মায়ের সাথে বেয়াদবীর ফল / মুহাম্মদ আতিকুর রহমান

গ্রীষ্মকাল, বেশ গরম, তাই আনিস সাহেব একটি চেয়ার নিয়ে বাইরে বসে আছেন। বাইরের ঠা-া বাতাস আনিস সাহেবের চোখে ঘুম এনে দিল। হঠাৎ তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। যখন চোখ খুললেন, দেখলেন তার সামনে একজন লোক বসে আছে। খুব জীর্ণ-শীর্ণ অবস্থা। দেখে মনে হচ্ছে অনেক দিন যাবৎ কিছু খায়নি। লোকটি আনিস সাহেবের নিকট খাবার চাইল। আনিস সাহেব ঘর থেকে খাবার এনে লোকটিকে দিলেন। লোকটির যখন খাবার শেষ হলো, তখন আনিস সাহেব তাকে বললেন, ভাই! কোথা থেকে এসেছেন? সে বলল, ভাই! আমার কোন ঘর-বাড়ি নেই। আমি আমার মায়ের সাথে বেয়াদবি করেছি, তাই আমার এ শাস্তি। আনিস সাহেব বললেন, আচ্ছা! আপনি আমাকে সব খুলে বলুন। লোকটি তার ঘটনা বিস্তারিত বর্ণনা করতে লাগল।
ছোট বেলা আমার বাবা মারা যায়, আমার মা অনেক কষ্ট করে আমাকে পড়া-লেখা করান। এভাবে তিনি আমাকে এস এস সি পাশ করান। তারপর উচ্চশিক্ষা লাভ করার জন্য তিনি আমাকে একটি বড় প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করেন।
আমার মা দিনের বেলা অন্যের বাসায় কাজ করতেন। আর রাতে সেলাই কাজ করে আমার পড়া-লেখার খরচ চালিয়ে যেতেন। এত কষ্ট করে আমার মা আমাকে লালন-পালন করেছেন, কিন্তু আমি তাঁর দুঃখ-কষ্ট বুঝতে পারি নাই, কত বড় হতভাগা আমি!
আমার মত হতভাগা মনে হয় আর নেই। তারপর আমার পড়া-লেখা শেষ হয়, এবং বড় একটি চাকরি হয়। এরপর বেশ কিছুদিন আমাদের অবস্থা ভালো ছিল। এভাবে আমাদের দিন চলতে থাকে। হঠাৎ অফিসের একটি মেয়ের সাথে আমার সম্পর্ক হয়ে যায়। এভাবে আমাদের সম্পর্ক চলতে থাকে। হঠাৎ তাকে বিয়ে করে ঘরে নিয়ে আসি। আমার মা আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি মা’কে বলি সে আমার স্ত্রী! আমার মা আমাকে খুব ভালবাসে, তাই কিছু বলেনি। এরপর থেকে শুরু হয় অশান্তি। আমার মা আর স্ত্রীর মাঝে প্রায়ই ঝগড়া হত। স্ত্রী যখন আমার কাছে নালিশ করত, তখন আমি স্ত্রীর পক্ষেই সায় দিতাম। আর মা’কে বকা-ঝকা করতাম। মা এসব সহ্য করতেন আর নিরবে কাঁদতেন। কিন্তু আমি আমার মায়ের কষ্ট বুঝতাম। কত হতভাগা আমি। এরপর একদিন আমার স্ত্রী নালিশ করল যে, আমার মা তাকে মেরেছে।  স্ত্রীর সৌন্দর্য আর হৃদয়মাখা কথা শুনে মা’কে আর জিজ্ঞাসা করলাম না যে কী হয়েছে। বরং তাঁকে নির্দয়ভাবে মারধর শুরু করি, সেই সাথে তাঁকে নিষেধ করে দিই যেন আর কোন দিন আমার স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া না করে।
ঐ দিন আমার মা খুব কাঁদে। কিন্তু আমার মন এত পাষাণ হয়ে গিয়েছিল যে, আমি একটি বারের জন্যও কাছে গিয়ে পাশে বসে এ কথা জিজ্ঞেস করিনি মা তোমার কি খুব ব্যথা লেগেছে? আহ! মা! আমার মা!
একদিন আমার স্ত্রী আমাকে বলল, তুমি কি আমাকে চাও? নাকি তোমার মা’কে? যদি তোমার মা’কে চাও, তাহলে আমি এ বাড়ি চলে যাব। আর যদি আমাকে চাও তাহলে তোমার মা’কে এ বাড়ি থেকে বের করে দাও। তখন আমি এত নিষ্ঠুর হয়ে গিয়েছিলাম যে, আমার বউ যা বলত আমি তাই করতাম। একটি বারের জন্যও ভাবলাম না যে, যে মা আমার জন্য এত কষ্ট করেছে, যে মা নিজে না খেয়ে আমাকে খাইয়েছে, সেই মা’কে আমি কিভাবে এত কষ্ট দিতে পারি। তারপর আমি স্ত্রীর কথা মত আমার মা’কে ঘর থেকে বের করে দিলাম। আমার মা অসহায়ের মত বাড়ি থেকে চলে গেলেন। তারপর আমার মা কত কষ্ট করেছেন, রাস্তায় রাস্তায় থেকেছেন, তারপর একটি কুঁড়েঘরে না খেয়ে বসবাস করতে লাগলেন। এবং আমার জন্য বদদোয়া করলেন যে, হে আল্লাহ! যে ছেলের জন্য আমি এত কষ্ট করেছি, সে ছেলে আমাকে এত কষ্ট দিয়েছে, এর বিচার তুমি করবে। শেষ পর্যন্ত আমাকে বদদোয়া দিতে দিতে এ পৃথিবীতে থেকে চলে যান। কত বড় হতভাগা আমি আমার মায়ের কাছে শেষ পর্যন্ত ক্ষমা চাওয়ারও সুযোগ পেলাম না।
যখন লোকেরা খবর দিলো তোমার মা মারা গেছে তখন আমি তাকে কবর দিয়ে এলাম। এরপর থেকে শুরু হয় আমার উপর আযাব। মায়ের বদদোয়া আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায়। প্রথমে আমার পায়ে একটা ফোঁড়া হয়। তারপর তা হতে প্রচ- ব্যাথা শুরু হয়। আস্তে আস্তে ফোঁড়া বড় হতে থাকে। আর ব্যথাও বাড়তে থাকে। আমি ডাক্তার দেখাই তাতেও কোন কাজ হয়নি। এভাবে আমার অসুস্থতা দিন দিন বাড়তে থাকে। আমি অনেক বড় বড় ডাক্তার দেখাই তাতেও কোন কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত আমার জমি-জমা সব বিক্রি করে আমার চিকিৎসা চালাই। আমার জমি যখন সব বিক্রি হয়ে যায়, তখন আমার স্ত্রী আমাকে বলে যে, আমি আর তোমার সঙ্গে সংসার করতে পারব না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কেন? আমার স্ত্রী উত্তর দিলো, তোমার কাছে এখন কিছুই নেই। তাছাড়া তোমার সেবা করতে করতে আমি অস্থির হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু তোমার রোগের ভাল হওয়ার কোন নামগন্ধও নেই। আমি স্ত্রীকে বললাম, দেখ তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। আর তোমার কারণে আমি আমার মা’কে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছি। এখন তুমি যদি চলে যাও, তাহলে আমার কী হবে? স্ত্রী উত্তর দিলো , আমি কিছু করতে পারব না। তোমার সংসার নিয়ে তুমি থাক, আমি চললাম। এ কথা বলে আমার স্ত্রী চলে গেল।
এখন আমি একা। আমাকে দেখার মত আর কেউ নেই। আমার স্মরণ হলো মায়ের বদদোয়ার কথা। আর স্মরণ এলেই কি হবে? যা হবার তা তো হয়েই গেছে। আমি দৌড়ে গিয়ে মায়ের কবরের পাশে কাঁদতে লাগলাম। এবং বলতে লাগলাম, মা! ও মা! আমাকে ক্ষমা করে দাও। মাগো আমাকে ক্ষমা করে দাও। এরপর চিকিৎসার জন্য আস্তে আস্তে আমার ঘর-বাড়ি বিক্রি করতে হলো, কিন্তু আমার চিকিৎসার কোন উন্নতি হলো না। অসুস্থতা দিন দিন বেড়েই চললো। এভাবেই আমার জীবন চলতে লাগলো। এখন আমি নিঃস্ব। আমি দিশেহারা। আমার দিন কাটে রাস্তায়। না খেয়ে, না পড়ে। এখন আমার প্রভুর কাছে দোয়া করি তিনি যেন আমাকে ঈমানের সাথে মৃত্যু দেন। কিন্তু আমার মৃত্যুও হচ্ছে না। এই হলো জীবনকাহিনী। আনিস সাহেব ঘটনাটি শুনে অনেক দুঃখিত হলেন, এবং লোকটির জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন।
তাই আমাদের উচিত মা-বাবাকে যথাযথ সম্মান করা। আমরা যেন কখনো আমাদের মা-বাবার সাথে মন্দ আচরণ না করি। কারণ তারা যদি একবার বদদোয়া দেন, তাহলে আমাদের জীবন ধ্বংস। আমরা সবসময় তাদের সেবা করব, এবং তাদের যেন কোনভাবেই কষ্ট না হয় সেদিক লক্ষ রাখব। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight