মোহাম্মদ ইউসুফ আহমেদ : সর্বনাশা প্রেম

Biye

এই সবুজ শ্যামল অপরুপ বৈচিত্রে সাজানো বসুন্ধরায় প্রতিদিন কত তরুণ তরুণীরা অবৈধ প্রেমের জালে আবদ্ধ হয়ে স্বীয় সোনার জীবনকে ধ্বংস করছে। যার ফলে তাদের মমতাময়ী পিতা মাতার ভবিষ্যতের রঙ্গিন স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে। আর এমনই একটি শোকজনক ঘটনা ঘটছে সোহেলের জীবনে। সে বড় শিক্ষিত হবে, ভাল বেতনে চাকুরী পাবে! এমন আশা নিয়েই সোহেলকে তার পিতা মাতা স্কুলে ভর্তি করেছিল। কিন্তু সে পড়া লেখার পাঠ্যসূচি বাদ দিয়ে অবৈধ প্রেমের পাঠ্যসূচি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে তার জীবনাকাশে নেমে আশে অমানিশার ঘোর আধার। ধ্বংসের মুখে পতিত হয় তার সোনার জীবন। এখন চলুন আমরা সোহেলের বন্ধু নূর ইসলাম সাগরের মুখে  শোনে নিই তার জীবন ধ্বংশের ঘটনাগুলো। খুব তড়িঘড়ি করে আমাদেরকে দিনাজপুর এসে একটা ভালো মেস যোগার করতে  হলো। কারণ এস.এস.সি. ফাইনাল পরীক্ষার বাকী হাতে-গুনা মাত্র ৩ মাস। ভেবেছিলাম বাসা থেকেই পড়ব। কিন্তু যখন কাজ আর নানান চাপে একেবারেই অসহ্য হয়ে উঠল তখন আর বাসায় থাকবার পরিবেশ থাকল না। অগত্যা মেসে আসতেই হলো। আমরা রুমমেট চার জন। রুমে বেড ছিল দুটি। একটিতে আমি আর নিজাম অপরটিতে সাজেদ ও সোহেল থাকত। বেশ ভালই চলছিল আমাদের লেখাপড়া। ইতিমধ্যে কেটে গেল পনের বিশ দিন। এতদিনেও ব্যাপারটা আমরা ভালো করে বুঝে উঠতে পারিনি। সোহেল রাতে কোথায় যেন যায়। আমরা পড়ি রাত ১২ টা পর্যন্ত। ১২.৩০ মিনিটে ঘুমিয়ে পড়ি। সেও আমাদের সাথে মাগরিবের পর পড়তে বসে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর বাইরে চলে যায়। সে ফিরে আসলে বলি কিরে কোথায় গিয়েছিলি? ও আমাদেরকে একটু মুচকি হাসি উপহার দিয়ে বলে, পাশের মেস থেকে ঘুরে এলাম। আমরা তা বিশ্বাস করি। কিন্তু এটা তার যখন নিত্য অভ্যাস হয়ে দাড়াল, তখন আমাদের সন্দেহ হতে লাগল। আসলে ও যায় কোথায়? সেদিন রাতের খাবারের পর আমরা সোহেলকে লক্ষ করে বললাম, প্রতিদিন তুই কোথায় যাস সোহেল? সে মুচকি হেসে আগের মতোই উত্তর দিল। আমি বললাম, প্রতিদিন কি প্রয়োজন যাওয়ার? ও দুই ঠোটের কোনে মুচকি হাসির রেখা টেনে প্রসন্ন মনে বলল, অসুবিধে কি? সেদিন আমাদের একটা বনভোজনের আয়োজন ছিল সিংড়া সালবনে। সবাই বেশ আয়োজন করে গেলাম। ঘুরে ঘুরে দেখলাম, হাসি আড্ডায় সময় কাটাতে লাগলাম। ফিরতে বেশ দেরি হলো। সবাই যার যার মেসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। আমরা আমাদের মেসে আসতেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ দেখলাম, সোহেল আমাদের সাথে নেই। ভাবলাম হয়তো পাশের মেসে গিয়েছে। তাই আর চিন্তা না করে মেসে এসে নামায পড়ে রাতের খাবার সেরে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন সকাল, দুপুর, বিকাল, পেরিয়ে ক্রমশ সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। পাখিরা সব স্বীয় নীড়ে ফিরে এল; কিন্তু সোহেল স্বীয় নীড়ে ফিরে এলো না। আমরাও এতটা চিন্তিুত নয়। কেননা  এটা আজ ওর নতুন কিছু নয়। মাঝে মাঝেই সে মেসে অনুপুস্থিত থাকে। পাশের পকেটে মোবাইলটা ক্রিং ক্রিং শব্দে বেজে উঠল। অপরিচিত নাম্বার, তাই সালাম না দিয়েই কুশলাদি জিজ্ঞাস করে পরিচয় জানতে চাইলাম। ও বলল, আমি সোহেল। বিষন্ন একটা বিপদে পড়েছি তোরা তাড়াতাড়ি একটু বলাকা মোড়ে আয়। এ কথা বলেই লাইন কেটে দিল। লাউডস্পীকারে কথা বলার সুবাদে তিনজনই তার কথা শোনলাম। তাই আর কালবিলম্ব না করে দ্রুত বলাকা মোড়ে পৌঁছলাম। সামনে অগ্রসর হতেই সোহেল আমাদের দৃষ্টি সীমার ভিতরে চলে এলো। কিন্তু কেউই তার কাছে ভিড়তে চাইল না। কারণ হলো, তার সাথে একটা অচিন মেয়ে ছিলো। সোহেল নিজেই আমাদের নিকট আসল। নিজাম একটু বাকপটু ছিল। আমরা কথা না বললেও নিজাম সহাস্যে বলল, ওটা কে রে সোহেল? ও জবাবে মুখ গুমড়ো করে বলল, তোদের ভাবী। আমরা যেন আকাশ থেকে পড়লাম। একি তারপর ও সদ্য বিবাহিতা পাত্রীকে  একটা হোটেলে ঢুকিয়ে দিয়ে এসে আমাদের সমস্ত ঘটনা খুলে বলল। আমরা ঘৃণা আর লজ্জায় একেবারে মরে যেতে লাগলাম। ছি.. এ কতবড় করুণ ট্রাজেডি! একটি অবলা ললনার মোহে যদি কোনো ভবিষ্যত পানে অগ্রসরমান তরুণ ভালোবাসা নামের দূর্ঘটনা জন্ম দিয়ে বিয়ের মতো আশীর কাটায় বিদ্ধ হয়ে যায়, তবে তা কতখানি আক্ষেপ আর ঘৃণার বিষয় এবং করুণ ট্রাজেডি হতে পারে তা লিখে বোঝানো সম্ভব হবে না। কিন্তু এটাই যে অবৈধ প্রেমের চূড়ান্ত রুপ, তা কজন বুঝবার চেষ্টা করে। তারপর আর এক মুহুর্ত সেখানে দেরী না করে চলে আসতে বাধ্য হলাম আমরা। কিন্তু সোহেলের করুণ কান্না ও অসহায় দৃষ্টি আমাদের কে সামনে এক পা অগ্রসর হতে দিল না। আফসোস! আফসোস করে সে বলল, আমি জীবিত থাকতেই মৃত হয়ে গেলাম। মৃত্যু হয়ে গেলে মানুষ দুনিয়ার অত্যাচার থেকে মুক্তি পায়, কিন্তু আমি তাও পেলাম না। ধরণীতেই যেন জাহান্নামের অগ্নিতে জ্বলছি। তোরা সকল তরুণ ভাইদের বলে দিস তারা যেন প্রেম নামের মহাপ্রণয়ের দিকে পা না বাড়ায়। এটা জাহান্নামের জলন্ত আগুন বৈ আর কিছুই নয়। এ কথাগুলো বলেই মুচরে কেঁদে উঠল সে। এরপর সে আমাদের কাছে কিছু টাকা চাইল। আমরা শেষ মুহুর্তে তার মুখের প্রতি চেয়ে পাঁচশ টাকা দিয়ে দ্রুত চলে এলাম। এস. এস. সি. পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য হল না তার। জীবনটা তার তিলে তিলে ধ্বংশ হতে লাগল। জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে গেল সুখ। শান্তির আভাস মাত্রও তার অবশিষ্ট রইল না। লাঞ্ছনার কালো পানিতে জীবন নামের তরী আস্তে আস্তে ভেসে যেতে লাগল দূর সীমানায়। প্রিয় পাঠক পাঠিকা! পবিত্র কুরআন ও হাদীসে যৌবনের গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। যৌবনকাল হলো মানুষের জীবন গড়ার উপযুক্ত সময়। আর এই অবৈধ ভালবাসা নামক আগুন জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। একজন মেধাবী ছাত্র কিংবা ছাত্রী যখন ভালবাসার  ইন্দনে জ্বলতে থাকে তখন তার থেকে পড়ালেখা ও অন্যান্য সকল বিষয় বরবাদ হয়ে যায়। সে ছিটকে পড়ে জীবন গড়ার সিঁড়ি থেকে। তাই আসুন আমরা অবৈধ ভালবাসার বিষাক্ত ছোবল থেকে নিজেকে বিরত রাখি।
লেখক: গল্পকার, ঔপন্যাসিক

3 মন্তব্য রয়েছেঃ মোহাম্মদ ইউসুফ আহমেদ : সর্বনাশা প্রেম

  1. Fahimda says:

    আল্লাহ তাআলা আমাদের এই যুবসমাজকে এধরণের অনৈতিক কাজ থেকে হেফাজত করুন আমিন। এ ধরণের দীনি পত্রিকায় এমন লেখা ছাপানোর মাধ্যসে গুণে ধরা যুবসমাজকে সতর্ক করার জন্য পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আল্লাহ তাআলা আল জান্নাত পরিবারকে দীনি কাজের বিনিময়ে জান্নাত নসীব করুন। আমিন।

  2. mamun says:

    Sottikater valobasa to pobitro o sund or.Mamun

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight