রাসূল সা. উত্তম আদর্শ ও আমাদের অবস্থা : রাসূল সা.-এর মানবতাবাদ ও কল্যাণ কামনা এবং আমরা / ড. মুফতী আবদুল মুকীত আযহারী

রাসূল সা. মানবতাবাদী ছিলেন ও সর্বদা মানুষের কল্যাণ কামনা করতেন। কাদিসিয়ায় একবার হযরত সাহল বিন হানীফ ও কাইস বিন সা’দ রা. বসা ছিলেন। তাঁদের সামনে থেকে একটা লাশ নিয়ে যাওয়া হলে তারা দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁদেরকে বলা হল যে, এটা একজন কর প্রদানকারী বিধর্মীর লাশ। তাঁরা বললেন, রাসূল সা. একবার সাহাবাগণের সাথে বসা ছিলেন। তখন একটা জানাজা তাদের সামনে দিয়ে অতিক্রম করল। রাসূল সা. সে লাশ দেখে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং সাহাবাগণও দাঁড়ালেন। সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এটা এক ইহুদীর লাশ। রাসূল সা. বললেন, তারপরও তো সে মানুষ।  অর্থাৎ, একজন মানুষকে আমি দাওয়াত দিতে পারি নি বলে সে আমার হাতছাড়া হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হল। রাসূল সা. আফসোস করছেন, কারণ তিনি এ ব্যক্তির কল্যাণ করতে পারেন নি। এ লোকটিকে জান্নাতে নিতে পারেন নি।
একজন ইহুদী চাকর রাসূল সা.-এর সেবা করত। সে অসুস্থ হলে রাসূল সা. তার সেবা-শুশ্রƒষার জন্য তার কাছে আসেন। চাকরের মাথার কাছে বসে রাসূল সা. বলেন, হে বালক! ইসলাম গ্রহণ কর। সে তার বাবার দিকে তাকালে তার বাবা বলেন যে, আবুল কাসেম সা.-এর দাওয়াত মেনে নাও। তখন বালকটি ইসলাম গ্রহণ করে। অতপর রাসূল সা. বের হন আর বলতে থাকেন, ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেছেন।’  রাসূল সা. এরকম মানবদরদী ছিলেন। একজন ইহুদী বা বিধর্মী মানুষের প্রতিও রাসূল সা.-এর শুভকামনা ছিল। রাসূল সা. সর্বদা কামনা করতেন যেন কোন মানুষ কষ্ট না পায়। এমন যেন না হয় যে কোন মানুষ ইসলাম ছাড়া দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে আর জাহান্নামে গিয়ে কষ্ট পাবে। রাসূল সা. সর্বদা কামনা করতেন যেন মানুষ সুখী থাকে। চাই সে মুসলমান হোক বা ইহুদী, খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ ইত্যাদি যাই হোক না কেন। রাসূল সা. সর্বদা চেষ্টা করতেন যেন, সকল মানুষ সুখ পায় ইহজগতে এমনিভাবে পরজগতে। আর তাই কোন বিধর্মী ইসলাম ছাড়া মৃত্যুবরণ করলেও রাসূল সা. দুঃখিত হতেন ও হতাশা প্রকাশ করতেন। আর কোন বিধর্মী মৃত্যুবরণ করার আগে ইসলাম গ্রহণ করলে রাসূল সা. যারপরনাই খুশি হতেন।
হযরত তুফাইল বিন আমর রা. ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূল সা. তাঁকে তাঁর জাতির কাছে দাওয়াত দেয়ার উদ্দেশ্যে পাঠালেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার (সত্যবাদিতার) জন্য একটি আলামত প্রদান করুন। রাসূল সা. বললেন, হে আল্লাহ! তাকে আলোকিত করুন। আল্লাহ তাআলা তার দু’ চোখের মাঝে আলো দান করলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহ! আমি আশঙ্কা করছি যে লোকেরা বলবে, এটা একটা শাস্তি। তখন সে আলো তার লাঠির মাথায় চলে আসে। রাতের অন্ধকারে সেটা আলোকিত থাকত। তাঁর গোত্রকে দাওয়াত দেয়ার পর তাঁর বাবা ইসলাম গ্রহণ করেননি কিন্তু তাঁর মা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর গোত্রের মধ্যে কেবল হযরত আবু হুরাইরা রা. ইসলাম গ্রহণ করেন।  তারপর হযরত তোফায়েল রা. রাসূল সা.-এর কাছে আসলেন ও বললেন, আমার জাতি দাওস ইসলাম গ্রহণে অস্বীকার করেছে এবং আল্লাহ ও তার রাসূল সা.-এর অবাধ্য হয়েছে। তাই আপনি তাদের জন্য বদদোয়া করুন। তখন রাসূল সা. ক্বিবলার দিকে ফিরলেন ও হাত ওঠালেন। উপস্থিত লোকজন বলতে লাগল যে, তবে তো দাউস জাতি ধ্বংস হয়ে গেল। রাসূল সা. বললেন, হে আল্লাহ! আপনি দাওস জাতিকে হেদায়াত দান করুন ও তাদেরকে নিয়ে আসুন, হে আল্লাহ! আপনি দাওস জাতিকে হেদায়াত দান করুন ও তাদেরকে নিয়ে আসুন, হে আল্লাহ! আপনি দাওস জাতিকে হেদায়াত দান করুন ও তাদেরকে নিয়ে আসুন।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওবাইদ রা. বলেন, উহুদের দিন যখন রাসূল সা.-এর দাঁত ভেঙ্গে যায়, কপাল ফেটে যায় এবং রাসূল সা.-এর চেহারায় রক্ত প্রবাহিত থাকে তখন তাঁকে কেউ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আল্লাহর কাছে তাদের জন্য বদ দোয়া করেন। রাসূল সা. বললেন, ‘আল্লাহ তাআলা আমাকে অভিশাপ কারী ও দোষারোপকারী রূপে প্রেরণ করেন নি। বরং আল্লাহ তাআলা আমাকে দাঈ ও রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। হে আল্লাহ! আপনি আমার জাতিকে হেদায়াত করুন, কারণ তারা জানে না।’  হযরত আনাস রা. বলেন, উহুদের দিন যখন রাসূল সা.-এর চেহারায় ক্ষত হয়, তার দাঁত ভেঙ্গে যায়, তার কাঁধ তীরের আঘাতে বিদ্ধ হয় এবং রাসূল সা.-এর চেহারায় রক্ত প্রবাহিত থাকে তখন রাসূল সা. রক্ত মুছছেন আর বলছেন, কিভাবে সে জাতি সফল হবে? যারা তাদের নবীর সা. সাথে এমন করল অথচ সে নবী সা. তাদেরকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেন।
হযরত আয়েশা রা. একবার রাসূল সা.-কে জিজ্ঞাসা করেন, উহুদের দিনের চেয়ে কঠিন কোন দিন কি আপনার সামনে এসেছিল? রাসূল সা. বললেন, আমি তোমার জাতির কাছ থেকে সবচেয়ে বেশী কষ্ট পেয়েছি যখন আমি আব্দিয়ালীল-এর সন্তানদের কাছে আক্বাবার কাছে নিজেকে উপস্থাপন করেছিলাম। তখন তারা আমার আহ্বানে সাড়া দেয়নি। রাসূল সা. তায়েফ নেতৃবর্গ ইবনে আব্দিয়ালীল, মাসউদ ও হাবীবের কাছে ইসলামের দাওয়াত দেন ও তাদেরকে ইসলাম ও রাসূল সা.-কে সহযোগিতা করার প্রস্তাব দেন। রাসূল সা. সেখানে দশ দিন অবস্থান করেন এবং সেখানকার সকল প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছান ও ইসলামের সাহায্যের জন্য বলেন। তারা রাসূল সা.-এর দাওয়াতের প্রতি কর্ণপাত করেনি এবং রাসূল সা.-কে অপমান করে। রাসূল সা. তাদেরকে বিষয়টি গোপন রাখার অনুরোধ করেন। তারা অনুরোধ তো রক্ষা করেই নি বরং তারা বলে, তুমি আমাদের শহর থেকে বেরিয়ে যাও এবং তারা নির্বোধ মানুষদেরকে রাসূল সা.-এর পিছনে লেলিয়ে দেয়। রাসূল সা. বের হয়ে যেতে চাইলে তাদের নির্বোধ লোকেরা ও চাকররা তাঁর পিছু নেয় এবং তাঁকে গালিগালাজ ও চেঁচামেচি করতে থাকে। অবশেষে লোকজন রাসূল সা.-এর কাছে জড়ো হয়ে যায় এবং রাসূল সা.-এর চলার পথের দু পাশে দাঁড়িয়ে যায়। সবাই রাসূল সা.-কে পাথর মারতে থাকে, গালি দিতে থাকে, কটু বাক্য ছুঁড়তে থাকে ও রাসূল সা.-কে আঘাত করতে থাকে। আর হযরত জায়েদ রা. নিজের শরীর দ্বারা রাসূল সা.-কে বাঁচাতে থাকেন যার ফলে তার মাথাও আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এভাবে আঘাতের কারণে রাসূল সা.-এর দুটি জুতা রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। রাসূল সা. বলেন, আমি হতাশ হয়ে চলতে থাকি ও একপর্যায়ে বেহুঁশ হয়ে যাই। একসময়ে কারনুস সাআ’লিব নামক স্থানে আমার হুঁশ আসে। আমি মাথা উঁচু করে দেখতে পাই, একটি মেঘের ছায়া আমাকে ঘিরে আছে। আমি তাতে হযরত জিবরাইল আ.-কে দেখতে পেলাম। হযরত জিবরাইল আ. আমাকে বলছেন, আল্লাহ তাআলা আপনার জাতির কথা শুনেছেন ও আপনাকে তারা যা উত্তর দিয়েছে তা শুনেছেন। আল্লাহ তাআলা আপনার কাছে পাহাড়ের ফেরেশতা পাঠিয়েছেন। এ জাতি সম্পর্কে আপনি যা চান তা তাকে আদেশ করতে পারেন। রাসূল সা. বলেন, পাহাড়ের ফেরেশতা আমাকে ডেকে সালাম দিল ও বলল, হে মুহাম্মদ! আল্লাহ তাআলা আপনার জাতির কথা শুনেছেন ও আপনাকে তারা যা উত্তর দিয়েছে তা শুনেছেন। আমি পাহাড়ের ফেরেশতা। আপনার পালনকর্তা আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন যাতে আপনি যা চান সে আদেশ আমাকে করেন। আপনি যদি এ দু’ পাহাড় দ্বারা তাদেরকে পিষিয়ে দিতে চান তবে তাই করব। রাসূল সা. তাকে বলেন, বরং আমি আশা করি, আল্লাহ তাআলা তাদের বংশ থেকে এমন মানুষ সৃষ্টি করবেন যারা আল্লাহর এবাদত করবে ও আল্লাহর সাথে কোন কিছু শরীক করবে না।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রা. বলেন, রাসূল সা. হযরত খালেদ বিন ওয়ালিদ রা.-এর নেতৃত্বে এক জামাতকে জুজাইমা গোত্রের কাছে পাঠান। তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করেন। জুজাইমা গোত্রের লোকেরা (ভাষাগত কারণে) ‘আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি’ সুন্দর করে বলতে পারেনি। তারা বলতে থাকে, আমরা ধর্মান্তরিত হয়েছি, আমরা ধর্মান্তরিত হয়েছি। তখন হযরত খালেদ রা. তাদেরকে হত্যা করতে শুরু করেন ও আটক করতে থাকেন। হযরত ইবনে ওমর রা. বলেন, এক পর্যায়ে আমাদের প্রত্যেকের কাছে তার বন্দীকে দেন ও বলেন যেন আমরা প্রত্যেকে আমাদের হাতে আটক বন্দীকে হত্যা করি। আমি বললাম, আল্লাহর শপথ, আমি আমার বন্দীকে হত্যা করব না এবং আমার সঙ্গী কেউ তার বন্দীকে হত্যা করবে না। পরে আমরা রাসূল সা.-এর কাছে বিস্তারিত বিবরণ দিলে রাসূল সা. বললেন, হে আল্লাহ! খালেদ যা করেছে তা থেকে আমি দায়মুক্ত। এভাবে দু’বার বললেন।  রাসূল সা. হযরত আলী রা.-কে ডেকে বললেন, এ জাতির কাছে যাও এবং অন্ধাকার যুগের সকল কর্মকা- তোমার পায়ের নিচে চাপা দাও। হযরত আলী রা. তাদের কাছে গিয়ে তাদেরকে রক্তপণস্বরূপ অনেক সম্পদ প্রদান করেন।  হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, সেখানে এক যুবক আটক হয়। সে বলে, আমি এ গোত্রের লোক নই। আমি এখানের এক মেয়েকে ভালবাসি। আমাকে একটু তাকে দেখতে দাও তারপর তোমাদের যা ইচ্ছা তা আমার সাথে কর। তাকে দেখতে দেয়া হল। মেয়েটি লম্বা শ্যামলা ছিল। যুবকটি মেয়েকে বলল, হে হুবাইশ! জীবন শেষ হওয়ার ক্ষণে তুমি সুস্থ থেক। তারপর সে কয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করল। মেয়েটি তাকে বলল, তোমার জন্য আমার জীবন উৎসর্গ করলাম। তারপর সে যুবকটিকে আনা হল ও তাকে হত্যা করা হল। মেয়েটি যুবকটির মৃতদেহ দেখে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। চিৎকার করতে করতে সেও মারা গেল। রাসূল সা.-এর কাছে এ খবর পৌঁছানো হলে তিনি বললেন, তোমাদের মধ্যে কি কোন দয়াবান মানুষ ছিল না?
রাসূল সা. সর্বদা হত্যা ও যুদ্ধ থেকে দূরে থাকতে সকল উপায় অবলম্বন করতে উৎসাহিত করতেন। জুজাইমা গোত্র যদিও স্পষ্টরূপে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিতে পারিনি কিন্তু তারা ধর্মান্তরিত হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছিল এবং যুদ্ধ পরিত্যাগ করেছিল। এ ছুতা অবলম্বন করে তাদের সাথে যুদ্ধ থেকে বাঁচা সম্ভব ছিল যেমনটি হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রা. করেছেন। উপরন্তু তিনি বন্দীদেরকে হত্যা করতে বলেছেন। আর রাসূল সা. বন্দিকে হত্যা করতে নিষেধ করতেন। তাই হযরত ইবনে ওমর রা. তার নেতার সে আদেশ পালন করেননি এবং রাসূল সা.ও হযরত ইবনে ওমর রা.-এর এ কাজের প্রতি সমর্থন করেছেন ও হযরত খালেদ রা.-এর নির্দেশের তিরস্কার করেছেন। অথচ সেনাপতি বা নেতার আদেশ মান্য করা ওয়াজিব ও অমান্য করা পাপ। তবে শুধুমাত্র নেতা কোন পাপের আদেশ করলে তা মানতে হবে না ও তা না মানলে কোন পাপ হবে না। এর দ্বারা খুব স্পষ্ট যে কোন বন্দীকে হত্যা করা, শরিয়ত নির্ধারিত চার কারন: জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে, সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে, বাড়ী বা দেশ রক্ষার ক্ষেত্রে এবং ইসলাম প্রচারে বাধা আসার ক্ষেত্র ছাড়া কারো উপর আক্রমণ করা বা কারো সাথে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করা অবৈধ। এ সকল কারণ ছাড়া যে কোন অজুহাতে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া বা কারো উপর আক্রমণ করা সম্পূর্ণ নিষেধ। এটা আবার রাসূল সা. তার উম্মতের সামনে স্পষ্ট করে দিলেন।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা দরকার যে ইসলামী আলেমগণ একমত যে, সাহাবা রা. নিষ্পাপ নয়। সাহাবাগণ পাপ করেন তবে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সে পাপ থেকে তওবা করার তাওফীক দান করেন এবং সকলের সকল পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন। সকল সাহাবাগণের প্রতি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন। এমনিভাবে সকল সাহাবাগণের জন্য জান্নাতের ওয়াদা করেছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সাহাবাগণের অনুসরন করতে বলেছেন এবং সাহাবাগণের ঈমানের মত ঈমান আনয়নের নির্দেশ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, হে মুমিনগণ! লোকেরা (সাহাবাগণ) যেভাবে ঈমান এনেছে সেভাবে তোমরা ঈমান আনয়ন কর।  রাসূল সা. সাহাবাগণের সমালোচনা করতে নিষেধ করেছেন। রাসূল সা. বলেন, তোমরা আমার সাহাবাগণকে গালি দিবে না। কারণ তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও ব্যায় করে তবুও তাদের (সাহাবাগণের) কারো এক মুষ্টি বা এর অর্ধেক দানের সমতুল্য হবে না।  অতএব হযরত খালেদ রা. জুজাইমা গোত্রে কোন ভুল করলেও তার সমালোচনা করা আমাদের জন্য বৈধ নয়। রাসূল সা. এ বিষয়টি আমাদের সামনে স্পষ্ট করেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ বিন আওফা রা. বলেন, হযরত আব্দুর রহমান বিন আওফ রা. রাসূল সা.-এর কাছে হযরত খালেদ রা.-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। রাসূল সা. বলেন, হে খালেদ! বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিকে কেন তুমি কষ্ট দাও? তুমি যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ ব্যয় কর তবুও তার আমলের সমতুল্য হতে পারবে না। হযরত খালেদ রা. বলেন, তারা আমার সমালোচনা করে আর আমি তাদের উত্তর দিয়েছি। তখন রাসূল সা. বলেন, তোমরা খালেদ রা.-কে কষ্ট দিবে না, কারণ সে আল্লাহর তলোয়ারের মধ্য থেকে একটি তলোয়ার যেটাকে আল্লাহ তাআলা কাফেরদের বিরুদ্ধে নিযুক্ত করেছেন।  অতএব কোন অবস্থাতেই হযরত খালেদ রা. বা কোন সাহাবীর কোন প্রকার সমালোচনা করা কখনো আমাদের জন্য বৈধ নয়।
রাসূল সা.-এর এক জামাত তাঈ গোত্রের উপর অভিযান চালান। তাদের কিছু মানুষ পালিয়ে যায় ও কিছুকে আটক করা হয়। সে আটককৃত বন্দীদের মধ্যে সেই গোত্রনেতার কন্যা সাফানা বিনতে হাতেম ও ছিল। রাসূল সা. যখন এ সকল বন্দীদের কাছ থেকে অতিক্রম করছিলেন তখন সে সাফানা রাসূল সা.-কে ডাক দেন এবং বলেন, হে মুহাম্মদ! আমার প্রতি দয়া করুন। আমি আমার গোত্র তাঈর নেতার কন্যা। আমার বাবা হাতেম তাঈ। আমার বাবা অতিথিদের আপ্যায়ন করতেন, ক্ষুধার্তদেরকে খাবার দিতেন, বস্ত্রহীনদেরকে বস্ত্র দিতেন, ভিক্ষুকদেরকে ভিক্ষা দিতেন। দুর্যোগ পরিস্থিতিতে তিনি সবার কাছে সাহায্যের হাত বাড়াতেন। আমার বাবা সেরা দানবীর ছিলেন। আমি সেই প্রসিদ্ধ হাতেম তাঈয়ের মেয়ে। রাসূল সা. তার কথা শুনার পর আদেশ করলেন যে, তাকে ছেড়ে দাও। কারণ তার বাবার মধ্যে ইসলামের চারিত্রিক গুণগুলো ছিল। রাসূল সা. তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমার বাবা যদি জীবিত থাকত তবে আমি তার প্রতি দয়া প্রদর্শন করতাম। শুধু তাকে মুক্ত করেননি বরং রাসূল সা. তাকে বললেন, অপেক্ষা কর এবং নির্ভরযোগ্য কাউকে পেলে তার সাথে নিজ গোত্রের কাছে ফিরে যাবে। কিছুদিন মুসলমানদের সাথে থাকার পর এক কাফেলায় তার বংশের কিছু নির্ভরযোগ্য মানুষ পেলে তাদের সাথে যাওয়ার জন্য রাসূল সা.-এর কাছে অনুমতি চান। রাসূল সা. তাকে কাপড়চোপড়সহ কিছু উপঢৌকন প্রদান করে তাকে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করেন।
খাইবার যুদ্ধে আবুল হাক্বিক দুর্গ মুসলমানগন দখল করার পর হযরত সাফিয়া ও তার এক বোনকে রাসূল সা.-এর কাছে আনা হয়। হযরত বিলাল রা. তাদের দু’জনকে খাইবার যুদ্ধে নিহত ইহুদীদের লাশের পাশ দিয়ে নিয়ে আসেন। ইহুদী নেতাদের মৃত লাশ দেখে হযরত সাফিয়া রা. ও তার বোন আতংকিত হয় ও হযরত সাফিয়া রা.-এর বোন আপন চেহারায় থাপ্পড় মারতে থাকে, চিৎকার করতে থাকে ও মাথার উপর মাটি ঢালতে থাকে। রাসূল সা.-এর কাছে তাদেরকে এ অবস্থায় নিয়ে আসলে রাসূল সা. বলেন, এ শয়তান নারীকে আমার কাছ থেকে আড়াল কর এবং হযরত সাফিয়া রা.-কে রাসূল সা.-এর পিছনে নিয়ে তার উপর চাদর নিক্ষেপ করেন। রাসূল সা. ইহুদী নারীর আতঙ্ক দেখে হযরত বিলাল রা.-কে বললেন, হে বিলাল! তোমার কাছে থেকে দয়া উঠিয়ে নেয়া হয়েছে? তুমি দু’টি নারীকে তাদের পুরুষদের লাশদের সামনে থেকে অতিক্রম করালে।  রাসূল সা. এতটা দয়াবান ও মানবদরদী ছিলেন যে তিনি শত্রুপক্ষের বন্দী নারীদের মানসিক অবস্থার প্রতি খেয়াল রাখতে আদেশ করেছেন। আমরা বর্তমান যুগের নীতি দেখি যে, সকলে শত্রুপক্ষকে বিভিন্নভাবে গায়েল করে। সর্বপ্রথম যে আক্রমণ পরিচালিত হয় তা হল মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণ এবং শত্রুপক্ষ পরাজিত হলেও তাদের বিরুদ্ধে যুগ যুগ ধরে মানসিক আক্রমণ চলতে থাকে। অথচ রাসূল সা. ও ইসলাম সকল মানুষের শুভকামনা করে বলেই শত্রুপক্ষকেও কখনো গালিগালাজ করা, হেয় করা বা মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণ করা সমর্থন করেননি। রাসূল সা. বা সাহাবাগণ কখনো প্রতিশোধমূলক আচরণ কখনো করেননি। শক্রপক্ষের উপর বিজয় লাভ করার পরও কখনো তারা প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি।
রাসূল সা., খোলাফয়ে রাশেদীন এবং সাহাবাগণ কোন যুদ্ধ, কোন অভিযান বা কোন কাজ কখনো প্রতিশোধ নেয়ার উদ্দেশ্যে করেননি। হযরত ওসমান বিন আবী তালহা রা. বলেন, আমরা অন্ধকার যুগে সোমবার ও বৃহস্পতিবার কা’বা ঘর খুলতাম। ইসলামের প্রথম যুগে রাসূল সা. একবার মানুষের সাথে কা’বা ঘরে প্রবেশ করতে চাইলে আমি তার সাথে দুর্ব্যবহার করি ও কঠোর আচরণ করি। তবে রাসূল সা. আমার সাথে সহনশীলতা প্রদর্শন করেন। তারপর বলেন, হে ওসমান! অতিসত্বর তুমি দেখবে যে, এ চাবি আমার হাতে আসবে এবং আমি যেখানে রাখতে চাই সেখানে রাখব। আমি বললাম, তবে সেদিন কুরাইশ ধ্বংস হয়ে যাবে ও অপমানিত হবে। রাসূল সা. বললেন, না, বরং কুরাইশ সেদিন উন্নত হবে ও সম্মানিত হবে। তারপর রাসূল সা. সবার সাথে কা’বা ঘরে প্রবেশ করেন আর আমি ভাবতে থাকি, তবে তো এরকম একদিন আসবে।  মক্কা বিজয়ের দিন রাসূল সা. মক্কায় প্রবেশ করে ওসমান রা.-কে কা’বার চাবি নিয়ে আসার জন্য ডাকেন। হযরত ওসামন রা. ইতস্তত করতে থাকেন। রাসূল সা. হযরত ওমর রা.-কে বলেন, তার সাথে যাও। যদি সে চাবি দেয় তবে তো ভাল নচেৎ তাকে বাধ্য করবে। তিনি তাকে নিয়ে আসেন ও তার মাথা তার কোলে মুড়িয়ে রাখেন। হযরত ওসমান রা. দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকেন। হযরত আব্বাস রা. বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তো জমজমের পানি পান করানোর দায়িত্ব পালন করি, এর সাথে আমাদেরকে কা’বার চাবি বা এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব প্রদান করুন। এ সময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী অবতীর্ণ হয়।  রাসূল সা. বললেন, হে ওসমান! এস, এ চাবি গ্রহণ কর। আল্লাহ তাআলা অন্ধকার যুগে তোমাদের কাছে এ চাবি থাকা পছন্দ করেছেন, এমনিভাবে ইসলামের যুগেও এ চাবি তোমাদের কাছে রাখা পছন্দ করেছেন।  হযরত ওসমান রা. বলেন, আমি ফিরছিলাম, আমাকে ডাকলেন ও বললেন, তোমার কি সে কথা মনে আছে যা আমি বলেছিলাম? আমি রাসূল সা.-এর সে কথা মনে করলাম, ‘হে ওসমান! অতিসত্বর তুমি দেখবে যে, একদিন এ চাবি আমার হাতে আসবে এবং আমি যেখানে রাখতে চাই সেখানে রাখব”। আমি বললাম, হা, আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল।  রাসূল সা. এ মানবদরদ দেখে যুগে যুগে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। পৃথিবীব্যাপী ইসলামের বিস্তার হয়েছে রাসূল সা. ও মুসলমানগণের এ সুন্দর আচরনের ফলে।
রাসূল সা. এতটা মানবতাবাদী ছিলেন যে, কারো সাথে চুক্তি সম্পদিত হওয়ার পর কখনো ভঙ্গ করেননি। কাউকে নিরাপত্তা দেয়ার পর কখনো কারো সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। এমন না যে, কাফেররা তো ইসলামের চরম শত্রু তাই তাদেরকে যেভাবে পারা যায় সেভাবে দমন করতে হবে। যুদ্ধ তো কৌশল তাই যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করা যাবে বা চুক্তি লঙ্ঘন করা যাবে এবং যেভাবে সম্ভব বিজয় লাভ করতে হবে ও শত্রুপক্ষকে দমন করতে হবে। এমনটি রাসূল সা. বা সাহাবাগণ কখনো করেননি এবং ইসলাম এরকম কার্যকলাপ কখনো সমর্থন করে না। এর জ্বলন্ত প্রমাণ হল হুদাইবিয়া সন্ধি। হযরত মিসওয়ার বিন মাখরামা রা. বলেন, হুদায়বিয়া স্থানে মুসলমান ও মুশরিকদের মাঝে সন্ধি হয়। সন্ধির মধ্যে নেতৃত্ব দেয় মুশরিকরদের পক্ষ থেকে সুহাইল বিন আমর ও মুসলমানগণের পক্ষে রাসূল সা.। সন্ধির মধ্যে কিছু ধারা ছিল যা মুসলমানদের জন্য অপমানজনক। এর মধ্যে একটি ধারা ছিল : মুসলমানদের কেউ মুশরিকদের সাথে মিলিত হলে তাকে মুশরিকরা ফিরিয়ে দিবে না কিন্তু  মুশরিকদের মধ্য থেকে কেউ মুসলমানদের কাছে আসলে তাকে মুসলমানগন মুশরিকদের কাছে ফেরত পাঠাবে। এ ধারা লেখার সময় সাহাবাগণ প্রতিবাদ করে বললেন, সুবহানাল্লাহ! একজন মুসলামন হয়ে আসলে তাকে কিভাবে মুশরিকদের কাছে ফেরত পাঠানো হবে? এমন সময় সুহাইলের ছেলে হযরত আবু জান্দাল রা. শিকলে বাধা অবস্থায় মক্কা থেকে দৌড়ে এসে মুসলমানদের মাঝে ঝাঁপ দিল। তখন মুশরিক নেতা সুহাইল বলল, আবু জান্দালকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দাও। রাসূল সা. বললেন, এখনো তো তোমাদের সাথে আমাদের সন্ধি সম্পাদিত হয়নি। সুহাইল তখন বলল, তবে তোমাদের সাথে কোন সন্ধিচুক্তি আমরা আর সম্পাদন করব না। রাসূল সা. অনুরোধ করলেন, তাকে আমাদের কাছে দিয়ে দাও। তারা বলল না, আমরা তাকে দেব না। হযরত আবু জান্দাল রা. বলছেন, হে মুসলমানগণ! আমি মুসলমান হয়েছি, তারপরও আমাকে মুশরিকদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হবে? তোমরা কি দেখ না, আমাকে কত কষ্ট দেয়া হয়েছে? হযরত আবু জান্দাল রা.-কে ইসলামের কারণে কঠিন নির্যাতন করা হয়েছিল। হযরত ওমর রা. রাসূল সা.-এর কাছে গেলেন ও বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি সত্য নবী না? রাসূল সা. বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আমরা সত্য ও আমাদের শত্রুরা কি মিথ্যা না? রাসূল সা. বললেন, হ্যাঁ। হযরত ওমর রা. বললেন, তবে কেন আমরা আমাদের ধর্মের অপমান সহ্য করব? রাসূল সা. বললেন, আমি আল্লাহর রাসূল। আমি তাকে অমান্য করছি না। আল্লাহ আমাকে সাহায্য করবেন।   রাসূল সা. বলেন, হে আবু জান্দাল! ধৈর্য ধর ও সাওয়াবের আশা কর। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমার ও তোমার মত দুর্বলদের জন্য সমাধান বের করে দিবেন। আমরা জাতির সাথে সন্ধি করেছি এবং তারা আমাদেরকে আল্লাহর শপথ দিয়েছে। তাই আমরা তাদের সাথে চুক্তি ভঙ্গ করতে পারি না। তখন হযরত ওমর রা. লাফ দিয়ে আবু জান্দাল রা.-এর সাথে হাটতে থাকে আর বলতে থাকে, হে আবু জান্দাল! ধৈর্য ধর, কারণ তারা মুশরিক।  রাসূল সা. এরকম কঠিন পরিস্থিতি যখন তার চোখের সামনে তাঁর সাহাবা নির্যাতনের মুখে নিপতিত হচ্ছেন এবং তাঁর কাছের সাহাবাগণ প্রতিবাদ করছেন সে অবস্থায়ও কাফেরদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করেন নি।
রাসূল সা. হুদায়বিয়া সন্ধির পর মদিনায় এলে হযরত আবু বসির ওতবা বিন উসাইদ রা. তাঁর কাছে আসেন। তিনি মক্কায় মুশরিকদের হাতে আটক ছিলেন। তিনি কৌশলে মদিনায় পালিয়ে আসেন। মক্কা থেকে তার ব্যাপারে আজহার বিন আব্দে আউফ ও আখনাস বিন শারিক রাসূল সা.-এর কাছে চিঠি পাঠান। আমের গোষ্ঠির একজন ও তার গোলামকে পাঠান। তারা উভয়ে রাসূল সা.-এর কাছে হযরত আবু বসির রা.-কে ফেরত দেয়া সম্পর্কে আজহার ও আখনাস-এর চিঠি নিয়ে আসেন। তখন রাসূল সা. বলেন, হে আবু বাসির! আমরা এ জাতিকে অঙ্গীকার দিয়েছি যা তুমি জান। আমাদের ধর্মে বিশ্বাসঘাতকতা করা ঠিক না। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা  তোমার ও তোমার মত দুর্বলদের জন্য সমাধান বের করে দিবেন। এখন তোমার জাতির কাছে ফিরে যাও। হযরত আবু বসির রা. বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাকে মুশরিকদের কাছে ফেরত পাঠাবেন? তারা আমাকে আমার ধর্ম ছাড়তে নির্যাতন করবে। রাসূল সা. বললেন,  নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা  তোমার ও তোমার মত দুর্বলদের জন্য সমাধান বের করে দিবেন।
বদর যুদ্ধে রাসূল সা. ও সাহাবাগণ যখন বদর প্রান্তরে পৌঁছেন তখন হযরত আলী, জুবাইর সা’দ রা. সহ কিছু সাহাবাকে খবর সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পাঠালেন। সেখানে কুরাইশের একদলকে পেলেন যার মধ্যে আসলাম ও আবু ইয়াসার সহ কিছু গোলাম ছিল। তাদেরকে ধরে রাসূল সা.-এর কাছে নিয়ে আসলেন। রাসূল সা. নামাজ পড়ছিলেন। সাহাবাগণ তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা এখানে কেন এসেছ? তারা বলল, আমরা পানি সংগ্রহে এসেছি। সাহাবাগণ তাদের এ তথ্য পছন্দ করলেন না তাই তাদেরকে আসল তথ্য বের করার উদ্দেশ্যে মারধর করলেন। তারা মার খাওয়ার পর অবশেসে বলল, আমরা আবু সুফিয়ানের দলের লোক। রাসূল সা. নামাজ শেষ করার পর বললেন, যদি তারা সত্য বলে মারতেছ আর যখন তারা মিথ্যা বলে তখন তাদেরকে ছেড়ে দিচ্ছ।  রাসূল সা. তথ্য উৎঘাটনের উদ্দেশ্যে আঘাত করাকে তিরস্কার করলেন। শত্রুপক্ষের লোকজনকে আটক করার পরেও তাদের কাছ থেকে শত্রুপক্ষের তথ্য বের করার উদ্দেশ্যে মারধর করা রাসূল সা. ও ইসলাম সমর্থন করছে না। তবে আমাদের যুগে নিরপরাধ লোকজনকে ধরে ধরে তদন্তের নামে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের প্রচলন পৃথিবী ব্যপি চলছে। শত্রুপক্ষ দূরের কথা বরং নিজ দেশের আপন মানুষকে সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তাদেরকে অহরহ নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে।
রাসূল সা. মানবতাবাদী ও মানবের কল্যাণে কাজ করতেন। আর তাই তিনি সর্বদা সর্ব সাধারণের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। সকল কাজে রাসূল সা. পরামর্শ করতেন। বদর যুদ্ধের আগে বদর যুদ্ধে রাসূল সা. ও সাহাবাগণ অংশগ্রহণ করবেন কি না? তা নিয়ে সকলের সাথে পরামর্শ করতে বসেন। হযরত আবু বকর রা. হযরত ওমর রা. বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে পরামর্শ প্রদান করেন। রাসূল সা. বলেন, আরো পরামর্শ প্রদান কর। হযরত মিকদাদ রা. মতামত দিলেন। রাসূল সা. আবারো বলতে থাকলেন, আরো পরামর্শ দাও। হযরত সা’দ রা. দাঁড়িয়ে বললেন, আপনি মনে হয় আমাদের মতামত চাচ্ছেন। মূলত রাসূল সা. আনসারী সাহাবাগণের মতামত চাচ্ছিলেন। কারণ আক্বাবা অঙ্গীকারে আনসারী সাহাবাগণ অঙ্গীকার করেছে যে, তারা রাসূল সা. ও মুসলমানগণকে রক্ষা করবেন ও সাহায্য করবেন। কোন শত্রু মদিনায় আক্রমণ করলে তাদের বিরুদ্ধে লড়বেন। কিন্তু মদিনার বাইরে গিয়ে লড়ার ক্ষেত্রে কোন অঙ্গীকার হয় নি। তাই রাসূল সা. মদিনাবাসী আনসারী সাহাবীগণের মতামত শুনতে চাচ্ছিলেন। আনসারী সাহাবীগণের পক্ষে হযরত সা’দ বিন ওবাদা রা. দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যে সত্তার হাতে আমার জীবন তার শপথ, আপনি যদি আমাদেরকে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে আদেশ করেন তবে আমরা তাতে ঝাঁপ দিব। আাপনি যদি আমাদেরকে বারকুল গামাদ স্থান পর্যন্ত বাহন চালাতে আদেশ করেন তবে আমরা তাও করব। রাসূল সা. সকলকে রওয়ানা হতে আদেশ করলেন।
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, উহুদ যুদ্ধের আগে আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীরা উহুদ প্রান্তরে এলে রাসূল সা. সাহাবাদের কাছে এসে বললেন, আমি স্বপ্ন দেখেছি যে, আমার তলোয়ার জুল ফিকার ভেঙ্গে গেছে। একটি গরু দেখেছি যেটা জবাই করা হয়েছে, এটা বিপদ। আর দেখেছি যে, আমার শরীরে বর্ম আছে। আর এটা হল মদিনা, শত্রুপক্ষ এখানে পৌঁছতে পারবে না।  রাসূল সা. সাহাবাগণকে বললেন, যদি আমরা মদিনায় অবস্থান করি আর তারা আমাদের কাছে প্রবেশ করে তবে আমরা তাদের সাথে মদিনার মধ্যে যুদ্ধ করব। সাহাবাগণ বললেন, শত্রুপক্ষ অন্ধকার যুগে কখনো আমাদের এলাকায় প্রবেশ করতে পারেনি তবে ইসলামী যুগে তারা কিভাবে আমাদের শহরে প্রবেশ করবে? রাসূল সা. বললেন, তবে তোমাদের মতই চূড়ান্ত। রাসূল সা. যুদ্ধবর্ম পরিধান করে বের হলেন। আনসারী সাহাবীগণ তখন বললেন, আমরা রাসূল সা.-এর মতামতকে ফিরিয়ে দিলাম। তারা আবার রাসূল সা.-এর কাছে এসে বললেন, তবে আপনার মতামতই চূড়ান্ত। রাসূল সা. তখন বললেন, কোন নবী যুদ্ধবর্ম পরিধান  করে ফেললে যুদ্ধ না করা পর্যন্ত তার বর্ম খোলা উচিত নয়।
মানবতাবাদী ও মানবকল্যাণকামী রাসূল সা. জনমানুষের মতামতকে এতটা গুরুত্ব দিতেন যে, রাসূল সা. জনমানুষের মতামতের সম্মানার্থে নিজের মতামতকে ত্যাগ করেছেন। এমনকি উহুদ প্রান্তরে রাসূল সা. জানতেন যে সাধারণ মানুষের মতামত ভুল, তারপরও রাসূল সা. জনমানুষের মতামতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এর নামই তো ছিল গণতন্ত্র। জনমানুষের কল্যাণ সাধণের উদ্দেশ্যে জনমানুষের মতামতের ভিত্তিতে কাজ করা। সারা পৃথিবীতে গণতন্ত্র বাস্তবায়ন ও রক্ষার দাবী করে তবে আমরা দৃষ্টি ঘুরালে কোথাও সেই কাক্সিক্ষত গণতন্ত্র খুঁজে পাই না। অথচ রাসূল সা. সেই চৌদ্দশত বছর আগে সঠিক অর্থের গণতন্ত্র বা জনগণের কল্যাণে জনগণের মতামতকে সম্মান করে কাজ করা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। রাসূল সা. ও সাহাবাগণ তাদের পারিবারিক জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় জীবন সর্বক্ষেত্রে সঠিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত জগতের সামনে রেখে গেছেন।
-বুখারী শরীফ:১২৫০
-বুখারী শরীফ:১২৯০
-ফাতহুল বারী :পৃষ্ঠা-৭০৫, বুখারী শরীফ:৪১৩১
-মুসনাদ আহমাদ শরীফ:৭২৭৩, -মুসলিম শরীফ:২৫২৪
-বায়হাক্বী শরীফ:১৩৭২
-তিরমিজী শরীফ:৩০০৩
-মুসলিম শরীফ:৩৩৫২, বুখারী শরীফ:৩০৫৯, রাহীকুল মাখতুম:১২৫, সীরাত বিন হিশাম:১:৪২০
– বুখারী শরীফ:৬৭৬৬, নাসাঈ শরীফ:৫৪০৫
-ফাতহুল বারী :পৃষ্ঠা-৬৫৫,
-ফাতহুল বারী :পৃষ্ঠা-৬৫৫, -তাবারানী শরিফ :১৭১৮
-কুরআন শরীফ:০২:১৩
-মুসলিম শরীফ:২৫৪১, বুখারী শরীফ:৩৪৭০
– ইবনে হিব্বান:৭২৪৮, মুসলিম শরীফ:২৫৪১, তাবারানী শরীফ:৫৮১
– আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া :৬:২৯০, মুসনাদ আহমাদ:৭২০, উসুদুল গাবা:২২৯৫
– জাদুল মাআ’দ:৩৬১
– মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক:৮৮৬৪
– মুসান্নাফ বিন শাইবা:৩৬২৪১
– জাদুল মাআ’দ:৩৬১
– বুখারী শরীফ:২৫৮৩
-সীরাত বিন হিশাম:২:৩১৯
-সীরাত বিন হিশাম:২:৩২৩, বায়হাক্বী শরীফ: ১৮২৬০
-সিয়ার আ’লামুন নুবালা:২৬:৩০২, -মুসলিম শরীফ:৩৩৩৬
-মুসলিম শরীফ:৩৩৩৬
-তাবারানী শরীফ:১১৯৪৩
-মুসনাদে আহমাদ:১৪৪৯৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight