রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মি‘রাজ

পবিত্র সেই সত্তা যিনি এক রাতে স্বীয় বান্দাকে (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মসজিদে হারাম (মক্কায়ে মুয়াজ্জমা) হতে মসজিদে আকসা (বায়তুল মুকাদ্দাস) পর্যন্ত নিয়ে গেলেন, যার চতুর্পার্শ্বকে তিনি বরকতময় করেছেন, যেন নিজের আশ্চর্য নিদর্শনসমূহ অবলোকন করাতে পারেন। নিশ্চয়ই তিনি সব কিছু দেখেন ও জানেন। [সূরা বনি ইসরাঈল : আয়াত ১]
মেরাজের ঘটনা : হযরত আবু যর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় অবস্থানকালে একদিন সহসা দেখতে পেলেন তাঁর ঘরের ছাদ খুলে গিয়েছে এবং খোলা ছাদ দিয়ে জিবরাঈল আ. অবতীর্ণ হলেন। তিনি প্রথমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বক্ষ বিদীর্ণ করে তা জমজমের পানি দ্বারা ধৌত করলেন। অতঃপর ঈমান ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে পূর্ণ একখানা স্বর্ণ পাত্র নিয়ে উপস্থিত হলেন এবং তা বক্ষের ভেতর স্থাপন করে বন্ধ করে দিলেন। পরে তাঁর হাত ধরে ঊর্ধাকাশে নিয়ে গেলেন। যখন আকাশে পৌঁছলেন, তখন জিবরাঈল আ. দ্বাররক্ষককে বললেন, দ্বার খুলে দাও। জিজ্ঞেস করা হল, কে? জবাব দিলেন জিবরাঈল। আবার জিজ্ঞেস করলেন, তোমার সঙ্গে অপর কেউ আছে কি? তিনি বললেন, আমার সঙ্গে রয়েছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। জিজ্ঞেস করা হল, তাঁকে কি ডাকা হয়েছে? জিবরাঈল আ. জবাবে বললেন, হ্যাঁ। এরপর তিনি প্রথম আকাশে উপনীত হলে সেখানে এক ব্যক্তিকে বসা দেখতে পেলেন, তাঁর ডানে ও বামে বহু ছায়ারূপ রয়েছে। তিনি ডান দিকে তাকিয়ে হাসেন এবং বাম দিকে তাকিয়ে কাঁদেন। নবীজীকে দেখে তিনি বললেন, মারহাবা, হে নেক নবী! নেক সন্তান! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরাঈল আ.-কে জিজ্ঞেস করলেন, ইনি কে? তিনি বললেন, ইনি আদম আ.। তাঁর ডান ও বামের ছায়ারূপগুলো তাঁর সন্তানদের রূহ। ডান দিকের ছায়াগুলো জান্নাতি এবং বাম দিকের ছায়াগুলো জাহান্নামি। এ কারণে ডান দিকে দৃষ্টি পড়লে তিনি হাসেন এবং বাম দিকে দৃষ্টি পড়লে কাঁদেন। অতঃপর দ্বিতীয় আসমানে উপস্থিত হলেন। দ্বারপথে পূর্বের ন্যায় সওয়াল-জওয়াব হলো এবং প্রত্যেক আসমানেই কোন-না-কোন নবী-রাসূলের সাক্ষাৎ পেলেন। প্রথম আসমানের ওপর হযরত আদম আ. এবং ষষ্ঠ আসমানে হযরত ইবরাহীম আ.-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। হযরত আনাস রা. বলেন, হযরত আবু যর আমার নিকট নবী-রাসূলদের মনজিল ও মর্যাদা নির্দিষ্ট করে বলেননি। সে যাই হোক, হযরত জিবরাঈল আ. তাঁকে হযরত ইদরীস আ.-এর নিকট নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁকে দেখতে পেয়ে তিনি বলে উঠলেন ‘মারহাবা, হে  নবী ও নেক ভাই। তিনি নাম জিজ্ঞেস করলেন। হযরত জিবরাঈল আ. তাঁর নাম বলে দিলেন। পরে এরূপ ঘটনা হযরত মূসা আ. হযরত ঈসা আ. ও হযরত ইবরাহীম আ.-এর সঙ্গে সাক্ষাতে সংঘটিত হয়। হযরত মূসা ও হযরত ঈসা আ. নেক নবী ও নেক ভাই বলে হযরত ইবরাহীম আ. নেক নবী ও নেক সন্তান বলে তাঁকে সংবর্ধনা জানালেন। অতঃপর হযরত জিবরাঈল আ. তাঁকে আরো ঊর্ধ্বলোকে নিয়ে গেলেন। তিনি এমন স্থানে গিয়ে পৌঁছলেন, যেখানে বিশ্বলোকের মূল কর্মকেন্দ্র চলার শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল, এখানেই আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আধ্যাত্মিক পুরস্কার নিয়ে হযরত মূসা আ.-এর নিকটে এলেন, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ আপনার উম্মতের উপর কি কর্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন? বললেন, পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ। হযরত মূসা আ. বললেন, আল্লাহর সমীপে পুনরায় চলে যান, আপনার উম্মত এ দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার গেলেন, তখন আল্লাহ নামাজের এক অংশ কম করে দিলেন। তিনি ফিরে আসলেন। হযরত মূসা আ. বললেন, আপনি আবার যান, আপনার উম্মত একটাও পালন করতে পারবে না। তখন আল্লাহ আরো এক অংশ কম করে দিলেন। মূসা আ. আবার বললেন, আপনার উম্মত এও আদায় করতে সক্ষম হবে না। এরপর আল্লাহ পাক নামাজের সংখ্যা কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত করলেন এবং বললেন, নামাজ যদিও কার্যত পাঁচ ওয়াক্তই হবে; কিন্তু নামাজীরা সওয়াব পঞ্চাশ ওয়াক্তের পাবে। কেননা, আমার বিধানে কোন রদবদল হতে পারে না। হযরত মূসা আ. নামাজের পরিমাণ আরো কমানোর জন্য আল্লাহর নিকট ফেরত যাওয়ার পরামর্শ দিলেন; কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এখন আমার লজ্জা করছে। এরপর তাঁকে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত ভ্রমণ করালেন। তা এমন সব বিভিন্ন বর্ণে ও রঙে আচ্ছন্ন ছিল, যা তিনি চিনতে ও জানতে পারেননি। অতঃপর হযরত জিবরাঈল আ. তাঁকে জান্নাতে নিয়ে গেলেন। সেখানে তিনি মণি-মুক্তা নির্মিত ইমারতসমূহ দেখতে পেলেন। দেখলেন সেখানকার যমীন মিশকযুক্ত। [বুখারী শরীফ]
জান্নাতে ভ্রমণ : বর্ণিত আছে, শেষবারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নামাজের ওয়াক্ত হ্রাস করার জন্য মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে উপস্থিত হলেন তখন মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জান্নাত ও জাহান্নাম পরিদর্শন করার নির্দেশ দেয়া হল। নির্দেশ প্রাপ্ত হয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় সিদরাতুল মুনতাহায় গিয়ে পৌঁছলেন। পবিত্র কুরআনের বাণী, সিদরাতুল মুনতাহা, যার সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে জান্নাতুল মাওয়া। ওই স্থানে গিয়ে তিনি হযরত জিবরাঈল আ.-এর সাথী হলেন।
প্রথম দৃশ্য : বর্ণিত আছে, প্রথমত তিনি জান্নাতুল ফেরদাউসে পৌঁছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ওই ফেরদাউস জান্নাতের প্রাচীরগুলো হল খাঁটি স্বর্ণের এবং তার রয়েছে আটটি দরজা। প্রতিটি দরজা হল চল্লিশ বছরের রাস্তার দূরত্বের সমান চওড়া। তন্মধ্যে প্রথম দরজাটি যা তাঁর নজরে পড়ল তাতে লেখা ছিল, মহান আল্লাহকে যে করযে হাসানাহ প্রদান করে আল্লাহ তার সে কর্যকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেন। এ লেখা দেখার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জিবরাঈল আ.-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে জিবরাঈল! আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে করযে হাসানাহ প্রদান করা দান-খয়রাত করা থেকেও কি বেশি ছাওয়াব লাভ হয়?
জবাবে হযরত জিবরাঈল আ. বলেন, হে আল্লাহর নবী! আল্লাহর ওয়াস্তে কাউকে করযে হাসানাহ প্রদান করা, দান-খয়রাত করা থেকেও বেশি ছওয়াব লাভ হয়। কেননা, দান-খয়রাত দ্বারা আল্লাহ অবশ্যই সন্তুষ্ট হয়ে থাকেন। আর করযে হাসানা প্রদান করার মাধ্যমে আল্লাহর কোন বান্দার কষ্ট লাঘব হয়ে থাকে। আর এ কাজ আল্লাহর নিকট খুবই পছন্দনীয়। অতএব দান-খয়রাত থেকে করযে হাসানা আল্লাহর নিকট অতীব প্রিয় বলেই তারজন্য এ পুরস্কারের ব্যবস্থা রেখেছেন।
দ্বিতীয় দৃশ্য : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, জান্নাতের দরজায় জান্নাতের দ্বাররক্ষক “রিদওয়ান ফেরেশতা” একটি সবুজ রঙের মিম্বারে উপবিষ্ট আছেন। তাঁর ডান দিকে এবং বাম দিকে অসংখ্য ফেরেশতা রয়েছেন। যারা আমাকে এবং আমার সাথী জিবরাঈল আ.-কে মোবারকবাদ জানালেন। ওই ফেরেশতাদের সৌন্দর্য এত অধিক ছিল যা ইতিপূর্বে আমার দৃষ্টিতে পড়েনি। এ প্রসঙ্গে আমি জিবরাঈল আ.-কে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই জিবরাঈল! জান্নাতের দরজায় আমি যে সকল ফেরেশতাদেরকে দেখতে পেলাম, তাদের সৌন্দর্যের তো কোন শেষ নেই। উত্তরে জিবরাঈল আ. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, আপনার উম্মতের মধ্যে যে সকল নারী-পুরুষ দুনিয়াতে আল্লাহকে ভয় করবে এবং তাঁর ইবাদতে সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রাখবে তাদের জন্য রয়েছে এমন দুটি জান্নাত যার সৌন্দর্য এ সকল ফেরেশতাদের চেয়ে আরো লক্ষগুণ বেশি সৌন্দর্যময়। কালামে পাকে এরশাদ হয়েছে, যারা আল্লাহকে ভয় করবে তাদের জন্য রয়েছে দুটি জান্নাত।
তৃতীয় দৃশ্য : জনাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর আমি হযরত জিবরাঈল আ.-এর সঙ্গে জান্নাতে প্রবেশ করলাম। দ্বাররক্ষক “রিদওয়ান ফেরেশতা” এবং তার সাথী নূরানী ফেরেশতারা সেখানেই রয়ে গেলেন। ওই জান্নাতের জমিন মেশক ও আম্বরের তৈরি যার ওপর আমার কদম রাখা মাত্রই আমার অন্তরের প্রশান্তি এসে গেল।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, আমি বেশেতের মধ্যে এমন কিছু অট্টালিকা দেখতে পেলাম যা লাল রং এর ইয়াকুত এবং সবুজ রং এর যমরূদ পাথর ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মোতি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। তদুপরি তার নিচ দিয়ে বা পাশ দিয়ে এমন কিছু নহর প্রবাহিত হচ্ছে যার কোনটার পানি খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ঠা-া ও মিষ্টি, আবার কোনটার পানি দুধের মতো ধবধবে সাদা ও মিষ্টি। আবার কোনটা উত্তম ধরনের পবিত্র শরবতের ন্যায়। আবার কোনটা প্রকৃত মধুর মতো খুবই মজাদার।
যেমন, মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন, খোদাভীরু লোকদের জন্য যে জান্নাতের ওয়াদা দেয়া হয়েছে, তার প্রকৃত অবস্থা হল এই যে, ওই জান্নাতের অট্টালিকার পাশ দিয়ে এমন সব নহর প্রবাহিত হচ্ছে যার মধ্যে কোন প্রকার দুর্গন্ধ নেই। বরং এরূপ “দুগ্ধের নহর” যার স্বাদ কখনো পরিবর্তনীয় নয়। আর এরূপ মজাদার “শরাবে তহুরের” নহর প্রবাহিত হচ্ছে যা পানকারীদের জন্য খুবই মজাদার এবং উপাদেয়। তাছাড়া তাদের জন্য রয়েছে খাঁটি মধুর নহরসমূহ যা দেখতে খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং খেতে খুবই মজাদার। তদুপরি তাদের জন্য মওজুদ রয়েছে বিভিন্ন প্রকারের মজাদার ফলসমূহ যা খুবই উপাদেয় ও সন্তুষ্টিদায়ক।
চতুর্থ দৃশ্য : আল্লাহর নবী এরশাদ করেন, আমি বেহেশতের বিভিন্ন অট্টালিকাসমূহের আশে-পাশে এমন কিছু খাঁটি স্বর্ণের গাছ-পালাসমূহ দেখতে পেলাম, যাদের শাখা-প্রশাখা এবং ডালাপালাগুলো হল উজ্জ্বল মোতির তৈরি। আর কা-গুলো পরিষ্কার চান্দির তৈরি। আর ওই বৃক্ষগুলোর মূল বা জড় মেশক ও আম্বরের মধ্যে ডুবে আছে। তদুপরি এমন এক বৃক্ষ তথায় রয়েছে যা সমস্ত অট্টালিকাগুলোকে ঢেকে আছে। তদুপরি এমন এক বৃক্ষ সেখানে রয়েছে যা বর্ণনাতীত। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে ভাই জিবরাঈল! এ বৃক্ষটা আবার কোন ধরনের যার সৌন্দর্য ও মনোরম দৃশ্যের কোন শেষ নেই। জবাবে জিবরাঈল আ. বললেন, এ বৃক্ষটি হল ঐ বৃক্ষ যার সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র কালামে এরশাদ করেছেন, যে সকল ঈমানদার নেক আমল করেছে তাদের জন্য রয়েছে বেহেশতের মধ্যে “তুবা” বৃক্ষ, যা কেবল দেখতেই মনোরম ও মনোমুগ্ধকর নয় বরং তার ফলের মধ্যে যে স্বাদ রয়েছে তাও হবে অবর্ণনীয়। যার পাতাগুলো শুধু পাতাই নয় বরং তা বেহেশতবাসীদের জন্য পরিধেয় বস্ত্রসামগ্রী হিসেবে হবে ব্যবহৃত যা হাজারো রঙে রঞ্জিত এক মনোমুগ্ধকর বস্ত্র। আর তার ফলগুলো হবে হেজাজি মটকার ন্যায় বড় বড় যাদের রং এবং স্বাদ হবে ভিন্ন ভিন্ন। আর তার সুগন্ধি হবে এত ব্যাপক যে সমগ্র জান্নাত তার সুগন্ধে ভরপুর হয়ে যাবে।
পঞ্চম দৃশ্য : রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, হযরত জিবরাঈল আমীন আমাকে বেহেশতের মাঝে ঘুরে ঘুরে বেহেশতের সৌন্দর্য ও বিভিন্ন নেয়ামতসমূহ দেখাচ্ছিলেন। হঠাৎ এক উঁচু স্থানে লাল রঙের ইয়াকুত পাথরের তৈরি এমন এক অট্টালিকা আমার নজরে পড়ল, যার মধ্যে ৭০ হাজার প্রাসাদ নির্মিত ছিল। প্রত্যেক প্রাসাদের মধ্যে ৭০ হাজার ধবধবে সাদা মোতির তাঁবু টানানো রয়েছে। এই তাঁবুগুলোর ভেতর থেকে ভেতরের সবকিছুই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। উপরন্তু ঐ তাঁবুগুলোর মধ্যে স্বর্ণের তৈরি উঁচু উঁচু সিংহাসনসমূহ সাজান রয়েছে। যা বেহেশতের বিভিন্ন প্রকার হীরা ও জওহর দ্বারা সুসজ্জিত। আর ঐ স্বর্ণের কুরসীগুলোর উপর সূক্ষ্ম ও পুরু রেশমের গালিচা বিছানো রয়েছে। যার উপর জান্নাতের হুররা উপবিষ্ট রয়েছে। তাদের প্রতি লক্ষ্য করলে মনে হয় যেন তারা লাল রঙের ইয়াকুত পাথর এবং মারজান (প্রকৃত মোতীর) দ্বারা তৈরি। তদুপরি এ সকল নাজ ও নেয়ামত, হুর ও গেলমান সবাই যেন কারো জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষ্যমাণ। পবিত্র কালামে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন, জান্নাতবাসীদের জন্য রয়েছে এমন সুন্দর সুন্দর হুর (যুবতী রমণী) যারা তাঁবুসমূহের মধ্যে সংরক্ষিত রয়েছে। তাদেরকে দেখলে মনে হয় যেন তারা ইয়াকুত ও মারজান (মুক্তা বিশেষ)।
ষষ্ঠ দৃশ্য : রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি জান্নাতের মাঝে এক সুউচ্চ বালাখানা দেখতে পেলাম। যেখানে বিভিন্ন প্রকারের নহরসমূহ প্রবাহিত হচ্ছে এবং খুব উন্নত ও স্বচ্ছ পানির হাউজসমূহ রয়েছে। ওই হাউজসমূহের মধ্যে একটা হাউজের নিকটে দেখতে পেলাম একজন গৌর বর্ণের হুর তার মুখ ধৌত করছে। আমি হযরত জিবরাঈল আ.-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাঈল! বেহেশতের হুর ও গোলামদের সৌন্দর্য তো এত অধিক যে চন্দ্র ও সূর্যের কিরণকে পর্যন্ত পেছনে ফেলে দেয়। অথচ এখন দেখছি একজন গৌর বর্ণের হুর এ বালাখানার হাউজের মধ্যে হেহারা ধৌত করছে? জান্নাতের মধ্যে গৌর বর্ণের হুরও আছে? জবাবে জিবরাঈল আ. বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি লক্ষ্য করছেন কি এ বালাখানাটা কার? আপনি অনুগ্রহ করে এ বালাখানার কার্নিশের দিকে লক্ষ করুন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, জিবরাঈলের কথায় আমি সেদিকে লক্ষ করে দেখতে পেলাম স্বর্ণাক্ষরে উক্ত প্রাসাদের কার্নিশে লেখা রয়েছে, ‘হা-যা মাকান উমার ইবনিল-খাত্তাব’ এটা ওমর ইবনুল খাত্তাবের প্রাসাদ। তখন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর মর্যাদাবোধ ও লজ্জার কথা আমার স্মরণে এসে গেল। তৎক্ষণাৎ আমি প্রাসাদের কাছ থেকে চলে এলাম।
একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ওমর রা.-কে সামনে দেখতে পেয়ে তাঁর জান্নাতি প্রাসাদের কথা আলোচনা করতে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হে ওমর! আমি তোমার জান্নাতের প্রাসাদসমূহ হতে একটি প্রাসাদ দেখতে পেলাম। একজন গৌর বর্ণের হুর সেখানে হাত-মুখ ধৌত করছে? এ ব্যাপারে আমি আশ্চর্য হয়ে হযরত জিবরাঈল আ.-কে জিজ্ঞেস করলাম। জান্নাতের মাঝে এ ধরনের গৌর বর্ণের হুর কেন? এর কারণ কী? জবাবে হযরত জিবরাঈল আ. আমাকে কিছু না বলে শুধু এতটুকুই বললেন, এ প্রাসাদসমূহ হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাবের। হে ওমর! বেহেশতের মধ্যে তোমার জন্য গৌর বর্ণের হুর কেন?
একথা শোনা মাত্র হযরত ওমর রা. কাঁদতে কাঁদতে স্থির হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! দুনিয়াতে আমার গৌর বর্ণ খুবই পছন্দনীয়। একথা শোনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও কেঁদে ফেললেন এবং আল্লাহর হামদ ও সানা আদায় করে বললেন, হে আল্লাহ! তুমি মানুষের মনের আকাক্সক্ষা জান্নাতুল ফেরদাউস পর্যন্ত পূরণ করে থাক। সুবহানাল্লাহ!
এ প্রসঙ্গে স্বয়ং মহান আল্লাহ তাআলা কালামে পাকে এরশাদ করেন, জান্নাতের ভেতর তোমাদের হৃদয়ের আকাক্সক্ষা অনুসারে সব কিছুই বিদ্যমান। [সূরা সিজদা]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight