যে শিক্ষায় দুনিয়া আখেরাতের সফলতা বিদ্ধমান : মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম

আমাদের অজানা নয় যে, এ বিশ্বের গোটা রক্ষা ব্যবস্থা মানুষের পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। যদি একজন অন্য জনকে সাহায্য না করে, তবে একাকী মানুষ হিসেবে সে যতই বুদ্ধিমান, শক্তিশালী ও বিত্তশালী হোক, জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় আসবাব-পত্র কিছুতেই সংগ্রহ করতে পারবে না। একাকী মানুষ স্বীয় খাদ্যের জন্য শস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে আহার্য করা পর্যন্ত সব স্তর অতিক্রম করতে পারে না। এমনিভাবে পোশাক-পরিচ্ছদের জন্য তুলা চাষ থেকে শুরু করে দেহের মানানসই পোশাক তৈরি করা পর্যন্ত অসংখ্য সমস্যার সমাধান করতে একাকী কোন মানুষ কিছুতেই সক্ষম নয়। আল্লাহ তা’আলা স্বীয় অসীম জ্ঞান ও পরিপূর্ণ ক্ষমতায় বিশ্ব চরাচরের জন্যে এমন অটুট ব্যবস্থাপনা রচনা করেছেন, যাতে প্রত্যেকটি মানুষই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্য হাজারো লাখো মানুষের মুখাপেক্ষী। দরিদ্র ব্যক্তি পয়সার জন্যে যেমন ধনীর মুখাপেক্ষী, তেমনি শ্রেষ্ঠতম ধনী ব্যক্তিও পরিশ্রম ও মেহনতের জন্যে দিনমজুরের মুখাপেক্ষী। তদ্রুপ ব্যবসায়ী গ্রাহকের মুখাপেক্ষী আর গ্রাহক ব্যবসায়ীর মুখাপেক্ষী। গৃহনির্মাতা রাজমিস্ত্রী ও কর্মকারের মুখাপেক্ষী, আর এরা গৃহনির্মাতার মুখাপেক্ষী। চিন্তা করলে দেখা যায়, এ সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা শুধু পার্থিব জীবনের জন্যে নয় বরং মৃত্যু থেকে নিয়ে কবরে সমাহিত হওয়া পর্যন্ত সকল স্তরে এ সাহায্য সহযোগিতার মুখাপেক্ষী। বরং এরপরও মানুষ জীবিতদের ইছালে ছওয়াব ও দুআয়ে-মাগফিরাতের মুখাপেক্ষী থাকে। যদি এহেন সর্বব্যাপী মুখাপেক্ষিতা না থাকতো, তবে কে কার সাহায্যে এগিয়ে আসতো। মোটকথা, সমগ্র বিশ্বের ব্যবস্থাপনা পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এ চিত্রের একটা ভিন্ন পিঠও আছে। তা এই যে, যদি চুরি, ডাকাতি, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদির জন্যে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা হতে থাকে ও চোর ডাকাতদের বড় বড় দল গঠিত হয়ে যায়, তবে এ সাহায্য ও সহযোগিতাই বিশ্বব্যবস্থাকে বিধ্বস্ত ও তছনছ করে দেয়। এতে বুঝা গেল যে, পারস্পরিক সহযোগিতা একটি দুধারী তরবারী। যা প্রয়োগ ব্যতীত বিশ্বের ব্যবস্থাপনা চলে না। ক্ষুর এর ভুল ব্যবহার গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে বানচাল করে দেয়। সেজন্য কুরআন সুন্নাহ পরস্পর সহযোগিতার একটি মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। যা অবলম্বনে বিশ্বব্যবস্থা অটুট থাকবে আর মানুষের জীবনে নেমে আসবে সুখ-শান্তি, আরাম ও আনন্দের স্রোতধারা। এ মর্মে আল্লাহ তা’আলা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন, তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সহযোগিতা করো, গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহায়তা করো না। [সূরা মায়েদা : ২] চিন্তা করলে দেখা যায় যে, কুরআনে কারীম এ আয়াত কেবল মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিচ্ছে। তাও শুধু সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির ক্ষেত্রে। এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে একথা প্রতীয়মান হয় যে, গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে কাউকে সহযোগিতা করা যাবে না, যদিও সে মুসলমান হয়। বরং তাকে গুনাহ ও জুলুম থেকে বিরত রাখাই হবে প্রকৃত সহায়তা। বুখারি শরীফে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, তোমার (মুসলিম) ভাইকে সাহায্য কর, চাই সে জালেম হোক কিংবা মাজলুম হোক। সাহাবায়ে কেরাম রা. বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মাজলুমকে সাহায্য করার অর্থ বুঝতে পেরেছি, কিন্তু জালেমকে সাহায্য করার দ্বারা কি উদ্দেশ্য? তখন রাসূল সা. ইরশাদ করেন, তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখ, এটিই তার সাহায্য। [বুখারি : ৩/১৩৮-হাদীস নং ২৪৪৪] কুরআন পাকের এ শিক্ষা, সৎকর্ম ও তাকওয়া তথা আল্লাহভীতিকে মাপকাঠি বানিয়েছে। এর ভিত্তিতেই পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। আর এর বিপরীতে পাপ ও অত্যাচারকে কঠোর অপরাধ গণ্য করেছে এবং এতে সাহায্য-সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছে। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি হেদায়েত ও সৎকর্মের প্রতি আহ্বান জানায়, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারী লোকদের ছাওয়াবের সমপরিমাণ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের ছাওয়াব হ্রাস করা হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পাপের প্রতি আহবান করে, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারীদের গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের গুনাহ হ্রাস করা হবে না। [মুসলিম শরীফ : ৪/২০৬০- হাদীস নং ২৬৭৪] অন্য রেওয়ায়েতে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন অত্যাচারীর সাথে তার সাহায্যার্থে বের হয়, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। [মুজামুল কাবীর তাবরানী : ১/২২৭] হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন ঝগড়া-বিবাদে অন্যায় পথে সহযোগিতা করে, সে আল্লাহর অসন্তুষ্টির মধ্যে থাকে, যতক্ষণ না তা হতে ফিরে আসে। [মুসতাদরাকে হাকেম : ৪/৯৯- হাদসি নং ৭০৫১, বাইহাকী : ৬/১২৩- হা. ৭৬৭৬] এছাড়াও হাদীসের গ্রন্থাবলীতে এ প্রসঙ্গে আরও অসংখ্য হাদীস বর্ণিত রয়েছে, যেগুলি অধ্যয়ন করলে একথাই পরিস্ফুটিত হয় যে, সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে সহায়তা করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য আর গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে সহায়তা হারাম। গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা করার কয়েকটি চিত্র আল্লামা আশেকে ইলাহী বুলন্দশহরী রহ. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থ আনওয়ারুল বয়ানে উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন, যে চাকরী বা পদের কারণে গুনাহে লিপ্ত হতে হয়, তা গ্রহণ করা হারাম, এভাবে গুনাহের আইন প্রণয়ন করাও হারাম। কেননা, এর দ্বারা গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হয়। এমনিভাবে মদের কারখানায় চাকুরী করা কিংবা অন্য কোন মাধ্যমে সহযোগিতা করা অথবা এমন চাকুরী করা যাতে শরীয়ত পরিপন্থী কাজে অন্যকে সহায়তা করা হয় বা সুদ-ঘুষের লেন-দেন করা হয় অথবা সুদ-ঘুষ আদান-প্রদানের মাধ্যম হতে হয়, এধরণের চাকুরী করা হারাম এবং তা থেকে অর্জিত বেতন হারাম। এভাবে চোর, ডাকাত, লুটতরাজকারী ও অত্যাচারীর সহায়তা করাও হারাম। [তাফসীরে আনওয়ারুল বয়ান : খ-৩, পৃ. ১২] রাসূল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এ শিক্ষার সুফল রাসূলুল্লাহ সা. কে যখন দুনিয়ায় প্রেরণ করা হলো তখন ত পুরো ‘আরব উপদ্বীপ’ নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতার নরকে পরিণত ছিল। হত্যা ও নাশকতার বাজার গরম ছিল। লুণ্ঠনকে বীরত্ব ও বাহাদূরী মনে করা হতো। কন্যা সন্তানকে জীবন্ত দাফন করে বড়াই করা হতো। নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থীরতার সেই পরিবেশে রাসূলুল্লাহ সা. সংবাদ দিয়েছিলেন, একটা সময় আসবে একজন নারী একাকী হীরা থেকে ভ্রমণ করে মক্কায় এসে তাওয়াফ করবে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সে ভয় করবে না। [বুখারি শরীফ : ৪/৫৩৮ হাদীস নং ৩৫৯৫] জগদ্বাসী প্রত্যক্ষ করেছে, রাসূল সা. এর ইন্তেকালের পূর্বেই সেই সময় এসেছিল। যে ‘আরব উপদ্বীপ’ হিংসা বিদ্বেষ, শত্র“তা ও অস্থিরতার জলন্ত আঙ্গার ছিল, সেখানে ভালোবাসা, হৃদ্রতা, একতা, শান্তি ও নিরাপত্তার ফুল প্রস্ফুটিত হয়েছিল ও গড়ে উঠেছিল বেহেশতি নহরের পানিতে বিধৈাত একটি সুশীল আদর্শ সমাজ। আরবের এ চিত্র পুলিশ কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে হয়নি। বরং কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষার ফলে হয়েছিল। কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষাই মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিটি ব্যক্তির অন্তরে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির বীজ রোপণ করে দিয়েছিল। এবং প্রতিটি ব্যক্তিকে অপরাধ উৎপীড়ণ দমনের জন্যে সিপাহী রূপে গড়ে তুলেছিল। আর বানিয়েছিল তাদেরকে তাকওয়া ও সৎকাজের অনন্য সহযোগী। এর ফলে সৎকাজের সহযোগিতায় তারা ছিলেন প্রতিযোগী। আর অসৎকাজ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখতে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায়। তদ্রুপ নিজেকে পাপ ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে তারা ছিলেন সর্বদা সচেতন। এরই অনিবার্য পরিণতি ছিল যে, তারা অপরাধের প্রতি পা বাড়াতেনই না। ঘটনাক্রমে যদি কখনও অপরাধ সংঘটিত হয়ে যেত, আল্লাহর ভয় তাদেরকে অস্থির করে তুলত, তখন নিজেই রাসূল সা. এর দরবারে গিয়ে স্বীকার করতো। যতক্ষণ পর্যন্ত এর পূর্ণ প্রতিকার না হতো পরকালের চিন্তায় ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি পেতো না। কুরআনের এ শিক্ষা পরিহারের পরিণাম কিন্তু আমাদের অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা ও সৎকাজে বাধা প্রদান করতে ব্যতিব্যস্ত। সচরাচর পরিলক্ষিত হয় যে, যদি কোন ব্যক্তি ইসলামী বেশভূষা গ্রহণ করতে চায়, সুন্নতি পোশাক পরিধান করতে চায়, সুন্নত মোতাবেক জীবন যাপন করতে চায়, তখন তার বন্ধুবান্ধব, পরিবারবর্গ ও অফিসের লোকজন চেষ্টা করে, সে যেন এই ছাওয়াবের কাজ থেকে বিরত থাকে এবং আমাদের ন্যায় (পাপী) হয়ে যায়। আজকাল সৎকাজে সহায়তা করতে কেউ প্রস্তুত নয়। কিন্তু কেউ যদি গুনাহ করার ইচ্ছা করে তখন সবাই তার সহযোগী হয়। হারাম উপার্জন করলে, সুদ গ্রহণ করলে ও দাড়ি মুন্ডালে স্ত্রীও খুশী, মা-বাবাও খুশি, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজের লোকজন খুবই খুশী। যদি সৎপথে চলতে চায়, সুন্নাতের উপর চলতে চায়, তখন সবাই অসন্তুষ্ট। বন্ধু নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সিনেমা হলে নিয়ে যায়। গান বাদ্য ও মদের আসরে নিয়ে যায়। তারপর ধোঁকা দিয়ে নাপিতের দোকানে নিয়ে যায়, নিজের পকেটের টাকা দিয়ে দাড়ি কামিয়ে দেয়। আবার অনেকে অন্যের দুনিয়া সাজাতে নিজের আখেরাত ধ্বংস করে। যেমন, নির্বাচনের সময় ভোটার এবং সমর্থকরা একথা ভালোকরেই জানে যে, আমরা যে পার্থীকে পদে বসাতে চাচ্ছি সে একজন ফাসেক ও জালেম। পদ অর্জনের পর তার জুলম আরো বৃদ্ধি পাবে। তবুও তার সহযোগিতায় লিপ্ত থাকে। তাকে সফল করার লক্ষে তার প্রতিপক্ষের দুর্ণাম রটিয়ে বেড়ায়। কখনো কখনো বিপক্ষের লোকদেরকে হত্যাও করা হয়। এটি কতবড় অহমিকা ও নির্বুদ্ধিতা যে, নিজের আখেরাত ধ্বংস হবে আর অন্যের দুনিয়া অর্জন হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন নিকৃষ্টতম ব্যক্তিদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিও হবে যে, অন্যের দুনিয়ার জন্যে নিজের আখেরাত ধ্বংস করেছে। [ইবনে মাজা : ৪/৩৩৯ হা. ৩৯৬৬] আজ আমাদের গুনাহ ও অপরাধের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার কারণে, সারাবিশ্বে অপরাধ, চুরি, ডাকাতি, অশ্লীলতা, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তা দমন করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এহেন দুর্গতি, দুরাবস্থা ও অস্থিরতা থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করতে হলে, কুরআনের এই মূলনীতি অনুসরণ হবে এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত ও অপরাধ দমনের লক্ষে প্রত্যেক ব্যক্তিই সচেষ্ট হতে হবে। শিক্ষার্থী : উচ্চতর তাফসীর গবেষণা বিভাগ, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ তাআলার যিনি পবিত্র কুরআন নাযিল করেছেন বান্দার পথ প্রদর্শনের জন্য সর্বশ্রেষ্ট নবী মুহাম্মদ সা. এর উপর, যিনি হলেন উম্মতের রাহবর। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক তারই উপর এবং তার সকল সাহাবীদের উপর।
আল্লাহ তা’আলা মানব জাতির ইহকাল ও পরকালের সর্বপ্রকার মঙ্গল ও সফলতা একমাত্র দ্বীন ইসলামের মধ্যে নিহিত রেখেছেন। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের সাথে বলতে হয় বর্তমান যুগে ইসলামিক মন মানসিকতাকে অনেকেই আধুনিক বলে গণ্য করতে চায়না। তাই অনেকেই তার সন্তানকে সঠিকরূপে ইসলামিক শিক্ষা প্রদান করতে পারে না। ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চায়না। আরবী ভাষা নয়, ইংরেজি ভাষা শিখিয়েই বর্তমানে অনেক বাবা-মা নিজেদের সৌভাগ্যবান ভাবেন, গর্বিত হন। কিন্তু ইসলামে কখনই সময়ের থেকে পিছিয়ে থাকার কথা বলা হয়নি; বরং সর্বকালের সাথে মানিয়ে নিয়েও ইসলামিক নিয়মে চলা সম্ভব। সাধারন শিক্ষার পাশাপশি প্রিয় সন্তানকে বিশুদ্ধ কুরআন তেলাওয়াত, কালিমা, নামায তথা মৌলিক দ্বীন শিক্ষা দেয়া আপনার অবশ্য পালনীয় কর্তব্য এবং তা আপনার সন্তানের অধিকারও বটে। তাই ছোটবেলা থেকেই শিশুদের ইসলামী  শিক্ষা তথা কুরআন শিক্ষা, নামায শিক্ষা আদব কায়দা শিক্ষা দেয়া উচিত। শিশুকাল থেকেই আপনার সন্তানকে নামায পড়ায় অভ্যস্ত করে তুলুন এবং অন্যান্য ভাষার পাশাপাশি আরবী ভাষা ও কুরআন পড়ার শিক্ষা দিন। আর প্রত্যেক মুসলিম সন্তানকে বিশুদ্ধভাবে কুরআন পড়তে শিখানোর দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে পিতা মাতার ওপর। যার প্রতিদান মহান আল্লাহ্ পিতা-মাতাকে উপহার দিবেন সূর্যের চেয়ে অধিক জ্যোতির্ময় নুরের মুকুট। তাই মৌলিক দ্বীন শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ।
আর কুরআন শিক্ষাকারী ব্যক্তিকে আল্লাহর রাসূল সর্বোত্তম ব্যক্তি বলেছেন। এমন কোনো মা-বাবা খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে তার সন্তান সর্বোত্তম হোক এটা চায় না। তাই উত্তম হওয়ার যে মাপকাঠি তথা কুরআন শিক্ষা করা তা না করে তো কেউই উত্তম হতে পারবে না। কুরআন মাজীদ না শিখে দুনিয়ার সমস্ত জ্ঞান বিজ্ঞান শিখে ফেললেও সেই ব্যক্তিকে সর্বোত্তম বলা যাবে না। তাই সর্বাগ্রে সন্তানকে কুরআন শিক্ষা দেওয়া জরুরী।
প্রত্যেক মুসলিমকে কুরআন পড়া জানতে হবে। যে নিজেকে মুসলিম হিসাবে দাবী করবে তাকে অবশ্যই কুরআন শিক্ষা করতে হবে। কুরআন শিক্ষা করা এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, আল্লাহ তা‘আলা কুরআন শিক্ষা করা ফরয করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ‘পড় তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন’ [সূরা আলাক : ১]।
কুরআন শিক্ষায় কোন প্রকার অবহেলা করা যাবে না। উম্মতকে কুরআন শিক্ষার নির্দেশ দিয়ে ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘তোমরা কুরআন শিক্ষা কর এবং তিলাওয়াত কর’ [মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবাহ:৮৫৭২]।

সালাত আদায়ের জন্য কুরআন শিক্ষা
আল্লাহ তা‘আলা ঈমানদার বান্দাদের উপর প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। কুরআন তেলাওয়াত ছাড়া সালাত আদায় হয় না। সালাত আদায় করার জন্যও কুরআন শিখতে হবে। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘অতএব তোমরা কুরআন থেকে যতটুকু সহজ ততটুকু পড়।  [সূরা আল-মুযযাম্মিল: ২০]।
সন্তানকে যদি মা-বাবা কুরআন শিক্ষা দেন তাহলে আখিরাতে তারা অশেষ মর্যাদার অধিকারী হবেন। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, উসমান ইবন আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম যে কুরআন শেখে এবং (অপরকে) শেখায়।  [বুখারী : ৫০২৭] অন্য হাদীসে বার্ণিত হয়েছে, হযরত মুআয জুহানী রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কুরআন শরীফ পড়বে এবং এর উপর আমল করবে তার পিতা-মাতাকে কিয়ামতের দিন এমন এক মুকুট পরানো হবে যার আলো সূর্যের আলো হতেও উজ্জ্বল হবে; যদি সে সূর্য তোমাদের ঘরের ভিতর হয়। (তবে তা যে পরিমাণ আলো ছড়াবে সে মুকুটের আলো উহা হতেও অধিক হবে।) তাহলে সে ব্যক্তি সম্পর্কে কী ধারণা যে স্বয়ং কুরআনের উপর আমল করেছে? [সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৪৪৮]
যাকে এই কুরআন শেখার তাওফিক দেওয়া হবে সে বিশাল মর্যাদা ও ফযীলতের অধিকারী হবে। আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব থেকে একটি আয়াত পড়বে, তার জন্য একটি নেকী লেখা হবে। আর নেকীটিকে করা হবে দশগুণ। আমি বলছি না   একটি হরফ। বরং ‘আলিফ’ একটি হরফ, ‘লাম’ একটি হরফ এবং ‘মীম’ একটি হরফ’। [তিরমিযী :  ২৯১০]
আবূ হুরায়রা রা. কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সন্তানকে সুসন্তান ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার আরেক উত্তম পদ্ধতির নাম হল সৎসঙ্গ। এজন্য প্রথমেই সন্তানকে ভাল সংশ্রবে রাখা দরকার। কুরআন মাজীদে আল্লাহ পাক বলেন, তোমরা সত্যবাদীদের সাথে থাক। [সূরা তাওবা : ১১৯] এর রহস্য হল, সত্যবাদীদের সাথে থাকলে সত্যবাদী হওয়া যায়, আর মিথ্যাবাদীদের সাথে থাকলে মিথ্যাবাদী হওয়ার আশংকা রয়েছে। এটা কুরআন-হাদীস, বিজ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দ্বারাই প্রমাণিত ও অতি বাস্তব কথা। দুষ্ট প্রকৃতির ছেলে মেয়েদের সাথে কখনো নিজ সন্তানকে মিশতে দেয়া ঠিক নয়। সেজন্য সংশ্রবের ব্যপারে সতর্ক থাকা জরুরী। মন্দ সংশ্রবের কারণে বাচ্চাদের মধ্যে মন্দ স্বভাবের প্রভাব পড়ে।
সন্তান ভালো হবে না খারাপ হবে তা নির্ভর করে পিতা-মাতার কাছে। সন্তান যে পরিবেশে বড় হবে তা-ই সে শিখবে। পিতা-মাতা যদি আদর্শবান হন এবং ধর্মীয় নিয়মকানুন অনুযায়ী চলেন এবং সন্তানকে সুশিক্ষা দিয়ে গড়ে তোলেন তাহলে সন্তান অবশ্যই ভালো হবে। আল্লাহ তাআলা এ পৃথিবীতে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে থাকেন পরীক্ষা করার জন্য। অনেককে আল্লাহ তাআলা প্রচুর ধন-সম্পদ দান করেন ঠিকই কিন্তু সেই ধন-সম্পত্তির সঠিক ব্যবহার না করার ফলে দেখা যায় সে ধ্বংস হয়ে যায়। আবার কাউকে সন্তান-সন্ততি দেন ঠিকই কিন্তু তাদের সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত না করার ফলে এই সন্তান তার জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। যেমনটি হয়েছিল ঐশী নামের মেয়ের ক্ষেত্রে।
বর্তমানে অনেক মায়েরা অভিযোগ করে থাকেন যে, ছেলে-মেয়েরা ঘরে থাকে না শুধু বাইরে চলে যায়, তাই টিভি কিনে দিয়েছি। জেনে রাখা উচিত, টিভি, ভিসিডি এগুলো চরিত্র ও ঈমান বিধ্বংসী হাতিয়ার। এসব জিনিস দিয়ে সন্তান ধ্বংস হওয়ার অসংখ্য ঘটনা চোখের সামনেই বিদ্যমান। সুতরাং আমাদের নিজেদেরই উপায় বের করতে হবে কীভাবে আমরা সন্তানদের এগুলো থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি। আমাদের সব সময় খেয়াল রাখতে হবে বাড়িতে সন্তান-সন্ততিরা নিয়মিত নামায পড়ছে কিনা, কুরআন তেলাওয়াত করছে কিনা। বর্তমানে যেহেতু বিজ্ঞানের যুগ, আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনে বর্তমান যুগে ইন্টারনেট, টিভি, ক্যাবল সংযোগ, মোবাইল ফোন ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষ যেমন অহরহ সামাজিক অপকর্মে লিপ্ত হতে শুরু করে তেমন নিত্যনতুন নৈতিক পদস্খলন হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তাই এসবের খারাপ জিনিসগুলো বাদ দিয়ে ভালোকে গ্রহণ করতে হবে এবং সন্তান যেন খারাপ কোনো কিছুর দিকে আসক্ত না হয় সেদিকে খুব খেয়াল রাখতে হবে।
মনে রাখতে হবে একটি শিশু জন্মের পর  থেকেই সাধারণত মায়ের কাছে থাকে। মা-ই তার প্রথম পাঠশালা। তাই সন্তান আদর্শ ও সৎ হওয়ার পিছনে মায়ের ভূমিকাই বেশি। একটি সন্তান পৃথিবীতে কত বড় হবে, কত ভালো হবে, তার অনেকটাই নির্ভর করে মায়ের উপর। সেজন্য সর্বাগ্রে মা-কে সচেতন হতে হবে। সন্তানকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং তা যথার্থভাবে বাস্তবায়নের প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। সন্তান মা-বাবার হাতে আল্লাহর আমানত, তাঁর দেয়া নেয়ামত। এদেরকে সুশিক্ষা দেয়া হল কি না সে বিষয়ে কিয়ামতের দিন পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে।
তাবেয়ী ইবরাহীম আততাইমী রহ. বলেন, তাঁরা (সাহাবীগণ) শিশুকালে কথা বলা শিখলে তাকে কালিমার তালকীন করতেন (মুখে মুখে বলা শিখাতেন)। যাতে শিশুর প্রথম কথা হয় লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। [মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ৩৫১৯] দ্বিতীয়ত সাত বছর হলে শিশুকে নামাযের আদেশ দেয়া। দশ বছর হলে নামায না পড়লে প্রয়োজনে প্রহার করা, যা হাদীস দ্বারাই প্রমাণিত। এরপর তাকে কুরআন শিক্ষা দেয়া। সাত বছর বয়সেই কুরআন শিক্ষা দেওয়া উচিত। হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রাহ. বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নামাযের জন্য যখন সাত বছর বয়সকে নির্ধারণ করা হয়েছে, এর থেকে আমার মনে হয় এই বয়সটাই নিয়মতান্ত্রিক লেখাপড়া শুরু করার উপযুক্ত সময়।
উপরোল্লিখিত বিষয়গুলি সন্তান আদর্শবান হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি উপায়। এ ছাড়া মা যদি সন্তানকে প্রকৃত আদর্শবান করে গড়ে তুলতে চান তাহলে তার উচিত ছোট থাকতেই সন্তানকে প্রতিটি কাজে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নতে অভ্যস্ত করে তোলা। এর একটি উপায় হল, তার সামনে নিজে সুন্নতের আমল করা। জায়গায় জায়গায় মাসনূন দুআগুলি পাঠ করা। এতে নিজেরও উপকার হবে সন্তানেরও ভবিষ্যত উজ্জ্বল হবে।
পরিশেষে মহান আল্লাহ তাআলার কাছে এই কামনাই করি, প্রতিটি পরিবার যেন প্রকৃত ইসলামের আদর্শে জীবন পরিচালিত করে আর সন্তান-সন্ততি যেন ইসলামিক আদর্শে গড়ে ওঠে। আমিন।
লেখক: গবেষক, চেয়ারম্যান নোমান গ্রুপ অব ই-াস্ট্রিজ লি.

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ যে শিক্ষায় দুনিয়া আখেরাতের সফলতা বিদ্ধমান : মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম

  1. শাইরা খাতুন says:

    হক কথা ক’জন বলে! সবাই যেন এমন শিক্ষা অর্জন করতে পারে দোয়া করি। লেখাটি বর্তমান সময়ের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় লেখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight