংশ পেল ও দুর্নীতি শুরু করল। তাদের দুর্নীতি বন্ধ করতে পরিদর্শকের পরিদর্শক নিয়োগ করলাম, কিছুদিন সেও দুর্নীতির অংশ পেল ও সবাই মিলে দুর্নীতি করল। ফলে আগে একজন দুর্নীতি করার পরও যতটুকু আয় পেতাম এখন দুর্নীতির অংশীদার একাধিক হওয়াতে ততটুকুও পাচ্ছি না। একপর্যায়ে দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের কাছে হার মেনে ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম। এভাবেই দুর্নীতিবাজরা চায় সবাই দুর্নীতি করুক, নচেৎ সবাই মিলে তার বিরোধিতা করে তাকে পরাজিত করবে।
তাই মন্দকে মন্দ বলা ও মন্দ কাজে বাধা দেওয়া ইমানী দায়িত্ব ও একজন মুসলমানের গুণ। তবে খারাপ কাজকে ন¤্র উপায়ে দমন করতে হবে। একবার এক সাহাবী রা. রাসূল সা.-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার একটি সন্তান হয়েছে তবে সেটি কালো অথচ আমরা ফর্সা। তাই আমার সন্দেহ, আমার স্ত্রীর অন্য কারো সাথে অবৈধ সম্পর্ক আছে। রাসূল সা. তার উপর রাগ হয়ে তাকে থাপ্পড় দেননি বা তার এ খারাপ সন্দেহকে কঠোর উপায়ে দমন করেননি। রাসূল সা. ন¤্র ভাষায় বলছেন, আচ্ছা! তোমার কি কোন উট আছে? সে বলল, হাঁ, আছে। তোমার উটের রং কি? সে বলল লাল। রাসূল সা. আবার বললেন, তোমার এই উটের কোন বাচ্চা কি কালো আছে। সে বলল, হাঁ। রাসূল সা. বললেন, উট লাল অথচ তার বাচ্চা কালো হল কিভাবে। সে বলল, এ উটের বংশে কোন কালো উট ছিল তার প্রভাবে হয়েছে। রাসূল সা. তখন বললেন, এরকমই তোমার এ ছেলেটিও তোমার বংশে কেউ কালো ছিল তার প্রভাবে কালো হয়েছে। [বুখারী শারীফ : ৪৯১৯] সে সাহাবীর সকল সন্দেহ দূরীভূত হয়ে গেল এবং খুশি মনে আপন বাড়িতে ফিরে গেল। রাসূল সা. ন¤্র উপায়ে এতবড় একটি পাপ (সতী নারীকে অপবাদ দেয়া) দমন করলেন যা কখনো কঠোর উপায়ে সম্ভব হত না।
রাসূল সা. সাধারণত মন্দকে ন¤্র উপায়ে দমন করতেন। তবে কঠোরতা দরকার হলে রাসূল সা. দরকার-পরিমাণ কঠোরতা অবলম্বন করতেন। রাসূল সা.-এর সাধারণ কঠোরতা প্রদর্শন হল তাঁর চেহারা লাল হয়ে যাওয়া। সাহাবাগণ বলেন, রাসূল সা.এর চেহারা যখন লাল হয়ে যেত আমরা বুঝে ফেলতাম রাসূল সা. কোন কারণে রাগ করেছেন। হযরত আয়েশা রা. বলেন, একবার একটি ছবি সম্বলিত কার্পেট ক্রয় করে আমার কক্ষে বিছালাম। রাসূল সা. যখন আমার বাসায় আসলেন তখন দরজার সামনে দাড়িয়ে রইলেন এবং প্রবেশ করছেন না। আমি রাসূল সা. এর দিকে তাকিয়ে দেখি, ওনার চেহারা লাল হয়ে গেছে তখন বুঝতে পারলাম আমার কোন ভুল হয়েছে। তখনই আমি বললাম, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আমার কোন অপরাধ হয়ে গেলে একটু বলে দেন। রাসূল সা. তখন বললেন, এটা কেমন কার্পেট? কোথা থেকে পেয়েছ এটা? তিনি বললেন, আমি এটা ক্রয় করেছি যাতে আপনি এটার উপর বসতে পারেন। রাসূল সা. বললেন, ছবিওয়ালাদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে আর বলা হবে,এই ছবির মধ্যে জীবন দান কর। রাসূল সা. বলেন, যে বাসায় ছবি থাকে সে বাসায় ফেরেশতা প্রবেশ করে না। [মুসনাদুর রাবী’ : ২৭৫; বুখারী শারীফ : ৭০২৬ ] তুমি ছবিওয়ালা এই কার্পেট বাসায় বিছিয়েছ অথচ ছবিওয়ালাদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে। এভাবে রাসূল সা. যখনই কোন অন্যায় বা অপরাধ দেখে রাগ ও কঠোর হতেন তখন তার চেহারা দেখেই সাহাবাগণ বুঝে ফেলতেন।
তাবুকের যুদ্ধের সময়ে সাহাবাগণের উদ্দেশে আদেশ হল, সকলকে তাবুকের যুদ্ধে যেতে হবে। সকল মুসলমান সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তখন প্রচ- গরম ও বার্ষিক ফসল কাটার সময় ছিল। তাই মুনাফিকরা বিভিন্ন ছল-চাতুরি করে ও মিথ্যা অজুহাত দিয়ে সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। তিনজন মুসলমান ‘আজ যাব’ ‘কাল যাব’ করে তারাও আর সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তার মধ্যে একজন ছিলেন হযরত কা’ব বিন মালিক রা.। তিনি বলেন, রাসূল সা. যখন তাবূক যুদ্ধ থেকে ফেরত এলেন তখন আমি রাসূল সা. এর কাছে আসলাম। রাসূল সা. আমাকে দেখে একটু রাগের হাসি হাসলেন। রাসূল সা. অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন, তবে তা হাসি দ্বারা। হযরত উবাই রা. বলেন, রাসূল সা. যখন আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন তখন আমি বুঝতে পেরেছি যে এ হাসি রাগের হাসি, খুশির হাসি না। রাসূল সা. আমাকে বললেন, তুমি পিছনে কেন রয়ে গেলে। আমি বললাম, অজুহাত ও যুক্তি উপস্থাপন করে আপনাকে খুশি করার উদ্দেশ্য থাকলে আমি আপনাকে মিথ্যা অজুহাত ও মিথ্যা যুক্তি উপস্থাপন করতে পারতাম। কিন্তু আমি জানি, আপনি সত্য নবী। আপনার সাথে মিথ্যা বললে আগামীকাল  আল্লাহ তাআলা সব সত্য আপনার কাছে প্রকাশ করে দেবেন। আর আমি যদি সত্য কথা বলি তবে হয়ত আল্লাহ তায়ালা আমাকে ক্ষমা করবেন এবং আল্লাহ আপনাকেও আমার ব্যাপারে সন্তুষ্ট করিয়ে দিবেন। হে আল্লাহর রাসূল! তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার কোন গ্রহণযোগ্য কারণ আমার ছিল না। রাসূল সা. বললেন, এই ব্যক্তি সত্য বলেছে। তবে তুমি এখন যাও যতক্ষণ না আল্লাহ তাআলা আমাদের মাঝে ফয়সালা না করেন। রাসূল সা. অন্যায়ের প্রতিবাদ ন¤্র উপায়ে হাসিমুখে করছেন। তবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছেন না। রাসূল সা. তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তাকে আলাদা থাকতে বললেন। সেই সাহাবী প্রায় ৫০ দিন সকল মুসলমানের কাছ থেকে বয়কটে ছিলেন। দীর্ঘ বয়কটের শাস্তি ভোগ করার পর অবশেষে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের তাওবা কবুল হওয়ার ঘোষণা আসে। [বুখারী শারীফ : ৪১৫৬]
হযরত হাতেব বিন বুলতাআ’ রা. মুসলিম জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। মুসলমানগণের মক্কা অভিযানের পরিকল্পনার খবর গোপনে এক মহিলার মাধ্যমে মক্কার কুরাইশদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেন। আল্লাহ তায়ালা এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর রাসূল সা.-কে জানিয়ে দেন। তখন রাসূল সা. হযরত আলী ও একজন সাহাবীকে পাঠালেন আর বললেন, মক্কার পথে ওমুক স্থানে একজন মহিলার কাছে একটি চিঠি আছে সেটা নিয়ে আসবে। সে স্থানে গিয়ে সে মহিলাকে পেয়ে তার কাছে থাকা চিঠি দিতে বললে সে মহিলা অস্বীকার করে। তখন হযরত আলী রা. বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমার কাছেই চিঠি আছে। যদি তুমি আপোসে না দাও তবে আমরা শক্তি প্রয়োগ করে নিতে বাধ্য হব। তখন সে মহিলা চিঠি বের করে দেয়। তারা সেই চিঠি রাসূল সা.এর কাছে নিয়ে এলেন। হযরত ওমর রা. এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর শুনে তলোয়ার বের করে রাসূল সা.-এর কাছে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দেন আমি বিশ্বাসঘাতক হাতেবের মাথা কেটে ফেলি। রাসূল সা. এত বড় অন্যায়কে কিভাবে দমন করেছেন? কঠোরভাবে না ন¤্রভাবে? রাসূল সা. বললেন, থামো হে ওমর! তুমি কি জান সে বদরী সাহাবী। আর আল্লাহ তাআলা বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল সাহাবার পূর্বের ও পরের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। হযরত হাতেব বিন বুলতাআ’ রা, বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি মুনাফিক হইনি। মক্কায় সকলের আত্মীয়-স্বজন আছে আর আমার কোন আত্মীয়-স্বজন নেই। তাই মক্কায় রয়ে যাওয়া আমার পরিবার ও ছেলেমেয়েদের নিরাপত্তার জন্য কোন অভিভাবক নেই। তাই আমি চেয়েছিলাম যে, আমি মক্কার কাফেরদেরকে গোপন পরিকল্পনার খবর দিয়ে উপকার করব যাতে তারা আমার পরিবারের উপর কোন নির্যাতন না চালায় ও বিপদের সময়ে আমার পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ায়। রাসূল সা. তার ওজর গ্রহণ করলেন এবং তাকে কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করেন নি। [(ঘটনার অর্থ) বুখারী শারীফ : ২৮০১]
বনু নাজীর গোত্রের দুর্গকে যখন মুসলমানগণ ঘেরাও করে রাখেন তখন বনু নাজীর গোত্রের সন্ত্রাসীদেরকে দ- দেয়া ও দুর্বলদেরকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যখন মুসলমানগণ তাদের সাথে কথাবার্তা বলছেন তখন আব্দুল্লাহ বিন মুনজির রা. বনু নাজিরের ইহুদীদেরকে ইশারা করে বললেন, যদি তোমরা আত্মসমর্পণে আস তবে তোমাদেরকে দ- দেয়া হবে তাই তোমরা আত্মসমর্পণ কর না। পরক্ষণেই হযরত আব্দুল্লাহ বিন মুনজির রা.-এর সুমতি ফিরে আসে এবং রাসূল সা.-এর কাছে গিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। আমাকে ক্ষমা করুন এবং তিনি নিজেকে মসজিদের খুঁটির সাথে বেঁধে ফেলেন এবং বলেন, রাসূল সা. যতক্ষণ আমাকে ক্ষমা করে আমার বাঁধন না খুলবেন আমি এভাবে বন্দি থাকব। রাসূল সা. তাকেও ক্ষমা করে দেন।
অনেক সময় অনেকে বলে, ভাল ব্যবহার কার সাথে করব? সে আমার সাথে শত্রুতা পোষণ করে তার সাথে শক্তি প্রদর্শন না করলে সে আরো বেশি শত্রুতা দেখাবে। যে আমাকে আঘাত করে তার সাথে কিভাবে ন¤্র ব্যবহার করব? ওমাইর ইবনে ওহাব মক্কায় নির্জনে বসে সাফওয়ান বিন মুআত্তালের সাথে বলছে, আমার ইচ্ছা হয়, মুহাম্মাদ সা. কে হত্যা করতে তবে আমার কিছু ঋণ আছে ও আমার পরিবারের ভরণ পোষণ করতে হয় তাই কোন ঝুঁকি নিতে পারছি না। তখন সাফওয়ান বিন মুআত্তাল বলল, আমি তোমার ঋণ পরিশোধ ও তোমার পরিবারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিচ্ছি। যাও মুহাম্মাদ সা.-কে হত্যা করে আস। তখন ওমাইর রাসূল সা.-কে হত্যার উদ্দেশ্যে মদীনায় পৌছল। রাসূল সা.-কে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, ওমাইর আপনাকে হত্য করতে এসেছে এবং বিনিময়ে সাফওয়ান তার ঋণ ও তার পরিবারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। রাসূল সা. যখন জেনেছেন তখন কি ওমাইরকে ধরার জন্য ও তার হাত থেকে বাঁচার পূর্ব সতর্কতাস্বরূপ তার উপর আক্রমণ করেছেন? না তাকে বন্দি করেছেন? কী করেছেন তার সাথে? আমরা এমন আক্রমণকারী শত্রুর সাথে কী করি। ওমাইর মদিনায় এসে খোলা তালোয়ার নিয়ে রাসূল সা.-কে খুঁজছে। হযরত ওমর রা. ওমাইর এর সন্দেহজনক ঘুরাফেরা দেখে তাকে ধরে রাসূল সা.-এর কাছে নিয়ে আসেন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দেন, আমরা ইসলামের এই শত্রুকে শায়েস্তা করি। রাসূল সা. বললেন, হে ওমর! তাকে আমার কাছে আসতে দাও ও তার তালোয়ার তার কাছে দাও। রাসূল সা. তাকে হাসিমুখে স্বাগত জানালেন ও বললেন, হে ওমাইর! তোমার তলোয়ার তোমার কাঁধে নিয়ে ঘুরছ কেন? সে ছলনা করে বলছে, হা, এই তলোয়ারই আমাদের সম্পর্ক নষ্ট করেছে। তারপর রাসূল সা. বললেন, তুমি মদিনায় কেন এসেছ? সে বলল, আমার ছেলে ওহাব আটক হয়েছে তাকে ছাড়াতে এসেছি। রাসূল সা. তখন বললেন, সত্য কথা বল। সে বলল, না, আল্লাহর শপথ! আমি এ জন্যই এসেছি। তখন রাসূল সা. বলেন, তুমি কি ওমুক স্থানে সাফওয়ানের সাথে বসে আমাকে হত্যা করতে ষড়যন্ত্র করনি? বিনিময়ে সাফওয়ান তোমার ঋণ ও তোমার পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছে। তখন সাফওয়ান বলল, আল্লাহর শপথ! আমি যখন সাফওয়ানের সাথে এ আলোচনা করি তখন আমি আর সে ছাড়া আর কেউ ছিল না। নিশ্চয় যে আল্লাহকে আমরা অস্বীকার করছি সেই আল্লাহই আপনাকে এসব জানিয়েছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর সত্য নবী। [তাবরানী শারীফ : ১৩৬০৪]  তিনি তো একজন ভাল মানুষ ছিলেন ও কল্যাণকামী ছিলেন এবং আমাদের মত এরকম ধর্ম মেনেছেন ও দেব-দেবীর পূজা করেছেন। যখন তর্কের সময় কেউ কাউকে তিরস্কার করতে চায় তখন এমনই বলে যে, আপনি এমন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ঝগড়া-বিবাদ করছেন অথচ আপনার বাবাতো অনেক ভাল মানুষ ছিলেন। প্রতি উত্তরে তখন রাসূল সা. বললেন, হে হুসাইন! আমার বাবা এবং তোমার বাবা উভয়ের অবস্থানই জাহান্নামে। অর্থাৎ আমার বাবা ও তোমার বাবা সকলে ভুল করেছে তাই এখন তারা জাহান্নামে। তারা ভুল করেছে বলে আমরা সেটাকে ভুল বলব না বা তাদের মত ভুল আমরাও করব, এটাতো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। রাসূল সা.-এর বাবা ভুল করেছেন বলে রাসূল সা. সেটাকে ভুল বলবেন না সেটাতো কখনো সম্ভব না। যেমন আমাদের সমাজে আইন অন্যের জন্য আমার জন্য নয়। আমি ভুল করলে বা আমার পরিবার বা আমার দল ভুল করলে সেটাকে ভুল বলতে আমরা রাজি নই; বরং সে ভুলকে সঠিক সাব্যস্ত করতে আমরা হাজারো ছলচাতুরি করে থাকি। রাসূল সা. এভাবে তার সাথে বুদ্ধিভিত্তিক খোলামেলা আলোচনা করছেন এবং জিজ্ঞাসা করছেন, হে হুসাইন! আপনি কতজন দেবীর পূজা করেন? সে বলল, সাতজনের, তার মধ্যে ছয়জন পৃথিবীতে এবং একজন আকাশে। রাসূল সা.বললেন, যখন আপনার বিপদ হয় (যখন আপনি নৌকায় যাচ্ছেন আর সমুদ্রে ঝড় ওঠে) তখন কাকে ডাকেন? সে বলল, আকাশের খোদাকে ডাকি। যখন আপনার মসিবত আসে তখন কাকে ডাকেন? সে বলল, আকাশের আল্লাহকে ডাকি। আপনি পৃথিবীর দেবতাগুলোকে সুখের সময় ডাকেন আর বিপদের সময়ে তাদেরকে ডাকেন না এটা কি যুক্তির কথা? এটা কি বুদ্ধিমানের কাজ? আর বিপদের সময় আকাশের আল্লাহকে ডাকেন আর সুখের সময় সর্বদা তাকে ডাকেন না এটা কি বুদ্ধিমানের কাজ? যাকে আপনি বিপদের সময় ডাকেন তাকে তো সুখের সময় আরো বেশী করে ডাকাটাই তো বুদ্ধিমানের কাজ ছিল। তখন সে রাসূল সা.-এর সামনে বলল, আমি এরকম যুক্তির কথা আর কখনো শুনিনি। রাসূল সা. তখন সুযোগ পেয়ে বললেন, আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন তবে আপনি নিরাপদ থাকবেন ও শান্তি পেয়ে যাবেন। সে বলল, আমার সাথে আমার বংশ আছে। আমিতো একা ইসলাম গ্রহণ করতে পারি না। রাসূল সা. তখন বললেন, তাহলে কমপক্ষে এতটুকু করুন যে আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, হে আল্লাহ আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। সে বলল, হ্যাঁ, এটাতো বলতে পারি। রাসূল সা.-এর সাথে এরকম উম্মুক্ত সংলাপ ও খোলামেলা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা করতে করতে হযরত হুসাইনের মন গলে গেল এবং ইসলামই যে সঠিক পথ তা নিঃসন্দেহে বুঝতে পারলেন। তখন রাসূল সা.-এর সামনে তিনি ঘোষণা করলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ এক ও তার কোন শরীক নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল ও নবী। [তিরমিজী শারীফ : ৩৪৭৯] এই হুসাইন বিন আবীদের এক ছেলে ইমরান বিন হুসাইন আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তার বাবা যখন কাফের আর ইসলামের ক্ষতি করতে ও রাসূল সা.-কে তিরস্কার করতে এসেছিল সে তখন সে মজলিসেই ছিল। কিন্তু সে তার বাবার জন্য দাঁড়ায়নি, সালাম দেয়নি এবং তাকে না চেনার ভান করেছিল। অথচ তার বাবা যখন ইসলাম গ্রহণ করল তখন উপস্থিত সকলের মধ্যে সর্বপ্রথম তার ছেলে ইমরান তার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে বাবার কাছে গিয়ে বাবার কপালে, হাতে ও বুকে চুম্বন করল। রাসূল সা. এ দৃশ্য দেখে কেঁদে ফেললেন। সাহাবার জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কাঁদছেন কেন? রাসূল সা. বললেন, এই বৃদ্ধ যখন এল তখন তার ছেলে তার দিকে তাকায়নি আর এখন যখন সে ইসলাম গ্রহণ করেছে তখন তার ছেলে তাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করছে। আমি ছেলে ও তার বাবার মায়া দেখে কাঁদছি। রাসূল সা. তার সম্মানার্থে সকল সাহাবাদেরকে আদেশ করলেন যে, তোমরা এই বুদ্ধিজীবী বৃদ্ধকে তার বাসায় এগিয়ে দিয়ে আস। যখন তিনি রাসূল সা.-এর দরজা থেকে বের হলেন তখন তার অপেক্ষায় থাকা অন্যান্য কাফেররা দেখল যে তাদের প-িত ইসলাম গ্রহণ করেছে। তখন কি সকলে ইসলাম গ্রহণ করেছে? না। অহংকার মানুষকে অন্ধ করে ফেলে। তারা তাকে তিরস্কার করা শুরু করল আর বলল, তুমি এই বুড়া বয়সে বে-দীন হয়ে গেলে? তুমি ধর্মত্যাগী ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করা শুরু করল।
একজন মানুষ যখন ভাল কাজ করে তখন হাজারো মানুষ তার সে ভাল কাজে বাধা দিতে, তাকে তিরস্কার করতে দাঁড়িয়ে যায়। তখন সে ভাল কাজকে সমর্থন করা ও তার পাশে দাড়ানো সকল মুসলমানের ইমানী দায়িত্ব। রাসূল সা. বলেন, যখন তোমাদের কেউ কোন খারাপ কাজ দেখে তখন সে যেন তা হাত দ্বারা পরিবর্তন করে, যদি না পারে তবে যেন মুখ দ্বারা পরিবর্তন করে আর তাও যদি সম্ভব না হয় তবে যেন অন্তর দ্বারা ঘৃণা করে। খারাপ কাজকে ঘৃণা করা ও ভাল কাজকে পছন্দ করা সকলের ঈমানী দায়িত্ব। কেউ যদি খারাপ কাজকে ঘৃণা না করে তবে তার সামান্য ঈমানও থাকবে না।  রাসূল সা. বলেন, তোমরা ভাল কাজের আদেশ করতে থাক ও খারাপ কাজের নিষেধ করতে থাক। এমন একটা সময় হবে যখন কেউ ভাল কাজের আদেশ করবে না এবং খারাপ কাজের নিষেধ করবে না। সাহাবা কেরাম রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এমন কি হবে? তিনি বললেন, এমন তো হবেই বরং এর চেয়ে আরো বেশি খারাপ অবস্থা হবে। সাহাবাগণ বললেন, এর চেয়ে খারাপ অবস্থাটা কি? রাসূল সা. বললেন, মানুষজন ভাল কাজকে খারাপ মনে করবে আর খারাপ কাজকে ভাল মনে করবে। সাহাবাগণ বললেন, এমনটা কি হবে? রাসূল সা. বললেন, এর চেয়েও খারাপ অবস্থা হবে। (এমন এক যুগ আসবে যে, মানুষজন ভাল কাজ করতে নিষেধ করবে ও ভাল কাজ করতে বাধা দিবে এবং খারাপ কাজের আদেশ করবে ও খারাপ কাজ করতে উৎসাহ দিবে)। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি তাদেরকে এমন ফিতনা দিব যাতে সহনশীল ব্যক্তি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যাবেন। [ইবনে আবী দুনিয়া : ৩৩; মুসনাদে আবী ইয়ালা : ৬৩৮৪]
এজন্য হযরত সুফিয়ান রাহ. বলেন, যদি তুমি ভাল কাজের আদেশ করলে তবে তুমি মুমিনকে ও মুমিনের দলকে শক্তিশালী করলে। আর যদি খারাপ কাজকে খারাপ বললে তবে মুনাফিক-পাপীকে দুর্বল করলে। [মুসানদুল খাল্লাল : ৬৮]
সকল খারাপ মানুষ চায় সকল মানুষ তাদের মত খারাপ কাজ করুক আর ভাল মানুষ চায় সকল মানুষ তাদের মত ভাল কাজ করুক অথবা কমপক্ষে তাদের ভাল কাজকে সমর্থন করুক। ব্যভিচারী নির্লজ্জরা চায় সবাই তাদের মত বেলাল্লাপনা করুক। কোন হুজুর, ভদ্র মানুষ তাদের পরিবেশে আসুক তা তারা বরদাশত করে না এমনকি তাদেরকে মৌলবাদী, গ্রাম্য ইত্যাদি বলে গালমন্দ করে। মদখোররা চায় সবাই তাদের মত মদ খাক বা তাদের কাজকে আধুনিকতা ও সভ্যতা মনে করুক। তাদের মদ খাওয়াকে কেউ খারাপ বলবে সেটা তারা চায় না। যারা ঘুষ খায়, দুর্নীতি করে তারা চায় তার অফিসের সবাই দুর্নীতি করুক। কেউ তাদেরকে খারাপ বলুক সেটা তারা চায় না। বরং যে খারাপ বলে তার বিরুদ্ধে সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করে। একজন বাস মালিক বলল, দুর্নীতিবাজদের দাফটের কাছে আমাকে হার মানতে হয়েছে এবং ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হয়েছে। প্রথমে বাসের হেলপার দুর্নীতি করত সেটা ঠেকাতে চালকের সাহায্য নিলাম। কিছুদিন পর সে চালকও তার দুর্নীতির অংশীদার হল। তারপর পরিদর্শক নিয়োগ করলাম, কিছুদিন পর সেও দুর্নীতির অংশ পেল ও দুর্নীতি শুরু করল। তাদের দুর্নীতি বন্ধ করতে পরিদর্শকের পরিদর্শক নিয়োগ করলাম, কিছুদিন সেও দুর্নীতির অংশ পেল ও সবাই মিলে দুর্নীতি করল। ফলে আগে একজন দুর্নীতি করার পরও যতটুকু আয় পেতাম এখন দুর্নীতির অংশীদার একাধিক হওয়াতে ততটুকুও পাচ্ছি না। একপর্যায়ে দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের কাছে হার মেনে ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম। এভাবেই দুর্নীতিবাজরা চায় সবাই দুর্নীতি করুক, নচেৎ সবাই মিলে তার বিরোধিতা করে তাকে পরাজিত করবে।
তাই মন্দকে মন্দ বলা ও মন্দ কাজে বাধা দেওয়া ইমানী দায়িত্ব ও একজন মুসলমানের গুণ। তবে খারাপ কাজকে ন¤্র উপায়ে দমন করতে হবে। একবার এক সাহাবী রা. রাসূল সা.-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার একটি সন্তান হয়েছে তবে সেটি কালো অথচ আমরা ফর্সা। তাই আমার সন্দেহ, আমার স্ত্রীর অন্য কারো সাথে অবৈধ সম্পর্ক আছে। রাসূল সা. তার উপর রাগ হয়ে তাকে থাপ্পড় দেননি বা তার এ খারাপ সন্দেহকে কঠোর উপায়ে দমন করেননি। রাসূল সা. ন¤্র ভাষায় বলছেন, আচ্ছা! তোমার কি কোন উট আছে? সে বলল, হাঁ, আছে। তোমার উটের রং কি? সে বলল লাল। রাসূল সা. আবার বললেন, তোমার এই উটের কোন বাচ্চা কি কালো আছে। সে বলল, হাঁ। রাসূল সা. বললেন, উট লাল অথচ তার বাচ্চা কালো হল কিভাবে। সে বলল, এ উটের বংশে কোন কালো উট ছিল তার প্রভাবে হয়েছে। রাসূল সা. তখন বললেন, এরকমই তোমার এ ছেলেটিও তোমার বংশে কেউ কালো ছিল তার প্রভাবে কালো হয়েছে। [বুখারী শারীফ : ৪৯১৯] সে সাহাবীর সকল সন্দেহ দূরীভূত হয়ে গেল এবং খুশি মনে আপন বাড়িতে ফিরে গেল। রাসূল সা. ন¤্র উপায়ে এতবড় একটি পাপ (সতী নারীকে অপবাদ দেয়া) দমন করলেন যা কখনো কঠোর উপায়ে সম্ভব হত না।
রাসূল সা. সাধারণত মন্দকে ন¤্র উপায়ে দমন করতেন। তবে কঠোরতা দরকার হলে রাসূল সা. দরকার-পরিমাণ কঠোরতা অবলম্বন করতেন। রাসূল সা.-এর সাধারণ কঠোরতা প্রদর্শন হল তাঁর চেহারা লাল হয়ে যাওয়া। সাহাবাগণ বলেন, রাসূল সা.এর চেহারা যখন লাল হয়ে যেত আমরা বুঝে ফেলতাম রাসূল সা. কোন কারণে রাগ করেছেন। হযরত আয়েশা রা. বলেন, একবার একটি ছবি সম্বলিত কার্পেট ক্রয় করে আমার কক্ষে বিছালাম। রাসূল সা. যখন আমার বাসায় আসলেন তখন দরজার সামনে দাড়িয়ে রইলেন এবং প্রবেশ করছেন না। আমি রাসূল সা. এর দিকে তাকিয়ে দেখি, ওনার চেহারা লাল হয়ে গেছে তখন বুঝতে পারলাম আমার কোন ভুল হয়েছে। তখনই আমি বললাম, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আমার কোন অপরাধ হয়ে গেলে একটু বলে দেন। রাসূল সা. তখন বললেন, এটা কেমন কার্পেট? কোথা থেকে পেয়েছ এটা? তিনি বললেন, আমি এটা ক্রয় করেছি যাতে আপনি এটার উপর বসতে পারেন। রাসূল সা. বললেন, ছবিওয়ালাদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে আর বলা হবে,এই ছবির মধ্যে জীবন দান কর। রাসূল সা. বলেন, যে বাসায় ছবি থাকে সে বাসায় ফেরেশতা প্রবেশ করে না। [মুসনাদুর রাবী’ : ২৭৫; বুখারী শারীফ : ৭০২৬ ] তুমি ছবিওয়ালা এই কার্পেট বাসায় বিছিয়েছ অথচ ছবিওয়ালাদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে। এভাবে রাসূল সা. যখনই কোন অন্যায় বা অপরাধ দেখে রাগ ও কঠোর হতেন তখন তার চেহারা দেখেই সাহাবাগণ বুঝে ফেলতেন।
তাবুকের যুদ্ধের সময়ে সাহাবাগণের উদ্দেশে আদেশ হল, সকলকে তাবুকের যুদ্ধে যেতে হবে। সকল মুসলমান সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তখন প্রচ- গরম ও বার্ষিক ফসল কাটার সময় ছিল। তাই মুনাফিকরা বিভিন্ন ছল-চাতুরি করে ও মিথ্যা অজুহাত দিয়ে সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। তিনজন মুসলমান ‘আজ যাব’ ‘কাল যাব’ করে তারাও আর সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তার মধ্যে একজন ছিলেন হযরত কা’ব বিন মালিক রা.। তিনি বলেন, রাসূল সা. যখন তাবূক যুদ্ধ থেকে ফেরত এলেন তখন আমি রাসূল সা. এর কাছে আসলাম। রাসূল সা. আমাকে দেখে একটু রাগের হাসি হাসলেন। রাসূল সা. অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন, তবে তা হাসি দ্বারা। হযরত উবাই রা. বলেন, রাসূল সা. যখন আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন তখন আমি বুঝতে পেরেছি যে এ হাসি রাগের হাসি, খুশির হাসি না। রাসূল সা. আমাকে বললেন, তুমি পিছনে কেন রয়ে গেলে। আমি বললাম, অজুহাত ও যুক্তি উপস্থাপন করে আপনাকে খুশি করার উদ্দেশ্য থাকলে আমি আপনাকে মিথ্যা অজুহাত ও মিথ্যা যুক্তি উপস্থাপন করতে পারতাম। কিন্তু আমি জানি, আপনি সত্য নবী। আপনার সাথে মিথ্যা বললে আগামীকাল  আল্লাহ তাআলা সব সত্য আপনার কাছে প্রকাশ করে দেবেন। আর আমি যদি সত্য কথা বলি তবে হয়ত আল্লাহ তায়ালা আমাকে ক্ষমা করবেন এবং আল্লাহ আপনাকেও আমার ব্যাপারে সন্তুষ্ট করিয়ে দিবেন। হে আল্লাহর রাসূল! তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার কোন গ্রহণযোগ্য কারণ আমার ছিল না। রাসূল সা. বললেন, এই ব্যক্তি সত্য বলেছে। তবে তুমি এখন যাও যতক্ষণ না আল্লাহ তাআলা আমাদের মাঝে ফয়সালা না করেন। রাসূল সা. অন্যায়ের প্রতিবাদ ন¤্র উপায়ে হাসিমুখে করছেন। তবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছেন না। রাসূল সা. তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তাকে আলাদা থাকতে বললেন। সেই সাহাবী প্রায় ৫০ দিন সকল মুসলমানের কাছ থেকে বয়কটে ছিলেন। দীর্ঘ বয়কটের শাস্তি ভোগ করার পর অবশেষে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের তাওবা কবুল হওয়ার ঘোষণা আসে। [বুখারী শারীফ : ৪১৫৬]
হযরত হাতেব বিন বুলতাআ’ রা. মুসলিম জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। মুসলমানগণের মক্কা অভিযানের পরিকল্পনার খবর গোপনে এক মহিলার মাধ্যমে মক্কার কুরাইশদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেন। আল্লাহ তায়ালা এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর রাসূল সা.-কে জানিয়ে দেন। তখন রাসূল সা. হযরত আলী ও একজন সাহাবীকে পাঠালেন আর বললেন, মক্কার পথে ওমুক স্থানে একজন মহিলার কাছে একটি চিঠি আছে সেটা নিয়ে আসবে। সে স্থানে গিয়ে সে মহিলাকে পেয়ে তার কাছে থাকা চিঠি দিতে বললে সে মহিলা অস্বীকার করে। তখন হযরত আলী রা. বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমার কাছেই চিঠি আছে। যদি তুমি আপোসে না দাও তবে আমরা শক্তি প্রয়োগ করে নিতে বাধ্য হব। তখন সে মহিলা চিঠি বের করে দেয়। তারা সেই চিঠি রাসূল সা.এর কাছে নিয়ে এলেন। হযরত ওমর রা. এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর শুনে তলোয়ার বের করে রাসূল সা.-এর কাছে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দেন আমি বিশ্বাসঘাতক হাতেবের মাথা কেটে ফেলি। রাসূল সা. এত বড় অন্যায়কে কিভাবে দমন করেছেন? কঠোরভাবে না ন¤্রভাবে? রাসূল সা. বললেন, থামো হে ওমর! তুমি কি জান সে বদরী সাহাবী। আর আল্লাহ তাআলা বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল সাহাবার পূর্বের ও পরের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। হযরত হাতেব বিন বুলতাআ’ রা, বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি মুনাফিক হইনি। মক্কায় সকলের আত্মীয়-স্বজন আছে আর আমার কোন আত্মীয়-স্বজন নেই। তাই মক্কায় রয়ে যাওয়া আমার পরিবার ও ছেলেমেয়েদের নিরাপত্তার জন্য কোন অভিভাবক নেই। তাই আমি চেয়েছিলাম যে, আমি মক্কার কাফেরদেরকে গোপন পরিকল্পনার খবর দিয়ে উপকার করব যাতে তারা আমার পরিবারের উপর কোন নির্যাতন না চালায় ও বিপদের সময়ে আমার পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ায়। রাসূল সা. তার ওজর গ্রহণ করলেন এবং তাকে কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করেন নি। [(ঘটনার অর্থ) বুখারী শারীফ : ২৮০১]
বনু নাজীর গোত্রের দুর্গকে যখন মুসলমানগণ ঘেরাও করে রাখেন তখন বনু নাজীর গোত্রের সন্ত্রাসীদেরকে দ- দেয়া ও দুর্বলদেরকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যখন মুসলমানগণ তাদের সাথে কথাবার্তা বলছেন তখন আব্দুল্লাহ বিন মুনজির রা. বনু নাজিরের ইহুদীদেরকে ইশারা করে বললেন, যদি তোমরা আত্মসমর্পণে আস তবে তোমাদেরকে দ- দেয়া হবে তাই তোমরা আত্মসমর্পণ কর না। পরক্ষণেই হযরত আব্দুল্লাহ বিন মুনজির রা.-এর সুমতি ফিরে আসে এবং রাসূল সা.-এর কাছে গিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। আমাকে ক্ষমা করুন এবং তিনি নিজেকে মসজিদের খুঁটির সাথে বেঁধে ফেলেন এবং বলেন, রাসূল সা. যতক্ষণ আমাকে ক্ষমা করে আমার বাঁধন না খুলবেন আমি এভাবে বন্দি থাকব। রাসূল সা. তাকেও ক্ষমা করে দেন।
অনেক সময় অনেকে বলে, ভাল ব্যবহার কার সাথে করব? সে আমার সাথে শত্রুতা পোষণ করে তার সাথে শক্তি প্রদর্শন না করলে সে আরো বেশি শত্রুতা দেখাবে। যে আমাকে আঘাত করে তার সাথে কিভাবে ন¤্র ব্যবহার করব? ওমাইর ইবনে ওহাব মক্কায় নির্জনে বসে সাফওয়ান বিন মুআত্তালের সাথে বলছে, আমার ইচ্ছা হয়, মুহাম্মাদ সা. কে হত্যা করতে তবে আমার কিছু ঋণ আছে ও আমার পরিবারের ভরণ পোষণ করতে হয় তাই কোন ঝুঁকি নিতে পারছি না। তখন সাফওয়ান বিন মুআত্তাল বলল, আমি তোমার ঋণ পরিশোধ ও তোমার পরিবারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিচ্ছি। যাও মুহাম্মাদ সা.-কে হত্যা করে আস। তখন ওমাইর রাসূল সা.-কে হত্যার উদ্দেশ্যে মদীনায় পৌছল। রাসূল সা.-কে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, ওমাইর আপনাকে হত্য করতে এসেছে এবং বিনিময়ে সাফওয়ান তার ঋণ ও তার পরিবারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। রাসূল সা. যখন জেনেছেন তখন কি ওমাইরকে ধরার জন্য ও তার হাত থেকে বাঁচার পূর্ব সতর্কতাস্বরূপ তার উপর আক্রমণ করেছেন? না তাকে বন্দি করেছেন? কী করেছেন তার সাথে? আমরা এমন আক্রমণকারী শত্রুর সাথে কী করি। ওমাইর মদিনায় এসে খোলা তালোয়ার নিয়ে রাসূল সা.-কে খুঁজছে। হযরত ওমর রা. ওমাইর এর সন্দেহজনক ঘুরাফেরা দেখে তাকে ধরে রাসূল সা.-এর কাছে নিয়ে আসেন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দেন, আমরা ইসলামের এই শত্রুকে শায়েস্তা করি। রাসূল সা. বললেন, হে ওমর! তাকে আমার কাছে আসতে দাও ও তার তালোয়ার তার কাছে দাও। রাসূল সা. তাকে হাসিমুখে স্বাগত জানালেন ও বললেন, হে ওমাইর! তোমার তলোয়ার তোমার কাঁধে নিয়ে ঘুরছ কেন? সে ছলনা করে বলছে, হা, এই তলোয়ারই আমাদের সম্পর্ক নষ্ট করেছে। তারপর রাসূল সা. বললেন, তুমি মদিনায় কেন এসেছ? সে বলল, আমার ছেলে ওহাব আটক হয়েছে তাকে ছাড়াতে এসেছি। রাসূল সা. তখন বললেন, সত্য কথা বল। সে বলল, না, আল্লাহর শপথ! আমি এ জন্যই এসেছি। তখন রাসূল সা. বলেন, তুমি কি ওমুক স্থানে সাফওয়ানের সাথে বসে আমাকে হত্যা করতে ষড়যন্ত্র করনি? বিনিময়ে সাফওয়ান তোমার ঋণ ও তোমার পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছে। তখন সাফওয়ান বলল, আল্লাহর শপথ! আমি যখন সাফওয়ানের সাথে এ আলোচনা করি তখন আমি আর সে ছাড়া আর কেউ ছিল না। নিশ্চয় যে আল্লাহকে আমরা অস্বীকার করছি সেই আল্লাহই আপনাকে এসব জানিয়েছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর সত্য নবী। [তাবরানী শারীফ : ১৩৬০৪]  তিনি তো একজন ভাল মানুষ ছিলেন ও কল্যাণকামী ছিলেন এবং আমাদের মত এরকম ধর্ম মেনেছেন ও দেব-দেবীর পূজা করেছেন। যখন তর্কের সময় কেউ কাউকে তিরস্কার করতে চায় তখন এমনই বলে যে, আপনি এমন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ঝগড়া-বিবাদ করছেন অথচ আপনার বাবাতো অনেক ভাল মানুষ ছিলেন। প্রতি উত্তরে তখন রাসূল সা. বললেন, হে হুসাইন! আমার বাবা এবং তোমার বাবা উভয়ের অবস্থানই জাহান্নামে। অর্থাৎ আমার বাবা ও তোমার বাবা সকলে ভুল করেছে তাই এখন তারা জাহান্নামে। তারা ভুল করেছে বলে আমরা সেটাকে ভুল বলব না বা তাদের মত ভুল আমরাও করব, এটাতো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। রাসূল সা.-এর বাবা ভুল করেছেন বলে রাসূল সা. সেটাকে ভুল বলবেন না সেটাতো কখনো সম্ভব না। যেমন আমাদের সমাজে আইন অন্যের জন্য আমার জন্য নয়। আমি ভুল করলে বা আমার পরিবার বা আমার দল ভুল করলে সেটাকে ভুল বলতে আমরা রাজি নই; বরং সে ভুলকে সঠিক সাব্যস্ত করতে আমরা হাজারো ছলচাতুরি করে থাকি। রাসূল সা. এভাবে তার সাথে বুদ্ধিভিত্তিক খোলামেলা আলোচনা করছেন এবং জিজ্ঞাসা করছেন, হে হুসাইন! আপনি কতজন দেবীর পূজা করেন? সে বলল, সাতজনের, তার মধ্যে ছয়জন পৃথিবীতে এবং একজন আকাশে। রাসূল সা.বললেন, যখন আপনার বিপদ হয় (যখন আপনি নৌকায় যাচ্ছেন আর সমুদ্রে ঝড় ওঠে) তখন কাকে ডাকেন? সে বলল, আকাশের খোদাকে ডাকি। যখন আপনার মসিবত আসে তখন কাকে ডাকেন? সে বলল, আকাশের আল্লাহকে ডাকি। আপনি পৃথিবীর দেবতাগুলোকে সুখের সময় ডাকেন আর বিপদের সময়ে তাদেরকে ডাকেন না এটা কি যুক্তির কথা? এটা কি বুদ্ধিমানের কাজ? আর বিপদের সময় আকাশের আল্লাহকে ডাকেন আর সুখের সময় সর্বদা তাকে ডাকেন না এটা কি বুদ্ধিমানের কাজ? যাকে আপনি বিপদের সময় ডাকেন তাকে তো সুখের সময় আরো বেশী করে ডাকাটাই তো বুদ্ধিমানের কাজ ছিল। তখন সে রাসূল সা.-এর সামনে বলল, আমি এরকম যুক্তির কথা আর কখনো শুনিনি। রাসূল সা. তখন সুযোগ পেয়ে বললেন, আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন তবে আপনি নিরাপদ থাকবেন ও শান্তি পেয়ে যাবেন। সে বলল, আমার সাথে আমার বংশ আছে। আমিতো একা ইসলাম গ্রহণ করতে পারি না। রাসূল সা. তখন বললেন, তাহলে কমপক্ষে এতটুকু করুন যে আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, হে আল্লাহ আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। সে বলল, হ্যাঁ, এটাতো বলতে পারি। রাসূল সা.-এর সাথে এরকম উম্মুক্ত সংলাপ ও খোলামেলা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা করতে করতে হযরত হুসাইনের মন গলে গেল এবং ইসলামই যে সঠিক পথ তা নিঃসন্দেহে বুঝতে পারলেন। তখন রাসূল সা.-এর সামনে তিনি ঘোষণা করলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ এক ও তার কোন শরীক নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল ও নবী। [তিরমিজী শারীফ : ৩৪৭৯] এই হুসাইন বিন আবীদের এক ছেলে ইমরান বিন হুসাইন আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তার বাবা যখন কাফের আর ইসলামের ক্ষতি করতে ও রাসূল সা.-কে তিরস্কার করতে এসেছিল সে তখন সে মজলিসেই ছিল। কিন্তু সে তার বাবার জন্য দাঁড়ায়নি, সালাম দেয়নি এবং তাকে না চেনার ভান করেছিল। অথচ তার বাবা যখন ইসলাম গ্রহণ করল তখন উপস্থিত সকলের মধ্যে সর্বপ্রথম তার ছেলে ইমরান তার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে বাবার কাছে গিয়ে বাবার কপালে, হাতে ও বুকে চুম্বন করল। রাসূল সা. এ দৃশ্য দেখে কেঁদে ফেললেন। সাহাবার জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কাঁদছেন কেন? রাসূল সা. বললেন, এই বৃদ্ধ যখন এল তখন তার ছেলে তার দিকে তাকায়নি আর এখন যখন সে ইসলাম গ্রহণ করেছে তখন তার ছেলে তাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করছে। আমি ছেলে ও তার বাবার মায়া দেখে কাঁদছি। রাসূল সা. তার সম্মানার্থে সকল সাহাবাদেরকে আদেশ করলেন যে, তোমরা এই বুদ্ধিজীবী বৃদ্ধকে তার বাসায় এগিয়ে দিয়ে আস। যখন তিনি রাসূল সা.-এর দরজা থেকে বের হলেন তখন তার অপেক্ষায় থাকা অন্যান্য কাফেররা দেখল যে তাদের প-িত ইসলাম গ্রহণ করেছে। তখন কি সকলে ইসলাম গ্রহণ করেছে? না। অহংকার মানুষকে অন্ধ করে ফেলে। তারা তাকে তিরস্কার করা শুরু করল আর বলল, তুমি এই বুড়া বয়সে বে-দীন হয়ে গেলে? তুমি ধর্মত্যাগী ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করা শুরু করল।
একজন মানুষ যখন ভাল কাজ করে তখন হাজারো মানুষ তার সে ভাল কাজে বাধা দিতে, তাকে তিরস্কার করতে দাঁড়িয়ে যায়। তখন সে ভাল কাজকে সমর্থন করা ও তার পাশে দাড়ানো সকল মুসলমানের ইমানী দায়িত্ব। রাসূল সা. বলেন, যখন তোমাদের কেউ কোন খারাপ কাজ দেখে তখন সে যেন তা হাত দ্বারা পরিবর্তন করে, যদি না পারে তবে যেন মুখ দ্বারা পরিবর্তন করে আর তাও যদি সম্ভব না হয় তবে যেন অন্তর দ্বারা ঘৃণা করে। খারাপ কাজকে ঘৃণা করা ও ভাল কাজকে পছন্দ করা সকলের ঈমানী দায়িত্ব। কেউ যদি খারাপ কাজকে ঘৃণা না করে তবে তার সামান্য ঈমানও থাকবে না।  রাসূল সা. বলেন, তোমরা ভাল কাজের আদেশ করতে থাক ও খারাপ কাজের নিষেধ করতে থাক। এমন একটা সময় হবে যখন কেউ ভাল কাজের আদেশ করবে না এবং খারাপ কাজের নিষেধ করবে না। সাহাবা কেরাম রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এমন কি হবে? তিনি বললেন, এমন তো হবেই বরং এর চেয়ে আরো বেশি খারাপ অবস্থা হবে। সাহাবাগণ বললেন, এর চেয়ে খারাপ অবস্থাটা কি? রাসূল সা. বললেন, মানুষজন ভাল কাজকে খারাপ মনে করবে আর খারাপ কাজকে ভাল মনে করবে। সাহাবাগণ বললেন, এমনটা কি হবে? রাসূল সা. বললেন, এর চেয়েও খারাপ অবস্থা হবে। (এমন এক যুগ আসবে যে, মানুষজন ভাল কাজ করতে নিষেধ করবে ও ভাল কাজ করতে বাধা দিবে এবং খারাপ কাজের আদেশ করবে ও খারাপ কাজ করতে উৎসাহ দিবে)। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি তাদেরকে এমন ফিতনা দিব যাতে সহনশীল ব্যক্তি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যাবেন। [ইবনে আবী দুনিয়া : ৩৩; মুসনাদে আবী ইয়ালা : ৬৩৮৪]
এজন্য হযরত সুফিয়ান রাহ. বলেন, যদি তুমি ভাল কাজের আদেশ করলে তবে তুমি মুমিনকে ও মুমিনের দলকে শক্তিশালী করলে। আর যদি খারাপ কাজকে খারাপ বললে তবে মুনাফিক-পাপীকে দুর্বল করলে। [মুসানদুল খাল্লাল : ৬৮]
সকল খারাপ মানুষ চায় সকল মানুষ তাদের মত খারাপ কাজ করুক আর ভাল মানুষ চায় সকল মানুষ তাদের মত ভাল কাজ করুক অথবা কমপক্ষে তাদের ভাল কাজকে সমর্থন করুক। ব্যভিচারী নির্লজ্জরা চায় সবাই তাদের মত বেলাল্লাপনা করুক। কোন হুজুর, ভদ্র মানুষ তাদের পরিবেশে আসুক তা তারা বরদাশত করে না এমনকি তাদেরকে মৌলবাদী, গ্রাম্য ইত্যাদি বলে গালমন্দ করে। মদখোররা চায় সবাই তাদের মত মদ খাক বা তাদের কাজকে আধুনিকতা ও সভ্যতা মনে করুক। তাদের মদ খাওয়াকে কেউ খারাপ বলবে সেটা তারা চায় না। যারা ঘুষ খায়, দুর্নীতি করে তারা চায় তার অফিসের সবাই দুর্নীতি করুক। কেউ তাদেরকে খারাপ বলুক সেটা তারা চায় না। বরং যে খারাপ বলে তার বিরুদ্ধে সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করে। একজন বাস মালিক বলল, দুর্নীতিবাজদের দাফটের কাছে আমাকে হার মানতে হয়েছে এবং ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হয়েছে। প্রথমে বাসের হেলপার দুর্নীতি করত সেটা ঠেকাতে চালকের সাহায্য নিলাম। কিছুদিন পর সে চালকও তার দুর্নীতির অংশীদার হল। তারপর পরিদর্শক নিয়োগ করলাম, কিছুদিন পর সেও দুর্নীতির অংশ পেল ও দুর্নীতি শুরু করল। তাদের দুর্নীতি বন্ধ করতে পরিদর্শকের পরিদর্শক নিয়োগ করলাম, কিছুদিন সেও দুর্নীতির অংশ পেল ও সবাই মিলে দুর্নীতি করল। ফলে আগে একজন দুর্নীতি করার পরও যতটুকু আয় পেতাম এখন দুর্নীতির অংশীদার একাধিক হওয়াতে ততটুকুও পাচ্ছি না। একপর্যায়ে দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের কাছে হার মেনে ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম। এভাবেই দুর্নীতিবাজরা চায় সবাই দুর্নীতি করুক, নচেৎ সবাই মিলে তার বিরোধিতা করে তাকে পরাজিত করবে।
তাই মন্দকে মন্দ বলা ও মন্দ কাজে বাধা দেওয়া ইমানী দায়িত্ব ও একজন মুসলমানের গুণ। তবে খারাপ কাজকে ন¤্র উপায়ে দমন করতে হবে। একবার এক সাহাবী রা. রাসূল সা.-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার একটি সন্তান হয়েছে তবে সেটি কালো অথচ আমরা ফর্সা। তাই আমার সন্দেহ, আমার স্ত্রীর অন্য কারো সাথে অবৈধ সম্পর্ক আছে। রাসূল সা. তার উপর রাগ হয়ে তাকে থাপ্পড় দেননি বা তার এ খারাপ সন্দেহকে কঠোর উপায়ে দমন করেননি। রাসূল সা. ন¤্র ভাষায় বলছেন, আচ্ছা! তোমার কি কোন উট আছে? সে বলল, হাঁ, আছে। তোমার উটের রং কি? সে বলল লাল। রাসূল সা. আবার বললেন, তোমার এই উটের কোন বাচ্চা কি কালো আছে। সে বলল, হাঁ। রাসূল সা. বললেন, উট লাল অথচ তার বাচ্চা কালো হল কিভাবে। সে বলল, এ উটের বংশে কোন কালো উট ছিল তার প্রভাবে হয়েছে। রাসূল সা. তখন বললেন, এরকমই তোমার এ ছেলেটিও তোমার বংশে কেউ কালো ছিল তার প্রভাবে কালো হয়েছে। [বুখারী শারীফ : ৪৯১৯] সে সাহাবীর সকল সন্দেহ দূরীভূত হয়ে গেল এবং খুশি মনে আপন বাড়িতে ফিরে গেল। রাসূল সা. ন¤্র উপায়ে এতবড় একটি পাপ (সতী নারীকে অপবাদ দেয়া) দমন করলেন যা কখনো কঠোর উপায়ে সম্ভব হত না।
রাসূল সা. সাধারণত মন্দকে ন¤্র উপায়ে দমন করতেন। তবে কঠোরতা দরকার হলে রাসূল সা. দরকার-পরিমাণ কঠোরতা অবলম্বন করতেন। রাসূল সা.-এর সাধারণ কঠোরতা প্রদর্শন হল তাঁর চেহারা লাল হয়ে যাওয়া। সাহাবাগণ বলেন, রাসূল সা.এর চেহারা যখন লাল হয়ে যেত আমরা বুঝে ফেলতাম রাসূল সা. কোন কারণে রাগ করেছেন। হযরত আয়েশা রা. বলেন, একবার একটি ছবি সম্বলিত কার্পেট ক্রয় করে আমার কক্ষে বিছালাম। রাসূল সা. যখন আমার বাসায় আসলেন তখন দরজার সামনে দাড়িয়ে রইলেন এবং প্রবেশ করছেন না। আমি রাসূল সা. এর দিকে তাকিয়ে দেখি, ওনার চেহারা লাল হয়ে গেছে তখন বুঝতে পারলাম আমার কোন ভুল হয়েছে। তখনই আমি বললাম, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আমার কোন অপরাধ হয়ে গেলে একটু বলে দেন। রাসূল সা. তখন বললেন, এটা কেমন কার্পেট? কোথা থেকে পেয়েছ এটা? তিনি বললেন, আমি এটা ক্রয় করেছি যাতে আপনি এটার উপর বসতে পারেন। রাসূল সা. বললেন, ছবিওয়ালাদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে আর বলা হবে,এই ছবির মধ্যে জীবন দান কর। রাসূল সা. বলেন, যে বাসায় ছবি থাকে সে বাসায় ফেরেশতা প্রবেশ করে না। [মুসনাদুর রাবী’ : ২৭৫; বুখারী শারীফ : ৭০২৬ ] তুমি ছবিওয়ালা এই কার্পেট বাসায় বিছিয়েছ অথচ ছবিওয়ালাদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে। এভাবে রাসূল সা. যখনই কোন অন্যায় বা অপরাধ দেখে রাগ ও কঠোর হতেন তখন তার চেহারা দেখেই সাহাবাগণ বুঝে ফেলতেন।
তাবুকের যুদ্ধের সময়ে সাহাবাগণের উদ্দেশে আদেশ হল, সকলকে তাবুকের যুদ্ধে যেতে হবে। সকল মুসলমান সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তখন প্রচ- গরম ও বার্ষিক ফসল কাটার সময় ছিল। তাই মুনাফিকরা বিভিন্ন ছল-চাতুরি করে ও মিথ্যা অজুহাত দিয়ে সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। তিনজন মুসলমান ‘আজ যাব’ ‘কাল যাব’ করে তারাও আর সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তার মধ্যে একজন ছিলেন হযরত কা’ব বিন মালিক রা.। তিনি বলেন, রাসূল সা. যখন তাবূক যুদ্ধ থেকে ফেরত এলেন তখন আমি রাসূল সা. এর কাছে আসলাম। রাসূল সা. আমাকে দেখে একটু রাগের হাসি হাসলেন। রাসূল সা. অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন, তবে তা হাসি দ্বারা। হযরত উবাই রা. বলেন, রাসূল সা. যখন আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন তখন আমি বুঝতে পেরেছি যে এ হাসি রাগের হাসি, খুশির হাসি না। রাসূল সা. আমাকে বললেন, তুমি পিছনে কেন রয়ে গেলে। আমি বললাম, অজুহাত ও যুক্তি উপস্থাপন করে আপনাকে খুশি করার উদ্দেশ্য থাকলে আমি আপনাকে মিথ্যা অজুহাত ও মিথ্যা যুক্তি উপস্থাপন করতে পারতাম। কিন্তু আমি জানি, আপনি সত্য নবী। আপনার সাথে মিথ্যা বললে আগামীকাল  আল্লাহ তাআলা সব সত্য আপনার কাছে প্রকাশ করে দেবেন। আর আমি যদি সত্য কথা বলি তবে হয়ত আল্লাহ তায়ালা আমাকে ক্ষমা করবেন এবং আল্লাহ আপনাকেও আমার ব্যাপারে সন্তুষ্ট করিয়ে দিবেন। হে আল্লাহর রাসূল! তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার কোন গ্রহণযোগ্য কারণ আমার ছিল না। রাসূল সা. বললেন, এই ব্যক্তি সত্য বলেছে। তবে তুমি এখন যাও যতক্ষণ না আল্লাহ তাআলা আমাদের মাঝে ফয়সালা না করেন। রাসূল সা. অন্যায়ের প্রতিবাদ ন¤্র উপায়ে হাসিমুখে করছেন। তবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছেন না। রাসূল সা. তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তাকে আলাদা থাকতে বললেন। সেই সাহাবী প্রায় ৫০ দিন সকল মুসলমানের কাছ থেকে বয়কটে ছিলেন। দীর্ঘ বয়কটের শাস্তি ভোগ করার পর অবশেষে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের তাওবা কবুল হওয়ার ঘোষণা আসে। [বুখারী শারীফ : ৪১৫৬]
হযরত হাতেব বিন বুলতাআ’ রা. মুসলিম জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। মুসলমানগণের মক্কা অভিযানের পরিকল্পনার খবর গোপনে এক মহিলার মাধ্যমে মক্কার কুরাইশদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেন। আল্লাহ তায়ালা এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর রাসূল সা.-কে জানিয়ে দেন। তখন রাসূল সা. হযরত আলী ও একজন সাহাবীকে পাঠালেন আর বললেন, মক্কার পথে ওমুক স্থানে একজন মহিলার কাছে একটি চিঠি আছে সেটা নিয়ে আসবে। সে স্থানে গিয়ে সে মহিলাকে পেয়ে তার কাছে থাকা চিঠি দিতে বললে সে মহিলা অস্বীকার করে। তখন হযরত আলী রা. বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমার কাছেই চিঠি আছে। যদি তুমি আপোসে না দাও তবে আমরা শক্তি প্রয়োগ করে নিতে বাধ্য হব। তখন সে মহিলা চিঠি বের করে দেয়। তারা সেই চিঠি রাসূল সা.এর কাছে নিয়ে এলেন। হযরত ওমর রা. এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর শুনে তলোয়ার বের করে রাসূল সা.-এর কাছে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দেন আমি বিশ্বাসঘাতক হাতেবের মাথা কেটে ফেলি। রাসূল সা. এত বড় অন্যায়কে কিভাবে দমন করেছেন? কঠোরভাবে না ন¤্রভাবে? রাসূল সা. বললেন, থামো হে ওমর! তুমি কি জান সে বদরী সাহাবী। আর আল্লাহ তাআলা বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল সাহাবার পূর্বের ও পরের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। হযরত হাতেব বিন বুলতাআ’ রা, বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি মুনাফিক হইনি। মক্কায় সকলের আত্মীয়-স্বজন আছে আর আমার কোন আত্মীয়-স্বজন নেই। তাই মক্কায় রয়ে যাওয়া আমার পরিবার ও ছেলেমেয়েদের নিরাপত্তার জন্য কোন অভিভাবক নেই। তাই আমি চেয়েছিলাম যে, আমি মক্কার কাফেরদেরকে গোপন পরিকল্পনার খবর দিয়ে উপকার করব যাতে তারা আমার পরিবারের উপর কোন নির্যাতন না চালায় ও বিপদের সময়ে আমার পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ায়। রাসূল সা. তার ওজর গ্রহণ করলেন এবং তাকে কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করেন নি। [(ঘটনার অর্থ) বুখারী শারীফ : ২৮০১]
বনু নাজীর গোত্রের দুর্গকে যখন মুসলমানগণ ঘেরাও করে রাখেন তখন বনু নাজীর গোত্রের সন্ত্রাসীদেরকে দ- দেয়া ও দুর্বলদেরকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যখন মুসলমানগণ তাদের সাথে কথাবার্তা বলছেন তখন আব্দুল্লাহ বিন মুনজির রা. বনু নাজিরের ইহুদীদেরকে ইশারা করে বললেন, যদি তোমরা আত্মসমর্পণে আস তবে তোমাদেরকে দ- দেয়া হবে তাই তোমরা আত্মসমর্পণ কর না। পরক্ষণেই হযরত আব্দুল্লাহ বিন মুনজির রা.-এর সুমতি ফিরে আসে এবং রাসূল সা.-এর কাছে গিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। আমাকে ক্ষমা করুন এবং তিনি নিজেকে মসজিদের খুঁটির সাথে বেঁধে ফেলেন এবং বলেন, রাসূল সা. যতক্ষণ আমাকে ক্ষমা করে আমার বাঁধন না খুলবেন আমি এভাবে বন্দি থাকব। রাসূল সা. তাকেও ক্ষমা করে দেন।
অনেক সময় অনেকে বলে, ভাল ব্যবহার কার সাথে করব? সে আমার সাথে শত্রুতা পোষণ করে তার সাথে শক্তি প্রদর্শন না করলে সে আরো বেশি শত্রুতা দেখাবে। যে আমাকে আঘাত করে তার সাথে কিভাবে ন¤্র ব্যবহার করব? ওমাইর ইবনে ওহাব মক্কায় নির্জনে বসে সাফওয়ান বিন মুআত্তালের সাথে বলছে, আমার ইচ্ছা হয়, মুহাম্মাদ সা. কে হত্যা করতে তবে আমার কিছু ঋণ আছে ও আমার পরিবারের ভরণ পোষণ করতে হয় তাই কোন ঝুঁকি নিতে পারছি না। তখন সাফওয়ান বিন মুআত্তাল বলল, আমি তোমার ঋণ পরিশোধ ও তোমার পরিবারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিচ্ছি। যাও মুহাম্মাদ সা.-কে হত্যা করে আস। তখন ওমাইর রাসূল সা.-কে হত্যার উদ্দেশ্যে মদীনায় পৌছল। রাসূল সা.-কে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, ওমাইর আপনাকে হত্য করতে এসেছে এবং বিনিময়ে সাফওয়ান তার ঋণ ও তার পরিবারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। রাসূল সা. যখন জেনেছেন তখন কি ওমাইরকে ধরার জন্য ও তার হাত থেকে বাঁচার পূর্ব সতর্কতাস্বরূপ তার উপর আক্রমণ করেছেন? না তাকে বন্দি করেছেন? কী করেছেন তার সাথে? আমরা এমন আক্রমণকারী শত্রুর সাথে কী করি। ওমাইর মদিনায় এসে খোলা তালোয়ার নিয়ে রাসূল সা.-কে খুঁজছে। হযরত ওমর রা. ওমাইর এর সন্দেহজনক ঘুরাফেরা দেখে তাকে ধরে রাসূল সা.-এর কাছে নিয়ে আসেন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দেন, আমরা ইসলামের এই শত্রুকে শায়েস্তা করি। রাসূল সা. বললেন, হে ওমর! তাকে আমার কাছে আসতে দাও ও তার তালোয়ার তার কাছে দাও। রাসূল সা. তাকে হাসিমুখে স্বাগত জানালেন ও বললেন, হে ওমাইর! তোমার তলোয়ার তোমার কাঁধে নিয়ে ঘুরছ কেন? সে ছলনা করে বলছে, হা, এই তলোয়ারই আমাদের সম্পর্ক নষ্ট করেছে। তারপর রাসূল সা. বললেন, তুমি মদিনায় কেন এসেছ? সে বলল, আমার ছেলে ওহাব আটক হয়েছে তাকে ছাড়াতে এসেছি। রাসূল সা. তখন বললেন, সত্য কথা বল। সে বলল, না, আল্লাহর শপথ! আমি এ জন্যই এসেছি। তখন রাসূল সা. বলেন, তুমি কি ওমুক স্থানে সাফওয়ানের সাথে বসে আমাকে হত্যা করতে ষড়যন্ত্র করনি? বিনিময়ে সাফওয়ান তোমার ঋণ ও তোমার পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছে। তখন সাফওয়ান বলল, আল্লাহর শপথ! আমি যখন সাফওয়ানের সাথে এ আলোচনা করি তখন আমি আর সে ছাড়া আর কেউ ছিল না। নিশ্চয় যে আল্লাহকে আমরা অস্বীকার করছি সেই আল্লাহই আপনাকে এসব জানিয়েছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর সত্য নবী। [তাবরানী শারীফ : ১৩৬০৪]  তিনি তো একজন ভাল মানুষ ছিলেন ও কল্যাণকামী ছিলেন এবং আমাদের মত এরকম ধর্ম মেনেছেন ও দেব-দেবীর পূজা করেছেন। যখন তর্কের সময় কেউ কাউকে তিরস্কার করতে চায় তখন এমনই বলে যে, আপনি এমন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ঝগড়া-বিবাদ করছেন অথচ আপনার বাবাতো অনেক ভাল মানুষ ছিলেন। প্রতি উত্তরে তখন রাসূল সা. বললেন, হে হুসাইন! আমার বাবা এবং তোমার বাবা উভয়ের অবস্থানই জাহান্নামে। অর্থাৎ আমার বাবা ও তোমার বাবা সকলে ভুল করেছে তাই এখন তারা জাহান্নামে। তারা ভুল করেছে বলে আমরা সেটাকে ভুল বলব না বা তাদের মত ভুল আমরাও করব, এটাতো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। রাসূল সা.-এর বাবা ভুল করেছেন বলে রাসূল সা. সেটাকে ভুল বলবেন না সেটাতো কখনো সম্ভব না। যেমন আমাদের সমাজে আইন অন্যের জন্য আমার জন্য নয়। আমি ভুল করলে বা আমার পরিবার বা আমার দল ভুল করলে সেটাকে ভুল বলতে আমরা রাজি নই; বরং সে ভুলকে সঠিক সাব্যস্ত করতে আমরা হাজারো ছলচাতুরি করে থাকি। রাসূল সা. এভাবে তার সাথে বুদ্ধিভিত্তিক খোলামেলা আলোচনা করছেন এবং জিজ্ঞাসা করছেন, হে হুসাইন! আপনি কতজন দেবীর পূজা করেন? সে বলল, সাতজনের, তার মধ্যে ছয়জন পৃথিবীতে এবং একজন আকাশে। রাসূল সা.বললেন, যখন আপনার বিপদ হয় (যখন আপনি নৌকায় যাচ্ছেন আর সমুদ্রে ঝড় ওঠে) তখন কাকে ডাকেন? সে বলল, আকাশের খোদাকে ডাকি। যখন আপনার মসিবত আসে তখন কাকে ডাকেন? সে বলল, আকাশের আল্লাহকে ডাকি। আপনি পৃথিবীর দেবতাগুলোকে সুখের সময় ডাকেন আর বিপদের সময়ে তাদেরকে ডাকেন না এটা কি যুক্তির কথা? এটা কি বুদ্ধিমানের কাজ? আর বিপদের সময় আকাশের আল্লাহকে ডাকেন আর সুখের সময় সর্বদা তাকে ডাকেন না এটা কি বুদ্ধিমানের কাজ? যাকে আপনি বিপদের সময় ডাকেন তাকে তো সুখের সময় আরো বেশী করে ডাকাটাই তো বুদ্ধিমানের কাজ ছিল। তখন সে রাসূল সা.-এর সামনে বলল, আমি এরকম যুক্তির কথা আর কখনো শুনিনি। রাসূল সা. তখন সুযোগ পেয়ে বললেন, আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন তবে আপনি নিরাপদ থাকবেন ও শান্তি পেয়ে যাবেন। সে বলল, আমার সাথে আমার বংশ আছে। আমিতো একা ইসলাম গ্রহণ করতে পারি না। রাসূল সা. তখন বললেন, তাহলে কমপক্ষে এতটুকু করুন যে আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, হে আল্লাহ আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। সে বলল, হ্যাঁ, এটাতো বলতে পারি। রাসূল সা.-এর সাথে এরকম উম্মুক্ত সংলাপ ও খোলামেলা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা করতে করতে হযরত হুসাইনের মন গলে গেল এবং ইসলামই যে সঠিক পথ তা নিঃসন্দেহে বুঝতে পারলেন। তখন রাসূল সা.-এর সামনে তিনি ঘোষণা করলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ এক ও তার কোন শরীক নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল ও নবী। [তিরমিজী শারীফ : ৩৪৭৯] এই হুসাইন বিন আবীদের এক ছেলে ইমরান বিন হুসাইন আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তার বাবা যখন কাফের আর ইসলামের ক্ষতি করতে ও রাসূল সা.-কে তিরস্কার করতে এসেছিল সে তখন সে মজলিসেই ছিল। কিন্তু সে তার বাবার জন্য দাঁড়ায়নি, সালাম দেয়নি এবং তাকে না চেনার ভান করেছিল। অথচ তার বাবা যখন ইসলাম গ্রহণ করল তখন উপস্থিত সকলের মধ্যে সর্বপ্রথম তার ছেলে ইমরান তার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে বাবার কাছে গিয়ে বাবার কপালে, হাতে ও বুকে চুম্বন করল। রাসূল সা. এ দৃশ্য দেখে কেঁদে ফেললেন। সাহাবার জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কাঁদছেন কেন? রাসূল সা. বললেন, এই বৃদ্ধ যখন এল তখন তার ছেলে তার দিকে তাকায়নি আর এখন যখন সে ইসলাম গ্রহণ করেছে তখন তার ছেলে তাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করছে। আমি ছেলে ও তার বাবার মায়া দেখে কাঁদছি। রাসূল সা. তার সম্মানার্থে সকল সাহাবাদেরকে আদেশ করলেন যে, তোমরা এই বুদ্ধিজীবী বৃদ্ধকে তার বাসায় এগিয়ে দিয়ে আস। যখন তিনি রাসূল সা.-এর দরজা থেকে বের হলেন তখন তার অপেক্ষায় থাকা অন্যান্য কাফেররা দেখল যে তাদের প-িত ইসলাম গ্রহণ করেছে। তখন কি সকলে ইসলাম গ্রহণ করেছে? না। অহংকার মানুষকে অন্ধ করে ফেলে। তারা তাকে তিরস্কার করা শুরু করল আর বলল, তুমি এই বুড়া বয়সে বে-দীন হয়ে গেলে? তুমি ধর্মত্যাগী ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করা শুরু করল।
একজন মানুষ যখন ভাল কাজ করে তখন হাজারো মানুষ তার সে ভাল কাজে বাধা দিতে, তাকে তিরস্কার করতে দাঁড়িয়ে যায়। তখন সে ভাল কাজকে সমর্থন করা ও তার পাশে দাড়ানো সকল মুসলমানের ইমানী দায়িত্ব। রাসূল সা. বলেন, যখন তোমাদের কেউ কোন খারাপ কাজ দেখে তখন সে যেন তা হাত দ্বারা পরিবর্তন করে, যদি না পারে তবে যেন মুখ দ্বারা পরিবর্তন করে আর তাও যদি সম্ভব না হয় তবে যেন অন্তর দ্বারা ঘৃণা করে। খারাপ কাজকে ঘৃণা করা ও ভাল কাজকে পছন্দ করা সকলের ঈমানী দায়িত্ব। কেউ যদি খারাপ কাজকে ঘৃণা না করে তবে তার সামান্য ঈমানও থাকবে না।  রাসূল সা. বলেন, তোমরা ভাল কাজের আদেশ করতে থাক ও খারাপ কাজের নিষেধ করতে থাক। এমন একটা সময় হবে যখন কেউ ভাল কাজের আদেশ করবে না এবং খারাপ কাজের নিষেধ করবে না। সাহাবা কেরাম রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এমন কি হবে? তিনি বললেন, এমন তো হবেই বরং এর চেয়ে আরো বেশি খারাপ অবস্থা হবে। সাহাবাগণ বললেন, এর চেয়ে খারাপ অবস্থাটা কি? রাসূল সা. বললেন, মানুষজন ভাল কাজকে খারাপ মনে করবে আর খারাপ কাজকে ভাল মনে করবে। সাহাবাগণ বললেন, এমনটা কি হবে? রাসূল সা. বললেন, এর চেয়েও খারাপ অবস্থা হবে। (এমন এক যুগ আসবে যে, মানুষজন ভাল কাজ করতে নিষেধ করবে ও ভাল কাজ করতে বাধা দিবে এবং খারাপ কাজের আদেশ করবে ও খারাপ কাজ করতে উৎসাহ দিবে)। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি তাদেরকে এমন ফিতনা দিব যাতে সহনশীল ব্যক্তি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যাবেন। [ইবনে আবী দুনিয়া : ৩৩; মুসনাদে আবী ইয়ালা : ৬৩৮৪]
এজন্য হযরত সুফিয়ান রাহ. বলেন, যদি তুমি ভাল কাজের আদেশ করলে তবে তুমি মুমিনকে ও মুমিনের দলকে শক্তিশালী করলে। আর যদি খারাপ কাজকে খারাপ বললে তবে মুনাফিক-পাপীকে দুর্বল করলে। [মুসানদুল খাল্লাল : ৬৮]
সকল খারাপ মানুষ চায় সকল মানুষ তাদের মত খারাপ কাজ করুক আর ভাল মানুষ চায় সকল মানুষ তাদের মত ভাল কাজ করুক অথবা কমপক্ষে তাদের ভাল কাজকে সমর্থন করুক। ব্যভিচারী নির্লজ্জরা চায় সবাই তাদের মত বেলাল্লাপনা করুক। কোন হুজুর, ভদ্র মানুষ তাদের পরিবেশে আসুক তা তারা বরদাশত করে না এমনকি তাদেরকে মৌলবাদী, গ্রাম্য ইত্যাদি বলে গালমন্দ করে। মদখোররা চায় সবাই তাদের মত মদ খাক বা তাদের কাজকে আধুনিকতা ও সভ্যতা মনে করুক। তাদের মদ খাওয়াকে কেউ খারাপ বলবে সেটা তারা চায় না। যারা ঘুষ খায়, দুর্নীতি করে তারা চায় তার অফিসের সবাই দুর্নীতি করুক। কেউ তাদেরকে খারাপ বলুক সেটা তারা চায় না। বরং যে খারাপ বলে তার বিরুদ্ধে সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করে। একজন বাস মালিক বলল, দুর্নীতিবাজদের দাফটের কাছে আমাকে হার মানতে হয়েছে এবং ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হয়েছে। প্রথমে বাসের হেলপার দুর্নীতি করত সেটা ঠেকাতে চালকের সাহায্য নিলাম। কিছুদিন পর সে চালকও তার দুর্নীতির অংশীদার হল। তারপর পরিদর্শক নিয়োগ করলাম, কিছুদিন পর সেও দুর্নীতির অংশ পেল ও দুর্নীতি শুরু করল। তাদের দুর্নীতি বন্ধ করতে পরিদর্শকের পরিদর্শক নিয়োগ করলাম, কিছুদিন সেও দুর্নীতির অংশ পেল ও সবাই মিলে দুর্নীতি করল। ফলে আগে একজন দুর্নীতি করার পরও যতটুকু আয় পেতাম এখন দুর্নীতির অংশীদার একাধিক হওয়াতে ততটুকুও পাচ্ছি না। একপর্যায়ে দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের কাছে হার মেনে ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম। এভাবেই দুর্নীতিবাজরা চায় সবাই দুর্নীতি করুক, নচেৎ সবাই মিলে তার বিরোধিতা করে তাকে পরাজিত করবে।
তাই মন্দকে মন্দ বলা ও মন্দ কাজে বাধা দেওয়া ইমানী দায়িত্ব ও একজন মুসলমানের গুণ। তবে খারাপ কাজকে ন¤্র উপায়ে দমন করতে হবে। একবার এক সাহাবী রা. রাসূল সা.-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার একটি সন্তান হয়েছে তবে সেটি কালো অথচ আমরা ফর্সা। তাই আমার সন্দেহ, আমার স্ত্রীর অন্য কারো সাথে অবৈধ সম্পর্ক আছে। রাসূল সা. তার উপর রাগ হয়ে তাকে থাপ্পড় দেননি বা তার এ খারাপ সন্দেহকে কঠোর উপায়ে দমন করেননি। রাসূল সা. ন¤্র ভাষায় বলছেন, আচ্ছা! তোমার কি কোন উট আছে? সে বলল, হাঁ, আছে। তোমার উটের রং কি? সে বলল লাল। রাসূল সা. আবার বললেন, তোমার এই উটের কোন বাচ্চা কি কালো আছে। সে বলল, হাঁ। রাসূল সা. বললেন, উট লাল অথচ তার বাচ্চা কালো হল কিভাবে। সে বলল, এ উটের বংশে কোন কালো উট ছিল তার প্রভাবে হয়েছে। রাসূল সা. তখন বললেন, এরকমই তোমার এ ছেলেটিও তোমার বংশে কেউ কালো ছিল তার প্রভাবে কালো হয়েছে। [বুখারী শারীফ : ৪৯১৯] সে সাহাবীর সকল সন্দেহ দূরীভূত হয়ে গেল এবং খুশি মনে আপন বাড়িতে ফিরে গেল। রাসূল সা. ন¤্র উপায়ে এতবড় একটি পাপ (সতী নারীকে অপবাদ দেয়া) দমন করলেন যা কখনো কঠোর উপায়ে সম্ভব হত না।
রাসূল সা. সাধারণত মন্দকে ন¤্র উপায়ে দমন করতেন। তবে কঠোরতা দরকার হলে রাসূল সা. দরকার-পরিমাণ কঠোরতা অবলম্বন করতেন। রাসূল সা.-এর সাধারণ কঠোরতা প্রদর্শন হল তাঁর চেহারা লাল হয়ে যাওয়া। সাহাবাগণ বলেন, রাসূল সা.এর চেহারা যখন লাল হয়ে যেত আমরা বুঝে ফেলতাম রাসূল সা. কোন কারণে রাগ করেছেন। হযরত আয়েশা রা. বলেন, একবার একটি ছবি সম্বলিত কার্পেট ক্রয় করে আমার কক্ষে বিছালাম। রাসূল সা. যখন আমার বাসায় আসলেন তখন দরজার সামনে দাড়িয়ে রইলেন এবং প্রবেশ করছেন না। আমি রাসূল সা. এর দিকে তাকিয়ে দেখি, ওনার চেহারা লাল হয়ে গেছে তখন বুঝতে পারলাম আমার কোন ভুল হয়েছে। তখনই আমি বললাম, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আমার কোন অপরাধ হয়ে গেলে একটু বলে দেন। রাসূল সা. তখন বললেন, এটা কেমন কার্পেট? কোথা থেকে পেয়েছ এটা? তিনি বললেন, আমি এটা ক্রয় করেছি যাতে আপনি এটার উপর বসতে পারেন। রাসূল সা. বললেন, ছবিওয়ালাদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে আর বলা হবে,এই ছবির মধ্যে জীবন দান কর। রাসূল সা. বলেন, যে বাসায় ছবি থাকে সে বাসায় ফেরেশতা প্রবেশ করে না। [মুসনাদুর রাবী’ : ২৭৫; বুখারী শারীফ : ৭০২৬ ] তুমি ছবিওয়ালা এই কার্পেট বাসায় বিছিয়েছ অথচ ছবিওয়ালাদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে। এভাবে রাসূল সা. যখনই কোন অন্যায় বা অপরাধ দেখে রাগ ও কঠোর হতেন তখন তার চেহারা দেখেই সাহাবাগণ বুঝে ফেলতেন।
তাবুকের যুদ্ধের সময়ে সাহাবাগণের উদ্দেশে আদেশ হল, সকলকে তাবুকের যুদ্ধে যেতে হবে। সকল মুসলমান সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তখন প্রচ- গরম ও বার্ষিক ফসল কাটার সময় ছিল। তাই মুনাফিকরা বিভিন্ন ছল-চাতুরি করে ও মিথ্যা অজুহাত দিয়ে সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। তিনজন মুসলমান ‘আজ যাব’ ‘কাল যাব’ করে তারাও আর সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তার মধ্যে একজন ছিলেন হযরত কা’ব বিন মালিক রা.। তিনি বলেন, রাসূল সা. যখন তাবূক যুদ্ধ থেকে ফেরত এলেন তখন আমি রাসূল সা. এর কাছে আসলাম। রাসূল সা. আমাকে দেখে একটু রাগের হাসি হাসলেন। রাসূল সা. অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন, তবে তা হাসি দ্বারা। হযরত উবাই রা. বলেন, রাসূল সা. যখন আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন তখন আমি বুঝতে পেরেছি যে এ হাসি রাগের হাসি, খুশির হাসি না। রাসূল সা. আমাকে বললেন, তুমি পিছনে কেন রয়ে গেলে। আমি বললাম, অজুহাত ও যুক্তি উপস্থাপন করে আপনাকে খুশি করার উদ্দেশ্য থাকলে আমি আপনাকে মিথ্যা অজুহাত ও মিথ্যা যুক্তি উপস্থাপন করতে পারতাম। কিন্তু আমি জানি, আপনি সত্য নবী। আপনার সাথে মিথ্যা বললে আগামীকাল  আল্লাহ তাআলা সব সত্য আপনার কাছে প্রকাশ করে দেবেন। আর আমি যদি সত্য কথা বলি তবে হয়ত আল্লাহ তায়ালা আমাকে ক্ষমা করবেন এবং আল্লাহ আপনাকেও আমার ব্যাপারে সন্তুষ্ট করিয়ে দিবেন। হে আল্লাহর রাসূল! তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার কোন গ্রহণযোগ্য কারণ আমার ছিল না। রাসূল সা. বললেন, এই ব্যক্তি সত্য বলেছে। তবে তুমি এখন যাও যতক্ষণ না আল্লাহ তাআলা আমাদের মাঝে ফয়সালা না করেন। রাসূল সা. অন্যায়ের প্রতিবাদ ন¤্র উপায়ে হাসিমুখে করছেন। তবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছেন না। রাসূল সা. তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তাকে আলাদা থাকতে বললেন। সেই সাহাবী প্রায় ৫০ দিন সকল মুসলমানের কাছ থেকে বয়কটে ছিলেন। দীর্ঘ বয়কটের শাস্তি ভোগ করার পর অবশেষে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের তাওবা কবুল হওয়ার ঘোষণা আসে। [বুখারী শারীফ : ৪১৫৬]
হযরত হাতেব বিন বুলতাআ’ রা. মুসলিম জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। মুসলমানগণের মক্কা অভিযানের পরিকল্পনার খবর গোপনে এক মহিলার মাধ্যমে মক্কার কুরাইশদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেন। আল্লাহ তায়ালা এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর রাসূল সা.-কে জানিয়ে দেন। তখন রাসূল সা. হযরত আলী ও একজন সাহাবীকে পাঠালেন আর বললেন, মক্কার পথে ওমুক স্থানে একজন মহিলার কাছে একটি চিঠি আছে সেটা নিয়ে আসবে। সে স্থানে গিয়ে সে মহিলাকে পেয়ে তার কাছে থাকা চিঠি দিতে বললে সে মহিলা অস্বীকার করে। তখন হযরত আলী রা. বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমার কাছেই চিঠি আছে। যদি তুমি আপোসে না দাও তবে আমরা শক্তি প্রয়োগ করে নিতে বাধ্য হব। তখন সে মহিলা চিঠি বের করে দেয়। তারা সেই চিঠি রাসূল সা.এর কাছে নিয়ে এলেন। হযরত ওমর রা. এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর শুনে তলোয়ার বের করে রাসূল সা.-এর কাছে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দেন আমি বিশ্বাসঘাতক হাতেবের মাথা কেটে ফেলি। রাসূল সা. এত বড় অন্যায়কে কিভাবে দমন করেছেন? কঠোরভাবে না ন¤্রভাবে? রাসূল সা. বললেন, থামো হে ওমর! তুমি কি জান সে বদরী সাহাবী। আর আল্লাহ তাআলা বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল সাহাবার পূর্বের ও পরের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। হযরত হাতেব বিন বুলতাআ’ রা, বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি মুনাফিক হইনি। মক্কায় সকলের আত্মীয়-স্বজন আছে আর আমার কোন আত্মীয়-স্বজন নেই। তাই মক্কায় রয়ে যাওয়া আমার পরিবার ও ছেলেমেয়েদের নিরাপত্তার জন্য কোন অভিভাবক নেই। তাই আমি চেয়েছিলাম যে, আমি মক্কার কাফেরদেরকে গোপন পরিকল্পনার খবর দিয়ে উপকার করব যাতে তারা আমার পরিবারের উপর কোন নির্যাতন না চালায় ও বিপদের সময়ে আমার পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ায়। রাসূল সা. তার ওজর গ্রহণ করলেন এবং তাকে কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করেন নি। [(ঘটনার অর্থ) বুখারী শারীফ : ২৮০১]
বনু নাজীর গোত্রের দুর্গকে যখন মুসলমানগণ ঘেরাও করে রাখেন তখন বনু নাজীর গোত্রের সন্ত্রাসীদেরকে দ- দেয়া ও দুর্বলদেরকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যখন মুসলমানগণ তাদের সাথে কথাবার্তা বলছেন তখন আব্দুল্লাহ বিন মুনজির রা. বনু নাজিরের ইহুদীদেরকে ইশারা করে বললেন, যদি তোমরা আত্মসমর্পণে আস তবে তোমাদেরকে দ- দেয়া হবে তাই তোমরা আত্মসমর্পণ কর না। পরক্ষণেই হযরত আব্দুল্লাহ বিন মুনজির রা.-এর সুমতি ফিরে আসে এবং রাসূল সা.-এর কাছে গিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। আমাকে ক্ষমা করুন এবং তিনি নিজেকে মসজিদের খুঁটির সাথে বেঁধে ফেলেন এবং বলেন, রাসূল সা. যতক্ষণ আমাকে ক্ষমা করে আমার বাঁধন না খুলবেন আমি এভাবে বন্দি থাকব। রাসূল সা. তাকেও ক্ষমা করে দেন।
অনেক সময় অনেকে বলে, ভাল ব্যবহার কার সাথে করব? সে আমার সাথে শত্রুতা পোষণ করে তার সাথে শক্তি প্রদর্শন না করলে সে আরো বেশি শত্রুতা দেখাবে। যে আমাকে আঘাত করে তার সাথে কিভাবে ন¤্র ব্যবহার করব? ওমাইর ইবনে ওহাব মক্কায় নির্জনে বসে সাফওয়ান বিন মুআত্তালের সাথে বলছে, আমার ইচ্ছা হয়, মুহাম্মাদ সা. কে হত্যা করতে তবে আমার কিছু ঋণ আছে ও আমার পরিবারের ভরণ পোষণ করতে হয় তাই কোন ঝুঁকি নিতে পারছি না। তখন সাফওয়ান বিন মুআত্তাল বলল, আমি তোমার ঋণ পরিশোধ ও তোমার পরিবারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিচ্ছি। যাও মুহাম্মাদ সা.-কে হত্যা করে আস। তখন ওমাইর রাসূল সা.-কে হত্যার উদ্দেশ্যে মদীনায় পৌছল। রাসূল সা.-কে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, ওমাইর আপনাকে হত্য করতে এসেছে এবং বিনিময়ে সাফওয়ান তার ঋণ ও তার পরিবারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। রাসূল সা. যখন জেনেছেন তখন কি ওমাইরকে ধরার জন্য ও তার হাত থেকে বাঁচার পূর্ব সতর্কতাস্বরূপ তার উপর আক্রমণ করেছেন? না তাকে বন্দি করেছেন? কী করেছেন তার সাথে? আমরা এমন আক্রমণকারী শত্রুর সাথে কী করি। ওমাইর মদিনায় এসে খোলা তালোয়ার নিয়ে রাসূল সা.-কে খুঁজছে। হযরত ওমর রা. ওমাইর এর সন্দেহজনক ঘুরাফেরা দেখে তাকে ধরে রাসূল সা.-এর কাছে নিয়ে আসেন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দেন, আমরা ইসলামের এই শত্রুকে শায়েস্তা করি। রাসূল সা. বললেন, হে ওমর! তাকে আমার কাছে আসতে দাও ও তার তালোয়ার তার কাছে দাও। রাসূল সা. তাকে হাসিমুখে স্বাগত জানালেন ও বললেন, হে ওমাইর! তোমার তলোয়ার তোমার কাঁধে নিয়ে ঘুরছ কেন? সে ছলনা করে বলছে, হা, এই তলোয়ারই আমাদের সম্পর্ক নষ্ট করেছে। তারপর রাসূল সা. বললেন, তুমি মদিনায় কেন এসেছ? সে বলল, আমার ছেলে ওহাব আটক হয়েছে তাকে ছাড়াতে এসেছি। রাসূল সা. তখন বললেন, সত্য কথা বল। সে বলল, না, আল্লাহর শপথ! আমি এ জন্যই এসেছি। তখন রাসূল সা. বলেন, তুমি কি ওমুক স্থানে সাফওয়ানের সাথে বসে আমাকে হত্যা করতে ষড়যন্ত্র করনি? বিনিময়ে সাফওয়ান তোমার ঋণ ও তোমার পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছে। তখন সাফওয়ান বলল, আল্লাহর শপথ! আমি যখন সাফওয়ানের সাথে এ আলোচনা করি তখন আমি আর সে ছাড়া আর কেউ ছিল না। নিশ্চয় যে আল্লাহকে আমরা অস্বীকার করছি সেই আল্লাহই আপনাকে এসব জানিয়েছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর সত্য নবী। [তাবরানী শারীফ : ১৩৬০৪]  তিনি তো একজন ভাল মানুষ ছিলেন ও কল্যাণকামী ছিলেন এবং আমাদের মত এরকম ধর্ম মেনেছেন ও দেব-দেবীর পূজা করেছেন। যখন তর্কের সময় কেউ কাউকে তিরস্কার করতে চায় তখন এমনই বলে যে, আপনি এমন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ঝগড়া-বিবাদ করছেন অথচ আপনার বাবাতো অনেক ভাল মানুষ ছিলেন। প্রতি উত্তরে তখন রাসূল সা. বললেন, হে হুসাইন! আমার বাবা এবং তোমার বাবা উভয়ের অবস্থানই জাহান্নামে। অর্থাৎ আমার বাবা ও তোমার বাবা সকলে ভুল করেছে তাই এখন তারা জাহান্নামে। তারা ভুল করেছে বলে আমরা সেটাকে ভুল বলব না বা তাদের মত ভুল আমরাও করব, এটাতো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। রাসূল সা.-এর বাবা ভুল করেছেন বলে রাসূল সা. সেটাকে ভুল বলবেন না সেটাতো কখনো সম্ভব না। যেমন আমাদের সমাজে আইন অন্যের জন্য আমার জন্য নয়। আমি ভুল করলে বা আমার পরিবার বা আমার দল ভুল করলে সেটাকে ভুল বলতে আমরা রাজি নই; বরং সে ভুলকে সঠিক সাব্যস্ত করতে আমরা হাজারো ছলচাতুরি করে থাকি। রাসূল সা. এভাবে তার সাথে বুদ্ধিভিত্তিক খোলামেলা আলোচনা করছেন এবং জিজ্ঞাসা করছেন, হে হুসাইন! আপনি কতজন দেবীর পূজা করেন? সে বলল, সাতজনের, তার মধ্যে ছয়জন পৃথিবীতে এবং একজন আকাশে। রাসূল সা.বললেন, যখন আপনার বিপদ হয় (যখন আপনি নৌকায় যাচ্ছেন আর সমুদ্রে ঝড় ওঠে) তখন কাকে ডাকেন? সে বলল, আকাশের খোদাকে ডাকি। যখন আপনার মসিবত আসে তখন কাকে ডাকেন? সে বলল, আকাশের আল্লাহকে ডাকি। আপনি পৃথিবীর দেবতাগুলোকে সুখের সময় ডাকেন আর বিপদের সময়ে তাদেরকে ডাকেন না এটা কি যুক্তির কথা? এটা কি বুদ্ধিমানের কাজ? আর বিপদের সময় আকাশের আল্লাহকে ডাকেন আর সুখের সময় সর্বদা তাকে ডাকেন না এটা কি বুদ্ধিমানের কাজ? যাকে আপনি বিপদের সময় ডাকেন তাকে তো সুখের সময় আরো বেশী করে ডাকাটাই তো বুদ্ধিমানের কাজ ছিল। তখন সে রাসূল সা.-এর সামনে বলল, আমি এরকম যুক্তির কথা আর কখনো শুনিনি। রাসূল সা. তখন সুযোগ পেয়ে বললেন, আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন তবে আপনি নিরাপদ থাকবেন ও শান্তি পেয়ে যাবেন। সে বলল, আমার সাথে আমার বংশ আছে। আমিতো একা ইসলাম গ্রহণ করতে পারি না। রাসূল সা. তখন বললেন, তাহলে কমপক্ষে এতটুকু করুন যে আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, হে আল্লাহ আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। সে বলল, হ্যাঁ, এটাতো বলতে পারি। রাসূল সা.-এর সাথে এরকম উম্মুক্ত সংলাপ ও খোলামেলা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা করতে করতে হযরত হুসাইনের মন গলে গেল এবং ইসলামই যে সঠিক পথ তা নিঃসন্দেহে বুঝতে পারলেন। তখন রাসূল সা.-এর সামনে তিনি ঘোষণা করলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ এক ও তার কোন শরীক নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল ও নবী। [তিরমিজী শারীফ : ৩৪৭৯] এই হুসাইন বিন আবীদের এক ছেলে ইমরান বিন হুসাইন আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তার বাবা যখন কাফের আর ইসলামের ক্ষতি করতে ও রাসূল সা.-কে তিরস্কার করতে এসেছিল সে তখন সে মজলিসেই ছিল। কিন্তু সে তার বাবার জন্য দাঁড়ায়নি, সালাম দেয়নি এবং তাকে না চেনার ভান করেছিল। অথচ তার বাবা যখন ইসলাম গ্রহণ করল তখন উপস্থিত সকলের মধ্যে সর্বপ্রথম তার ছেলে ইমরান তার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে বাবার কাছে গিয়ে বাবার কপালে, হাতে ও বুকে চুম্বন করল। রাসূল সা. এ দৃশ্য দেখে কেঁদে ফেললেন। সাহাবার জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কাঁদছেন কেন? রাসূল সা. বললেন, এই বৃদ্ধ যখন এল তখন তার ছেলে তার দিকে তাকায়নি আর এখন যখন সে ইসলাম গ্রহণ করেছে তখন তার ছেলে তাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করছে। আমি ছেলে ও তার বাবার মায়া দেখে কাঁদছি। রাসূল সা. তার সম্মানার্থে সকল সাহাবাদেরকে আদেশ করলেন যে, তোমরা এই বুদ্ধিজীবী বৃদ্ধকে তার বাসায় এগিয়ে দিয়ে আস। যখন তিনি রাসূল সা.-এর দরজা থেকে বের হলেন তখন তার অপেক্ষায় থাকা অন্যান্য কাফেররা দেখল যে তাদের প-িত ইসলাম গ্রহণ করেছে। তখন কি সকলে ইসলাম গ্রহণ করেছে? না। অহংকার মানুষকে অন্ধ করে ফেলে। তারা তাকে তিরস্কার করা শুরু করল আর বলল, তুমি এই বুড়া বয়সে বে-দীন হয়ে গেলে? তুমি ধর্মত্যাগী ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করা শুরু করল।
একজন মানুষ যখন ভাল কাজ করে তখন হাজারো মানুষ তার সে ভাল কাজে বাধা দিতে, তাকে তিরস্কার করতে দাঁড়িয়ে যায়। তখন সে ভাল কাজকে সমর্থন করা ও তার পাশে দাড়ানো সকল মুসলমানের ইমানী দায়িত্ব। রাসূল সা. বলেন, যখন তোমাদের কেউ কোন খারাপ কাজ দেখে তখন সে যেন তা হাত দ্বারা পরিবর্তন করে, যদি না পারে তবে যেন মুখ দ্বারা পরিবর্তন করে আর তাও যদি সম্ভব না হয় তবে যেন অন্তর দ্বারা ঘৃণা করে। খারাপ কাজকে ঘৃণা করা ও ভাল কাজকে পছন্দ করা সকলের ঈমানী দায়িত্ব। কেউ যদি খারাপ কাজকে ঘৃণা না করে তবে তার সামান্য ঈমানও থাকবে না।  রাসূল সা. বলেন, তোমরা ভাল কাজের আদেশ করতে থাক ও খারাপ কাজের নিষেধ করতে থাক। এমন একটা সময় হবে যখন কেউ ভাল কাজের আদেশ করবে না এবং খারাপ কাজের নিষেধ করবে না। সাহাবা কেরাম রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এমন কি হবে? তিনি বললেন, এমন তো হবেই বরং এর চেয়ে আরো বেশি খারাপ অবস্থা হবে। সাহাবাগণ বললেন, এর চেয়ে খারাপ অবস্থাটা কি? রাসূল সা. বললেন, মানুষজন ভাল কাজকে খারাপ মনে করবে আর খারাপ কাজকে ভাল মনে করবে। সাহাবাগণ বললেন, এমনটা কি হবে? রাসূল সা. বললেন, এর চেয়েও খারাপ অবস্থা হবে। (এমন এক যুগ আসবে যে, মানুষজন ভাল কাজ করতে নিষেধ করবে ও ভাল কাজ করতে বাধা দিবে এবং খারাপ কাজের আদেশ করবে ও খারাপ কাজ করতে উৎসাহ দিবে)। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি তাদেরকে এমন ফিতনা দিব যাতে সহনশীল ব্যক্তি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যাবেন। [ইবনে আবী দুনিয়া : ৩৩; মুসনাদে আবী ইয়ালা : ৬৩৮৪]
এজন্য হযরত সুফিয়ান রাহ. বলেন, যদি তুমি ভাল কাজের আদেশ করলে তবে তুমি মুমিনকে ও মুমিনের দলকে শক্তিশালী করলে। আর যদি খারাপ কাজকে খারাপ বললে তবে মুনাফিক-পাপীকে দুর্বল করলে। [মুসানদুল খাল্লাল : ৬৮]
সকল খারাপ মানুষ চায় সকল মানুষ তাদের মত খারাপ কাজ করুক আর ভাল মানুষ চায় সকল মানুষ তাদের মত ভাল কাজ করুক অথবা কমপক্ষে তাদের ভাল কাজকে সমর্থন করুক। ব্যভিচারী নির্লজ্জরা চায় সবাই তাদের মত বেলাল্লাপনা করুক। কোন হুজুর, ভদ্র মানুষ তাদের পরিবেশে আসুক তা তারা বরদাশত করে না এমনকি তাদেরকে মৌলবাদী, গ্রাম্য ইত্যাদি বলে গালমন্দ করে। মদখোররা চায় সবাই তাদের মত মদ খাক বা তাদের কাজকে আধুনিকতা ও সভ্যতা মনে করুক। তাদের মদ খাওয়াকে কেউ খারাপ বলবে সেটা তারা চায় না। যারা ঘুষ খায়, দুর্নীতি করে তারা চায় তার অফিসের সবাই দুর্নীতি করুক। কেউ তাদেরকে খারাপ বলুক সেটা তারা চায় না। বরং যে খারাপ বলে তার বিরুদ্ধে সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করে। একজন বাস মালিক বলল, দুর্নীতিবাজদের দাফটের কাছে আমাকে হার মানতে হয়েছে এবং ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হয়েছে। প্রথমে বাসের হেলপার দুর্নীতি করত সেটা ঠেকাতে চালকের সাহায্য নিলাম। কিছুদিন পর সে চালকও তার দুর্নীতির অংশীদার হল। তারপর পরিদর্শক নিয়োগ করলাম, কিছুদিন পর সেও দুর্নীতির অংশ পেল ও দুর্নীতি শুরু করল। তাদের দুর্নীতি বন্ধ করতে পরিদর্শকের পরিদর্শক নিয়োগ করলাম, কিছুদিন সেও দুর্নীতির অংশ পেল ও সবাই মিলে দুর্নীতি করল। ফলে আগে একজন দুর্নীতি করার পরও যতটুকু আয় পেতাম এখন দুর্নীতির অংশীদার একাধিক হওয়াতে ততটুকুও পাচ্ছি না। একপর্যায়ে দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের কাছে হার মেনে ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম। এভাবেই দুর্নীতিবাজরা চায় সবাই দুর্নীতি করুক, নচেৎ সবাই মিলে তার বিরোধিতা করে তাকে পরাজিত করবে।
তাই মন্দকে মন্দ বলা ও মন্দ কাজে বাধা দেওয়া ইমানী দায়িত্ব ও একজন মুসলমানের গুণ। তবে খারাপ কাজকে ন¤্র উপায়ে দমন করতে হবে। একবার এক সাহাবী রা. রাসূল সা.-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার একটি সন্তান হয়েছে তবে সেটি কালো অথচ আমরা ফর্সা। তাই আমার সন্দেহ, আমার স্ত্রীর অন্য কারো সাথে অবৈধ সম্পর্ক আছে। রাসূল সা. তার উপর রাগ হয়ে তাকে থাপ্পড় দেননি বা তার এ খারাপ সন্দেহকে কঠোর উপায়ে দমন করেননি। রাসূল সা. ন¤্র ভাষায় বলছেন, আচ্ছা! তোমার কি কোন উট আছে? সে বলল, হাঁ, আছে। তোমার উটের রং কি? সে বলল লাল। রাসূল সা. আবার বললেন, তোমার এই উটের কোন বাচ্চা কি কালো আছে। সে বলল, হাঁ। রাসূল সা. বললেন, উট লাল অথচ তার বাচ্চা কালো হল কিভাবে। সে বলল, এ উটের বংশে কোন কালো উট ছিল তার প্রভাবে হয়েছে। রাসূল সা. তখন বললেন, এরকমই তোমার এ ছেলেটিও তোমার বংশে কেউ কালো ছিল তার প্রভাবে কালো হয়েছে। [বুখারী শারীফ : ৪৯১৯] সে সাহাবীর সকল সন্দেহ দূরীভূত হয়ে গেল এবং খুশি মনে আপন বাড়িতে ফিরে গেল। রাসূল সা. ন¤্র উপায়ে এতবড় একটি পাপ (সতী নারীকে অপবাদ দেয়া) দমন করলেন যা কখনো কঠোর উপায়ে সম্ভব হত না।
রাসূল সা. সাধারণত মন্দকে ন¤্র উপায়ে দমন করতেন। তবে কঠোরতা দরকার হলে রাসূল সা. দরকার-পরিমাণ কঠোরতা অবলম্বন করতেন। রাসূল সা.-এর সাধারণ কঠোরতা প্রদর্শন হল তাঁর চেহারা লাল হয়ে যাওয়া। সাহাবাগণ বলেন, রাসূল সা.এর চেহারা যখন লাল হয়ে যেত আমরা বুঝে ফেলতাম রাসূল সা. কোন কারণে রাগ করেছেন। হযরত আয়েশা রা. বলেন, একবার একটি ছবি সম্বলিত কার্পেট ক্রয় করে আমার কক্ষে বিছালাম। রাসূল সা. যখন আমার বাসায় আসলেন তখন দরজার সামনে দাড়িয়ে রইলেন এবং প্রবেশ করছেন না। আমি রাসূল সা. এর দিকে তাকিয়ে দেখি, ওনার চেহারা লাল হয়ে গেছে তখন বুঝতে পারলাম আমার কোন ভুল হয়েছে। তখনই আমি বললাম, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আমার কোন অপরাধ হয়ে গেলে একটু বলে দেন। রাসূল সা. তখন বললেন, এটা কেমন কার্পেট? কোথা থেকে পেয়েছ এটা? তিনি বললেন, আমি এটা ক্রয় করেছি যাতে আপনি এটার উপর বসতে পারেন। রাসূল সা. বললেন, ছবিওয়ালাদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে আর বলা হবে,এই ছবির মধ্যে জীবন দান কর। রাসূল সা. বলেন, যে বাসায় ছবি থাকে সে বাসায় ফেরেশতা প্রবেশ করে না। [মুসনাদুর রাবী’ : ২৭৫; বুখারী শারীফ : ৭০২৬ ] তুমি ছবিওয়ালা এই কার্পেট বাসায় বিছিয়েছ অথচ ছবিওয়ালাদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে। এভাবে রাসূল সা. যখনই কোন অন্যায় বা অপরাধ দেখে রাগ ও কঠোর হতেন তখন তার চেহারা দেখেই সাহাবাগণ বুঝে ফেলতেন।
তাবুকের যুদ্ধের সময়ে সাহাবাগণের উদ্দেশে আদেশ হল, সকলকে তাবুকের যুদ্ধে যেতে হবে। সকল মুসলমান সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তখন প্রচ- গরম ও বার্ষিক ফসল কাটার সময় ছিল। তাই মুনাফিকরা বিভিন্ন ছল-চাতুরি করে ও মিথ্যা অজুহাত দিয়ে সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। তিনজন মুসলমান ‘আজ যাব’ ‘কাল যাব’ করে তারাও আর সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তার মধ্যে একজন ছিলেন হযরত কা’ব বিন মালিক রা.। তিনি বলেন, রাসূল সা. যখন তাবূক যুদ্ধ থেকে ফেরত এলেন তখন আমি রাসূল সা. এর কাছে আসলাম। রাসূল সা. আমাকে দেখে একটু রাগের হাসি হাসলেন। রাসূল সা. অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন, তবে তা হাসি দ্বারা। হযরত উবাই রা. বলেন, রাসূল সা. যখন আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন তখন আমি বুঝতে পেরেছি যে এ হাসি রাগের হাসি, খুশির হাসি না। রাসূল সা. আমাকে বললেন, তুমি পিছনে কেন রয়ে গেলে। আমি বললাম, অজুহাত ও যুক্তি উপস্থাপন করে আপনাকে খুশি করার উদ্দেশ্য থাকলে আমি আপনাকে মিথ্যা অজুহাত ও মিথ্যা যুক্তি উপস্থাপন করতে পারতাম। কিন্তু আমি জানি, আপনি সত্য নবী। আপনার সাথে মিথ্যা বললে আগামীকাল  আল্লাহ তাআলা সব সত্য আপনার কাছে প্রকাশ করে দেবেন। আর আমি যদি সত্য কথা বলি তবে হয়ত আল্লাহ তায়ালা আমাকে ক্ষমা করবেন এবং আল্লাহ আপনাকেও আমার ব্যাপারে সন্তুষ্ট করিয়ে দিবেন। হে আল্লাহর রাসূল! তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার কোন গ্রহণযোগ্য কারণ আমার ছিল না। রাসূল সা. বললেন, এই ব্যক্তি সত্য বলেছে। তবে তুমি এখন যাও যতক্ষণ না আল্লাহ তাআলা আমাদের মাঝে ফয়সালা না করেন। রাসূল সা. অন্যায়ের প্রতিবাদ ন¤্র উপায়ে হাসিমুখে করছেন। তবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছেন না। রাসূল সা. তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তাকে আলাদা থাকতে বললেন। সেই সাহাবী প্রায় ৫০ দিন সকল মুসলমানের কাছ থেকে বয়কটে ছিলেন। দীর্ঘ বয়কটের শাস্তি ভোগ করার পর অবশেষে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের তাওবা কবুল হওয়ার ঘোষণা আসে। [বুখারী শারীফ : ৪১৫৬]
হযরত হাতেব বিন বুলতাআ’ রা. মুসলিম জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। মুসলমানগণের মক্কা অভিযানের পরিকল্পনার খবর গোপনে এক মহিলার মাধ্যমে মক্কার কুরাইশদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেন। আল্লাহ তায়ালা এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর রাসূল সা.-কে জানিয়ে দেন। তখন রাসূল সা. হযরত আলী ও একজন সাহাবীকে পাঠালেন আর বললেন, মক্কার পথে ওমুক স্থানে একজন মহিলার কাছে একটি চিঠি আছে সেটা নিয়ে আসবে। সে স্থানে গিয়ে সে মহিলাকে পেয়ে তার কাছে থাকা চিঠি দিতে বললে সে মহিলা অস্বীকার করে। তখন হযরত আলী রা. বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমার কাছেই চিঠি আছে। যদি তুমি আপোসে না দাও তবে আমরা শক্তি প্রয়োগ করে নিতে বাধ্য হব। তখন সে মহিলা চিঠি বের করে দেয়। তারা সেই চিঠি রাসূল সা.এর কাছে নিয়ে এলেন। হযরত ওমর রা. এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর শুনে তলোয়ার বের করে রাসূল সা.-এর কাছে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দেন আমি বিশ্বাসঘাতক হাতেবের মাথা কেটে ফেলি। রাসূল সা. এত বড় অন্যায়কে কিভাবে দমন করেছেন? কঠোরভাবে না ন¤্রভাবে? রাসূল সা. বললেন, থামো হে ওমর! তুমি কি জান সে বদরী সাহাবী। আর আল্লাহ তাআলা বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল সাহাবার পূর্বের ও পরের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। হযরত হাতেব বিন বুলতাআ’ রা, বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি মুনাফিক হইনি। মক্কায় সকলের আত্মীয়-স্বজন আছে আর আমার কোন আত্মীয়-স্বজন নেই। তাই মক্কায় রয়ে যাওয়া আমার পরিবার ও ছেলেমেয়েদের নিরাপত্তার জন্য কোন অভিভাবক নেই। তাই আমি চেয়েছিলাম যে, আমি মক্কার কাফেরদেরকে গোপন পরিকল্পনার খবর দিয়ে উপকার করব যাতে তারা আমার পরিবারের উপর কোন নির্যাতন না চালায় ও বিপদের সময়ে আমার পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ায়। রাসূল সা. তার ওজর গ্রহণ করলেন এবং তাকে কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করেন নি। [(ঘটনার অর্থ) বুখারী শারীফ : ২৮০১]
বনু নাজীর গোত্রের দুর্গকে যখন মুসলমানগণ ঘেরাও করে রাখেন তখন বনু নাজীর গোত্রের সন্ত্রাসীদেরকে দ- দেয়া ও দুর্বলদেরকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যখন মুসলমানগণ তাদের সাথে কথাবার্তা বলছেন তখন আব্দুল্লাহ বিন মুনজির রা. বনু নাজিরের ইহুদীদেরকে ইশারা করে বললেন, যদি তোমরা আত্মসমর্পণে আস তবে তোমাদেরকে দ- দেয়া হবে তাই তোমরা আত্মসমর্পণ কর না। পরক্ষণেই হযরত আব্দুল্লাহ বিন মুনজির রা.-এর সুমতি ফিরে আসে এবং রাসূল সা.-এর কাছে গিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। আমাকে ক্ষমা করুন এবং তিনি নিজেকে মসজিদের খুঁটির সাথে বেঁধে ফেলেন এবং বলেন, রাসূল সা. যতক্ষণ আমাকে ক্ষমা করে আমার বাঁধন না খুলবেন আমি এভাবে বন্দি থাকব। রাসূল সা. তাকেও ক্ষমা করে দেন।
অনেক সময় অনেকে বলে, ভাল ব্যবহার কার সাথে করব? সে আমার সাথে শত্রুতা পোষণ করে তার সাথে শক্তি প্রদর্শন না করলে সে আরো বেশি শত্রুতা দেখাবে। যে আমাকে আঘাত করে তার সাথে কিভাবে ন¤্র ব্যবহার করব? ওমাইর ইবনে ওহাব মক্কায় নির্জনে বসে সাফওয়ান বিন মুআত্তালের সাথে বলছে, আমার ইচ্ছা হয়, মুহাম্মাদ সা. কে হত্যা করতে তবে আমার কিছু ঋণ আছে ও আমার পরিবারের ভরণ পোষণ করতে হয় তাই কোন ঝুঁকি নিতে পারছি না। তখন সাফওয়ান বিন মুআত্তাল বলল, আমি তোমার ঋণ পরিশোধ ও তোমার পরিবারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিচ্ছি। যাও মুহাম্মাদ সা.-কে হত্যা করে আস। তখন ওমাইর রাসূল সা.-কে হত্যার উদ্দেশ্যে মদীনায় পৌছল। রাসূল সা.-কে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, ওমাইর আপনাকে হত্য করতে এসেছে এবং বিনিময়ে সাফওয়ান তার ঋণ ও তার পরিবারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। রাসূল সা. যখন জেনেছেন তখন কি ওমাইরকে ধরার জন্য ও তার হাত থেকে বাঁচার পূর্ব সতর্কতাস্বরূপ তার উপর আক্রমণ করেছেন? না তাকে বন্দি করেছেন? কী করেছেন তার সাথে? আমরা এমন আক্রমণকারী শত্রুর সাথে কী করি। ওমাইর মদিনায় এসে খোলা তালোয়ার নিয়ে রাসূল সা.-কে খুঁজছে। হযরত ওমর রা. ওমাইর এর সন্দেহজনক ঘুরাফেরা দেখে তাকে ধরে রাসূল সা.-এর কাছে নিয়ে আসেন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দেন, আমরা ইসলামের এই শত্রুকে শায়েস্তা করি। রাসূল সা. বললেন, হে ওমর! তাকে আমার কাছে আসতে দাও ও তার তালোয়ার তার কাছে দাও। রাসূল সা. তাকে হাসিমুখে স্বাগত জানালেন ও বললেন, হে ওমাইর! তোমার তলোয়ার তোমার কাঁধে নিয়ে ঘুরছ কেন? সে ছলনা করে বলছে, হা, এই তলোয়ারই আমাদের সম্পর্ক নষ্ট করেছে। তারপর রাসূল সা. বললেন, তুমি মদিনায় কেন এসেছ? সে বলল, আমার ছেলে ওহাব আটক হয়েছে তাকে ছাড়াতে এসেছি। রাসূল সা. তখন বললেন, সত্য কথা বল। সে বলল, না, আল্লাহর শপথ! আমি এ জন্যই এসেছি। তখন রাসূল সা. বলেন, তুমি কি ওমুক স্থানে সাফওয়ানের সাথে বসে আমাকে হত্যা করতে ষড়যন্ত্র করনি? বিনিময়ে সাফওয়ান তোমার ঋণ ও তোমার পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছে। তখন সাফওয়ান বলল, আল্লাহর শপথ! আমি যখন সাফওয়ানের সাথে এ আলোচনা করি তখন আমি আর সে ছাড়া আর কেউ ছিল না। নিশ্চয় যে আল্লাহকে আমরা অস্বীকার করছি সেই আল্লাহই আপনাকে এসব জানিয়েছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর সত্য নবী। [তাবরানী শারীফ : ১৩৬০৪]  তিনি তো একজন ভাল মানুষ ছিলেন ও কল্যাণকামী ছিলেন এবং আমাদের মত এরকম ধর্ম মেনেছেন ও দেব-দেবীর পূজা করেছেন। যখন তর্কের সময় কেউ কাউকে তিরস্কার করতে চায় তখন এমনই বলে যে, আপনি এমন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ঝগড়া-বিবাদ করছেন অথচ আপনার বাবাতো অনেক ভাল মানুষ ছিলেন। প্রতি উত্তরে তখন রাসূল সা. বললেন, হে হুসাইন! আমার বাবা এবং তোমার বাবা উভয়ের অবস্থানই জাহান্নামে। অর্থাৎ আমার বাবা ও তোমার বাবা সকলে ভুল করেছে তাই এখন তারা জাহান্নামে। তারা ভুল করেছে বলে আমরা সেটাকে ভুল বলব না বা তাদের মত ভুল আমরাও করব, এটাতো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। রাসূল সা.-এর বাবা ভুল করেছেন বলে রাসূল সা. সেটাকে ভুল বলবেন না সেটাতো কখনো সম্ভব না। যেমন আমাদের সমাজে আইন অন্যের জন্য আমার জন্য নয়। আমি ভুল করলে বা আমার পরিবার বা আমার দল ভুল করলে সেটাকে ভুল বলতে আমরা রাজি নই; বরং সে ভুলকে সঠিক সাব্যস্ত করতে আমরা হাজারো ছলচাতুরি করে থাকি। রাসূল সা. এভাবে তার সাথে বুদ্ধিভিত্তিক খোলামেলা আলোচনা করছেন এবং জিজ্ঞাসা করছেন, হে হুসাইন! আপনি কতজন দেবীর পূজা করেন? সে বলল, সাতজনের, তার মধ্যে ছয়জন পৃথিবীতে এবং একজন আকাশে। রাসূল সা.বললেন, যখন আপনার বিপদ হয় (যখন আপনি নৌকায় যাচ্ছেন আর সমুদ্রে ঝড় ওঠে) তখন কাকে ডাকেন? সে বলল, আকাশের খোদাকে ডাকি। যখন আপনার মসিবত আসে তখন কাকে ডাকেন? সে বলল, আকাশের আল্লাহকে ডাকি। আপনি পৃথিবীর দেবতাগুলোকে সুখের সময় ডাকেন আর বিপদের সময়ে তাদেরকে ডাকেন না এটা কি যুক্তির কথা? এটা কি বুদ্ধিমানের কাজ? আর বিপদের সময় আকাশের আল্লাহকে ডাকেন আর সুখের সময় সর্বদা তাকে ডাকেন না এটা কি বুদ্ধিমানের কাজ? যাকে আপনি বিপদের সময় ডাকেন তাকে তো সুখের সময় আরো বেশী করে ডাকাটাই তো বুদ্ধিমানের কাজ ছিল। তখন সে রাসূল সা.-এর সামনে বলল, আমি এরকম যুক্তির কথা আর কখনো শুনিনি। রাসূল সা. তখন সুযোগ পেয়ে বললেন, আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন তবে আপনি নিরাপদ থাকবেন ও শান্তি পেয়ে যাবেন। সে বলল, আমার সাথে আমার বংশ আছে। আমিতো একা ইসলাম গ্রহণ করতে পারি না। রাসূল সা. তখন বললেন, তাহলে কমপক্ষে এতটুকু করুন যে আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, হে আল্লাহ আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। সে বলল, হ্যাঁ, এটাতো বলতে পারি। রাসূল সা.-এর সাথে এরকম উম্মুক্ত সংলাপ ও খোলামেলা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা করতে করতে হযরত হুসাইনের মন গলে গেল এবং ইসলামই যে সঠিক পথ তা নিঃসন্দেহে বুঝতে পারলেন। তখন রাসূল সা.-এর সামনে তিনি ঘোষণা করলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ এক ও তার কোন শরীক নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল ও নবী। [তিরমিজী শারীফ : ৩৪৭৯] এই হুসাইন বিন আবীদের এক ছেলে ইমরান বিন হুসাইন আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তার বাবা যখন কাফের আর ইসলামের ক্ষতি করতে ও রাসূল সা.-কে তিরস্কার করতে এসেছিল সে তখন সে মজলিসেই ছিল। কিন্তু সে তার বাবার জন্য দাঁড়ায়নি, সালাম দেয়নি এবং তাকে না চেনার ভান করেছিল। অথচ তার বাবা যখন ইসলাম গ্রহণ করল তখন উপস্থিত সকলের মধ্যে সর্বপ্রথম তার ছেলে ইমরান তার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে বাবার কাছে গিয়ে বাবার কপালে, হাতে ও বুকে চুম্বন করল। রাসূল সা. এ দৃশ্য দেখে কেঁদে ফেললেন। সাহাবার জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কাঁদছেন কেন? রাসূল সা. বললেন, এই বৃদ্ধ যখন এল তখন তার ছেলে তার দিকে তাকায়নি আর এখন যখন সে ইসলাম গ্রহণ করেছে তখন তার ছেলে তাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করছে। আমি ছেলে ও তার বাবার মায়া দেখে কাঁদছি। রাসূল সা. তার সম্মানার্থে সকল সাহাবাদেরকে আদেশ করলেন যে, তোমরা এই বুদ্ধিজীবী বৃদ্ধকে তার বাসায় এগিয়ে দিয়ে আস। যখন তিনি রাসূল সা.-এর দরজা থেকে বের হলেন তখন তার অপেক্ষায় থাকা অন্যান্য কাফেররা দেখল যে তাদের প-িত ইসলাম গ্রহণ করেছে। তখন কি সকলে ইসলাম গ্রহণ করেছে? না। অহংকার মানুষকে অন্ধ করে ফেলে। তারা তাকে তিরস্কার করা শুরু করল আর বলল, তুমি এই বুড়া বয়সে বে-দীন হয়ে গেলে? তুমি ধর্মত্যাগী ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করা শুরু করল।
একজন মানুষ যখন ভাল কাজ করে তখন হাজারো মানুষ তার সে ভাল কাজে বাধা দিতে, তাকে তিরস্কার করতে দাঁড়িয়ে যায়। তখন সে ভাল কাজকে সমর্থন করা ও তার পাশে দাড়ানো সকল মুসলমানের ইমানী দায়িত্ব। রাসূল সা. বলেন, যখন তোমাদের কেউ কোন খারাপ কাজ দেখে তখন সে যেন তা হাত দ্বারা পরিবর্তন করে, যদি না পারে তবে যেন মুখ দ্বারা পরিবর্তন করে আর তাও যদি সম্ভব না হয় তবে যেন অন্তর দ্বারা ঘৃণা করে। খারাপ কাজকে ঘৃণা করা ও ভাল কাজকে পছন্দ করা সকলের ঈমানী দায়িত্ব। কেউ যদি খারাপ কাজকে ঘৃণা না করে তবে তার সামান্য ঈমানও থাকবে না।  রাসূল সা. বলেন, তোমরা ভাল কাজের আদেশ করতে থাক ও খারাপ কাজের নিষেধ করতে থাক। এমন একটা সময় হবে যখন কেউ ভাল কাজের আদেশ করবে না এবং খারাপ কাজের নিষেধ করবে না। সাহাবা কেরাম রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এমন কি হবে? তিনি বললেন, এমন তো হবেই বরং এর চেয়ে আরো বেশি খারাপ অবস্থা হবে। সাহাবাগণ বললেন, এর চেয়ে খারাপ অবস্থাটা কি? রাসূল সা. বললেন, মানুষজন ভাল কাজকে খারাপ মনে করবে আর খারাপ কাজকে ভাল মনে করবে। সাহাবাগণ বললেন, এমনটা কি হবে? রাসূল সা. বললেন, এর চেয়েও খারাপ অবস্থা হবে। (এমন এক যুগ আসবে যে, মানুষজন ভাল কাজ করতে নিষেধ করবে ও ভাল কাজ করতে বাধা দিবে এবং খারাপ কাজের আদেশ করবে ও খারাপ কাজ করতে উৎসাহ দিবে)। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি তাদেরকে এমন ফিতনা দিব যাতে সহনশীল ব্যক্তি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যাবেন। [ইবনে আবী দুনিয়া : ৩৩; মুসনাদে আবী ইয়ালা : ৬৩৮৪]
এজন্য হযরত সুফিয়ান রাহ. বলেন, যদি তুমি ভাল কাজের আদেশ করলে তবে তুমি মুমিনকে ও মুমিনের দলকে শক্তিশালী করলে। আর যদি খারাপ কাজকে খারাপ বললে তবে মুনাফিক-পাপীকে দুর্বল করলে। [মুসানদুল খাল্লাল : ৬৮]
সকল খারাপ মানুষ চায় সকল মানুষ তাদের মত খারাপ কাজ করুক আর ভাল মানুষ চায় সকল মানুষ তাদের মত ভাল কাজ করুক অথবা কমপক্ষে তাদের ভাল কাজকে সমর্থন করুক। ব্যভিচারী নির্লজ্জরা চায় সবাই তাদের মত বেলাল্লাপনা করুক। কোন হুজুর, ভদ্র মানুষ তাদের পরিবেশে আসুক তা তারা বরদাশত করে না এমনকি তাদেরকে মৌলবাদী, গ্রাম্য ইত্যাদি বলে গালমন্দ করে। মদখোররা চায় সবাই তাদের মত মদ খাক বা তাদের কাজকে আধুনিকতা ও সভ্যতা মনে করুক। তাদের মদ খাওয়াকে কেউ খারাপ বলবে সেটা তারা চায় না। যারা ঘুষ খায়, দুর্নীতি করে তারা চায় তার অফিসের সবাই দুর্নীতি করুক। কেউ তাদেরকে খারাপ বলুক সেটা তারা চায় না। বরং যে খারাপ বলে তার বিরুদ্ধে সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করে। একজন বাস মালিক বলল, দুর্নীতিবাজদের দাফটের কাছে আমাকে হার মানতে হয়েছে এবং ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হয়েছে। প্রথমে বাসের হেলপার দুর্নীতি করত সেটা ঠেকাতে চালকের সাহায্য নিলাম। কিছুদিন পর সে চালকও তার দুর্নীতির অংশীদার হল। তারপর পরিদর্শক নিয়োগ করলাম, কিছুদিন পর সেও দুর্নীতির অংশ পেল ও দুর্নীতি শুরু করল। তাদের দুর্নীতি বন্ধ করতে পরিদর্শকের পরিদর্শক নিয়োগ করলাম, কিছুদিন সেও দুর্নীতির অংশ পেল ও সবাই মিলে দুর্নীতি করল। ফলে আগে একজন দুর্নীতি করার পরও যতটুকু আয় পেতাম এখন দুর্নীতির অংশীদার একাধিক হওয়াতে ততটুকুও পাচ্ছি না। একপর্যায়ে দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের কাছে হার মেনে ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম। এভাবেই দুর্নীতিবাজরা চায় সবাই দুর্নীতি করুক, নচেৎ সবাই মিলে তার বিরোধিতা করে তাকে পরাজিত করবে।
তাই মন্দকে মন্দ বলা ও মন্দ কাজে বাধা দেওয়া ইমানী দায়িত্ব ও একজন মুসলমানের গুণ। তবে খারাপ কাজকে ন¤্র উপায়ে দমন করতে হবে। একবার এক সাহাবী রা. রাসূল সা.-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার একটি সন্তান হয়েছে তবে সেটি কালো অথচ আমরা ফর্সা। তাই আমার সন্দেহ, আমার স্ত্রীর অন্য কারো সাথে অবৈধ সম্পর্ক আছে। রাসূল সা. তার উপর রাগ হয়ে তাকে থাপ্পড় দেননি বা তার এ খারাপ সন্দেহকে কঠোর উপায়ে দমন করেননি। রাসূল সা. ন¤্র ভাষায় বলছেন, আচ্ছা! তোমার কি কোন উট আছে? সে বলল, হাঁ, আছে। তোমার উটের রং কি? সে বলল লাল। রাসূল সা. আবার বললেন, তোমার এই উটের কোন বাচ্চা কি কালো আছে। সে বলল, হাঁ। রাসূল সা. বললেন, উট লাল অথচ তার বাচ্চা কালো হল কিভাবে। সে বলল, এ উটের বংশে কোন কালো উট ছিল তার প্রভাবে হয়েছে। রাসূল সা. তখন বললেন, এরকমই তোমার এ ছেলেটিও তোমার বংশে কেউ কালো ছিল তার প্রভাবে কালো হয়েছে। [বুখারী শারীফ : ৪৯১৯] সে সাহাবীর সকল সন্দেহ দূরীভূত হয়ে গেল এবং খুশি মনে আপন বাড়িতে ফিরে গেল। রাসূল সা. ন¤্র উপায়ে এতবড় একটি পাপ (সতী নারীকে অপবাদ দেয়া) দমন করলেন যা কখনো কঠোর উপায়ে সম্ভব হত না।
রাসূল সা. সাধারণত মন্দকে ন¤্র উপায়ে দমন করতেন। তবে কঠোরতা দরকার হলে রাসূল সা. দরকার-পরিমাণ কঠোরতা অবলম্বন করতেন। রাসূল সা.-এর সাধারণ কঠোরতা প্রদর্শন হল তাঁর চেহারা লাল হয়ে যাওয়া। সাহাবাগণ বলেন, রাসূল সা.এর চেহারা যখন লাল হয়ে যেত আমরা বুঝে ফেলতাম রাসূল সা. কোন কারণে রাগ করেছেন। হযরত আয়েশা রা. বলেন, একবার একটি ছবি সম্বলিত কার্পেট ক্রয় করে আমার কক্ষে বিছালাম। রাসূল সা. যখন আমার বাসায় আসলেন তখন দরজার সামনে দাড়িয়ে রইলেন এবং প্রবেশ করছেন না। আমি রাসূল সা. এর দিকে তাকিয়ে দেখি, ওনার চেহারা লাল হয়ে গেছে তখন বুঝতে পারলাম আমার কোন ভুল হয়েছে। তখনই আমি বললাম, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আমার কোন অপরাধ হয়ে গেলে একটু বলে দেন। রাসূল সা. তখন বললেন, এটা কেমন কার্পেট? কোথা থেকে পেয়েছ এটা? তিনি বললেন, আমি এটা ক্রয় করেছি যাতে আপনি এটার উপর বসতে পারেন। রাসূল সা. বললেন, ছবিওয়ালাদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে আর বলা হবে,এই ছবির মধ্যে জীবন দান কর। রাসূল সা. বলেন, যে বাসায় ছবি থাকে সে বাসায় ফেরেশতা প্রবেশ করে না। [মুসনাদুর রাবী’ : ২৭৫; বুখারী শারীফ : ৭০২৬ ] তুমি ছবিওয়ালা এই কার্পেট বাসায় বিছিয়েছ অথচ ছবিওয়ালাদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে। এভাবে রাসূল সা. যখনই কোন অন্যায় বা অপরাধ দেখে রাগ ও কঠোর হতেন তখন তার চেহারা দেখেই সাহাবাগণ বুঝে ফেলতেন।
তাবুকের যুদ্ধের সময়ে সাহাবাগণের উদ্দেশে আদেশ হল, সকলকে তাবুকের যুদ্ধে যেতে হবে। সকল মুসলমান সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তখন প্রচ- গরম ও বার্ষিক ফসল কাটার সময় ছিল। তাই মুনাফিকরা বিভিন্ন ছল-চাতুরি করে ও মিথ্যা অজুহাত দিয়ে সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। তিনজন মুসলমান ‘আজ যাব’ ‘কাল যাব’ করে তারাও আর সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তার মধ্যে একজন ছিলেন হযরত কা’ব বিন মালিক রা.। তিনি বলেন, রাসূল সা. যখন তাবূক যুদ্ধ থেকে ফেরত এলেন তখন আমি রাসূল সা. এর কাছে আসলাম। রাসূল সা. আমাকে দেখে একটু রাগের হাসি হাসলেন। রাসূল সা. অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন, তবে তা হাসি দ্বারা। হযরত উবাই রা. বলেন, রাসূল সা. যখন আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন তখন আমি বুঝতে পেরেছি যে এ হাসি রাগের হাসি, খুশির হাসি না। রাসূল সা. আমাকে বললেন, তুমি পিছনে কেন রয়ে গেলে। আমি বললাম, অজুহাত ও যুক্তি উপস্থাপন করে আপনাকে খুশি করার উদ্দেশ্য থাকলে আমি আপনাকে মিথ্যা অজুহাত ও মিথ্যা যুক্তি উপস্থাপন করতে পারতাম। কিন্তু আমি জানি, আপনি সত্য নবী। আপনার সাথে মিথ্যা বললে আগামীকাল  আল্লাহ তাআলা সব সত্য আপনার কাছে প্রকাশ করে দেবেন। আর আমি যদি সত্য কথা বলি তবে হয়ত আল্লাহ তায়ালা আমাকে ক্ষমা করবেন এবং আল্লাহ আপনাকেও আমার ব্যাপারে সন্তুষ্ট করিয়ে দিবেন। হে আল্লাহর রাসূল! তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার কোন গ্রহণযোগ্য কারণ আমার ছিল না। রাসূল সা. বললেন, এই ব্যক্তি সত্য বলেছে। তবে তুমি এখন যাও যতক্ষণ না আল্লাহ তাআলা আমাদের মাঝে ফয়সালা না করেন। রাসূল সা. অন্যায়ের প্রতিবাদ ন¤্র উপায়ে হাসিমুখে করছেন। তবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছেন না। রাসূল সা. তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তাকে আলাদা থাকতে বললেন। সেই সাহাবী প্রায় ৫০ দিন সকল মুসলমানের কাছ থেকে বয়কটে ছিলেন। দীর্ঘ বয়কটের শাস্তি ভোগ করার পর অবশেষে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের তাওবা কবুল হওয়ার ঘোষণা আসে। [বুখারী শারীফ : ৪১৫৬]
হযরত হাতেব বিন বুলতাআ’ রা. মুসলিম জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। মুসলমানগণের মক্কা অভিযানের পরিকল্পনার খবর গোপনে এক মহিলার মাধ্যমে মক্কার কুরাইশদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেন। আল্লাহ তায়ালা এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর রাসূল সা.-কে জানিয়ে দেন। তখন রাসূল সা. হযরত আলী ও একজন সাহাবীকে পাঠালেন আর বললেন, মক্কার পথে ওমুক স্থানে একজন মহিলার কাছে একটি চিঠি আছে সেটা নিয়ে আসবে। সে স্থানে গিয়ে সে মহিলাকে পেয়ে তার কাছে থাকা চিঠি দিতে বললে সে মহিলা অস্বীকার করে। তখন হযরত আলী রা. বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমার কাছেই চিঠি আছে। যদি তুমি আপোসে না দাও তবে আমরা শক্তি প্রয়োগ করে নিতে বাধ্য হব। তখন সে মহিলা চিঠি বের করে দেয়। তারা সেই চিঠি রাসূল সা.এর কাছে নিয়ে এলেন। হযরত ওমর রা. এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর শুনে তলোয়ার বের করে রাসূল সা.-এর কাছে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দেন আমি বিশ্বাসঘাতক হাতেবের মাথা কেটে ফেলি। রাসূল সা. এত বড় অন্যায়কে কিভাবে দমন করেছেন? কঠোরভাবে না ন¤্রভাবে? রাসূল সা. বললেন, থামো হে ওমর! তুমি কি জান সে বদরী সাহাবী। আর আল্লাহ তাআলা বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল সাহাবার পূর্বের ও পরের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। হযরত হাতেব বিন বুলতাআ’ রা, বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি মুনাফিক হইনি। মক্কায় সকলের আত্মীয়-স্বজন আছে আর আমার কোন আত্মীয়-স্বজন নেই। তাই মক্কায় রয়ে যাওয়া আমার পরিবার ও ছেলেমেয়েদের নিরাপত্তার জন্য কোন অভিভাবক নেই। তাই আমি চেয়েছিলাম যে, আমি মক্কার কাফেরদেরকে গোপন পরিকল্পনার খবর দিয়ে উপকার করব যাতে তারা আমার পরিবারের উপর কোন নির্যাতন না চালায় ও বিপদের সময়ে আমার পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ায়। রাসূল সা. তার ওজর গ্রহণ করলেন এবং তাকে কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করেন নি। [(ঘটনার অর্থ) বুখারী শারীফ : ২৮০১]
বনু নাজীর গোত্রের দুর্গকে যখন মুসলমানগণ ঘেরাও করে রাখেন তখন বনু নাজীর গোত্রের সন্ত্রাসীদেরকে দ- দেয়া ও দুর্বলদেরকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যখন মুসলমানগণ তাদের সাথে কথাবার্তা বলছেন তখন আব্দুল্লাহ বিন মুনজির রা. বনু নাজিরের ইহুদীদেরকে ইশারা করে বললেন, যদি তোমরা আত্মসমর্পণে আস তবে তোমাদেরকে দ- দেয়া হবে তাই তোমরা আত্মসমর্পণ কর না। পরক্ষণেই হযরত আব্দুল্লাহ বিন মুনজির রা.-এর সুমতি ফিরে আসে এবং রাসূল সা.-এর কাছে গিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। আমাকে ক্ষমা করুন এবং তিনি নিজেকে মসজিদের খুঁটির সাথে বেঁধে ফেলেন এবং বলেন, রাসূল সা. যতক্ষণ আমাকে ক্ষমা করে আমার বাঁধন না খুলবেন আমি এভাবে বন্দি থাকব। রাসূল সা. তাকেও ক্ষমা করে দেন।
অনেক সময় অনেকে বলে, ভাল ব্যবহার কার সাথে করব? সে আমার সাথে শত্রুতা পোষণ করে তার সাথে শক্তি প্রদর্শন না করলে সে আরো বেশি শত্রুতা দেখাবে। যে আমাকে আঘাত করে তার সাথে কিভাবে ন¤্র ব্যবহার করব? ওমাইর ইবনে ওহাব মক্কায় নির্জনে বসে সাফওয়ান বিন মুআত্তালের সাথে বলছে, আমার ইচ্ছা হয়, মুহাম্মাদ সা. কে হত্যা করতে তবে আমার কিছু ঋণ আছে ও আমার পরিবারের ভরণ পোষণ করতে হয় তাই কোন ঝুঁকি নিতে পারছি না। তখন সাফওয়ান বিন মুআত্তাল বলল, আমি তোমার ঋণ পরিশোধ ও তোমার পরিবারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিচ্ছি। যাও মুহাম্মাদ সা.-কে হত্যা করে আস। তখন ওমাইর রাসূল সা.-কে হত্যার উদ্দেশ্যে মদীনায় পৌছল। রাসূল সা.-কে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, ওমাইর আপনাকে হত্য করতে এসেছে এবং বিনিময়ে সাফওয়ান তার ঋণ ও তার পরিবারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। রাসূল সা. যখন জেনেছেন তখন কি ওমাইরকে ধরার জন্য ও তার হাত থেকে বাঁচার পূর্ব সতর্কতাস্বরূপ তার উপর আক্রমণ করেছেন? না তাকে বন্দি করেছেন? কী করেছেন তার সাথে? আমরা এমন আক্রমণকারী শত্রুর সাথে কী করি। ওমাইর মদিনায় এসে খোলা তালোয়ার নিয়ে রাসূল সা.-কে খুঁজছে। হযরত ওমর রা. ওমাইর এর সন্দেহজনক ঘুরাফেরা দেখে তাকে ধরে রাসূল সা.-এর কাছে নিয়ে আসেন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দেন, আমরা ইসলামের এই শত্রুকে শায়েস্তা করি। রাসূল সা. বললেন, হে ওমর! তাকে আমার কাছে আসতে দাও ও তার তালোয়ার তার কাছে দাও। রাসূল সা. তাকে হাসিমুখে স্বাগত জানালেন ও বললেন, হে ওমাইর! তোমার তলোয়ার তোমার কাঁধে নিয়ে ঘুরছ কেন? সে ছলনা করে বলছে, হা, এই তলোয়ারই আমাদের সম্পর্ক নষ্ট করেছে। তারপর রাসূল সা. বললেন, তুমি মদিনায় কেন এসেছ? সে বলল, আমার ছেলে ওহাব আটক হয়েছে তাকে ছাড়াতে এসেছি। রাসূল সা. তখন বললেন, সত্য কথা বল। সে বলল, না, আল্লাহর শপথ! আমি এ জন্যই এসেছি। তখন রাসূল সা. বলেন, তুমি কি ওমুক স্থানে সাফওয়ানের সাথে বসে আমাকে হত্যা করতে ষড়যন্ত্র করনি? বিনিময়ে সাফওয়ান তোমার ঋণ ও তোমার পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছে। তখন সাফওয়ান বলল, আল্লাহর শপথ! আমি যখন সাফওয়ানের সাথে এ আলোচনা করি তখন আমি আর সে ছাড়া আর কেউ ছিল না। নিশ্চয় যে আল্লাহকে আমরা অস্বীকার করছি সেই আল্লাহই আপনাকে এসব জানিয়েছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর সত্য নবী। [তাবরানী শারীফ : ১৩৬০৪]  তিনি তো একজন ভাল মানুষ ছিলেন ও কল্যাণকামী ছিলেন এবং আমাদের মত এরকম ধর্ম মেনেছেন ও দেব-দেবীর পূজা করেছেন। যখন তর্কের সময় কেউ কাউকে তিরস্কার করতে চায় তখন এমনই বলে যে, আপনি এমন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ঝগড়া-বিবাদ করছেন অথচ আপনার বাবাতো অনেক ভাল মানুষ ছিলেন। প্রতি উত্তরে তখন রাসূল সা. বললেন, হে হুসাইন! আমার বাবা এবং তোমার বাবা উভয়ের অবস্থানই জাহান্নামে। অর্থাৎ আমার বাবা ও তোমার বাবা সকলে ভুল করেছে তাই এখন তারা জাহান্নামে। তারা ভুল করেছে বলে আমরা সেটাকে ভুল বলব না বা তাদের মত ভুল আমরাও করব, এটাতো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। রাসূল সা.-এর বাবা ভুল করেছেন বলে রাসূল সা. সেটাকে ভুল বলবেন না সেটাতো কখনো সম্ভব না। যেমন আমাদের সমাজে আইন অন্যের জন্য আমার জন্য নয়। আমি ভুল করলে বা আমার পরিবার বা আমার দল ভুল করলে সেটাকে ভুল বলতে আমরা রাজি নই; বরং সে ভুলকে সঠিক সাব্যস্ত করতে আমরা হাজারো ছলচাতুরি করে থাকি। রাসূল সা. এভাবে তার সাথে বুদ্ধিভিত্তিক খোলামেলা আলোচনা করছেন এবং জিজ্ঞাসা করছেন, হে হুসাইন! আপনি কতজন দেবীর পূজা করেন? সে বলল, সাতজনের, তার মধ্যে ছয়জন পৃথিবীতে এবং একজন আকাশে। রাসূল সা.বললেন, যখন আপনার বিপদ হয় (যখন আপনি নৌকায় যাচ্ছেন আর সমুদ্রে ঝড় ওঠে) তখন কাকে ডাকেন? সে বলল, আকাশের খোদাকে ডাকি। যখন আপনার মসিবত আসে তখন কাকে ডাকেন? সে বলল, আকাশের আল্লাহকে ডাকি। আপনি পৃথিবীর দেবতাগুলোকে সুখের সময় ডাকেন আর বিপদের সময়ে তাদেরকে ডাকেন না এটা কি যুক্তির কথা? এটা কি বুদ্ধিমানের কাজ? আর বিপদের সময় আকাশের আল্লাহকে ডাকেন আর সুখের সময় সর্বদা তাকে ডাকেন না এটা কি বুদ্ধিমানের কাজ? যাকে আপনি বিপদের সময় ডাকেন তাকে তো সুখের সময় আরো বেশী করে ডাকাটাই তো বুদ্ধিমানের কাজ ছিল। তখন সে রাসূল সা.-এর সামনে বলল, আমি এরকম যুক্তির কথা আর কখনো শুনিনি। রাসূল সা. তখন সুযোগ পেয়ে বললেন, আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন তবে আপনি নিরাপদ থাকবেন ও শান্তি পেয়ে যাবেন। সে বলল, আমার সাথে আমার বংশ আছে। আমিতো একা ইসলাম গ্রহণ করতে পারি না। রাসূল সা. তখন বললেন, তাহলে কমপক্ষে এতটুকু করুন যে আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, হে আল্লাহ আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। সে বলল, হ্যাঁ, এটাতো বলতে পারি। রাসূল সা.-এর সাথে এরকম উম্মুক্ত সংলাপ ও খোলামেলা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা করতে করতে হযরত হুসাইনের মন গলে গেল এবং ইসলামই যে সঠিক পথ তা নিঃসন্দেহে বুঝতে পারলেন। তখন রাসূল সা.-এর সামনে তিনি ঘোষণা করলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ এক ও তার কোন শরীক নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল ও নবী। [তিরমিজী শারীফ : ৩৪৭৯] এই হুসাইন বিন আবীদের এক ছেলে ইমরান বিন হুসাইন আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তার বাবা যখন কাফের আর ইসলামের ক্ষতি করতে ও রাসূল সা.-কে তিরস্কার করতে এসেছিল সে তখন সে মজলিসেই ছিল। কিন্তু সে তার বাবার জন্য দাঁড়ায়নি, সালাম দেয়নি এবং তাকে না চেনার ভান করেছিল। অথচ তার বাবা যখন ইসলাম গ্রহণ করল তখন উপস্থিত সকলের মধ্যে সর্বপ্রথম তার ছেলে ইমরান তার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে বাবার কাছে গিয়ে বাবার কপালে, হাতে ও বুকে চুম্বন করল। রাসূল সা. এ দৃশ্য দেখে কেঁদে ফেললেন। সাহাবার জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কাঁদছেন কেন? রাসূল সা. বললেন, এই বৃদ্ধ যখন এল তখন তার ছেলে তার দিকে তাকায়নি আর এখন যখন সে ইসলাম গ্রহণ করেছে তখন তার ছেলে তাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করছে। আমি ছেলে ও তার বাবার মায়া দেখে কাঁদছি। রাসূল সা. তার সম্মানার্থে সকল সাহাবাদেরকে আদেশ করলেন যে, তোমরা এই বুদ্ধিজীবী বৃদ্ধকে তার বাসায় এগিয়ে দিয়ে আস। যখন তিনি রাসূল সা.-এর দরজা থেকে বের হলেন তখন তার অপেক্ষায় থাকা অন্যান্য কাফেররা দেখল যে তাদের প-িত ইসলাম গ্রহণ করেছে। তখন কি সকলে ইসলাম গ্রহণ করেছে? না। অহংকার মানুষকে অন্ধ করে ফেলে। তারা তাকে তিরস্কার করা শুরু করল আর বলল, তুমি এই বুড়া বয়সে বে-দীন হয়ে গেলে? তুমি ধর্মত্যাগী ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করা শুরু করল।
একজন মানুষ যখন ভাল কাজ করে তখন হাজারো মানুষ তার সে ভাল কাজে বাধা দিতে, তাকে তিরস্কার করতে দাঁড়িয়ে যায়। তখন সে ভাল কাজকে সমর্থন করা ও তার পাশে দাড়ানো সকল মুসলমানের ইমানী দায়িত্ব। রাসূল সা. বলেন, যখন তোমাদের কেউ কোন খারাপ কাজ দেখে তখন সে যেন তা হাত দ্বারা পরিবর্তন করে, যদি না পারে তবে যেন মুখ দ্বারা পরিবর্তন করে আর তাও যদি সম্ভব না হয় তবে যেন অন্তর দ্বারা ঘৃণা করে। খারাপ কাজকে ঘৃণা করা ও ভাল কাজকে পছন্দ করা সকলের ঈমানী দায়িত্ব। কেউ যদি খারাপ কাজকে ঘৃণা না করে তবে তার সামান্য ঈমানও থাকবে না।  রাসূল সা. বলেন, তোমরা ভাল কাজের আদেশ করতে থাক ও খারাপ কাজের নিষেধ করতে থাক। এমন একটা সময় হবে যখন কেউ ভাল কাজের আদেশ করবে না এবং খারাপ কাজের নিষেধ করবে না। সাহাবা কেরাম রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এমন কি হবে? তিনি বললেন, এমন তো হবেই বরং এর চেয়ে আরো বেশি খারাপ অবস্থা হবে। সাহাবাগণ বললেন, এর চেয়ে খারাপ অবস্থাটা কি? রাসূল সা. বললেন, মানুষজন ভাল কাজকে খারাপ মনে করবে আর খারাপ কাজকে ভাল মনে করবে। সাহাবাগণ বললেন, এমনটা কি হবে? রাসূল সা. বললেন, এর চেয়েও খারাপ অবস্থা হবে। (এমন এক যুগ আসবে যে, মানুষজন ভাল কাজ করতে নিষেধ করবে ও ভাল কাজ করতে বাধা দিবে এবং খারাপ কাজের আদেশ করবে ও খারাপ কাজ করতে উৎসাহ দিবে)। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি তাদেরকে এমন ফিতনা দিব যাতে সহনশীল ব্যক্তি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যাবেন। [ইবনে আবী দুনিয়া : ৩৩; মুসনাদে আবী ইয়ালা : ৬৩৮৪]
এজন্য হযরত সুফিয়ান রাহ. বলেন, যদি তুমি ভাল কাজের আদেশ করলে তবে তুমি মুমিনকে ও মুমিনের দলকে শক্তিশালী করলে। আর যদি খারাপ কাজকে খারাপ বললে তবে মুনাফিক-পাপীকে দুর্বল করলে। [মুসানদুল খাল্লাল : ৬৮]
সকল খারাপ মানুষ চায় সকল মানুষ তাদের মত খারাপ কাজ করুক আর ভাল মানুষ চায় সকল মানুষ তাদের মত ভাল কাজ করুক অথবা কমপক্ষে তাদের ভাল কাজকে সমর্থন করুক। ব্যভিচারী নির্লজ্জরা চায় সবাই তাদের মত বেলাল্লাপনা করুক। কোন হুজুর, ভদ্র মানুষ তাদের পরিবেশে আসুক তা তারা বরদাশত করে না এমনকি তাদেরকে মৌলবাদী, গ্রাম্য ইত্যাদি বলে গালমন্দ করে। মদখোররা চায় সবাই তাদের মত মদ খাক বা তাদের কাজকে আধুনিকতা ও সভ্যতা মনে করুক। তাদের মদ খাওয়াকে কেউ খারাপ বলবে সেটা তারা চায় না। যারা ঘুষ খায়, দুর্নীতি করে তারা চায় তার অফিসের সবাই দুর্নীতি করুক। কেউ তাদেরকে খারাপ বলুক সেটা তারা চায় না। বরং যে খারাপ বলে তার বিরুদ্ধে সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করে। একজন বাস মালিক বলল, দুর্নীতিবাজদের দাফটের কাছে আমাকে হার মানতে হয়েছে এবং ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হয়েছে। প্রথমে বাসের হেলপার দুর্নীতি করত সেটা ঠেকাতে চালকের সাহায্য নিলাম। কিছুদিন পর সে চালকও তার দুর্নীতির অংশীদার হল। তারপর পরিদর্শক নিয়োগ করলাম, কিছুদিন পর সেও দুর্নীতির অংশ পেল ও দুর্নীতি শুরু করল। তাদের দুর্নীতি বন্ধ করতে পরিদর্শকের পরিদর্শক নিয়োগ করলাম, কিছুদিন সেও দুর্নীতির অংশ পেল ও সবাই মিলে দুর্নীতি করল। ফলে আগে একজন দুর্নীতি করার পরও যতটুকু আয় পেতাম এখন দুর্নীতির অংশীদার একাধিক হওয়াতে ততটুকুও পাচ্ছি না। একপর্যায়ে দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের কাছে হার মেনে ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম। এভাবেই দুর্নীতিবাজরা চায় সবাই দুর্নীতি করুক, নচেৎ সবাই মিলে তার বিরোধিতা করে তাকে পরাজিত করবে।
তাই মন্দকে মন্দ বলা ও মন্দ কাজে বাধা দেওয়া ইমানী দায়িত্ব ও একজন মুসলমানের গুণ। তবে খারাপ কাজকে ন¤্র উপায়ে দমন করতে হবে। একবার এক সাহাবী রা. রাসূল সা.-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার একটি সন্তান হয়েছে তবে সেটি কালো অথচ আমরা ফর্সা। তাই আমার সন্দেহ, আমার স্ত্রীর অন্য কারো সাথে অবৈধ সম্পর্ক আছে। রাসূল সা. তার উপর রাগ হয়ে তাকে থাপ্পড় দেননি বা তার এ খারাপ সন্দেহকে কঠোর উপায়ে দমন করেননি। রাসূল সা. ন¤্র ভাষায় বলছেন, আচ্ছা! তোমার কি কোন উট আছে? সে বলল, হাঁ, আছে। তোমার উটের রং কি? সে বলল লাল। রাসূল সা. আবার বললেন, তোমার এই উটের কোন বাচ্চা কি কালো আছে। সে বলল, হাঁ। রাসূল সা. বললেন, উট লাল অথচ তার বাচ্চা কালো হল কিভাবে। সে বলল, এ উটের বংশে কোন কালো উট ছিল তার প্রভাবে হয়েছে। রাসূল সা. তখন বললেন, এরকমই তোমার এ ছেলেটিও তোমার বংশে কেউ কালো ছিল তার প্রভাবে কালো হয়েছে। [বুখারী শারীফ : ৪৯১৯] সে সাহাবীর সকল সন্দেহ দূরীভূত হয়ে গেল এবং খুশি মনে আপন বাড়িতে ফিরে গেল। রাসূল সা. ন¤্র উপায়ে এতবড় একটি পাপ (সতী নারীকে অপবাদ দেয়া) দমন করলেন যা কখনো কঠোর উপায়ে সম্ভব হত না।
রাসূল সা. সাধারণত মন্দকে ন¤্র উপায়ে দমন করতেন। তবে কঠোরতা দরকার হলে রাসূল সা. দরকার-পরিমাণ কঠোরতা অবলম্বন করতেন। রাসূল সা.-এর সাধারণ কঠোরতা প্রদর্শন হল তাঁর চেহারা লাল হয়ে যাওয়া। সাহাবাগণ বলেন, রাসূল সা.এর চেহারা যখন লাল হয়ে যেত আমরা বুঝে ফেলতাম রাসূল সা. কোন কারণে রাগ করেছেন। হযরত আয়েশা রা. বলেন, একবার একটি ছবি সম্বলিত কার্পেট ক্রয় করে আমার কক্ষে বিছালাম। রাসূল সা. যখন আমার বাসায় আসলেন তখন দরজার সামনে দাড়িয়ে রইলেন এবং প্রবেশ করছেন না। আমি রাসূল সা. এর দিকে তাকিয়ে দেখি, ওনার চেহারা লাল হয়ে গেছে তখন বুঝতে পারলাম আমার কোন ভুল হয়েছে। তখনই আমি বললাম, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আমার কোন অপরাধ হয়ে গেলে একটু বলে দেন। রাসূল সা. তখন বললেন, এটা কেমন কার্পেট? কোথা থেকে পেয়েছ এটা? তিনি বললেন, আমি এটা ক্রয় করেছি যাতে আপনি এটার উপর বসতে পারেন। রাসূল সা. বললেন, ছবিওয়ালাদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে আর বলা হবে,এই ছবির মধ্যে জীবন দান কর। রাসূল সা. বলেন, যে বাসায় ছবি থাকে সে বাসায় ফেরেশতা প্রবেশ করে না। [মুসনাদুর রাবী’ : ২৭৫; বুখারী শারীফ : ৭০২৬ ] তুমি ছবিওয়ালা এই কার্পেট বাসায় বিছিয়েছ অথচ ছবিওয়ালাদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে। এভাবে রাসূল সা. যখনই কোন অন্যায় বা অপরাধ দেখে রাগ ও কঠোর হতেন তখন তার চেহারা দেখেই সাহাবাগণ বুঝে ফেলতেন।
তাবুকের যুদ্ধের সময়ে সাহাবাগণের উদ্দেশে আদেশ হল, সকলকে তাবুকের যুদ্ধে যেতে হবে। সকল মুসলমান সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তখন প্রচ- গরম ও বার্ষিক ফসল কাটার সময় ছিল। তাই মুনাফিকরা বিভিন্ন ছল-চাতুরি করে ও মিথ্যা অজুহাত দিয়ে সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। তিনজন মুসলমান ‘আজ যাব’ ‘কাল যাব’ করে তারাও আর সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তার মধ্যে একজন ছিলেন হযরত কা’ব বিন মালিক রা.। তিনি বলেন, রাসূল সা. যখন তাবূক যুদ্ধ থেকে ফেরত এলেন তখন আমি রাসূল সা. এর কাছে আসলাম। রাসূল সা. আমাকে দেখে একটু রাগের হাসি হাসলেন। রাসূল সা. অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন, তবে তা হাসি দ্বারা। হযরত উবাই রা. বলেন, রাসূল সা. যখন আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন তখন আমি বুঝতে পেরেছি যে এ হাসি রাগের হাসি, খুশির হাসি না। রাসূল সা. আমাকে বললেন, তুমি পিছনে কেন রয়ে গেলে। আমি বললাম, অজুহাত ও যুক্তি উপস্থাপন করে আপনাকে খুশি করার উদ্দেশ্য থাকলে আমি আপনাকে মিথ্যা অজুহাত ও মিথ্যা যুক্তি উপস্থাপন করতে পারতাম। কিন্তু আমি জানি, আপনি সত্য নবী। আপনার সাথে মিথ্যা বললে আগামীকাল  আল্লাহ তাআলা সব সত্য আপনার কাছে প্রকাশ করে দেবেন। আর আমি যদি সত্য কথা বলি তবে হয়ত আল্লাহ তায়ালা আমাকে ক্ষমা করবেন এবং আল্লাহ আপনাকেও আমার ব্যাপারে সন্তুষ্ট করিয়ে দিবেন। হে আল্লাহর রাসূল! তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার কোন গ্রহণযোগ্য কারণ আমার ছিল না। রাসূল সা. বললেন, এই ব্যক্তি সত্য বলেছে। তবে তুমি এখন যাও যতক্ষণ না আল্লাহ তাআলা আমাদের মাঝে ফয়সালা না করেন। রাসূল সা. অন্যায়ের প্রতিবাদ ন¤্র উপায়ে হাসিমুখে করছেন। তবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছেন না। রাসূল সা. তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তাকে আলাদা থাকতে বললেন। সেই সাহাবী প্রায় ৫০ দিন সকল মুসলমানের কাছ থেকে বয়কটে ছিলেন। দীর্ঘ বয়কটের শাস্তি ভোগ করার পর অবশেষে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের তাওবা কবুল হওয়ার ঘোষণা আসে। [বুখারী শারীফ : ৪১৫৬]
হযরত হাতেব বিন বুলতাআ’ রা. মুসলিম জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। মুসলমানগণের মক্কা অভিযানের পরিকল্পনার খবর গোপনে এক মহিলার মাধ্যমে মক্কার কুরাইশদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেন। আল্লাহ তায়ালা এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর রাসূল সা.-কে জানিয়ে দেন। তখন রাসূল সা. হযরত আলী ও একজন সাহাবীকে পাঠালেন আর বললেন, মক্কার পথে ওমুক স্থানে একজন মহিলার কাছে একটি চিঠি আছে সেটা নিয়ে আসবে। সে স্থানে গিয়ে সে মহিলাকে পেয়ে তার কাছে থাকা চিঠি দিতে বললে সে মহিলা অস্বীকার করে। তখন হযরত আলী রা. বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমার কাছেই চিঠি আছে। যদি তুমি আপোসে না দাও তবে আমরা শক্তি প্রয়োগ করে নিতে বাধ্য হব। তখন সে মহিলা চিঠি বের করে দেয়। তারা সেই চিঠি রাসূল সা.এর কাছে নিয়ে এলেন। হযরত ওমর রা. এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর শুনে তলোয়ার বের করে রাসূল সা.-এর কাছে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দেন আমি বিশ্বাসঘাতক হাতেবের মাথা কেটে ফেলি। রাসূল সা. এত বড় অন্যায়কে কিভাবে দমন করেছেন? কঠোরভাবে না ন¤্রভাবে? রাসূল সা. বললেন, থামো হে ওমর! তুমি কি জান সে বদরী সাহাবী। আর আল্লাহ তাআলা বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল সাহাবার পূর্বের ও পরের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। হযরত হাতেব বিন বুলতাআ’ রা, বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি মুনাফিক হইনি। মক্কায় সকলের আত্মীয়-স্বজন আছে আর আমার কোন আত্মীয়-স্বজন নেই। তাই মক্কায় রয়ে যাওয়া আমার পরিবার ও ছেলেমেয়েদের নিরাপত্তার জন্য কোন অভিভাবক নেই। তাই আমি চেয়েছিলাম যে, আমি মক্কার কাফেরদেরকে গোপন পরিকল্পনার খবর দিয়ে উপকার করব যাতে তারা আমার পরিবারের উপর কোন নির্যাতন না চালায় ও বিপদের সময়ে আমার পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ায়। রাসূল সা. তার ওজর গ্রহণ করলেন এবং তাকে কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করেন নি। [(ঘটনার অর্থ) বুখারী শারীফ : ২৮০১]
বনু নাজীর গোত্রের দুর্গকে যখন মুসলমানগণ ঘেরাও করে রাখেন তখন বনু নাজীর গোত্রের সন্ত্রাসীদেরকে দ- দেয়া ও দুর্বলদেরকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যখন মুসলমানগণ তাদের সাথে কথাবার্তা বলছেন তখন আব্দুল্লাহ বিন মুনজির রা. বনু নাজিরের ইহুদীদেরকে ইশারা করে বললেন, যদি তোমরা আত্মসমর্পণে আস তবে তোমাদেরকে দ- দেয়া হবে তাই তোমরা আত্মসমর্পণ কর না। পরক্ষণেই হযরত আব্দুল্লাহ বিন মুনজির রা.-এর সুমতি ফিরে আসে এবং রাসূল সা.-এর কাছে গিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। আমাকে ক্ষমা করুন এবং তিনি নিজেকে মসজিদের খুঁটির সাথে বেঁধে ফেলেন এবং বলেন, রাসূল সা. যতক্ষণ আমাকে ক্ষমা করে আমার বাঁধন না খুলবেন আমি এভাবে বন্দি থাকব। রাসূল সা. তাকেও ক্ষমা করে দেন।
অনেক সময় অনেকে বলে, ভাল ব্যবহার কার সাথে করব? সে আমার সাথে শত্রুতা পোষণ করে তার সাথে শক্তি প্রদর্শন না করলে সে আরো বেশি শত্রুতা দেখাবে। যে আমাকে আঘাত করে তার সাথে কিভাবে ন¤্র ব্যবহার করব? ওমাইর ইবনে ওহাব মক্কায় নির্জনে বসে সাফওয়ান বিন মুআত্তালের সাথে বলছে, আমার ইচ্ছা হয়, মুহাম্মাদ সা. কে হত্যা করতে তবে আমার কিছু ঋণ আছে ও আমার পরিবারের ভরণ পোষণ করতে হয় তাই কোন ঝুঁকি নিতে পারছি না। তখন সাফওয়ান বিন মুআত্তাল বলল, আমি তোমার ঋণ পরিশোধ ও তোমার পরিবারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিচ্ছি। যাও মুহাম্মাদ সা.-কে হত্যা করে আস। তখন ওমাইর রাসূল সা.-কে হত্যার উদ্দেশ্যে মদীনায় পৌছল। রাসূল সা.-কে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, ওমাইর আপনাকে হত্য করতে এসেছে এবং বিনিময়ে সাফওয়ান তার ঋণ ও তার পরিবারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। রাসূল সা. যখন জেনেছেন তখন কি ওমাইরকে ধরার জন্য ও তার হাত থেকে বাঁচার পূর্ব সতর্কতাস্বরূপ তার উপর আক্রমণ করেছেন? না তাকে বন্দি করেছেন? কী করেছেন তার সাথে? আমরা এমন আক্রমণকারী শত্রুর সাথে কী করি। ওমাইর মদিনায় এসে খোলা তালোয়ার নিয়ে রাসূল সা.-কে খুঁজছে। হযরত ওমর রা. ওমাইর এর সন্দেহজনক ঘুরাফেরা দেখে তাকে ধরে রাসূল সা.-এর কাছে নিয়ে আসেন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দেন, আমরা ইসলামের এই শত্রুকে শায়েস্তা করি। রাসূল সা. বললেন, হে ওমর! তাকে আমার কাছে আসতে দাও ও তার তালোয়ার তার কাছে দাও। রাসূল সা. তাকে হাসিমুখে স্বাগত জানালেন ও বললেন, হে ওমাইর! তোমার তলোয়ার তোমার কাঁধে নিয়ে ঘুরছ কেন? সে ছলনা করে বলছে, হা, এই তলোয়ারই আমাদের সম্পর্ক নষ্ট করেছে। তারপর রাসূল সা. বললেন, তুমি মদিনায় কেন এসেছ? সে বলল, আমার ছেলে ওহাব আটক হয়েছে তাকে ছাড়াতে এসেছি। রাসূল সা. তখন বললেন, সত্য কথা বল। সে বলল, না, আল্লাহর শপথ! আমি এ জন্যই এসেছি। তখন রাসূল সা. বলেন, তুমি কি ওমুক স্থানে সাফওয়ানের সাথে বসে আমাকে হত্যা করতে ষড়যন্ত্র করনি? বিনিময়ে সাফওয়ান তোমার ঋণ ও তোমার পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছে। তখন সাফওয়ান বলল, আল্লাহর শপথ! আমি যখন সাফওয়ানের সাথে এ আলোচনা করি তখন আমি আর সে ছাড়া আর কেউ ছিল না। নিশ্চয় যে আল্লাহকে আমরা অস্বীকার করছি সেই আল্লাহই আপনাকে এসব জানিয়েছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর সত্য নবী। [তাবরানী শারীফ : ১৩৬০৪]  তিনি তো একজন ভাল মানুষ ছিলেন ও কল্যাণকামী ছিলেন এবং আমাদের মত এরকম ধর্ম মেনেছেন ও দেব-দেবীর পূজা করেছেন। যখন তর্কের সময় কেউ কাউকে তিরস্কার করতে চায় তখন এমনই বলে যে, আপনি এমন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ঝগড়া-বিবাদ করছেন অথচ আপনার বাবাতো অনেক ভাল মানুষ ছিলেন। প্রতি উত্তরে তখন রাসূল সা. বললেন, হে হুসাইন! আমার বাবা এবং তোমার বাবা উভয়ের অবস্থানই জাহান্নামে। অর্থাৎ আমার বাবা ও তোমার বাবা সকলে ভুল করেছে তাই এখন তারা জাহান্নামে। তারা ভুল করেছে বলে আমরা সেটাকে ভুল বলব না বা তাদের মত ভুল আমরাও করব, এটাতো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। রাসূল সা.-এর বাবা ভুল করেছেন বলে রাসূল সা. সেটাকে ভুল বলবেন না সেটাতো কখনো সম্ভব না। যেমন আমাদের সমাজে আইন অন্যের জন্য আমার জন্য নয়। আমি ভুল করলে বা আমার পরিবার বা আমার দল ভুল করলে সেটাকে ভুল বলতে আমরা রাজি নই; বরং সে ভুলকে সঠিক সাব্যস্ত করতে আমরা হাজারো ছলচাতুরি করে থাকি। রাসূল সা. এভাবে তার সাথে বুদ্ধিভিত্তিক খোলামেলা আলোচনা করছেন এবং জিজ্ঞাসা করছেন, হে হুসাইন! আপনি কতজন দেবীর পূজা করেন? সে বলল, সাতজনের, তার মধ্যে ছয়জন পৃথিবীতে এবং একজন আকাশে। রাসূল সা.বললেন, যখন আপনার বিপদ হয় (যখন আপনি নৌকায় যাচ্ছেন আর সমুদ্রে ঝড় ওঠে) তখন কাকে ডাকেন? সে বলল, আকাশের খোদাকে ডাকি। যখন আপনার মসিবত আসে তখন কাকে ডাকেন? সে বলল, আকাশের আল্লাহকে ডাকি। আপনি পৃথিবীর দেবতাগুলোকে সুখের সময় ডাকেন আর বিপদের সময়ে তাদেরকে ডাকেন না এটা কি যুক্তির কথা? এটা কি বুদ্ধিমানের কাজ? আর বিপদের সময় আকাশের আল্লাহকে ডাকেন আর সুখের সময় সর্বদা তাকে ডাকেন না এটা কি বুদ্ধিমানের কাজ? যাকে আপনি বিপদের সময় ডাকেন তাকে তো সুখের সময় আরো বেশী করে ডাকাটাই তো বুদ্ধিমানের কাজ ছিল। তখন সে রাসূল সা.-এর সামনে বলল, আমি এরকম যুক্তির কথা আর কখনো শুনিনি। রাসূল সা. তখন সুযোগ পেয়ে বললেন, আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন তবে আপনি নিরাপদ থাকবেন ও শান্তি পেয়ে যাবেন। সে বলল, আমার সাথে আমার বংশ আছে। আমিতো একা ইসলাম গ্রহণ করতে পারি না। রাসূল সা. তখন বললেন, তাহলে কমপক্ষে এতটুকু করুন যে আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, হে আল্লাহ আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। সে বলল, হ্যাঁ, এটাতো বলতে পারি। রাসূল সা.-এর সাথে এরকম উম্মুক্ত সংলাপ ও খোলামেলা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা করতে করতে হযরত হুসাইনের মন গলে গেল এবং ইসলামই যে সঠিক পথ তা নিঃসন্দেহে বুঝতে পারলেন। তখন রাসূল সা.-এর সামনে তিনি ঘোষণা করলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ এক ও তার কোন শরীক নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসূল ও নবী। [তিরমিজী শারীফ : ৩৪৭৯] এই হুসাইন বিন আবীদের এক ছেলে ইমরান বিন হুসাইন আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তার বাবা যখন কাফের আর ইসলামের ক্ষতি করতে ও রাসূল সা.-কে তিরস্কার করতে এসেছিল সে তখন সে মজলিসেই ছিল। কিন্তু সে তার বাবার জন্য দাঁড়ায়নি, সালাম দেয়নি এবং তাকে না চেনার ভান করেছিল। অথচ তার বাবা যখন ইসলাম গ্রহণ করল তখন উপস্থিত সকলের মধ্যে সর্বপ্রথম তার ছেলে ইমরান তার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে বাবার কাছে গিয়ে বাবার কপালে, হাতে ও বুকে চুম্বন করল। রাসূল সা. এ দৃশ্য দেখে কেঁদে ফেললেন। সাহাবার জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কাঁদছেন কেন? রাসূল সা. বললেন, এই বৃদ্ধ যখন এল তখন তার ছেলে তার দিকে তাকায়নি আর এখন যখন সে ইসলাম গ্রহণ করেছে তখন তার ছেলে তাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করছে। আমি ছেলে ও তার বাবার মায়া দেখে কাঁদছি। রাসূল সা. তার সম্মানার্থে সকল সাহাবাদেরকে আদেশ করলেন যে, তোমরা এই বুদ্ধিজীবী বৃদ্ধকে তার বাসায় এগিয়ে দিয়ে আস। যখন তিনি রাসূল সা.-এর দরজা থেকে বের হলেন তখন তার অপেক্ষায় থাকা অন্যান্য কাফেররা দেখল যে তাদের প-িত ইসলাম গ্রহণ করেছে। তখন কি সকলে ইসলাম গ্রহণ করেছে? না। অহংকার মানুষকে অন্ধ করে ফেলে। তারা তাকে তিরস্কার করা শুরু করল আর বলল, তুমি এই বুড়া বয়সে বে-দীন হয়ে গেলে? তুমি ধর্মত্যাগী ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করা শুরু করল।
একজন মানুষ যখন ভাল কাজ করে তখন হাজারো মানুষ তার সে ভাল কাজে বাধা দিতে, তাকে তিরস্কার করতে দাঁড়িয়ে যায়। তখন সে ভাল কাজকে সমর্থন করা ও তার পাশে দাড়ানো সকল মুসলমানের ইমানী দায়িত্ব। রাসূল সা. বলেন, যখন তোমাদের কেউ কোন খারাপ কাজ দেখে তখন সে যেন তা হাত দ্বারা পরিবর্তন করে, যদি না পারে তবে যেন মুখ দ্বারা পরিবর্তন করে আর তাও যদি সম্ভব না হয় তবে যেন অন্তর দ্বারা ঘৃণা করে। খারাপ কাজকে ঘৃণা করা ও ভাল কাজকে পছন্দ করা সকলের ঈমানী দায়িত্ব। কেউ যদি খারাপ কাজকে ঘৃণা না করে তবে তার সামান্য ঈমানও থাকবে না।  রাসূল সা. বলেন, তোমরা ভাল কাজের আদেশ করতে থাক ও খারাপ কাজের নিষেধ করতে থাক। এমন একটা সময় হবে যখন কেউ ভাল কাজের আদেশ করবে না এবং খারাপ কাজের নিষেধ করবে না। সাহাবা কেরাম রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এমন কি হবে? তিনি বললেন, এমন তো হবেই বরং এর চেয়ে আরো বেশি খারাপ অবস্থা হবে। সাহাবাগণ বললেন, এর চেয়ে খারাপ অবস্থাটা কি? রাসূল সা. বললেন, মানুষজন ভাল কাজকে খারাপ মনে করবে আর খারাপ কাজকে ভাল মনে করবে। সাহাবাগণ বললেন, এমনটা কি হবে? রাসূল সা. বললেন, এর চেয়েও খারাপ অবস্থা হবে। (এমন এক যুগ আসবে যে, মানুষজন ভাল কাজ করতে নিষেধ করবে ও ভাল কাজ করতে বাধা দিবে এবং খারাপ কাজের আদেশ করবে ও খারাপ কাজ করতে উৎসাহ দিবে)। আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি তাদেরকে এমন ফিতনা দিব যাতে সহনশীল ব্যক্তি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যাবেন। [ইবনে আবী দুনিয়া : ৩৩; মুসনাদে আবী ইয়ালা : ৬৩৮৪]
এজন্য হযরত সুফিয়ান রাহ. বলেন, যদি তুমি ভাল কাজের আদেশ করলে তবে তুমি মুমিনকে ও মুমিনের দলকে শক্তিশালী করলে। আর যদি খারাপ কাজকে খারাপ বললে তবে মুনাফিক-পাপীকে দুর্বল করলে। [মুসানদুল খাল্লাল : ৬৮]
সকল খারাপ মানুষ চায় সকল মানুষ তাদের মত খারাপ কাজ করুক আর ভাল মানুষ চায় সকল মানুষ তাদের মত ভাল কাজ করুক অথবা কমপক্ষে তাদের ভাল কাজকে সমর্থন করুক। ব্যভিচারী নির্লজ্জরা চায় সবাই তাদের মত বেলাল্লাপনা করুক। কোন হুজুর, ভদ্র মানুষ তাদের পরিবেশে আসুক তা তারা বরদাশত করে না এমনকি তাদেরকে মৌলবাদী, গ্রাম্য ইত্যাদি বলে গালমন্দ করে। মদখোররা চায় সবাই তাদের মত মদ খাক বা তাদের কাজকে আধুনিকতা ও সভ্যতা মনে করুক। তাদের মদ খাওয়াকে কেউ খারাপ বলবে সেটা তারা চায় না। যারা ঘুষ খায়, দুর্নীতি করে তারা চায় তার অফিসের সবাই দুর্নীতি করুক। কেউ তাদেরকে খারাপ বলুক সেটা তারা চায় না। বরং যে খারাপ বলে তার বিরুদ্ধে সবাই মিলে ষড়যন্ত্র করে। একজন বাস মালিক বলল, দুর্নীতিবাজদের দাফটের কাছে আমাকে হার মানতে হয়েছে এবং ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে হয়েছে। প্রথমে বাসের হেলপার দুর্নীতি করত সেটা ঠেকাতে চালকের সাহায্য নিলাম। কিছুদিন পর সে চালকও তার দুর্নীতির অংশীদার হল। তারপর পরিদর্শক নিয়োগ করলাম, কিছুদিন পর সেও দুর্নীতির অংশ পেল ও দুর্নীতি শুরু করল। তাদের দুর্নীতি বন্ধ করতে পরিদর্শকের পরিদর্শক নিয়োগ করলাম, কিছুদিন সেও দুর্নীতির অংশ পেল ও সবাই মিলে দুর্নীতি করল। ফলে আগে একজন দুর্নীতি করার পরও যতটুকু আয় পেতাম এখন দুর্নীতির অংশীদার একাধিক হওয়াতে ততটুকুও পাচ্ছি না। একপর্যায়ে দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের কাছে হার মেনে ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম। এভাবেই দুর্নীতিবাজরা চায় সবাই দুর্নীতি করুক, নচেৎ সবাই মিলে তার বিরোধিতা করে তাকে পরাজিত করবে।
তাই মন্দকে মন্দ বলা ও মন্দ কাজে বাধা দেওয়া ইমানী দায়িত্ব ও একজন মুসলমানের গুণ। তবে খারাপ কাজকে ন¤্র উপায়ে দমন করতে হবে। একবার এক সাহাবী রা. রাসূল সা.-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার একটি সন্তান হয়েছে তবে সেটি কালো অথচ আমরা ফর্সা। তাই আমার সন্দেহ, আমার স্ত্রীর অন্য কারো সাথে অবৈধ সম্পর্ক আছে। রাসূল সা. তার উপর রাগ হয়ে তাকে থাপ্পড় দেননি বা তার এ খারাপ সন্দেহকে কঠোর উপায়ে দমন করেননি। রাসূল সা. ন¤্র ভাষায় বলছেন, আচ্ছা! তোমার কি কোন উট আছে? সে বলল, হাঁ, আছে। তোমার উটের রং কি? সে বলল লাল। রাসূল সা. আবার বললেন, তোমার এই উটের কোন বাচ্চা কি কালো আছে। সে বলল, হাঁ। রাসূল সা. বললেন, উট লাল অথচ তার বাচ্চা কালো হল কিভাবে। সে বলল, এ উটের বংশে কোন কালো উট ছিল তার প্রভাবে হয়েছে। রাসূল সা. তখন বললেন, এরকমই তোমার এ ছেলেটিও তোমার বংশে কেউ কালো ছিল তার প্রভাবে কালো হয়েছে। [বুখারী শারীফ : ৪৯১৯] সে সাহাবীর সকল সন্দেহ দূরীভূত হয়ে গেল এবং খুশি মনে আপন বাড়িতে ফিরে গেল। রাসূল সা. ন¤্র উপায়ে এতবড় একটি পাপ (সতী নারীকে অপবাদ দেয়া) দমন করলেন যা কখনো কঠোর উপায়ে সম্ভব হত না।
রাসূল সা. সাধারণত মন্দকে ন¤্র উপায়ে দমন করতেন। তবে কঠোরতা দরকার হলে রাসূল সা. দরকার-পরিমাণ কঠোরতা অবলম্বন করতেন। রাসূল সা.-এর সাধারণ কঠোরতা প্রদর্শন হল তাঁর চেহারা লাল হয়ে যাওয়া। সাহাবাগণ বলেন, রাসূল সা.এর চেহারা যখন লাল হয়ে যেত আমরা বুঝে ফেলতাম রাসূল সা. কোন কারণে রাগ করেছেন। হযরত আয়েশা রা. বলেন, একবার একটি ছবি সম্বলিত কার্পেট ক্রয় করে আমার কক্ষে বিছালাম। রাসূল সা. যখন আমার বাসায় আসলেন তখন দরজার সামনে দাড়িয়ে রইলেন এবং প্রবেশ করছেন না। আমি রাসূল সা. এর দিকে তাকিয়ে দেখি, ওনার চেহারা লাল হয়ে গেছে তখন বুঝতে পারলাম আমার কোন ভুল হয়েছে। তখনই আমি বললাম, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আমার কোন অপরাধ হয়ে গেলে একটু বলে দেন। রাসূল সা. তখন বললেন, এটা কেমন কার্পেট? কোথা থেকে পেয়েছ এটা? তিনি বললেন, আমি এটা ক্রয় করেছি যাতে আপনি এটার উপর বসতে পারেন। রাসূল সা. বললেন, ছবিওয়ালাদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে আর বলা হবে,এই ছবির মধ্যে জীবন দান কর। রাসূল সা. বলেন, যে বাসায় ছবি থাকে সে বাসায় ফেরেশতা প্রবেশ করে না। [মুসনাদুর রাবী’ : ২৭৫; বুখারী শারীফ : ৭০২৬ ] তুমি ছবিওয়ালা এই কার্পেট বাসায় বিছিয়েছ অথচ ছবিওয়ালাদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে। এভাবে রাসূল সা. যখনই কোন অন্যায় বা অপরাধ দেখে রাগ ও কঠোর হতেন তখন তার চেহারা দেখেই সাহাবাগণ বুঝে ফেলতেন।
তাবুকের যুদ্ধের সময়ে সাহাবাগণের উদ্দেশে আদেশ হল, সকলকে তাবুকের যুদ্ধে যেতে হবে। সকল মুসলমান সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তখন প্রচ- গরম ও বার্ষিক ফসল কাটার সময় ছিল। তাই মুনাফিকরা বিভিন্ন ছল-চাতুরি করে ও মিথ্যা অজুহাত দিয়ে সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। তিনজন মুসলমান ‘আজ যাব’ ‘কাল যাব’ করে তারাও আর সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তার মধ্যে একজন ছিলেন হযরত কা’ব বিন মালিক রা.। তিনি বলেন, রাসূল সা. যখন তাবূক যুদ্ধ থেকে ফেরত এলেন তখন আমি রাসূল সা. এর কাছে আসলাম। রাসূল সা. আমাকে দেখে একটু রাগের হাসি হাসলেন। রাসূল সা. অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন, তবে তা হাসি দ্বারা। হযরত উবাই রা. বলেন, রাসূল সা. যখন আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন তখন আমি বুঝতে পেরেছি যে এ হাসি রাগের হাসি, খুশির হাসি না। রাসূল সা. আমাকে বললেন, তুমি পিছনে কেন রয়ে গেলে। আমি বললাম, অজুহাত ও যুক্তি উপস্থাপন করে আপনাকে খুশি করার উদ্দেশ্য থাকলে আমি আপনাকে মিথ্যা অজুহাত ও মিথ্যা যুক্তি উপস্থাপন করতে পারতাম। কিন্তু আমি জানি, আপনি সত্য নবী। আপনার সাথে মিথ্যা বললে আগামীকাল  আল্লাহ তাআলা সব সত্য আপনার কাছে প্রকাশ করে দেবেন। আর আমি যদি সত্য কথা বলি তবে হয়ত আল্লাহ তায়ালা আমাকে ক্ষমা করবেন এবং আল্লাহ আপনাকেও আমার ব্যাপারে সন্তুষ্ট করিয়ে দিবেন। হে আল্লাহর রাসূল! তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার কোন গ্রহণযোগ্য কারণ আমার ছিল না। রাসূল সা. বললেন, এই ব্যক্তি সত্য বলেছে। তবে তুমি এখন যাও যতক্ষণ না আল্লাহ তাআলা আমাদের মাঝে ফয়সালা না করেন। রাসূল সা. অন্যায়ের প্রতিবাদ ন¤্র উপায়ে হাসিমুখে করছেন। তবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছেন না। রাসূল সা. তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত তাকে আলাদা থাকতে বললেন। সেই সাহাবী প্রায় ৫০ দিন সকল মুসলমানের কাছ থেকে বয়কটে ছিলেন। দীর্ঘ বয়কটের শাস্তি ভোগ করার পর অবশেষে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের তাওবা কবুল হওয়ার ঘোষণা আসে। [বুখারী শারীফ : ৪১৫৬]
হযরত হাতেব বিন বুলতাআ’ রা. মুসলিম জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। মুসলমানগণের মক্কা অভিযানের পরিকল্পনার খবর গোপনে এক মহিলার মাধ্যমে মক্কার কুরাইশদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেন। আল্লাহ তায়ালা এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর রাসূল সা.-কে জানিয়ে দেন। তখন রাসূল সা. হযরত আলী ও একজন সাহাবীকে পাঠালেন আর বললেন, মক্কার পথে ওমুক স্থানে একজন মহিলার কাছে একটি চিঠি আছে সেটা নিয়ে আসবে। সে স্থানে গিয়ে সে মহিলাকে পেয়ে তার কাছে থাকা চিঠি দিতে বললে সে মহিলা অস্বীকার করে। তখন হযরত আলী রা. বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমার কাছেই চিঠি আছে। যদি তুমি আপোসে না দাও তবে আমরা শক্তি প্রয়োগ করে নিতে বাধ্য হব। তখন সে মহিলা চিঠি বের করে দেয়। তারা সেই চিঠি রাসূল সা.এর কাছে নিয়ে এলেন। হযরত ওমর রা. এই বিশ্বাসঘাতকতার খবর শুনে তলোয়ার বের করে রাসূল সা.-এর কাছে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দেন আমি বিশ্বাসঘাতক হাতেবের মাথা কেটে ফেলি। রাসূল সা. এত বড় অন্যায়কে কিভাবে দমন করেছেন? কঠোরভাবে না ন¤্রভাবে? রাসূল সা. বললেন, থামো হে ওমর! তুমি কি জান সে বদরী সাহাবী। আর আল্লাহ তাআলা বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল সাহাবার পূর্বের ও পরের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। হযরত হাতেব বিন বুলতাআ’ রা, বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি মুনাফিক হইনি। মক্কায় সকলের আত্মীয়-স্বজন আছে আর আমার কোন আত্মীয়-স্বজন নেই। তাই মক্কায় রয়ে যাওয়া আমার পরিবার ও ছেলেমেয়েদের নিরাপত্তার জন্য কোন অভিভাবক নেই। তাই আমি চেয়েছিলাম যে, আমি মক্কার কাফেরদেরকে গোপন পরিকল্পনার খবর দিয়ে উপকার করব যাতে তারা আমার পরিবারের উপর কোন নির্যাতন না চালায় ও বিপদের সময়ে আমার পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ায়। রাসূল সা. তার ওজর গ্রহণ করলেন এবং তাকে কোন প্রকার শাস্তি প্রদান করেন নি। [(ঘটনার অর্থ) বুখারী শারীফ : ২৮০১]
বনু নাজীর গোত্রের দুর্গকে যখন মুসলমানগণ ঘেরাও করে রাখেন তখন বনু নাজীর গোত্রের সন্ত্রাসীদেরকে দ- দেয়া ও দুর্বলদেরকে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যখন মুসলমানগণ তাদের সাথে কথাবার্তা বলছেন তখন আব্দুল্লাহ বিন মুনজির রা. বনু নাজিরের ইহুদীদেরকে ইশারা করে বললেন, যদি তোমরা আত্মসমর্পণে আস তবে তোমাদেরকে দ- দেয়া হবে তাই তোমরা আত্মসমর্পণ কর না। পরক্ষণেই হযরত আব্দুল্লাহ বিন মুনজির রা.-এর সুমতি ফিরে আসে এবং রাসূল সা.-এর কাছে গিয়ে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। আমাকে ক্ষমা করুন এবং তিনি নিজেকে মসজিদের খুঁটির সাথে বেঁধে ফেলেন এবং বলেন, রাসূল সা. যতক্ষণ আমাকে ক্ষমা করে আমার বাঁধন না খুলবেন আমি এভাবে বন্দি থাকব। রাসূল সা. তাকেও ক্ষমা করে দেন।
অনেক সময় অনেকে বলে, ভাল ব্যবহার কার সাথে করব? সে আমার সাথে শত্রুতা পোষণ করে তার সাথে শক্তি প্রদর্শন না করলে সে আরো বেশি শত্রুতা দেখাবে। যে আমাকে আঘাত করে তার সাথে কিভাবে ন¤্র ব্যবহার করব? ওমাইর ইবনে ওহাব মক্কায় নির্জনে বসে সাফওয়ান বিন মুআত্তালের সাথে বলছে, আমার ইচ্ছা হয়, মুহাম্মাদ সা. কে হত্যা করতে তবে আমার কিছু ঋণ আছে ও আমার পরিবারের ভরণ পোষণ করতে হয় তাই কোন ঝুঁকি নিতে পারছি না। তখন সাফওয়ান বিন মুআত্তাল বলল, আমি তোমার ঋণ পরিশোধ ও তোমার পরিবারের ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিচ্ছি। যাও মুহাম্মাদ সা.-কে হত্যা করে আস। তখন ওমাইর রাসূল সা.-কে হত্যার উদ্দেশ্যে মদীনায় পৌছল। রাসূল সা.-কে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিয়েছেন যে, ওমাইর আপনাকে হত্য করতে এসেছে এবং বিনিময়ে সাফওয়ান তার ঋণ ও তার পরিবারের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। রাসূল সা. যখন জেনেছেন তখন কি ওমাইরকে ধরার জন্য ও তার হাত থেকে বাঁচার পূর্ব সতর্কতাস্বরূপ তার উপর আক্রমণ করেছেন? না তাকে বন্দি করেছেন? কী করেছেন তার সাথে? আমরা এমন আক্রমণকারী শত্রুর সাথে কী করি। ওমাইর মদিনায় এসে খোলা তালোয়ার নিয়ে রাসূল সা.-কে খুঁজছে। হযরত ওমর রা. ওমাইর এর সন্দেহজনক ঘুরাফেরা দেখে তাকে ধরে রাসূল সা.-এর কাছে নিয়ে আসেন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি অনুমতি দেন, আমরা ইসলামের এই শত্রুকে শায়েস্তা করি। রাসূল সা. বললেন, হে ওমর! তাকে আমার কাছে আসতে দাও ও তার তালোয়ার তার কাছে দাও। রাসূল সা. তাকে হাসিমুখে স্বাগত জানালেন ও বললেন, হে ওমাইর! তোমার তলোয়ার তোমার কাঁধে নিয়ে ঘুরছ কেন? সে ছলনা করে বলছে, হা, এই তলোয়ারই আমাদের সম্পর্ক নষ্ট করেছে। তারপর রাসূল সা. বললেন, তুমি মদিনায় কেন এসেছ? সে বলল, আমার ছেলে ওহাব আটক হয়েছে তাকে ছাড়াতে এসেছি। রাসূল সা. তখন বললেন, সত্য কথা বল। সে বলল, না, আল্লাহর শপথ! আমি এ জন্যই এসেছি। তখন রাসূল সা. বলেন, তুমি কি ওমুক স্থানে সাফওয়ানের সাথে বসে আমাকে হত্যা করতে ষড়যন্ত্র করনি? বিনিময়ে সাফওয়ান তোমার ঋণ ও তোমার পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছে। তখন সাফওয়ান বলল, আল্লাহর শপথ! আমি যখন সাফওয়ানের সাথে এ আলোচনা করি তখন আমি আর সে ছাড়া আর কেউ ছিল না। নিশ্চয় যে আল্লাহকে আমরা অস্বীকার করছি সেই আল্লাহই আপনাকে এসব জানিয়েছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর সত্য নবী। [তাবরানী শারীফ : ১৩৬০৪]
রাসূল সা. কে হত্যা করতে ওমাইর এসেছে তা জানার পরও রাসূল সা. তার সাথে কোনরকম কঠোর আচরণ করেননি বরং ন¤্র আচরণ করছেন। তার সাথে উম্মুক্ত সংলাপ করছেন এবং ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছেন। একজন গ্রাম্য সাহাবী গাওরাস ইবনুল হারিস তার গোত্রের সাথে ঘোষণা করেছে যে সে রাসূল সা. কে হত্যা করবে। রাসূল সা. একটি গাছের নিচে ঘুমিয়ে ছিলেন। সে রাসূল সা. এর কাছে এসে তলোয়ার বের করে বলছে, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে বাঁচাবে? আমরা হলে কি করতাম? এরকম শত্রুকে কৌশলে বশে আনতে পারলে শেষ করে ফেলতাম। আর এটাকেই যুক্তিযুক্ত মনে করা হয়।  রাসূল সা.বললেন, আল্লাহ আমাকে বাঁচাবে। এ কথা শুনে সে গ্রাম্যের হাত থেকে তলোয়ার পরে গেল এবং রাসূল সা. তা তুলে নিয়ে বললেন, তোমাকে আমার হাত থেকে কে বাঁচাবে? তারপর রাসূল সা. তাকে ক্ষমা করে দিলেন ও ইসলামের দাওয়াত দিলেন। সে ইসলাম গ্রহণ করতে আস্বীকার করল। তখন  রাসূল সা. কি করলেন? তারপরও রাসূল সা. তাকে ক্ষমা করে দিলেন এবং বললেন, তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ না কর তবে ইসলামের শত্রুতা পোষণ করবে না। সে বলল, ঠিক আছে। আর রাসূল সা. তাকে ছেড়ে দিলেন। রাসূল সা. এর এরকম মাহানুভবতা দেখে সে গ্রাম্য পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণ করেন। [বুখারী শারীফ : ৩৮৪৭]
রাসূল সা. দরকার হলে শেষ অবলম্বনস্বরূপ কঠোর ভাষা ব্যবহার করতেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনুল লাতাবিয়াহ রা.-কে বনী সুলাইমের সাদাকা সংগ্রহ করার জন্য একবার পাঠালেন। উনি ফেরার পর রাসূল সা. কে বললেন, এগুলো হল সাদাকা ও জাকাতের সম্পদ আর এ সম্পদগুলো হল আমাকে দেয়া তাদের হাদিয়া। রাসূল সা. রাগ হয়ে গেলেন এবং তার চেহারা লাল হয়ে গেল। অতপর সবাইকে উপস্থিত করে রাসূল সা. মিম্বারে উঠে বললেন, একজনকে আমি সাদাকা সংগ্রহ করার জন্য পাঠিয়েছি। সে আমার কাছে এসে বলে, এগুলো হল সাদাকার সম্পদ আর এগুলো হল আমার হাদিয়া। সে যদি তার বাবার ঘরে বা তার মায়ের ঘরে বসে থাকত তবে কি এ হাদিয়া তার কাছে আসত? অর্থাৎ তার কাজের দায়িত্বশীল হওয়ার কারণে কেউ হয়ত একটু অন্যায় সুবিধা নেয়ার জন্য তাকে এ উপঢৌকন দিয়েছে। যা একপ্রকার ঘুষরূপে গণ্য। রাসূল সা. আরো বলেন, আমি তোমাদের অনেককে চিনি যার কাঁধে বড় উট উটিয়ে দেয়া হবে (কারণ সে উট সে অন্যায়ভাবে সংগ্রহ করেছিল)। আমি আরেকজনকে চিনি যার কাঁধে গাধা উঠিয়ে দেয়া হবে (কারণ সেটা সে দুর্নীতি করে গ্রহণ করেছিল) । [বুখারী শারীফ : ৬৪৯২] রাসূল সা. এরকম অর্থনৈতিক দুর্নীতির সুযোগ চিরতরে বন্ধ করে দেয়ার জন্য শুধু রাগ করেই ক্ষান্ত হননি, বরং মিম্বারে উঠে সকলকে সতর্ক করেছেন যাতে এরকম দুর্নীতিতে অজান্তে কেউ পতিত না হয়। তবে লক্ষণীয় যে রাসূল সা. ঐ সাহাবীর প্রতি রাগ করে সবার সামনে সেই অন্যায়ের তীব্র সমালোচনা করলেও সে সাহাবীর সম্মানের প্রতি লক্ষ রেখেছেন। সকলের সামনে তার নাম উচ্চারণ করেননি যাতে সে অপমানিত না হয়।
একবার হযরত মুয়াজ রা.-কে এক স্থানে ইমামতি করার জন্য পাঠালে তিনি লম্বা ক্বেরাত পড়েন। তখন একজন রাসূল সা.-এর কাছে এসে অভিযোগ করলে রাসূল সা. রাগ করে চেহারা লাল করে বেস থাকেন নি। বরং রাসূল সা. হযরত মুয়াজ রা.-কে তিরস্কার করে বলছেন, হে মুআজ, তুমি কি ফিতনাবাজ, বিশৃংখলাকারী? তুমি নামাজের ক্বেরাতকে দীর্ঘ করবে না। কারণ তোমার পিছনে অনেক বৃদ্ধ, অসুস্থ ও দুগ্ধশিশুর মা নামাজ পড়ে। [আবু দাউদ শারীফ : ৭৯০] এখানে মুখ দ্বারা অন্যায় দমন করা দরকার তাই মুখের কঠোর ভাষায় অন্যায় দমন করছেন।
হযরত আবু জার রা. বলেন, আমি একবার এক সাহাবীকে মার নাম তুলে গালি দিলে রাসূল সা. আমাকে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করলেন। রাসূল সা. আমাকে বললেন, হে আবু জার! তোমার মধ্যে এখনো অন্ধকার যুগের দোষ রয়ে গেছে। [বুখারী শরীফ : ৩০]
এভাবেই রাসূল সা. অপরাধকে ও অপরাধীদেরকে ন¤্র উপায়ে এবং উত্তম ব্যবহার প্রদর্শন করে দমন করতেন। এমনকি নিজের জীবনের শত্রুকেও ক্ষমা করে দিয়ে হাসিমুখে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। যখন দরকার হয়েছে তখন চেহারা লাল করে রাগ প্রদর্শন করে অন্যায় দমন করেছেন। যখন ন¤্র উপায় কার্যকর ছিল না তখন মুখের কঠোর ভাষায়ও অন্যায় প্রতিরোধ করেছেন। এমনিভাবে যখন সকল শান্তিপূর্ণ উপায় অকার্যকর হয়েছে তখন শেষ বিকল্পস্বরূপ যুদ্ধ করেছেন। তবে সেটা পরামর্শ, দলগতভাবে পূর্বাপর সবকিছু বিবেচনা করে সম্মিলিত সিদ্ধান্তের পর করেছেন। #

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight