রমজান, রোযা ও যাকাত-ফিতরার বিস্তারিত মাসায়েল / মাওলানা মুহাম্মদ হেমায়েত উদ্দীন

রমজানের রোজা
সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়ত সহকারে ইচ্ছাকৃতভাবে পান, আহার ও যৌন তৃপ্তি থেকে বিরত থাকাকে রোজা বলা হয়। প্রত্যেক আকেল  (বোধ সম্পন্ন), বালেগ (বয়সপ্রাপ্ত) ও সুস্থ নর-নারীর উপর রমজানের রোজা রাখা ফরজ।
ছেলে-মেয়ে দশ বৎসরের হয়ে গেলে তাদের দ্বারা (শাস্তি দিয়ে হলেও) রোজা রাখানো কর্তব্য। এর পূর্বেও শক্তি হলে রোজা রাখার অভ্যাস করানো উচিত।
রোজার নিয়তের মাসায়েল:
* রমজানের রোজার জন্য নিয়ত করা ফরজ। নিয়ত ব্যতীত সারাদিন পানাহার ও যৌনতৃপ্তি থেকে বিরত থাকলেও রোজা হবে না।
* মুখে নিয়ত করা জরুরী নয়। অন্তরে নিয়ত করলেই যথেষ্ট হবে, তবে মুখে নিয়ত করা উত্তম।
* মুখে নিয়ত করলেও আরবীতে হওয়া জরুরী নয়; যে কোন ভাষায় নিয়ত করা যায়। নিয়ত এভাবে করা যায়, আরবীতে, নাওয়াইতো বিসাওমিল ইয়াওমি।
বাংলায়, আমি আজ রোজা রাখার নিয়ত করলাম।
* সূর্য ঢলার দেড় ঘন্টা পূর্ব পর্যন্ত রমজানের রোজার নিয়ত করা দুরস্ত আছে, তবে রাতেই নিয়ত করে নেয়া উত্তম। [জাওয়াহেরে ফিক্বহ, খ. ১]
* রমজান মাসে অন্য যে কোন প্রকার রোজা বা কাযা রোযার নিয়ত করলেও এই রমজানের রোজা আদায় হবে। অন্য যে রোজার নিয়ত করবে সেটা আদায় হবে না।
* রাতে নিয়ত করার পরও সুবহে সাদেকের পূর্ব পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস জায়েয। নিয়ত করার সাথে সাথেই রোজা শুরু হয় না, বরং রোজা শুরু হয় সুবহে সাদেক থেকে।
সেহরীর মাসায়েল:
* সেহরী খাওয়া জরুরী নয় তবে সেহরী খাওয়া সুন্নাত, অনেক ফজীলতের আমল, তাই ক্ষুধা না লাগলে বা খেতে ইচ্ছে না করলেও সেহরীর ফজীলত হাছিল করার নিয়তে যাই হোক কিছু পানাহার করে নিবে।
* নিদ্রার কারণে সেহরী খেতে না পারলেও রোজা রাখতে হবে। সেহরী না খেতে পারায় রোজা না রাখা অত্যন্ত পাপ।
* সেহরীর সময় আছে বা নেই সন্দেহ হলে সেহরী না খাওয়া উচিত। এরূপ সময়ে খেলে রোজা কাযা করা ভাল। আর যদি পরে নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, তখন সেহরীর সময় ছিল না, তাহলে কাযা করা ওয়াজিব।
* সেহরীর সময় আছে মনে করে পানাহার করল অথচ পরে জানা গেল যে, তখন সেহরীর সময় ছিল না, তাহলে রোজা হবে না; তবে সারাদিন তাকে রোজাদারের ন্যায় থাকতে হবে এবং রমজানের পর ঐ দিনের রোজা কাযা করতে হবে।
* বিলম্বে সেহরী খাওয়া উত্তম। আগে খাওয়া হয়ে গেলেও শেষ সময় নাগাদ কিছু চা-পানি ইত্যাদি করতে থাকলেও বিলম্বে সেহরী করার ফজীলত অর্জিত হবে।
ইফতার এর মাসায়েল:
* সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর বিলম্ব না করে তাড়াতাড়ি ইফতার করা মোস্তাহাব। বিলম্বে ইফতার করা মাকরূহ।
* মেঘের দিনে কিছু দেরী করে ইফতার করা ভাল। মেঘের দিনে ঈমানদার ব্যক্তির অন্তরে সূর্য অস্ত গিয়েছে বলে সাক্ষ্য না দেয়া পর্যন্ত ছবর করা ভাল। শুধু ঘড়ি বা আজানের উপর নির্ভর করা ভাল নয়; কারণ তাতে ভুলও হতে পারে।
* সূর্য অস্ত যাওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ থাকা পর্যন্ত ইফতার করা দুরস্ত নেই।
* সবচেয়ে উত্তম হল খোরমার দ্বারা ইফতার করা, তারপর কোন মিষ্টি জিনিস দ্বারা, তারপর পানি দ্বারা।
* লবণ দ্বারা ইফতার শুরু করা উত্তম এই আকীদা ভুল।
* ইফতার করার পূর্বে নি¤েœাক্ত দু‘আ পাঠ করা মোস্তাহাব। আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতো, ওয়া আলা রিযকিকা আফতারতো।
* ইফতার করার পর নি¤েœর দু‘আ পাঠ করবে, যাহাবায্যামাউ ওয়াবতাল্লাতিল উরুকু ওয়াছাব্বাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ।
* ইফতার এর সময় দু‘আ কবুল হয়, তাই ইফতারের পূর্বে বা কিছু ইফতার করে বা ইফতার থেকে সম্পূর্ণ ফারেগ হয়ে দু‘আ করা মোস্তাহাব। [জাওয়াহেরুল ফাতাওয়া, খ. ১]
* পশ্চিম দিকে প্লেনে সফর করার কারণে যদি দিন লম্বা হয়ে যায় তাহলে সুবহে সাদেক থেকে নিয়ে ২৪ ঘন্টার মধ্যে সূর্যাস্ত ঘটলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ইফতার বিলম্ব করতে হবে, আর ২৪ ঘন্টার মধ্যেও সূর্যাস্ত না ঘটলে ২৪ পূর্ণ হওয়ার সামান্য কিছু পূর্বে ইফতার করে নিবে। [আহসানুল ফাতাওয়া, খ. ৪]
* পূর্ব দিকে প্লেন সফর করলে যখনই সূর্যাস্ত পাবে তখনই ইফতার করবে।
যে কারণে রোজা ভাঙ্গে না এবং মাকরূহও হয় না
১। মেসওয়াক করা। যে কোন সময় হোক, কাঁচা হোক বা শুষ্ক।
২। শরীর বা মাথা বা দাড়ি গোঁপে তেল লাগানো।
৩। চোখে সুরমা লাগানো বা কোন ঔষধ দেয়া। [আহসানুল ফাতাওয়া]
৪। খুশবো লাগানো বা তার ঘ্রাণ নেয়া।
৫। ভুলে কিছু পান করা বা আহার করা বা স্ত্রী সম্ভোগ করা।
৬। গরম বা পিপাসার কারণে গোসল করা বা বারবার কুলি করা।
৭। অনিচ্ছা বশতঃ গলার মধ্যে ধোঁয়া, ধোলাবালি বা মাছি ইত্যাদি প্রবেশ করা।
৮। কানে পানি দেয়া বা অনিচ্ছাবশতঃ চলে যাওয়ার কারণে রোজা ভঙ্গ হয় না, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে দিলে সতর্কতা হল সে রোজা কাযা করে নেয়া। [জাওয়াহেরে ফাতাওয়া]
৯। অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি হওয়া। ইচ্ছাকৃতভাবে অল্প বমি করলে মাকরূহ হয় না, তবে এরূপ করা ঠিক নয়।
১০। স্বপ্ন দোষ হওয়া।
১১। মুখে থুথু আসলে গিলে ফেলা।
১২। যে কোন ধরনের ইনজেকশন বা টীকা লাগানো। তবে রোজার কষ্ট যেন বোধ না হয় এ উদ্দেশ্যে শক্তির ইনজেকশন বা স্যালাইন লাগানো মাকরূহ। [জাওয়াহেরে ফাতাওয়া]
১৩। রোজা অবস্থায় দাঁত উঠালে এবং রক্ত পেটে না গেলে।
১৪। পাইরিয়া রোগের কারণে যে সামান্য রক্ত সব সময় বের হতে থাকে এবং গলার মধ্যে যায় তার কারণে। [ফাতাওয়ায়ে রহীমীয়া, খ. ৩]
১৫। সাপ ইত্যাদিতে দংশন করলে। [ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া, খ. ৩]
১৬। পান খাওয়ার পর ভালভাবে কুলি করা সত্ত্বেও যদি থুথুতে লালভাব থেকে যায়।
১৭। শাহওয়াতের সাথে শুধু নজর করার কারণেই যদি বীর্যপাত ঘটে যায় তাহলে রোজা ফাসেদ হয় না।
১৮। রোজা অবস্থায় শরীর থেকে ইনজেকশনের সাহায্যে রক্ত বের করলে রোজা ভাঙ্গে না এবং এতে রোজা রাখার শক্তি চলে যাওয়ার মত দুর্বল হয়ে পড়ার আশংকা না থাকলে মাকরূহও হয় না। [আহসানুল ফাতাওয়া, খ. ৪]
যে সব কারণে রোজা ভাঙ্গে না তবে মাকরূহ হয়ে যায়
১। বিনা প্রয়োজনে কোন জিনিস চিবানো।
২। তরকারী ইত্যাদি লবণ চেখে ফেলে দেয়া। তবে কোন চাকরের মুনিব বা কোন নারীর স্বামী বদ মেজাজী হলে জিহ্বার অগ্রভাগ দিয়ে লবণ চেখে তা ফেলে দিলে এতটুকু অবকাশ আছে।
৩। কোন ধরনের মাজন, কয়লা, গুল বা টুথপেষ্ট ব্যবহার করা মাকরূহ। আর এর কোন কিছু সামান্য পরিমাণও গলার মধ্যে চলে গেলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। [জাওয়াহেরে ফাতাওয়া, খ. ১]
৪। গোসল ফরজ এ অবস্থায় সারা দিন অতিবাহিত করা।
৫। কোন রোগীর জন্য নিজের রক্ত দেয়া। [জাওয়াহেরে ফাতাওয়া, খ. ১]
৬। গীবত করা, চোগলখুরী করা, অনর্থক কথা-বার্তা বলা, মিথ্যা বলা।
৭। ঝগড়া-ফ্যাসাদ করা, গালি-গালাজ করা।
৮। ক্ষুধা বা পিপাসার কারণে অস্থিরতা প্রকাশ করা।
৯। মুখে অধিক পরিমাণ থুথু একত্র করে গিলে ফেলা।
১০। দাঁতে ছোলা বোটের চেয়ে ছোট কোন বস্তু আটকে থাকলে তা বের করে মুখের ভিতর থাকা অবস্থায় গিলে ফেলা।
১১। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকবে না এরূপ মনে হওয়া সত্ত্বেও স্ত্রীকে চুম্বন করা ও আলিঙ্গন করা। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণের আস্থা থাকলে ক্ষতি নেই, তবে যুবকদের এহেন অবস্থা থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়। আর রোজা অবস্থায় স্ত্রীর ঠোট মুখে নেয়া সর্বাবস্থায় মাকরূহ।
১২। নিজের মুখ দিয়ে চিবিয়ে কোন বস্তু শিশুর মুখে দেয়া। তবে অনন্যোপায় অবস্থায় এরূপ করলে অসুবিধা নেই।
১৩। পায়খনার রাস্তা পানি দ্বারা এত বেশী ধৌত করা যে, ভিতরে পানি পৌঁছে যাওয়ার সন্দেহ হয় এরূপ করা মাকরূহ। আর প্রকৃত পক্ষে পানি পৌঁছে গেলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যায়। তাই এ ক্ষেত্রে খুবই সর্তকতা অবলম্বন করা দরকার। এ জন্য রোজা অবস্থায় পানি দ্বারা ধৌত করার পর কোন কাপড় দ্বারা বা হাত দ্বারা পানি পরিষ্কার করে ফেলা নিয়ম।
১৪। ঠোটে লিপিষ্টিক লাগালে যদি মুখের ভিতর চলে যাওয়ার আশংকা হয় তাহলে তা মাকরূহ।
যে সব কারণে রোজা ভেঙ্গে যায় এবং শুধু কাযা ওয়াজিব হয়
১। কানে বা নাকে ঔষধ দিলে।
২। ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ ভরে বমি করলে বা অল্প বমি আসার পর তা গিলে ফেললে।
৩। কুলি করার সময় অনিচ্ছাবশতঃ কণ্ঠনালীতে পানি চলে গেলে।
৪। স্ত্রী বা কোন নারীকে শুধু স্পর্শ প্রভৃতি করার কারণেই বীর্যপাত হয়ে গেলে।
৫। এমন কোন জিনিস খেলে যা সাধারণতঃ খাওয়া হয় না। যেমন, কাঠ, লোহা, কাগজ, পাথর, মাটি, কয়লা ইত্যাদি।
৬। বিড়ি, সিগারেট, বা হুক্কা সেবন করলে।
৭। আগরবাতি প্রভৃতির ধোঁয়া ইচ্ছাকৃতভাবে নাকে বা হলকে পৌঁছালে।
৮। ভুলে পানাহার করার পর রোজা ভেঙ্গে গেছে মনে করে আবার ইচ্ছাকৃতভাবে কোন কিছু পানাহার করলে।
৯। রাত আছে মনে করে সুবহে সাদেকের পর সেহরী খেলে।
১০। ইফতারের সময় হয়নি, দিন রয়ে গেছে অথচ সময় হয়ে গেছে এই মনে করে ইফতার করলে।
১১। দুপুরের পরে রোজার নিয়ত করলে।
১২। দাঁত দিয়ে রক্ত বের হলে তা যদি থুথুর চেয়ে পরিমাণে বেশি হয় এবং কণ্ঠনালীর নীচে চলে যায়।
১৩। কেউ জোর পূর্বক রোজাদারের মুখে কোন কিছু দিলে এবং তা কণ্ঠনালীতে পৌঁছে গেলে।
১৪। দাঁতে কোন খাদ্য-টুকরা আটকে ছিল এবং সুবহে সাদেকের পর তা যদি পেটে চলে যায় তবে সে টুকরা ছোলা বুটের চেয়ে ছোট হলে রোজা ভেঙ্গে যায় না, তবে এরূপ করা মাকরূহ। কিন্তু মুখ থেকে বের করার পর গিলে ফেললে তা যতই ছোট হোক না কেন রোজা কাযা করতে হবে।
১৫। হস্ত মৈথুন করলে যদি বীর্যপাত হয়।
১৬। পেশাবের রাস্তা বা স্ত্রীর যোনিতে কোন ঔষধ প্রবেশ করালে।
১৭। পানি বা তেল দ্বারা ভিজা আঙ্গুল যোনিতে বা পায়খানার রাস্তায় প্রবেশ করালে।
১৮। শুকনো আঙ্গুল প্রবেশ করিয়ে পুরোটা বা কিছুটা বের করে আবার প্রবেশ করালে। আর যদি শুকনো আঙ্গুল একবার প্রবেশ করিয়ে একবারেই পুরোটা বের করে নেয় আবার প্রবেশ না করায়, তাহলে রোজার অসুবিধা হয় না।
১৯। মুখে পান রেখে ঘুমিয়ে গেলে এবং এ অবস্থায় সুবহে সাদেক হয়ে গেলে।
২০। নস্যি গ্রহণ করলে বা কানে তেল ঢাললে।
২১। কেউ রোজার নিয়তই যদি না করে তাহলেও শুধু কাযা ওয়াজিব হয়।
২২। স্ত্রীর বেহুঁশ থাকা অবস্থায় কিংবা বে-খবর ঘুমন্ত অবস্থায় তার সাথে সহবাস করা হলে ঐ স্ত্রীর উপর শুধু কাযা ওয়াজিব হবে।
২৩। রমজান ব্যতীত অন্য নফল রোজা ভঙ্গ হলে শুধু কাযা ওয়াজিব হয়।
২৪। এক দেশে রোজা শুরু করার পর অন্য দেশে চলে গেলে সেখানে যদি নিজের দেশের তুলনায় আগে ঈদ হয়ে যায় তাহলে নিজের দেশের হিসেবে যে কয়টা রোজা বাদ গিয়েছে তার কাযা করতে হবে। আর যদি সেখানে গিয়ে রোজা এক দুটো বেড়ে যায় তাহলে তা রাখতে হবে।
যে সব কারণে রোজা না রাখার অনুমতি আছে
১। যদি কেউ শরী’আত সম্মত সফরে থাকে তাহলে রোজা তার জন্য রোজা না রাখার অনুমতি আছে; পরে কাযা করে নিতে হবে। কিন্তু সফরে যদি কষ্ট না হয়, তাহলে রোজা রাখাই উত্তম। আর যদি কোন ব্যক্তি রোজার রাখার নিয়ত করার পর সফর শুরু করে তাহলে সে দিনের রোজা রাখা জরুরী।
২। কোন রোগী ব্যক্তি রোজা রাখলে যদি তার রোগ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা হয় অথবা অন্য কোন নতুন রোগ দেখা দেয়ার আশঙ্কা হয় অথবা রোগ মুক্তি বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা হয়, তাহলে রোজা ছেড়ে দেয়ার অনুমতি আছে। সুস্থ হওয়ার পর কাযা করে নিতে হবে। তবে অসুস্থ অবস্থায় রোজা ছাড়তে হলে কোন দীনদার পরহেযগার চিকিৎসকের পরামর্শ থাকা শর্ত, কিংবা নিজের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের ভিত্তিতে হতে হবে, শুধু নিজের কাল্পনিক খেয়ালের বশিভূত হয়ে আশংকাবোধ করে রোজা ছাড়া দুরস্ত হবে না। তাহলে কাযা কাফ্ফারা উভয়টা ওয়াজিব হবে।
৩। রোগ মুক্তির পর যে দুর্বলতা থাকে তখন রোজা রাখলে যদি পুনরায় রোগাক্রান্ত হওয়ার প্রবল আশংকা হয় তাহলে তখন রোজা না রাখার অনুমতি আছে, পরে কাজা করে নিতে হবে।
৪। গর্ভবতী বা দুগ্ধদায়িনী স্ত্রী লোক রোজা রাখলে যদি নিজের জীবনের ব্যাপারে বা সন্তানের জীবনের ব্যাপারে আশংকা  বোধ করে বা রোজা রাখলে দুধ শুকিয়ে যাবে আর সন্তানের সমূহ কষ্ট হবে এরূপ নিশ্চিত হলে তার জন্য তখন রোজা ছাড়া জায়েয, পরে কাযা করে নিতে হবে।
৫। হায়েজ নেফাস অবস্থায় রোজা ছেড়ে দিতে হবে এবং পবিত্র হওয়ার পর কাযা করে নিতে হবে।
যে সব কারণে রোজা শুরু করার পর তা ভেঙ্গে ফেলার অনুমতি রয়েছে
১। যদি এমন পিপাসা বা ক্ষুধা লাগে যাতে প্রাণের আশংকা দেখা দেয়।
২। যদি এমন কোন রোগ বা অবস্থা দেখা দেয় যে, ঔষুধ-পত্র গ্রহণ না করলে জীবনের আশা ত্যাগ করতে হয়।
৩। গর্ভবতী স্ত্রীলোকের যদি এমন অবস্থা হয় যে, নিজের বা সন্তানের প্রাণ নাশের আশংকা হয়।
৪। বেহুঁশ বা পাগল হয়ে গেল।
* উল্লেখ্য যে, এসব অবস্থায় যে রোজা ছেড়ে দেয়া হবে তার কাজা করে নিতে হবে।
* কেউ যদি অন্যকে দিয়ে কাজ করাতে পারে বা জীবিকা অর্জনের জন্য অন্য কোন কাজ করতে পারে তা সত্ত্বেও সে টাকার লোভ রোদে গিয়ে কাজ করল এবং এ কারণে অনুরূপ পিপাসায় আক্রান্ত হল, তাহলে তার জন্য রোজা ছাড়ার অনুমতি নেই।
রমজান মাসের সম্মান রক্ষার মাসায়েল
* রমজান মাসে দিনের বেলায় লোকদের পানাহারের উদ্দেশ্যে হোটেল রেস্তোরা প্রভৃতি খাবার দোকান খোলা রাখা রমজানের অবমাননা বিধায় তা পাপ। অন্য ধর্মাবলম্বী বা মা’যূর ব্যক্তিদের খাতিরে খোলা রাখার অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। [ফাতাওয়ায়ে রহীমীয়া, খ. ২]
* কোন কারণ বশতঃ রোজা ভেঙ্গে গেলেও বাকী দিনটুকু পানাহার পরিত্যাগ করে রোজাদারের ন্যায় থাকা ওয়াজিব।  [বেহেশতী জেওর]
* দুর্ভাগ্য বশতঃ কেউ যদি রোজা না রাখে তবুও অন্যের সামনে পানাহার করা বা প্রকাশ করা যে, আমি রোজা রাখিনি এতে দ্বিগুণ পাপ হয়, প্রথম হরো রোজা না রাখার পাপ, দ্বিতীয় হলো গোনাহ প্রকাশ করার পাপ।
রোজার কাযার মাসায়েল
* রমজানের রোজা কাযা হয়ে গেলে রমজানের পর যথাশীঘ্র কাযা করে নিতে হবে। বিনা কারণে কাযা রোজা রাখতে দেরী করা গোনাহ।
* কাযা রোজার জন্য সুবহে সাদেকের পূর্বেই নিয়ত করতে হবে, অন্যথায় কাযা রোজা সহীহ হবে না। সুবহে সাদেকের পর নিয়ত করলে সে রোজা নফল হয়ে যাবে।
* ঘটনাক্রমে একাধিক রমজানের কাযা রোজা একত্রিত হয়ে গেলে নির্দিষ্ট করে নিয়ত করতে হবে যে, আজ অমুক বৎসরের রমজানের রোজা আদায় করছি।
* যে কয়টি রোজা কাযা হয়েছে তা একাধারে রাখা মোস্তাহাব। বিভিন্ন সময়ে রাখাও দুরস্ত আছে।
* কাযা শেষ করার পূর্বেই নতুন রমজান এসে গেলে তখন ঐ রমজানের রোজাই রাখতে হবে। কাযা পরে আদায় করে নিতে হবে।
রোজার কাফ্ফারার মাসায়েল
* একটি রোজার কাফ্ফারা ৬০ টি রোজা (একটি কাযা বাদেও)। এই ৬০ টি রোজা একাধারে রাখতে হবে। মাঝখানে ছুটে গেলে আবার পুনরায় পূর্ণ ৬০২ টি একাধারে রাখতে হবে। এই ৬০ দিনের মধ্যে নেফাস বা রমজানের মাস এসে যাওয়ার কারণে বিরতি হলেও কাফ্ফারা আদায় হবে না।
* কাফ্ফারার রোজ এমন দিন থেকে শুরু করবে যেন মাঝখানে কোন নিষিদ্ধ দিন এসে না যায়। উল্লেখ্য যে, পাঁচ দিন রোজা রাখা নিষিদ্ধ বা হারাম তা হল দুই ঈদের দিন এবং ঈদুল আযহার পরের তিন দিন।
* কাফ্ফারার রোজা রাখার মধ্যে হায়েজের দিন (নেফাসের নয়) এসে গেলেও যে কয়দিন সে হায়েযের কারণে বিরতি যাবে তাতে অসুবিধে নেই।
* কাযা রোজার ন্যায় কাফ্ফারার রোজার নিয়তও সুবহে সাদেকের পূর্বে হওয়া জরুরী।
* একই রমজানের একাধিক রোজা ছুটে গেলে কাফ্ফারা একটাই ওয়াজিব হবে। দুই রমজানের ছুটে গেলে দুই কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে।
* কাফ্ফারা বাবত বিরতিহীনভাবে ৬০ দিন রোজা রাখার সামর্থ না থাকলে পূর্ণ খোরাক খেতে পারে এমন ৬০ জন মিসকীনকে (অথবা একজনকে ৬০ দিন) দু’বেলা পরিতৃপ্তির সাথে খাওয়াতে হবে অথবা সদকায়ে ফিতর-য়ে যে পরিমাণ গম বা তার মূল্য দেয়া হয় প্রত্যেককে সে পরিমাণ দিতে হবে। এই গম ইত্যাদি বা মূল্য দেয়ার ক্ষেত্রে একজনকে ৬০ দিনেরটা একদিনেই দিয়ে দিলে কাফ্ফারা আদায় হবে না। তাতে মাত্র একদিনের কাফ্ফারা ধরা হবে।
* ৬০ দিন খাওয়ানোর বা মূল্য দেয়ার মাঝে ২/১ দিন বিরতি পড়লে ক্ষতি নেই।
রোজার ফেদিয়ার মাসায়েল
* ফেদিয়া অর্থ ক্ষতিপূরণ। রোজা রাখতে না পারলে বা কাজা আদায় করতে না পারলে যে ক্ষতিপূরণ দিতে হয় তাকে ফেদিয়া বলে। প্রতিটা রোজার পরিবর্তে সদকায়ে ফিতর (ফিতরা) পরিমাণ পণ্য বা তার মূল্য দান করাই হল এক রোজার ফেদিয়া।
* যার যিম্মায় কাযা রোজা রয়ে গেছে জীবদ্দশায় আদায় হয়নি, মৃত্যুর পর তার ওয়ারিশগণ তার ফেদিয়া আদায় করবে। মৃত ব্যক্তি ওছিয়ত করে গিয়ে থাকলে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে নিয়ম অনুযায়ী এই ফেদিয়া আদায় করা হবে। আর ওছিয়ত না করে থাকলেও যদি ওয়ারিছগণ নিজেদের মাল থেকে ফেদিয়া আদায় করে দেয় তবুও আশা করা যায় আল্লাহ তা কবূল করবেন এবং মৃত ব্যক্তিকে ক্ষমা করবেন।
* অতি বৃদ্ধ/বৃদ্ধা রোজা রাখতে না পারলে অথবা কোন ধ্বংসকারী বা দীর্ঘ মেয়াদী রোগ হলে এবং সুস্থ হওয়ার কোন আশা না থাকলে আর রোজা রাখায় ক্ষতি হওয়ার ভয় থাকলে এমন লোকের জন্য প্রত্যেক রোজার পরিবর্তে ফেদিয়া আদায় করার অনুমতি আছে তবে এরূপ বৃদ্ধ/বৃদ্ধা বা এরূপ রোগী পুনরায় কখনও রোজা রাখার শক্তি পেলে তাদেরকে কাযা করতে হবে এবং যে ফেদিয়া দান করেছিল তার ছওয়াব পৃথকভাবে সে পাবে।
নফল রোজার মাসায়েল
* পাঁচদিন ব্যতীত সারা বৎসর যে কোন দিন নফল রোজা রাখা যায়। উক্ত পাঁচদিন হল দুই ঈদের দুই দিন এবং ঈদুল আযহার পরের তিন দিন অর্থাৎ, ১১ই, ১২ই, ও ১৩ই যিলহজ্জ। এই পাঁচদিন যে কোন রোজা রাখা হারাম।
* যে ব্যক্তি প্রত্যেক চন্দ্র মাসের ১৩ ই, ১৪ ই, ও ১৫ ই তারিখে নফল রোজা রাখল, সে যেন সারা বৎসর রোজা রাখল। এটাকে আইয়্যামে বীযের রোজা বলে।
* প্রত্যেক সোমবার এবং বৃহস্পতিবারও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নফল রোজা রাখতেন। এতেও অনেক সাওয়াব আছে।
* বেলা দ্বিপ্রহরের এক ঘন্টা পূর্ব পর্যন্ত নফল রোজার নিয়ত করা দুরস্ত আছে।
* নফল রোজা শুরু করলে সেটা পুরো করা ওয়াজিব হয়ে যায়। তাই নফল রোজার নিয়ত করার পর সেটা ভাঙ্গলে তার কাযা আদায় করা ওয়াজিব।
* স্বামী বাড়িতে থাকা অবস্থায় তার বিনা অনুমতিতে স্ত্রীর জন্য নফল রোজা রাখা দুরস্ত নয়। রাখলে স্বামী হুকুম করলে তা ভেঙ্গে দিতে হবে এবং পরে কাযা করে নিতে হবে।
* মেহমান যদি একা খেতে মনে কষ্ট পায় তাহলে তার খাতিরে মেযবান (বাড়িওয়ালা) নফল রোজা ভেঙ্গে ফেলতে পারে। ভাঙ্গলে পরে কাযা করে নিতে হবে। তবে এই ভাঙ্গার অনুমতি সূর্য ঢলার পূর্ব পর্যন্ত। [উমদাতুর রিয়াহ]
মান্নতের রোজার মাসায়েল
যদি কেউ আল্লাহর নামে রোজা রাখার মান্নত করে তাহলে সেই রোজা রাখা ওয়াজিব হয়ে যায়। তবে কোন শর্তের ভিত্তিতে মান্নত মানলে সেই শর্ত পূরণ হওয়ার পূর্বে ওয়াজিব হয় না, শর্ত পূরণ হলেই ওয়াজিব হয়।
* কোন নির্দিষ্ট দিনে রোজা রাখার মান্নত করলে এবং সেই দিন সে রোজা রাখলে মান্নতের রোজা বলে নিয়ত করুক বা শুধু রোজা বলে নিয়ত করুক বা নফল বলে নিয়ত করুক মান্নতের রোজাই আদায় হবে। তবে কাযা রোজার নিয়ত করলে কাযাই আদায় হবে, মান্নতের রোজা আদায় হবে না।
* কোন দিন তারিখ নির্দিষ্ট করে মান্নত না করলে যে কোন দিন সে মান্নতের রোজা রাখা যায়। এরূপ মান্নতের রোজার নিয়ত সুবহে সাদেকের পূর্বেই হওযা শর্ত।
* কোন নির্দিষ্ট দিনে বা নির্দিষ্ট তারিখে বা নির্দিষ্ট মাসে রোজা রাখার মান্নত করলে সেই নির্দিষ্ট দিনে বা তারিখে বা মাসে রোজা রাখাই জরুরী নয় অন্য যে কোন সময় রাখলেও চলবে।
* যদি এক মাস রোজা রাখার মান্নত করে তাহলে পুরো এক মাস লাগাতার রোজা রাখতে হবে।
* যদি কয়েক দিন রোজা রাখার মান্নত করে তাহলে একত্রে রাখার নিয়ত না থাকলে সে কয়দিন ভেঙ্গে ভেঙ্গে রাখলেও চলবে। আর একত্রে রাখার নিয়ত করলে একত্রেই রাখতে হবে।
সুন্নাত এ’তেকাফ (রমজানের শেষ দশকের এ’তেকাফ) এর মাসায়েল
* এ’তেকাফ অর্থ স্থির থাকা, অবস্থান করা। পরিভাষায় জাগতিক কার্যকলাপ ও পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছওয়াবের নিয়তে মসজিদে বা ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করা স্থির থাকাকে এ’তেকাফ বলে।
* রমজানের শেষ দশকে এ’তেকাফ  করা সুন্নাতে মুআক্কাদায়ে কেফায়া, অর্থাৎ, বড় গ্রাম বা শহরের প্রত্যেকটা মহল্লা এবং ছোট গ্রামের পূর্ণ বসতিতে কেউ কেউ এ’তেকাফ করলে সকলেই দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবে আর কেউই না করলে সকলেই সুন্নাত তরকের জন্য দায়ী হবে।
* রমজানের ২০ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব থেকে ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা পর্যন্ত এ’তেকাফের সময়।
এ’তেকাফের শর্ত সমূহ
এ’তেকাফের জন্য তিনটি শর্ত যথা:
(১) এমন মসজিদে এ’তেকাফ হতে হবে যেখানে নামাজের জামাআত হয়। জুমআর জামাআত হোক বা না হোক। এ শর্ত পুরুষের এ’তেকাফের ক্ষেত্রে। মহিলাগণ ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে এ’তেকাফ করবে।
(২) এ’তেকাফের নিয়ত করতে হবে।
(৩) হায়েয নেফাস শুরু হলে এ’তেকাফ ছেড়ে দিবে।
যে সব কারণে এ’তেকাফ ফাসেদ তথা নষ্ট হয়ে যায় এবং কাযা করতে হয়
(১) স্ত্রী সহবাস করলে এ’তেকাফ ফাসেদ হয়ে যায়, চাই বীর্যপাত হোক বা না হোক, ইচ্ছাকৃত হোক বা ভুলে হোক। সহবাসের আনুষঙ্গিক কাজ যেমন চুম্বন, আলিঙ্গন, ইত্যাদির কারণে বীর্যপাত হলে এ’তেকাফ ফাসেদ হয়ে যায়। চুম্বন ইত্যাদির কারণে বীর্যপাত না হলে এ’তেকাফ বাতিল হয় না, তবে এ’তেকাফের অবস্থায় তা করা হারাম।
(২) এ’তেকাফের স্থান থেকে শরী’আত সম্মত প্রয়োজন বা স্বাভাবিক প্রয়োজন ছাড়া বের হলে এ’তেকাফ ফাসেদ হয়ে যায়। শরী’আত সম্মত প্রয়োজন হলে মসজিদের বাইরে যাওয়া যায়; যেমন সে মসজিদে জুমআর জামাআত না হলে জুমআর নামাজের জন্য জামে মসজিদে যাওয়া, ফরয বা সুন্নাত গোসলের জন্য বের হওয়া ইত্যাদি। আর স্বাভাবিক প্রয়োজনেও বের হওয়া যায়; যেমন পেশাব-পায়খনার জন্য বের হওয়া, খাদ্য-খাবার এনে দেয়ার লোক না থাকলে এবং পানি দেয়ার কেউ না থাকলে উযূর পানির জন্য বাইরে যাওয়া।
* যে কাজের জন্য বাইরে যাওয়া হবে সে কাজ সমাপ্ত করার পর সত্বর ফিরে আসবে, বিনা প্রয়োজনে কারো সাথে কথা বলবে না।
* গোসল ফরজ হওয়া ছাড়াও আমরা শরীর ঠান্ডা করার নিয়তে বা শরীর পরিষ্কার করার নিয়তে সাধারণতঃ যে গোসল করে থাকি, শুধু এরূপ গোসলেরই উদ্দেশ্যে মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না। তবে কাউকে বলে যদি পথের মধ্যে পানির ব্যবস্থা করে রাখে বা পুকুর ইত্যাদি থাকে আর পেশাব পায়খানা থেকে ফেরার পথে অতিরিক্ত সময় না লাগিয়ে জলদি ঐ পানি গায়ে মাথায় ঢেলে বা ডুব দিযে গোসল সেরে চলে আসে তাহলে এ’তেকাফের ক্ষতি হবে না।
এ’তেকাফের অবস্থায় যে সব জিনিস মাকরূহ
১. এ’তেকাফ অবস্থায় চুপ থাকলে ছওয়াব হয় এই মনে করে চুপ থাকা মাকরূহ তাহরীমী।
২. বিনা জরুরতে দুনিয়াবী কাজে লিপ্ত হওয়া মাকরূহ তাহরীমী। যেমন, ক্রয়-বিক্রয় করা ইত্যাদি। তবে নেহায়েত জরুরত হলে যেমন ঘরে খোরাকী নেই এবং সে ব্যতীত কোন বিশ্বস্ত লোকও নেই এরূপ অবস্থায় মসজিদে মাল-পত্র উপস্থিত না করে কেনা বেচার চুক্তি করতে পারে।

এ’তেকাফের মোস্তাহাব ও আদবসমূহ
১. এ’তেকাফের জন্য সর্বোত্তম মসজিদ নির্বাচন করবে। সর্বোত্তম মসজিদ হল মসজিদুল হারাম, তারপর মসজিদে নববী, তারপর বায়তুল মুকাদ্দাস, তারপর যে জামে মসজিদে জামাআতের এন্তেজাম আছে, তারপর মহল্লার মসজিদ, তারপর যে মসজিদে বড় জামা’আত হয়।
২. নেক কথা ব্যতীত অন্য কথা না বলা।
৩. বেকার বসে না থেকে নফল নামায, তিলাওয়াত ও তাসবীহ-তাহলীলে মশগুল থাকা উত্তম।
* এ’তেকাফে খাস কোন এবাদত করা শর্ত নয়, যে কোন নফল নামায, যিকির-আযকার, তিলাওয়াত, দ্বীনী কিতাব পড়া, পড়ানো বা যে ইবাদত মনে চায় করতে পারে।
* এ’তেকাফ শুরু করার পর নিজের বা অন্যের জীবন বাঁচানোর তাগিদে অনন্যোপায় অবস্থায় এ’তেকাফের স্থান থেকে বের হলে গোনাহ নেই, বরং তা জরুরী, তবে তাতে এ’তেকাফ ভেঙ্গে যাবে।
* কোন শরীআত সম্মত প্রয়োজনে বা স্বাভাবিক প্রয়োজনে বের হলে ইত্যবসরে কোন রোগী দেখলে বা জানাযায় শরীক হলে তাতে কোন দোষ নেই।
* পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এ’তেকাফে বসা বা বসানো উভয়টা না জায়েয ও গোনাহ। [জাওয়াহেরে ফেক্বাহ, খ. ১]
* মহিলাদের জন্য মসজিদে এ’তেকাফ করা মাকরূহে তাহরীমী। তারা ঘরে এ’তেকাফ করবে। স্বামী উপস্থিত থাকলে এ’তেকাফের জন্য স্বামীর অনুমতি গ্রহণ করতে হবে। স্বামীর খেদমতের প্রয়োজন থাকলে এ’তেকাফে বসবে না। শিশুর তত্ত্বাবধান ও যুবতী কন্যার প্রতি খেয়াল রাখার প্রয়োজনীয়তা থাকলে এ’তেকাফে না বসাই সমীচীন। মহিলাগণ নির্দিষ্ট কোন কামরায় বা ঘরের কোণে এক স্থানে পর্দা ঘিরে এ’তেকাফে বসবে। মহিলাদের জন্য এ’তেকাফের অন্যান্য মাসায়েল পুরুষদেরই ন্যায়।
ওয়াজিব এ’তেকাফ (মান্নতের এ’তেকাফ) এর মাসায়েল
* এ’তেকাফের মান্নত করলে এ’তেকাফ ওয়াজিব হয়ে যায়। তবে কোন শর্তের ভিত্তিতে মান্নত করলে (যেমন আমার অমুক কাজ হয়ে গেলে এ’তেকাফ করব ইত্যাদি) শর্ত পূরণ হওয়ার পূর্বে ওয়াজিব হয় না।
* ওযাজিব এ’তেকাফের জন্য রোজা শর্ত, যখনই এ’তেকাফ করবে রোজাও রাখতে হবে।
* ওয়াজিব এ’তেকাফ কমপক্ষে একদিন হতে হবে। বেশি দিনের নিয়ত করলে তাই করতে হবে।
* যদি শুধু একদিনের এ’তেকাফের মান্নত করে তাহলে তার সঙ্গে রাত শামেল হবে না। তবে যদি রাত-দিন উভয়ের নিয়ত করে বা একত্রে কয়েক দিনের মান্নত করে তাহলে রাতও শামেল হবে। দিন বাদে শুধু রাতে এ’তেকাফের মান্নত হয় না।
* উপরোল্লিখিত মাসায়েল ব্যতীত সুন্নাত এ’তেকাফের ক্ষেত্রে যে সব মাসায়েল বর্ণনা করা হয়েছে, ওয়াজিব এ’তেকাফের ক্ষেত্রেও সেগুলো প্রযোজ্য।
মোস্তাহাব/নফল এ’তেকাফের মাসায়েল
* সুন্নাত এ’তেকাফ (রমজান পূর্ণ শেষ দশক) ও ওয়াজিব এ’তেকাফ ব্যতীত অন্যান্য যে কোন সময়ের এ’তেকাফের জন্য কোন পরিমাণ সময় নির্ধারিত নেই সামান্য সময়ের জন্যও তা হতে পারে।
* যে সব জিনিস দ্বারা এ’তেকাফ ফাসেদ হয়ে যায় এবং কাযা করতে হয় সেসব দ্বারা মোস্তাহাব এ’তেকাফও নষ্ট হয়ে যাবে। তবে মোস্তাহাব এ’তেকাফের জন্য যেহেতু সময়ের পরিমাণ নির্ধারিত নেই, তার কাযাও নেই।
যাকাতের মাসায়েল
কোন কোন অর্থ/সম্পদ কি পরিমাণ থাকলে যাকাত ফরয হয়:
* যদি কারও নিকট শুধু সোনা থাকে, রূপা টাকা-পয়সা ও ব্যবসায়িক পণ্য কিছুই না থাকে, তাহলে সাড়ে সাত তোলা বা তার বেশি (সোনা) থাকলে বৎসরান্তে তার উপর যাকাত ফরয হয়।
* যদি কারো নিকট শুধু রুপা থাকে, সোনা, টাকা-পয়সা ও ব্যবসায়িক পণ্য কিছুই না থাকে, তাহলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা (রুপা) থাকলে বৎসরান্তে তার উপর যাকাত ফরয হয়।
* যদি কারও নিকট কিছু সোনা থাকে এবং তার সাথে কিছু রুপা বা কিছু টাকা-পয়সা বা কিছু ব্যবসায়িক পণ্য থাকে তাহলে এ ক্ষেত্রে সোনার সাড়ে সাত তোলা বা রুপার সাড়ে বায়ান্ন তোলা দেখা হবে না বরং সোনা, রুপা এবং টাকা-পয়সা এবং ব্যবসায়িক পণ্য যা কিছু আছে সবটা মিলে যদি সাড়ে সাত তোলা সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার যে কোন একটার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায়, তাহলে (বৎসরান্তে) তার উপর যাকাত ফরয হবে।
* যদি কারও নিকট শুধু টাকা-পয়সা থাকে, সোনা রুপা ও ব্যবসায়িক পণ্য কিছু না থাকে, তাহলে সাড়ে সাত তোলা সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার যে কোন একটার মূল্যের সমপরিমাণ (টাকা-পয়সা) থাকলে বৎসরান্তে তার উপর যাকাত ফরয হবে।
* কারও নিকট সোনা, রুপা ও টাকা-পয়সা কিছুই নেই শুধু ব্যবসায়িক পণ্য রয়েছে, তাহলে উপরোক্ত পরিমাণ সোন বা রুপার যে কোন একটার মূল্যের সমপরিমাণ থাকলে বৎসরান্তে তার উপর যাকাত ফরয হবে।
* কারও নিকট সোনা-রুপা নেই শুধু টাকা-পয়সা ও ব্যবসায়িক পণ্য রয়েছে, তাহলে টাকা-পয়সা ও ব্যবসায়িক পণ্যের মূল্য মিলিয়ে যদি উক্ত পরিমাণ সোনা বা রুপার যে কোন একটার মূল্যের সমপরিমাণ হয় তাহলে বৎসরান্তে তার উপর যাকাত ফরয হবে।
যাকাত ফরয হওয়ার শর্তসমূহ
* আকেল (বুদ্ধিমান) বালেগ, ছাহেবে নেছাব মুসলমানের উপর বৎসরে একবার যাকাত আদায় করা ফরয। যে পরিমাণ অর্থের উপর যাকাত ফরয হয় তাকে বলে ‘নেছাব’ আর এ পরিমাণ অর্থের মালিককে বলা হয় ‘ছাহেবে নেছাব’। গরিব, পাগল, ও নাবালেগের সম্পত্তিতে যাকাত ফরয হয় না।
* নেছাব পরিমাণ অর্থের উপর পূর্ণ এক বৎসর অতিবাহিত হলে যাকাত ফরয হয়। এক বৎসর অতিবাহিত হওয়ার পূর্বে যাকাত ফরয হয় না। যাকাতে ক্ষেত্রে ইংরেজি বা বাংলা নয় বরং চান্দ্র বৎসরের হিসাব করতে হবে।
* অর্থ সম্পদের প্রত্যেকটা অংশের উপর পূর্ণ এক বৎসর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয় বরং শুধু নেছাব পরিমাণের উপর বৎসর অতিবাহিত হওয়া শর্ত। কাজেই বৎসরের শুরুতে যে পরিমাণ ছিল (নেছাবের চেয়ে কম না হওয়া চাই) বৎসরের শেষে যদি তার চেয়ে পরিমাণ বেশি দেখা দেয় তাহলে ঐ বেশি পরিমাণের উপরও যাকাত ফরয হবে। এখানে দেখা গেল ঐ বেশি পরিমাণ যেটা বৎসরের মাঝে যোগ হয়েছে, তার উপর পূর্ণ এক বৎসর যোগ না হওয়া সত্ত্বেও তার উপর যাকাত আসছে।
* কেউ যদি বৎসরের শুরুতে মালেকে নেছাব হয় এবং বৎসরের শেষেও মালেকে নেছাব থাকে, মাঝখানে কিছু কম হয়ে যায় (নেছাবের ন্যুতম পরিমাণের চেয়ে কমে গেলেও) তাহলে বৎসরের শেষে তার নিকট যে পরিমাণ থাকবে তার উপর যাকাত ফরয হবে। তবে মাঝখানে যদি এমন হয়ে যায় যে, মোটেই অর্থ-সম্পদ না থাকে, তাহলে পূর্বের হিসাব বাদ যাবে। পুনরায় যখন নেছাবের মালিক হবে তখন থেকে নতুন হিসাব ধরা হবে এবং তখন থেকেই বৎসরের শুরু ধরা হবে।
যে সব অর্থ/সম্পদের যাকাত আসে না
* ব্যবসায়িক পণ্য ছাড়া ঘরে যে সব আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড়, থালা-বাসন, হাড়ি-পাতিল, ফ্রিজ, আলমারি, শোকেজ, পড়ার বই ইত্যাদি থাকে তার উপর যাকাত আসে না।
* থাকা বা ভাড়া দেয়ার উদ্দেশ্যে যে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করা হয় বা ক্রয় করা হয় কিংবা অনুরূপ উদ্দেশ্যে যে জমি ক্রয় করা হয় সে ঘর-বাড়ি ও জমির মূল্যের উপর যাকাত আসে না।
* কারও কারখানা থাকলে এবং উক্ত কারখানায় কোন উৎপাদন হলে সে উৎপাদনের কাজে যে মেশিন যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র ব্যবহৃত হয়, মিল-ফ্যাক্টরীতে যে গাড়ী ও যানবাহন ব্যবহৃত হয় তার মূল্যের উপর যাকাত আসে না বরং যাকাত আসে উৎপাদিত মালামাল ও ক্রয়কৃত কাঁচামালের উপর।
* রিক্সা, বেবি, টেক্সি, বাস, ট্রাক, লঞ্চ, স্টীমার ইত্যাদি যা ভাড়ায় খাটানো হয় অথবা যা দিয়ে উপার্জন করা হয় তার মূল্যের উপর যাকাত আসে না। অবশ্য এসব যানবাহনই যদি কেউ ব্যবসার (বিক্রয়ের) উদ্দেশ্যে ক্রয় করে থাকে তাহলে তার মূল্যের উপর যাকাত আসবে।
* পেশাজীবীরা তাদের পেশার কাজ চালানোর জন্য যেসব যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র ব্যবহার করে থাকে তার মূল্যের উপর যাকাত আসে না। যেমন, কৃষকের ট্রাক্টও, ইলেকট্রিশিয়ানদের ড্রিল মেশিন ইত্যাদি।
* যদি কারও নিকট ব্যবহারের উদ্দেশ্যে হীরা, মনি, মুক্তা, ডায়ম- ইত্যাদির অলংকার থাকে, তাহলে তার মূল্যের উপর যাকাত আসে না। তবে এরূপ নিয়তে রাখা হলে যে, এটা একটা সঞ্চয় প্রয়োজনের মুহূর্তে বিক্রি করে নগদ অর্থ অর্জন করা যাবে, এরূপ হলে তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে।
* প্রভিডেন্ট ফা-ের অর্থ হাতে পাওয়ার পূর্বে তার উপর যাকাত আসে না। তবে যে টাকাটা কর্তৃপক্ষ বাধ্যতামূলক নয় বরং চাকুরিজীবী স্বেচ্ছায় কর্তন করায় তার উপর যাকাত আসবে। এটা হল সরকারী চাকুরী প্রভিডেন্ট ফা-ের মাসআলা। আর প্রাইভেট কোম্পানীর প্রভিডেন্ট ফা-ের টাকা হাতে পাওয়ার পূর্বেও তার যাকাত দিতে হবে।  এমনিভাবে সরকারী চাকুরীর ক্ষেত্রেও চাকুরিজীবী যদি প্রভিডেন্ট ফা-ের টাকায় কোন ইন্সুরেন্স কোম্পানীতে অংশ নেয় তাহলেও তার যাকাত দিতে হবে। আহসানুল ফাতাওয়া, খ. ৪]
* না-বালেগ ও পাগল এর অর্থ/সম্পত্তিতে যাকাত আসে না।
যাকাত হিসাব করার তরীকা ও মাসায়েল
* যে অর্থ/সম্পদে যাকাত আসে সে অর্থ/সম্পদের ৪০ ভাগের ১ ভাগ যাকাত আদায় করা ফরয। মূল্যের আকারে নগদ টাকা দ্বারা বা তা দ্বারা কোন আসবাব পত্র ক্রয় করে তা দ্বারাও যাকাত দেয়া যায়।
* যাকাতের ক্ষেত্রে চন্দ্র মাসের হিসেবে বৎসর ধরা হবে। যখনই কেউ নেছাব পরিমাণ অর্থ/সম্পদের মালিক হবে তখন থেকেই তার যাকাতের বৎসর শুরু ধরতে হবে।
* সোনা-রুপার মধ্যে যদি ব্রঞ্জ, রাং, দস্তা, তামা ইত্যাদি কোন কিছুর মিশ্রণ থাকে আর সে মিশ্রণ সোনা-রুপার চেয়ে কম হয় তাহলে পুরোটাকেই সোনা-রুপা ধরে যাকাতের হিসেব করা হবে, মিশ্রিত দ্রব্যের কোন হিসাব করা হবে না। আর যদি মিশ্রিত দ্রব্য সোনা-রুপার চেয়ে অধিক হয়, তাহলে সেটাকে আর সোনা-রুপা ধরা হবে না। বরং ঐ মিশ্রিত ধ্রব্যই ধরা হবে।
* যাকাত হিসেব করার সময় অর্থাৎ, ওয়াজিব হওয়ার সময় সোনা-রুপা ব্যবসায়িক পণ্য ইত্যাদির মূল্য ধরতে হবে তখনকার (ওয়াজিব হওয়ার সময়কার) বাজার দর হিসেবে এবং সোনা-রুপার ইত্যাদি যে স্থানে রয়েছে সে স্থানের দাম ধরতে হবে। [আহসানুল ফাতাওয়া, খ. ৪]
* শেয়ারের মূল্য ধরার ক্ষেত্রে মাসআলা হল, যারা কোম্পানীর লভ্যাংশ অর্জন করার উদ্দেশ্যে নয় বরং শেয়ার ক্রয় করেছেন শেয়ার বেচা-কেনা করে লাভবান হওয়া এর উদ্দেশ্যে,তারা শেয়ার বাজারের দর ধরে যাকাত হিসেব করবেন। আর শেয়ার ক্রয় করার সময় যদি মুল উদ্দেশ্য থাকে কোম্পানী থেকে লভ্যাংশ অর্জন করা এবং সাথে সাথে এ উদ্দেশ্যও থাকে যে, শেয়ারের ভালো দর বাড়লে বিক্রিও করে দিব, তাহলে যাকাত হিসেব করার সময় শেয়ারের বাজার দরের যে অংশ যাকাত যোগ্য অর্থ/সম্পদের বিপরীতে আছে তার উপর যাকাত আসবে, অবশিষ্ট অংশের উপর যাকাত আসবে না। উদাহরণ স্বরূপ শেয়ারের মার্কেট ভ্যালূ (বাজার দর) ১০০ টাকা, তার মধ্যে ৬০ ভাগ কোম্পানীর বিল্ডিং, মেশিনারিজ ইত্যাদির বিপরীতে, আর ৪০ ভাগ কোম্পানীর নগদ অর্থ, কাঁচামাল ও তৈরী মালের বিপরীতে, তাহলে যাকাতের হিসেব করার সময় শেয়ারের বাজার দর অর্থাৎ, ১০০ টাকার ৬০ ভাগ বাদ যাবে। কেননা, সেটা এমন অর্থ/সম্পদের বিপরীতে যার উপর যাকাত আসে না। অবশিষ্ট ৪০ ভাগের উপর যাকাত আসবে। [ফিকহী মাকালাত]
* যাকাত দাতার যে পরিমাণ ঋণ আছে সে পরিমাণ অর্থ বাদ দিয়ে বাকীটার যাকাত হিসেব করবে। ঋণ পরিমাণ অর্থ বাদ দিয়ে যদি যাকাতের নেছাব পূর্ণ না হয় তাহলে যাকাত ফরয হবে না। তবে হযরত মাওলানা মুফতী তাকী উসমানী সাহেব বলেছেন, যে লোন নিয়ে বাড়ি করা হয় বা যে লোন নিয়ে মিল ফ্যাক্টরী তৈরি করা হয় বা মিল ফ্যাক্টরীর মেশিনারীজ ক্রয় করা হয়, এমনিভাবে যে সব লোন নিয়ে এমন কাজে নিয়োগ করা হয় যার মূল্যের উপর যাকাত আসে না, এসব লোন যাকাতের জন্য বাধা নয় অর্থাৎ, এসব লোনের পরিমাণ অর্থ যাকাতের হিসাব থেকে বাদ দেয়া যাবে না। হ্যাঁ, যে লোন নিয়ে এমন কাজে নিয়োগ করা হয়, যার মূল্যের উপর যাকাত আসে, এরূপ ক্ষেত্রে এ লোন পরিমাণ অর্থ যাকাতের হিসাব থেকে বাদ যাবে। মুফতী তাকী উসমানী সাহেব এ মাসআলাটিকে শক্তিশালী যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত করেছেন, অতএব তার মতটি গ্রহণ করার মধ্যেই সর্তকতা রয়েছে।
* কারও নিকট যাকাত দাতার টাকা পাওনা থাকলে সে পাওনা টাকার যাকাত দিতে হবে। পাওনা তিন প্রকার (এক) কাউকে নগদ টাকার ঋণ দিয়েছে কিংবা ব্যবসায়ের পণ্য বিক্রি করেছে এবং তার মূল্য বাকী রয়েছে। এরূপ পাওনা কয়েক বৎসর পর উসূল হলে যদি পাওনা টাকা এত পরিমাণ হয় যাতে যাকাত ফরয হয়, তাহলে অতীত বৎসর সমূহের যাকাত দিতে হবে। যদি একত্রে উসূল না হয়, ভেঙ্গে ভেঙ্গে উসূল হয়, তাহলে ১১ তোলা রুপার মূল্য পরিমাণ হলে যাকাত দিতে হবে। এর চেয়ে কম পরিমাণ উসূল হলে তার যাকাত ওয়াজিব হবে না। তবে অল্প অল্প করে সেই পরিমাণে পৌঁছে গেলে তখন ওয়াজিব হবে। আর যদি এরূপ পাওনা টাকা নেছাবের চেয়ে কম হয় তাহলে তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে না। (দুই) নগদ টাকা ঋণ দেয়ার কারণে বা ব্যবসায়ের পণ্য বাকীতে বিক্রি করার কারণে পাওনা নয় বরং ঘরের প্রয়োজনীয় আসবাব পত্র, কাপড়-চোপড়, চাষাবাদের গরু ইত্যাদি বিক্রয় করেছে এবং তার মূল্য পাওনা রয়েছে, এরূপ পাওনা যদি নেছাব পরিমাণ হয় এবং কয়েক বৎসর পর উসূল হয় তাহলে ঐ কয়েক বৎসরের যাকাত দিতে হবে। আর যদি ভেঙ্গে ভেঙ্গে উসূল হয় তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্য পরিমাণ না হবে ততক্ষণ যাকাত ওয়াজিব হবে না। যখন উক্ত পরিমাণ উসূল হবে তখন বিগত বৎসর সমূহের যাকাত দিতে হবে। (তিন) মহরের টাকা, পুরস্কারের টাকা, খোলা তালাকের টাকা, বেতনের টাকা ইত্যাদি পাওনা থাকলে এরূপ পাওনা উসূল হওয়ার পূর্বে যাকাত ওয়াজিব হয় না। উসূল হওয়ার পর ১ বৎসর মজুদ থাকলে তখন থেকে তার যাকাতে হিসাব শুরু হবে। পাওনা টাকার যাকাত সম্পর্কে উপরোল্লিখিত বিবরণ শুধু তখনই প্রযোজ্য হবে যখন এই টাকা ব্যতী তার নিকট যাকাত যেগ্য অন্য কোন অর্থ/সম্পদ না থাকে। আর অন্য কোন অর্থ/সম্পদ থাকলে তার মাসআলা উলামায়ে কেরাম থেকে জেনে নিবেন।
* যে ঋণ ফেরত পাওয়ার আসা নেই এরূপ ঋণের উপর যাকাত ফরয হয় না। তবে পেলে বিগত সমস্ত বৎসরের যাকাত দিতে হবে।
* যৌথ কারবারে অর্থ নিয়োজিত থাকলে যৌথভাবে পূর্ণ অর্থের যাকাত হিসাব করা হবে না বরং প্রত্যেকের অংশের আলাদা আলাদা হিসাব করা হবে। [ইসলামী ফিকাহ: ১ম]
* যে সব সোনা রুপার অলংকার স্ত্রীর মালিকানায় দিয়ে দেয়া হয় সেটাকে স্বামীর সম্পত্তি ধরে হিসাব করা হবে না বরং সেটা স্ত্রীর সম্পত্তি। আর যে সব অলংকার স্ত্রীকে শুধু ব্যবহার করতে দেয়া হয়, মালিক থাকে স্বামী, সেটা স্বামীর সম্পত্তির মধ্যে ধরে হিসাব করা হবে। আর  যেগুলোর মালিকানা অস্পষ্ট রয়েছে তা স্পষ্ট করে নেয়া উচিত। যেসব অলংকার স্ত্রীর নিজস্ব সম্পদ থেকে তৈরি বা যেগুলোর বাপের বাড়ি থেকে অর্জন করে সেগুলো স্ত্রীর সম্পদ বলে গণ্য হবে। মেয়েকে যে অলংকার দেয়া হয় সেটার ক্ষেত্রেও মেয়েকে মালিক বানিয়ে দেয়া হলে সেটার মালিক সে। আর শুধু ব্যবহারের উদ্দেশ্যে দেয়া হলে মেয়ে তার মালিক নয়। নাবালেগা মেয়েদের বিবাহ-শাদীতে ব্যয়ের লক্ষ্যে তাদের নামে ব্যাংকে বা ব্যবসায় যে টাকা লাগানো হয় সেটার মালিক তারা। অতএব এগুলো পিতা/মাতার সম্পত্তি বলে গণ্য হবে না এবং পিতা/মাতার যাকাতের হিসাব এগুলো ধরা হবে না। আর বালেগ সন্তানের নামে শুধু অলংকার তৈরী করে রাখলে বা টাকা লাগালেই তারা মালিক হয়ে যায় না যতক্ষণ না সেটা সে সন্তানদের দখলে দেয়া হয়। তাদের দখলে দেয়া হলে তারা মালিক, অন্যথায় সেটার মালিক পিতা/মাত।
* হিসাবের চেয়ে কিছু বেশি যাকাত দেয়া উত্তম। যাতে কোন রূপ কম হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে। প্রকৃত পক্ষে সেটুকু যাকাত না হলেও তাতে দানের ছওয়াবতো হবেই।
গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি প্রভৃতি প্রাণীর যাকাত
* গরু, বলদ, মহিষ, ঘোড়া, খচ্ছর প্রভৃতি প্রাণী ক্ষেত খামারের কাজে বা গাড়ী টানার জন্য অথভা বোঝা বহনের নিমিত্তে প্রতিপালন করা হলে তার উপর যাকাত ওয়াজিব হয় না।
* গরু, ছাগল, মহিষ প্রভৃতি চতুষ্পদ প্রাণী ব্যবসার নিয়তে ক্রয় করলে অর্থাৎ, ক্রয় করার সময় স্বয়ং ঐ প্রাণী বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ক্রয় করলে সেগুলো ব্যবসায়িক পণ্য বলে গণ্য হবে এবং সেগুলোর মূল্য যাকাতের হিসাবে আসবে। যাকাত আদায় করার দিন তার যে মূল্য সেই মূল্য ধরা হবে। ক্রয় করার সময় যদি বিক্রয়ের নিয়ত না থাকে বা পরে এরূপ নিয়ত হয়, সে সব ক্ষেত্রে সেগুলো বাণিজ্যিক পণ্য বলে গণ্য হবে না এবং তার উপর যাকাত আসবে না।
* গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ যদি দুধের জন্য অথবা বংশ বৃদ্ধির জন্য কিংবা শখ বশতঃ পালন করা হয়, তাহলে তাতে যাকাত আসে; তবে সেগুলো যাকাত আসার শর্ত হলে সেগুলো ‘সায়েমা’ হতে হবে অর্থাৎ, সেগুলোর বেশির ভাগ সময়ের খাদ্য বা বেশির ভাগ খাদ্য নিজেদের দিতে হয় নাং বরং ময়দান জংগল ও চারণভূমির ঘাসপাতা ও তৃণলতা খেয়ে জীবন ধারণ করে, তাহলে তার উপর যাকাত আসে। তবে এরূপ ছাগল, ভেড়া অন্ততঃ ৪০ টা এবং গরু, মহিষ, ৩০ টার কম হলে তার উপর যাকাত আসে না। সাধারণতঃ আমাদের দেশে এরূপ গরু ছাগল ইত্যাদি পাওয়া যায় না, তাই তার যাকাতের পরিমাণ ও বিস্তারিত বিবরণ পেম করা থেকে বিরত রইলাম। আমাদের দেশের গরু মহিষের ফার্মে গরু মহিষকে নিজেরা খাদ্য দিতে হয় তাই সেগুলো সায়েমা নয়। অতএব দুধের উদ্দেশ্যে বা বংশ বৃদ্ধির জন্য সেগুলো পালন করলেও তার উপর যাকাত আসবে না।
* হাঁস, মুরগি যদি ডিমের উদ্দেশ্যে বা তার বাচ্চা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে পালন করা হয়, তাহলে সেই হাঁস মুরগির উপর যাকাত আসে না। তবে হাঁস মুরগি বা তার বাচ্চা ক্রয়ের সময় যদি স্বয়ং সেটাকেই বিক্রি করার নিয়তে ক্রয় করা হয় তাহলে সেটা বাণিজ্যিক পণ্য বলে গণ্য হবে এবং তার মূল্যের উপর যাকাত আসবে।
* বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে মাছ চাষ করা হলে সেই মাছ বাণিজ্যিক পণ্য বলে গণ্য হবে এবং তার মূলের উপর যাকাত আসবে। [আহসানুল ফাতাওয়া, খ. ৪]
কোন লোকদের বা কোন কোন খাতে যাকাত দেয়া যায় না
নি¤œলিখিত লোকদেরকে বা নি¤œলিখিত খাতে যাকাত দেয়া যায় না, দিলে যাকাত আদায় হয় না।
১। যার নিকট নেছাব পরিমাণ অর্থ/সম্পদ আছে।
২। যারা সাইয়্যেদ অর্থাৎ, হাসানী, হোসাইনী, আলাবী, জা’ফরী ইত্যাদি।
৩। যাকাত দাতার মা, বাপ, দাদা, দাদী, পরদাদা, পরদাদী, পরনানা, পরনানী ইত্যাদি উপরের সিঁড়ি।
৪। যাকাত দাতার ছেলে, মেয়ে, নাতি, নাতনি, পোতা, পৌত্রী, ইত্যাদি নীচের সিঁড়ি।
৫। যাকাত দাতার স্বামী বা স্ত্রী।
৬। অমুসলিমকে যাকাত দেয়া যায় না।
৭। যার উপর যাকাত ফরজ হয় এরূপ মালদার লোকদের নাবালেগ সন্তান।
৮। মসজিদ-মাদ্রাসা, বা স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল প্রভৃতি নির্মাণ কাজের জন্য।
৯। মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের জন্য বা মৃত ব্যক্তির ঋণ ইত্যাদি আদায়ের জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যায় না।
১০। রাস্তা-ঘাট, পুল ইত্যাদি নির্মাণ ও স্থাপন কার্যে যেখানে নির্দিষ্ট কাউকে মালিক বানানো হয় না সেখানে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যায় না।
১১। সরকার যদি যাকাতের মাসআলা অনুযায়ী সঠিক খাতে যাকাতের অর্থ ব্যয় না করে, তাহলে সরকারের যাকাত ফা-ে যাকাত দেয়া যাবে না।
১২। যাকাত দ্বারা মসজিদ-মাদ্রাসার স্টাফকে (গরীব হলেও) বেতন দেয়া যাবে না।
যে লোকদের যাকাত দেয়া যায়
১। ফকীর র্অথাৎ, যাদের নিকট সন্তান সন্তুতির প্রয়োজন সমাধা করার মত সম্বল নেই অথবা যাদের নিকট যাকাত ফেৎরা ওয়াজিব হওয়ার পরিমাণ অর্থ সম্পদ নেই।
২। মিসকীন অর্থাৎ, যারা সম্পূর্ণ রিক্ত হস্ত অথবা যাদের জীবিকা অর্জনের ক্ষমতা নেই।
৩। ইসলামী রাষ্ট্র হলে তার যাকাত তহবিলের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিগণ।
৪। যাদের উপর ঋণের বোঝা চেপেছে।
৫। যারা আল্লাহর রাস্তায় শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদে লিপ্ত।
৬। মুসাফির ব্যক্তি (বাড়িতে সম্পদশালী হলেও) সফরে রিক্ত হস্ত হয়ে পড়লে।
৭। যাকাত দাতার ভাই বোন, ভাতিজা, ভাতিজী, ভগ্নিপতি, ভাগনা-ভাগনী, চাচা-চাচী, খালা-খালু, ফুপা, ফুফী, মামা-মামী, শ্বাশুড়ী, জামাই, সৎ বাপ ও সৎ মা ইত্যাদি (যদি এরা গরীব হয়)
৮। নিজের গরীব চাকর-বাকর নওকর বা কর্মচারীকে দেয়া যায়। তবে এটা বেতন বাবদ কর্তন করা যাবে না।
যাদেরকে যাকাত দেয়া উত্তম
১। দ্বীনী ইলম পড়নেওয়ালা এবং পড়ানেওয়ালা যদি যাকাতের হকদার হয়, তাহলে এরূপ লোককে যাকাত দেয় সবচেয়ে উত্তম। [জাওয়াহেরে ফেকাহ, খ.১]
২। তারপর যাকাত পাওয়ার সবচেয়ে যোগ্য নিজের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে যারা যাকাত পাওয়ার যোগ্য তারা।
৩। তারপর বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীর মধ্যে যারা যাকাত পাওয়ার যোগ্য তারা।
৪। তারপর যাকাতের অন্যান্য হকদারগণ।
যাকাত আদায় করার তরীকা ও মাসায়েল
* বৎসর পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে যাকাত আদায় করতে হবে। বিনা ওজরে বিলম্ব করলে পাপ হবে।
* যাকাত আদায় করার সময় নিয়ত করতে হবে যে, এ সম্পদ আল্লাহর ওয়াস্তে যাকাত হিসেবে প্রদান করা হচ্ছে, নতুবা যাকাত আদায় হবে না।
* নেছাবের মালিক হওয়ার পর বৎসর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেও অর্থাৎ,  যাকাত ওয়াজিব হওয়ার পূর্বেও অগ্রিম প্রদান করা যায়।
* যাকাত প্রদানের সময় গ্রহণকারীকে একথা জানানো প্রয়োজন নেই যে, এটা যাকাতের টাকা। আপনজনকে যাকাত দিলে তাকে একথা না বলাই শ্রেয়, কেননা বললে তার খারাপ লাগতে পারে।
* যে পরিমাণ টাকা থাকলে কারও উপর যাকাত ফরয হয়, এত পরিমাণ যাকাতের টাকা একজনকে দেয়া মাকরুহ। তবে ঋণি ব্যক্তির ঋণ মুক্তির জন্য বা অধিক সন্তান সন্তুতি ওয়ালাকে এত পরিমাণ দিলেও ক্ষতি নেই।
* যাকাত দেয়র নিয়তে কোন টাকা পৃথক করে রাখলে পরে দেয়র সময় যাকাতের নিয়তের কথা মনে না থাকলেও যাকাত আদায় হয়ে যাবে।
* যাকে যাকাত দিবে অন্তত এত পরিমাণ দিবে যেন ঐ দিনের খরচের জন্য সে আর অন্যের মুখাপেক্ষী না হয়। কম পক্ষে এত পরিমাণ দেয়া মোস্তাহাব, এর চেয়ে কম দিলেও যাকাত আদায় হয়ে যাবে।
* কারও নিকট টাকা পাওনা থাকলে যাকাতের নিয়তে সেই টাকা মাফ করে দিলে যাকাত আদায় হবে না বরং তার নিকট যাকাতের টাকা দিয়ে পরে তার নিকট থেকে ঋণ পরিশোধ বাবদ সে টাকা নিয়ে নিলে যাকাতও আদায় হবে ঋণও উসূল হবে।
* যাকাতের টাকা নিজের হাতে গরীবদেরকে না দিয়ে অন্য কাউকে উকিল বানিয়ে তার দ্বারাও দিলেও যাকাত আদায় হবে।
* যাকাত ওযাজিব হওয়ার পর কেউ নিজের সমস্ত মাল দান করে দিলে তার যাকাত মাফ হয়ে যায়।
* যাকাত দাতার অনুমতি ছাড়া অন্য কেউ তার পক্ষ থেকে যাকাত দিয়ে দিলে যাকাত আদায় হবে না।
* যাকাত দাতা কাউকে পুরস্কার বা ঋণের নামে কিছু দিল আর অন্তরে নিয়ত রাখল যে, যাকাত হতে দিলাম, তবুও যাকাত আদায় হয়ে যাবে। মুখে যাকাত কথাটা বলার আবশ্যকাত নেই।
সদকায়ে ফিতর/ফিতরা এর মাসায়েল
* ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদেকের সময় যার নিকট যাকাত ওয়াজিব হওয়া পরিমাণ অর্থ/সম্পদ থাকে তার উপর সদকায়ে ফিতর বা ফিতরা ওয়াজিব। তবে যাকাতের নেছাবের ক্ষেত্রে ঘরের আসবাবপত্র বা ঘরের মূল্য ইত্যাদি হিসেবে ধরা হয় না কিন্তু ফিতরার ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় আসবাবপত্র ব্যতীত অন্যান্য আসবাবপত্র সৌখিন দ্রব্যাদি, খালিঘর বা ভাড়া ঘর (যার ভাড়ার উপর জীবিকা নির্ভরশীল নয়) এসব কিছুর মূল্য হিসেবে ধরা হবে।
* রোজা না রাখলে বা রাখতে না পারলে তার উপরও ফিতরা দেয়া ওয়াজিব। এ কথা নয় যে, রোজা না রাখলে ফিতরাও দিতে হয় না।
* সদকায়ে ফিতর/ ফিতরা নিজের পক্ষ থেকে এবং পিতা হলে নিজের নাবালেগ সন্তানের পক্ষ থেকে দেয়া ওয়াজিব। বালেগ সন্তান, স্ত্রী, স্বামী, চাকর-বাকরানী, মাতা-পিতা প্রমুখের পক্ষ থেকে দেয়া ওয়াজিব নয়। তবে বালেগ সন্তান পাগল হলে তার পক্ষ থেকে দেয়া পিতার উপর ওয়াজিব।
* একান্নভুক্ত পরিবার হলে বালেগ সন্তান, মাতা পিতার পক্ষ থেকে এবং স্ত্রীর পক্ষ থেকে ফিতরা দেয়া মোস্তাহাব ওয়াজিব নয়। [বেহেশতী জেওর, বাংলা]
* সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব না হলেও সঙ্গতি থাকলে দেয়া মোস্তাহাব এবং অনেক সওয়াবের কাজ। [প্রাগুক্ত]
* ফিতরার ৮০ তোলার সেরের হিসেবে ১ সের সাড়ে বার ছটাক ১ কেজি ৬৬২ গ্রাম গম বা আটা কিংবা তার মূল্য দিতে হবে । পূর্ণ দুই সের ১ কেজি ৮৬৬ গ্রাম বা তার মূল্য দেয়া উত্তম।
* গম, আটা, ও যব ব্যতীত অন্যান্য খাদ্যশস্য যেমন, ধান, চাউল, বুট, কলাই, মটর ইত্যাদি দ্বারা ফিতরা আদায় করতে চাইলে বাজার দরে উপরোক্ত পরিমাণ গম বা যবের যে মূল্য হয় সে মূল্যের ধান চাউল ইত্যাদি দিতে হবে।
* ফিতরায় গম, যব ইত্যাদি শষ্য দেয়ার চেয়ে তার মূল্য নগদ টাকা পয়সা দেয়া উত্তম।
* ফিতরা ঈদুল ফিতরের দিন ঈদের নামাজের পূর্বেই দিয়ে দেয়া উত্তম। নামাজের পূর্বে দিতে না পারলে পরে দিলেও চলবে। ঈদের দিনের পূর্বে রমজানের মধ্যে দিয়ে দেয়াও দোরস্ত আছে।
* যাকে যাকাত দেয়া যায় তাকে ফিতরা দেয়া যায়।
* একজনের ফিতরা একজনকে দেয়া বা একজনের ফেতরা কয়েকজনকে দেয়া উভয়ই দুরস্ত আছে। কয়েকজনের ফেতরাও একজনকে দেয়া দুরস্ত আছে কিন্তু তার দ্বারা যেন সে মালেকে নেছাব না হয়ে যায়। অধিকতর উত্তম হল একজনকে এই পরিমাণ ফিতরা দেয়া, যার দ্বারা সে ছোট-খাট প্রয়োজন পূরণ করতে পারে বা পরিবার পরিজন নিয়ে দু তিন বেলা খেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight