রাজকুমারীশয়তানের ডায়েরি

সাদেক হোসেনধারাবাহিক উপন্যাস

সাত.
সুলতানের বাহিনীতে ত্রিশ হাজার মুজাহিদ। তারা সবাই স্বেচ্ছাসেবী। তাদেরকে কোন বেতন-ভাতা দিতে হয় না। স্বেচ্ছায়-সাগ্রহে তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করতে বাহিনীতে যোগ দিয়েছে। তবে তাদের যাবতীয় খরচ রাজকোষাগার থেকে বহন করা হয়।
এই বিশাল বাহিনীর সারি-সারি তাঁবু মাইলের-পর-মাইল জায়গা জুড়ে স্থাপন করা হয়েছে। অত্যন্ত নিপুণভাবে বিন্যস্ত করে স্থাপন করা হয়েছে তাঁবুগুলো।
হারুন ও তার বন্ধু- যে সোমনাথে গিয়েছিল- মুজাহিদ বাহিনীর কমান্ডার। তাদের প্রত্যেকের অধীনে রয়েছে এক হাজার করে জানবাজ যোদ্ধা। হারুনের বন্ধুর নাম বোরহান। উভয়ে নিজ নিজ অধীন বাহিনী নিয়ে স্ব-স্ব স্থানে অবস্থান করলেও তারা প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, গল্প করে, হাসি-আনন্দ করে। উভয়ের মাঝে অনন্য এক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। একে অপরের জন্য জান দিতে সদা প্রস্তুত। এই বিশাল বাহিনীর সঙ্গে কেউ-কেউ তাদের পরিবার-পরিজনও নিয়ে এসেছে।
সিপাহসালার আলতুনতাশ তার পরিবার-পরিজন নিয়ে এসেছেন। সঙ্গে স্ত্রী শামসা ও এক মেয়ে। মেয়েটির নাম আনীসা। দেখতে সাক্ষাৎ পরী। রূপে-গুণে অতুলনীয়া। চকিতে কারও দৃষ্টি নিপতিত হলে চটজলদি চোখ সরিয়ে আনা দায়। যে-ই তাকে দেখেছে, বিমোহিত হয়েছে। আলতুনতাশ বোরহানের দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়। তাই মাঝে-মাঝে বোরহান তার সঙ্গে দেখা করত। একদিন বোরহান আলতুনতাশের তাঁবুতে গেল; কিন্তু তাকে পেল না। ফেরার উদ্দেশ্যে দু’এক কদম ফেলল। ইতিমধ্যে হঠাৎ আনীসার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। বোরহানের পা যেন মাটিতে গেঁথে গেল। চোখ যেন বিস্ময়ে স্থির হয়ে রইল। ইতিপূর্বেও বোরহান তাকে দেখেছে। সে-ও বোরহানকে দেখেছে। কিন্তু উভয়ে সামনা-সামনি হয়নি। বোরহান ক্ষণকাল আত্মহারা ও বিমোহিত হয়ে রইল। তারপর আনীসার কণ্ঠ থেকে যেন হাজার বীণার সুর উত্থিত হল। বলল, ভুল করেই এদিকে চলে এলেন না-কি?
বোরহান আত্মস্থ হয়ে বলল, চাচাজানের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম।
ঃ তা তো আমি জানি, তবে আসবার কারণ?
ঃ বিশেষ কোনো কারণ নেই। এমনিতেই দেখা করতে এসেছিলাম।
ঃ শুনলাম, আপনি নাকি সোমনাথ গিয়েছিলেন?
ঃ হ্যাঁ, গিয়েছিলাম।
ঃ সেখানে নাকি বহু পরী বাস করে?
ঃ পরী… কই তা তো দেখিনি!
আনীসার গন্ডদেশে সুন্দর একটি ছোট্ট টোল পড়ল। সে মৃদু হেসে বলল, তা হলে সোমনাথের হুরকে কি দেখেছিলেন?
ঃ সোমনাথের হুর! উহ্ হু, সোমনাথের রাজকুমারীর কথা বলছ? হ্যাঁ, তাকে দেখেছি বটে।
ঃ নিশ্চয়ই পরমাসুন্দরী হবে!
ঃ হ্যাঁ, সুন্দরীই বটে। হারুন ভাই তো তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
আনীসার অধরে দুষ্টু হাসি। বলল, আর আপনি…?
ঃ আমি শুধু এতটুকুই বলতে পারি, হ্যাঁ, সত্যিই সে রূপসী-সুন্দরী। কিন্তু…।
ঃ থাক আর বলতে হবে না। এবার বলুন, আমরা কবে এখান থেকে যাত্রা শুরু করব, তা কি আপনি বলতে পারেন?
ঃ দু’চার দিনের মধ্যেই। উট সংগ্রহের জন্য দেরি হচ্ছিল। আলহামদুলিল্লাহ তার ব্যবস্থা হয়ে গেছে। সত্বরই যাত্রা শুরু হবে।
ঃ কিন্তু এত উটের কী প্রয়োজন?
ঃ মুলতান থেকে আজমীর পর্যন্ত ৩৫০ মাইল পথ মরুভূমি। এই দীর্ঘ পথে সবুজের কোন চিহ্ন নেই, ঘাস-পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই উটে করে রসদপত্র ও পানি নিয়ে যেতে হবে।
ঃ অন্য কোন পথ কি নেই, যে-পথে পানি পাওয়া যাবে?
ঃ আছে, তবে খুব দীর্ঘ। তদুপরি সেই পথ অনিরাপদ। কারণ, সে-পথে হিন্দুদের আবাস, হিন্দুদের রাজত্ব। হতে পারে, পথেই তারা সবাই একত্রিত হয়ে এক নেতৃত্বে  আমাদের বিরুদ্ধে মোকাবেলা করতে প্রস্তুত হয়ে যাবে। তখন সম্মুখে অগ্রসর হওয়া খুবই কষ্টকর হয়ে যাবে।
ঃ আপনি কি সোমনাথের কেল্লা দেখেছেন?
ঃ দেখেছি। এক রাতে আত্মগোপন করে আমি আর হারুন ভাই সেখানে গিয়েছিলাম। অত্যন্ত মজবুত কেল্লা। অনেক উঁচু ও প্রশস্ত। এখনও পর্যন্ত এ-ধরণের কেল্লা আমি কোথাও দেখিনি। সমুদ্রের একেবারে তীরে অবস্থিত। সমুদ্রের ফেনিল তরঙ্গমালা এসে কেল্লার প্রাচীরে আছড়ে পড়ে।
ঃ কিন্তু রাজকুমারীকে আপনারা কীভাবে দেখতে পেলেন?
ঃ সে এক অলৌকিক ব্যাপার। আমি আর হারুন ভাই বনের পথ ধরে যাচ্ছিলাম। পথেই রাত হয়ে গেল। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। আমরা অন্ধকার হাতড়ে পথ চলছিলাম। হঠাৎ কিছু মানুষের আর্তচিৎকার আর শোরগোল শুনতে পেলাম। আমরা সে-দিকেই ঘোড়া ছুটালাম। কিছুদূর যাওয়ার পর আলো দেখতে পেলাম। কাছে গিয়ে দেখি, কয়েকজন দস্যু কয়েকটি যুবতীকে ঘিরে আছে। আমরা দস্যুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। তাদের হত্যা করার পর জানতে পারলাম, তাদের মাঝে রাজকুমারী রয়েছে। রাজকুমারী আমাদের খুব কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল।
ঃ মনে হচ্ছে, সে-দেশে দস্যুদের খুব উপদ্রব।
ঃ আমারও তা-ই মনে হয়।
ঃ আচ্ছা, এখন আমি যাচ্ছি। হয়ত আব্বাজান এখনই এসে পড়বেন।
বলেই আনীসা চপল পদক্ষেপে বন্য হরিণীর মতো পালিয়ে গেল।
বোরহান পলকহীন দৃষ্টিতে আনীসার গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল। সে আরও কিছুক্ষণ আলতুনতাশের অপেক্ষা করে ফিরে এল। আমীর আলী ও আলতুনতাশ উট সংগ্রহে খুব ব্যস্ত ছিলেন। কয়েকদিনের প্রচেষ্টায় তারা দশ হাজার উট সংগ্রহ করে ফেললেন।
উট মরুর জাহাজ। ক্রমাগত এক সপ্তাহ পানি পান ছাড়াই মরুপথে নির্বিঘেœ চলতে পারে। তাই কয়েকদিন উটগুলোকে পিপাসার্ত রেখে খুব ভালভাবে পানি পান করানো হল। তারপর মশক ও পাত্রে পানি ভরে তাতে চাপিয়ে দেয়া হল। রসদ-পত্রও বোঝাই করা হল। তারপর সুলতানের এই বিশাল বাহিনী দুর্গম মরুর পথে মুলতান থেকে আজমীরের উদ্দেশ্যে রওনা হল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight