মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধা আজীবন / তানভির রহমান

আসরের নামাজ আদায় করার জন্য মসজিদে যাচ্ছিলাম। মাঠে চোখ পড়তেই দেখলাম আমাদের পাড়ার রাশেদকে ওর বাবা সাইকেল চালানো শেখাচ্ছেন। ওর বাবা সাইকেলের পিছনের সিটে ধরে দৌড়াচ্ছেন আর রাশেদ সাইকেল চালাচ্ছে। রাশেদের সাইকেল চালানো দেখে আমারও ছোটবেলার প্রথম সাইকেল চালানোর কিছু স্মৃতি মনে পড়ে গেল। সাথে কিছু ভাবনারও উদয় হল। আর সেই ভাবনাই চোখের কোণায় দু’ফোঁটা অশ্রু আর পৃথিবীর সব বাবা-মার প্রতি হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসার জন্ম দিল। রাশেদের মত আমিও আমার বাবার কাছ থেকে সাইকেল চালানো শিখেছি। প্রথম দিকে আব্বু সাইকেলের পিছনে ধরতেন। আর আমি সাইকেল চড়ে বসতাম। তারপর আব্বুর কথা মত সাইকেল চালানো শুরু করতাম। মাঝে মাঝে এমনও হত যে, আব্বু সাইকেল ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে প্রায় আধা কিলোমিটার অবধি চলে যেতেন। হঠাৎ করেই আব্বু সাইকেল ছেড়ে দিতেন। আর আমি কিছুদূর গিয়েই পড়ে যেতাম। তখন দেখতাম আব্বু দৌড়ে আসছেন। এভাবে প্রতিনিয়ত অনুশীলন করার পর আমি সাইকেল চালানো শিখেছি। শুধু রাশেদ বা আমিই নই, আমরা যারা সাইকেল চালাতে পারি আমাদের মধ্যে হয়ত শতকরা ৯০ জনই নিজেদের বাবার কাছ থেকে সাইকেল চালানো শিখেছি। সবার বাবাই সাইকেলের পিছনে ধরে অনেক দৌড়া-দৌড়ি করেছেন। মাঝে মাঝে তিনি সাইকেল ছেড়ে দিলে কিছুদূর যাওয়ার পর তাঁর স্নেহের ছেলেটি পড়ে যেত। তখন তিনি হয়ত ছেলের কাছে গিয়ে হাসিমাখা মুখে বলতেন, উঠে পড়, সাইকেল চালাতে হলে অনেক কষ্ট করতে হয়। শুধু সাইকেল চালনাই নয়, আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি সাহায্য করেন। বাবার সাথে আমাদের সকলেরই মা চেষ্টা করেন কীভাবে আমাদের জীবন সুন্দর করা যায়। আমাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করার জন্য তারা অকান্ত পরিশ্রম করেন। কিন্তু আমরা তাদের এই অকৃত্রিম ভালবাসার কতটা দাম দিই? সমাজের অনেক শিক্ষিত এবং বিত্তশালী লোক আছে যাদের বাবা-মা আজ বৃদ্ধাশ্রমে দিনাতিপাত করছেন। যদি তাদের জিজ্ঞাসা করা হয়, কেন আপনার বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখেছেন? হয়ত তারা বলবে, বাবা-মা এখন বৃদ্ধ হয়ে গেছে। তাঁদের সেবা-যত্ন করা কষ্ট। তাই বৃদ্ধাশ্রমে রেখেছি। কিন্তু আমাদের ভেবে দেখা উচিত, আমরা একদিন ছোট ছিলাম, আমাদের সেবা করতেও তাঁদের অনেক কষ্ট হয়েছে। কিন্তু তাঁরা আমাদের জন্য অন্যকোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। বরং তারা সীমাহীন স্নেহ-ভালবাসা দিয়ে লালন-পালন করেছেন। যদি তারা আমাদের লালন-পালন না করতেন তবে হয়ত ছোট শিশুদের লালন-পালনের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠত। কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। তাহলে আমাদের বাবা-মায়ের জন্য কেন বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠেছে?
আমরা কেন তাদেরকে স্নেহ-ভালবাসা দিতে পারি না? আমাদের ভেবে দেখা উচিত যে, আমি আমার বাবা-মাকে সেবা-যত্ন করছি না, একদিন যদি আমাকেও বৃদ্ধ হতে হয়, আর তখন যদি আমার সন্তান সেবা-যত্ন না করে সেদিন আমার কী অবস্থা হবে? আর বাবা-মায়ের সাথে এই অকৃতজ্ঞতামূলক আচরণের কারণে আখিরাতে আমার কী অবস্থা হতে পারে?
তাই আমাদের সকলেরই এই কথার উপর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া উচিত যে, আর কোন বাবা-মায়ের হাহাকার শুনব না, অকৃতজ্ঞ সন্তান হিসেবে সমাজে পরিচিত লাভ করব না। সবাই নিজেদের বাবা-মাকে আমরণ ভালবাসব। তাদের সেবা-যত্ন করব। ইনশাআল্লাহ তাহলে সমাজে কোন দুঃখ থাকবে না। আল্লাহ তাআলার আমাদেরকে সঠিকভাবে আমল করার তাওফীক দান করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight