রাসূল সা. উত্তম আদর্শ ও আমাদের অবস্থা রাসূল সা.-এর ক্ষমা ও ইসলাম বিরোধীদের অপপ্রচার /

রাসূল সা. সর্বদা ক্ষমা করে দিতেন। কারো কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন না। এক গ্রাম্য  লোক রাসূল সা.-কে হত্যা করতে উদ্যত হয়। সে রাসূল সা.-এর কাছে খোলা তরবারি নিয়ে এসে বলে, তোমাকে আমার হাত থেকে কে বাঁচাবে? রাসূল সা. বললেন, আল্লাহ। সে গ্রাম্য ব্যক্তির হাত থেকে তরবারি পড়ে গেলে রাসূল সা. তা তুলে নিয়ে বললেন, তোমাকে এখন আমার হাত থেকে কে বাঁচাবে? রাসূল সা. তাকে ক্ষমা করে দিলেন। রাসূল সা. রক্ষণাত্মক ভূমিকায় ছিলেন তাই তিনি গ্রাম্য লোকটাকে হত্যা করলেও পৃথিবীর কোন আইন বা কোন নীতিতে কোন দোষ বা অপরাধরূপে গণ্য হত না। তারপরও রাসূল সা.-সে গ্রাম্য লোকটাকে ক্ষমা করে দেন। রাসূল সা. এভাবে আক্রমণকারী, নিন্দাকারী সকলকে ক্ষমা করে দিতেন। রাসূল সা. কারো কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন না।
রাসূল সা. সর্বদা মারামারি, হানাহানি থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতেন। রাসূল সা. সর্বদা সাহাবা কেরামগণের সাথে পরামর্শ করতেন এবং সাহাবাগণের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতেন। উহুদ যুদ্ধের সময় রাসূল সা. মদিনায় থেকে যুদ্ধ করার পক্ষে ছিলেন কিন্তু আবেগী যুবক সাহাবাগণ মদিনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার পক্ষে মত দেন। এ মত রাসূল সা.-এর মতের বিরুদ্ধে হওয়া সত্ত্বেও রাসূল সা. তাদের পরামর্শ মেনে নেন ও বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু একমাত্র একস্থানে রাসূল সা. সাহাবাগণের মত গ্রহণ করেননি। সেটা হল হুদায়বিয়া প্রেক্ষাপট।
রাসূল সা. কুরাইশ কাফেরদের সাথে হুদায়বিয়া চুক্তি করেন যাতে অনেকগুলো ধারা মুসলামানদের জন্য হীন ও অপমানজনক ছিল। চুক্তির শুরুতে কাফেররা রাহমান ও রাহীম লিখতে দেবে না। তারা আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ সা. লিখতে দিবে না। কাফেরদের মধ্য হতে কেউ মুসলামনদের কাছে আসলে তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে আর মুসলামানদের মধ্য হতে কেউ কাফেরদের কাছে গেলে তারা তাকে ফিরিয়ে দিবে না। এ কারণে কোন সাহাবা এ চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে একমত ছিলেন না। এমনকি হযরত ওমর রা. রাসূল সা.-এর কাছে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সা.! আমরা কি সঠিক ও তারা কি ভুল পথে না? রাসূল সা. বললেন, হাঁ। আবার বললেন, আমাদের মাধ্যে কেউ নিহত হলে জান্নাতে ও তাদের কেউ মারা গেলে জাহান্নামে যাবে না? রাসূল সা. বললেন, হাঁ। হযরত ওমর রা. বললেন, তবে কেন আমরা হীনতা মেনে নেব? রাসূল সা. বললেন, আমি আল্লাহর রাসূল, এবং আল্লাহ আমাকে সমর্থন করছেন। হযরত ওমর রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাদেরকে বলেননি যে আমরা বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করব? রাসূল সা. বললেন, হাঁ, তবে এ বছরই করবে তা বলিনি। এভাবে হযরত ওমর রা. হযরত আবু বকর রা.-এর কাছে গিয়ে একই প্রশ্ন করলে তিনি রাসূল সা.-এর মতই উত্তর প্রদান করেন। সকল সাহাবা মনঃক্ষুণœ ছিলেন তাই রাসূল সা. তাদেরকে ইহরামের কাপড় খুলে মাথা মু-াতে বললে হতাশার কারণে কোন সাহাবা নড়াচড়া করলেন না। অবশেষে হযরত উম্মে সালামা রা.-এর পরামর্শে রাসূল সা. নিজে মাথা মু-ন শুরু করলে সাহাবাগণ একের পর এক সবাই মাথা মু-ন করেন। রাসূল সা. সকল সাহাবাগণের পরামর্শ উপেক্ষা করে হুদাইবিয়া সন্ধি করেছেন কারণ তিনি সর্বদা শান্তির পক্ষে ছিলেন এবং শান্তিকে ভালবাসতেন। রাসূল সা. রক্তারক্তি, হানাহানি পছন্দ করতেন না বলেই হুদায়বিয়া চুক্তি বা ১০ বছরের জন্য যুদ্ধবিরতি সন্ধি করলেন।
হযরত সালমা ইবনুল আকওয়া রা. বলেন, হুদায়বিয়ার সময়ে রাসূল সা. আমাকে অস্ত্রহীন দেখে আমাকে একটি চামড়ার ঢাল দিল। সেটা আমি আমার চাচা আমের রা.-কে দিয়ে দিই। সন্ধি হওয়ার পরে মক্কার চারজন মুশরিককে দেখলাম যে, তারা রাসূল সা.-এর উপর আক্রমণ করতে চাচ্ছে। তারা একটি গাছের কাছে বিশ্রাম নিল ও তাদের অস্ত্রগুলো গাছের সাথে ঝুলিয়ে তারা সেখানে শুয়েছিল। এমন সময় এক ঘোষক বলতে লাগল, হে মুহাজিরগণ! ইবনে জুনাইম রা. নিহত হয়েছেন। (কাফেরদের মধ্যে কেউ চুক্তি ভঙ্গ করে মুসলমান সাহাবীকে হত্যা করল) তখন আমি আমার তলোয়ার বের করে সে চারজনের উপর আক্রমণ করে তাদের চারওজনকে শোয়া অবস্থায় বেঁধে ফেললাম এবং রশি আমার হাতে নিলাম। যে সত্তা মুহাম্মদ সা.-কে সম্মানিত করেছেন তার শপথ, তাদেরকে বললাম, তোমাদের কেউ মাথা উঁচু করলে তার মাথা আমি কেটে ফেলব। তারপর তাদেরকে রাসূল সা.-এর কাছে নিয়ে এলাম। এমন সময়ে আমার চাচা আমের রা. আবালাত বংশের মেকরাজকে সুসজ্জিত ঘোড়ায় সত্তরজন মুশরিক সহ রাসূল সা.-এর কাছে ধরে নিয়ে আসল। তারাও এরকম অতর্কিত হামলা করছিল। রাসূল সা. বললেন, তাদেরকে ছেড়ে দাও, কারণ এদ্বারা নতুন করে আবার রক্তপাত শুরু হবে। রাসূল সা. তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন।  কাতাদা রা. বলেন, হুদাইবিয়ার পাদদেশে রাসূল সা.-এর এক সাহাবী জুনাইম রা. উঁকি দিলে মুশরিকরা তাকে তীর মেরে হত্যা করে। রাসূল সা. এক অশ্ববাহিনী পাঠালে তারা বারোজনের একটি অশ্ববাহিনী রাসূল সা.-এর কাছে ধরে নিয়ে আসেন। রাসূল সা. তাদেরকে বলেন, তোমাদের কোন নিরাপত্তা আছে? কেউ তোমাদেরকে নিরাপত্তা দিয়েছে? তারা বলল, না। রাসূল সা. তারপরও তাদেরকে ছেড়ে দিলেন।  রাসূল সা. শুধুমাত্র শান্তির আশায় এবং তিনি সর্ব শান্তিকে ভালবাসতেন বলে তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। রাসূল সা. সর্বদা ক্ষমা করতেন এবং এখানে সত্তরজনের বিশাল এক দলকে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন।
হযরত আনাস রা. বলেন, তানয়ীম নামক স্থানে ফজরের সময়ে মক্কাবাসী মুশরিকদের আশিজনের একটি দল রাসূল সা. ও সাহাবাদেরকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করে। রাসূল সা. তাদেরকে ধরে ফেলেন এবং তাদের সকলকে ক্ষমা করে দেন। অতপর আল্লাহ তাআলা আয়াত নাজেল করেন, তিনি মক্কার উপকণ্ঠে তাদের হাতসমূহকে তোমাদের কাছ থেকে এবং তোমাদের হাতসমূহকে তাদের কাছ থেকে ফিরিয়েছেন।  রাসূল সা. হানাহানিমুক্ত নিরাপদ পরিবেশ এবং শান্তিময় সমাজ চেতেন বলেই রাসূল সা. সর্বদা শত্রুদেরকে ক্ষমা করতেন এবং তাদের সাথে সংলাপ ও আপোস আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পক্ষে ছিলেন।
রাসূল সা. মক্কা বিজয়ের সময় প্রথমে বাইতুল্লাহের ভিতরে প্রবেশ করেন ও সেখানে নামাজ পড়েন। তারপর দরজা খুলে বের হন এবং কুরাইশরা সবাই মসজিদে সমবেত ছিল। তারা অপেক্ষায় ছিল, রাসূল সা. এখন কি করেন। রাসূল সা. দরজার দু’টি খুঁটি ধরে দাঁড়ালেন আর সকলে নিচে ছিল। রাসূল সা. ভূমিকার পরে বলেন, হে কুরাইশ জাতি! আল্লাহ তাআলা তোমাদের মধ্য থেকে অন্ধকার যুগের অহংকার ও বাপ-দাদা নিয়ে বড়লোকি মোচন করেছেন। সকল মানুষ আদম আ.-এর সন্তান আর আদম আ. মাটির সৃষ্টি। তারপর তেলাওয়াত করলেন, হে লোকসকল! তোমাদেরকে নারী ও পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি ও তোমাদেরকে বিভিন্ন গোত্রে ও বংশে তৈরি করেছি যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পার। নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে সেই সম্মানিত যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে আল্লাহভীরু। তারপর বলল, হে কুরাইশ জাতি! তোমরা কি মনে কর, আমি তোমাদের সাথে কি করব? তারা বলল, ভাল আশা করছি। আপনি সম্মানিত ভাই এবং সম্মানিত ভাইয়ের ছেলে। তিনি বলেন, আমি তোমাদেরকে সেরকম বলব যেরকম ইউসুফ আ. তার ভাইদেরকে বলেছিল, আজ তোমাদের ব্যাপারে কোন অভিযোগ নেই। তোমরা যাও, তোমরা সকলে মুক্ত।
হযরত আলী রা. বলেন, যখন হযরত হাসান রা. জন্ম গ্রহণ করল তখন তার নাম রাখলাম হারব যার অর্থ যুদ্ধ। রাসূল সা. যখন এসে বললেন, আমাকে আমার সন্তানকে দেখাও। আর জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা তার কি নাম রেখেছ? আমি বললা, তার নাম রেখেছি হারব বা যুদ্ধ। রাসূল সা. বললেন, না, তোমরা তার নাম রাখ হাসান যার অর্থ সুন্দর। আবার যখন হুসাইন রা. জন্ম লাভ করে তখন আমি তার নাম রাখলাম হারব। রাসূল সা. যখন এসে বললেন, আমাকে আমার সন্তানকে দেখাও। আর জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা তার কি নাম রেখেছ? আমি বললাম, তার নাম রেখেছি হারব বা যুদ্ধ। রাসূল সা. বললেন, না, তার নাম রাখ হুসাইন যার অর্থ ভাল। যখন আমার তৃতীয় সন্তান হল তখন রাসূল সা. এসে বললেন, আমাকে আমার সন্তান দেখাও। আর জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা তার কি নাম রেখেছ? আমি বললাম, তার নাম রেখেছি হারব বা যুদ্ধ। রাসূল সা. বললেন, না, তার নাম রাখ মুহসিন যার অর্থ কল্যাণকারী। অতপর রাসূল সা. বললেন, আমি তাদের নাম হারুন আ.-এর সন্তানদের মত নাম রেখেছি। তার সন্তানদের নাম ছিল, শাবার, শুবাইর ও মুশবির যার অর্থ চালাক, উদ্যমী ও ত্যাগী।  এ ঘটনা দ্বারা প্রতিয়মান হয় যে, রাসূল সা. শান্তি-নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি এতটাই পছন্দ করতেন যে তিনি যুদ্ধ শব্দ শুনতে চাইতেন না বা এ শব্দে কারো নাম রাখতে চাইতেন না।
রাসূল সা. একবার সফরে ছিলেন ও পথিমধ্যে ক্ষুধার্ত হন। তখন এক রাখাল তাকে দুধ পান করাতে চান। রাসূল সা. জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার নাম কি? সে বলল, মুররাহ (টক বা তিতা)। তখন তার দেয়া দুধ পান করলেন না। আরেকজন রাখাল এসে দুধ পান করাতে চাইলে রাসূল সা. তার নাম জিজ্ঞাসা করলেন, সে বলল, যুদ্ধ। তখন রাসূল সা. তার দেয়া দুধও পান করলেন না। তৃতীয় এক রাখাল এসে দুধ পান করাতে চাইলে রাসূল সা. তার নাম জিজ্ঞাসা করলেন। সে বলল, ইয়ায়িশ বা দীর্ঘজীবী থাক। তখন রাসূল সা. তার দেয়া দুধ পান করলেন। রাসূল সা. যুদ্ধকে এতটাই অপছন্দ করতেন যে এরকম শব্দের নামও অপছন্দ করতেন। এমনকি আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমাদের উপর যুদ্ধ ফরজ করা হয়েছে অথচ এটা (যুদ্ধ) তোমাদের কাছে অপছন্দনীয়।  যুদ্ধ মুসলমানদের কাছে অপ্রিয়, অপছন্দনীয় ও ঘৃণিত একটি ব্যাপার। যুদ্ধ কোন সময়ে মুসলমানদের কাছে প্রিয় বা কাম্য বিষয় নয় ও ছিলও না।
তারপরও রাসূল সা., সাহাবাগণ কেন যুদ্ধ করেছেন? আল্লাহ তাআলা বলেন, আপনি কেন এমন জাতির সাথে যুদ্ধ করেন না যারা তাদের চুক্তি লংঘন করেছে এবং তারা রাসূল সা. কে বিতারিত করার ইচ্ছা পোষণ করেছে ও তারাই আপনাদের সাথে প্রথমে (শত্রুতা) শুরু করেছে। আপনারা কি তাদেরকে ভয় করেন? অথচ আল্লাহ তাআলাকেই ভয় পাওয়া বেশি দরকার, যদি আপনারা মুমিন হন।  রাসূল সা. কখনই কাফেরদের সাথে প্রথমে যুদ্ধ করেন নি। বরং কাফের ও মুশরিকরাই সর্বদা প্রথমে যুদ্ধ শুরু করেছে। রাসূল সা. সর্বদা আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ করেছেন, তিনি কখনো আক্রমণাত্মক যুদ্ধ করেননি। ইসলামী চিন্তাবিদগণ বলেন, চার কারণে রাসূল সা. ও সাহাবাগণ যুদ্ধ করেছেন বা শক্তি প্রয়োগ করেছেন এবং এ চার ক্ষেত্রে যুদ্ধ বৈধ গণ্য করেছেন। জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে, সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রে, বাড়ি বা দেশ রক্ষার ক্ষেত্রে এবং ইসলাম প্রচারে বাধা আসার ক্ষেত্রে। কোন শত্রু যদি কোন মুসলমানের জীবন, সম্পদ বা তার বাড়ি-ঘর ও দেশের উপর আক্রমণ করে অথবা মুসলমানের ধর্ম প্রচারের স্বাধীনতার উপর আক্রমণ করে তবে জীবন, সম্পদ, দেশ ও ইসলাম প্রচারের স্বাধীনতা রক্ষার উদ্দেশ্যে সে আক্রমণ প্রতিহত করা বা যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে ইসলামের অনুমতি আছে।
অনেকে বলেন, তলোয়ার বা যুদ্ধ দ্বারা ইসলাম প্রচার ও প্রসারিত হয়েছে। রাসূল সা. ও সাহাবাগণ রা. যুদ্ধ করে দেশ জয় করেছেন ও তলোয়ার দ্বারা ইসলাম প্রচার করেছেন। প্রকৃতপক্ষে রাসূল সা., সাহাবাগণ রা. সেখানেই যুদ্ধ করেছেন যেখানে কোন মুসলমানের জীবন, সম্পদ, বাড়ি-ঘর বা দেশের উপর আক্রমণ হয়েছে অথবা ইসলাম প্রচারের স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে ও যে সকল স্থানে ইসলাম প্রচারে শত্রুপক্ষ বাধা প্রদান করেছেন। খুলাফায়ে রাশিদীনের যুগে অর্ধ পৃথিবীতে ইসলামের আলো ছড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রাসূল সা. ও খোলাফায়ে রাশিদীন হাবাশায় কোন সেনাদল অভিযানে পাঠান নি। কারণ হাবাশা বা ইথিওপিয়ার সরকার বা জনগন যদিও কাফের ছিল তবুও সেখানে ইসলাম প্রচারের স্বাধীনতা ছিল। মুসলমান মুসলমানদের ধর্মকর্ম পালন করতে পারতেন, কেউ তাদেরকে বাধা দিত না। এ কারণে মক্কার কাফেরদের নির্যাতন থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে মুসলমানগণ মক্কা থেকে হাবাশায় হিজরত করেন। হাবাশায় ইসলাম প্রচারের স্বাধীনতা ছিল বলে এখানে রাসূল সা. বা সাহাবাগণ কোন সেনা অভিযান পরিচালনা করেন নি। এভাবে যোখানেই ইসলাম প্রচারের স্বাধীনতা হরণ করা হয়নি সেখানে রাসূল সা. বা সাহাবাগণ কোন সেনা অভিযান পরিচালনা করেন নি। বরং শুধুমাত্র সেখানেই সেনা অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে যেখানে ইসলাম প্রচারে বাধা প্রদান করা হয়েছিল। উপরন্তু সকল অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল, ইসলামের দাওয়াত প্রচার করা, যুদ্ধ করা নয়। এ কারণেই রাসূল সা. ইসলামের দাওয়াত দেয়ার আগে যুদ্ধ পরিচালনা করতে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন।
রাসূল সা. ও সাহাবাগণ রা. মূলত সব স্থানে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন এবং দাওয়াত দেয়ার আগে যুদ্ধ করার নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে রাসূল সা.-এর স্পষ্ট নির্দেশনা আছে। হযরত সুলাইমান বিন বুরাইদা রা. বলেন, রাসূল সা. যখন কোন সেনা দলের নেতা মনোনয়ন করতেন তখন তাকে আল্লাহকে ভয় করা ও তার সাথের মুসলমানদের সাথে ভাল আচরন করার আদেশ করতেন। তারপর বলতেন, আল্লাহর নামে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ কর, যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে তাদের সাথে যুদ্ধ কর, আত্মসাৎ করবে না, বিশ্বাসঘাতকতা করবে না (অর্থাৎ হঠাৎ আক্রমণ করবে না এবং ইসলামের দাওয়াত দেয়ার আগে আক্রমণ করবে না), নাক-কান কর্তন করবে না এবং শিশুকে হত্যা করবে না। যখন শত্রুদের সাথে মিলিত হবে তখন তাদেরকে তিনটি বিষয়ের প্রতি দাওয়াত দিবে। তারা যে আহবানেই সাড়া দেয় তা গ্রহণ করে নিবে ও তাদের তরফ থেকে হাত গুটিয়ে নিবে। (প্রথমত) ইসলামের দাওয়াত দিবে। তারা যদি এ দাওয়াতে সাড়া দেয় তবে গ্রহণ করে নিবে ও তাদের তরফ থেকে হাত গুটিয়ে নিবে। তারপর তাদেরকে দাওয়াত দিবে যেন তারা তাদের বাড়ি থেকে মুহাজিরদের (মুসলমানদের) বাড়িতে স্থানান্তরিত হয় তবে মুহাজির মুসলমানগণ যে সুবিধা পায় তা তারাও পাবে। যদি তারা অস্বীকার করে ও নিজ বাড়িতে থাকতে চায় তবে তাদেরকে জানিয়ে দিবে যে, তারা সাধারণ মুসলমানদের মত গণ্য হবে। সাধারণ মুসলমানদের ক্ষেত্রে যে বিধান আছে সে বিধান তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে এবং গনিমত ও ফাইয়ে (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) তাদের কোন অংশ হবে না। তবে তারা যদি মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তবে অংশ পাবে। যদি তারা (ইসলাম গ্রহণে) অস্বীকার করে তবে তাদেরকে কর দিতে আহবান করবে। তারা যদি এ আহ্বানে সাড়া দেয় তবে গ্রহণ করে নেবে ও তাদের তরফ থেকে হাত গুটিয়ে নিবে। আর যদি তারা (কর দিতেও) অস্বীকার করে তবে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে।
হযরত আবুল বুখতুরী রা. বর্ণনা করেন, হযরত সালমান ফারসী রা.-এর নেতৃত্বে মুসলমানদের একদল পারস্যের এক প্রাসাদ ঘেরাও করেন। মুসলমানগণ বলেন, হে আবু আব্দুল্লাহ (হযরত সালমান রা.-এর উপাধি)! আমরা কি আক্রমণ করব না? হযরত সালমান রা. বলেন, আমাকে তাদেরকে দাওয়াত দেয়ার সুযোগ দাও। কারণ আমি রাসূল সা.-কে এভাবে দাওয়াত দিতে শুনেছি। অতপর সালমান রা. তাদের কাছে এসে বললেন, আমি তোমাদের মত একজন পারস্য ব্যক্তি। তোমরা দেখেছ যে আরব আমাকে মানছে। তোমরা যদি ইসলাম গ্রহণ কর তবে আমাদের জন্য যে সুযোগ- সুবিধা আছে তা তোমাদের জন্য হবে এবং আমাদের উপর যে দায়িত্ব আছে তাও তোমাদের উপর কার্যকর হবে। যদি তোমরা (ইসলাম গ্রহণে) অস্বীকার কর ও তোমার ধর্মেই থাকতে চাও তবে ছোট হয়ে (আমাদের শাসন মেনে নিয়ে) আমাদেরকে কর দিবে। যদি অস্বীকার কর তবে তোমাদের সাথে প্রকাশ্যে যুদ্ধ করব। তারা বলল, আমরা কর দিব না বরং তোমাদের সাথে যুদ্ধ করব। মুসলমানগণ বললেন, হে আবু আব্দুল্লাহ! আমরা কি আক্রমণ করব না? তিনি বললেন, না। অতপর সালমান রা. তিন দিন এভাবে দাওয়াত দিলেন। তারপর তিনি বললেন, আক্রমণ কর। বর্ণনাকারী বলেন, অতপর আমরা আক্রমণ করে প্রাসাদ জয় করি।  হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূল সা. ইসলামের দাওয়াত দেয়া ছাড়া কখনো কারো সাথে যুদ্ধ করেন নি।
কোন নেতা যখন কোন সেনাদলকে কোন সেনা অভিযানে পাঠান তখন তারা সেনাদলের মনোবল চাঙ্গা করতে শত্রুদলকে আক্রমণের বিভিন্ন উপায় বলে দেন ও কঠিন আক্রমণ করার দিক নির্দেশনা দেন। শত্রুপক্ষকে নির্মূল ও নিশ্চি‎হ্ন করাতে উদ্ধুদ্ধ করতে থাকেন। কিন্তু রাসূল সা. যখন হযরত আলী রা.-কে খাইবার যুদ্ধে পাঠাবার সময় যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে অনুৎসাহিত করেছেন ও শত্রুপক্ষের সাথে শান্তির উপায় অবলম্বন করার নির্দেশনা দিয়েছেন। শত্রুপক্ষকে মুসলমান বানানোর ব্যপারে উৎসাহিত করেছেন। রাসূল সা. বলেছেন, ধীরে ধীরে গিয়ে তাদের স্থানে অবস্থান নেবে তারপর তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেবে। তাদের উপর আল্লাহর পাওনাগুলোর মধ্য থেকে যে সকল কর্তব্য আছে সে ব্যাপারে অবহিত করবে। আল্লাহর শপথ তোমার মাধ্যমে কাউকে আল্লাহ হেদায়াত দেয়া তোমার মালিকানায় সতেজ উটসমূহ হওয়ার চেয়ে উত্তম।  অন্য এক হাদীসে রাসূল সা. বলেন, তোমার মাধ্যমে কাউকে আল্লাহ হেদায়াত দেয়া যেখানে সূর্য উদিত হয় ও অস্ত যায় এর চেয়ে অর্থাৎ দুনিয়ার তুলনায় উত্তম।  অন্য এক বর্ণনায় রাসূল সা. বলেন, তোমার মাধ্যমে কাউকে আল্লাহ হেদায়াত দেয়া দুনিয়া ও দুনিয়ায় যা আছে এর তুলনায় উত্তম।  সাধারণ সমরবিদরা মনে করে যে, যুদ্ধ ক্ষেত্রে অসতর্ক অবস্থায় হঠাৎ আক্রমণ করা শত্রুপক্ষকে পরাভূত ও নির্মূল করার একটি উপায় এজন্য সমরবিদরা এ ব্যাপারে তাদের সেনাদলকে নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। অথচ ইসলামে শত্রু নিধন বা শত্রু হত্যা উদ্দেশ্য নয় বলে রাসূল সা. স্পষ্ট আদেশ করেছেন, হঠাৎ আক্রমণ করবে না, ধীরে ধীরে অবস্থান নিয়ে শত্রুপক্ষকে তোমাদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে দেবে। শুধু এতটুকু না, বরং শত্রুপক্ষকে ইসলামের দাওয়াত দিবে এবং শত্রুপক্ষ মুসলমান হয়ে যাওয়া তাদেরকে পরাজিত করা বা শত্রুপক্ষকে নির্মূল করার চেয়ে অনেক উত্তম। এভাবে শত্রুপক্ষ নিধন করার তুলনায় তাদের মঙ্গল কামনা করতে রাসূল সা. উৎসাহিত করেছেন। সর্বদা রাসূল সা. মানব হত্যার ক্ষেত্রে অনুৎসাহিত করেছেন ও সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। রাসূল সা. বলেছেন, কোন ব্যক্তি কাউকে নিরাপত্তা দিল তারপর তাকে হত্যা করল তবে কেয়ামতের দিন তাকে বিশ্বাসঘাতকতার পতাকা বহন করতে দেয়া হবে।  অন্য হাদিসে রাসূল সা. আরো সতর্ক করে বলেন, কোন ব্যক্তি কাউকে নিরাপত্তা দিল তারপর তাকে হত্যা করল তবে আমি হত্যাকারীর দায়িত্ব থেকে মুক্ত যদিও নিহত ব্যক্তি কাফেরই হোক না কেন।  রাসূল সা. বলেন, তোমরা বৃদ্ধকে হত্যা করবে না, শিশু ও নারীকে হত্যা করবে না, আত্মসাৎ করবে না। গনিমত বা যুদ্ধলব্দ সম্পদকে একত্রিত করবে এবং সংস্কামূলক কাজ করবে। (সকলের প্রতি দয়া ও) কল্যাণ করবে কারণ আল্লাহ তাআলা কল্যাণকারীকে ভালবাবেসন।  হযরত রাবাহ বিন রাবী, রা. বলেন, আমরা রাসূল সা.-এর সাথে এক যুদ্ধে ছিলাম। অতপর রাসূল সা. লোকজনকে কোন কিছুর কাছে জমায়েত দেখে একজন লোককে পাঠালেন, দেখে আস, লোকজন কেন জমায়েত হয়েছে? সে বলল, একজন নিহত নারীর সামনে লোকজন জমায়েত হয়ে আছে। রাসূল সা. বললেন, এতো যুদ্ধ করেনি। বর্ণনাকারী বলেন, হযরত খালিদ বিন ওয়ালীদ রা. সামনে ছিলেন। রাসূল সা. একজন লোককে পাঠিয়ে বললেন যে হযরত খালিদ রা.-কে বলবে, সে যেন কোন নারী ও কর্মচারীকে হত্যা না করে।  হযরত আলী রা. বলেন, যারা আগে বা পিছনে পলায়ন করে তাদেরকে হত্যা করবে না। আহত ব্যক্তির উপর আক্রমণ করবে না। কোন ঘরে প্রবেশ করবে না। যে অস্ত্র ফেলে দিয়েছে সে নিরাপদ এবং যে দরজা বন্ধ করেছে সেও নিরাপদ।  হযরত আবু বকর রা. বলেন, তোমরা শিশু, নারী, বৃদ্ধ, অসুস্থ এবং পাদরিকে হত্যা করবে না। ফলদার গাছ কাটবে না। নির্মিত বস্তু ধ্বংস করবে না। খাবারের উদ্দেশ্য ছাড়া উট- গরু জবাই করবে না। কোন খেজুর গাছ ডোবাবে না ও জ্বালাবে না।
আমরা ইসলামের বিধান সম্পর্কে সম্যক অবগত নই এবং ইসলাম সম্পর্কে জানতে আমাদের আগ্রহও কম। আর এ সুযোগে ইসলামের শত্রুরা, ইসলামের বিরুদ্ধে চিরাচরিত ষড়যন্ত্রকারীরা ইসলাম সম্পর্কে বিভন্ন রকম বিভ্রান্তিমূলক তথ্য উপস্থাপন করে ইসলাম ও মুসলামন জাতির  ধারাবাহিক সমালোচনা করে যাচ্ছে। ইসলামের বিরুদ্ধে পৃথিবীব্যাপী মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলশ্রুতিতে বর্তমানে অনেক মুসলমান সন্তানের মধ্যেও ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা জন্মাতে তারা সক্ষম হয়েছে। ইসলাম বিদ্বেষীদের মধ্য থেকে অনেকে বলে, ইসলাম যুদ্ধে উৎসাহিত করে বা রাসূল সা. যুদ্ধবাজ ছিলেন (নাউজু বিল্লাহ), মুসলমানগণ জঙ্গি, উগ্রপন্থী বা ইসলাম জঙ্গি ও উগ্র কার্যকলাপে উদ্ধুদ্ধ করে। অথচ উপরোক্ত হাদীস ও সাহাবাদের বাণী ও কার্যকলাপ দ্বারা স্পষ্ট প্রতীয়মান হল যে ইসলাম কখনো যুদ্ধ পছন্দ করে নি বা কখনো জঙ্গি ও উগ্র কার্যকলাপ সমর্থন করে নি। রাসূল সা. ও সাহাবাগণ যত যুদ্ধ করেছেন সব ছিল একমাত্র আত্মরক্ষামূলক বা স্বাধীনতা বিরোধীদের বিরুদ্ধে।
অপরপক্ষে যে সকল ইসলাম বিরোধীরা ইসলাম যুদ্ধ ও উগ্র কার্যকলাপে উদ্ধুদ্ধ করে বলে অপপ্রচার চালায় তাদের নিজেদের কাজকর্ম আমরা পর্যালোচনা করলে কি দেখতে পাই? এ সকল কাফেরদের ক্ষমতালোভ ও আগ্রাসনে লাখো লাখো নিরাপরাধ মানুষ নিহত হয়েছে। একমাত্র ক্ষমতালোভ ও প্রতিশোধমূলক যুদ্ধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কোটি কোটি নিরাপরাধ মানুষ নিহত হয়েছে। আজও পাশ্চাত্য ও সভ্যতার দাবীদার ইসলামের সমালোচকরা তাদের প্রতিহিংসামূলক ও আগ্রাসনমূলক যুদ্ধগুলোতে কত শিশু, নারী বা বৃদ্ধ নিহত হচ্ছে। ইসরাইলের আগ্রাসনে ফিলিস্তিন শিশুরা হাসপাতালে, মায়ের আঁচলে, বাবার কোলে প্রতিনিয়ত মৃত্যুবরণ করছে। এ সকল মানবতাবিরোধী আগ্রাসনকে কেউ এমনকি মুসলমান সন্তানগণও  জঙ্গি বা উগ্র কার্যকলাপ মনে করে না বা কাউকে এর সমালোচনা করতে দেখা যায় না। অথচ এ সকল পাপী ও বর্বর যে রাসূল সা. ও সাহাবাগণকে যুদ্ধবাজ বলে নিন্দা করে সেই রাসূল সা. তাঁর সারা জীবনে যতগুলো যুদ্ধ করেছেন যা সবই রক্ষণাত্মক ছিল; সে সকল যুদ্ধের মোট নিহতের সংখ্যা মাত্র ১০৪৭ জন। এটা বলাবাহুল্য যে এরকম হতাহতের সংখ্যা আমরা প্রতিনিয়ত এক একটি রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যেও দেখি। আর বর্তমান যুগের সভ্যতা, উন্নতি ও মানবতার দাবীদারদের একেক আগ্রাসনে হতাহতের সংখ্যা কমপক্ষে লাখ ছাড়িয় যায়। তারপরও কি আমরা মুসলমানগণ, মুসলিম সন্তানগণ ইসলাম বিদ্বেষীদের বিভ্রান্তিতে আর কতকাল নিমজ্জিত থাকবে? আমরা কি একটু সচেতন হতে পারি না? আমাদের ইসলাম নিয়ে মিথ্যা অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কি আমরা দাড়াতে পারি না? ইসলাম সম্পর্কে আরো জ্ঞান অর্জন করে নিজে আরো সচেতন হতে পারি না ও অন্যকে সচেতন করতে পারি না? তবে কবে আমরা মুসলিম জাতি এ সকল ইসলাম বিদ্বেষীদের অপপ্রচারের জাবাব সমস্বরে দিতে পারব?
পুরো কুরআন শরীফে মাত্র ৬ স্থানে যুদ্ধের উল্লেখ আছে আর ১২০ স্থানে শান্তির আলোচনা করেছেন। এমনকি যুদ্ধ লাগার পরেও এবং যুদ্ধে অনেক মুসলমান হত্যা করার পরেও শত্রুপক্ষের কেউ যদি শুধু বাঁচার জন্যেও বলে যে আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি; তবে সেও নিরাপদ। রাসূল সা. হযরত উসামা রা.-এর নেতৃত্বে জুহাইনা বংশের হারাকা গোত্রে একটি দল পাঠান। যুদ্ধে মুখোমুখি হলে একজন মুশরিক একজন মুসলমানকে আক্রমণ করে হত্যা করে। তখন হযরত উসামা রা. তার অসতর্ক হওয়ার অপেক্ষা করে সুযোগ পেয়ে তার উপর তলোয়ার উঠান। যখন হযরত উসামা রা. তলোয়ার ওঠান, সে বলে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তারপরও তিনি তাকে হত্যা করেন। বার্তাবাহক রাসূল সা.-এর কাছে আসলে তাকে সব খবর জিজ্ঞাসা করেন। অতপর সে হযরত উসামা রা. এর এক ব্যক্তি হত্যার খবরও বলেন। রাসূল সা. তাকে ডাকেন ও জিজ্ঞাসা করেন, কেন তুমি তাকে হত্যা করেছ? হযরত উসামা রা. বললেন, এই ব্যক্তিটি মুসলমানদের অনেক যন্ত্রণা দিয়েছে। সে অমুককে হত্যা করেছে, অমুককে হত্যা করেছে এবং অনেকের নাম বললেন। অতপর আমি তার উপর আক্রমণ করি আর সে যখন তলোয়ার দেখে তখন বলেছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। রাসূল সা. বললেন, তুমি কি তাকে হত্যা করেছ? তিনি বললেন, হাঁ। রাসূল সা. বললেন, কেয়ামতের দিন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এলে তুমি কী করবে? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল সা.! আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। রাসূল সা. বলতে থাকলেন, কেয়ামতের দিন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এলে তুমি কী করবে?
আল্লাহ তাআলা বলেন, যদি তারা সন্ধির দিকে ঝুঁকে তবে আপনিও সন্ধির দিকে ঝুঁকবেন এবং আল্লাহর প্রতি ভরসা করুন; তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। যদি তারা আপনাকে প্রতারিত করতে চায় তবে আল্লাহই আপনার জন্য যথেষ্ট।  সন্ধি যে দল করে তারা সাধরণত পরাজিত হয় বা দুর্বল হয়। আর সাধারণ সমরবিদ মনে করে, যুদ্ধে বিপক্ষ শক্তি পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে গেলে পরাজিত শক্তিকে সমূলে বিনাশ করতে হবে। এ অবস্থায় পরাজিত শত্রুপক্ষ সন্ধি চাইলেও তা কর্ণপাত করা যাবে না। নাচেৎ তারা সন্ধির সুযোগ নিয়ে আবার শক্তি সঞ্চয় করে নতুন করে যুদ্ধ করবে। ইসলাম সর্বদা এতটাই শন্তির পক্ষে অবস্থান নেয় যে যুদ্ধ চলাকালীনও কোন সুযোগ পেলেই যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি স্থাপন করার স্পষ্ট নির্দেশনা আছে। আর তাই আল্লাহ তাআলা রাসূল সা.-কে নির্দেশনা প্রদান করছেন যে, যদি শত্রুপক্ষ পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে বা কোন কারণে যুদ্ধ বন্ধ করতে চায় ও সন্ধি চায় তবে আপনাকেও সে সন্ধি করতে হবে। সন্ধির মাধ্যমে শত্রুপক্ষ যদি আপনাকে প্রতারিত ও করতে চায় তবুও আপনাকে শান্তির পক্ষে অবস্থান নিতে হবে। এভাবে ইসলাম সর্বদা যুদ্ধে অনুৎসাহিত করেছেন এবং শান্তির পক্ষে অবস্থান নিতে উদ্ধুদ্ধ করেছেন।
মদিনায় মুসলমানগণ যাওয়ার পর ইহুদীদের সাথে রাসূল সা.-এর ঐতিহাসিক মদিনা সনদ হয়। কালক্রমে ইহুদীরা রাসূল সা. ও মুসলমানগণের সাথে সম্পাদিত চুক্তি ভাঙ্গা শুরু করে। সর্বপ্রথম কাইনুকা গোষ্ঠী চুক্তি ভঙ্গ করে। বদরের যুদ্ধে রাসূল সা. সহাবাগণ বিজয় লাভ করার পর কাইনুকা’ গোষ্ঠীর হিংসার মাত্রা বেড়ে যায়। মুসলমানগণের সাথে তাদের বিদ্বেষ প্রকাশ করতে থাকলে রাসূল সা. তাদেরকে কাইনুকা’ বাজারে একত্র করে বললেন, হে কাইনুকা গোষ্ঠী! বদরের যুদ্ধে কুরাইশের মত অবস্থা আসার আগে তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। তারা বলল, হে মুহাম্মাদ! [সা.] কুরাইশদের মত যুদ্ধের ব্যাপারে অজ্ঞ জাতির কিছু মানুষকে নিধন করে আত্মম্ভরিতায় পড়বে না। যদি আমাদের সাথে যুদ্ধ করতে তবে বুঝতে যে, আমরা কেমন মানুষ?  এভাবে কাইনুকা’ গোষ্ঠী রাসূল সা.-কে স্পষ্টরূপে চুক্তিভঙ্গ ও যুদ্ধের হুমকি দেয়। ইতিমধ্যে এক মুসলিম মহিলা কাইনুকা’ বাজারে সামগ্রী নিয়ে যায় ও বিক্রি করে তারপর তিনি এক স্বর্ণকারের কাছে কোন দরকারে যান। সেই ইহুদী স্বর্ণকার মুসলিম মহিলার মুখ খুলতে বলে। মুসলিম মহিলা অস্বীকার করলে সেই স্বর্ণকার কৌশলে তার জামার পিছনের নিচের অংশ পিঠের সাথে বেঁধে দেয়। যখন মুসলিম সাহাবী দাঁড়ান তখন তার লজ্জাস্থান প্রকাশিত হয়ে যায়। এ অবস্থা দেখে ইহুদীরা হাসতে থাকে আর মুসলিম নারী চিৎকার করতে থাকে। এ সময় একজন মুসলমান ইহুদীর উপর আক্রমণ করে তাকে হত্যা করে। তখন ইহুদীরা চিৎকার করে সকলে মিলে সেই মুসলমানের উপর ঝাপিয়ে পড়ে ও তাকে হত্যা করে।  তাদের এ প্রকাশ্য চুক্তি ভঙ্গের কারণে রাসূল সা. সাহবাগণকে নিয়ে তাদেরকে ঘেরাও করে। ১৫ দিন এভাবে ঘেরাও থাকার পর তারা তাদেরকে ও তাদের নারী, শিশুরা আটক হওয়ার ব্যাপারে রাসূল সা.-এর সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। পরবর্তীকালে আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল-এর সুপারিশে তাদেরকে মুক্তি দিয়ে হযরত ওবাদা বিন সামিত রা.-কে তাদেরকে সিরিয়ায় বিতাড়িত করার দায়িত্ব দেন।
রাসূল সা. মদিনায় আসার পর মক্কার কুরাইশরা আওস ও খাজরাজের মূর্তিপূজারী আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের কাছে বদর যুদ্ধের আগে চিঠি পাঠায়। তারা হুমকি দেয় যে, তোমরা আামাদের শত্রুকে আশ্রয় দিয়েছ। তোমরা তার সাথে যুদ্ধ করবে বা তাকে বের করে দিবে। নচেৎ আমরা সবাই মিলে এসে তোমাদের যোদ্ধাদেরকে হত্যা করব ও তোমাদের নারীদেরকে আটক করব। এ চিঠি আসার পর আব্দুল্লাহ বিন উবাই ও তার মূর্তিপূজারী সঙ্গীরা রাসূল সা.-এর সাথে যুদ্ধ করতে মনস্থ করে। রাসূল সা.-এর কাছে এ খবর আসার পরে তাদের সাথে সাক্ষাত করে রাসূল সা. তাদেরকে বললেন, তোমাদের কাছে কুরাইশদের চিঠি আসার পরে তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছ? তোমরা কি তোমাদের সন্তান ও আপন ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাচ্ছ? (কারণ তাদেরই সন্তান ও ভাইরা তখন মুসলমান)। রাসূল সা.-এর কাছ থেকে এটা শুনার পর তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। এ খবর কুরাইশদের কাছে পৌছল। বদর যুদ্ধের পরে কুরাইশ কাফেররা ইহুদীদের কাছে চিঠি পাঠাল যে, তোমরা দুর্গ ও অস্ত্রধারী জাতি। তোমরা আমাদের শত্রুর সাথে যুদ্ধ কর নচেৎ আমরা তোমাদের সাথে এমন এমন করব যে, তোমাদের নারীদের পায়ের চুরি ও আমাদের মাঝে কোন বাধা থাকবে না অর্থাৎ আমরা তোমাদের নারীদেরকেও আটক করব।  এ খবর রাসূল সা.-এর কাছে পৌছে। ওদিকে নাজীর গোষ্ঠী বিশ্বাসঘাতকা করার সিদ্ধান্ত নেয়। রাসূল সা.-এর কাছে বার্তা পাঠায় যে, আপনি ৩০ জন সঙ্গি নিয়ে আসেন এবং আমরা আমাদের ৩০ জন পন্ডিতকে নিয়ে আসব। আমাদের পাদরিরা যদি আপনাকের স্বীকার করে ও আপনাকে বিশ্বাস করে তবে আমরা আপনাকে স্বীকার করব। পরের দিন রাসূল সা. জামাত নিয়ে তাদের কাছে যায় ও তাদেরকে ঘেরাও করে। রাসূল সা. বলেন, তোমরা আমার সাথে চুক্তি করা ছাড়া আমার কাছে নিরাপদ নও। তারা চুক্তি করতে অস্বীকার করে। রাসূল সা. সেদিন তাদের সাথে যুদ্ধ করেন। তারপর নজীর গোষ্ঠী রেখে কুরাইজা গোষ্ঠীর কাছে যান ও তাদেরকে চুক্তি করতে আহবান করলে তারা চুক্তি করতে। তারপর নজীর গোষ্ঠীর কাছে গিয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ করে তাদেরকে উচ্ছেদ হতে বাধ্য করেন। নাজীর গোষ্ঠী তাদের বাড়ির দরজা, জানালা, তাদের সামগ্রী ও তাদের উট যা বহন করতে পেরেছে তা নিয়ে উচ্ছেদ হয়েছে। নাজীর গোষ্ঠীর খেজুরের বাগানকে আল্লাহ তাআলা শুধু রাসূল সা.-কে দান করেন।
নাজীর গোষ্ঠী আরো একবার বিশ্বাসঘাতকা করে। আমর বিন উমাইয়া রা. চুক্তিবদ্ধ দু’জন ব্যক্তিকে হত্যা করে। এ হত্যার রক্তপণ পরিশোধ করতে হবে। রক্তপণ পরিশোধে চুক্তিবদ্ধ গোষ্ঠীরা সহায়তা করার কথা ছিল বলে রাসূল সা. নাজীর গোষ্ঠীর কাছে যান। তারা সহায়তা করার আশ্বাস দিয়ে রাসূল সা.-কে এক দেয়ালের পাশে বসান।  তারা রাসূল সা.-কে উপর থেকে পাথর মেরে হত্যার ষড়যন্ত্র করল। আমর বিন জাহশ ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে উদ্যত হলে রাসূল সা.-কে আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দেন। তখন রাসূল সা. উঠে চলে যান।
কুরাইজা গোত্র রাসূল সা.-এর সাথে চুক্তিবদ্ধ থাকার পরেও খান্দাকের যুদ্ধের সময় তারা চুক্তি ভঙ্গ করে। মদিনার পূর্বে কুরাইজা গেত্রের দুর্গ ছিল। খন্দকের যুদ্ধের সময়ে হুহাই বিন আখতাব ইহুদী কুরাইজার নেতা কা’ব বিন আসাদের কাছে গিয়ে বলে, আমি মুহাম্মদ সা. ও তার সঙ্গিদেরকে সমুলে উচ্ছেদ করার জন্য আরব গোষ্ঠীকে নিয়ে এসেছি। কা’ব বলল, বরং তুমি জগতের অপমান নিয়ে এসেছ। অবশেষে সিদ্ধান্ত হল যে, যদি আরব কাফেররা পরাজিত হয় তবে তারা হুহাই বিন আখতাবের দুর্গে আশ্রয় নেবে। খন্দকের যুদ্ধে কাফেররা ফিরে যাওয়ার পর রাসূল সা. কুরাইজা গোত্রের সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে হযরত সাদ বিন মুআ’জ ও সা’দ বিন ওবাদা রা.-কে পাঠান। তারা দেখতে পায় যে তাদের মধ্যে সাইফা গোত্র ছাড়া সকলে চুক্তি ভঙ্গ করে।  তখন রাসূল সা. সাহবাগণকে নিয়ে কুরাইজা গোত্রসমূহের উদ্দেশ্যে অভিযানে যান। তাদেরকে দীর্ঘ সময়ে সাহাবগণ ঘেরাও করে রাখার পর তারা হযরত সা’দ বিন মুআজ রা.-কে বিচারক মানতে রাজি হয়। অবশেষে তাদেরকেও উচ্ছেদ করা হয়।
যখন খাইবার অভিযানে বিজয় লাভ হয় তখন হযরত সাফিয়া রা.-এর ভাতিজি জায়নাব রাসূল সা.-কে বিষাক্ত একটি ভুনা ছাগল হাদিয়া দেয়। রাসূল সা. তা থেকে খান এবং কিছু সাহাবা রা. ও খান। অতপর রাসূল সা. তাদেরকে বলেন, তোমরা হাত ওঠাও। রাসূল সা. সে ইহুদী মহিলাকে খবর পাঠিয়ে ডাকলেন ও বললেন, তুমি কি এতে বিষ দিয়েছ? সে বলল, আপনাকে কে বলেছে? রাসূল সা. বললেন, আমার হাতে থাকা ছাগলের এ বাহু। সে বলল, হা। রাসূল সা. বললেন, কেন করলে? সে বলল, আমি বলেছি, আপনি যদি সত্য নবী হন তবে আপনাকে ক্ষতি করবে না। আর যদি আপনি মিথ্যা হন তবে আপনার থেকে আমরা নিস্তার পাব। রাসূল সা. তাকে ক্ষমা করে দিলেন ও তাকে শাস্তি দিলেন না। পরবর্তীতে রাসূল সা.-এর এক সাহাবী বিশর বিন মাগরুর মারা গেলে তখন তাকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight