মানবতার কবি শেখ সা‘দী / ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

দামেশকের জামে মসজিদে হযরত ইয়াহয়া আলাইহিস সালামের কবরের শিয়রে এতকাফে ছিলাম (শেখ সা‘দীর কথা)। ঘটনাচক্রে আরবের তামীম পেগাত্রের এক বাদশাহ, যিনি জুলুম ও স্বৈরাচারের জন্য খ্যাত ছিলেন, সেখানে যেয়ারত করতে আসেন। তিনি সেখানে নামায আদায় করলেন। তারপর দোয়া করলেন আর নিজের অভাব অভিযোগের কথা জানিয়ে মোনাজাত করলেন। (সত্যিই)
ফকির ও ধনী এ দরবারের ভিখারি সবাই
যারা অধিক ধনী অধিক ভিখারি তারাই।
এ সময় তিনি আমাকে বললেন, যেহেতু দরবেশদের মনোবল মজবুত এবং সততার উপর তাদের জীবন চলে, সেহেতু আমার জন্য একটু দোয়া করবেন। কারণ, শক্ত একজন শত্রুর পক্ষ হতে পেরেশানীতে আছি। আমি তাকে বললাম, আপনা দুর্র্বল প্রজাদের প্রতি দয়া দেখাবেন, তাহলে সবল দুশমনের ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকবেন।
সবল বাহু আর শক্তিশালী হাতের পাঞ্জায়
নিরীহ দুর্বলের হাত ভাঙা বড় অন্যায়।
পতিতের প্রতি দয়া দেখায় না, সে কি ভয় পায়না
নিজে পতিত হলে কেউ যে এগিয়ে আসবে না?
মন্দের দানা বুনে যে দিন কাটে ভালোর আশায়
ভ্রান্ত চিন্তায় ঘুরপাক খায় বেভুল বাতিল কল্পনায়।
কানের তুলা বের করো, শোধ কর মানুষের প্রাপ্য
যদি আজ না দাও, সেদিন ফেরত দিবে অবশ্যই।
আদম সন্তান পরস্পরে এক দেহের অঙ্গ
সৃষ্টির উৎসে তাদের উপাদান যে অভিন্ন
কালের দুর্বিপাকে ব্যথিত হয় যদি একটি অঙ্গ
স্বস্তিতে থাকতে পারে না, বাকী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ
অন্যদের দুঃখ- কষ্টে তুমি যে নির্বিকার
তোমাকে মানুষ বলা অনুচিত, অবিচার। (গুলিস্তান, ১ম অধ্যায়, হেকায়ত নং ১০)
ফারসি সাহিত্যের কিংবদন্তি পুরুষ কবি শেখ সা‘দী তার সাহিত্যকর্মের সর্বত্র মানবতার জয়গান গেয়েছেন। বর্ণনা শৈলীর চমৎকারীত্ব, ভাষার লালিত্য ও মাধুর্য এবং মানবীয় গুণাবলীর উৎকর্ষ সাধনে তার অবদান বিশ^সভ্যতায় অবিস্মরণীয়। । উপরোক্ত হেকায়তে দুর্বল মানুষের অধিকার আদায়ের যে চমৎকার আবেদন তিনি রেখেছেন তা অতুলনীয়। শেষ কয়েকটি পংক্তিতে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন মানব প্রেমের এক বিশ^জনীন আবেদন। সহজ সরল ভাষায় অতি সংক্ষেপে, কাব্যশৈলীর অসাধারণ নৈপুণ্যে ও যুক্তির মানদন্ডে উপস্থাপিত মানব প্রেমের এই আবেদন যেকোনো মানুষের অন্তর ছুঁয়ে যায়। মানুষের চিন্তাকে মুহূর্তে নিয়ে যায় আপন সৃষ্টিতত্ত্ব, সমজাত মানুষের প্রতি দায়িত্ব চেতনা, বিশেষ করে মানুষে মানুষে সাম্য ও সম্প্রীতির বিস্তৃত নিলীমায়।
আজকের দিনে কালো সাদা, ধর্ম, বংশ ও জাত পাতের বিভিন্নতায় মানুষ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। শেখ সা‘দী কবিতার অলঙ্কারে মানব জাতির সামনে যে সত্যটি উপস্থাপন করেছে, তাহলো সব মানুষ এক আদমের সন্তান, সৃষ্টির মূলে সবার অভিন্ন উপাদান। কাজেই তাদের মধ্যে সম্পর্ক হওয়া চাই একটি দেহের বিভিন্ন অঙ্গের অন্তর্গত সম্পর্কের মতো। দেহের কোনো অঙ্গে আঘাত হলে অন্য অঙ্গগুলো যেমন স্বস্তিতে থাকতে পারে না, তেমনি পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে কোনো আদম সন্তান ব্যথায় কাতর হলে কোনো মানুষ তার প্রতি সমব্যথী না হয়ে পারে না। এই দায়িত্ব যে ভুলে যায়, অন্যের দুঃখ দুর্দশা দেখেও যে নির্বিকার থাকে, সে মানুষ নয়, শেখ সা‘দীর ভাষায় তাকে মানুষ নামে আখ্যায়িত করা অন্যায়।
শেখ সা‘দীর এই বিশ^জনীন বাণীতে ইসলামের শাশ^ত শিক্ষাই প্রস্ফুটিত হয়েছে সাহিত্যের অলঙ্কারে সেজে। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে : “হে মানব মন্ডলী! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে। আর আমি তোমাদেরকে পারস্পরিক পরিচয়ের সুবিধার্থে বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায়ে বিভক্ত করেছি। তোমাদের মধ্যে সবচে সম্মানী হল সে, যে তোমাদের মাঝে সবচে আল্লাহ ভীরু ও সংযমী।” (সূরা হুজুরাত : আয়াত-১৩)
অনুরূপভাবে মহানবী (সা) এর যবানীতে উচ্চারিত একটি হাদীসের আবেদন বাঙময় হয়েছে শেখ সা‘দীর এ রচনায়। আল্লাহর নবী বলেছেন, তুমি মু’মিনদেরকে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি ও সংবেদনশীলতায় দেখবে যে, তারা একটি দেহের মতো। দেহের একটি অঙ্গ যখন ব্যথায় কাতর হয়, তখন অন্য অঙ্গগুলো জ¦র ও রাত্রী জাগরণের মাধ্যমে তার প্রতি সমবেদনা জানায়। -(বুখারী : ৫৬৬৫; মুসলিম : ২৫৮৬)
মানব সমাজকে পরস্পর সৌহার্দপূর্ণ ও শান্তিময় করার আদর্শ ও শিক্ষা শেখ সা‘দী কুরআন ও হাদীস থেকে চয়ন করে বিশ^সাহিত্যে উপস্থাপন করেছেন। তিনি মানুষের চেতনার দুয়ারে করাঘাত করেছেন। চিন্তার পরিশুদ্ধির সূত্রে সুন্দর চরিত্র ও আচরণে আদর্শ সমাজ নির্মাণের মাল-মসলা জোগান দিয়েছেন।
পারস্যের রাজধানী সিরাজের রাজ দরবারের কবি ছিলেন শেখ সা‘দী। তার কবিনাম সা‘দী গ্রহণ করেন শিরাজের শাসক সাদ ইবনে আবু বকর ইবনে সাদ (৫৯৯-৬২৩হিজরী) এর নাম অনুসারে। কিন্তু তখনকার দিনের সভা কবিদের মতো ক্ষমতাসীনদের তোষণ ও স্তুতিগানের সাহিত্য চর্চা তিনি করেন নি। তিনি পূর্ববর্তী রাজা বাদশাহদের জীবনচিত্র তুলে ধরেছেন নানা কাহিনীর অবতারণা করে। তার মাধ্যমে বর্তমান শাসক শ্রেণীকে ভাল কাজে অনুপ্রাণিত করেছেন আর মন্দ কাজ হতে বিরত থাকার তাগিদ দিয়েছেন। তার অমর দু‘টি গ্রন্থের একটির নাম গুলিস্তান, অপরটি বূস্তান। গুলিস্তান মানে ফুলের স্থান আর বুস্তান মানে সুবাসের স্থান। গুলিস্তানে যেসব কাহিনী দিয়ে তিনি মানব মনের চিরন্তন বাগানে ফুল ফুটিয়েছেন তা অনেকটা দৃশ্যমান। কিন্তু বূস্তানের ফুলগুলো দৃশ্যমান নয়, কাছে গেলে তার সুবাস মনমস্তিষ্ককে বিমোহিত করে। গুলিস্তান গদ্যের ফাঁকে ফাঁকে কবিতা দিয়ে রচিত। তবে গদ্যও এতই ছন্দময় যে, তার মতো রচনা অনেক কবি সাহিত্যিক চেষ্টা করেও সৃষ্টি করতে পারেন নি। বূস্তান সম্পূর্ণটাই কাব্যগ্রন্থ।
মানব সমাজকে সুপথে বা বিপথে পরিচালিত করার অন্যতম চালিকাশক্তি রাজা বাদশাহরা। তাই তিনি আট বেহেশতের সংখ্যায় রচিত গুলিস্তানের আট অধ্যায়ের প্রথম অধ্যায়টি বরাদ্দ করেছেন রাজা-বাদশাহদের জীবন চরিত আলোচনায়। বর্তমান গণতন্ত্রের শ্লোগানের যুগেও ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করার ঝুঁকি আমরা কমবেশি বুঝি। সে যুগের রাজা-বাদশাহদের সমালোচনা ও সংশোধনের অভিনব পদ্ধতি নিয়ে চিন্তা করলে শেখ সা‘দীকে একজন দূরদর্শী সমাজ সংস্কারক হিসেবে দেখা যায়। যার লেখনির প্রভাব সভ্যতা ও সমাজকে পথ দেখাবে যুগ যুগ ধরে। শেখ সা‘দী বর্ণনা করেন : ‘খোরাসানের জনৈক বাদশাহ একবার সুলতান মাহমূদ সাবুকতাগীনকে স্বপ্নে দেখেন, তার গোটা দেহ খসে পড়েছে, মাটির সাথে মিশে একাকার হয়েছে। কিন্তু তার চোখ দুটি চোখের কোটরিতে তখনো ঘুরছে আর এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছে। দরবারের জ্ঞানী গুণিরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে যখন অপারগ, এক দরবেশ যথানিয়মে সম্মান জানিয়ে এগিয়ে এলেন। বললেন, ‘তিনি এখনো চিন্তিত, কারণ, অন্যের হাতে তার রাজত্ব।’
বহু খ্যাতিমান দাফন হয়েছেন নরম মাটির নিচে
যাদের অস্তিত্বের কোনো চিহ্ণ নাই মাটির উপরে।
জরাজীর্ণ লাশ রাখা হয়েছিল মাটির কবরে পুঁতে
তাদের অস্থিমজ্জাও নিশ্চিহ্ণ হয়েছে মাটির গ্রাসে।
সনামখ্যাত আনুশিরওয়াঁ অমর তার সুনাম নিয়ে
যদিও বহুকাল চলে গেল, আনুশিরওয়ান গত হয়েছে।
মানুষের কল্যাণে কিছু করে যাও, হায়াতের এই সুযোগে।
অমুক ব্যক্তি আর নাই একদিন এই ঘোষণা আসার আগে। (গুলিস্তান, ১ম অধ্যায়, ২য় হেকায়ত)
সুলতান মাহমুদ ইতিহাসে সোমনাত বিজয়ী ও ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের গোড়া পত্তনকারী হিসাবে খ্যাত। তার পুরোনাম আবুল কাসেম আমীন আদ্দৌলা। ৩৮৭ হিজরীতে খোরাসানের সিংহাসনে আরোহন করেন এবং ৪২১ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। তার দরবারে কবি সাহিত্যিক ও জ্ঞানী পন্ডিতদের বিশেষ কদর ছিল। তার সফরসঙ্গী আলবিরুনীর লেখা কিতাব মা লিল হিন্দ (ভারততত্ত্ব) ইতিহাসে বিখ্যাত। তার পিতা নাসিরুদ্দীন সাবুকতাগীন ছিলেন তুর্কী বংশোদ্ভুত খোরাসানের বাদশাহ। পিতার নামের সাথে মিলিয়ে তার নাম সুলতান মাহমূদ সাবুকতাগীন। আনুশিরওয়ান বা নওশিরওয়ান ইরানের প্রাচীন সাসানী যুগের বাদশাহ। তিনি ন্যায়বিচারক ও প্রজাবৎসল হিসেবে ফারসি সাহিত্যে বিশেষভাবে প্রশংসিত।
মানুষ যখন জগত ও জীবনের রহস্য হৃদয়ঙ্গম করতে পারে তখন নিজ থেকে সুপথগামী হয়। তার কথা ও কাজে মানবীয় সৌন্দর্যের ফুল ফুটে। শেখ সা‘দী তার রচনার ভাঁজে ভাঁজে জীবন ও জগতের রহস্যের পানে মানুষের অন্তর্চক্ষু খুলে দিয়েছেন নানা উপমা উৎপ্রেক্ষায়। তিনি বলেন,
এ জগত হে ভাই! কারো জন্যে থাকবে না স্থায়ী
অন্তর বাঁধো তার সাথে, জগত সৃষ্টি করেছেন যিনি
দুনিয়ার রাজত্ব, সম্পদ, পদের ভরসা করো না, মিছে
তোমার মতো অনেককে সে লালন করে হত্যা করেছে
পুত প্রাণ যখন মনস্থ করে এ জগত ছেড়ে চলে যাওয়ার
তখতের পরে মরণ কিবা মাটির উপর, কি পার্থক্য তার। (গুলিস্তান, ১ম অধ্যায়, ১ম হেকায়ত)
যারা ক্ষমতার মোহে অন্ধ তাদের চক্ষু খুলে দিয়েছেন শেখ সা‘দী নানা উপাখ্যানের অবতারণা করে। যাতে ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তী মনে না করেন। এক রাজা ও দরবেশের সংলাপে তিনি বিষয়টির বিশ্লেষণ করেছেন মানব সভ্যতার সামনে। তিনি বলেন :
সংসার বিরাগী এক দরবেশ এক মরু অঞ্চলে বসা ছিল আপন ভুবনে। সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন এক বাদশাহ। অল্পেতুষ্টির রাজত্বে দরবেশ ছিলেন প্রশান্ত চিত্তে, তাই তিনি মাথা তুললেন না, তাকিয়ে দেখলেন না বাদশাহর দিকে। রাজা বাদশাহর প্রতাপের কাছে বড্ড বেমানান মনে হল ব্যাপারটি। মনে কষ্ট পেয়ে তিনি বলে ফেললেন, আলখেল্লা পরা এই গোষ্ঠিটা আসলেই জানোয়ারের মত। মান সম্মান মনুষ্যত্ব এরা চেনে না। মন্ত্রী তখন কথা বললেন, ওহে ভাল মানুষ! মহামান্য সুলতান তোমার পাশ দিয়ে চলে গেলেন, অথচ তুমি সম্মান দেখালে না? আদবের লেহায দেখালে না যে? দরবেশ বলল, বাদশাহকে গিয়ে বলেন, সম্মান পাওয়ার আবদার যেন এমন কারো কাছে করেন, যে বাদশাহর কাছে কিছুর আশায় থাকে। আরেকটি কথা মনে রাখবেন, ‘প্রজার যতেœর জন্যেই রাজা। রাজাকে সম্মান করার জন্য প্রজা নয়।’
বাদশাহ হলেন অনাথ মানুষের প্রহরী
যদিও দয়া অনুগহে পুষ্ট হয় তার সম্পদে
রাখালের খেদমতের জন্য নয় তো ভেড়া
বরং রাখালের কাজ ভেড়ার সেবাযতœ করা।
একজনকে আজকে দেখছ সৌভাগ্যবান
আরেকজন কৃচ্ছ্রসাধনায় করে প্রাণপাত।
কয়েকটা দিন সবর কর, যেন খেয়ে যায়
কল্পনা বিলাসীর মস্তিষ্ক, কবরের মাটি।
বাদশাহ বা প্রজার ফারাক উঠে যাবে
যখন নিয়তির ফয়সালা উপস্থিত হবে।
কেউ যদি কবরের মাটি খুঁড়ে দেখে ভেতরে
চিনবে না কে ধনী, কে গরীব আলাদা করে।
দরবেশের কথাগুলো বাদশাহর বেশ ভালো লাগল। তিনি বললেন, আমার কাছে কিছু চান। বললেন, আমি চাই, আপনি যেন আর আমাকে বিরক্ত না করেন। বাদশাহ বললেন, আমাকে উপদেশ দিন। বললেন,
বর্তমানকে মূল্যায়ন কর, এই যে নেয়ামত তোমার হাতে
এই নেয়ামত, রাজত্ব হাত বদলে যাবে অন্যের হাতে। (গুলিস্তান, ১ম অধ্যায়, ২৮ম হেকায়ত)
সংসার, সম্পদ, রাজত্ব, প্রতিপত্তি ক্ষণস্থায়ী, যেন কচুপাতার পানি। এসবের মোহ ত্যাগ করতে হবে। মনকে এসবের বাঁধন মুক্ত করতে হবে। ফারসি সাহিত্যের কিংবদন্তি পুরুষগণ এ কথাই বলেছেন নানাভাবে মানব জীবনকে সুন্দর ও সার্থক করার লক্ষে। তাতে মনে হতে পারে, দুনিয়ার প্রতি উদাসীন হয়ে ঘর সংসার ছেড়ে যাওয়ার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা নিহিত। কিন্তু শেখ সা‘দী বা ফারসি সাহিত্যের মহাপুরুষদের রচনার আবেদন তা নয়। তারা দুনিয়ার ধন সম্পদকে নয়, দুনিয়ার আর ধন সম্পদের লোভ মোহ ত্যাগ করতে বলেছেন। শেখ সা‘দী বূস্তানের এক অনবদ্য কাহিনীতে এই জীবন দর্শনটি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই কবিতার দু‘টি ছত্র খ্যাতির এমন শীর্ষে উঠে গেছে, যা গোটা ইসলামী জীবনবোধের প্রতিনিধিত্ব করছে। শেখ সা‘দী বলেন,
আগেকার দিনের বাদশাহদের কাহিনীতে আছে,
পারস্য-রাজ তাক্লা যখন বসলেন সিংহাসনে।
শান্তিতে জনগণ কারো ক্ষতি কেউ করে না দেশে,
সবাইকে ছাড়িয়ে অগ্রণি তিনি একা এই কীর্তিতে।
এক দরবেশের কাছে গিয়ে একদিন বললেন রাজা,
আমার এ জীবন কেটে গেল নিস্ফল, অযথা।
আমি চাই নিমগ্ন হব ইবাদত-বন্দেগীতে একাগ্রভাবে,
জীবনের বাকী কয়দিন কাটে যেন সৎভাবে।
এই প্রতিপত্তি, রাজত্ব ও সিংহাসন যখন চলে যাবে
জগতের সম্পদ যাবে না সাথে, নিঃস্বই যেতে হবে।
আলোকিত-হৃদয় দরবেশ শুনে তার কথা
তীব্র প্রতিক্রিয়ায় বললেন, থামো তাক্লা।
‘তরীকত বজুয খেদমতে খাল্ক নীস্ত
বে তসবীহ ও সাজ্জাদা ও দাল্ক নীস্ত’
সৃষ্টির সেবা ছাড়া তরীকত নয় অন্যথা
তসবীহ, জানামায ও নয় আলখেল্লা।
তুমি সমাসীন থাক তোমার রাজ সিংহাসনে
তবে পূতঃচরিত্রে সজ্জিত হও দরবেশী গুণে।
সততা, নিষ্ঠা ও একাগ্রতায় উদ্যোগী হও,
বড়বড় বুলি, আস্ফালন ছাড় মুখ সামলাও।
তরিকত সাধনায় চেষ্টাই চাই, বুলি নয়,
সাধনা চেষ্টা, এখানে আস্ফালনের মূল্য নাই।
বুযুর্গগণ, যারা সজ্জিত ছিলেন স্বচ্ছতার সম্পদে
এমনই উত্তরীয় ছিল তাদের আচকানের নিচে।
(বুস্তান, ১ম অধ্যায়, হেকায়াত নং ৯)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight