যে সকল সময়ে নামায পড়া নিষিদ্ধ : হাসান মুহাম্মাদ শরীফ

Sirat 02

নামায ইসলামের অন্যতম একটি মৌলিক স্তম্ভ। আল্লাহর নৈকট্য লাভের অনেক বড় একটি মাধ্যম। পবিত্র কুরআনে প্রায় বিরাশি জায়গায় নামাযের কথা বলা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন, নামাযে দাঁড়ালে আমার দেহ মন জুড়িয়ে যায়, আমার চোখ শীতলতা পায়।
দিন রাতে সব মিলিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া  ফরয। এছাড়া আরো কিছু ফযীলতপূর্ণ নফল নামাযের  কথা হাদীসে উল্লেখ আছে। দিন বা রাতের বিভিন্ন মুহূর্তে তা আদায় করা হয়ে থাকে। এর বাইরে একজন মুসলিম যত খুশি ব্যক্তিগত নফল নামায আদায় করতে পারে। যার কোনো সীমারেখা নির্ধারিত নেই। প্রতি ২৪ ঘণ্টায় কিছু সময় এমন আছে যখন নামায পড়া একদম হারাম। আর কিছু সময় এমন আছে যাতে নির্ধারিত কিছু নামায পড়া মাকরুহ। নিচে এ সময়গুলো নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।
এক হাদীসে পাওয়া যায় তিন সময়ে নামায পড়া নিষেধ। সাহাবী উকবা বিন আমের জুহানী রা. বলেন, তিনটি সময়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে নামায পড়তে এবং মৃতের দাফন করতে নিষেধ করতেন। সূর্য উদয়ের সময়; যতক্ষণ না তা পুরোপুরি উঁচু হয়ে যায়। সূর্য মধ্যাকাশে অবস্থানের সময় থেকে নিয়ে তা পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়া পর্যন্ত। যখন সূর্য অস্ত যায়। [সুবুলুস সালাম ১/১১১, সহীহ মুসলিম ১/৫৬৮]
এই হাদীসের ভাষ্যানুযায়ী নামাযের নিষিদ্ধ সময় তিনটি।
১.    সূর্য যখন উদিত হতে থাকে এবং যতক্ষণ না তার হলুদ রঙ ভালোভাবে চলে যায় ও আলো ভালোভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এরজন্য আনুমানিক ১৫-২০ মিনিট সময় প্রয়োজন হয়।
২.    ঠিক দ্বিপ্রহরের সময়; যতক্ষণ না তা পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়ে।
৩.    সূর্য হলুদবর্ণ ধারণ করার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত।
উল্লিখিত তিন সময়ে সব ধরণের নামায পড়া নিষেধ। চাই তা ফরয হোক কিংবা নফল। ওয়াজিব হোক বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এ সময়ে শুকরিয়ার সিজদা এবং অন্য সময়ে পাঠকৃত তিলাওয়াতের সিজদাও নিষিদ্ধ। তবে এই সময়ে জানাযা উপস্থিত হলে বিলম্ব না করে তা পড়ে নেয়া যাবে। ঠিক তদ্রুপ কেউ যদি ওই দিনের আসরের নামায সঠিক সময়ে পড়তে না পারে তাহলে সূর্যাস্তের আগে হলেও তা পড়ে নিতেহবে। কাযা করা যাবে না। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি সূর্যাস্তের পূর্বে আসরের এক রাকাত পড়তে পারল সে পুরো আসরের নামাযই পেল। [নায়লুল আওতার ২/২১]
অন্য হাদীসে আরো দুটি সময়ে নামায পড়ার নিষেধাজ্ঞা এসেছে। সাহাবী আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, ফজরের নামাযের পর থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত কোনো নামায নেই। আসরের নামাযের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোনো নামায নেই। [সহীহ মুসলিম হাদীস নং ৮২৭]
এই দুই সময়ে কোনো ধরণের নফল নামায পড়া জায়েয নেই। তবে আসরের নামাযের পর সূর্য লালবর্ণ ধারণের আগ পর্যন্ত কাযা নামায পড়া যাবে। এরপর আর কাযাও পড়া যাবে না। অবশ্য এই দুই সময়ে জানাযা নামায পড়া যাবে।
এছাড়া আরো কিছু সময় আছে যখন নফল নামায পড়া মাকরুহ।
১. ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর থেকে ফরয নামাযের আগ পর্যন্ত ফজরের দুই রাকাত নামায ছাড়া অন্য কোনো নফল নামায পড়া মাকরুহ। হযরত হাফসা রা. বলেন, ফজরের ওয়াক্ত শুরু হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংক্ষিপ্ত দুই রাকাত নামায ছাড়া আর কোনো নামায পড়তেন না। সহীহ ইবনে হিব্বানে এই হাদীসের ভাষ্য হল, ফজরের ওয়াক্ত শুরু হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরযের আগে ফজরের দুই রাকাত সুন্নত ছাড়া আর কোনো নামায পড়তেন না। [আবু দাউদ ২/৫৮, সহীহ মুসলিম ১/৫০০, নাসবুর রায়াহ ১/২৫৫] তবে এ সময়ে কাযা নামায পড়া যাবে।
২. মাগরিবের নামাযের পূর্বে। ফিকহে হানাফী এবং ফিকহে মালেকীর মতে মাগরিবের ওয়াক্ত হওয়ার পর ফরয নামাযের আগে কোনো নফল নামায পড়া জায়েয নেই। উকবা বিন আমের রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, নিরন্তর আমার উম্মত কল্যাণ বা ফিতরাতের ওপর থাকবে, যতদিন তাঁরা নক্ষত্ররাজি পুরোপুরি বের হয়ে আসা পর্যন্ত মাগরিব নামাযকে বিলম্ব না করবে। [নায়লুল আওতার ২/৩]
অবশ্য ফিকহে শাফেয়ী মতে এই সময়ে দুই রাকাত নামায পড়া সুন্নতে গাইয়ে মুয়াক্কাদা। আর ফিকহে হাম্বলী মতে এই সময়ে দুই রাকাত নামায পড়া জায়েয আছে বটে তবে তা সুন্নত নয়। হযরত আনাস রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে সূর্যাস্তের পর মাগরিবের নামাযের আগে আমরা দুই রাকাত নামায পড়তাম। তিনি আরো বলেন, আমরা মদীনায় থাকতাম। মুয়াজ্জিন মাগরিবের নামাযের আজান দিলে সাহাবীরা সকলেই মসজিদের বিভিন্ন খুঁটির দিকে ছুটে যেতেন এবং দুই রাকাত করে নামায পড়তেন। এতো অধিক সংখ্যক লোক এই দুই রাকাত নামায পড়তো যে, অপরিচিত কোনো লোক মসজিদে এলে সে মনে করতো মাগরিবের নামায বুঝি পড়া হয়ে গেছে। [সহীহ মুসলিম ১/৫৭৩] অন্য হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনে মুগাফ্ফাল রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘মাগরিবের পূর্বে তোমরা দুই রাকাত নামায পড়। এরপর আবারো বলেন, মাগরিবের পূর্বে তোমরা দুই রাকাত নামায পড়। তৃতীয়বারে তিনি বলেন, যার এটা পড়তে মন চায়।’ কারণ মানুষ এটাকে সুন্নত হিসেবে গ্রহণ করুক; তা তিনি পছন্দ করতেন না।
৩. ইমাম যখন খুতবা দেয়ার জন্য নিজের জায়গা থেকে উঠেন। এ সময় কোনো নফল নামায পড়া জায়েয নেই। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, জুমার দিন ইমাম সাহেব খুতবা দেয়ার সময় যদি তুমি তোমার পাশের লোককে বল ‘চুপ কর’ তাহলেও তুমি অনর্থক কাজ করলে। [সুবুলুস সালাম ২/৫০]
ফিকহে শাফেয়ী ও হাম্বলী মতে যদি ইমামের সাথে তাকবীরে উলা ছুটে যাওয়ার সম্ভাবনা না থাকে তাহলে এই সময়ে দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়ার অবকাশ আছে। তবে শুধু নামাযের ওয়াজিবগুলো আদায়ের মাধ্যমে তা সংক্ষিপ্ত সময়ে শেষ করতে হবে। মুসল্লী যদি কাবলাল জুমার সুন্নত না পড়ে থাকে তাহলে তাহিয়্যাতুল মসজিদের সাথে তারও নিয়ত করে নিবে। বুখারী ও মুসলিম শরীফের হাদীসে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে দুই রাকাত নামায পড়ার আগে যেন সে না বসে।
হযরত জাবের রা. থেকে বর্ণিত, সাহাবী সুলাইক আল গাতফানী মসজিদে নববীতে এলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন খুতবা দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, সুলাইক! দাঁড়াও এবং দুই রাকাত নামায পড়। তবে নামাযটা একটু সংক্ষিপ্ত করো।
৪. ঈদের নামাযের আগে ও পরে ঘরে ও ঈদগাহে এবং নামাযের পরে শুধু ঈদগাহে নফল নামায পড়া মাকরুহ। হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  ঈদের দিন দুই রাকাত নামায পড়েছেন। তার আগে ও পরে কোনো নামায পড়েন নি। [সুবুলুস সালাম ২/৬৬] হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদের নামাযের আগে কোনো নামায পড়তেন না। নামায শেষে ঘরে ফিরে এলে দুই রাকাত নফল পড়তেন। [সুবুলুস সালাম ২/৬৭]
৫. ফরয নামাযের ইকামত দেয়ার সময়। ফিকহে হানাফী মতে এ সময় সব ধরণের নফল নামায পড়া মাকরুহ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ফরয নামাযের ইকামত দেয়া হলে আর কোনো নামায পড়ার সুযোগ নেই। তবে ফজরের সুন্নতের ক্ষেত্রে এর একটু ব্যতিক্রম আছে। কারো যদি তাশাহহুদে শরীক হওয়ার মাধ্যমেও জামাত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে জামাত শুরু হলেও ফজরের দুই রাকাত সুন্নত নামায পড়া যাবে। কারণ এ নামাযের গুরুত্ব অত্যধিক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সারাটা জীবন অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে এ নামায আদায় করেছেন। তিনি বলেন, ফজরের দুই রাকাত সুন্নত নামায দুনিয়া ও তার মধ্যকার সবকিছুর চেয়ে উত্তম। [সহীহ মুসলিম]
সাহাবায়ে কেরামও গুরুত্বের সাথে এ নামায আদায় করতেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবু মূসা রা. বলেন, আমাদের মসজিদে একবার আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. তাশরীফ আনলেন। তখন ইমাম ফজরের নামায পড়ছিলেন। তিনি একটি খুঁটির কাছে ফজরের সুন্নত আদায় করলেন। কারণ তিনি আগে সুন্নত পড়তে পারেননি। [মাযমাউয যাওয়ায়েদ২/২২৪]
আবু উসমান আনসারী রা. বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. যখন মসজিদে পৌঁছলেন তখন ইমাম ফজরের নামাযে ছিলেন। ইবনে আব্বাস রা. আগে সুন্নত পড়তে পারেননি; তাই প্রথমে তিনি দুই রাকাত সুন্নত পড়লেন এরপর জামাতে শরীক হলেন। [ত্বহাবী ১/২৫৬]
আর যদি সুন্নত পড়তে গেলে জামাত না পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে সুন্নত না পড়েই জামাতে শরীক হতে হবে। অবশ্য ফিকহে হাম্বলীর মতে ফজরের নামাযের আগে ফজরের দুই রাকাত সুন্নত পড়তে না পারলে ফরযের পরেও তা আদায় করা যাবে। কায়স বিন ফাহ্দ রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুজরা থেকে বের হলে নামাযের ইকামত দেয়া হলো। আমি তাঁর সাথে ফজরের নামায আদায় করলাম। এরপর তিনি আমাকে পুনরায় নামায পড়া অবস্থায় দেখতে পেয়ে বললেন, কায়স! কী হলো তোমার? তুমি কি একসাথে দুই নামায পড়ছো? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আগে ফজরের দুই রাকাত সুন্নত পড়তে পারিনি। তখন তিনি বললেন, আচ্ছা! তাহলে ঠিক আছে। [আল মুস্তাদরাক ১/২৭৪;২৭৫] ইমাম তিরমিযী রহ. যদিও হাদীসটিকে মুরসাল বলেছেন কিন্তু পাশাপাশি এর সহীহতর সনদ আছে বলেও উল্লেখ করেছেন। [জামে তিরমিযী ১/৯৬]
৬. যদি ফরয নামাযের সময় খুবই অল্প থাকে, যখন সুন্নত পড়তে গেলে যথাসময়ে আর ফরয পড়া যাবে না তখনও ফরয ছাড়া ভিন্ন কোনো সুন্নত নফল পড়া মাকরুহ।
৭. আরাফার দিন যোহর ও আসরের মাঝে ও আসরের পরে এবং মুযদালিফায় মাগরিব ও এশার মাঝে ও এশার পরে নফল নামায পড়া মাকরুহ।
তাছাড়া পেশাব পায়খানার প্রচ- চাপ ও বায়ু নিঃসরণের প্রবল প্রয়োজন নিয়ে নামায পড়া ঠিক নয়। তদ্রুপ কারো প্রচ- ক্ষুধা লেগেছে, খাবারও সামনে উপস্থিত আছে, যদি মনে হয় খাবার না খেলে নামাযে মন বসবে না; তাহলে এক্ষেত্রেও খাবার না খেয়ে নামায পড়া ঠিক নয়। বরং এসব প্রয়োজন সেরে নিবিষ্ট মনে নামায আদায় করা উচিত। আর সব নামাযই ওয়াক্তের শুরুতে আদায় করা উত্তম।

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ যে সকল সময়ে নামায পড়া নিষিদ্ধ : হাসান মুহাম্মাদ শরীফ

  1. Rabiul Karim says:

    Thank very much. it is really good idea. it is important to all

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight