যে সমস্ত আমল জান্নাত ও জাহান্নামে নিয়ে যাবে : সংকলনে : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

Islamic_Books

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সা. বলেন, সবচেয়ে বেশি যে বস্তু মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে তা দুটি ফাকা জায়গা আর তা হলো ১. লজ্জা স্থান ২. মুখ, অপরদিকে যে দুটি বস্তু অধিকপরিমাণে মানুষকে জান্নাতে নিয়ে যাবে সেগুলো হলো- ১. আল্লাহভীতি ২. সচ্চরিত্র। [ইবনে কাসীর]
জান্নাতিদের অভ্যাস
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও যমীন যা  তৈরি করা হয়েছে পরহেযগারদের জন্য। যারা স্বচ্ছলতা ও অভাবের সময় ব্যায় করে, যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে, আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে। বস্তুত আল্লাহ  সৎকর্মশীলদেরই ভালোসাসেন। তারা কখনও কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবেন? তারা নিজের কৃতকর্মের জন্য হঠকারিতা প্রদর্শন করে এবং জেনে শুনে যা ইচ্ছে করতে থাকে না। তাদের জন্য প্রতিদান হলো তাদের পালনকর্তার ক্ষমা ও জান্নাত যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নহর, যেখানে তারা থাকবে অনন্ত কাল, যারা ভাল কাজ করে তাদের জন্য কতইনা চমৎকার প্রতিদান। [ইমরান ১৩৩-১৩৬]জান্নাত দুনিয়ার যাবতীয় দুঃখ কষ্ট ভুুলিয়ে দিবে
হযরত আনাস বিন আব্দুল মালিক রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সা. এরশাদ করেন, কিয়মতের দিন দুনিয়ার যে সমস্ত মুসলমান বেশী কষ্ট করেছে তাদের জন্য আদেশ হবে যে, তাকে জান্নাতের মাঠে একবার ঘুরিয়ে নিয়ে এসো। সুতরাং তাকে জান্নাতে একবার ঘুরিয়ে নিয়ে আসা হবে। তারপর তাকে জিজ্ঞেস করা হবে তুমি কি কখনো দুঃখ কষ্ট পেয়েছিলে? সে জান্নাতে এ সব দেখে বলবে না কখনোই পাই নাই।
জান্নাতের নোয়ামতের তুলনায় জাগতিক দুঃখ কষ্ট অতি তুচ্ছ
হযরত মুসা আ. বা অন্য কোন নবী আল্লাহ পাকের নিকট আরজ করলেন, হে আল্লাহ এ কেমন ব্যাপার যে, আপনার প্রিয় বান্দারা দুনিয়াতে প্রাণের ভয়ে দিন কাটায়, তারা নিহত হয়, তাদেরকে শুলে চড়ানো হয়, তাদের হাত পা কর্তন করা হয়, পানাহারের জন্য তারা কিছ্ ুপায়না। এভাবে তাদের উপর নানা বিপদ আপদের পাহাড় ভাঙ্গতে থাকে। পক্ষান্তরে আপনার দুশমনেরা যমীনে না  নিহত হয়, না শুলে চড়ে আর না তাদের কারো হস্তপদ কর্তন করা হয। তারা যা চায় তাই খেতে পারে, পান করতে পারে, এভাবে হাজারো নেয়ামত তারা পেয়ে যাচ্ছে। জবাবে আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার এ সমস্ত বান্দাকে জান্নাতের দিকে নিয়ে চল তাহলে তারা এমন সব নেয়ামত দেখতে পাবে যা তারা কখনো দেখেনি। সম্মুখে দেখতে পাবে লাল ইয়াকুতের স্নানাগার, দেখবে তারা গালিচা বিছানো আর স্থানে স্থানে বিছানো মখমলের তোষক, দেখবে আনত নয়না ডাগর চক্ষু বিশষ্ট হুর। দেখবে ফুল এবং এমন খাদেম যেন গোলাপের ভিতর মোতির দানা। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেন এখন আমার বান্দাদেরকে বাইরে থেকে জাহান্নাম ভ্রমণ করানোর জন্য নিয়ে চল। তারপর যখন তাদেরকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে তখন তাদের সম্মুখে দোযখ থেকে একটি শিখা বের হবে। তা দেখে তারা বেহুশ হয়ে যাবে। জ্ঞান ফিরলে আল্লাহ পাক বলবেন, দুনিয়াতে আমি যা আমার শত্র“দিগকে দিয়েছি তা তাদের কিছুই কাজে আসবেনা যখন তাদের মঞ্জিল হবে এই গুলো অর্থাৎ জাহান্নাম। তখন সে বান্দা আরজ করবে দুনিয়ার নেয়ামত এ সমস্ত কাফেরদের কোন কাজে আসবেনা।
জান্নাতের নাজ নেয়ামতের আলোচনা
জান্নাতের মাটি হবে কস্তরী ও জাফরানের, জান্নাতের ছাদ হবে আল্লাহর আরশ, জান্নাতের প্রলেব সুগন্ধিময় কস্তরীর, জান্নাতের আস্তর হবে মোতি ও হিরার, দালানের একটি ইট হবে রৌপ্যের  ও একটি স্বর্ণের, প্রতিটি বৃক্ষের কাণ্ড হবে সোনা রুপার। ফল হবে বড় বড় মটকার ন্যায়, ফেনার চেয়ে নরম মধুর চেয়ে মিষ্টি, বৃক্ষপত্রও অতি হালকা ও মনোরম পোশাকের চেয়েও অধিক সৌন্দর্য। নহরের মধ্যে কিছু নহর হবে দুধের। এর স্বাদ চিরস্থায়ী। কিছু নহর হবে শরাবের যা পানকারীর জন্য খুব সুস্বাদু হবে। আর কিছু নহর হবে পরিচ্ছন্ন মধুর। জান্নাতের খাদ্য হবে ফল ফলাদি যা ইচ্ছা তাই পাবে, গোশত হবে উড়ন্ত পাখি। মনে যা চায় তাই হবে। পানীয় বস্তু হবে ফোয়ারার পানি, আদ্রক ও কর্পুর। বরতন আর খাবারবাসন হবে রৌপ্যের বস্তু দিয়ে তৈরি স্বচ্চ হবে যা কাচের ন্যায় স্বচ্ছ। জান্নাতের উভয় দরজার মাঝখানের ব্যবধান হবে চল্লিশ বছরের ব্যবধান, এতে এমন একদিন আসবে যে, রেশমী কাপড়ের কারণে ভীড় লেগে যাবে। জান্নাতের উভয় দরজার মাঝখানের ব্যবধান হবে চল্লিশ বছরের ব্যবধান। জান্নাতের বৃক্ষরাজির বাতাসের আওয়াজ শ্রবণকারীকে মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলবে। এই বৃক্ষের ছায়ার পরিধি এত বিস্তৃত হবে যে, একটি তীব্র গতি সম্পন্ন ঘোর সওয়ার এর ছায়ায় একশত বছর পর্যন্ত দৌড়ালেও তা অতিক্রম করতে পারবে না। একজন নিম্ন শ্রেণীর জান্নাতি এমন একটি জান্নাত পাবে যা একটি রাষ্ট্রের দালান কোঠায় বাগবাগিচায় দু’ হাজার বছর পর্যন্ত ভ্রমণ করতে পারবে। জান্নতের একটি বালাখানা অপর একটি বালাখানার উপর এমনভাবে তৈরি যে, এগুলোর নিম্নদেশ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত হবে। জান্নাতের বালাখানাগুলো এমন উচ্চতা সম্পন্ন হবে যে, তারকাসমূহ উদয় অস্ত যেতে দেখা যাবে যা স্বাভাবিকভাবে দেখা অসম্ভব। বেহেশতী লোকের পোষাক হবে রেশমী ও স্বর্ণের জান্নাতি লোকের বিছানার চাদর হবে মোটা রেশমী কাপড়ের যা অত্যন্ত অভিজাতভাবে বিছানো। জান্নাতিদের মশারীর কাপড় সম্পর্কে জিজ্ঞাস করা হলে এক জবাব হবে যে, তা এমন এক খাট হবে যার উপর স্বর্ণ নির্মিত চাদি শাহী মশাড়ীর ছাদ নির্মিত। এর মধ্যে নেই কোন ফাটল বা ছিদ্র। জান্নাতি লোকের বয়স হবে হযরত আদম আ. এর আকৃতিতে তেত্রিশ বছরের। জান্নাতি লোকের চেহারা হবে চন্দ্রের ন্যায়। তাদের বিবিরা হবে সুকন্ঠিতা সুরেলা। তাদের চেয়েও অধিক বেশী সৌন্দর্য আওয়াজ ফেরেশতা এবং নবীগণের তারা আল্লাহ পাকের গুণগান করবেন। জান্নাতিরা যে সমস্ত সওয়ারীতে আরোহণ করে একে অপরের সাথে দেখা করবে তাদের এই বাহনগুলি হবে অত্যন্ত জাক জমক পূর্ণ এবং শ্রেষ্ঠতর বাহন। এ সমস্ত বাহনগুলোকে আল্লাহ তাআলা নিজের ইচ্ছামত করে উপকরণাদি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। জান্নাতিরা এ সমস্ত বাহনের উপর আরোহণ করে যেখানে খুশি সেখানেই ভ্রমণ করবে। জান্নাতি লোকের অলংকারাদী এবং পোষাকাদী হবে নিখাদ স্বর্ণের এবং উন্নত মানের মোতির। তাদের মাথায় থাকবে শাহী তাজ। জান্নাতি লোকের পাচকরা হবে অতিশয় সুন্দর যেন কোন সংরক্ষিত মোতি। জান্নাতি বর কনে হবে তরুণ তরুণী, তারা হবে সমবয়সী। তাদের শরীরে আবহ সংগীতের ধারা ঘূর্ণায়মান। তাদের গণ্ডদেশ হবে গোলাপ ও ছেবের ন্যায়, মুক্তার ন্যায় সুগ্রথিত দাঁতগুলো সুবিন্যস্ত ভাবে সাজানো। কমর হবে নরম তুলতুলে। তাদের চেহারার ঝলক দেখলে সূর্য তখন তাদের সুদর্শন চেহারার লাবণ্যে আন্দোলিত হতে থাকবে। মুচকি হাসলে তাদের দন্তরাজি থেকে আলোক রশ্মি ঠিকরে পড়বে। জান্নাতি পুরুষ জান্নাতি মহিলাকে আঙ্গিনায় দেখবে, সে মহিলাকে এমন দেখা যাবে যেমন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আয়নাতে কোন বস্তু দেখা যায়। গোশতের অভ্যন্তরে হাড়, হাড়ের অভ্যন্তরের মজ্জা পর্যন্ত দেখা যাবে। জান্নাতি কোন রমনী যদি যমীনের উপর একবার সাগ্রহে দৃষ্টি ফেলে তাহলে আসমান ও যমীন সুঘ্রাণে সুরভিত হয়ে যাবে এবং সমস্ত মাখলুকাতের যবানকে তাকবীর ও তাছবীহ পড়তে স্বভাবিকভাবেই বাধ্য করে ফেলবে। আর এজন্য জগতের উভয় প্রান্ত সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে যাবে। আর সেখানে সূর্য রশ্মিকে এমনিভাবে নি®প্রভ করে দেবে যেমনিভাবে সূর্য তারকার রশ্মিকে ম্লান করে দেয়। আর ভূ-পৃষ্ঠে বসবাসকারী সবকিছুই চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। তাদের মাথার ওড়না দুনিয়া এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে সব বস্তু থেকে অধিক মূল্যাবান হবে। যুগ যুগান্তর ধরে তাদের রুপ বর্ধিত হতেই থাকবে। অনন্ত গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব, এবং হায়েজ নেফাজ থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র হবে। সর্দি কাশি প্রস্রাব পায়খানা এবং অন্যান্য দূর্গন্ধময় বিষয় থেকে পবিত্র হবে। কোন দিন তাদের যৌবন বিনষ্ট হবেনা। তাদের পোষাক পরিচ্ছদ পুরাতন হবেনা। তাদের সৌন্দর্যের লাবণ্য অক্ষুণœ থাকবে। তাদের দৃষ্টি কেবল নিজ নিজ স্বমীদের প্রতিই নিবদ্ধ থাকবে। অন্যের প্রতি লালসা জাগবেনা। এ রকম ভাবে জান্নাতি পুরুষরাও নিজ নিজ হুরদের প্রতি নিবদ্ধ থাববে। তাদের প্রতি আশাতীত খাহেশ থাকবে। স্বামীর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেই খাহেশ বৃদ্ধি পাবে। আদেশ দেওয়া মাত্রই পালন করবে। তার কাছে থেকে দূরে গেলেও তাকে হেফাজত করবে। স্বামী হুরের সঙ্গে সঙ্গে থাকবে। হুরেরা এমন হবে যে, কোন মানব দানব তাদের স্পর্শ করেনি। যত হুরই দেখবে তাদের পানি গ্রহণের জন্য মন আনচান করবে। হুরেরা জান্নাতি পুরুষের কথা বললে বিক্ষিপ্ত মোতির মালা দ্বারা সাজিয়ে দেয়া হবে। আর তাদের রুপের ঝলকে মহলগুলো চমকাতে থাববে। তারা হবে সমবয়সী। হুরদের চোখের গড়ন হবে সাদা, পুতলির মধ্যে কাল মনি দর্শনীয় মোহনীয়। তাদের শরীরের গঠন হবে মনোরম পিলারের ন্যায়। মুখাবয়বের রং হবে গৌর বর্ণের। যেন সমস্ত রুপ সৌন্দর্য একত্র করা হয়েছে। তাদের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ রুপ যেন পরিপাটি করা হয়েছে। তাদের রুপ দর্শনে মনের আনন্দে নয়ন মীতল হয়ে যাবে। আমোদ প্রমোদ এবং যৌনভোগের মনোরঙ্গিনী প্রেমিকা তারা, তারা প্রিয়সী স্বামীর জন্য আত্মোৎসর্গ কারিনী। স্বামীর হক সুবিন্যস্তভাবে সম্পাদনকারিনী। মনের চাহিদা যথাযথ পূর্ণ কারিনী। তারা একমহল থেকে অন্য আরেকটি মহলে পরিবর্তিত হলে বলবে যে, এ তো রুপের সূর্য যেন স্বীয় আকাশের একরাশি চক্রে পরিবর্তিত হয়েছে। এদের সঙ্গে প্রেমালাপ করলে রুপের ছটায় নিজেকে উৎসর্গিত মনে হবে। এদের বুকের সাথে বুক মিলালে স্বাদ ও প্রেমরসে মন প্রশান্তিতে নাচতে থাববে। তারা যখন মনোহরীনি  সুরেলা আওয়াজে গান ধরবে তখন চোখ কান স্নিগ্ধ আবেশে মাতোয়ারা হয়ে যাবে। তারা চুম্বন করলে তরঙ্গ বইবে শিহরণের। এর চেয়ে পছন্দসই আর কোন বিছুই হবেনা। তাদের সাথে সহবাস করলে এমন উপভোগ্য বিষয় আর কোনটি হবে না। আর তাদের চেহারা দর্শন সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হবে তার কোন গুণ বৈশিষ্ট্য সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। শুধু আলোচনা করেই তৃপ্তির ঢেকুর গিলে শান্ত থাকতে হবে। সমাপ্ত

4 মন্তব্য রয়েছেঃ যে সমস্ত আমল জান্নাত ও জাহান্নামে নিয়ে যাবে : সংকলনে : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

  1. খাইরুল কবীর says:

    গঠণমূলক আলোচনা। জান্নাতে যাওয়ার শওক বেড়ে গেল। সৈয়দা সুফিয়া আপুর লেখা আমার অনেক ভাল লাগে। উনার জন্য দোয়া রইল। আমার জন্যও দোয়া কামনা করছি।

  2. Sathi Dhaka University says:

    Valo Lekha, sobar jonno proyojon, amon lekha dewar jonno apo ke Donnobad

  3. Monira says:

    অনেক সুন্দর লেখা। এরকম লেখা নিয়মিত চালিয়ে যাওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানাই।

  4. মজিবুর রহমান says:

    হে আল্লাহ জীবনে যত গুনাহ করেছি সবগুনাহ থেকে তাওবা করছি। আমাকে তুমি মাফ করে দাও। আমাকে জাহান্নাম থেকে বাচিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাও। এই লেখা আমার জীবনের মোর ঘুরিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ আমি আমার অপরাধের জন্য লজ্জিত। যার লেখা পড়ে আমার হুশ এসেছে তাকে তুমি জান্নাতের উচু মাকাম দান করিও। আর দুনিয়াতে সুখে শান্নিতে রাখিও। আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight