রমজান এর শিক্ষা : আব্দুল্লাহ আবু নাদরা

Ramjan

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির আল্লাহ্কে স্মরণ করা, তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষণ নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষণ, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কুরআনুল কারীম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের  মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্নত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য ও শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে।

রমজান রহমতের মাস
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহর কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় ইয়াকুব আ. এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ আ. যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভালো কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, প্রত্যেক আদম সন্তানের ভালো কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম বা রোযা ছাড়া কারণ রোযা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। [মুসলিম ২৭০৭,  নাসাঈ, দারিমি, বায়হাকি]
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ সা. বলেছেন, যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায় এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। [বুখারি :১৮৯৯, মুসলিম, নাসাঈ, আহমাদ, ইবন হিব্বান, দারিমি]
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। [বুখারি:৩৮, নাসাঈ, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হিব্বান]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম [রোযাদার) দের জন্য জান্নাতে রায়্যান নামক দরজা রেখেছেন এবং কিয়ামতের দিন সায়েম (রোযাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ রা. হতে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, জান্নাতের আটটি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম রায়্যান যার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোযাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। [বুখারি :৪৭৯, মুসলিম]
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, রোযাদার এর  মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। [বুখারি :১৯০৪, নাসাঈ, ইবন মাজাহ, আহমাদ]
রোযা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবে এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নিকট সুপারিশ করবে।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ রা. হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ সা. বলেছেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন ‘রোযা হল জুন্নাহ বা ঢাল যার দ্বারা বান্দা নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে এবং রোযা আমার জন্য- আমিই এর প্রতিদান দিই”। [আহমাদ :১৪৭২৪]
রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে- হে রব! আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কুরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। [হাকিম, আবু নুয়াঈম, হাসান]
ইবন আব্বাস রা. হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ সা. বলেছেন, রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হজ্জ করার সমান। [ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসাঈ, আহমাদ।]
উল্লেখিত হাদীস এবং আরো অন্যান্য হাদীস থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, রমজান মাস পুরোটাই হল রহমত এবং বরকত দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গণনা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।

রমজান ঐক্যের এবং ভ্রাতৃত্বের মাস
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোযা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালয়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোযা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসল্লিদের ঢল নামছে, মাঝরাতে  সেহরি খাচ্ছে। মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার করছে, মসজিদে কুরআন প্রশিক্ষণ চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় তা হল ভ্রাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির পথচারীকে ইফতার করানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয়, যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভ্রাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ সা. প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ সা. এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলে, রাসূলুল্লাহ সা. সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল আ. এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন [বুখারী, মুসলিম]  এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক দান- সাদাকা করব।

রমজান তাকওয়া অর্জনের মাস
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তাআলার নিকটবর্তী হওয়ার জন্য সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহর সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। [সূরা বাকারা, আয়াহ ১৮৩]
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরী। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারণ করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার বা ধর্মহীনতার নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি আনা হয় না। মুত্তাকি বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষণ টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টন বিচার আচারের ক্ষেত্রে তাকওয়া আছে এটা অনেকে ভাবতেই পারেনা। অথচ মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আছে তাকওয়ার স্তর।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়ার শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমনসব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমনসব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহকে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন, হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ্কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। [সূরা আল ইমরান, আয়াত ১০২]
এখানে আল্লাহ্ তাআলা স্পষ্ট বলেছেন, আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ রা. বলেছেন, “তাকওয়া দিনের বেলা রোযা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয বা অত্যাবশ্যকীয় করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তাআলা ভালো কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব রা. এর পুত্র হাসান রা. বলেছেন, মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন। যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল সা. এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই তাকওয়া অর্জন করবে।” [সূরা আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১]
এবং আলাহ তাআলা বলেন, “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদশন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর”। [সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫]
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ করেছেন অর্থাৎ কুরআন অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম”। [সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫]
এখানে সূরা আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তাগুত কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কুরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তাআলা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বুঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে  ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না। আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহর জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্য কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না এতে জেল-নির্যাতন-মামলার ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক বা সত্য কথা বলা” [নাসাঈ, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ]  রাসুলুল্লাহ সা. আরও বলেছেন, “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর”। [আবু দাউদ, তিরমিযি]

কুরআনের মাস
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রা. মক্কায় কুরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের হাতে মার খেয়ে চেহারাসহ রক্তাক্ত হয়ে ফেরত আসেন, যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যবহারই করবে। পরদিন আবার তিনি একই ভাবে প্রকাশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি কুরাইশদের কাছে মার খেয়েও আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কুরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কুরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন, “রমজান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে”। [সূরা বাকারা : ১৮৫]
আমরা এই রমজান মাসে কুরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীর নামাযে কুরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কুরআনের ব্যবহার বুঝি? কুরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগণ কিভাবে কুরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? হযরত আয়েশা রা. কে যখন রাসূলুল্লাহ সা. এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ সা. এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কুরআন বা চলন্ত কুরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কুরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কুরআনের আয়াত প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কুরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তাআলা বলছেন, “যদি আমি এই কুরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” [সূরা হাশর – আয়াহ ২১]
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে, পাহাড়ের উপর কুরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বুঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তাআলা কুরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল করেছেন। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কুরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কুরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কুরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কুরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওয়াতের জন্য  বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়। যেমন সূরা আন নিসাতে আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান”। আবার সূরা ইবরাহীমের প্রথম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে আপনার পালনকর্তার নির্দেশে”।
একবার মুআজ ইবন জাবাল রা. শহরের মানুষদের ডেকে বললেন, “আজকে কুরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কুরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে”। তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলেছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীর নামাযে কুরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কুরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কুরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল সা. বলেছেন, “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কোনো জাতি কে কুরআন দ্বারা সমুন্নত করেন এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন”। [মুসলিম]
আল্লাহ্ তাআলা বলছেন, আর যদি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নেয়ামত সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম, কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। [সূরা আরাফ আয়াত: ৯৬]।
সুতরাং উপরোক্ত কুরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা মুসলিম উম্মাহ আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নেয়ামত না দিয়ে কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কুরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে। অথচ কুরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল!
জিয়াদ ইবন লাবিদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সা. কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন, “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। তখন আমি (জিয়াদ) বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ সা. এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কুরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কুরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কুরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর রাসূল সা. বললেন, জিয়াদ! তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনায় ধর্ম সম্পর্কে ভালো জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” [আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিযি]
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কুরআন তিলাওয়াত করে বা কুরআন প্রশিক্ষণ বা কুরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কুরআনের বাস্তবায়ন করে না, কুরআন দিয়ে শাসন করে না।

তাওবাহ এবং দোআ কবুলের মাস
আমরা জানি রমজান মাসে কুরআনুল কারীম, তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের আর এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল কদর পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহর দরবারে অনেক দোআ করেন, তওবাহ করেন, গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কুরআন তিলাওয়াত করেন, সেহরীর আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তাআলা প্রতিদিন প্রচুর রোযাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোআ করে ক্ষমা চায়। রোযাদারের দোআ কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, “তিন ব্যক্তির দোআ আল্লাহ তাআলা কখনও ফেরত দেন না, এক. ন্যায় পরায়ণ শাসক, দুই. রোযাদার যখন ইফতার করে, তিন. মজলুম বা অত্যাচারিত ব্যক্তির দোআ”। [ইবন মাজাহ : ১৭৫২।]

রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না। কারণ আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “জীবরাইল আ. আসলেন এবং বললেন যে ব্যক্তি রমজানে উপনিত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলোনা এবং নিজেকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না, আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হোক এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা.) বললাম, আমিন” [আহমাদ- ৭৪৪৪, ইবনে খুযাইমাহ, তিরমিযি, হাকেম]
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত- “যারা রোযা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” [তিরমিযি।]
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের আলোকে বুঝা যাচ্ছে যে, রমজান মাসে একজন রোযাদারের যেরকম দোআ কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোযাদারের দোআয় আল্লাহ্ তাআলা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ দোআ কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল-আন্তরিকতা, হালাল রিযিক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তাআলা দোআ কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। [তিরমিযি]
সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ বা জালিম শাসকের অন্যায়-অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী”। [আবু দাউদ, তিরমিযি, ইবন মাজাহ]
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহ্বান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম, আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোআ আল্লাহ্ তাআলা কবুল তো করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদীস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন “যখন কেউ কোনো অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর”। [মুসলিম]
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহর পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মুমিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহর ক্ষমা পাওয়া যায় না।

রমজান বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার প্রচুর রহমত বরকত পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে হিজরি ২য় সালে বদরের ময়দানে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জে ছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কুরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহর সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।

রমজান পরবর্তী আমল
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারে কিনতে ব্যস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেই সেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের তাওফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কুরআনের আলোকে সমাজ প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দেন, যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে আমাদের বিজয় অর্জন করতে পারি। রমজানের তাকওয়া বুকে ধারণ করে বাকী এগার মাস যেন আল্লাহর ভয় ও আমলের মাঝে কাটাতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পবিত্র মাহে রমজানের প্রতিটি দ-ায়মান, রুকু, সেজদাসহ রাত্রদিনের সব আমল কবুল করেন। আমিন।

অতিথী লেখক : রিয়াদ, সউদি আরব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight