মুহাম্মদ আলি আজমি : মন্দির থেকে মসজিদে

মুহাম্মদ আলি আজমি, একটি নাম, একটি বিপ্লব। অশ্রুবিন্দু আর অগ্নিশিখায় মোড়া কিংবদন্তি। শৈশবেই মগ্ন হয়েছিলেন সত্য ও বিশ্বাসের সন্ধানে, পেয়েছেন কৈশরেই, সতের বছর বয়সে। তিনি জন্মেছিলেন ভারতের পানিপুরে, ১৯৬৬ সালে, নাম ছিলো রাম চন্দর, পিতার নাম জুমনাদাশ। ইসলাম গ্রহণ করেছেন ১৩ এপ্রিল ১৯৮৩ সালে। তারপর থেকে দিয়ে চলেছেন অগ্নিপরীক্ষা। এখানে তাঁর নিজের মুখেই পরিবেশিত হলো তাঁর জীবনবৃত্তান্ত।
আমাদের গ্রামে অধিকাংশ ঘরই মুসলমানের; তাবলিগ জামাতও তাবলিগ করার জন্য সেখানে বেশি বেশি আসতো। তাঁদের সাথে আমার সম্পর্ক হয় সাত-আট বছর বয়সেই। আমার ববার মুদির দোকান ছিলো। তিনি আমাকে তাবলিগ জামাতের সাথে সম্পর্ক রাখতে বললেন, যাতে তাঁরা আমাদের দোকান থেকে সওদা-পাতি ক্রয় করেন। বাবার কথা অনুযায়ী আমি তাবলিগ জামাতের লোকদের খেদমত করতাম। তাঁদের পানি এনে দিতাম, লাকড়ি কিনে দিতাম এবং তাঁদের রাহবার হয়ে মুসলমানদের ঘরে ঘরে নিয়ে যেতাম। তাবলিগ জামাতের লোকজন অনেক খুশী হতো এবং আমাকে বাহবা দিতো। তাঁরা আমার নাম জিজ্ঞেস করলে বললাম রাম চন্দর। তাঁরা খুবই আশ্চর্য হলেন এবং বললেন, ‘কী আশ্চর্য! মুসলমানেরা যেখানে গোঁড়ামি প্রদর্শন করে সেখানে একটি হিন্দু ছেলে আমাদের খেদমত করে।’ ফলে তাঁরা আমাদের দোকান থেকে সওদাপত্র ক্রয় করতেন। কখনো কখনো আমরা তাঁদের থেকে তাবিজ নিতাম। এভাবেই তাবলিগ জামাতের সাথে আমার সম্পর্ক গড়ে উঠলো। আমি তাবলিগ জামাতের কয়েকজনকে এক থালায় বসে খাবার খেতে দেখলাম, ভাবলাম, এভাবে খেলে এরা একজনের রোগে আক্রান্ত হয়ে অন্যরা অসুস্থ হয়ে পড়বে। কিন্তু আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে তাঁরা এখানে যতোদিন থাকলেন কেউই অসুস্থ হলেন না। আমি ব্যাপারটি মা বাবাকে জানালে তাঁরা এড়িয়ে গেলেন। হিন্দুরা এক পাত্রে খেলে অসুস্থ হয়ে পড়ে, অথচ মুসলমানদের কিছুই হয় না। ব্যাপারটা আমাকে ভাবিত করলো।
তাবলিগ জামাতের লোকেরা ইসলাম সম্পর্কে বিভিন্ন কথা বলতেন। তাঁরা চলে যাওয়ার পর তাঁদের কথাগুলো আমাদের হিন্দু ধর্মমতের সাথে তুলনা করতাম, কিন্তু কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারতাম না। এই কথাগুলো আমার মস্তিষ্কে ঘুরতে থাকতো, কিন্তু মুখ থেকে বেরুতো না।
চিন্তার আশ্চর্য টানাটানিতে আমি পতিত হলাম। কেননা হিন্দু ধর্মমতের প্রতি আমার ভালোবাসা ছিলো, আকর্ষণ ছিলো এবং বিশ্বাস ছিলো। আমি দেবতা ও ভগবানের মূর্তিগুলোকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবসতাম। কিন্তু তাবলিগ জামাতের বয়ান আমাকে অস্থির করে তুললো; আমি ঠিক করতে পারছিলাম না- কোন্টা সত্য আর কোনটা মিথ্যা। এভাবেই দিন কাটতে লাগলো।
আমাদের গ্রাম থেকে সোয়া কিলোমিটার দূরে শংকর মন্দির ছিলো। তাতে কৃষ্ণ ও গাইমাতার মূর্তিও ছিলো। মূর্তিগুলো ছিল ধাতব পদার্থের। গাইমাতার মুখ এবং শ্রী কৃষ্ণের পা মিলে ছিলো। মহিলারা দুধ এনে মূর্তি দু’টির পাত্রে ঢালতো এবং পরে সাধু সে দুধ বিক্রি করতো।
তাবলিগ জামাতের মুরুব্বিরা ইসলামের নতুন নতুন কথা বর্ণনা করতেন। শুনে আমি অস্থির হয়ে পড়তাম এবং মন্দিরে চলে যেতাম। কিন্তু শান্তি ও স্থিরতা পেতাম না। আমার মনে হতো, কোন জঙ্গলে আমি পথভ্রষ্ট হয়ে পড়েছি; দূর থেকে কেউ আওয়াজ দিচ্ছে, আমি তার দিকে যেতে চাচ্ছি, কিন্তু পথ খুঁজে পাচ্ছি না। আমি আরো অস্থির হয়ে পড়তাম।
আমাদের গ্রাম থেকে দু’কিলোমিটার দূরে বড়গাঁও বাজার রয়েছে। আমি সেখানে প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম। আমাদের ক্লাশের অধিকাংশ ছাত্র ছিলো মুসলমান। জাফর আলি নামে একজন ছাত্র আমার বন্ধু ছিলো। সেই স্কুলে আমাদের গ্রামের একজন শিক্ষক নাসিম সাহেবও ছিলেন। জাফর আমার মতোই ছোট ছিলো, কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা ছিলো তার। সেই অধিকাংশ সময় ইসলাম সম্পর্কে আমাকে বলতো এবং আমিও তাকে বেশি বেশি প্রশ্ন করতাম। কখনো কখনো সে নাসিম সাহেবকে জিজ্ঞেস করে আমার প্রশ্নের উত্তর দিতো।
এরপর আমি আর জাফর জুনিয়র মডেল স্কুলে ভর্তি হলাম। সেই স্কুলে মুসলমান শিক্ষক আবদুল গনি সাহেব ছিলেন। তাঁর বাড়ি ছিলো মধুবন গ্রামে। জাফর তাঁর আত্মীয় হতো। সে আবদুল গনি সাহেবের কাছে আমার কথা বললো। তিনি আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করলেন এবং ইসলাম সম্পর্কে আমার জ্ঞান সমৃদ্ধ করলেন।
আমার জানা ছিলো, মুসলমানদের আকিদা হলো – আল্লাহ এক, তাঁর কোন শরিক নেই। আর হিন্দুরাও বলে, তাদের ভগবান এক। মুসলমানদের আল্লাহ এবং হিন্দুদের ভগবানের মাঝে নাম ছাড়াও কতো পার্থক্য রয়েছে। আমি এ ব্যাপারে আবদুল গনি সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, মুসলমান সেই আল্লাহকেই মানে – যিনি গোটা বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন। তারপর মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের প্রয়োজন ও সেবার জন্য জড়, তৃণ ও প্রাণীসমূহ সৃষ্টি করেছেন। মুসলমানরা সেই স্রষ্টার প্রতিই বিশ্বাস রাখে, যিনি চাঁদ ও সূর্যের পরিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, বাতাস প্রবাহিত করেন এবং যিনি কখনো তন্দ্রাচ্ছন্ন হন না। তাঁকে কেউ জন্ম দেয় নি এবং তিনিও কাউকে জন্ম দেন নি। তিনি অনাদি ও অনন্ত। তাঁকে মাটি বা পাথরের মূর্তির অবয়বে আবদ্ধ করা যায় না। তিনি এতোই পরাক্রমশালী যে-যা ইচ্ছা তাই করেন। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন; বরং সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী। তিনি মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে উদ্ধার করার লক্ষ্যে রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং তিনিই মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন।
আর হিন্দুরা যে মাটি, পাথর ও কাঠের তৈরি মূর্তিকে ভগবান মনে করে পূজা করে সেগুলো মানুষের হাতেরই সৃষ্টি। মানুষই এগুলোকে সৃষ্টি করেছে এবং স্রষ্টা সৃষ্টি থেকে শ্রেষ্ঠ। এবং শ্রেষ্ঠ কখনো অধমের সামনে নত হয় না। এ কারণেই মানুষের জন্য তাদের তৈরি মূর্তির সামনে সেজদা দেয়া শোভা পায় না। হিন্দুরা যে সমস্ত মূর্তিকে ভগবান ও ঈশ্বরের মর্যাদা দিয়ে পূজা করে সেগুলোর এতোটুকু শক্তিও নেই যে, তাদের শরীরে বসা মাছিকে তাড়াতে পারে বা একটি কণামাত্র সৃষ্টি করতে পারে। আবার ভগবান ও ঈশ্বরের মূর্তি চুরিও হয়- তারা নিজেদের চুরি ঠেকাতে পারে না। তাহলে কীভাবে তারা খোদা হতে পারে?
খোদা তো তিনিই যাঁর হুকুম ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না এবং যাঁর বিধানসমূহের মধ্যে ঈশ্বর ও ভগবান মিলেও কোন পরিবর্তন আনতে পারে না। কোন ভগবান পশ্চিম দিকে থেকে সূর্য উদিত করতে পারবে না। এমনকি সে আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করতেও পারবে না। ভগবান-ঈশ্বর নিজেদেরও সাহায্য করতে পারে না। তাদেরকে গর্তে ফেলে দিলে উঠে আসতে পারে না। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, ‘যদি আসমান-জমিনে আমি ছাড়া আর কোন ইলাহ থাকতো তাহলে সে দু’টো বরবাদ হয়ে যেতো।’ (সূরা আম্বিয়া : আয়াত ২২)
আবদুল গনি সাহেবের আলোচনা আমার মস্তিষ্কের দরজা খুলে দিলো এবং আমার চিন্তার রাস্তা প্রশস্ত করে দিলো। আমি হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসবগুলোর কথা ভাবতে লাগলাম। সেগুলোর অন্তঃসারশূন্যতা আমার চোখে ধরা পড়লো।
আমি মিড়াকে থাকতাম। জাফর ও আবদুল গনি সাহেবের কথামতো ইসলামি বই পড়তে শুরু করলাম। কুরআনের হিন্দি অনুবাদ, মৃত্যুর দৃশ্য এবং মৃত্যুর পর কী হবে, কেয়ামত কবে আসবে, ইত্যাদি বই পাঠ করলাম। কালিমায়ে তাইয়িবা, কালিমায়ে শাহাদত এবং আয়াতুল কুরসি মুখেমুখেই শিখে নিয়েছিলাম।
যখন কোন বিপদে পড়তাম বা ভয় হতো আমি কালিমায়ে তাইয়িবা পড়তাম এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতাম। যেসব রাতে ইসলামি বই ও কুরআন পড়াতাম- তার প্রায় রাতেই একজন বুযুর্গকে স্বপ্নে দেখতাম। বুযুর্গের মুখে দাড়ি ছিলো এবং চেহারায় নূর ছিলো। আমি তার দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে পারলাম না। স্বপ্নে যখন আমি ঘাবড়ে যেতাম তিনি আমাকে অভয় দিতেন এবং বলতেন, ‘হে সত্যপথের পথিক, কামিয়াব হওয়ার জন্য তোমাকে এখনই আগুনের সাগর পাড়ি দিতে হবে। ঈমানের রজ্জু দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকো। বিপদ আপদে ধৈর্য ও সাহসের সাথে কাজ করো। আগুনের সাগর নিরাপদে পেরিয়ে যাবে।’ আগুনের দরিয়া, ঈমানের রজ্জু ইত্যাদি কথা তখন আমার বুঝে আসছিলো না। পরে বাস্তবে যখন আগুনের দরিয়ায় পতিত হলাম-তখন সবকিছুই বুঝে এলো।
হিন্দুদের মধ্য থেকে বিভিন্ন সময়ে যারা ইসলাম গ্রহণ করছিলো তাদের পরিণতি আমি স্বচক্ষেই প্রত্যক্ষ করছিলাম। ইসলাম গ্রহণের অপরাধে বিশ বছরের তরুণী আরমিলাকে আমার চোখের সামনেই পুড়িয়ে মারা হলো। সে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিলো; কিন্তু দ্বিতীয়বার হিন্দুত্বে ফিরে আসতে রাজি হয় নি।
নওমুসলিম লতিফুর রহমানের উপর তারা অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছে। তারপর জোর করে খোজা বানিয়ে দিয়েছে। হাজারো অসহনীয় অত্যাচার সত্ত্বেও তিনি ইসলাম ত্যাগ করেন নি। এছাড়াও আমাদের গ্রামের বাঙ্কে রাম মুসলমান হয়ে জিয়াউর রহমান হয়ে গিয়েছিলেন। তখন অবশ্য আমি ছোট ছিলাম। এখন তিনি সৌদি আরবে শিক্ষকতা করেন।
আমি একদিকে ইসলাম গ্রহণের জন্য অস্থির ছিলাম, অপরদিকে নির্যাতন ও মারের ভয়ে ভীত ছিলাম। আমি রাতদিন আল্লাহকে ডাকতে লাগলাম, হে আল্লাহ আমাকে সাহায্য করো! যে রাস্তা তুমি আমাকে দেখিয়েছো সে রাস্তায় চলার হিম্মত ও তওফিক দান করো!
অবশেষে সেই দিন এলো, যেদিন আল্লাহ আমার ইসলাম গ্রহণের ফয়সালা করলেন। ১৯৮৩ সনের ১৩ ই এপ্রিল আমি করিমুদ্দিনপুর পৌঁছে গেলামÑ যেখানে পাঁচ ছয় হাজার মুসলমান ছিলো। মাওলানা রিযওয়ান আহমদ রাজি এর নিকট সেদিন সকাল ১০ টায় ইসলাম গ্রহণ করলাম। তিনি আমার নাম রাখলেন মুহাম্মদ আলি।
আমি আমার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটা গোপন রাখলাম। জুমার দিন এলো। আমি জুমা পড়তে চাইলাম, কিন্তু কাজটা এতোটুকু সহজ ছিলো না। জুমার দিন মসজিদের দরজায় অনেক হিন্দু অসুস্থ ও বাচ্চাদের জন্য পানিপড়া নেয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে, কেউ কেউ জিনিসপত্র বিক্রি করতেও আসে। তারা আমার ইসলাম গ্রহণের কথা জেনে ফেললে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। আমি বিষয়টি মাওলানা রিযওয়ান সাহেবকে জানালাম। তিনি নকল দাড়ি গোঁফ এনে মুখে লাগিয়ে দিলেন। আলিগড়ের কুর্তা ও পাজামা পরলাম। মাথায় লম্বা টুপি পড়লাম। মাওলানা সাহেব শিরওয়ানি দিলেন, চোখে লাগনোর জন্য চশমাও দিলেন। আমি তাঁর সাথে মসজিদে এলাম। আমাকে বড়ো আলেমের মতো দেখাতে লাগলো।
আমি নামাযের ধারবাহিকতা সম্পর্কে বিশেষ জানতাম না। ইমাম সাহেব যখন দাঁড়ালেন আমিও দাঁড়ালাম। সেজদায় যখন গেলাম তখন আমার দাড়ি খুলে পড়লো। আমি গোঁফও খুলে পকেটে পুরে ফেললাম। দ্বিতীয় সেজদায় চশমাও পড়ে গেলো। নামায শেষে মানুষ আমার দিকে হতভম্ব হয়ে তাকালো। আমি বেশ ঘাবড়ে গেলাম। মাওলানা সাহেব আমাকে অভয় দিলেন। তিনি দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, জুমনা দাসের পুত্র রাম চন্দর মুসলমান হয়েছে। এখনো হিন্দুরা ব্যাপারটি জানে না, তাই তা গোপন রাখতে হচ্ছে। রাম চন্দর অর্থাৎ মুহাম্মদ আলিকে আমরা দিল্লি পাঠিয়ে দিতে চাচ্ছি, যাতে হিন্দুদের জুলুমের শিকার না হয়। এই ঘোষণাটি দেয়া হলো মসজিদের ভেতর, বাইরের লোকেরা তা শুনতে পেলো না। মসজিদের সবাই আল্লাহু আকবার বলে উঠলো এবং আমাকে মোবারকবাদ জানালো। তারা আমার জন্য ঈমানের দৃঢ়তার দোয়া করলো।
ঘটনাক্রমে সেদিন আমার দাদিও অসুস্থ ছিলেন। তিনিও পানিপড়া নিতে মসজিদের দরজায় এসেছিলেন। তিনি আমাকে দেখেই চিনে ফেললেন এবং চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুই মসজিদ থেকে বেরুচ্ছিস?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, দাদি! আমি ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে গেছি।’ এটা শোনামাত্রই তিনি আমার গালে চড় বসালেন। গালিগালাজ করতে লাগলেন। চিৎকার করে হিন্দুদের ডাকতে লাগলেন। চেঁচামেচি শুনে হিন্দু-মুসলমান একত্র হয়ে গেলো। মুসলমানরা তো খুশি হলো কিন্তু হিন্দুরা ক্রোধে অন্ধ হয়ে গেলো। আমি বিচলিত হয়ে আল্লাহকে ডাকতে লাগলাম।
হিন্দুরা খুবই চালাক ও দূর্ত। তারা জানে, মুসলমানদের উপস্থিতিতে তারা আমাকে পাকড়াও করতে পারবে না। তাই তারা পুলিশ ডাকলো। পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে ঘুমি থানায় নিয়ে গেলো। এখান থেকেই আমার ঈমানের পরীক্ষা শুরু হলো। দারোগা খুব সুন্দরভাবে জিজ্ঞেস করলো, বলো, ‘কে তোমাকে ফুসলিয়েছে? আমরা তার হাড় গুঁড়ো করে দেবো এবং তোমাকে ছেড়ে দেবো।’ ‘আমার অন্তরই আমাকে ফুসলিয়েছে, আমাকে ফুসলিয়েছে আমার স্রষ্টা ও সত্য’ আমি জবাব দিলাম। ‘দারোগা সাহেব, এই নিষ্পাপ ছেলেটিকে মুসলমানেরা যাদু করেছে। এটা রাম চন্দর না। এর ভেতর কোন মুসলমান লুকিয়ে আছে।’ এক হিন্দু চিৎকার দিয়ে বললো। দারোগা সাহেব আবার সুন্দরভাবে জিজ্ঞেস করলো, ‘দেখো বাবা, এই মুসলমানেরা খুবই চালাক ও ধূর্ত প্রাণী। আমাদের ছেলেদেরকে বেকুব বানিয়ে ছাড়ে। তুমি এখনো ছোট ছেলে এবং সাধাসিধা। ওদের চালাকি তুমি বুঝবে না। যদি ওরা টাকা পয়সার লোভ দেখিয়ে থাকে, তাও বলো।’ আমি বললাম, ‘আমাকে কোন মুসলমান টাকা পয়সার লোভ দেখায় নি। আমি সত্য জেনেই ইসলাম গ্রহণ করেছি।’ দারোগা বললো, ‘দেখো বাবা, ঐ মুসলমানদের খাতিরে নিজে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না। ওরা তোমাকে একা ফেলে যাবে। বিপদে তোমার কোন সাহায্য করবে না। বিপদের সময় নিজের ভাই বোনদেরই কাজে আসে। ভগবান থেকে ক্ষমা চেয়ে নাও। ভগবান খুবই ভালো। তিনি তোমাকে মাফ করে দেবেন। আমরা সবাই ভগবানের কাছে তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবো। আর ভগবানের অসন্তুষ্টি তোমার ধ্বংসের কারণ হতে পারে।’ আমি জবাব দিলাম, ‘আমি তোমাদের কোন ভগবানকে মানি না। তাদের রাজি খুশির কোন তোয়াক্কা আমি করি না। তোমাদের ভগবান শরীর থেকে মাছি পর্যন্ত তাড়াতে পারে না। সে আমার কী উপকার করবে? আমার জীবন মৃত্যু একমাত্র আল্লাহর হাতে। আমি তাঁকে রাজি খুশি করার জন্য চিন্তিত। আমি একমাত্র তাকেই ভয় করি।’ আমার কথা শুনে দারোগার পাশে বসা হিন্দুটি চিৎকার দিয়ে উঠলো! আমার গালে এতো জোরে চড় কষালো যে আমি পড়ে গেলাম। ‘নির্লজ্জ, ইতর, আমাদের সামনে আমাদের ভগবানের সাথে বেয়াদবি করছিস। তোর হাড় গুঁড়ো করে দেবো’, দারোগা চিৎকার করে বললো।
আমাকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে শক্ত লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করলো। আঘাতের তীব্রতা এতো বেশি ছিলো যে আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। কিন্তু পূর্ব থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। আমি জানতাম এটা আমার ঈমানের পরীক্ষা। আমি হযরত বেলাল, খুবাইব, সোহাইব (রা.)-এর নির্যাতন ও তাঁদের দৃঢ়তার কথা স্মরণ করলাম। কুরআনের সেই আয়াতটি আমার মনে পড়লো, যাতে আল্লাহ বলেছেন, ‘মানুষ কি মনে করে যে, আমারা ঈমান এনেছি, একথা বললেই তাদেরকে পরীক্ষা না করেই অব্যাহতি দেয়া হবে? আমি তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছিলাম। আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করেছেন কে সত্যবাদী আর কে মিথ্যাবাদী।’ (সূরা আনকাবুত : আয়াত ২-৩)
আমার কর্তব্য ছিলো সত্যতা প্রমাণ করার। তাই আমি আল্লাহর কাছে দৃঢ়তার প্রার্থনা করলাম, ‘হে আল্লাহ! আমি দুর্বল। এই জুলুম আর নির্যাতনে আমাকে দৃঢ় রাখো। তুমি আমাকে ইসলাম গ্রহণ করার তওফিক দিয়েছো। সুতরাং তুমি আমাকে তার সত্যতার সাক্ষ্য দেয়ারও তওফিক দাও।’ প্রতিটি আঘাতের সাথে সাথে আমার মুখ থেকে বের হচ্ছিলো, ‘হে আল্লাহ আমাকে সাহায্য করো।’
আল্লাহ শব্দ শুনে আঘাতের তীব্রতা আরো বেড়ে যেতো এবং ওরা ক্রোধে উম্মাদ হয়ে যেতো। আমি আশঙ্কা করছিলাম, হিম্মত হারিয়ে ফেলবো, জবাব দিতে পারবো না। তখন আল্লাহর এই বাণী মনে পড়লো, ‘যারা বলে আল্লাহই আমাদের রব, তারপর এই কথার অবিচল থাকে তাদের প্রতি ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, ভয় পেয়ো না, দুঃখ করো না এবং জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো। যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে। আমরা তোমাদের সাথে দুনিয়াতেও রয়েছি আখেরাতেও থাকবো।’ (সূরা হা-মীম আস-সাজদা : আয়াত ৩০-৩১) এই আয়াত থেকে আমি হিম্মত পেলাম।  প্রহারের যতোটুকু সাধ্য তাদের ছিলো ততোটুকুই তারা প্রয়োগ করলো এবং মারলো। এখনো মনে পড়ে, যখন ডা-া দিয়ে পায়ের তালুতে পেটাচ্ছিলো- তার স্ফুলিঙ্গ আমার চোখ দিয়ে ঠিকরে বেরুচ্ছিলো। আল্লাহর সাহায্য না থাকলে আমি সেই অসহ্য নির্যাতন সইতে পারতাম না।
মুসলমানরাও মামলা দায়ের করলো। যখন আমাকে দেখার জন্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো- তিনি আমাকে পাগল সাব্যস্ত করলেন এরপর জজ মামলা খারিজ করে দিলেন। তাঁরা উভয়ই গোঁড়া হিন্দু ছিলেন।
আমাকে দেড় মাস জেলখানায় রাখা হলো, যখনই আমি কিছু বলতে চাইতাম, দুই তিন সেপাই মিলে আমাকে পিটিয়ে অজ্ঞান করে ফেলতো। কখনো কখনো শয়তান আমাকে প্ররোচনা দিতো। ‘কী দরকার এতো কষ্ট করে, দ্বিতীয় বার হিন্দু হয়ে গেলেই পারো।’ তখন আমি আল্লাহর কাছে আরো বেশি দোয়া করতাম। ‘হে পরোয়ারদিগার, আমাদের অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালিত করার পর বাতিল পথে ফিরিয়ে নিয়ে যেয়ো না। তোমার পক্ষ থেকে আমাদের রহম করো। নিশ্চয় তুমিই দাতা।’ এ ছাড়া যে দোয়া মনে পড়তো সেই দোয়াই করতাম।
দেড়মাস পর আমাকে হিন্দুদের জিম্মায় দিয়ে দেয়া হলো। তারা আমাকে আমার মা-বাবার মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু আমাকে দ্বিতীয় বার হিন্দু হতে রাজি করাতে পারলো না। শেষে তারা আমাকে হত্যা করার ফন্দি আঁটলো। আমি ভাবলাম, আমার পরিণতি আরমিলার মতোই হবে। ওরা আমাকে কী কী নির্যাতন করবে সেকথাও চিন্তা করলাম। আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম, তিনি যেন আমাকে হিম্মত ও অবিচলতা দান করেন।
আমি হিন্দুদের হাত থেকে পালাতে চাইলাম, কিন্তু ওরা আমাকে ধরে ফেললো এবং জোরে মারতে লাগলো। এটা আমার জন্য নতুন নয়। দেড় মাস আমার সাথে একই আচরণ করা হয়েছে। কিন্তু এবার ওরা মারার জন্য উঠে পড়ে লাগলো। কেউ চুল ধরে টানছে, কেউ কিল ঘুসি মারছে, কেউ লাঠি দিয়ে পিটাচ্ছে, কেউ পিঠের উপর দাঁড়াচ্ছে এবং কেউ কেউ গালি দিচ্ছে। পরিচিত অপরিচিত সবাই ছিলো। শুধু আমার ভাবীমা খুনি
হিন্দুদের হাত থেকে আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন। আর মুসলমানরা ছিলো অসহায়। পুলিশের ভয়ে তারা আমাকে সাহায্য করতে পারছিলো না।
দূর দূর থেকে প-িত, ঠাকুর ও সাধুরা এসে আমাকে হিন্দু বানাতে চাইলো। আমাকে এতো বেশি প্রহার করা হলো যে, আমি বেহুঁশ হয়ে গেলাম। যখন হুঁশ ফিরে এলো তারা আমার গায়ে মোটা রশি বাঁধলো। আমাকে টেনেহিঁচড়ে মন্দিরে নিয়ে চললো। নির্যাতনের এই পর্যায়ে আমার মা বাবা ভাই বোনও আমার সাথে ছিলো। কিন্তু তারা আমার খুনপিয়াসি হয়ে উঠেছিলো।
তারা আমাকে রাস্তার উপর দিয়ে একটানা হিঁচড়ে নিয়ে চললো। আমার পিঠে প্রচ- রকম ক্ষত হয়ে গলো। আমি কখনো অজ্ঞান হচ্ছিলাম কখনো জ্ঞান ফিরে পাচ্ছিলাম। আমি জানি না, তারা কেন আমাকে হত্যা করার পূর্বে এতো কষ্ট দিচ্ছে? কেননা আমাকে আরামিলার মতো জ্বালিয়ে দিচ্ছে না? যাতে আমি মুহূর্তেই মরে যেতে পারি এবং আমার প্রাণ মুক্তি পায়। আমি তাদের কাছে এক দুর্বল শিকার। ওরা আমাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে। অট্টহাসি দিচ্ছে আর মুসলমানদের জঘন্য গালিগালাজ করছে।
সেই নির্যাতনের কথা আমি চিন্তাও করতে পারি না। ইসলাম গ্রহণের অপরাধে যা আমার উপর বর্ষিত হয়েছিলো। আমার অবস্থা খুবই খারাপ ছিলো। রাস্তার কংকর ও কাঁটা আমার শরীরে বিঁধে গিয়েছিলো। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম, ‘হে আল্লাহ! আমার মৃত্যু সহজ করে দাও। ঈমানের সাথে আমার জীবনের ইতি টেনে দাও। হে আল্লাহ! আমাকে এই নির্যাতন থেকে মুক্তি দাও।’ সেই অবস্থায়ও আমি কালিমা তাইয়িবার জিকির করছিলাম। আমি শান্তি পাচ্ছিলাম এবং আমার মনে হচ্ছিলো আমার কোন কষ্ট নেই। ওরা আমাকে শংকর মন্দিরের কাছে নিয়ে এলো। এটা আমাদের বাড়ি থেকে সোয়া কিলোমিটার দূরে। মন্দিরের পাশে একটি পুকুর ছিলো। সেখানে ছিলো শ্মশানঘাট। হিন্দু মড়া পোড়ানো হতো। আমি ভাবলাম, হিন্দুরা এখন আমাকে পোড়াবে। আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের আনন্দ আমার শরীরে প্রবাহিত হলো। অন্য এক জগৎ আমার চোখে ভেসে উঠলো। আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ! আমাকে জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচাও। রাসূলের শাফাআত এবং তোমার দিদার নসিব করো।’
মন্দিরের ভেতর নিয়ে গিয়ে আমার কাপড় খুলে ধুতি পরিয়ে দেয়া হলো। মন্দিরের ছাই আমার শরীরে মাখা হলো এবং মাথায় তিলক দেয়া হলো। ওরা আমার মাথা মু-ন করে টিকি রেখে দিলো। শূকরের দু’টি বাচ্চা জবাই করে তাদের রক্ত দিয়ে আমাকে গোসল করালো। এরপর প-িত এলো এবং রামায়ণ পড়তে শুরু করলো। এসব দেখে আমি ভাবছিলাম, হিন্দুরা আমাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার আগে তাদের সংস্কার পালন করছে। কিন্তু হঠাৎ প-িত ঘোষণা করলো, ‘মুহাম্মদ আলি এখন রাম চন্দর হয়ে গেছে।’ এই ঘোষণায় হিন্দুরা খুশি হয়ে উঠলো এবং মিষ্টি বিতরণ করলো।
এই ঘোষণা আমার প্রত্যাশিত ছিলো না। আমি মরে যেতে রাজি আছি, হিন্দুর জীবন-যাপন করতে রাজি নই। রাম চন্দর হয়ে এক মুহূর্ত বাঁচার ইচ্ছা আমার নেই। মুহাম্মদ আলি হয়ে হাজারবার মৃত্যুর আকাক্সক্ষা আমার আছে। এই ঘোষণা আমার কাছে পূর্বের সকল নির্যাতনের চেয়েও তীব্র ছিলো। হিন্দুদের অট্টহাসি আমার বুকে খঞ্জর হয়ে বিঁধছিলো। আমি চিৎকার করে বললাম, ‘হিন্দুরা শোনো, তোমরা আমাকে দ্বিতীয়বার হিন্দু বানাতে পারবে না। আমি এক আল্লাহকে ছেড়ে পাথরের মূর্তির সামনে সেজদা দিতে পারবো না। আমি ঘোষণা করছি আমি মুসলমান। আমাকে মুসলমানদের কাছে যেতে দাও।’
একথা শোনার পর ওরা আমাকে মারতে শুরু করলো। রাত পর্যন্ত মারলো। রাতে ওরা আমাকে মন্দিরে বেঁধে রেখে সবাই বাড়িতে চলে গেলো। বাঁধার সময় প-িত বললো, ‘তুমি ভগবানের শত্রু। তার শক্তিকে অস্বীকার করো। দেবতাদের মন্দ বলো। তাদের আদেশে আজ রাতে জিন-ভূত এসে তোমাকে খেয়ে ফেলবে। ‘যদি রাম চন্দর হতাম তাহলে সম্ভবত খেয়ে ফেলতো। আল্লাহর কসম, আমি এখন মুহাম্মদ আলি। জিন ভূত আমার নাম শুনেই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।’ আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেলো।
মন্দিরে মহাকালীর ভয়ঙ্কর মূর্তি ছিলো। এছাড়াও গণেশ ও শ্রীকৃষ্ণের মূর্তি ছিলো। গাইমাতার মূর্তিও ছিলো। পরিবেশ এতোই ভয়নাক ছিলো যে, মুসলমান হওয়ার আগে হলে ভয়ে কয়েক মুহূর্তেই মারা পড়তাম। এখন আমার বিশ্বাস, পাথর আর মাটির মূর্তি আমার কিছুই করতে পারবে না। এই বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও আমার একটু একটু ভয় হলো। কেননা বিগত জীবনে ভগবান মনে করে এগুলোর পূজা করেছি এবং এদের অস্বাভাবিক ঘটনার কথাও শুনেছি।
আমার সারা শরীর ক্ষত-জখমে ভরপুর ছিলো। শরীরের প্রতিটি পশম থেকে যন্ত্রণা বেরুচ্ছিলো। শুয়ে ঘুমানোর কোন অবস্থাই ছিলো না। কিন্তু আল্লাহ আমার চোখে ঘুম টেনে দিলেন এবং যন্ত্রণা থেকে বাঁচালেন।
পরদিন হিন্দুরা আমাকে জীবিত দেখে হতভম্ব হয়ে গেলো। কিন্তু ওদের ভাগ্যে সত্যপথ ছিলো না। ওরা বলতে লাগলো, ‘ভগবান আজকে তোমাকে রহম করেছেন। হিন্দু যদি না হও তাহলে আজ রাতে তোমাকে পুড়ে ছাই বানিয়ে ফেলবেন।’ ওদের কথা শুনে আমি হাসলাম। বললাম, ‘এই সব পাথর মাটির মূর্তি আমার কিছুই করতে পারবে না। কিন্তু তোমরা যদি জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চাও তাহলে ইসলাম গ্রহণ করো।’ ওরা আমার কথা শুনে মারতে লাগলো। আমি ভাবলাম, এখানে আমার কোন সাহায্যকারী নেই। কিন্তু অন্তর সাক্ষ্য দিয়ে বললো, আল্লাহ তো রয়েছেন। তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু এবং সর্বশ্রেষ্ঠ হেফাজতকারী।
শেষের চব্বিশ ঘণ্টা আমি কিছুই খাই নি এবং ওরা আমাকে কিছু খেতেও দেয় নি। আল্লাহই আমাকে এই ক্ষুধা সহ্য করার শক্তি দিয়েছেন। আমার মা বাবা ভাই বোন হিন্দুদের সাথে আমাকে মারার জন্য সবসময় তৎপর ছিলো। শুধু আমার ভাবীমা আমার প্রতি দয়া দেখিয়েছেন। তিনি এই জালেমদের হাত থেকে আমাকে রক্ষা করার জন্য চেষ্টা করেছেন। তিনি চেষ্টা করে জেলখানা থেকে মুক্ত করে এনেছেন। তিনি বিশেষ চেষ্টা করে হিন্দু প-িত ও পূজারীদের থেকে আমাকে খাবার দেয়ার অনুমতি এনেছেন। এজন্য তিনি অনেক মিথ্যা বলেছেন। আমার ভাইও তাঁকে মারতে চেয়েছে। তিনি দয়ালু বোন এবং স্নেহময়ী মায়ের প্রতিমা। তিনিই সকাল সন্ধ্যায় মন্দিরে এসে আমাকে খাবার দিয়ে যেতেন।
আমার অবস্থা এতো নাজুক ছিলো যে, দিনে না বসে থাকতে পারতাম রাতে না শুনে পারতাম। শরীরের ক্ষতগুলো ছড়িয়ে যাচ্ছিলো এবং রস ঝরছিলো। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম, ‘হে আল্লাহ! যদি আমার হায়াত থাকে তাহলে এই জালেম কাফেরদের থেকে আমাকে মুক্তি দাও। এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে আমাকে উদ্ধার করো। আর যদি হায়াত না থাকে তাহলে তোমার সাথে সাক্ষাতের সুযোগ দাও।’ এই দোয়া করার পর আমার মাথায় পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা এলো। মন্দির থেকে পালানো কষ্টকর হলেও অসম্ভব ছিলো না। পরীক্ষা করে দেখলাম, মূর্তির উপর চড়ে উপরের খিড়কি পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া যাবে। একটি রশি হলে তার একপ্রান্ত মূর্তির গলায় বেঁধে অপরপ্রান্ত খিড়কি দিয়ে ঝুলিয়ে দিয়ে তাতে লটকে আরামের সাথেই বের হয়ে যাওয়া যাবে। আমি ভাবী থেকে সাহায্য নেবার সিদ্ধান্ত নিলাম। তিনি খাবার দিতে এলে আমার ইচ্ছার যথা জানালাম। তিনি বললেন, ‘ভগবানের মাথায় চড়ে পালিয়ে যাবে?’ সাথে সাথেই আবার বললেন, ‘তোমার মুক্তির জন্য আমার যা কিছু করা দরকার সব করবো।’ রাতে খাবার দিতে আসার সময় ভাবী রশি নিয়ে এলেন। আমি বললাম, ‘ভাবী! আমার জন্য এতো কষ্ট করলেন, আরেকটু কষ্ট করেন। অমুক মুসলমান ভাইকে খবর পৌঁছে দেবেন, আমি আজ রাত এখান থেকে পালিয়ে যাবো এবং পীপল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকবো।’ ভাবী আমার পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে খুশিও হলেন, দুঃখও পেলেন। তিনি যেতে যেতে বললেন, ‘রাম চন্দর!’ ‘না ভাবী, আমার নাম মুহাম্মদ আলি,’ আমি শুধরে দিলাম। ভাবী বললেন, ‘ঠিক আছে মুহাম্মদ আলিই সঠিক। তুমি আমার কাছে সহোদর ভাইয়ের থেকেও প্রিয়। আমার কষ্ট হচ্ছে তুমি এখান থেকে পালিয়ে গেলে জীবনে হয়তো তোমার সাথে দেখা আর নাও হতে পারে। কিন্তু তোমার এই দুরবস্থাও আমি সহ্য করতে পারছি না। তোমার শরীরে যতোগুলো আঘাত লেগেছে তার চেয়ে বেশি আঘাত লেগেছ আমার হৃদয়ে। মুহাম্মদ আলি, আমি তোমার জন্য প্রতি রাতই কেঁদেছি। আমি তোমার ভাই মা বাবাকে অনেক বুঝিয়েছি কিন্তু তারা শোনে নি। তুমি চলে গেলে তোমাকে আমার অনেক মনে পড়বে। তবে আমি খুশি যে, তুমি এই নির্যাতন থেকে মুক্তি পেতে যাচ্ছ। ভগবান তোমার মঙ্গল করুন।’ ‘ভগবান নয়, আল্লাহ বলুন ভাবীজান,’ আমি বললাম। তিনি হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে, আল্লাহই বলছি।’
এরকম স্নেহময়ী ভাবী থেকে বিচ্ছিন্ন হতে অনেক কষ্ট হচ্ছিলো। তিনি চলে যাচ্ছিলেন, আমি ভাবলাম, তার সাহায্যের জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো দরকার। আমি ডাকলাম, ‘ভাবী, শুনুন।’ তিনি এলে বললাম, ‘ভাবীজান, বিপদের সময় যখন মা বাবা ভাই বোন সবাই আমাকে ছেড়ে চলে গেলো এবং রক্তপিপাসু হয়ে উঠলো তখন আল্লাহর পর একমাত্র আপনিই আমাকে সাহায্য করেছেন। আমার বুঝে আসছে না, আমি কী বলে আপনার শোকর করবো। আমি আপনার এই ভালোবাসা আর স্নেহ জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মনে রাখবো। আমার জন্য আপনি যেভাবে মার খেয়েছেন, কষ্ট করেছেন, তার ঋণ কোনদিন শোধ করতে পারবো না।’ আমি দেখলাম, ভাবীর চোখ থেকে দরদর করে পানি নামছে। তিনি আঁচল দিয়ে মোছার চেষ্টা করছেন। আমার চোখেও পানি এলো। আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ভাবীর কান্নার আওয়াজে থেমে গেলাম। তিনি কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলেন। মহাকালীর বিরাট জিহ্বা বেরিয়ে ছিলো। আমি তাতে রশি বেঁধে খিড়কি দিয়ে বাইরে পালিয়ে গেলাম। পালাবার সময় আমার ইবরাহিম আ.-এর কথা মনে পড়লো। লোকেরা ঈদগাহে চলে যাওয়ার পর তিনি মূর্তিগুলো ভেঙ্গে ফেলেছিলেন। আমিও সুন্নতে ইবরাহিম পালন করতে চাইলাম। একটি ইট তুলে নিয়ে কোনটার নাক কোনটার কান, কোনটার হাত ভেঙ্গে দিলাম। কোনটার চোখ নষ্ট করে ফেললাম।
গভীর রাতে আমি খিড়কি দিয়ে ঝুলে রশি ধরে বাইরে বেরিয়ে এলাম। মুসলমান ভাই পীপল গাছের কাছে আমার অপেক্ষায় ছিলেন। আমার শরীরে শুধু একটি ধুতি ছিলো। আমি সংক্ষেপে তাঁকে আমার অবস্থা বর্ণনা করলাম। তিনি আমাকে তার গাড়িতে চড়িয়ে জৌনপুরের রিয়াজুল উলুমে নিয়ে এলেন। এটা আমাদের গ্রাম থেকে একশ কিলোমিটার দূরে ছিলো। মাওলানা হালিম সাহেব সে মাদরাসার মোহতামিম ছিলেন। কিছু দিন তাঁর কাছে থেকে তাঁর আদেশেই মোম্বাই চলে গেলাম। সেখানে হাজী শামসুদ্দীন সাহেব-এর কাছে উঠলাম। তিনি আমাদের গ্রামে থাকতেন এবং আমাদের প্রতিবেশি ছিলেন। দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে ফারেগ হয়েছেন। মোম্বাইয়ে তাঁর বিরাট বড়ো ব্যবসা রয়েছে। তিনি জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ-এর নেতা এবং তয়্যিবা কলেজ, মদনপুর-এর কমিটির সেক্রেটারি।
আমার শরীরে ক্ষত ছিলো। তিনি সাথে সাথে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করালেন। আমার পিটে কয়েকটি অপারেশন করে কংকর ও কাঁটা বের করা হলো। ইত্যবসরে আমার খৎনাও হলো। ছয়মাস আমি হাসপাতালে কাটালাম। হাজী শামসুদ্দীন সাহেবের কাছে প্রায় একবছর থাকলাম। এরপর দারুল উলুম এমদাদিয়ায় ভর্তি হলাম। তিন বছর সেখানে ছিলাম। তিন বছরে ইবতেদায়ি উর্দু, কুরআন নাযেরা এবং প্রথম শ্রেণীর পরীক্ষা পাস করলাম।
এই সময়ে ভাবীকে বারবার মনে পড়ছিলো। কিন্তু তার সাথে সাক্ষাৎ করার কোন সুযোগ ছিলো না। বাড়ির লোকেরা আমার ঠিকানা জেনে ফেললে এখানে ধাওয়া করবে। আমাকে দ্বিতীয়বার হিন্দু বানানোর খায়েশ তাদের এখনো মেটে নি। একদিন শুনলাম, হাজি সাহেব গ্রামে যাচ্ছেন। ভাবীর নামে একটি চিঠি তাঁকে দিয়ে সতর্ক করে দিলাম কেউ যেন না জানে।
আমি জানি না, বাড়ির লোকেরা কীভাবে আমার ঠিকানা জেনে গেলো। তারা অন্যান্য হিন্দুদের সাথে নিয়ে আমাকে ধরতে এলো। পুলিশ তাদের ইশারায় মাদরাসা ও হাজি সাহেবের বাড়িতে চক্কর দিতে লাগলো। এই অবস্থা দেখে হাজি সাহেব অন্য আলেমদের সাথে আমার ব্যাপারে পরামর্শ করতে বললেন। আলোচনা শেষে আমাকে পাকিস্তান পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্দান্ত হলো। সকলে বললেন, প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক খুবই দীনদার ব্যক্তি। বিপদের সময় একজন নওমুসলিমকে অবশ্যই তিনি সাহায্য করবেন।
১৯৮৬ সালের ১৮ ই মে আমি পাকিস্তান চলে গেলাম। পাকিস্তানের ইসলাবাদের কেন্দ্রীয় মসজিদের খতিব মাওলানা আবদুল্লাহ আমার জিম্মাদার হলেন। ইসলামাবাদেই আমি দীনি শিক্ষা নিতে শুরু করলাম। মাওলানা আবদুল্লাহ সাহেব প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের সাথে আমার সাক্ষাৎ করালেন। ইসলামাবাদে ওলামা মাশায়েখদের কনফারেন্স ছিলো। সেখানে আমিও শরিক ছিলাম। মাওলানা আবদুল্লাহ আমাকে প্রেসিডেন্ট সাহেবের কাছে নিয়ে গেলেন এবং তাঁকে আমার ব্যাপারে বললেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আমার ইসলাম গ্রহণের কথা শুনে খুবই খুশি হলেন। আমি পাকিস্তানের ন্যাশনালিটির কথা বললে তিনি সাথে সাথে চিরকুট লিখে দিলেন।
আমি প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক-এর ইসলাম প্রিয়তা সম্পর্কে যা শুনেছিলাম তার চেয়ে বেশি দেখতে পেলাম। সত্যিই তিনি মহান ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ শাসক ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight