মুঠোফোনও হতে পারে মারণাস্ত্র: আবদুল হান্নান জুলফিকার

বর্তমান সমাজের চিত্রটি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে আমরা পরস্পরকে ভালোবাসার চেয়ে নিজের মুঠোফোন বা মোবাইল ফোনকেই বেশি ভালোবাসি। প্রতিদিন খাবার খেতে ভুলে গেলেও অথবা অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাগজ নিতে ভুলে গেলেও; মোবাইল ফোন সঙ্গে থাকবেই। মুঠোফোন ছাড়া জীবন কাল-কুঠরিতে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকা কয়েদীদের জীবনের মতো।
মুঠোফোন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তির কল্যাণে মুঠোফোন এখন শুধুই কথা বলার যন্ত্র নয়; এটি যেনো মানুষের সঙ্গী। নিঃসন্দেহে মুঠোফোনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কিন্তু সবসময় মুঠোফোন সঙ্গে রাখার কিছু কুফলও রয়েছে। যা আপনাকে বিপদগ্রস্ত করছে। আপনার অজান্তেই। বিজ্ঞানী এ্যালবার্ট আইনস্টাইনের বিখ্যাত উক্তি রয়েছে, আমি ভয় করি সেই সময়ের; যখন প্রযুক্তি মানুষের আবেগের জায়গা দখল করে নেবে এবং নিজেরা নিজেদের ধ্বংস করে দিবে।
এছাড়াও স্টিফেন হকিং বলেন, মানুষের স্থান আগামীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দখল করে নেবে। তখন মানুষের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যাবে। আস্তে আস্তে মানুষ পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার রোগ প্রতিরোধ মতা কমিয়ে ফেলে।
অবাক হওয়ার মতো হলেও অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে। সাধারণ মোবাইল ফোন সবসময়ই ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আবৃত থাকে। একটি পাবলিক টয়লেটের সিটে যে পরিমাণ জীবানু থাকে, একটি মুঠোফোনে সাধারণত এর থেকে বেশি জীবানু থাকে। লন্ডন স্কুল অব হাইজিন এর এক গবষেণায় এমন তথ্যই উঠে এসেছে। ড. রন কার্টলার বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, বেশির ভাগ মানুষই দাবি করে তারা নিয়মিত হাত পরিষ্কার করে। কিন্তু বাস্তবতা একদমই ভিন্ন। এছাড়াও অতিরিক্ত মুঠোফোনের ব্যবহার যার্শেস, ডার্মাটাইটিস এর মতো সমস্যাও সৃষ্টি করে থাকে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞের মতে, মানবদেহসহ পুরো পৃথিবী একটি নির্দিষ্ট ছন্দে চলতে থাকে। মোবাইল ফোন সেই ছন্দের ব্যাঘাত ঘটায়। ফলে শুধু মানবদেহে নয়; নষ্ট হচ্ছে পুরো প্রকৃতিও। শরীরের রোগ প্রতিরোধ মতা কমে গেলে ক্যান্সারেরও সম্ভাবনা থাকে। তাই এরপরে যখন আপনার সর্দি-কাশি বা জ্বর আসবে তাহলে তখন কিছু দোষ আপনার মুঠোফোনকে দিলেও দিতে পারেন। মুঠোফোন মানুষকে অসামাজিক করে  তোলে। প্রযুক্তি আমাদের দিয়েছে  বেগ; কেড়ে নিয়েছে আবেগ। একটি সময় ছিলো যখন বাসায় পরিবারের প্রতিটি মানুষ কিংবা আড্ডায় বন্ধু-বান্ধব এক সঙ্গে হয়ে গল্পে মশগুল থাকতো। পরস্পরের মধ্যে একধরনের সম্পৃক্ততা থাকতো। গড়ে উঠতো একটি আত্মার সর্ম্পক। কিন্তু এখনকার দৃশ্যপট ভিন্ন। যে কোনো উৎসবে, আড্ডায় এখন কথা কম, মোবাইলের বোতাম চাপার আওয়াজই বেশি শোনা যায়। অতিরিক্ত মুঠোফোনের ব্যবহার মানুষের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য সাধন করলেও সামাজকিতার দিক থেকে আমাদরে অসামাজিক করে তুলেছে।
অতিরিক্ত মুঠোফোনের ব্যবহার মানুষকে সমাজ বিরোধী আচরণে উদ্বুদ্ধ করে। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় এমন তথ্যই উঠে এসেছে। অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীরা নানান সেবামূলক, দানশীলতা বা চ্যারিটির মতো কাজে অন্যদের থেকে পিছিয়ে থাকেন। কারণ বাকী সবার সাথে তাদের সম্পৃক্ততা খুব একটি হয়ে উঠে না। ইউনিভার্সিটি অব মারিল্যান্ডের গবেষণায় এই সব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষক অজয় আব্রাহাম বলেন, যারা মোবাইল ফোন নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকে তারা যেনো নিজেরাই নিজেদের জগত করে নেয়। সেখানকার উদ্দেশ্য হাসিল করাই যেনো প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাই আশপাশের মানুষদের সাথে খুব বেশি সম্পৃক্ততা হয়ে উঠে না। ফিলি ম্যাগের একটি রিপোর্টের মতে, প্রায় ১৩ শতাংশ লোক নিজেদের মুঠোফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকার অভিনয় করে। যাতে তার আশেপাশের লোকের সাথে কথা না বলতে হয়। চারপাশে যদি মধ্য বয়স্ক লোকেরা থাকে, তাহলে প্রায় ৩০ শতাংশ লোক নিজেদের মোবাইল ফোন নিয়ে অভিনয় করে ব্যস্ত থাকার। প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ মুঠোফোনে কথা বলার চেয়ে ছবি তোলা বা মেসেজ করাতেই বেশি ব্যস্ত থাকে। প্রায় ৪৪ শতাংশ লোকে ব্যস্ত থাকে মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারের কাজে। এছাড়াও মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো আপনার গোপনীয় ফোনালাপ রেকর্ড করে রাখার মতা রাখে। তাই গুরুত্বপূর্ণ কোনো আলাপ মোবাইল ফোনে আলোচনা না করারই পরামর্শ দেয় বিভিন্ন সমাজকর্মীরা। মাত্রাতিরিক্ত মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারে শরীরে প্রচন্ড ব্যথা। আপনার কি ঘাড় ব্যথা করে? অথবা প্রচন্ড মাথা ব্যথা অথবা পিঠের ব্যথা? আপনি যদি এই ধরনের ব্যথা অনুভব করে থাকেন তবে আজই নিজের মোবাইল ফোনের পেছনে সময় ব্যয় করা কমিয়ে দিন। নিউ ইয়র্ক স্পাইন সার্জারি বিভাগের চীফ কিনেথ হান্সরাজ বলেন, সাধারণভাবে মানুষ মাথা দিয়ে ১০-১২ পাউন্ড ওজন বহন করতে পারে। কিন্তু মানুষ যখন ঘাড় নিচু করে মুঠোফোন ব্যবহার করে তখন ঘাড়ে বাড়তি চাপ পড়ে। প্রায় ৬০ পাউন্ড ওজন বহন করার মতো এ চাপ। এর মানে মানুষ যখন মাথা নিচু করে মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকে, তার ঘাড়ে প্রায় ৮ গ্যালন পানি ভরা কলসের চাপ সে বহন করে। ঘাড় ব্যথা ছাড়াও মাথা ব্যথা, পিঠে ব্যথা এমনকি অর্থারাইটিসের মতো রোগও হতে পারে। কিন্তু এর থেকে রেহাই পাওয়ার পথও দেখিয়ে দিয়েছেন কিনথে হান্সরাজ। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, মোবাইলফোন ব্যবহার করার সময় নিজের দেহভঙ্গির অবস্থান পরিবর্তন করলেই হবে। ছোটবেলায় যেভাবে  সোজা হয়ে বসতে বলা হতো ঠিক  সেভাবেই। অতিরিক্ত মোবাইল ফোনের ব্যবহার ব্রেইন টিউমারের কারণও হতে পারে। ইতালির এক ভদ্রলোক এক কোম্পানিতে চাকরি করতেন। চাকরির খাতিরে তিনি প্রায় ১২ বছর ধরে প্রতিদিনি গড়ে ৬ ঘণ্টা করে ফোনে কথা বলতেন। একসময় তার ব্রেইন টিউমার ধরা পড়ে। এরপর তিনি তার কোম্পানিকে দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি মামলা করেন। কারণ অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণেই তার ব্রেইন টিউমার হয়েছে বলে জানা যায়। স্বাভাবিকভাবে তিনি মামলাটি জিতেও যান। ইউনিভার্সিটি হসপিটাল অব ওবরেও-এর প্রফেসর লের্নাট হার্ডলে বলেন, অতিরিক্ত মোবাইল  ফোনে কথা বলা মানুষদের ব্রেইন ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এক গবেষণায়  দেখা গেছে প্রতিদিন শুধু ৫০ মিনিট  মোবাইল  ফোন ব্যবহার করলেও তা আপনার মস্তিষ্কের ওপর  নেতিবাচক প্রভাব  ফেলবে। শ্রবণশক্তিকে দুর্বল করে দেয়।
অতিরিক্ত মোবাইল ফোনে কথা বলা শ্রবণশক্তির জন্যও মারাত্মক তিকর। এমনটি জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। আমেরিকান একাডেমী অব ওটাল্যারঙ্গিওলজি’র ড. নারেশ পান্ডে বলেন, যারা প্রায় ৪ বছর ধরে নিয়মিত এক ঘণ্টার ওপর মুঠোফোনে কথা বলে তাদের হাই ফ্রিকোয়েন্সিতে শ্রবণশক্তি প্রবল থাকে না। এমনকি কানের অভ্যন্তরীণ নানান সমস্যারও  দেখা  দেয়। নারেশ পান্ডের মতে, অতিরিক্ত মুঠোফোনে কথা বললে কিছু ইংরেজি অর যেমন এস, এফ, টি জাতীয় অরগুলো শুনতে সমস্যা হয়। এছাড়াও কানে সর্বদা আওয়াজ বাজতে থাকে। যা অত্যন্ত তিকর। যদি ইতিমধ্যে এই সব লণ নিজের মধ্যে পেয়েছেন; তবে আজই মুঠোফোনের ব্যবহার কমানোর পরামর্শই দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। দৃষ্টিশক্তিকে দুর্বল করে  দেয়। মোবাইল ফোনের পেছনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা মানে দৃষ্টিশক্তিকে দুর্বল করে তোলা।  এমনটি মনে করনে   চোখের চিকিৎসকেরা। সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকা  চোখের জন্য ভয়াবহ তিকর একটি দিক। কিন্তু  মোবাইল  ফোনের দিকে সারাণ তাকিয়ে থাকাও চোখের জন্য কম তিকর নয়। ভিশন কাউন্সিলরের রিপোর্ট অনুযায়ী, মোবাইল  ফোনের দিকে অনেকণ তাকিয়ে থাকলে ডিজিটাল আই স্ট্রেইন-এর মতো সমস্যা  দেখা দিতে পারে। বিশ্বের প্রায় ৭৩ শতাংশ প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষেরা এই সমস্যায় ভুগছেন। চোখের এই  স্ট্রেইনের কারণে মাথা ব্যথা, চোখে শুষ্কতা, ব্লাড ভিশনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। চোখের এই সব সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অ্যান্টি রিফলেকটিভ লেন্স ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। হতাশা, বিষণœতার কারণ অতিরিক্ত মোবাইল ফোনের ব্যবহার মোবাইল ফোন মানুষকে হতাশা এবং বিষণœতায় ভোগায়। কেন্ট স্টেটের গবেষণার মতে, যারা দিনের বেশিরভাগ সময় মুঠোফোনের পেছনে ব্যয় করে তারা হতাশা, অবসাদ এবং বিষণœতায় ভোগে। সাধারণ মানুষের থেকে তারা কম সুখী। দীর্ঘ সময় নিয়ে মুঠোফোন ব্যবহার করলে ইনসোমনিয়ার মতো রোগও হতে পারে। সুইডেনের ইউনিভার্সিটি অব গোটেনবার্গ এর গবেষণা অনুযায়ী বিকেলের পর যত-বেশি মোবাইল  ফোনের ব্যবহার হবে, মানসিক অসুস্থতা ততোবেশি গ্রাস করবে। এক জরিপে প্রায় ৪ হাজার ১শ জনকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো তাদের ঘুমের সমস্যা নিয়ে। ফলাফলে দেখা যায়, যারা মোবাইল ফোনে বেশি সময় ব্যয় করে-তারা রাতেও অপোয় থাকে ফোন আসার। ফলে বিষণœতা এবং হতাশার সৃষ্টি হয়। অপরদিকে যারা মুঠোফোনে অন্যান্য কাজ করে অথবা কম্পিউটারে কাজ করে; তাদেরও ঘুমের সমস্যা হয়।
তাই এরপর থেকে ঘুমের সমস্যা হলে একবার ভেবে দেখবেন দিনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করছনে  কোন দিকে। পুরুষের শুক্রাণুর ঘনত্বকে কমিয়ে দেয়। অনেকেই মনে করেন মুঠোফোন শিশুদের জন্য তিকর। কিন্তু শুধু শিশু নয়; মুঠোফোন সন্তান নেয়ার পরিকল্পনাতেও ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। কিভল্যান্ড কিনিকের গবেষণার মতে, মোবাইল ফোন পুরুষের শুক্রাণুর ঘনত্বকে কমিয়ে দেয়। যা সন্তান নেয়ার সময় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কিভল্যান্ড কিনিকের মতে, প্রায় ১৫ শতাংশ দম্পতিরা বন্ধ্যাত্বের স্বীকার। ইলেক্টরোম্যাগনেটিক ওয়েভ, পুরুষ বন্ধ্যাত্ব এবং মোবাইল ফোনের সাথে এর সম্পর্ক নিয়ে গবেষণার সময় এইসব তথ্য উঠে আসে। শুক্রাণু সক্রিয়তা, ঘনত্ব, কার্যকারিতা নির্ভর করে মানুষটি কতণ তার মোবাইল সাথে রয়েছে। তাই সব দম্পতির উচিত মোবাইলকে বেশি সময় না দিয়ে নিজেদেরকে বেশি সময় দেয়া। ঘনবসতি দেশগুলোতে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত দেশগুলোতে মোবাইল ফোনের ব্যবহার ব্যাপক। কিন্তু এই সব অঞ্চলের দেশগুলোতে মোবাইল ফোনের ব্যবহার যতটুকু না প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি মর্যাদা তৈরির মাধ্যম।
এই কারণেই তৃতীয় বিশ্বে বিশেষ করে দণি এশিয়ার দেশগুলোকেই মোবাইল নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ব্যবসার ত্রে হিসেবে বেছে নেয়। যা যতটুকু আশীর্বাদ তার চেয়ে বেশি হুমকি স্বরূপ। এই মারণাস্ত্র মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ক্ষণিকের উদ্দেশ্য হাসিল হলেও; নিরবে ধ্বংস করছে পুরো সৃষ্টিকুলকে। তাই অচিরেই এমন দিন আসতে পারে যখন পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে মোবাইল ফোন মুক্ত দিবস বিশ্বব্যাপী পালন করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight