রাসূল সা. উত্তম আদর্শ ও আমাদের অবস্থা : জাতিসংঘের যুদ্ধনীতি জেনেভা কনভেনশন ও রাসূল সা. এর যুদ্ধনীতি / ড. মুফতী আবদুল মুকীত আযহারী

 

১৯০৮ সালে হেগ কনভেশনে সমঝোতাচুক্তির খসড়ার আলোকে ১২ আগস্ট ১৯৪৯ সালে জেনেভা কনভেনশনে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সম্পদিত চুক্তি মূলত জাতিসংঘের যুদ্ধনীতি। এর পূর্বে মানুষের যুদ্ধনীতি সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না। মূলত যুদ্ধ সম্পর্কে কোন নীতিই ছিল না। সেই জেনেভা কনভেনশনের সম্পাদিত যুদ্ধনীতিতে সূত্র অর্থাৎ কোথা থেকে এ নীতিগুলো গ্রহণ করা হয়েছে তার বিবরণ থেকে দেখা যায় যে, সেসব নীতির উল্লেখিত সূত্রগুলোর চার নম্বর সূত্র হল ইসলামী বিধান। জাতিসংঘ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, জাতিসংঘের যুদ্ধনীতি সম্পাদনের বহু আগ থেকে ইসলামে যুদ্ধনীতি আছে।
জাতিসংজ্ঞের এ যুদ্ধনীতি যাঁরা প্রণয়ন করেছেন তাঁদের মধ্যে আছেন ফ্রান্সের লামবিব, প্যারন, মিশিল বিতব। তাঁরা এ যুদ্ধনীতি সম্পাদনের সময় অকপটে লিখেছেন, ‘আমরা এ যুদ্ধনীতির অধিকাংশ নীতি ইসলামের বিধান থেকে সংগ্রহ করেছি।’ আমরা মুসলমানগণ ধারণা করি বা আমাদের অন্তরে এ ধারণা বদ্ধমূল করা হয়েছে যে, সভ্যতা হল পাশ্চাত্য সভ্যতা আর মুসলমানগণ অসভ্য বা পশ্চাদ্পদ জাতি। আমাদের আদর্শ হওয়া দরকার পাশ্চাত্য সভ্যতা। আমরা যতটা পাশ্চাত্য সভ্যতা রপ্ত করতে পারব ততটা সভ্য হব এবং উন্নত হব। আর পাশ্চাত্য সভ্যতা আয়ত্ত করতে বা রপ্ত করতে যতটা পিছিয়ে থাকব ততটা পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীরূপে বিবেচিত হব। যেমন বেগম রোকেয়াকে নারীর অগ্রপথিক মানি। প্রতিবছর নারীর ক্ষমতায়ন, আর্থিক উন্নয়ন বা সুদের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের টার্গেট ঠিক করে দেয়া হয় এবং সেই পাশ্চাত্য আদর্শ বা সভ্যতার মাপকাঠি যতটা অর্জন করতে পারি সে অনুযায়ী আমরা নারীর ক্ষমতায়ন, আর্থিক উন্নয়নের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার অর্জন করি। এ অর্জনের খুশিতে গগনবিদারী গর্বে আমরা গোটা জাতি ভাসতে থাকি এবং পথেঘাটে অভিনন্দন জানাতে থাকি।
অথচ রাসূল সা. ১৫০০ বছর আগে যে সভ্যতা জগতের সামনে রেখে গেছেন তারই পুনঃপ্রতিষ্ঠা বর্তমান সভ্যতার গাইডবুকগুলোতে হচ্ছে। বর্তমান বিশ্ব বা পাশ্চাত্য সমাজ বিশ্বের সামনে যত নতুন সভ্যতা হাজির করছে তার সবগুলো ইসলামের সভ্যতায় বহু আগ থেকে বিদ্যমান। বর্তমান বিশ্বের হাজির করা মানবাধিকার, নারীনীতি, শিশুনীতি, শিক্ষানীতি, যুদ্ধনীতি, রাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি যত নীতি বা সভ্যতার উপাদান হাজির করা হচ্ছে তার সবগুলো ১৫০০ বছর আগে রাসূল সা. তাঁর আল্লাহ-প্রদত্ত ইসলামী নীতি ও বিধানে পরিপূর্ণরূপে বিস্তারিত উল্লেখ করে গেছেন। অথচ আমরা মুসলামনগণ ইসলাম সম্পর্কে না জানার কারণে বা আমাদের শিক্ষানীতি ও সিলেবাসে তাদের নগ্ন হস্তক্ষেপের ফলে ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞই রয়ে গেছি। আর তাই যখনই আমরা তাদের উপস্থাপিত সভ্যতা বা নীতি দেখি তখন আমরা বিশ্বাস করি যে, তারা অনেক সভ্য ও উন্নত আর আমরা অসভ্য ও অনুন্নত জাতি। ইসলামে এসব নীতি ও সভ্যতা নেই। ইসলাম মানবতার উন্নতি ও প্রগতির অন্তরায়। ইসলাম পশ্চাদ্মুখিতা, অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কারের নামে মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করাকে সমর্থন করে। ইসলাম শুধুমাত্র পরজগতের উন্নতি কীভাবে হবে তার বিবরণ দেয় কিন্তু জাগতিক জীবনের উন্নতি কিভাবে হবে তার নির্দেশনা দেয় না। মানুষ তার ব্যক্তিজীবনে কিভাবে উন্নতি লাভ করবে, পারিবারিক জীবনে কিভাবে সুখী হবে, সমাজ কিভাবে সমৃদ্ধ হবে, সমাজের প্রতিটি মানুষের অধিকার কিভাবে অক্ষুণ্ন থাকবে, সমাজের প্রতিটি আচরণ, অনুষ্ঠান, পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হবে, রাষ্ট্রীয় জীবনে মানবতার উন্নতি কিভাবে হবে, রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচার, প্রশাসন, বিজাতির সঙ্গে সম্পর্ক বা পররাষ্টনীতি, পারস্পরিক সহযোগিতা, যুদ্ধ-বিগ্রহ কেমন হবে তার নির্দেশনা বা সে সম্পর্কে গাইডলাইন হয়তবা ইসলামে নেই। অথচ যাঁরা জেনেভা কনভেনশন প্রণয়ন করেছেন তাঁরা সবাই অকপটে স্বীকার করে গেছেন এবং লিখে গেছেন যে তাঁরা এ নীতিমালা ইসলামী বিধান থেকে সংগ্রহ করেছেন। উপরন্তু জেনেভা কনভেনশনের যুদ্ধনীতি পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট যে, ইসলামের যুদ্ধনীতিতে যত মানবিক বিধান আছে তার অনেকগুলো জেনেভা, হেগ কনভেনশনের যুদ্ধনীতিতে অনুপস্থিত। তুলনামূলক সে পর্যালোচনা এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করব।
ইসলাম প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য, প্রভাব বিস্তার বা ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যে কোন ধরনের যুদ্ধ সমর্থন করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, কোন জাতির প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। বরং তোমরা ন্যায়বিচার করবে। অন্যস্থানে আল্লাহ তাআলা বলেন, কোন জাতি তোমাদেরকে মসজিদুল হারামে প্রবেশে বাধা দিয়েছে তাই তাদের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে সীমালংঘন (আক্রমণ) করতে উদ্ধুদ্ধ না করে। ভাল কাজ ও আল্লাহ ভীতির কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কর। কোন পাপ ও অন্যায় কাজে একে আপরকে সহযোগিতা করবে না। অতএব কেউ শত্রু হলেই যে তাকে আক্রমণ করা যাবে ইসলামে এর কোন বিধান নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, এ আখেরাতের ঘর (পরকালের জীবনের সফলতা) তাদেরই হবে যারা পৃথিবীতে উচ্চতা (ক্ষমতা) ও বিশৃংখলা চায় না। যারা শুধুমাত্র ক্ষমতা চায় বা অহংকারের নিমিত্তে উচ্চতা চায় তাদের সফলতা নেই। অতএব শুধুমাত্র ক্ষমতা বা পদ-পদবির জন্য আক্রমণ বা যুদ্ধ ইসলাম কোন ভাবেই সমর্থন করে না। আর এ ব্যাপারে জাতিসংঘের বর্তমান যুদ্ধনীতি বা হেগ এবং জেনেভা কনভেনশন নিশ্চুপ।
জাতিসংঘের বর্তমান যুদ্ধনীতি বা পৃথিবীর সব যুদ্ধনীতিতে শত্রুপক্ষের সঙ্গে দু’ রকমের আচরণের কথা উল্লেখ আছে। যুদ্ধের মধ্যে শত্রুপক্ষকে হত্যা করা অথবা তাদেরকে বন্দি করা। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবন্দীদেরকে হত্যা করা বা মুক্তিপণ বা যুদ্ধবন্দী বিনিময়ের মাধ্যমে মুক্ত করা। তৃতীয় আর কোন ধারা নেই। ইসলামে তৃতীয় আরেকটি মানবতার ধারা আছে যা কোন যুদ্ধনীতিতে নেই সেটা হল শত্রুপক্ষকে ক্ষমা করা। হযরত আলী রা. উটযুদ্ধে বলেন, তোমরা পলায়নরত ব্যক্তিকে ধাওয়া করবে না। আহত ব্যক্তির উপর আক্রমণ করবে না। যে ব্যক্তি তার অস্ত্র ফেলে দেবে সে নিরাপদ। কোন বন্দীকে হত্যা করবে না। নারীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকবে, যদিও তারা তোমাদের সম্মানহানি করে এবং তোমাদের আমীরদের গালাগালি করে। আমরা অন্ধকার যুগে দেখতাম, একজন পুরুষ নারীকে চামড়া দ্বারা আঘাত করত আর মানুষ তার দুর্নাম করত।
মদিনায় আবস্থানকারী ইহুদীদের তিনটি গোষ্ঠী, কায়নুকা, নাজীর ও কুরায়জা গোষ্ঠীর সঙ্গে বেশ কিছু শর্তসাপেক্ষে মুসলমানগণের সহাবস্থান চুক্তি সম্পাদিত হয়। কিন্তু এ তিন গোষ্ঠি বিভিন্ন সময়ে চুক্তি লংঘন করতে থাকে। অনবরত মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও শত্রুতা চালাতে থাকে। এ ইহুদী গোষ্ঠীরা সম্পাদিত চুক্তির স্পষ্ট লংঘন করার কারণে মুসলমানগণ তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালান। এ অভিযানে কায়নুকা ও নাজির গোষ্ঠী মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। কিন্তু তারা যুদ্ধে পরাজিত হয়। ইতিহাস দ্বারা প্রমাণিত যে, ইহুদীরা যখন যুদ্ধে পরাজিত হয় তখন তারা রাসূল সা.-এর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। পৃথিবীর সকল যুদ্ধের নীতি হল, শত্রুপক্ষ পরাজিত হলে তাদেরকে হত্যা করা হবে বা তাদেরকে গ্রেফতার করা হবে। ইহুদীরা রাসূল সা.-এর কাছে প্রস্তাব করে যে, তারা চুক্তি লংঘন করেছে ও যুদ্ধ করেছে, তারপরও তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হোক। তাহলে তারা মদিনা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাবে। ইতিহাস সাক্ষী, ইহুদীরা চরম শত্রুতা, আক্রমণ ও যুদ্ধ করা সত্ত্বেও রাসূল সা. তাদেরকে ক্ষমা করে দেন এবং নির্বাসনে যেতে দেন। দু-একজন চরম বিশ্বাসঘাতক ছাড়া এ সকল যুদ্ধে পরাজিত শত্রুদেরকে হত্যাও করেন নি এবং আটকও করেন নি।
মক্কা বিজয়ের পরে রাসূল সা. ও সাহাবাগণ বিভিন্ন গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। তাদের মধ্যে হাওয়াজেন গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযান হয়। মুসলমানদের সে অভিযানে হাওয়াজেন গোত্র যুদ্ধ করে এবং যুদ্ধে পরাজিত হয়। হাওয়াজেন গোত্রের নেতৃস্থানীয় যোদ্ধারা পালিয়ে যায় আর দুর্বল মানুষ এবং নারী-শিশুরা রয়ে যায়। মুসলমানগণ যুদ্ধনীতি অনুযায়ী তাদেরকে আটক করেন। তখনকার সময়ে কোন বন্দিশালা বা জেলখানা ছিল না। আটক বন্দিদের ক্ষেত্রে ইসলামের নীতি ছিল, সকল বন্দিকে মুসলমান যোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টন করে দেয়া হত। তারা এ সকল বন্দির ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করবে এবং বিনিময়ে বন্দিদের কাছ থেকে চাহিদামত সেবা গ্রহণ করতে পারবে। সে নীতি অনুযায়ী হাওয়াজেন গোত্রের প্রায় চার হাজার বন্দিদেরকে মুসলমানগণের মাঝে বণ্টন করে দেয়া হয়।
তারপরে হাওয়াজেন গোত্রের পালিয়ে যাওয়া নেতারা রাসূল সা. এর কাছে জি’রানা নামক স্থানে আসেন ও বলেন, আমরা ভুল বুঝতে পেরেছি। এখন আমরা সকলে ইসলাম গ্রহণ করেছি। শত্রুপক্ষের যুদ্ধ ও সকল শত্রুতা নিষ্পত্তির উপায় হল শত্রুপক্ষ খুশিমনে ইসলাম গ্রহণ করা। তারা মুসলমান হওয়ার কারণে সকলে মুসলমানের বন্ধুতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। তাই তাদের গোত্রের বন্দিদেরকে মুক্ত করার জন্য আবেদন করে। রাসূল সা. তৎক্ষণাৎ বলেন, আমার কাছে যত বন্দি আছে এবং যাদেরকে বণ্টন করা হয়নি তাদের সকলকে মুক্ত করে দিলাম। কিন্তু যাদেরকে বণ্টন করে দেয়া হয়েছে এখন তারা সে সকল মুসলমানের অধিকারভুক্ত। অন্য মুসলমানের কাছে থাকা বন্দিদের ব্যাপারে এখনই সিদ্ধান্ত জানাতে পারব না। তবে তাদের কাছে তোমাদের ব্যাপারে সুপারিশ করব। রাসূল সা. শাসক হয়েছেন বলে কারো অধিকারের প্রতি তোয়াক্কা করবেন না এমনটা কখনো কল্পনা করা যায় না। রাসূল সা. তখন সাহাবাগণকে একত্র করে বক্তব্য দিলেন আর বললেন, হাওয়াজেন গোত্র পালিয়ে যাওয়ার পরে বাকীদের আটক করা হয়। সেসব বন্দিদের বণ্টন করে দেয়ার পরে তোমাদের হাওয়াজেন গোত্রের ভাইগণ এসেছেন এবং ভুল স্বীকার করছেন। তারা ইসলাম গ্রহণ করে তোমাদের ভাই হয়ে গেছেন। এখন তারা তোমাদের হাতে বন্দি থাকা তাদের স্ত্রী-সন্তান ও আত্মীয়দেরকে ফেরত চাচ্ছে। আমি আমার হাতে থাকা সকল বন্দিদেরকে ফেরত দিয়ে দিয়েছি।
তখন অধিকাংশ সাহাবা দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন যে, আমরাও ফেরত দিলাম। তবে কিছু নতুন মুসলমান যেমন আকরা’ বিন হাবিস, উয়াইনা বিন হুসাইন, তামীম, সুলাইম গোত্রের নেতৃত্বস্থানীয় দু-একজনসহ অনেকে আপত্তি করল যে, আমরা আমাদের অধিকারভুক্ত বন্দিদেরকে মুক্ত করব না। রাসূল সা. যখন দেখলেন যে, নতুন মুসলমানগণের মধ্যে কিছু মুসলমান আপত্তি করছে তখন তিনি প্রণোদনা ঘোষণা করলেন। রাসূল সা. বললেন, যারা আমাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে তারা তো প্রশংসার যোগ্য। আর যারা আপত্তি করছে তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, তোমাদের মধ্যে যারা এ সকল বন্দিকে মুক্ত করবে আমি তার প্রতিটি বন্দির বিনিময়ে এই পরিমাণ সম্পদ প্রদান করব। এ প্রণোদনা শুনে বাকিরা সবাই বলল যে, আমরাও আমাদের হাতে থাকা বন্দিদেরকে মুক্ত করে দিলাম। অতএব ইসলামের এ নীতি পরাজিত শত্রুপক্ষকে ক্ষমা করার নীতি এবং বন্দিকে ক্ষমা করার নীতি শুধুমাত্র ইসলামী বিধানেই আছে। পৃথিবীর আর কোন যুদ্ধনীতিতে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
সকল যুদ্ধনীতিতে শত্রুপক্ষ সকলের সঙ্গে যুদ্ধ করার বিধান আছে। আর ইসলামে শত্রুপক্ষ হলেই তার সঙ্গে যুদ্ধ করা যাবে না। শুধুমাত্র শত্রুপক্ষের মধ্যে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা যাবে যারা সরাসরি মুসলমানের সঙ্গে যুদ্ধ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ কর যারা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধে করে এবং তোমরা সীমালংঘন করবে না। যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী যোদ্ধারা ছাড়া শত্রুপক্ষের নারী, শিশু, বৃদ্ধ, রোগী, কর্মচারী, পাদরি, ধর্মগুরু এমন কাউকে হত্যা করা যাবে না। রাসূল সা. বলেন, তোমরা আল্লাহর নামে রওয়ানা হও। আল্লাহর নির্দেশ ও রাসূল সা.-এর ধর্মে রওয়ানা হও। তোমরা বৃদ্ধকে, শিশুকে, ছোটকে ও নারীকে হত্যা করবে না। আত্মসাৎ করবে না, বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। গনিমতের সম্পদকে একত্র কর। সংশোধন কর এবং কল্যাণ কর। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কল্যাণকারীকে ভালবাসেন। হযরত আসওয়াদ ইবনুস সারী রা. বলেন, একযুদ্ধে কিছু শিশুকে হত্যা করা হয়। তখন রাসূল সা. বলেন, মানুষের কী হল? তাদের হত্যা সীমা অতিক্রম করেছে। এমনকি তারা শিশুদেরকে হত্যা করেছে। তখন এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! তারা মুশরিকদের সন্তান। রাসূল সা. বললেন, তোমাদের উত্তম ব্যক্তিরা কি মুশরিকদের সন্তান না? (অর্থাৎ রাসূল সা. সহ তখনকার অধিকাংশ মুসলমানগণের পিতা-মাতা মুশরিক ছিল তাই তারাও তো মুশরিকদের সন্তান) তারপর বললেন, তোমরা শিশুদেরকে হত্যা করবে না, তোমরা শিশুদেরকে হত্যা করবে না।
হযরত ইবনে ওমর রা. বলেন, কোন এক যুদ্ধে একজন নিহত নারী পাওয়া গেল। তখন রাসূল সা. নারী ও শিশুদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। হযরত আবু ইমরান আল-জাওনী বলেন, হযরত আবু বকর রা. ইয়াজিদ বিন আবু সুফিয়ান রা. কে সিরিয়ায় পাঠান। তাকে বিদায় দিতে গিয়ে হযরত আবু বকর রা. তার সঙ্গে হাঁটতে থাকেন। তখন হযরত ইয়াজিদ রা. বলেন, আপনি হাঁটবেন আর আমি বাহনে থাকব এটা আমার ভাল লাগছে না। তিনি বললেন, তুমি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে বের হয়েছ আর আমি তোমার সঙ্গে হাটার মধ্যে সাওয়াবের আশা করছি। অতপর হযরত আবু বকর রা. তাকে ওসিয়ত করলেন যে, তোমরা কোন নারী, কোন শিশু, কোন বৃদ্ধ, কোন রোগী এবং কোন পুরোহিত বা ধর্মযাজককে হত্যা করবে না। কোন ফলদায়ক গাছ কর্তন করবে না। কোন বসবাসস্থলকে নষ্ট করবে না। কোন উট, গরুকে খাবারের উদ্দেশ্য ছাড়া অযথা হত্যা করবে না। কোন মৌচাককে ডোবাবে না এবং জ্বালাবে না।
হযরত রেবাহ বিন রাবা’ রা. বলেন, আমরা রাসূল সা. এর সঙ্গে এক যুদ্ধে ছিলাম। তখন তিনি দেখলেন, মানুষ কোন একটা বস্তু নিয়ে একত্র হয়েছে (জটলা বেঁধেছে)। রাসূল সা. একজনকে পাঠালেন, কেন তারা একত্র হয়েছে। তিনি এসে বললেন, একজন নিহত নারীকে ঘিরে মানুষ একত্র হয়েছে। রাসূল সা. বললেন, এ নারী তো যুদ্ধ করে নি। তখন অগ্রগামী সেনাদলে হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. ছিলেন। তখন রাসূল সা. একজন সাহাবা পাঠালেন এবং বললেন, খালেদকে বল, সে যেন কোন নারী, কোন কর্মচারীকে হত্যা না করে।
উহুদ যুদ্ধের সময় যখন রাসূল সা. সহাবাগণকে নিয়ে উহুদ প্রান্তরে যচ্ছিলেন তখন রাসূল সা. বললেন, উহুদ প্রান্তরে যাওয়ার সংক্ষিপ্ত রাস্তা কেউ চিনে নাকি? আবুল খায়সামা রা. নামক এক সাহাবা বললেন, আমি চিনি। হযরত আবুল খায়সামা রা. সাহাবাগণকে নিয়ে মেরবা’ আল কায়জী নামক এক অন্ধ ইহুদীর বাগানের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। সে ইহুদী অন্ধ হলেও ইসলাম ও রাসূল সা. এর প্রচ- বিদ্বেষী ছিল। সে যখন দেখল যে মুসলমানগণ তার বাগানের রাস্তা দিয়ে অতিক্রম করছে তখন সে সহ্য করতে পারল না। সে মুসলমানগণের গায়ে ধূলাবালি আর পাথর মারতে থাকে আর বলতে থাকে, তোমাদের মধ্যে যদি মুহাম্মাদ সা.-কে পেতাম তবে তাকে এ পাথর দ্বারা পিষে গুঁড়া গুঁড়া করতাম। সাহবাগণ এই অন্ধ ইহুদীর এরকম বেয়াদবী কথা সহ্য করতে পারলেন না। তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ অন্ধ ইহুদী তো আমাদের চরম শত্রু। আবার আমাদের উপর অতি বিদ্বেষের কারণে আক্রমণ করছে এবং আপনার সঙ্গে চরম বেয়াদবী ও আক্রমণাত্মক আচরণ করছে। আমরা তো যুদ্ধে যাচ্ছি। এ ইহুদী শক্রপক্ষের সঙ্গে আতাত করে আমাদের ক্ষতিও করতে পারে। তাই আপনি তাকে হত্যা করার অনুমতি দিন। রাসূল সা. সেদিন কি করেছিলেন? হা, সে চরম শত্রু, বেয়াদব, কুলাঙ্গার তাই তাকে হত্যা কর। না, এরকম অনুমতি দেন নি। রাসূল সা. বললেন যে, না, তাকে হত্যা করা যাবে না। কারণ সে আমাদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নি। ইসলাম ছাড়া এরকম মহানুভবতা আর কোথায় পাওয়া যাবে?
ইসলামের আরেকটি অসাধারণ নীতি যা অন্য কোন নীতিতে নেই। তা হল, শত্রুপক্ষের উপর আক্রমণাত্মক যুদ্ধ পরিচালনা করা যাবে না। শুধুমাত্র রক্ষণাত্মক যুদ্ধ পরিচালনা করা যাবে। কারণ ইসলাম যুদ্ধবাজ ধর্ম নয় বা যুদ্ধ করতে উৎসাহ প্রদান করে না। যদি শত্রুপক্ষ আক্রমণ করে বা আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করে এরকম নিশ্চিত খবর পাওয়া গেলেই শুধুমাত্র যুদ্ধ করার অনুমতি আছে। তখন যুদ্ধ না করলে মুসলমানগণ কাপুরুষ বলে বিবেচিত হবে। এ কারণে আমরা দেখতে পাই যে, ইসলামে যতগুলো যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে সবগুলোই রক্ষণাত্মক ছিল। প্রথম হিজরীতে হযরত হামজা রা. এর নেতৃত্বে মদিনার বাইরে এক দল পাঠান। তাদের মুখোমুখি হয় সিরিয়া থেকে আসা আবু জাহলের নেতৃত্বে এক বাণিজ্যক দল। কিন্তু হযরত হামজা রা. তাদের উপর আক্রমণ করেন নি। তবে কুরাইশ কাফের দলের মধ্যে ভয় প্রবেশ করে যে, মুসলমানগণ যেহেতু মদিনার বাইরে তাদের বাণিজ্যিক পথে ঘোরাফেরা করে সেহেতু হয়ত তারা কুরাইশ বাণিজ্যিক দলের উপর প্রতিশোধমূলক আক্রমণ করতে পারে। দ্বিতীয় হিজরী সনে রাসূল সা. এর নেতৃত্বে এক সেনাদল মদিনার বাইরে বের হন। তখন কাফের নেতা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে একটি বাণিজ্যিক দল সিরিয়া থেকে বাণিজ্যিক সামগ্রী নিয়ে ফিরতে থাকে। যখনই আবু সুফিয়ান রাসূল সা. এর নেতৃত্বে একটি সাহাবাগণের দল সম্পর্কে জানল, সে ভিন্ন রাস্তায় মক্কার পথে বদর প্রান্তরে গিয়ে অবস্থান নেয়। আর মক্কায় জামজাম বিন আমর এর মাধ্যমে খবর পাঠায় যে, আমরা মুসলমানদের হাতে আক্রমণের শিকার হতে যাচ্ছি তাই তোমরা মুসলামনগণের মোকাবেলার উদ্দেশ্যে একটি সাহায্যকারী দল পাঠাও। অথচ রাসূল সা. এর দলের সঙ্গে আবু সুফিয়ানের দলের কোন সাক্ষাৎই হয়নি। তারপরও আবু জাহল মক্কা থেকে রণসাজে সজ্জিত একটি সেনাদল নিয়ে বদর প্রান্তরে পৌঁছে এবং বিভিন্নভাবে উস্কানি দিতে থাকে ও অহংকার প্রদর্শন করতে থাকে। সেখানে বসে তারা মুসলমানগণকে উপহাস করতে থাকে আর যুদ্ধের জন্য ডাকতে থাকে। যখন রাসূল সা. মক্কার কুরাইশদের রণসাজে সজ্জিত যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্ততির কথা শুনলেন তখনই কেবলমাত্র রাসূল সা. সাহাবাগণ সহ তাদের মোকাবেলার উদ্দেশ্যে রক্ষণাত্মক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।
তৃতীয় হিজরীতে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মক্কার কুরাইশরা বদর যুদ্ধে চরমভাবে পরাজিত হয়। এর প্রতিশোধ নেয়ার উদ্দেশ্যে একবছর যাবত যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়।অতপর তারা তিন হাজার সৈন্যের অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক যুদ্ধ করার জন্য উহুদ প্রান্তরে সমবেত হয়। রাসূল সা. মুসলমানগণের জান-মাল, নারীদের সম্ভ্রম রক্ষার উদ্দেশ্যেই কেবল রক্ষণাত্মক যুদ্ধে অবতীর্ণ হন।
চতুর্থ হিজরীতে নিশ্চিত খবর আসে যে, তালহা ও সালামা আসাদ গোত্র নিয়ে সমবেত হচ্ছে ও মুসলমানগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। তারপরও রাসূল সা. গোয়েন্দা পাঠিয়েছেন যাতে আসাদ গোষ্ঠীর মদিনা আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণের খবরের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়। রাসূল সা. যখন নিশ্চিত হয়েছেন তখনই কেবল আবু সালাম রা. এর নেতৃত্বে সাহাবাগণের একটি দল তাদের মোকাবেলায় পাঠান।
পঞ্চম হিজরীতে নিশ্চিত খবর আসে যে, দাওমাতুল জানদালের আশপাশে সা’লাবা ও মুহারেব গোত্র সমবেত হচ্ছে ও মুসলমানগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। তারপরও রাসূল সা. গোয়েন্দা পাঠিয়েছেন যাতে সা’লাবা ও মুহারেব গোষ্ঠীর মদিনা আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণের খবরের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়। রাসূল সা. যখন নিশ্চিত হয়েছেন তখনই কেবল সাহাবাগণের একটি দল নিয়ে তাদের মোকাবেলায় যান।
ষষ্ঠ হিজরীতে নিশ্চিত খবর আসে যে, মুসতালাক গোত্রের নেতা হারেস বিন জারার তার গোত্র নিয়ে সমবেত হচ্ছে ও মদিনায় আক্রমণের উদ্দেশ্যে পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। রাসূল সা. গোয়েন্দা বুরাইদা ইবনুল হুসাইব রা. কে পাঠান যাতে মুসতালাক গোষ্ঠীর মদিনা আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণের খবরের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়। রাসূল সা. যখন নিশ্চিত হয়েছেন তখনই কেবল সাহাবাগণের একটি দল নিয়ে তাদের মোকাবেলায় বের হন।
অষ্টম হিজরীতে মাওতার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অনেকে বলেন, এ যুদ্ধটিও আক্রমণাত্মক ছিল। কারণ এ যুদ্ধটি ছিল মদিনা থেকে পনেরো দিনের দূরত্বে পারস্য সা¤্রাজ্যের সীমান্তের কাছে। রাসূল সা. প্রথমে একজন প্রতিনিধি হযরত হারেস ইবনে আমর রা. কে রোম স¤্রাটের কাছে পাঠান ও ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দেন। তখন তারা তো ইসলাম গ্রহণ করেনি বরং বার্তাবাহককে আটক করে তারপর হত্যা করে। আর এটা যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। তাই রাসূল সা. হযরত জায়িদ বিন হারেসা রা. এর নেতৃত্বে মাত্র তিন হাজারের একটি দল পাঠান। রোম সা¤্রাজ্য মুসলমানগণের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং প্রথম তিন সেনাপতি শহীদ হওয়ার পরে হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা. নেতৃত্ব গ্রহণ করলে রোম সা¤্রাজ্যের সেনারা পরাজিত হয়ে পালাতে শুরু করে। মুসলমানগণের যেহেতু কখনো আ্ক্রমণ বা যুদ্ধ উদ্দেশ্য থাকে না তাই তারা পিছু হটার পরে রোম সেনাদেরকে হত্যা করার জন্য তাদের পিছনে ধাওয়া করেন নি বরং ফেরত চলে আসেন।
অষ্টম হিজরিতে মক্কা অভিযান সংঘটিত হয়। অনেকে বলেন মক্কা অভিযান মুসলমানগণের আক্রমণাত্মক যুদ্ধ ছিল। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে রাসূল সা. কখন মক্কা অভিযানের সিদ্ধান্ত গহণ করেন? যখন হুদাইবিয়ায় শান্তি চুক্তি বা যুদ্ধ বন্ধের সন্ধি হয় তারপর মক্কার কুরাইশরা প্রথমে সে চুক্তি ভঙ্গ করে। কুরাইশরা মুসলমানগণের মিত্র বনু বকরের উপর আক্রমণ করে। তখনই কেবল চুক্তি ভঙ্গের কারণে তাদের বিরুদ্ধে মক্কা অভিযান করেন। পৃথিবী দেখেছে যে, সে মক্কা অভিযান হলেও সেখানে কোন রক্তপাত হয়নি। রাসূল সা. ক্ষমার অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত রেখেছেন।
নবম হিজরীতে তাবুকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অনেকে বলেন, এ যুদ্ধটিও আক্রমণাত্মক ছিল। কারণ এ যুদ্ধটি ছিল মদিনা থেকে বিশ দিনের দূরত্বে রোম সা¤্রাজ্যের সীমান্তের কাছে। ইতিহাসে এর প্রমাণ আছে যে, রাসূল সা. প্রথমে একজন প্রতিনিধি হযরত আরেস ইবনে ওমাইর রা.-কে রোম স¤্রাটের কাছে পাঠান ও ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দেন। তারা তো ইসলাম গ্রহণ করেনি বরং তারা সে প্রতিনিধিকেও হত্যা করে। এর কিছু দিন পর রাসূল সা. জানতে পারেন যে রোম সা¤্রাজ্য মুসলমানগণের উপর আক্রমণের উদ্দেশ্যে বিরাট সেনাদলের সমাবেশ ঘটাচ্ছে। প্রথমে রাসূল সা. গোয়েন্দা দল পাঠিয়ে রোম সা¤্রাজ্যের রণপ্রস্তুতির সংবাদ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছেন। তারপরই কেবল রণকৌশলের অংশস্বরূপ তাদের সীমান্তের কাছে তাদের আক্রমণের অভিযান প্রতিহত করেন। বাস্তবে রোম সা¤্রাজ্য যখন দেখল মুসলমানগণ অভিযানের মোকাবেলায় আমাদের বর্ডারের কাছে চলে আসছে তখন তারা তাদের আক্রমণের উদ্দেশ্য থেকে পিছু হটেন। রাসূল সা. ও মুসলমানগণেরও যেহেতু কখনো আক্রমণ বা যুদ্ধ উদ্দেশ্য থাকে না তাই তারা পিছু হটার পরে রাসূল সা. সাহাবাগণ সহ ফেরত চলে আসেন।
শত্রুপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার আগে তাদের যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বা যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য থাকতে হবে। সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করা বৈধ নয়। কিছুদিন আগেও আমরা পৃথিবীব্যাপী যুদ্ধ দেখেছি তার পুরোটাই সন্দেহের বশবর্তী ছিল। ২০০১ সনের ১১ সেপ্টেম্বর সংঘটিত আমেরিকার টুইন টাওয়ারের হামলা কারা করেছে তা আজও পরিষ্কার হয়নি। তবে শুধুমাত্র সন্দেহের বশবর্তী হয়ে দেশের পর দেশে আক্রমণ চালানো হয়েছে। লাখ লাখ নারী-শিশু, নিরপরাধ জনগোষ্ঠীকে হত্যা করা হয়েছে। ইরাকের তৎকালীন রাষ্টপ্রধানের কাছে মারণাস্ত্র আছে এরকম সন্দেহের অজুহাতে কত লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। অন্যায় আক্রমণ চালিয়ে একটি সমৃদ্ধ দেশকে ধ্বংস করা হয়েছে। আরো পরিতাপের বিষয় হলো যে, সে সন্দেহটাও ছিল মিথ্যা ও বর্তমানে প্রমাণিত ভুল। ইসলামে এরকম সন্দেহের বশবর্তী হয়ে যুদ্ধ করা সম্পূর্ণ অবৈধ।
রাসূল সা. একবার জাকাত সংগ্রহের জন্য হযরত ওয়ালীদ বিন ওকবা রা.-কে হারেসা রা. এর গোত্রের কাছে পাঠান। পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুযায়ী হযরত ওয়ালীদ রা. সে গোত্রের এলাকায় আসেন। সে এলাকার লোকদের নিয়ম ছিল, তারা নতুন অতিথিকে তলোয়ার খেলার মাধ্যমে স্বাগতম জানাত। যেরকম বর্তমানে বিদেশী রাষ্ট্রপতিদের আগমনের সম্মানে তোপধ্বনি বা আকাশে ফাঁকা গুলি ছোঁড়া হয়। যখন হারেসা রা.-এর গোত্র দূর থেকে মেহমানের আগমন দেখল তখন তারা সবাই তলোয়ার নিয়ে আগত অতিথি হযরত ওয়ালিদ বিন ওকবা রা.-কে স্বাগতম জানানোর উদ্দেশ্যে মহাসড়কে বের হলেন। হযরত ওয়ালিদ রা. হযরত হারেসা রা.-এর গোত্রকে তলোয়ার নিয়ে সামনে আগানো দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি মনে করলেন, তারা হযরত ওয়ালিদ রা.-এর উপর আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে আসছে। তাই তিনি এ ধারণা করে রাসূল সা.-এর কাছে ফিরে এলেন এবং রাসূল সা.-এর কাছে বললেন, হরেসা রা. এর গোত্র জাকাত দিতে অস্বীকার করেছে ও আমার উপর আক্রমণ করতে এসেছিল। মুসলমানের উপর আক্রমণ আসলে বা কোন চুক্তি লংঘন করলে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করা যায়। তাই রাসূল সা. হযরত হারেসা রা. এর গোত্রের এরকম অবাধ্যতা, আক্রমণ ও জাকাত প্রদান করার ক্ষেত্রে পূর্বে সম্পাদিত চুক্তি লংঘন করার কথা শুনে মুসলমানের একদলকে তাদের বিরুদ্ধে অভিযানের উদ্দেশ্যে পাঠান।
অন্যদিকে যখন হযরত হারেসা রা. হযরত ওয়ালিদ রা.-কে চলে যেতে ও ফিরে আসতে দেরি করতে দেখছেন তখন তাঁরাও রাসূল সা. এর কাছে জাকাতের সম্পদ নিয়ে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে রাসূল সা. এর পাঠানো সেনাদলের সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞাসা করেন যে, আপনারা কোথায় যাচ্ছেন। তারা বলেন, আপনারা জাকাত দিতে অস্বীকার করেছেন ও রাসূল সা. এর প্রতিনিধির উপর আক্রমণ করতে চেয়েছেন তাই আপনাদের বিরুদ্ধে অভিযানের উদ্দেশ্যে রাসূল সা. আমাদেরকে পাঠিয়েছেন। হযরত হারেসা রা. বলেন, এমনটি কখনো ঘটেনি। অতপর সবাই রাসূল সা. এর কাছে যান। সবাই মিলে বিস্তারিত আলোচনা করলে ও সব পক্ষের সঙ্গে তদন্ত হলে সব স্পষ্ট হয়ে যায়। তখন আল্লাহ তাআলা আয়াত নাজেল করেন যে, আল্লাহ তাআলা বলেন, হে মুমিনগণ! যখন তোমাদের কাছে কোন পাপী কোন সংবাদ নিয়ে আসে তখন তা যাচাই বাছাই কর যাতে তোমরা কোন জাতিকে অজ্ঞতাবশত আক্রমণ না করে বস।
আলেমগণের মত হল, সাহাবায়ে কেরাম পাপ করেছেন, তবে তাদের সকলের তাওবা আল্লাহ কবুল করে নিয়েছেন। আর তাই আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, সকল সাহাবাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়ে গেছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। আল্লাহ তাআলা সকল সাহাবাদেরকে জান্নাত প্রদানের ওয়াদা করেছেন। অতএব আয়াতের মধ্যে সাহাবা ওয়ালিদ রা.-কে পাপী বলে সম্বোধন করলেও আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। এ ঘটনা দ্বারা এ বিষয়টি প্রতীয়মান হয় যে, কোন অবস্থাতেই শত্রুপক্ষের আক্রমণ বা আক্রমণের প্রস্তুতি বা চুক্তিভঙ্গের বিষয়ে নিশ্চিত খবর না পাওয়া পর্যন্ত কোন ধরনের যুদ্ধ বা অভিযান পরিচালনা করা ইসলামের বিধানমতে সম্পূর্ণ নিষেধ। সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কখনো শত্রুপক্ষের বিরেুদ্ধে যুদ্ধ করা বৈধ নয়।
মুসলমানগণকে একমাত্র তার জীবন, সম্পদ, সম্মান ও স্বাধীনতা রক্ষার খাতিরে বা এ সংশ্লিষ্ট কোন চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর তা শত্রুপক্ষ ভঙ্গ করলে তখন যুদ্ধ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। উপরন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যুদ্ধ বন্ধ করার যত ধরনের শান্তিপূর্ণ উপায় সম্ভব তা গ্রহণ করতে হবে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, প্রথমে শত্রুপক্ষকে ইসলাম গ্রহণ করার দাওয়াত দিতে হবে। যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে তবে কোন অবস্থাতেই তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা যাবে না। যদি ইসলাম গ্রহণে অস্বীকার করে তবে তাদেরকে কর প্রদান করে অন্য মুসলিম নাগরিকদের মত সকল নাগরিক সুবিধা ভোগ করার জন্য আহবান করা হবে। যদি তারা এ প্রস্তাব গ্রহণ করে তবেও তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা যাবে না। যদি এতেও তারা রাজি না হয় কেবল তখনই তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা যাবে। হযরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব রহ. বলেন, হযরত আবু বকর রা. যখন ইয়াজিদ বিন আবু সুফিয়ান, আমর ইবনুল আস এবং সুরাহবীল বিন হেগানাহ রা. সহ সেনাদলকে সিরিয়ায় পাঠান। যখন তারা আরোহণ করে তখন তিনি তাদেরকে বিদায় জানাতে গিয়ে তাদের সঙ্গে হাটতে হাটতে সানিয়াতুল বিদা’ স্থান পর্যন্ত পৌঁছেন। তখন তারা বলেন, আপনি হাঁটবেন আর আমরা বাহনে থাকব? হযরত আবু বকর রা. বললেন, আমি তোমাদের সঙ্গে হাঁটার মধ্যে সাওয়াবের আশা করছি। অতপর হযরত আবু বকর রা. তাদেরকে ওসিয়ত করতে লাগলেন। তিনি বললেন, আল্লাহকে ভয় করার ওসিয়ত তোমাদেরকে করছি। তোমরা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ কর এবং যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ কর। কারণ আল্লাহ তাআলা তাঁর দ্বীনের সাহায্য করবে। তোমরা আত্মসাৎ কর না। তোমরা বিশ্বাস ঘাতকতা কর না। তোমরা কাপুরুষতা প্রদর্শন করবে না। ভূমিতে বিশৃংখলা করবে না এবং যা তোমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে তা অমান্য করবে না। আল্লাহ যদি চায় তবে যখন তোমরা শত্রুদের মুখোমেখি হবে তখন তাদেরকে তিন বিষয়ের প্রতি দাওয়াত দিবে। যদি তারা তোমাদের ডাকে সাড়া দেয় এবং তা গ্রহণ করে নেয় তবে তাদের থেকে (তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা) বিরত থাকবে। তাদেরকে ইসলামের (কবুল করা) দাওয়াত দেবে। যদি তারা তোমাদের ডাকে সাড়া দেয় এবং তা গ্রহণ করে নাও তবেও তাদের থেকে (তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা) বিরত থাকবে। অতঃপর তাদেরকে তাদের বাড়ি থেকে মুহাজিরদের দেশে স্থানান্তর হতে দাওয়াত দিবে। যদি তারা এমনটা করে তবে তাদেরকে জানাবে তাদের সেরকম দায়িত্ব হবে যেরকম মুহাজিরদের দায়িত্ব আছে। তাদের সেরকম অধিকার হবে যেরকম মুহাজিরদের অধিকার আছে। আর যদি তারা ইসলামে প্রবেশ করে এবং তারা মুহাজিরদের দেশের পরিবর্তে তাদের দেশে (থাকা) বেছে নেয় তবে তারা গ্রাম্য মুসলমানদের মত হবে। অন্য মুসলমানদের ক্ষেত্রে যেভাবে আল্লাহর বিধান প্রযোজ্য হয় সেরকম বিধান তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তাদের জন্য মুসলমানদের গনিমত ও সাধারণ সম্পদের মধ্যে কোন অধিকার থাকবে না যতক্ষণ না তারা মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করে। যদি তারা ইসলামে প্রবেশ করতে অস্বীকার করে তবে তাদেরকে কর প্রদানের আহবান কর। যদি তারা এমনটা করে তবে তা গ্রহণ করে নেবে ও তাদের থেকে (তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা) বিরত থাকবে। যদি তারা (কর প্রদানে) অস্বীকার করে তবে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করে আল্লাহ চাইলে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ কর। তোমরা কোন খেজুর গাছ ডুবাবে না এবং জ্বালিয়ে দিবে না। (অযথা) কোন প্রাণিকে, কোন ফলদায়ক গাছ কর্তন করবে না। কোন ধর্মীয় স্থান (গির্জা, মন্দির) ধ্বংস করবে না। কোন শিশু, কোন বৃদ্ধ এবং কোন নারীকে হত্যা করবে না। তোমরা কিছু মানুষ পাবে যারা নিজেদেরকে ধর্মীয় স্থানে (পূজায়) আবদ্ধ রেখেছে তাদেরকে তারা যে কাজের সাধনায় নিজেদেরকে নিমগ্ন রেখেছে তাতে ছেড়ে দেবে। কিছু মানুষ এমন পাবে যাদের মাথার মধ্যে শয়তান ষড়যন্ত্রস্থল বানিয়েছে (অর্থাৎ তারা নিজেরা যুদ্ধ না করলেও যুদ্ধ সম্পর্কে সকল কূটচাল ও পরিকল্পনা তাদের মাথা থেকে আসে)। যদি তাদেরকে পাও তবে তাদেরকে যেখানে পাবে হত্যা করবে ইনশা আল্লাহ।
ইসলামের আরেকটি নীতি যা অন্য কোন যুদ্ধনীতিতে নেই। কাফের বা শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধেও কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করা যাবে না। কখনো চুক্তি ভঙ্গ করা যাবে না। বরং ইসলামের মহান চরিত্র, সততা, ওয়াদা রক্ষা ইত্যাদির প্রদর্শন করতে হবে। হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূল সা. যখন সেনাদল পাঠাতেন তখন বলতেন, তোমরা আল্লাহর নামে বের হও। যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে তাদের সঙ্গে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ কর। তোমরা বিশ্বাস ঘাতকতা কর না। তোমরা আত্মসাৎ কর না। তোমরা শরীর বিকৃত কর না। তোমরা শিশু ও গির্জাবাসী (যাজক, সাধক ও ধর্মগুরু) কে হত্যা কর না। রাসূল সা. বলেন, যে ব্যক্তি কোন পুরুষকে তার জীবনে নিরাপত্তা প্রদান করে তারপরও সে তাকে হত্যা করে তবে আমি হত্যাকারীর দায়মুক্ত যদিও নিহত ব্যক্তি কাফের হয়। হযরত ওমর রা.-এর যুগে তার কাছে একবার খবর পৌঁছে যে, একজন মুজাহিদ পারস্যের এক যোদ্ধাকে বলে, ‘ভয় কর না’, তারপর তাকে হত্যা করে। তখন হযরত ওমর রা. সেনাপতির কাছে চিঠি লেখেন, আমার কাছে খবর পৌঁছেছে যে তোমারদের কিছু মানুষ এক কাফেরকে ধাওয়া করে। যখন সে পাহাড়ে উঠে ও আশ্রয় নেয় তখন সে তাকে বলে, ‘ভয় পেও না।’ তারপর যখন তাকে ধরতে পারে তখন তাকে হত্যা করে। যার হাতে আমার জীবন তার শপথ করে বলছি, এরকম কেউ করেছে আমার কাছে খবর পৌঁছলে আমি তার গর্দান কর্তন করব। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যখনই কোন জাতি ওয়াদা ভঙ্গ করে তখনই আল্লাহ তাআলা তাদের উপর শত্রুদেরকে নিযুক্ত করেন।
বদর যুদ্ধের আগে দ্বিতীয় হিজরীতে রাসূল সা. ও আবু বকর রা. এর সঙ্গে কুরাইশ দলের কাছ থেকে আসা একজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। রাসূল সা. তাকে কুরাইশদের সেনা সংখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। সে বলে, আমি জানি না। রাসূল সা. তাকে বলেন, তারা প্রতিদিন কয়টি পশু জবাই করে? সে উত্তর দিল, নয়টি বা দশটি। রাসূল সা. এখান থেকে হিসাব করে ফেললেন যে তাদের সংখ্যা নয়শত থেকে এক হাজার হবে। সে লোক এখন রাসূল সা. কে জিজ্ঞাসা করেন, আপনারা কে? রাসূল সা. বললেন, আমরা পানি থেকে। সে লোকটি বলতে লাগল, কোন পানি? এটা কি ইরাকের পানি? রাসূল সা. যদি তখন বলেন, আমরা মদিনার লোক তবে সব ফাঁস হয়ে যাবে। তাই বলে কি রাসূল সা. মিথ্যা বলেছেন? না। মিথ্যা বলা, বিশ্বাসঘাতকতাসহ যে কোন অন্যায় আচরণ ইসলাম কোন অবস্থাতেই সমর্থন করে না। বরং তিনি কৌশলে বলেছেন আমরা পানি থেকে অর্থাৎ সকল মানুুষের মূল বা জন্ম পানি থেকে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, আমরা পানি থেকে সকল জীবিত বস্তুকে তৈরি করেছি।
অনেকে বিভ্রান্ত হন যে যুদ্ধের কৌশল হল মিথ্যা বলা আর যুদ্ধে মিথ্যা বলা বৈধ। মূলত রাসূল সা. বলেছেন, তিন স্থানে মিথ্যা বলা যায় : স্ত্রীর সঙ্গে, আপোস করার ক্ষেত্রে ও যুদ্ধে। প্রথম হল স্ত্রীর মন রক্ষার্থে। স্ত্রী দেখতে ভাল না, তখন যদি বলা হয় যে, তুমি সুন্দর না তবে সে কষ্ট পাবে। তাই স্ত্রীর মন রক্ষার জন্য ‘তুমি সুন্দরী’ মিথ্যা হলেও বলতে হবে। অথবা রান্না ভাল না তখন এ কথা বললে স্বামী-স্ত্রীর সুসম্পর্ক থাকবে না। তখন ‘তোমার রান্না অনেক ভাল’ এরকম মিথ্যা বলায় ইসলাম বৈধতা দান করেছে। দ্বিতীয় হল, দু’ জন মানুষের মাঝে আপোস-মীমাংসা ও সুসম্পর্ক তৈরি করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা বলা বৈধ। যেমন দু’জন মুসলমান ঝগড়া করেছে। এখন আপনি যদি একজনের কাছে আরেকজনের দুর্নাম করেন বা একজন আরেকজন সম্পর্কে শত্রুতা ও রাগবশত যা বলে তা যদি আরেকজনকে বলেন তবে সম্পর্ক সুন্দর তো হবেই না বরং সম্পর্ক আরো নষ্ট হবে। সে ক্ষেত্রে এরকম মিথ্যা বলা বৈধ যে, আপনি যার সঙ্গে ঝগড়া করেছেন আসলে সে তো আপনাকে পছন্দ করে। সে বলেছে আপনি তার অমুক দিন অনেক উপকার করেছেন। আপনি তাকে বাহ্যিকভাবে অপছন্দের ভাব দেখালেও আসলে মনে মনে তাকে অনেক পছন্দ করেন। সে তো আপনাকে অনেক পছন্দ করে এবং আপনার অনেক প্রশংসা করে। এরকম কথা যার দ্বারা দু’ জনের মাঝে আপোস করা যায় এরকম কথা মিথ্যা হলেও তা বলায় ইসলাম বৈধতা দিয়েছে। তৃতীয় হল যুদ্ধক্ষেত্রে। আর সেটা বিশ্বাসঘাতকতা বা চুক্তি ভঙ্গ না, কারণ সেটা স্পষ্ট অবৈধ। এ মিথ্যা হল মুলমানগণকে বিরাট ক্ষতি থেকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে যেমন কোন মুসলমান যদি কাফের শত্রুদের হাতে আটক হয় তখন তার কাছে মুসলমানগণ সম্পর্কে তথ্য নিতে চাইবে। মুসলমানগণের সংখ্যা কত? তাদের অস্ত্র কেমন? মুসলমানগণের দুর্বল স্থান কোনটা? মুুসলমান নেতার অবস্থান কোথায় ইত্যাদি তথ্য কাফের শত্রুদেরকে বলে দিলে সকল মুসলমানের বিরাট ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে মিথ্যা বলায় ইসলাম বৈধতা প্রদান করেছে। মিথ্যা কূটকৌশল করা, বিশ্বাসঘাতকতা করা, নিরাপত্তা প্রদানের পরে আঘাত করা বা সন্ধি করার পর আক্রমণ করা এ সব ক্ষেত্রে ইসলাম কখনো বৈধতা দান করেনি।
এ ক্ষেত্রে খন্দকের যুদ্ধে হযরত নুআইম ইবনে মাসউদ রা.-এর কাজ কর্ম দ্বারা কেউ কেউ বিভ্রান্তি ছড়াতে চায়। খন্দকের যুদ্ধে সকল কাফের একত্র হয়ে মুসলমানগণকে পৃথিবী থেকে নিশ্চি‎হ্ন করার উদ্দেশ্যে মদিনা আক্রমণ করে। মদিনার বাইরে থেকে সারা আরবের শত্রুরা আর মদিনার ভিতরে কাফেরের দোসর ইহুদীরা সম্মিলিত আক্রমণ করার ষড়যন্ত্র করে। মুসলমানগণ তাদের সম্মিলিত আক্রমণ থেকে বাঁচার লক্ষ্যে মদিনার চারপাশে পরিখা খনন করে। আরব কাফেররা মদিনা আক্রমণ করতে এসে পরিখা দেখে বাধাপ্রাপ্ত হয়। তাই তারা মদিনাকে চারপাশ থেকে ঘেরাও করে রাখে। বিভিন্ন সময় পরিখা অতিক্রম করে আক্রমণ করতে থাকে। মুসলমানদের শক্ত বাধার কারণে সম্মিলিতভাবে মদিনায় প্রবেশ করতে পারেনি। তবে মদিনার ভিতরে থাকা কাফেরদের দোসর ইহুদিরা তাদের দিক থেকে মদিনায় প্রবেশের সুযোগ দেয়ার ষড়যন্ত্র ও চেষ্টা করছিল। এমন কঠিন সময়ে কাফেরদের সঙ্গে মদিনা আক্রমণ করতে আসা মিত্র দল গেতফান গোত্রে থাকা হযরত নুআইম ইবনে মাসউদ রা. রাসূল সা.-এর কাছে ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন রাসূল সা. তাকে বলেন, হে নুআইম! তুমি আমাদেরকে অবরোধ করা থেকে কাফেরদেরকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা কর। তখন রক্তপাত বন্ধ করার উদ্দেশ্যে কূটকৌশল গ্রহণ করলেন তবে মিথ্যার আশ্রয় নেন নি।
হযরত নুআইম রা. ছিলেন গেতফান গোত্রের মানুষ। যার ফলে তার সঙ্গে কাফেরপক্ষ আর ইহুদীপক্ষ উভয়ের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক ছিল। তিনি তার ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রাখলেন। তিনি ইহুদী নেতাদের কাছে গিয়ে বললেন, দেখ, কুরাইশরা মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এসেছে আর তোমাদেরকে তাদের সাহায্য করতে বলা হচ্ছে। তারা যদি যুদ্ধে বিজয়ী হয় তবে তো ভাল অন্যথায় তারা যদি পরাজিত হয় বা অবস্থা খারাপ দেখে যদি চলে যায় তবে তারা তো চলে যাবে তখন মুসলমানগণ তোমাদেরকে একলা পেয়ে প্রতিশোধ নেবে। তখন তোমরা কাউকে সাহায্যকারী পাবে না। এ কারণে তোমরা কুরাইশদেরকে সাহায্য করার আগে তাদের কাছ থেকে জামানত গ্রহণ কর। যাতে তারা ইচ্ছা করলেই বা অবস্থা বেগতিক দেখলেই তোমাদেরকে একলা রেখে চলে না যায়। ইহুদিরা বলল, তোমার পরামর্শ অনেক ভাল। তারপর তিনি কুরাইশ নেতাদের কাছে গেলেন। তিনি কথার ফাঁকে বললেন, ইহুদীরা তো তোমাদেরকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তারা জামানতস্বরূপ তোমাদের কাছ থেকে বন্ধক চাচ্ছে। তখন কুরাইশ নেতারা রাগ হয়ে গেল। যারা আমাদেরকে বিশ্বাস করে না তাদের সঙ্গে কিভাবে সহযোগিতা হবে? যখন কাফের ও ইহুদীদের মাঝে সরাসরি সাক্ষাৎ হয় তখন ইহুদীরা জামানতস্বরূপ কিছু মানুষ বা কিছু অস্ত্র বন্ধক দাবি করলে কুরাইশ কাফেরদের আত্মসম্মানে লাগে এবং তারা ক্রুদ্ধ হয়ে সহযোগিতার আলোচনা ভেঙ্গে দেয়। হযরত নুআইম রা. এর পুরো ঘটনা দ্বারা প্রতীয়মান যে তিনি কোন মিথ্যা বা বিশ্বাসঘাতকতার আশ্রয় নেননি বরং তিনি রক্তপাত ও ইসলামের বিরাট ক্ষতি থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে কিছু কৌশল গ্রহণ করেছেন মাত্র।
যুদ্ধনীতির মধ্যে ইসলামের আরেকটি অন্যতম নীতি হল ইসলামের মধ্যে সেনাপতি বা দলপতি একজন সাধারণ সেনার মত কাজ করেন। বর্তমান বিশ্বে দলনেতা বা রাষ্ট্রনেতা শুধু শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে বক্তৃতা দেয় ও ঘোষণা দেয় আর সকল কাজ, যুদ্ধ, আক্রমণ, আত্মত্যাগ সাধারণ সেনারা করে। খতীব সাহেব, সভাপতি, সেক্রেটারী বা কমিটির সদস্যগণ সকলকে মসজিদের জন্য, মাদ্রাসার জন্য দান করার জন্য উদ্ধুদ্ধ করেন আর নিজে একটি পয়সাও প্রদান করেন না। নেতা সবাইকে মিছিল আন্দোলন করতে আদেশ করেন আর নিজে কখনো এ সকল কাজে অংশগ্রহণ করেন না। বাবা সন্তানদেরকে পরিষ্কার করতে, ঘুছিয়ে রাখতে সর্বদা আদেশ করেন আর নিজে কখনো করেন না। রাসূল সা. যখন কোন অভিযানে যেতেন তখন সকলের মাঝে দৈনন্দিন সকল কাজ ভাগ করে দিতেন। তবে কঠিন কাজটা রাসূল সা. নিজে করতেন। রান্নার কাজ হলে কাউকে পশু জবাই করা, কাউকে গোশত কাটা, কাউকে পাতিল ধোয়া ইত্যাদি বণ্টন করে দিতেন। আর রাসূল সা. সবচেয়ে কঠিন কাজ জঙ্গল থেকে লাকড়ি আনার কাজ নিজের দায়িত্বে নিতেন।
বদর যুদ্ধে মাত্র সত্তরটি উট ছিল। তখন রাসূল সা. প্রতিটি উটে তিনজন করে ভাগ করে দেন। যাতে পালাক্রমে সবাই উটে আরোহণ করতে পারে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসুদ রা. বলেন, আমরা বদরে যাওয়ার সময় উটের ভাগে তিনজন ছিলাম। আমি, আবু লবাবা, হযরত আলী রা.। তখন দেখলাম রাসূল সা.-এর সফরসঙ্গী হযরত ওকবা রা. বলছেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি উটে আরোহণ করুন। আপনার ভাগের বাকী দু’জন আমরা আপনার হাঁটা হেঁটে দিব। রাসূল সা. বললেন, তোমরা আমার চেয়ে বেশি শক্তিশালী না যে আমার পক্ষ থেকে হাঁটবে। আর না আমি তোমাদের চেয়ে সাওয়াবের কম মুখাপেক্ষী।
খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খনন করতে হবে। সকল সাহাবাদের সঙ্গে রাসূল সা. নিজেও পরিখা খনন করেছেন। বরং কোথাও কঠিন কাজ যা সাধারণ সাহাবাগণ করতে পারতেন না রাসূল সা. নিজে তা করতেন। পরিখা খননের সময় একটা শক্ত পাথর পড়ল যা কোন সাহাবী কোদাল দিয়ে ভাঙতে পারছিলেন না। রাসূল সা. কে ডাকা হলে রাসূল সা. নিজে কোদাল দ্বারা সজোরে তিনবার আঘাত করলেন এবং প্রতিবারই আল্লাহু আকবার বললেন। প্রতিবারের আঘাতে আলো বের হচ্ছিল। অতপর রাসূল সা. সুসংবাদ দিলেন যে, আমি প্রতিবারের আঘাতে যে আলো বের হচ্ছিল তার দ্বারা প্রথমবার আমাকে পারস্যের প্রাসাদ, দ্বিতীয়বার রোমের প্রাসাদ ও তৃতীয়বার সানআ’ এর সাদা ইমারতগুলো দেখানো হয়েছে। এগুলো সব মুসলমানগণের দখলে আসবে। এরকম আশাব্যাঞ্জক ভবিষ্যদ্বাণী আর সুসংবাদ শুনিয়ে ভেঙে-পড়া কান্ত সাহাবাগণের মনোবল চাঙ্গা করলেন।
রাসূল সা. পরিখা খনন করতে করতে কান্ত হয়ে যাওয়া এবং ক্ষুধার তাড়নায় অতিষ্ঠ সাহাবাগণের মনোবল ধরে রাখার জন্য এবং উৎসাহ, উদ্দীপনার সঙ্গে কাজ করার মানসে সুর দিয়ে কবিতা আবৃত্তি করলেন। সাহাবাগণও রাসূল সা. এর সঙ্গে সুর দিয়ে গাইলেন। রাসূল সা. আবৃত্তি করলেন, আখেরাতের জীবন ছাড়া কোন জীবন নেই, হে আল্লাহ! আপনি মুহাজির ও আনসারগণকে ক্ষমা করুন। সাহাবাগণ আবৃত্তি করলেন, আমরা রাসূল সা. এর সঙ্গে অঙ্গীকার করেছি যতদিন আমরা পৃথিবীতে বেঁচে থাকব তাঁর সঙ্গে থাকব। আল্লাহ যদি না চাইতেন তবে আমরা হেদায়েত পেতাম না, নামাজও পড়তাম না এবং সাদাকাও করতাম না। হে আল্লাহ আমাদের উপর প্রশান্তি বর্ষণ করুন আর আমাদের পাগুলো অটল রাখুন যখন কাফেরদের সম্মুখীন হব এবং যখন তারা আমাদের উপর সীমালংঘন করে। যদি তারা আমাদেরকে বিভ্রান্ত করতে চায় তবে আমরা তাদেরকে অমান্য করব। এভাবে রাসূল সা. সেনাপতি ও রাষ্ট্রপতি হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ জনগণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন।
যুদ্ধনীতির মধ্যে ইসলামের একটি নীতি হল, সেনাপতি সেনাদলের খোঁজখবর রাখা। কারো কোন কোন সমস্যার কথা থাকলে তা বিবেচনা করতেন। বদর যুদ্ধের সময় হযরত ওসমান রা.-এর স্ত্রী অসুস্থ ছিলেন। রাসূল সা.-এর কাছে বললে তিনি তাকে তার স্ত্রীর সেবায় থাকার অনুমতি দিয়েছেন এবং তাকে যুদ্ধ অংশগ্রহণকারীদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করেছেন। আরেকজন সাহাবা রা. এসে তার মায়ের অসুস্থের কথা বলেছেন। রাসূল সা. তাকে তার মায়ের সেবা করতে বলেছেন। হযরত আসলাম রা. বলেন, আমরা একবার হযরত আমীরুল মুমিনীন ওমর বিন খাত্তাব রা. এর সঙ্গে বাজারে বের হলাম। পথিমধ্যে এক যুবতী নারী হযরত ওমর রা. এর পথরোধ করে বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আমার স্বামী মারা গেছে আর কিছু ছোট শিশু রেখে গেছেন। তারা কোন উৎপাদনমূলক কাজ করতে পারে না। আমাদের কোন কৃষিও নেই, পশুও নেই। আমি ভয় পাচ্ছি, শিশুগুলো অভাবে মারা যাবে। আমি খাফাফ বিন ইমায়িল গিফারীর কন্যা। আমার বাবা হুদায়বিয়ায় রাসূল সা.- এর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। হযরত ওমর রা. তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে রইলেন, চলে গেলেন না। অতঃপর হযরত ওমর রা. বলেন, স্বাগতম আমাদের নিকটজন আত্মীয়। হযরত ওমর রা. তার বাসায় বাঁধা একটি উট নিলেন তারপর তাতে দু’টি বস্তা রাখলেন। সে দু’টো খাবার, কাপড় সহ বিভিন্ন ভরণ-পোষণ ভর্তি করে সে উটের লাগাম সে যুবতী নারীকে প্রদান করেন। আর বলেন, যাও খরচ করতে থাক। এগুলো শেষ হওয়া মাত্র আল্লাহ তাআলা আরো অনেক কল্যাণ তোমাকে দান করবেন। তখন এক ব্যক্তি বলল, আমীরুল মুমিনীন! আপনি তাকে অতিমাত্রায় দান করলেন। হযরত ওমর রা. বলেন, তোমার মা তোমাকে নষ্ট করুক। আমি তার বাবা ও ভাইকে দেখেছি, তারা একটি দুর্গ দীর্ঘ সময় ঘেরাও করে রেখেছিল অতপর তারা তা জয় করে। আমরা তাদের ভাগের গনিমতের সম্পদগুলো বণ্টন করে নিয়েছি। অর্থাৎ তারা ইসলামের জন্য আমাদের জন্য জীবন দিয়ে গেছেন আর তাদের উসিলায় আমরা এগুলো ভোগ করছি। তবে কিভাবে সে যুদ্ধাহত ভাইদের কথা ভুলে যাব।
পৃথিবীর যুদ্ধনীতির মধ্যে অন্যতম একটি হল যদি কোন সেনা যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতির কথা অমান্য করে বা কোন সেনার ভুলের কারণে সেনাদলের মধ্যে যদি কোন ক্ষতি হয় তবে সে সেনার একমাত্র প্রায়শ্চিত্ত হল তাকে হত্যা করা। দ্বিতীয় কোন নীতি নেই। কিন্তু ইসলামের মধ্যে যদি এরকম অমান্যও কেউ করে বা এরকম ভুলও কেউ করে যার দ্বারা সেনাদলের মধ্যে বিরাট ক্ষতি হয় তবে সেনাপতি ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমাও করে দিতে পারেন। উহুদের যুদ্ধে রাসূল সা. হযরত আব্দুল্লাহ বিন জুবাইর রা. এর নেতৃত্বে সত্তরজন সাহাবাকে রুমা পাহাড়ে অবস্থান করতে বলেন এবং রাসূল সা. তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যদি আমরা পরাজিত হই এবং আমাদেরকে পাখিরা ছিন্ন-ভিন্ন করে খেতে থাকে তবুও তোমরা এ স্থান থেকে নড়বে না। উহুদের যুদ্ধের শুরুতে কাফেররা পরাজিত হয়ে পলায়ন করতে থাকলে এবং অন্য সাহাবাগণ গনিমতের সম্পদ কুড়াতে থাকলে রুমা পাহাড়ের সে সাহাবাগন ভাবলেন যে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। তাই তারা সেখান থেকে সরে এসে গণিমতের সম্পদ কুড়াতে থাকেন। সেনাপতি সহ অল্পকিছু সেখানে অবস্থান করেন এবং অন্য সাহাবাগণকে রাসূল সা. এর আদেশের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। কিন্তু সবাই সে রুমা পাহাড় ছেড়ে চলে যান। তখন সেদিক থেকে তখনকার কাফের নেতা খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-এর নেতৃত্বে একটি দল মুসলমানগণের উপর আক্রমণ করে। রয়ে যাওয়া অল্পকিছু সাহাবা তাদের মোকাবেলায় টিকতে পারেন নি। পিছন দিক থেকে আক্রমণ করায় এবং পালিয়ে যাওয়া কাফেররা ফিরে এসে আক্রমণ করায় মুসলমানগন চারিদিক থেকে আক্রমণের শিকার হন। তখন সাহাবাগণ বিহ্বল হয়ে পড়ায় পরাজয়ের সম্মুখীন হন। হযরত হামজা রা. সহ সত্তরজন নেতৃত্বস্থানীয় সাহাবা শহীদ হন। রুমা পাহাড়ে নিয়োগ করা যে সকল সাহাবাগণের অবাধ্যতা বা ভুলের কারণে মুসলমানগণ এতবড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন তাদেরকে রাসূল সা. কি করেছেন? তাদেরকে হত্যা করেছেন? তাদেরকে বরখাস্ত করেছেন? তাদেরকে বন্দি করেছেন? না, এমন কিছু করেন নি। রাসূল সা. তাদের সকলকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, এমনকি যখন তোমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছ ও কর্তব্য স্থির করার ব্যাপারে বিবাদে লিপ্ত হয়েছ। আর যা তোমরা চাইতে তা দেখার পর অবাধ্যতা প্রকাশ করেছ, তাতে তোমাদের কারো কাম্য ছিল দুনিয়া আর কারো কাম্য ছিল আখেরাত। অতঃপর তোমাদিগকে সরিয়ে দিলেন ওদের উপর থেকে যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন। বস্তুত তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করেছেন।
রাসূল সা. জগতের সামনে এমন যুদ্ধনীতি উপস্থাপন করে গেছেন যার অনুসরণ করে বর্তমান বিশ্ব নতুন করে সভ্যতা, মানবতার অগ্রপথিক দাবিদার পশ্চিমারা জেনেভা কনভেনশনের নীতিগুলো উপস্থাপন করলেও তারা রাসূল সা.-এর অসাধারণ নীতিগুলো তাদের পক্ষে মানা অসম্ভব বলে তাদের নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারে নি। যুদ্ধনীতির মধ্যে উল্লিখিত রাসূল সা. এর নীতিগুলো দ্বারা স্পষ্ট যে, রাসূল সা. কত বড় মহান ছিলেন, তার আদর্শ কত মানবিক, কত কল্পনাতীত কল্যাণকর ছিল—এগুলোর পর্যালোচনা দ্বারা সবার কাছে উজ্জ্বল সূর্যের মত স্পষ্ট যে রাসূল সা. এর আদর্শের তুলনা শুধুমাত্র রাসূল সা.। মনবতা, মহনুভবতা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা যদি কেউ করতে চায় তবে তাকে অবশ্যই ইসলামের ছায়া গ্রহণ করতে হবে । ইসলামের আদর্শ ছাড়া কখনো এটা সম্ভব না।
 
তথ্যসূত্র
 
– ihl-databases.icrc.org/applic/ihl, en.wikipedia.org/wiki/Hague_Conventions_of_1899_and_1907
– আল-কুরআনুল কারীম : ০৫:০২
– আল-কুরআনুল কারীম : ০৫:০২
– আল-কুরআনুল কারীম : ২৮৮৩
– মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা:৩৭০৭৫
– নাসবুর রায়াহ:৩৬১ পৃ.
– আর রাহীকুল মাখতুম:২০৬ পৃ.
– বুখারী শরীফ: ২১৮৪, – আবু দাউদ শরীফ: ২৬৯৩,
– আল-কুরআনুল কারীম : ০২:১৯০
– আবু দাউদ শরীফ: ২৬১৫, বায়হাক্কী শরীফ:১৬৬৯৮
– মুসনাদ আহমাদ: ১৫১৬২
– বুখারী শরীফ: ২৮৫২
– বায়হাক্কী শরীফ: ১৭৫৯১
– আবু দাউদ শরীফ : ২৬৬৯
– আর রাহীকুল মাখতুম:২১৮ পৃ.
– আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৫:২৬
– আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৫:৭৮, মাজমাউজ জায়িদ:৯৯৫০
– আর রাহীকুল মাখতুম:২৪১ পৃ.
– আর রাহীকুল মাখতুম:২৪৯ পৃ.
– আর রাহীকুল মাখতুম:২৫৭ পৃ.
– আর রাহীকুল মাখতুম:২৮০ পৃ.
– আর রাহীকুল মাখতুম:৩৩৬ পৃ.
– আর রাহীকুল মাখতুম:৩৪৮ পৃ.
– আর রাহীকুল মাখতুম:৩৭৩ পৃ.
– মুসনাদ আহমাদ : ১৭৯৯১, বায়হাক্বী শরীফ:১৭৪২১
– আল-কুরআনুল কারীম : ৪৯:৬
– আল-কুরআনুল কারীম : ৫৯:২২
– আল-কুরআনুল কারীম : ৫৭:১০
– বায়হাক্কী শরীফ: ১৬৬৭৪
– মুসনাদ আহমাদ: ২৭২৩
– সহীহ ইবনে হিব্বান : ৫৯৮২
– মুআ’ত্তা মালিক : ৯৬৭
– আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৫:৭৫
– আল- কুরআন : ২১:৩০
– তিরমিজী শরীফ : ১৮৫৮
-সিরাত ইবনে হিশাম: ২:২২৯, বুখারী শরীফ:৪১১৪
-খুলাসা সিয়ারে সাইয়িদিও বাশার: ৮৭ পৃ., -আল-ওয়াফি বিল ওয়াফিয়াত: ১:৭১
– আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৫:৬৭, মুসনা লিশ শাশী: ৫৮৭
-নাসাই শরীফ:৮৮০৭
-বুখারী শরীফ:৩৮৭৪, মুসলিম শরীফ:১৮০৫
– বুখারী শরীফ:৩৯২৮
– আর রাহীকুল মাখতূম:২৩৯
– আল-কুরআনুল কারীম:৩:১৫২
 
 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight