মানব হত্যার ভয়াবহ পরিণাম / মুফতী পিয়ার মাহমুদ

তাবৎ দুনিয়া আজ বদ্ধভূমি। জল-স্থল সর্বত্রই শুধু লাশ আর লাশ। কখন কোথায় কে প্রাণ হারাবে তা আন্দাজ করার কোন উপায় নেই। বোমায় পোড়ে খাক হবে, নাকি বুলেটের আঘাতে ঝাঝরা হবে, না অন্য কোন অভিনব কায়দায় বেঘোরে প্রাণ দিবে জানা নেই। কোলের শিশু থেকে অশীতিপর বৃদ্ধও নিরাপদ নয় আপন ঘরেও। আজব এই পৃথিবীতে আশরাফুল মাখলুকাত মানব প্রাণের কোন মূল্য না থাকলেও পশু-পাখি ও গাছ-পালার প্রাণের মূল্য সীমাহীন। বিশেষ প্রয়োজনে গাছ কাটলে এ জন্য প্রতিবাদ সভা-সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়। মিডিয়ায় তোলপাড় হয়। আর কোন প্রাণী মারা গেলে বা মেরে ফেললে তো কোন কথাই নেই। এক শেণ্রীর পরিবেশকর্মী রে রে করে উঠে। সংবাদ মাধ্যমে তা লিড নিউজ হয়। হৈচৈ পড়ে যায় মিডিয়া পাড়ায়। অথচ পৃথিবীতে মানব না থাকলে পশু-পাখি, গাছপালা ইত্যাদির মূল্য কি? এ সকল কিছুই তো মানবের জন্য। মানব এগুলোর জন্য নয়। এ ছাড়াও মানব হচ্ছে সৃষ্টির সেরা। পশু-পাখি, গাছ পালা ইত্যাদির চেয়ে তার মূল্য অনেক অনেক গুণ বেশী। মূলত মানবের সাথে পশু-পাখি, গাছপালা ইত্যাদির কোন তুলনা যায়ইনা। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে- “নিশ্চয় আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, তাদেরকে স্থলে-জলে চলাচলের বাহন দান করেছি, তাদেরকে প্রদান করেছি উত্তম জীবনোপকরণ এবং তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি অনেক সৃষ্টি জীবের উপর। (সূরা বনী ইসরাঈল:৭০) এ ব্যাপারে কারো দ্বীমত পোষণ করার অবকাশ নেই যে, উর্ধ্ব ও অধ:জগতের সমগ্র সৃষ্টিজীব এবং জীব-জন্তুর চেয়ে আদম সন্তান শ্রেষ্ট। (মাআরিফুল কুরআন: ৭৮৪-৭৮৫ সংক্ষেপিত) অথচ এই আদম সন্তানের প্রাণ আজ মূল্যহীন। তার প্রাণের নেই কোন মূল্য। চৌদিকে সে অরক্ষিত ও অনিরাপদ। সর্বত্রই চলছে মানব হত্যার মচ্ছব। যা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া নিষ্প্রয়োজন। আধুনিক মিডিয়ার কল্যাণে যার বিভৎস বিবরণ জাতির নখ দর্পনে। অবস্থার ভয়াবহতা আন্দাজ করার জন্য জাতীয় দৈনিকের দুটি রিপোর্ট পেশ করছি। ১.“অবরোধ-হরতালে ভয়াবহ সহিংসতায় সারা দেশে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। দুর্বৃত্তদের পেট্রোল বোমায় মারা যাচ্ছেন অসহায় মানুষ। কথিত বন্দুক যুদ্ধে বিএনপি জামায়াতের নেতা-কর্মীদের হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনকারীদের হামলায় ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীও মারা যাচ্ছেন। সব মিলে চলমান আন্দোলনে এ পর্যন্ত ৭১ দিনে ১৫৪ জন মারা গেছেন।” (যুগান্তর: ১৮ মার্চ ২০১৫) ২. “প্রতিদিন গড়ে ১২ জন খুনের শিকার হচ্ছেন। একাধিক মানবাধিকার সংগঠন এ সব তথ্য জানিয়েছেন। গত ১ বছর ২ মাস ২২ দিনে দেশে ৫ হাজার ৬৩৫ টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। (ইনকিলাব:২৪ মার্চ ২০১৫) গা শিউরে উঠার মতো বিবরণ। মূলত ইসলামই পারে মানব হত্যার এ মচ্ছব রুখে দিতে। এ ক্ষেত্রে অন্য সকল পেসক্রিপশন হবে ব্যর্থ ও ভন্ডুল। কারণ ইসলাম চায় সমাজ ব্যবস্থাকে সর্বদা একটি সুসংহত সুশৃংখল ও নিরাপদ বুনিয়াদের উপর রাখতে। আরও চায় প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে শান্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। পক্ষান্তরে হত্যা, খুনাখুনী, মারামারি ইত্যাদি সমাজ, রাষ্ট্র ও মানব জীবনে সৃষ্টি করে চরম শংকা ও অনিরাপত্তা। তাই ইসলাম মানব হত্যাকে চিহৃত করেছে গুরুতর অপরাধ রুপে এবং ইহপার ও পরপারে রেখেছে সুকঠিন শাস্তির বিধান। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-“যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ ও সন্ত্রাস সৃষ্টি করার অপরাধ ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন দুনিয়ার সকল মানুষকেই হত্যা করল আর যে কারও জীবন রক্ষা করল সে যেন দুনিয়ার সকল মানুষের জীবনই রক্ষা করল।” (মায়েদাহ: ৩১২) কাউকে হত্যা করা হারাম ও মহাপাপ। ইহপার ও পরপারে রয়েছে সুকঠিন শাস্তির বিধান। আল্লাহ তাআলা বলেন, “যে কেউ কোন মুমিনকে ইচ্ছাকৃত হত্যা করল, তার শাস্তি জাহান্নাম। তথায় সে থাকবে দীর্ঘকাল। আল্লাহ তার প্রতি ক্রদ্ধ হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং তার জন্য প্রস্থুত রেখেছেন ভয়ংকর শাস্তি। (নিসা: ৯৩) বর্ণিত আয়াতে কোন মুমিনকে হত্যা করলে যে চারটি শাস্তির ভয় দেখানো হয়েছে, তার যে কোন একটির কথা শুনলেও মানব শরীর শিউরে উঠে। সুতরাং যাকে সেই শাস্তিগুলো দেওয়া হবে তার অবস্থা কি হবে সেটা আর বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখেনা। অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- “আর তারা সঙ্গত কারণ ব্যতিত তাকে হত্যা করে না যাকে হত্যা করা আল্লাহ তাআলা নিষেধ করেছেন এবং লিপ্ত হয় না ব্যভিচারে। যারা এ অপরাধ করবে, তারা সম্মুখীন হবে কঠিন শাস্তির। তাদের এ শাস্তি বর্ধিত করা  হবে এবং তথায় তারা থাকবে চিরকাল।” (ফুরকান:৬৮-৬৯) হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে- “কিয়ামত দিবসে সর্ব প্রথম রক্তপাত তথা হত্যার বিচার হবে।” (বুখারী: ৬৫৩৩, ৬৮৬৩; মুসলিম: ১৬৭৮) অন্য বর্ণনায় সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের বাচনীক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি আমাদের উপর (কোন মুসলমানের উপর) অস্ত্র উত্তোলন করে সে আমদের দলভূক্ত নয়।”(বুখারী: ৬৮৭৪,৭০৭০; মুসলিম: ১৬১) অন্য এক বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “মুসলমানকে গালি দেওয়া ফিসক আর তাকে হত্যা করা কুফরী কাজের অন্তুর্ভূক্ত।” (বুখারী:৪৮,৬০৪৪; মুসলিম: ১১৬) সাহাবী আবু হুরায়রার রা. বর্ণনায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বালেন, “সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! মানুষ এমন এক যামানার মুখোমুখী হবে, যখন হত্যাকারীও জানবে না যে, কেন সে হত্যা করল। নিহত ব্যক্তিও জানবে না যে, কেন তাকে হত্যা করা হলো। জিজ্ঞাসা করা হলো, এমনটি কিভাবে হবে ? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দিলেন, হত্যাযজ্ঞ ব্যাপক আকার ধারণ করার ফলে। এই হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই হবে জাহান্নামী। (মুসলিম:২৯০৮) মানবতার ধর্ম ইসলাম কেবল মুসলমানের জান-মাল ও ইজ্জত-আবরুরই নিরাপত্তা দেয়নি; বরং মুসলমানদের পাশাপাশি অমুসলিম ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জান-মাল ও ইজ্জত-আবরুরও নিরাপত্তা দিয়েছে সমধিক। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আমরের রা. বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি কোন যিম্মীকে (বিধি মুতাবিক ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাস বা অবস্থানকারী কোন কাফেরকে) হত্যা করবে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ জান্নাতের ঘ্রাণ চল্লিশ বছর দূরের পথ হতেও পাওয়া যাবে।” (বুখারী: ৩১৬৬, ৬৯১৪) অন্য বর্ণনায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “সাবধান! (জেনে রাখ) যে কেউ কোন যিম্মীর (ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাস বা অবস্থানকারী কোন কাফেরের) প্রতি অবিচার করবে অথবা তার প্রাপ্য অধিকার কমিয়ে দিবে বা সামর্থ্যরে বাইরে কোন কাজ চাপিয়ে দিবে কিংবা তার আত্মিক তুষ্টি ব্যতিত তার কোন সম্পদ ভোগ করবে, কিয়ামত দিবসে আমি তার প্রতিপক্ষ হয়ে তার অন্যায় অপরাধ প্রমাণ করব।” (আবু দাউদ: ৩০৫২)। এতো গেল মানব প্রাণ সংহারকের পরকলীন শাস্তি ও হুশিয়ারী। এর ইহকালীন শাস্তিও বড় কঠোর ও নির্মম। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে- “হে ঈমানদারগণ! মানব হত্যার ব্যাপারে তোমাদের জন্য কিসাসের বিধান ফরজ করা হয়েছে। (কিসাসের বিবরণ  হলো) স্বাধীন ব্যক্তিকে হত্যার বদলে স্বাধীন, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাস, নারীর বদলে নারীকে হত্যা করা হবে। তবে যদি তার ভাই তথা মৃত ব্যক্তির ওয়ারীশদের তরফ হতে কিছুটা মাফ করে দেওয়া হয়, তাহলে প্রচলিত নিয়মের অনুসরণ করবে এবং ভালভাবে তার দেয় আদায় করবে। এটা তোমাদের প্রভুর তরফ হতে হত্যাকারীদের উপর সহজ করণ ও অনুকম্পা। এরপরও যে সীমালঙ্গন করে তার জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। হে বোধসম্পন্ন লোক সকল! (জেনে রাখ) কিসাসের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য জীবন। যাতে তোমরা হতে পার সাবধান।”(বাকারা: ১৭৮-১৭৯) উক্ত আয়াত এবং এতদসংক্রান্ত অন্যান্য আয়াত ও হাদীসগুলোর আলোকে মুফাসিসরীনে কিরাম লিখেছেন- কেউ যদি কাউকে ইচ্ছাকৃত হত্যা করে, নিহত ব্যক্তি যে ধর্মেরই হকো, নারী হোক, পুরুষ হোক, স্বাধীন হোক, আর ক্রীতদাস হোক হত্যাকারীকে মৃত্যদন্ড দেওয়া হবে। (মাআরিফুল কুরআন: ১/৪৮৪-৪৮৬; বুখারী: ২/১০১৪-১০১৬; মুসলিম: ২/৫৮-৬১) মৃত্যদন্ড কার্যকর করবে সরকার ও প্রশাসন। কোন ব্যক্তি, পঞ্চায়েত বা সংগঠনের এ বিধান কার্যকর করার এখতিয়ার ও অনুমতি নেই। আর যদি নিহত ব্যক্তির ওলী ও উত্তারাধিকারীগণ কিসাস না নিয়ে মুক্তিপণ দাবী করে তাও পারবে। এটা তাদের ইচ্ছার উপর নির্ভর করবে। অবস্থা ভেদে প্রশাসন তার ব্যবস্থা নেবে। (মাআরিফুল কুরআন: ১/৪৮৪-৪৮৬; বুখারী: ২/১০১৪-১০১৬; মুসলিম: ২/৫৮-৬১) কুরআন-হাদীস ও ইসলামী ফিকহ অধ্যয়ন করলে বুঝে আসে ইসলামী শরীআহ মূলত মানব হত্যার দন্ডবিধিকে কঠোর করেছে তিনটি বিষয়কে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। ১. জন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ২. শাসন ব্যবস্থা সুদৃঢ় করা। ৩. নাগরিকদের সচ্চরিত্রবান করা ও বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষ করা। প্রিয় পাঠক! একবার ভেবে দেখুন, কোন এলাকা কিংবা রাষ্ট্রে যদি মানুষের বসবাস, চলাচল ও কাজ-কর্ম নিরাপদ ও নির্বিঘœ করা হয়, যদি সে এলাকা বা রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা হয় নিরপেক্ষ ও সুদৃঢ় আর নাগরিকগণ বেড়ে উঠে সুপথে ও সচ্চরিত্রবান হয়ে, তাহলে সে এলাকা বা রাষ্ট্রে কি কখনও মানব হত্যার মত জঘণ্য অপরাধ সংগঠিত হতে পারে। আর সে জাতির উন্নতি ও অগ্রযাত্রা কি কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে? মূলত ইসলাম ধর্ম আদ্যপ্রান্ত কল্যাণময়ী ও মানবতাবাদী। এর শিক্ষা-দীক্ষা হচ্ছে, মানব হবে মানবতাবাদী, কল্যাণ ও শান্তিকামী। সে অন্যের উপকার করবে। অন্যের ব্যথায় হবে ব্যথিত। ভুলেও কারো ক্ষতির চিন্তা করবে না। সাহাবী তামীমে দারীর রা. বর্ণনায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “ইসলামের মার্মকথা হচ্ছে, কল্যাণকামীতা। আমরা বললাম কার জন্য কল্যাণকামীতা? তিনি বললেন, আল্লাহ, কুরআন, রাসূল, মুসলমানদের ইমামগণ ও সকল জনসাধরণের জন্য।” (মুসলিম: ৫৫; আবু দাউদ: ৪৯৪৪; তিরমিযী:১৯২৬; বুখারী: ৫৭) সাহাবী আবু হুরায়রার রা. বর্ণনায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বালেন, “যে ব্যক্তি কোন মুমিনকে দুনিয়ার কোন বিপদ থেকে উদ্ধার করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামত দিবসের বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন এবং যে ব্যক্তি কোন অভাবী বা বিপদগ্রস্থের প্রতি দুনিয়াতে সহজ আচরণ করবে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি দুনিয়া ও আখেরাতে সহজ আচরণ করবেন এবং যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ গোপন করবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন করবেন এবং আল্লাহ তাআলা বান্দাকে ততক্ষণ সাহয্য করতে থাকেন, যতক্ষণ সে অপরকে সাহায্য করতে থাকে।” (মুসলিম: ২৬৯৯; বুখারী: ৫৭; আবু দাউদ: ৪৯৪৬;তিরমিযী:১৪২৫,১৯৩০,২৯৪৫; ইবনে মাজা:২২৫)। আসল কথা হলো, ইসলামের প্রবর্তক সর্বজান্তা আল্লাহ তাআলা। এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাণ পুরুষ সুক্ষদর্শী নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাই ইসলামের কোন বিধান প্রবর্তনের পূর্বে অগ্র-পশ্চাত ভেবে সকল প্রকার ছিদ্র পথ বন্ধ করেই প্রবর্তন করেছেন। তাইতো খুন-জখম, মারামারী ও হত্যার প্রথম ধাপ জগড়া-বিবাদ, হিংসা-বিদ্বেষ, জুলুম-অত্যাচার, কাউকে কষ্ট দেওয়া ইত্যাদি কর্মকান্ডকেও ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে বড় কঠোরভাবে। বড় কঠোর ভাষায় হিংসার নিন্দা করে আল্লাহ তাআলা বলেন- “তারা কি মানুষের সাথে হিংসা করে এমন বিষয়ের জন্য যা কিছু আল্লাহ তাআলা নিজ অনুগ্রহে মানুষকে দান করেছেন? (নিসা: ৫৪) সাহাবী আবু হুরায়রার রা. বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন “তোমরা হিংসা-বিদ্বেষ থেকে সম্পূর্ণরুপে বেচে থাক। কেননা হিংসা-বিদ্বেষ মানুষের নেক আমলকে সেভাবে খেয়ে ফেলে যেভাবে আগুন শুকনো লাকড়ী কিংবা খড়-কুটোকে খেয়ে ফেলে।” (আবু দাউদ: ৪৯০৩) ইসলামে ঝগড়া-বিবাদও হারাম ও নিষিদ্ধ। ঝগড়া-বিবাদের নিন্দায় কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে- “আর এমন কিছু মানুষ আছে পার্থিব জীবনে যাদের কথাবার্তা আপনাকে চমৎকৃত করে। তারা নিজেদের মনের কথার ব্যাপারে আল্লাহকে সাক্ষীরুপে পেশ করে। প্রকৃতপক্ষে তারা মারাত্মক ঝগড়াটে লোক। (বাকারা: ২০৪) সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের রা. এর বাচনিক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- “তোমার জন্য এ গুনাহই যথেষ্ট যে, তুমি সর্বদা ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত থাকবে। অর্থ্যাৎ তোমাকে ধ্বংশ করার জন্য সর্বদা ঝগড়া-বিবাদের যথেষ্ট। (তিরমিযী: ১৯৯৪) সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের রা.এর বাচনিক অন্য বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন-“তুমি তোমার ভাই অর্থ্যাৎ অন্যের সাথে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হয়ো না।” (তিরমিযী:১৯৯৫) সাহাবী আনাস ইবনে মালেক রা. এর বাচনিক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- “যে ব্যক্তি অন্যায়ের উপর থেকে ঝগড়া-বিবাদ পরিহার করল, তার জন্য জান্নাতের কিনারায় একটি বালাখানা নির্র্মাণ করা হবে। আর যে ব্যক্তি সত্য ও ন্যায়ের উপর থেকে ঝগড়া-বিবাদ পরিহার করল, তার জন্য জান্নাতের মাঝে একটি বালাখানা নির্র্মাণ করা হবে। আর যে ব্যক্তি স্বীয় আখলাক-চরিত্র সুন্দর করল, তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে একটি বালাখানা নির্র্মাণ করা হবে। (তিরমিযী: ১৯৯৩) ইসলাম ও ইসলামের নবীর অনুসারীদের ভাল করে মনে রাখা দরকার, কোন মানুষকে সে যে ধর্ম-বর্ণ বা জাতিরই হোক না কেন, বোমা, গুলি, অত্মঘাতী হামলা বা অন্য কোন কায়দায় হত্যা তো অনেক বড় কথা; অন্যায়ভাবে একজন মুমিনকে কষ্ট দেওয়াও ইসলাম ও ইসলামের নবীর দৃষ্টিতে চরম ঘৃণিত, নিষিদ্ধ কাজ ও দন্ডনীয় অপরাধ। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে- “যারা বিনা অপরাধে মুমিন নর-নারীকে কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও পাপের বোঝা বহন করে।”(আহযাব: ৫৮) সাহাবী আবু সিরমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- “যে ব্যক্তি অন্যের ক্ষতি করে, আল্লাহ তার ক্ষতি করবেন। আর যে ব্যক্তি অন্যকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাকে কষ্ট দিবেন।” (তিরমিযী: ১৯৪০; আবু দাউদ: ৩৬৩৫; ইবনে মাজা: ২৩৪২; বুখারী: ২/১০৫৯) অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, সাহাবী আবু বকর রা.বলেন, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- “অভিশপ্ত সিই ব্যক্তি যে কোন মুমিনের ক্ষতি করে বা তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে।” (তিরমিযী: ১৯৪১) কোন কাফের বা সংখ্যালঘুকে কষ্ট দেওয়াও চরম অন্যায়। এক বর্ণনায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- সাবধান! (জেনে রাখ) যে কেউ কোন যিম্মীর (বিধি মুতাবিক ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাস বা অবস্থানকারী কোন কাফেরের) প্রতি অবিচার করবে অথবা তার প্রাপ্য অধিকার কমিয়ে দিবে বা সামর্থ্যরে বাইরে কোন কাজ চাপিয়ে দিবে কিংবা তার আত্মিক তুষ্টি ব্যতিত তার সম্পদ ভোগ করবে, কিয়ামত দিবসে আমি তার প্রতিপক্ষ হয়ে তার অন্যায় অপরাধ প্রমাণ করব।” (আবু দাউদ:৩০৫২) সুবহানাল্লাহ! সংখ্যালঘু ও অন্য ধর্মালম্বীদের ব্যাপারেও কত ইনসাফপূর্ণ অপূর্ব বাণী। এটা সম্ভব সেই সত্তার জন্যই, যিনি বিশ^ ও মানবতার নবী এবং যার ধর্ম বিশ^ ও মানবতার ধর্ম। সর্বপোরি বিশ^বাসীর খুব ভাল করে জানা থাকা দরকার, মানব জাতির সর্ববিধ কল্যাণের জন্যই ইসলামের আগমন। ইসলামী জীবন ব্যবস্থা যে সমাজে যে জাতি যে কালেই প্রতিফলিত করেছে সফলতা তাদের পদচুম্বন করেছে। শান্তি-শৃংখলা ও নাগরিক নিরাপত্তার সুফল তারা ভোগ করেছে শত ভাগ। ইতিহাস সাক্ষী, ইসলামপূর্ব যুগে পৃথিবীব্যাপী যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল তার নজীর পৃথিবীর ইতিহাসে পাওয়া দুষ্কর। সেই ত্রাসের রাজত্বের মূলে কুঠার আঘাত করে ইসলামের অনুসারীরা যে শান্তির সমাজ বিশ্ববাসীকে উপহার দিয়েছিল তার উপমা পেশ করতে পৃথিবীর ইতিহাস অক্ষম। তাই বলি,  মানব হত্যার এ মচ্ছবকে রুখে দিয়ে নিরাপদ বিশ^ উপহার দেয়ার জন্য আশু প্রয়োজন কুরআনী বিধান ও জীবন ব্যবস্থার বাস্তবায়ন। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন।

লেখক
গ্রন্থ প্রণেতা, ধর্মীয় গবেষক ও সিনিয়র মুহাদ্দিস
জামিয়া মিফতাহুল উলুম, নেত্রকোনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight