মায়ের পুষ্টি ।। ডা. নাজমা বেগম নাজু

সুস্থ-সবল শিশুর প্রধান ও প্রথম প্রয়োজন একটি পরিবার। একটি সমাজ ও একটি জাতি। যদি একটি সুস্থ-সবল শিশু পেতে চায়, তবে মায়ের পুষ্টির দিকে ভালোভাবে নজর দিতে হবে। সুস্থ জাতি গঠনে মায়ের পুষ্টি অপরিহার্য। একজন রুগ্ন, স্বাস্থ্যহীন মা- পরিবার, সমাজ ও জাতিকে একটি দুর্বল ও কম-জন্ম-ওজনের শিশু উপহার দেবেন। সে শিশুটির মৃত্যুহারও বেশি। তাছাড়া বেঁচে থাকলে বহু সমস্যা নিয়ে মরার মতো বেঁচে থাকে। পক্ষান্তরে একজন স্বাস্থ্যবতী পুষ্ট মা একটি সুস্থ, পুষ্ট ও সঠিক জন্ম- ওজনের শিশু পরিবার, সমাজ ও জাতিকে উপহার দেবেন।
বাংলাদেশে অপুষ্টি একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। ধনী গরিব প্রায় প্রতিটি পরিবারেই অপুষ্টি সমস্যা বিদ্যমান। আর এই অপুষ্টি সমস্যার প্রধান শিকার হ”েছ মা ও শিশু। পুষ্টিহীনতার কারণেই বাংলাদেশের মায়েদের গড় ওজন ও উ”চতা স্বাভাবিক গড় ওজন ও উ”চতার চেয়ে কম। আমাদের গর্ভবতী মায়েদের পুষ্টির অভাবেই বাংলাশে শতকরা ৫০% নবজাতক শিশুই স্বাভাবিক ওজনের (২.৫ কেজি) চেয়ে কম ওজন নিয়ে জন্মায়। কম জন্ম ওজনের শিশুদের মৃত্যর হারও বেশি। একটি কম জন্ম ওজনের শিশুকে এক ঝুড়ি সমস্যার সঙ্গে তুলনা করা যায়।
গর্ভবতী হওয়ার আগে মায়ের ওজন যদি ৪৫ কেজির নিচে থাকে তাহলে ওইসব মায়েদের কম জন্ম ওজনের শিশু জন্ম দেবার সম্ভাবনা বেশি। মায়ের পুষ্টির সাথে শিশুর জন্ম ওজনের এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশের বেশ ক’টি গবেষণায় দেখা যায়, যেসব গর্ভবতী মা গর্ভাবস্থায় কম ক্যালরি, কম আমিষ খেয়েছেন, তারা কম জন্ম ওজনের শিশু বেশি প্রসব করেন। তুলনামূলকভাবে ওইসব গর্ভবতী মা থেকে যারা ক্যালরি ও আমিষ খেয়েছেন তাদের শিশু অধিক পুষ্ট ও সাস্থ্যবান হয়।
কম জন্ম ওজন ছাড়াও যদি একটি সঠিক জন্ম ওজনের শিশুকে জন্মের পর থেকে প্রথম ৬ মাস পর্যন্ত সঠিকভাবে এবং সফলভাবে শুধু দুধ না খাওয়ানো হয় তাহলেও শিশুটি মারাত্মক অপুষ্টির শিকার হয়। মায়ের দুধ শিশুর শ্রেষ্ঠ খাবার। মায়ের দুধের বিকল্প, সমকক্ষ অথবা শ্রেষ্ঠ কিছুই নেই।
শিশুর জন্য দরকারি সব রকমের পুষ্টি উপাদানই মায়ের দুধে আছে।
আমাদের নবজাতক শিশুদের কম জন্ম ওজন প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে এবং জন্মের পর পূর্ণ ছয়মাস সফলভাবে শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে শিশুদেরকে মারাত্মক অপুষ্টি থেকে রক্ষা করার জন্যে গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়ের পুষ্টির গুরুত্ব অপরিসীম। একজন মায়ের গর্ভধারণের মূল উদ্দেশ্য হল পরিবার, সমাজ ও জাতিকে একটি সুস্থ, সবল ও সঠিক জন্ম ওজনের শিশু উপহার দেয়া, যে শিশুটি হবে আগামী দিনের সবল, সুস্থ, কর্মক্ষম নাগরিক।
১. কমপক্ষে একজন মায়ের গর্ভধারণ করার জন্য গর্ভপূর্ববর্তী ওজন ৪৫ কেজি হতে হবে। তাই গর্ভধারণের আগেই মায়েদেরকে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করে কাক্সিক্ষত ওজন লাভ করতে হবে।
২. গর্ভাবস্থায় মায়ের ১০-১২.৫ কেজি ওজন বাড়তে হবে। গর্ভবতী মায়ের ওজন গর্ভস্থ শিশুর পুষ্টির দিকনির্দেশনা দেয়। একজন গর্ভবতী মায়ের ওজন বাড়ার হার নি¤œরূপ।
* প্রতি মাসে গড়ে আধা কেজি করে বাড়ে প্রথম ৩ মাস। মোট প্রথম ৩ মাসে ১-২ কেজি ওজন বাড়ে।
* প্রতি মাসে ১-১.৫ কেজি ওজন বাড়ে পরবর্তী ৩ মাস (অর্থাৎ ৪র্থ মাস থেকে ষষ্ঠ মাস পর্যন্ত) মোট দি¦তীয় ৩ মাসে বাড়ে ৩-৪.৫ কেজি।
* প্রতি মাসে ১.৫-২ কেজি ওজন বাড়ে পরবর্তী শেষ ৩ মাস। ( অর্থাৎ ৭ম থেকে ৯ম মাস পর্যন্ত)। মোট তৃতীয় ৩ মাসে বাড়ে ৪.৫-৬ কেজি।
* সর্বমোট গর্ভাবস্থায় মোট বাড়ে ১০-১২.৫ কেজি। তবে কমপক্ষে গর্ভাবস্থায় মোট ৭ কেজি ওজন বাড়াতে হবে।
৩. মায়ের খাবার সুষম হতে হবে; যেমন শর্করা, আমিষ ও তেল জাতীয় খাবার। এছাড়াও খনিজ, ভিটামিন ও পানি থাকতে হবে। গর্ভবতী মায়ের সুষম খাবার খেতে হবে এবং স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি খাবার খেতে হবে। এতে করে গর্ভের সন্তান সুস্থ থাকে, স্বাভাবিকভাবে বাড়ে এবং মা নিজে সুস্থ থাকে, সুষম খাবার বলতে আমরা বুঝি শর্করা জাতীয় খাবার, আমিষ জাতীয় খাবার, ¯েœহ জাতীয় খাবার এবং ভিটামিন ও খনিজ।
শর্করা জাতীয় খাবার: ভাত, রুটি, আলো, সেমাই ইত্যাদি। শর্করা জাতীয় খাবার মায়ের শরীরে শক্তি জোগায়।
আমিষ: সব রকমের ডাল, সিমের বিচি, ছোট মাছ, শুটকি, ডিম, দুধ, ইত্যাদি। আমিষ মায়ের শরীরের ক্ষয় পূরণ করে এবং মায়ের পেটের শিশুর শরীর গঠনও বৃদ্ধি করে।
তেল জাতীয় খাবার: তেল, ঘি, মাখন, ইত্যাদি। তেল জাতীয় খাবার শরীরে শক্তি জোগায়।
খনিজ ও ভিটামিন: গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়ের জন্য খনিজ ও ভিটামিন খুবই দরকার। ভিটামিন ও খনিজ রোগ প্রতিরোধ করে।
খনিজ: লৌহ মায়ের শরীরে রক্ত তৈরি করে, ফলে শিশু মায়ের শরীর থেকে পুষ্টি লাভ করে। মায়ের শরীরে লৌহের অভাব হলে মা লৌহ ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতায় ভোগেন এবং মা কম ওজনের সন্তান প্রসব করেন। কম- জন্ম ওজনের সন্তান প্রসব প্রতিরোধ করার জন্য মাকে এই সময় লৌহসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। যে মহিলা গর্ভবতী নন তার প্রতিদিন যে পরিমাণ শরীওে লৌহ উপাদানের দরকার তার চেয়ে দ্বিগুণ বেশি দরকার একজন গর্ভবতী মায়ের শরীরে। কারণ মায়ের শরীরে শিশুটি পুষ্ট হ”েছ এবং দিনে দিনে বাড়ছে। একজন গর্ভবতী মায়ের প্রতিদিন ৩০ মিলিগ্রাম লৌহের প্রয়োজন। যে-সমস্ত খাবার বেশি পরিমাণ লৌহ উপাদান থাকে সেগুলো হল মাংস, মাছ, ডিম, গাঢ় সবুজ রঙের শাক, সজনে, কাঁচাকলা, ধনেপাতা, লেটুস, পুইশাক, ছোলার ডাল ইত্যাদি।
ক্যালসিয়াম: মায়ের পেটের শিশুর শরীরে হাড় গঠনে ক্যালসিয়াম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের খাবারে যদি ক্যালসিয়াম কম থাকে তাহলে শিশু মায়ের শরীর থেকে ক্যালসিয়াম গ্রহণ করবে। ফলে মায়ের শরীরে ক্যালসিয়াম ঘাটতি দেখা দেয়। একজন স্বাভাবিক মহিলার চেয়ে একজন গর্ভবতী মহিলার দ্বিগুণ বেশি পরিমাণ ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন হয়।
দুধ, দই, ডিম, কাটাসহ ছোট মাছ, শুটকি ইত্যাদি ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার। গর্ভাবস্থায় এসব খাবার মায়েদেরকে অবশ্যই খেতে হবে।
আয়োডিন: একজন মহিলা যিনি গর্ভবতী নন তার চেয়ে একজন গর্ভবতী মহিলার শতকরা ১৭% বেশি আয়োডিন প্রয়োজন। খাবারে আয়োডিনের অভাবে মায়ের পেটের শিশুর মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। আয়োডিনের অভাব হলে মায়ের গর্ভপাত হতে পারে’ মৃত সন্তান জন্ম দিতে পারেন, বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দিতে পারেন, এমনকি একটি হাবাগোবা (ক্রিটিন) শিশুর জন্ম দিতে পারেন।
ভিটামিন: গর্ভপাত মায়েদের ভিটামিন এ’ এর অভাব পূরণ হলুদ সবজি এবং হলুদ ফলমূল থেকে হবে। যেমন, গাজর, মিষ্টি কমড়া, পাকা পেঁপে, পাকা বেল, পাকা কাঠাল, পাকা আম ইত্যাদি।
ভিটামিন সি’ সবধরনের টক জাতীয় ফলে পাওয়া যায়। যেমন, কাঁচা আম, লেবু, বরই, আমড়া, বাতাবিলেবু, কামরাঙা, আমলকী, পেয়ারা, ইত্যাদি। ভিটামিন সি’ শরীরে লৌহ উপাদান কাজে লাগাতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, মা যদি অল্প অপুষ্টি বা মাঝারি অপুষ্টিতে ভোগেন তবে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে কোনো অসুবিধা হয় না। তবে যে মা মারাত্মক অপুষ্টিতে ভোগেন তার বুকের দুধের পরিমাণ এবং গুনগত মান কম থাকে।
তাই গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য কিছু পুষ্টিতথ্য আমাদের সবার জন্য প্রয়োজন:
১. গর্ভবতী ও স্তন্যদানকরা অবস্থায় মায়েদের স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি খাবার খেতে হবে। মায়েদের প্রতি বেলায় একমুঠো বেশি ভাত (ভাতের বদলে রুটি আলো) একমুঠো বেশি সবজি, দিনে এক কাপ ঘন ডাল খেতে হবে।
২. প্রতিদিন তাজা শাকসবজি ও হলুদ ফলমূল খেতে হবে।
৩. মায়েদের সবধরনের খাবারই খেতে হবে।
৪. আয়োডিনযুক্ত লবণ খেতে হবে।
৫. দিনে অন্তত ১-২ ঘণ্টা বিশ্রাম নিতে হবে।
৬. গর্ভাবস্থায় মায়েদেরকে ভারী কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।
গর্ভবতী মায়েদের যা জানতে হবে
গর্ভের ৪-৮ মাস সময়ের মধ্যে ১ মাস পরপর দুটি ও পরবর্তী গর্ভধারণকালে ১ টি বুস্টার টিটেনাল টক্সয়েড ইনজেকশন নেবেন, যা মা ও নবজাতক শিশুকে ধনুষ্টংকারের হাত হতে রক্ষা করবে।
গর্ভকালীন অবস্থায় মায়ের রক্তের ধনড় এবং ৎয পরিক্ষা করিয়ে নিতে হবে। মায়ের ৎয নেগেটিভ ব্লাড গ্রুপ হলে অবশ্যই স্ত্রী ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। গর্ভাবস্থায় হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ, প্রসাব পরীক্ষা, নিয়মিত ওজন ও ব্লাডপ্রেশার দেখা উচিত। কোনো গর্ভবতী মহিলার পায়ে পানি জমলে, চোখে দেখতে অসুবিধা, মাথা ঘোরা, রক্তের চাপ স্বাভাবিকের বেশি থাকলে ঝাড়ফুঁক, কবিরাজি ইত্যাদি অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পরিহার করে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তিপূর্বক চিকিৎসা করাতে হবে।
প্রসবের সময় এগিয়ে এলে অন্ততপক্ষে একবার হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ চেয়ে গর্ভের শিশুর অস্থান ও মায়ের শারীরিক অবস্থা জানা উচিত। ডেলিভারি স্বাভাবিক না হওয়ার ঝুকি থাকলে হাসপাতালে ভর্তিপূর্বক ডেলিভারি করাতে হবে। গর্ভকালীন সময়ে শারীরিক ও মানসিক বিশ্রামের খুব প্রয়োজন। স্বামী, শাশুড়ি, ননদ, আত্মীয়স্বজন প্রত্যেকের সহানুভূতি থাকা উচিত।
মেয়েসন্তান না ছেলেসন্তান হল তার জন্য মা কোনোভাবে দায়ী নন, এটি ¯্রষ্টার ইচ্ছে। #

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight