মৃত্যু ও কবরের শাস্তি :সংকলনে : মাওলানা আব্দুল মতিন

পূর্ব প্রকাশিতের পর…
হাদিস শরীফে আছে, যখন মানুষের অন্তিমকাল উপস্থিত হয় এবং আত্মা বের হবার সময় ঘনিয়ে আসে, তখন চারজন ফেরেশতা তার কাছে উপস্থিত হয়। সর্বপ্রথম একজন ফেরেশতা উপস্থিত হয়ে বলে- আসসালামু আলাইকুম হে অমুক! আমি তোমার খাদ্য-খাদকের সুব্যবস্থা করার নিমিত্ত আদিষ্ট ছিলাম; কিন্তু আফসোস! আজ পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ; মোটকথা, সকল ভূ-মণ্ডল তন্ন তন্ন করে খুজে দেখলাম, কিন্তু তোমার কিসমতের এক ফোটা দানাপানি পেলাম না। কাজেই বুঝলাম, তোমার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে, হয়তো তোমাকে এখনই মরণসুরা পান করতে হবে, দুনিয়ায় আর বেশিক্ষণ থাকবে না।
আবার অপর একজন ফেরেশতা প্রথম ফেরেশতার ন্যায় এসে সালাম করে বলবে- হে অমুক! আমি সর্বদা তোমার পানি সরবরাহের কার্যে নিযুক্ত ছিলাম; কিন্তু অত্র ত্রিভুবন খুঁজেও তোমার জন্য এক ফোঁটা পানির ব্যবস্থা করতে পারলাম না; তাই বুঝতে পারলাম, মৃত্যুদূত তোমার পার্শ্বেই হাজির, এখনই হয়তো তোমার গলদেশ টিপে ধরবে।
তৎপর আর একজন ফেরেশতা উক্ত ফেরেশতাদ্বয়ের ন্যায় এসে সালাম করে বলবে- হে অমুক! আমি সর্বদা তোমার শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ আঞ্জামের জন্য নিযুক্ত ছিলাম; কিন্তু আজ দুনিয়ার এমন কোন স্থান খুঁজে পেলাম না যেখানে গিয়ে এক পলক শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করতে পারি।
চতুর্থ ফেরেশতা এসে সালাম করে বলবে- হে আদম সন্তান! আমি তোমার সময় ও কার্যের সুবন্দোবস্ত করার নিমিত্তে নিয়োজিত ছিলাম। আজ সমস্ত ভু-মণ্ডল ঘুরেও তোমার একটি সেকেন্ড সময় ও কোন কার্য তালাশ করে পেলাম না। তাই নিঃসন্দেহে বুঝতে পারলাম, তুমি জিন্দা থেকে নশ্বর ধরার সুখ-শান্তি ভোগ করতে পারবে না। আজই তোমাকে মৃত্যুবরণ করতে হবে।
এ চারজান ফেরেশতার পরে কেরামান ও কাতেবীন নামক দু’জন ফেরেশতা আসসালামু আলাইকুম বলে উপস্থিত হয়ে বলবে- হে আদম সন্তান! তোমার ভালোমন্দ যাবতীয় কার্যাবলী লিখার জন্য আমরা আদিষ্ট ছিলাম। আজ আমাদের ভালোমন্দ কার্যাবলী লিখা রহিত হয়ে গেল।
এই বলে ফেরেশতাদ্বয় এক টুকরো কালো লিপি বের করে দিবে ও বলবে, ‘এই তোমার কার্যের ফলাফল, এটা পড়ে দেখ।’ আদম সন্তান উক্ত লিপি দেখামাত্র ভয়ে অস্থির হয়ে ঘর্মাক্ত হয়ে উঠবে এবং তা পাঠ করবার ভয়ে মুখমন্ডল এদিক সেদিক ঘুরাতে থাকবে। কিন্তু উপায় কি! সময় শেষ, আর যে বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারবে না।
অতঃপর ডানে বামে দুজন সহচর ফেরেশতাসহ যমদূত ফেরেশতা উক্ত ব্যক্তির জান কবজ করবার জন্য উপস্থিত হবে। ডানে যে ফেরেশতা থাকবে, তাকে বলা হয় রহমতের ফেরেশতা। আর বামে যে ফেরেশতা থাকবে, তাকে বলা হয় আযাবের ফেরেশতা। যদি মৃত্যুবরণকারী নেককার হয়ে থাকে, তবে তার আত্মা অতি সহজে দুগ্ধপায়ী শিশুর মাতার ¯েœহ-প্রচাপন যন্ত্রণার ন্যায় আরামে বের করবে। অন্যথা অত্যন্ত করুন অবস্থায় আত্মা বের করা হবে। মৃত্যুবরণকারীর আত্মা যখন গলদেশ পর্যন্ত পৌঁছবে, তখনই মৃত্যুদূত আযরাঈল তার গলা টিপে আত্মা বের করে নিবে।
আত্মা বের করা হলে মৃত্যুবরণকারী যদি নেককার হয়ে থাকে তবে আযরাঈল রহমতের ফেরেশতার নিকট তার আত্মা সোপর্দ করে বলবেন- ‘যাও, তাকে নিয়ে আসমানের পবিত্র শান্তিময় স্থানে রাখ।’
আর যদি মৃত্যুবরণকারী বদকার হয়ে থাকে, তবে তার আত্মা আযাবের ফেরেশতার নিকট দিয়ে বলবেন- ‘যাও, তাকে অতি অশান্তিময় স্থানে নিয়ে রাখ।’
নেককার ঈমানদার ব্যক্তির আত্মা নিয়ে রহমতের ফেরেশতা আসমানে উঠলেই আল্লাহ তা’আলার দরবার হতে গায়েবী আওয়াজ আসবে- হে ফেরেশতাগণ! তোমরা তাকে তার মৃতদেহের নিকট অবস্থা পর্যবেক্ষণের নিমিত্ত নিয়ে যাও।’ তখন ফেরেশতাগণ আত্মাকে নিয়ে মৃতদেহের ঘরের মধ্যে রেখে দিবে। আত্মা ঘরের মধ্যে থেকে তার জন্য কে কি করছে সব দেখতে থাকবে। এমনকি মৃতদেহের জানাযার নামায পড়ে যখন কবরের দিকে নিয়ে যাবে, তখনও আত্মা মৃতদেহের পিছনে পিছনে কবর পর্যন্ত অনুসরণ করতে থাকে।

কবরের প্রশ্ন
মৃতদেহকে যখন তার আত্মীয়-স্বজন দাফন করে চলে আসবে, তখনই তার রূহকে প্রশ্ন করার সময় উপস্থিত হয়। কবরের প্রশ্নের স্বরূপ বিভিন্ন রকম হতে পারে। কারও মতে মৃত ব্যক্তি দুনিয়ায় যেরূপ জীবিত ছিল, কবরে অনুরূপ জীবন দান করে মৃতদেহের রূহের নিকট মুনকির-নকীর নামক দুই ফেরেশতা প্রশ্ন করবে। আবার কেউ কেউ বলেন, দুনিয়ার ন্যায় জীবন দান করা হবে না; বরং রূহকে দেহের বক্ষ পর্যন্ত প্রবেশ করাবে। অতঃপর রূহের নিকট প্রশ্ন করা হবে। কেউ কেউ এটাও বলেন, রূহকে মৃতদেহের মধ্যে প্রবেশ করানো হবে না; বরং রূহকে মৃতদেহ ও কাফনের কাপড়ের মধ্যবর্তী স্থানে রাখা হবে। অতঃপর মুনকির-নকীর রূহকে প্রশ্ন করবে। অতএব, সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস রাখতে হবে যে, প্রত্যেক মৃতদেহের প্রতি কবর আযাব অবশ্যই হবে। এটা অবিশ্বাসকারী প্রকৃত ঈমানদাররূপে গণ্য হতে পারবে না।
ফিকাহ শাস্ত্রের পন্ডিত আবু লাইস রহ. বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি কবরের ভীষণ আযাব হতে রক্ষা পেতে চায়, তাকে সর্বদা চারটি নেক কাজ করতে হবে এবং চারটি গুনাহের কাজ হতে বিরত থাকতে হবে। নেক কাজগুলো যথা- ১. যথারীতি নামায আদায় করা, যেন কোন সসময়ই নামায ছুটে না যায়। ২. খাস নিয়তে দান-সদকা করা। ৩. সর্বদা ‘সুবহানাল্লাহ’ বেশি পরিমাণে পড়া। ৪. সর্বদা কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করা। এ চারি প্রকার নেক কার্য করতে থাকলে আশা করা যায় তার কবরের আযাব হবে না। শুধু তাই নয়, আল্লাহ তা’আলা তাঁর পবিত্র নূর দ্বারা উক্ত ব্যক্তির অন্ধকার কবরকে আলোকিত করে দিবেন।
যে চারটি গুনাহের কাজ হতে বিরত থাকতে হবে, তা হলো এই যে- ১. মিথ্যা বলা ও মিথ্য প্রবঞ্চনা হতে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকা। ২. কারও গচ্ছিত মাল আত্মসাৎ না করা। ৩. দস্যুবৃত্তি না করা। ৪. পেশাব-পায়খানার পর ঢিলা-কুলুখ ব্যবহার করে উত্তমরূপে পবিত্র হওয়া। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
‘তোমরা পেশাব হতে পবিত্র থাক, কেননা কবরের অধিকাংশ আযাব পেশাব হতে পবিত্র না থাকার দরূন হয়ে থাকে।’ [দারে কুতনী : ১/৪৬৪]
দাফনকারীগণ মৃতদেহ কবরে রেখে কিছু দূর আসা মাত্র মুনকির-নকীর নামক দুই ফেরেশতা অসামান্য শক্তি দেখিয়ে আভ্যন্তরীন ভূ-ভাগ বিদীর্ণ করতে করতে কবরের মধ্যে প্রবেশ করবে। তারা প্রবেশ করেই মৃতদেহকে বসিয়ে তিনটি প্রশ্ন করবে। প্রথমবারে জিজ্ঞেস করবে- ‘তোমার রব (প্রতিপালক) কে?’ দ্বিতীয়বারে জিজ্ঞেস করবে- ‘তোমার ধর্ম কি? তুমি কোন নবীর উম্মত?’ তৃতীয়বারে জিজ্ঞেস করবে- ‘তোমার নবী কে? তুমি কোন ধর্মাবলম্বী ছিলে?’
যদি মৃতব্যক্তি নেককার হয়ে থাকে, তবে প্রথম প্রশ্নের জবাবে সাথে সাথে বলে ফেলবে- ‘আমার প্রতিপালক আল্লাহ, তাঁর কোন শরীক নেই।’ দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাবে বলবে- ‘আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলাম, আমি সেই ধর্মে একান্ত বিশ্বাসী।’ তৃতীয় প্রশ্নের জবাবে বলবে- ‘আমার নবী সাইয়্যেদুল মুরসালীন খাতামুন্ নাবিয়্যীন হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আমি তাঁরই একান্ত বিশ্বাসী উম্মত।’
মৃতদেহের রূহ যখন মুনকির-নকীরের প্রশ্নের জবাব সঠিকভাবে দিয়ে দিবে তখন আল্লাহ তা’আলা অনতিদূর হতে ফেরেশতাদ্বয়কে নির্দেশ দিবেন- ‘হে ফেরেশতাদ্বয়! তাকে তোমাদের আর কিছু জিজ্ঞেস করতে হবে না। আমি তার উপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছি। তোমরা তাকে নতুন বরের ফুলশয্যা বিছিয়ে তার উপরে অতি সমাদর ও সম্মানের সাথে শুইয়ে রাখ আর তার কবর হতে জান্নাত পর্যন্ত একটি সুড়ঙ্গ করে দাও, যেন সে যথাস্থানে শুয়ে জান্নাতের সুগন্ধি অনুভব করতে পারে। আল্লাহ তা’আলার এই আদেশ পাওয়া মাত্রই ফেরেশতাদ্বয় তার কবর হতে জান্নাত পর্যন্ত একটি সুড়ঙ্গ করে দিবে। শেষ বিচারের পূর্বে কিয়ামতের পূর্বক্ষণ পর্যন্ত উক্ত ব্যক্তি যথাস্থানে শুয়ে জান্নাতের শান্তি পেতে থাকবে।
অতঃপর ফেরেশতাদ্বয় তার আত্মাকে নিয়ে আসমানে চলে যাবে এবং আল্লাহ তা’আলার পবিত্র আরশের নিচে ঝাড়বাতির ন্যায় একরূপ নূরের দ্বারা তৈরী বাতির মধ্যে রেখে দিবে। উক্ত পবিত্র আত্মা বা রূহ কিয়ামত পর্যন্ত উক্ত নূরের বাতির মধ্যে অবস্থান করতে থাকবে।
হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
(আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন) ‘আমি যদি কোন বান্দাকে রহমত ও মাগফেরাত করতে ইচ্ছা করি তবে তাকে শারীরিক পীড়া, দারিদ্রতা অথবা পারিবারিক বিষয়ে চিন্তাযুক্ত রাখি। তাতে যদি তার গুনাহের ক্ষতিপূরণ না হয় তবে মৃত্যুকালে অতীব কষ্টে তার রূহ বের করে থাকি, যেন গুনাহ হতে সম্পূর্ণ পূত পবিত্র হয়ে আমার সাথে সাক্ষাত করতে পারে। আর যদি আমি কোন বান্দাকে ক্ষমা করতে ইচ্ছা না করি, তবে তাকে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও আরাম-আয়েশে মশগুল রাখি এবং তার সমান্য নেকের বিনিময়ে অগণিত টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত দান করে নশ্বর দুনিয়ার মোহে তাকে ঘুরিয়ে থাকি। যদি তাতেও তার সামান্য নেকীর বিনিময় না হয়, তবে মৃত্যুকালে অতি সহজে তার রূহ বের করে দুনিয়াতেই তার সামান্য নেকের বদলা দিয়ে আমার সমীপে নেকহীন জাহান্নামীরূপে উপস্থিত করি।’
হাদিস শরীফে আছে, ‘যদি কোন ঈমানদার ব্যক্তির পায়ে কিংবা অন্য কোথাও একটি কাঁটা-ও বিদ্ধ হয়ে থাকে, তবে আল্লাহ তা’আলা উক্ত ঈমানদার ব্যক্তির এই সামান্য কষ্টের বিনিময়ে তার আমলনামা হতে একটি গুনাহ মিটিয়ে তদস্থলে একটি নেকী লিখে দিবেন। কাজেই কোন কোন বুজুর্গ বলেন, ‘যার শরীরিক কোন পীড়া বা অন্য কোন অশান্তি নেই, তার ভবিষ্যৎ তেমন ভাল হতে পারে না।

ঈমানদারদের অবস্থা
হাদিস শরীফে আছে, ‘যখন কোন মুমিন ব্যক্তির মৃত্যু অতি সন্নিকট হয়, তখন একদল স্বর্গীয় ফেরেশতা আসমান হতে সূর্যের ন্যায় আলোকদীপ্ত চেহারা নিয়ে যমীনে অবতীর্ণ হন। এছাড়া তারা জান্নাতের সুঘ্রাণযুক্ত কাফনের কাপড়ও নিয়ে আসেন। তারাই আযরাঈল এবং তার অনুচরবৃন্দ।

চলবে.

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ মৃত্যু ও কবরের শাস্তি :সংকলনে : মাওলানা আব্দুল মতিন

  1. Very important subject. We should read and knowledge about this.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight