রমজানের রোজা : ফজীলত ও বিধান, মাওলানা আহমদ মায়মূন

আল্লাহ তা‘আলা মুসলিম জাতির জন্য রমজানের রোজা ফরজ করেছেন। এ জন্য মুসলিম সমাজের ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠী পূর্ণ রমজান মাস ব্যাপী আল্লাহ তা‘আলার হুকুম পালনার্থে রোজা রেখে থাকে। রোজা এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যার দ্বারা মানুষের দৈহিক, আত্মিক ও আধ্যাত্মিক উপকার ও উন্নতি সাধিত হয়। এ জন্য পূর্ববর্তী ধর্মালম্বী অন্যান্য জানি-সম্প্রদায়ের জন্যও আল্লাহ তা‘আলা রোজার বিধান দান করেছিলেন। এ থেকে ‘রোজা’ নামক এ ইবাদতের গুরুত্ব পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। আমাদের প্রতি রোজার বিধান আরোপ করতে গিয়ে আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে বলেন, “হে মু’মিনগণ! তোমাদের জন্য রোজা পালন অপরিহার্জরূপে লিপিবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যেমন অপরিহার্যরূপে লিপিবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল তাদের জন্য, যারা তোমাদের পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। [সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৩]
উক্ত আয়াতে ‘রোজা পালন’ বোঝাতে যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে তা হল ‘সিয়াম’। আরবী ভাষায় ‘সিয়াম’ শব্দটির দু’রকম ব্যবহার রয়েছে। এক : ক্রিয়ামূল। অর্থাৎ, রোজা পালন করা। দুই : ‘সাওম’ এর বহুবচন। অর্থাৎ, রোজাসমূহ। উপরিউক্ত আয়াতে ‘সিয়াম’ শব্দটি ক্রিয়ামূলরূপে ব্যবহৃত হয়েছে, বহুবচনরূপে নয়। এমনিভাবে ‘সাওম’ শব্দটিও আরবী ভাষায় দু’ভাবে ব্যবহৃত হয়। এক : ক্রিয়ামূল, যা পূর্বে উল্লেখিত ‘সিয়াম’ এর প্রথম ব্যবহারের সমার্থক। দুই : রোজা, যা মানুষ নির্দিষ্ট নিয়মে পালন করে। ‘সাওম’ এর প্রথম ব্যবহারটি ক্রিয়ামূলরূপে হয়ে থাকে; যার অর্থ বিরত থাকা। আর দ্বিতীয় ব্যবহারটি পারিভাষিকরূপে। অর্থাৎ, ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ‘সাওম’ বলা হয় সুবহে সাদেক (সূর্যোদয়ের পূর্ববর্তী ধল প্রভাত) এর প্রথম মুহূর্ত থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পুরো সময় এক নাগাড়ে পানাহার ও যৌন বাসনা পূরণ থেকে বিরত থাকাকে, যাতে রোজার নিয়তও সম্পৃক্ত থাকে।
সুতরাং কেউ যদি উপরিউক্ত সময়ের মধ্যে রোজার পরিপন্থী কোনো কাজ করে বসে অথবা সেসব থেকে বিরত থাকা সত্ত্বেও রোজার নিয়ত না থাকে, তবে তা দ্বারা রোজা পালন শুদ্ধ হবে না।
রমজান মাসের রোজা ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম স্তম্ভ এবং এমন একটি ইবাদত, যা ইসলামও মুসলমানের পরিচয়ের ধারক। রোজার অসংখ্য ফজীলত রয়েছে।
রোজার ফজীলত : হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মানুষের নেক আমলের পুরস্কার বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। একটি নেক আমলকে দশগুণ থেকে সাতশগুণ পর্যন্ত, এমনকি এর চেয়ে বেশি, আল্লাহ তাআলার যত ইচ্ছা বৃদ্ধি করে দিতে পারেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তবে রোজার পুরস্কার তার চেয়ে ব্যতিক্রম। কেননা, রোজা আমার সন্তুষ্টির উদ্দেশে রাখা হয় এবং আমি স্বয়ং তার পুরস্কার দেব। বান্দা আমার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে রিপুর কামনা এবং পানাহার পরিত্যাগ করে। রোজাদারের জন্য দু’টি আনন্দ রয়েছে। একটি আনন্দ হল রোজাদারের ইফতারের সময়, আর অপর আনন্দটি হল, তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময়। আর রোজাদারের মুখের ঘ্রাণ আল্লাহ তা‘আলার নিকট মেশকের ঘ্রাণের চেয়ে অধিক সুগন্ধিময়। [সহীহ বুখারী : হাদীস নং ৭৪৯২, সহীহ মুসলিম : হাদীস নং ২৭০৭; মুসনাদে আহমদ : হাদীস নং ৯১১২; সুনানে ইবনে মাজাহ : হাদীস নং ১৬৩৮]
হযরত উসমান রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, রোজা জাহান্নাম থেকে আত্মরক্ষার ঢালস্বরূপ, তোমাদের যে কোনো ব্যক্তির যুদ্ধের সময়কার ঢালের মতো। [মুসনাদে আহমদ : হাদীস নং ১৬২৭৩; সুনানে নাসায়ী : হাদীস নং ২২৩২; সুনানে ইবনে মাজাহ : হাদীস নং ১৬৩৯]
হযরত সাহল ইবনে সা‘দ রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, জান্নাতের একটি তোরণ থাকবে, যার নাম হবে ‘রায়্যান’। কেয়ামতের দিন রোজাদারদেরকে ডাকা হবে এই বলে যে, রোজাদাররা কোথায়? দুনিয়াতে যারা রোজাদার ছিল তারা তখন উপস্থিত হবে এবং রায়্যান নামক তোরণ দিয়ে প্রবেশ করবে। যারা এ তোরণ দিয়ে প্রবেশ করবে তারা কখনও তৃষ্ণার্ত হবে না। [সহীহ বুখারী : হাদীস নং ১৮৯৬; সহীহ মুসলিম : হাদীস নং ২৭১০; সুনানে ইবনে মাজাহ : হাদীস নং ১৬৪০]
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি ঈমানদার অবস্থায় সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্ববর্তী সকল (সগীরা) গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। [সহীহ বুখারী : হাদীস নং ৩৮; সহীহ মুসলিম : হাদীস নং ১৭৮১; সুনানে ইবনে মাজাহ : হাদীস নং ১৩২৬, ১৬৪১]
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যখন রমজানের প্রথম রাত শুরু হয় তখন শয়তানদেরকে এবং অবাধ্য জিনদেরকে শেকলবন্দী করা হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর মাসব্যাপী এসব দরজার কোনোটি খোলা হয় না। এ সময় জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। এরপর মাসব্যাপী এসব দরজার কোনোটি বন্ধ করা হয় না। আর একজন ঘোষক ঘোষণা করে, হে কল্যাণ প্রত্যাশী! তুমি অগ্রসর হও এবং হে অকল্যাণ প্রত্যাশী! তুমি থাম। আর আল্লাহ তা‘আলার বিশেষ অনুগ্রহে কিছু লোক জাহান্নাম থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত হবে। এরূপ ঘোষণা রমজানের প্রতি রাতেই হতে থাকে। [সুনানে তিরমিযী : হাদীস নং ৬৮২; মুসনাদে আহমদ : হাদীস নং ৭৭৮০; সহীহ বুখারী : হাদীস নং ১৮৯৯; সহীহ মুসলিম : হাদীস নং ২৪৯৬; সুনানে ইবনে মাজাহ : হাদীস নং ১৬৪২]
হযরত জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা‘আলা রমজান মাসে প্রতিদিন ইফতারের সময় কিছু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। এভাবে রমজান মাসের প্রতি রাতেই করে থাকেন। [সুনানে ইবনে মাজাহ : হাদীস নং ১৬৪৩]
হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত, একবার রমজান মাস শুরু হল, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এ মাস তোমাদের সামনে উপস্থিত। এ মাসে এমন একটি রাত আছে, যা এক হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল সে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল। হতভাগা ব্যতীত এ রাতের কল্যাণ থেকে কেউ বঞ্চিত হয় না। [সুনানে ইবনে মাজাহ : হাদীস নং ১৬৪৪; তাবারানী, আওসাত : হাদীস নং ১৪৪৪]

পূর্ববর্তী ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রোজার বিধান
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা যেখানে মুসলিম সমাজকে রোজার বিধান দান করেছেন, সেখানে একথাও বলেছেন যে, তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্যও রোজার বিধান অপরিহার্য করা হয়েছিল। এ থেকে দু’টি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, প্রথমত রোজার বিধানটি একটি ঐতিহ্যবাহী আসমানী বিধান, যা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে পূর্ববর্তী সকল ধর্মালম্বীদের জন্য ফরজ করা হয়েছিল। এর দ্বারা রোজার বিধানের গুরুত্ব ফুটে ওঠে। দ্বিতীয়ত এর দ্বারা মুসলিম উম্মাহকে সান্ত¦না দেওয়া হয়েছে যে, রোজা পালন করা যদিও একটি কষ্টকর আমল, তবে যেহেতু পূর্ববর্তী সকল উম্মতের উপরও এ বিধান আরোপিত ছিল এবং তারা কষ্ট করে তা পালন করেছে সুতরাং তোমাদের জন্যও তা অধিক কষ্টকর হবে না। কেননা, যে কষ্টকর কাজে সকলে শরীক থাকে তা সহনীয় হয়ে ওঠে।
এ প্রসঙ্গে কুরআন কারীমে যে বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে তার অর্থ হল, “যারা তোমাদের পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে।” এতে হযরত আদম আ. থেকে শুরু করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্ব পর্যন্ত সকল জাতি ও ধর্ম অন্তর্ভূক্ত। এ থেকে বোঝা যায় যে, নামাজের বিধান যেমন পূর্ববর্তী সকল আসমানী ধর্মে ছিল, তেমনি রোজাও সকল ধর্মে ফরজ করা হয়েছিল। যারা ‘পূর্ববর্তী উম্মত’ বলে খৃষ্টান সম্প্রদায়কে বুঝিয়েছেন তাদের উদ্দেশ্যে সম্ভবত উদাহরণ স্বরূপ পেশ করা। এর দ্বারা অন্য সকল উম্মতের উপর আরোপিত বিধানের অস্বীকার করা উদ্দেশ্য নয়।
এখানে উল্লেখ্য যে, পবিত্র কুরআনে কেবল এটুকু বলা হয়েছে যে, মুসলমানদের প্রতি যেভাবে রোজার বিধান ফরজ করা হয়েছে তেমনি পূর্ববর্তী উম্মতসমূহের জন্যও ফরজ করা হয়েছে। এর মানে এ নয় যে, পূর্ববর্তী উম্মতসমূহের রোজা আর মুসলমানদের রোজা সংখ্যা আর নিয়ম-পদ্ধতিতে হুবহু একই রকম। পূর্ববর্তী যুগে এক প্রকার রোজা ছিল, যাতে কথা বন্ধ রাখার নিয়ম ছিল। যেমন সূরা মারইয়ামে হযরত মারইয়াম আ. এর প্রতি এরূপ এক নির্দেশের কথা উল্লিখিত হয়েছে। বলা হয়েছে, “যদি তুমি কোনো” মানুষকে (আপত্তি করতে) দেখ, তখন তুমি বলবে যে, আমি দয়াময়ের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে রোজা রাখার মানত করেছি, সুতরাং আমি আজ কোনো মানুষের সাথে কথা বলব না। [সূরা মারইয়াম : আয়াত ২৬]
ইসলামে রোজার মধ্যে কথা বন্ধ রাখার এ বিধান রহিত করে দেওয়া হয়েছে। তবে এটা আপরিহার্য রাখা হয়েছে যে, অশ্লীল কথাবার্তা বলা, কাউকে গালমন্দ করা, মিথ্যা কথা বলা, গীবত করা নিষিদ্ধ। এসব কাজ সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ, তবে রোজা অবস্থায় আরও কঠিনভাবে নিষিদ্ধ। ইসলামী শরীয়তে কথা বন্ধ রাখার রোজা রাখা অথবা রোজার মধ্যে প্রয়োজনীয় বা নির্দোষ কথাবার্তা বন্ধ রাখার কোনো বিধান নেই এবং তা কাম্য বা সওয়াবের কাজও নয়। এরূপ মানত করাও বৈধ নয়। হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী উল্লেখ করেন যে, বয়ঃসন্ধীতে উপনীত হওয়ার পর পিতৃবিয়োগের পর কাউকে এতিম বলা হবে না এবং রাত অবধি সারা দিন নীরব থাকাও অনুমোদিত নয়। [সুনানে আবু দাউদ : হাদীস নং ২৮৭৩]
এমনিভাবে কোনো কোনো ধর্মে বিশেষ বিশেষ খাদ্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উপবাস ব্রত পালনের নিয়ম চালু আছে। তাতে তাদের ধর্মানুসারে কিছু কিছু খাদ্য গ্রহণ করা যায়, আর কিছু কিছু খাদ্য গ্রহণ করা যায় না। সুতরাং অন্যান্য ধর্মে রোজার বিধান থাকলেও তা যে মুসলমানদের রোজার মতো একই নিয়মে, একই মাসে একই সময়ে, একই সংখ্যার একই রকমে পালিত হবে বা হয়, তা নয়। ইসলামী শরীয়তে আরোপিত রোজা ইসলামের নির্দেশিত নিয়মেই পালন করতে হবে। তার ব্যতীক্রম করা যাবে না।
রোজার উদ্দেশ্য :
আল্লাহ তা‘আলা রোজার বিধান আরোপ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে, যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার’। উক্ত আয়াতের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, রোজার বিধান আরোপের উদ্দেশ্য হল তাকওয়ার গুণ অর্জন করা। রোজা পালনের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের পথ সহজ হয় এবং এর দ্বারা রিপুকে নিয়ন্ত্রণে রাখার যোগ্যতা সৃষ্টি হয়, মানুষের আত্মা শক্তিশালী হয়।
একটি কন্টকময় পথে চলতে গিয়ে যেমন মানুষ নিজের শরীর ও পোশাককে বাঁচিয়ে চলতে চেষ্টা করে, তেমনি এ দুনিয়ার মন্দ কর্মকা- ও তার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করে একজন মু’মিন বান্দাকে তার জীবন-সফরের পরিক্রমা সম্পন্ন করতে হয়। আর এ আত্মরক্ষার গুনাকেই ‘তাকওয়া’ বলা হয়। রমজান মাস এ তাকওয়া অর্জনের জন্য মাসব্যাপী সাংবাৎরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাস।
রোজা অবস্থায় যেসব কাজ বর্জনীয় : হারাম, গর্হিত :
নিন্দনীয় কাজ বা কথা সব সময় বর্জনীয়, তবে রোজা অবস্থায় এ সব বিষয়ের পরিত্যাগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য। হাদীস শরীফে আছে, রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমাদের কেউ যখন রোজা রাখে তখন সে যেন অশ্লীল কথা না বলে বা অশ্লীল কাজ না করে এবং চিল্লাচিল্লি ও হৈচৈ না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা কেউ তার সাথে ঝগড়া বা মারামারি করতে আসে তবে সে যেন বলে দেয় যে, আমি রোজাদার। অর এক বর্ণনায় এসেছে, যে যেন মূর্খসূলভ আচরণ না করে। [সহীহ বুখারী : হাদীস নং ১৮৯৪, ১৯০৪; সহীহ মুসলিম : হাদীস নং ১১৫১]
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত অপর এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি (রোজা অবস্থায়) মন্দ কথা ও মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে না তার আহার্য বা পানীয় বর্জন করার প্রতি আল্লাহ তা‘আলার কোনো আগ্রহ নেই। [সহীহ বুখারী : হাদীস নং ১৯০৩, ৬০৫৭; সুনানে আবু দাউদ : হাদীস নং ২৩৬২; সুনানে ইবনে মাজাহ : হাদীস নং ১৬৮৯/১৬৯০, সুনানে তিরমিযী : হাদীস নং ৭০৭; মুসনাদে আহমদ : হাদীস নং ৯৮৩৯, ১০৫৬২]
অসুস্থতার কারণে রোজা রাখতে অক্ষম হলে :
যদি কেউ এরূপ অসুস্থ হয় যে, সে রোজা পালন করতে অক্ষম অথবা রোজা পালন করলে তার অসুস্থতা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে তবে তার জন্য রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে। এরূপ ব্যক্তি রমজান মাস অতিবাহিত হওয়ার পর সুস্থ হলে অথবা রোজা রাখতে সক্ষম হলে, রমজান মাসের যে রোজাগুলো সে রাখতে পারেনি, সেগুলোর কাজা করবে।
সফরের কারণে রোজা রাখতে অক্ষম হলে :
যদি কেউ এতটুকু দূরত্বে গমনের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়, যতটুকু দূরে গেলে সফরে নামাজের কসর করা জায়েয হয় এবং সফর অবস্থায় রোজা রাখা কষ্টকর হয় তবে তার জন্য সফর অবস্থায় রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে। এরূপ ব্যক্তি যখন সফর সমাপ্ত করে বাড়ি ফিরে আসবে অথবা কোথাও কমপক্ষে পনেরো দিন বা তার চেয়ে বেশি সময় অবস্থান করার নিয়ত করে তখন সে সফরের সময় যে রোজাগুলো রাখতে পারেনি, সেগুলোর কাজা আদায় করবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে কেউ (রোজা রাখতে না পারার মতো) অসুস্থ হয় অথবা (শরীয়ত অনুমোদিত দূরত্বের) সফরে থাকে তবে সে রমজান পরবর্তী অন্যসময় রমজানের না রাখা রোজাগুলো পূরণ করবে। [সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৪]
কেউ যদি পূর্ববর্ণিত অসুস্থতার কারণে রমজান মাসের রোজা রাখতে অক্ষম হয় এবং অসুস্থতায় তার মৃত্যু হয়ে যায় অথবা সুস্থ হওয়ার পর রোজার কাজা আদায় করার মতো সময় পায়নি, এমনিভাবে যে ব্যক্তি সফর অবস্থায় রোজা পালন করতে পারেনি এবং সফর অবস্থায় তার মৃত্যু হয়ে যায় অথবা সফর থেকে বাড়িতে ফিরে আসার পর রোজার কাজা করার মতো সময় না পায়, তার আগেই তার মৃত্যু হয়ে যায় তবে তার জন্য কাজা বা ফিদ্ইয়া আদায়ের জন্য অসিয়ত করে যাওয়া আবশ্যক নয়।
আর যে ব্যক্তি রোজা রাখতে সক্ষম নয়, অর্থাৎ, অসুস্থতার কারণে রোজা পালনে সমর্থ নয় এবং সুস্থ হয়ে কাজা আদায় করার মতো সম্ভাবনাও না থাকে তবে তার উপর রোজার ফিদ্ইয়া আদায় করা ওয়াজিব। আর যদি ফিদ্ইয়া দিতেও অসমর্থ হয় তবে এ অক্ষমতার জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা ব্যতীত তার জন্য আর কোনো পথ খোলা নেই। প্রকৃতপক্ষে তার অক্ষমতা ও ক্ষমাপ্রার্থনা আল্লাহ তা‘আলার নিকট গ্রহণযোগ্য হলে পরকালের আজাব থেকে সে মুক্তি পেয়েও যেতে পারে। এটা কেবল আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল। তবে অন্তরে নিয়ত রাখবে যে, কখনও সামর্থ্য হলে ফিদ্ইয়া আদায় করে দেবে।
রোজার ফিদ্ইয়ার পরিমাণ :
একটি রোজার ফিদ্ইয়া হল আধা সা‘গম/আটা বা তার সমমূল্য। আধা সা‘ বর্তমানকালের মেট্রিক পদ্ধতির পরিমাপের হিসাবে ১.৬৩৬ গ্রামের সমান, যা পূর্বের আশি তোলার সেরের হিসাব অনুযায়ী প্রায় পোনে দু’ সেরের মতো। সুতরাং প্রতিটি রোজার জন্য এ পরিমাণ গম/আটা বা এর খোলা বাজার অনুসারে সমমূল্যের অর্থ কোনো গরিব-মিসকিনকে প্রদান করতে হবে। তবে কোন মসজিদ-মাদরাসার খেদমতের বিনিময়ে অথবা অন্য কোনো কাজের বিনিময়ে ফিদ্ইয়া দেওয়া যাবে না। কাজের পারিশ্রমিক বা খেদমতের হাদিয়া আলাদা প্রদান করতে হবে। রোজার ফিদ্ইয়াসহ সকল প্রকার ফরজ ও ওয়াজিব সদকা কোনো প্রকার বিনিময় ব্যতীত কেবল আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে প্রদান করতে হবে।
লেখক : সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামেয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ, ঢাকা। গ্রন্থ প্রণেতা, অনুবাদক ও গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight