মাতা পিতা সন্তানের জান্নাতের পথ : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

সন্তানের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নেয়ামত হল মা বাবা। আর মা বাবার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নিয়ামত হলো সন্তান। মাকে সন্তুষ্ট করতে হবে, তাহলে দুনিয়া-আখেরাতের কোথাও আটকাবে না। মা ছাড়া সন্তানের কোনো গতি নেই। মা যেমনই হোক মায়ের দোআ যারা পাবে জীবনে তাদের কোনো ভয় নেই। মানুষ তো মূল্যবান সম্পদ অনেক পয়সা খরচ করে অর্জন করে। আমরা সবাই যেন মায়ের সন্তুষ্টিকে মূল্যবান সম্পদ মনে করি এবং যেকোনো মূল্যে তা অর্জন করার চেষ্টা করি। কারণ আল্লাহ তা’আলা তওহীদের পর পিতা-মাতার অধিকারকে প্রধান্য দিয়েছেন। আমার আল্লাহই শুধু মায়ের কথা বলেছেন’ তিনি পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন –
ووصينا الانسان بوالديه احسانا حملته امه كرها ووضعه كرها
‘মা-বাবার প্রতি সদাচরণ কর কারণ মা কষ্ট করে তোমাকে গর্ভে ধারণ করেছেন …।’ [সূরা আহকাফ : ১৫]
দেখুন, মা-বাবা দু’জনের সাথেই সদাচরণের আদেশ করেছেন। আপনারা যদি বাবা মায়ের মর্যাদা বুঝতে পারেন তাহলে আমি আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা করে নিশ্চয়তার সাথে বলতে পারি যে, দুনিয়াতে এবং আখেরাতে কোনোখানে আপনারা আটকাবেন না ইনশাআল্লাহ ।
পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে, “আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে ও কোন কিছুকে তাঁর শরীক করবে না; এবং পিতা মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্থ, নিকট প্রতিবেশী, দূরপ্রতিবেশী, সংগী-সাথী, পথচারী এবং তোমাদের অধিকারভূক্ত দাস দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে। যে দাম্ভিক ও আত্মগর্বী, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ভালবাসেন না”। [সুরা নিসার : ৩৬]
উক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষকে তাঁর ইবাদত করার এবং তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করার নিষেধ করার পর আয়াতের ‘”ওয়াবিল ওয়ালিদাইনি ইহ্সানা’ অংশে মাতা-পিতার প্রতি সদাচার ও সদ্ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এ আয়াতে তৌহিদের পর সমস্ত আত্মীয়-স্বজন ও সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বাগ্রে মাতা-পিতার হক সম্পর্কিত আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা স্বীয় এবাদত-বন্দেগী ও হক সমূহের পরপরই মাতা-পিতার হক সম্পর্কিত বিবরণ দানের মাধ্যমে ইঙ্গিত করেছেন যে, প্রকৃতপক্ষে সমস্ত নেয়ামত ও অনুগ্রহ একান্তই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে। কিন্তু বাহ্যিক উপকরণের দিক দিয়ে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আল্লাহর পরে মানুষের প্রতি সর্বাধিক এহসান বা অনুগ্রহ থাকে মাতা-পিতার। সাধারণ উপকরণসমূহের মাঝে মানুষের অস্তিত্বের পিছনে মাতা-পিতাই বাহ্যিক কারণ। তাছাড়া জন্ম থেকে যৌবন প্রাপ্তি পর্যন্ত যে সমস্ত কঠিন বন্ধুর পথ ও স্তর রয়েছে তাতে বাহ্যতঃ মাতা-পিতাই তার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখেন, তার প্রতিপালন ও পরিবর্ধনের জামানতদার হয়ে থাকেন। সেজন্যই কুরআন-করীমের অন্যান্য জায়গায়ও মাতা-পিতার হক সমূহকে আল্লাহ তাআলার এবাদত ও আনুগত্যের সাথে যুক্ত করে বর্ণনা করা হয়েছে।
যেরুপ সুরা লোকমানের ১৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘‘আমার প্রতি এবং স্বীয় মাতা-পিতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও’।
হযরত মা’আয ইবনে জাবাল রা. বলেন, “রসূলে করিম সা. দশটি অসিয়ত করেছিলেন। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, যদিও তোমাদেরকে সেজন্য হত্যা কিংবা অগ্নিদগ্ধ করা হয় এবং আর একটি হচ্ছে নিজের মাতা-পিতার নাফরমানী কিংবা তাদের মনে কষ্ট দিবে না, যদিও তারা এমন নির্দেশও দিয়ে দেন যে, তোমরা তোমাদের পরিবার পরিজন ও ধন সস্পদ ত্যাগ কর।”[মুসনাদে আহমদ]
মাতা-পিতার অবাধ্য হওয়ার সর্বনিম্ন পর্যায় হলো যে, কোন অপছন্দনীয় কথার পর আফসোস করতে গিয়ে “ওফ” শব্দ বলা। কুরআন করীমে এ ধরনের আচরণ থেকেও নিষেধ করা হয়েছে। সুরা বনী ইসরাইলের ২৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে, “মাতা-পিতার (কথার) উপর ‘ওফ” শব্দও বলবে না এবং তাদেরকে ধমক দিবে না”।
আল্লাহ ব্যতীত মাতা-পিতা এবং মাতা-পিতা ব্যতীত আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কবুলের যোগ্য নয়। তিরমিযী শরীফের এক রেওয়াতে বর্ণিত রয়েছে , “যে ব্যক্তি স্বীয় মাতা-পিতাকে সন্তুষ্ট করল সে যেন আল্লাহক সন্তুষ্ট করল। আর যে ব্যক্তি স্বীয় মাতা-পিতাকে অসন্তুষ্ট করল সে যেন আল্লাহ তাআলাকে অসন্তুষ্ট করল”। রসুলে করীম সা.এর বাণী সমূহে যেমন মাতা-পিতার আনুগত্য ও তাদের সাথে সদ্ব্যবহারের তাকীদ রয়েছে, তেমনিভাবে তার সীমাহীন ফযীলত , মর্তবা ও ছওয়াবের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
একজন মা যখন একটি সন্তান গর্ভধারণ করার পর তাকে লালন পালন করা, লেখা পড়া করানো, তাকে আদর যতœ করে বড় করে তোলতে যে কত কষ্টসাধ্য কাজ করতে হয় বা কত কষ্ট সইতে হয় তা বলে শেষ করা যাবেনা। সন্তানকে খাওয়ানো পড়ানো, চিকিৎসা, ভরণ-পোষণ, তাদের সেবায় পরিশ্রম করা, কোলে কাধে করে মানুষ বানানো, তার পিছনে টাকা পয়সা খরচ করা হতে শুরু করে এমন কী কাজ আছে, যা সন্তানের জন্য একজন মা বাবা করেন না? আর এসব কিছুই করে থাকেন একজন মা বাবা বিনিময় ছাড়া।
কিছু মা বাবা আছে যারা সন্তান জন্ম দিয়ে তাদেরকে আদর্শ শিক্ষা না দেওয়ার কারনে ঐ সন্তান চুরি করা থেকে শুরু করে লুটতরাজ, সন্ত্রাসী চাঁদাবাজি, মানুষকে কষ্ট দেওয়া, মানুষ খুন করা, মানুষের ইজ্জত নিয়ে টানা টানি করে থাকে। ঐ ধরণের সন্তান পরিশেষে মা বাবার জন্যই ভুমেরাং হয়। ঐ ধরনের সন্তান ঘরে বাহিরে বিপর্যয় সৃষ্টি করে। ঐসব সন্তানেরা যে ঘরে যাবে সে ঘর তুষের আগুনে সারখার করে ফেলে মানুষের সুখের ঘরে আগুন লাগিয়ে পুড়ে তছনছ করে দেয়। ওদের মা বাবা থাকার চেয়ে না থাকাই ভাল ছিল। ওরা কোন একটি ইয়াতিম খানায় লালন পালন হতো সেই ভাল ছিল। ঐ সব সন্তান যদি কোন ভাল ঘরের বউ অথবা জামাই হয়ে যেতে পারে তাহলে ঐ ঘর জ্বলে পুরে সারখার হয়ে যাবে ও যাচ্ছে। কারণ তেতুল গাছের বিচি লাগালে তেতুল গাছই হবে আঙ্গুর গাছ লাগালে আঙ্গুর ফলই হবে। ফুকাহায়ে কেরামদের কাছে বিয়ে শাদীর ক্ষেত্রে কুফু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কম-বেশি ছয়টি বিষয়ে ছেলে মেয়ের সাথে মিল থাকা চাই। না হয় সেই দাম্পত্য সংসারে সুখ আসবে না। কুফুর বিষয়ে বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল সা. কুফুর দিকে খুব খেয়াল রাখতেন। পবিত্র কুরআনেও ঘোষণা হয়েছে- ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যভিচারিণী নারী অথবা মুশরিকা নারীকেই বিয়ে করে এবং ব্যভিচারিণীকে কেবল ব্যভিচারী অথবা মুশরিক পুরুষই বিয়ে করে এবং এদেরকে মুমিনদের জন্যে হারাম করা হয়েছে। [সূরা নূর : ৩]
ভাল আর মন্দ এক সাথে থাকতে পারে না। তখন ঐ ঘরের সন্তানেরা আরো মহা বিপদে পরে যায়। না পারে তারা ভালো করতে, আর না পারে খারাপ করতে। কারণ হয়তোবা তাদের মা ভাল ছিল অথবা বাবা ভাল ছিল। ফলে তারা না ভাল কিছু করতে পারে না খারাপ করতে পারে, মিশ্রিত হয়ে বিপদে পড়ে যায়। কখনো দেখা যায় কিছু সন্তান মায়ের মত ভাল হয়েছে, আবার কখনো দেখা যায় বাবার মত ভাল হয়েছে। তাই আমার অনুরুধ সন্তানের মা বাবার কাছে, আপনার সন্তান যেমন চরিত্র সেই রকম চরিত্র ব্যক্তির কাছেই বিবাহ দিবেন, কালো-সুন্দর সেখানে বিবেচ্য বিষয় না। কারণ প্রবাদ আছে জাতের মেয়ে কালও ভাল নদীর পানি ঘোলাও ভাল। তাহলে কুফু কুফু মিলে যাবে। তখন আপনাদের আর অসম্মানিত হতে হবে না। বিয়াইর বাড়ী ইজ্জত পাবেন। কেননা ওখানে অন্তরে অন্তরে মিলে যাবে যা আপনি সম্মান পাবেন। এটাকে বলে যেমনের তেমন। মা বাবা আদর্শ নীতিবান ও সম্মানিত হলে তার পরবর্তী বংশের লোকেরা ঐ সম্মান পেতে থাকবে। যেমন তার ছেলে মেয়ে নাতিন পুতি ইত্যাদি। আর যদি কেহ কোন সন্তান জন্ম দিয়ে গেল কিন্তু আদর্শ, সু শিক্ষা দিলনা তাহলে ঐ সন্তানের মা বাবাসহ অভিশাপ ও গালাগালি পেতে থাকে। তাহলে বুঝা গেল সন্তানের জন্য মা বাবা সম্মানিত হয় আর মা বাবার জন্য সন্তান সম্মানিত হয়। অপর পক্ষে মা বাবার জন্য সন্তান অসম্মানিত হয় আবার খারাপ সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য মা বাবাও অসম্মানিত হয়।
কিছু অনাদর্শ ও নীতিহীন মা বাবা কন্যা সন্তান জন্ম দিয়ে তাদেরকে আদর্শ শিক্ষা না দিয়ে আদব কায়দা না শিক্ষা দিয়ে বড় লোকের ও শিক্ষিত ছেলেদের পেছনে লেলিয়ে দেয়। ফলে তারা প্রেম ও ভালবাসার অভিনয় করে বড় লোকের ও শিক্ষিত ছেলেদের মাথা খারাপ করে তাদের মা বাবাকে বাধ্য করে তাকে বউ হিসেবে ঘরে তুলতে। তবে কিছু দিন যেতে না যেতেই ঐ ছেলে মা বাবা কে বাদ দিয়ে শাশুড়ী ও বউয়ের পুঁজা করা শুরু করে দেয়। ঐ ছেলে বউ ও শাশুড়ীর মোহে পড়ে গর্ভ ধারিনী মা বাবা কে ভুলে যায়। ঐ ছেলে বউয়ের মুখে মায়ের নামে মিথ্যা কুটনামীর কথা শুনতে খুবই মজা পায়। মা যদি শাসন করতে দুই একটি কথা বলে তা সহ্য হয় না। আর বউ এবং শাশুড়ীর মিথ্যা বানোয়াট কথা শুনতে মধুরমত লাগে। অনেকে দুষ্ট বউয়ের কথায় সুখের সংসারে আগুন লাগিলে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে জান মাল ইজ্জত নিয়ে ছিনি মিনি খেলে সংসারটাকে জাহান্নামে পরিণত করে। কুরআন ও হাদীসের কোথায় আছে মা বাবাকে বাদ দিয়ে শ্বশুড় বাড়ির লোকের কথা মত চলতে? আর সেই দুষ্ট মহিলা বউ হিসেবে শ্বশুড় বাড়ি যেতে না যেতেই আমার স্বামী, আমার টাকা, আমার সব করে ছেলেকে তার মা বাবা, ভাই বোন থেকে আলাদা করে ফেলে। অথচ আমার স্বামী কোথা থেকে আসল, আর তার টাকাই বা কোথা থেকে আসল বা কে তার স্বামীকে জন্ম দিল, লালন পালন করল এবং লেখা পড়া করিয়ে আদর্শবান, শিক্ষিত যুবক হিসেবে গড়ে তুলল সেসব চিন্তা কখনো করে না। হয়তো বা ঐ কন্যার মা বাবা তার বাবা মার সাথে সেইরকমই করেছিল যা আজ তাদের সন্তানও ওদের থেকে শিক্ষা পেয়েছে। আমার কিছুই বুঝে আসে না গর্ভধারীনী মাকে ভুলে গিয়ে একজন সন্তান কেমন করে থাকতে পারে যে মা ১০ মাস ১০ দিন পেটে ধারণ করে লালন পালন করেছেন। লেখা পড়া শিখিয়েছেন সে মাকে কেমনে কষ্ট দিতে পারে। মা না খেয়ে ছেলেকে খাওয়াইয়াছে, স্বামীর অত্যাচার সহ্য করেছে। দিন রাত ঘুমাই নি! এই সব ক্ষেত্রে স্বামী তার স্ত্রীকে বুঝানো উচিত । আর যদি না বুঝে তাহলে আমি মনে করি জাহান্নামের শাস্তি থেকে নিজে বাচার জন্য এবং নিজের পরিবারকেও শাস্তি থেকে বাচানোর জন্য ঐ স্ত্রীকে কঠিন থেকে কঠিন শাস্তি দেওয়া উচিত।
মা বাবার সাথে কেমন ব্যবহার করতে হবে এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা মাতার সাথে সদ্বব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উহ’ শব্দটিও বলো না। এবং তাদেরকে ধমক দিও না। এবং বল তাদেরকে শিষ্ঠাচারপূর্ন কথা। [সূরা ইসরা : ২৩]
হাদিসে বলা হয়েছে- ‘ তুমি এবং তোমার মাল তোমার (মা) বাবার জন্য। হযরত ইবরাহীম আ. এর ঘটনা আমরা সবাই জানি যে, তিনি তার পুত্র ইসমাইল আ. কে বলেছিলেন তোমার চৌকাট বদলাও। সাথে সাথে পিতার আদেশ পালনার্থে তিনি নিজ স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলেন। কেননা ইবরাহীম আ. নবী জানতেন বেশুকর বউয়ের ঘরে ভাল সন্তান জন্ম হতে পারে না। কারণ ইসমাঈলের বংশে আমাদের শ্রেষ্ঠ নবীর জন্ম হবে। তাই ইবরাহীম আ. ছেলে ইসমাঈলকে নিজ স্ত্রী তালাক দেওয়ার আদেশ করেছেন। আমাদের শ্রেষ্ঠ নবী বলেছেন মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। এরকমভাবে হযরত উমর রা. তার সন্তান আব্দুল্লাহকে বলেছিলেন তোমার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দাও। হযরত আব্দুল্লাহ রা. পিতার আদেশ পালনার্থে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলেন। এগুলো হলো একজন সন্তান তার পিতা মাতার কাছে আনুগত্য প্রকাশের বহিঃপ্রকাশ।
ছেলের বউ হিসেবে যখন অন্য সংসারের কোন মেয়ে নব বধুর রূপ নিয়ে স্বামীর সংসারে আসে তখন একটি সংসার আনন্দময়, সুখময় ও ফলপ্রসূ হওয়ার জন্য বউ শাশুড়ির মিল- মোহাব্বত অত্যন্ত জরুরি। বউ শাশুড়ির মাঝে যদি মিল-মোহাব্বত থাকে তাহলে সংসারে সুখ-সমৃদ্ধির জোয়ার আসে। সংসার হয়ে ওঠে জান্নাতের টুকরা। আর যদি সংসারের এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের মাঝে বিরূপ সম্পর্ক থাকে তাহলে সংসারের শান্তি হয়ে যায় সোনার হরিণ। জীবন তখন হয়ে ওঠে দুর্বিসহ। সংসারটা হয়ে যায় জাহান্নামের টুকরা। একটি সংসারকে সুখ-সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত করার জন্য যেমনি প্রয়োজন শাশুড়ির সুনিপুন পরিচালনা, তেমনি প্রয়োজন বউয়ের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা। এক্ষেত্রে বউ তার শাশুড়িকে শ্রদ্ধা করবে। মনে করবে তার শাশুড়ি তার জন্য জননীতুল্য শ্রদ্ধার পাত্র। শ্বশুরকে মনে করবে পিতাতুল্য। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে তার আচরণ হবে হৃদ্যতাপূর্ণ। বউয়ের দায়িত্ব হলো শাশুড়িকে সম্মান করা। যৌথ পরিবার হলে তার নির্দেশ মতো সংসার চালানো। শাশুড়িকে নিজের প্রতিপক্ষ বা শত্রু না ভাবা। বউয়ের চিন্তা করা উচিত যে, শাশুড়ি যদি তার প্রতিপক্ষ বা শত্রু হত তাহলে তাকে ছেলের বউ করে ঘরে তুলত না। অনেক বউ আছেন, শাশুড়ি বা ননদের কথা তিলকে তাল বানিয়ে স্বামীর কাছে মায়া কান্না করে স্বামী ও তার মা-বোনদের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করে দেয়। স্বামী বেচারাও ধূর্ত স্ত্রীর প্রতারণায় পড়ে মা বোনদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। এতে মা-ছেলের মায়া জড়ানো সম্পর্ক বিনষ্ট হয়ে যায় এবং মা বেচারী খুবই অপমানবোধ করেন। বউয়ের মনে রাখা উচিত যে, যে স্বামীর খেদমত করা মহান আল্লাহ তাআলা তার ওপর ফরজ করে দিয়েছেন। তার জন্মদাতা মাকে খুশি করলে সে নিশ্চয় খুশি হবে। এতে তার স্বামীর জান্নাতের রাস্তা ও যেমন সুগম হবে তেমনি তারও দুনিয়া আখেরাত কল্যাণকর হবে।
হাদীসে আছে, বিখ্যাত সাহাবি হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, হযরত রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ওই ব্যক্তি নিকৃষ্ট, অপমানিত, পর্যুদস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত; যার পিতা-মাতাকে বা যে কোনো একজনকে বার্ধক্যকালে পেয়েছে, কিন্তু সে (তাদের খেদমত করে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারেনি’। [মুসলিম শরিফ]
এই পবিত্র হাদিস থেকে প্রতীয়মান হলো যে, মা-বাবার খেদমত করা কতই বরকতময় আমল। যে কাজের বিনিময়ে জান্নাত নিশ্চিত হতে পারে, তার চেয়ে বড় আমল আর কী-ই বা হতে পারে? অথচ আমরা আমাদের চারদিকে আজ কী দেখছি? সন্তান কর্তৃক মা-বাবাকে নির্যাতন, বয়সের ভারে ন্যুজ মা-বাবাকে অবহেলা করা, মা-বাবাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া, মা-বাবার ভরণ-পোষণ না করা এসব অমানবিক কাজগুলো আমাদের দেশে অহরহ হতে দেখা যায়। এমনকি প্রাণপ্রিয় সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতাকে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হতেও দেখা যায়। যা কল্পনা করাও জঘন্য গুনাহ। অথচ রাব্বুল আলামীন মহান আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের সঙ্গে মা-বাবার খেদমতকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন,
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا ﴿الإسراء: ٢٣﴾
তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা মাতার সাথে সদ্বব্যবহার কর। তাদের একজন বা উভয়কে যদি তোমার জীবদ্দশায় বয়োবৃদ্ধ অবস্থায় পাও, তবে তাদের ‘উফ’ শব্দটিও বলো না, আর তাদের ধমক দিওনা বা কটু কথা বলো না; বরং তাদের সঙ্গে সুন্দর ও নরম ভাষায় কথা বলো। তোমার দুই বাহু তাদের পদতলে বিছিয়ে দাও, (তাদের খেদমতের সর্বাত্মক নিজেকে নিয়োজিত রাখো।) আরো বলোÑ হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের ওপর রহম করো যেভাবে তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন’। [সূরা আল ইসরা : ২৩-২৪]
প্রিয় পাঠক! আল্লাহ তাআলার কালামের প্রতি লক্ষ্য করুন। মা-বাবার প্রতি কীভাবে আচরণ করতে হবে তা কত সুন্দর সাবলীল ভাষায় আমাদের বলেছেন। বুকে হাত দিয়ে কী আমরা বলতে পারি আমরা মা-বাবার প্রতি সে রকম আচরণ করছি? অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, আর আমি মানুষকে তার পিতা মাতার সাথে সদ্ধ্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দু বছরে হয়। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমার নিকট ফিরে আসতে হবে। [সূরা লুকমান : ১৪]
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরকারকরা বলেন, পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা ব্যতীত আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় হয় না।
আল্লাহ তাআলা ও প্রিয়নবী হযরত রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর আসমানের নিচে আর যমীনের ওপর মা-বাবার চেয়ে অধিক সম্মানের যোগ্য, অধিক সদাচারণের উপযোগী, অধিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম পৃথিবী আর কেউ নেই। আল্লাহ তাআলার ইবাদতের পর মা-বাবার খেদমত করা মানব সন্তানের ওপর ফরজ। মা-বাবা বিধর্মী হলেও তাদের প্রতি কোনো অবস্থাতেই অশ্রদ্ধাপূর্ণ ব্যবহার করা যাবে না।
হযরত ইবনে আব্বাস রা.বর্ণনা করেন, নবী করীম সা. বলেন, “যে সৎচরিত্রবান সন্তান মাতা-পিতার প্রতি একবার ভালবাসাপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায়, আল্লাহ তাআলা তার প্রতিদান স্বরুপ একটি মকবুল হজ্জের সওয়াব দান করেন। উপস্থিত লোকসকল জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সা. যদি কেউ এমনিভাবে একদিনে একশতবার মহব্বত ও দয়ার সাথে তাকায়? হুজুর সা. বললেন, হ্যাঁ একশতবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেও একশত কবুল হজ্জের সওয়াব পাবে।”[মুসলীম, মাআরিফুল হাদীস]
সন্তানের ওপর পিতা-মাতার কতগুলো হক বা অধিকার
সন্তানের ওপর পিতা-মাতার কতগুলো হক বা অধিকার রয়েছে। যথাÑ ১. খাবার না থাকলে খাবারের ব্যবস্থা করা ২. কাপড় না থাকলে কাপড়ের ব্যবস্থা করা ৩. বসবাসের মতো ঘর না থাকলে ঘরের ব্যবস্থা করা ৪. অসুস্থ হলে চিকিৎসা করানো ৫. মা-বাবার খেদমত করা ৬. ডাকার সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেওয়া ও হাজির হওয়া ৭. বিনয়, ভদ্রতা ও নম্রতার সঙ্গে কথা বলা ৮. তাদের নাম ধরে না ডাকা। এটা চূড়ান্ত বেয়াদবি ৯. তাদের পিছনে চলা, সামনে বা ডানে বামে হাঁটা অনুচিত ১০. যা নিজের জন্য পছন্দ করবে, তা মা-বাবার জন্যও পছন্দ করা। পক্ষান্তরে যা নিজের জন্য অপছন্দ করবে, তা তাদের জন্যও অপছন্দ করা ১১. সর্বাবস্থায় তাদের জন্য দোয়া করা। মা-বাবার জন্য দোয়া না করলে জিন্দেগী সংকীর্ণ হয়ে যায়। ১২. যদি তারা কোনো হুকুম দেয়, সঙ্গে সঙ্গে তা তামিল করা। তবে গুনাহর হুকুম করলে তা আমল করা যাবে না। ১৩. সর্বাবস্থায় নিজের এবং স্ত্রী ও সন্তানের ওপর মা-বাবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। ১৪. মৃত্যুর পর মা-বাবার বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে সদাচারণ করা। ১৫. মৃত্যুর পর মা-বাবার কবর জিয়ারত করা ১৬. মৃত্যুর পর মা-বাবার জন্য ঈসালে সাওয়াব করা। কোরআন তেলাওয়াত, দরূদ শরীফ, দোয়া-দরূদ, নফল নামাজ, জিয়াফত ও দান-সাদকাহ করে ঈসালে সাওয়াব করা যায়।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছেলেকে বাঁচানোর জন্য মায়ের মমতাকে জাগিয়ে দিয়েছিলেন
তাম্বিহুল গাফেলীন (৭৩ নং পাতা) গ্রন্থে উল্লেখ আছে, আনাস ইবনে মালেকরা. বলেন: “রাসুলুল্লাহ সা. এর যুগে আল্কামাহ্ নামে এক যুবক ছিল। সে বিভিন্ন দিক দিয়ে দ্বীনের সাহায্য করার চেষ্টা করত। সে খুব বেশী বেশী দান করত। অকস্মাত সে এক কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ল। তার স্ত্রী কোন এক লোকের মারফত রাসুলুল্লাহ সা. এর নিকট এই সংবাদ প্রেরণ করল। খবর শুনে রাসুলুল্লাহ সা. হযরত আলি, হযরত বেলাল, হযরত সালমান ফারসী ও হযরত আম্মার রা. কে তার অবস্থা দেখার জন্য পাঠালেন। যখন তারা পৌঁছলেন তখন আল্কামাহ্ এর প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত। তাঁরা আল্কামাহ্ কে কালেমায়ে তাওহীদের তালকীন দিলেন। কিন্তু শত চেষ্টা সত্বেও তার মুখে কালেমা উচ্চারিত হয় না। এই শোচনীয় অবস্থার সংবাদ তারা হযরত বেলাল রা. এর মাধ্যমে নবী সা. এর নিকট পাঠালেন। রাসুলুল্লাহ সা. জিজ্ঞেস করলেন তার মাতা পিতা জীবিত আছে কি? হযরত বেলাল রা. উত্তর দিলেন তার বৃদ্ধ মাতা জীবিত আছেন। নবীজী সা. হযরত বেলাল রা. এর মারফত ঐ বৃদ্ধার নিকট সংবাদ প্রেরণ করলেন যে, সম্ভব হলে তিনি যেন নবীজী সা. এর সাথে সাক্ষাত করেন। অপারগ হলে রাসুলুল্লাহ সা. স্বয়ং তার নিকট যাবেন। আল্কামাহ্ এর মাতা বললেন,আমার জীবন রাসুল সা. এর জন্য কোরবান হোক। আমি নিজেই রাসুলুল্লাহর সা. এর দরবারে উপস্থিত হব। অতঃপর লাঠিতে ভর করে নবীজী সা. র দরবারে উপস্থিত হয়ে সালাম করতঃ বসে পরলেন।সালামের জবাব দিয়ে নবীজী সা. বললেন, যা জিজ্ঞেস করব ঠিক ঠিক উত্তর দিবে। আল্কামাহের জীবনকাল কেমন ছিল? তার মা বলল, সে বেশী বেশী নামায পড়ত ও রোযা রাখত। আর দান সদকা করার তো কোন সীমা ছিল না। রাসুলুল্লাহ সা. পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, তোমার এবং তার মধ্যকার সম্পর্ক কেমন ছিল? বৃদ্ধা উত্তর দিল, আমি তার প্রতি অসন্তুষ্ট। সে আমার উপর স্ত্রীকে প্রাধান্য দিত এবং স্ত্রীর কথামত চলত। নবীজী সা. বললেন: মাতার অসন্তুষ্টিই তাকে কালেমা পড়া থেকে বিরত রেখেছে। রাসুলুল্লাহ সা. হযরত বেলাল রা.কে বললেন, কিছু শুকনা কাঠ সংগ্রহ কর আমি আল্কামাহকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলবো। এই কথা শুনে তার বৃদ্ধা মা অস্থির হয়ে নবীজী সা. কে বলতে লাগলেন আমার সামনে আমার কলিজার টুকরাকে আগুনে পোড়াবেন না; আমি সহ্য করতে পরব না। রাসুলুল্লাহ সা. বললেন, আল্লাহর আযাব ইহা অপেক্ষা অনেক শক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী। তুমি যদি চাও আল্লাহপাক তোমার ছেলেকে ক্ষমা করুক, তবে তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাও। আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমার সন্তুষ্টি ব্যতীত তার নামায, রোযা এবং অন্যান্য ইবাদত বিন্দুমাত্র কাজে আসবে না। এই কথা শোনামাত্র বৃদ্ধা বলতে লাগল, ইয়া রাসুলাল্লাহ সা., আমি আল্লাহকে, আপনাকে এবং উপস্থিত সকলকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আল্কামাহর প্রতি সন্তুষ্ট। নবীজী সা. বেলাল রা.কে বললেন, গিয়ে দেখ আল্কামাহ্ কালেমা পড়তে পারছে কিনা। বেলাল রা. দরজায় পৌঁছে শুনতে পেলেন আল্কামাহর স্বর ভেসে আসছে। সে পাঠ করছে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। হযরত বেলাল ভিতরে প্রবেশ করে সবাইকে বললেন, তার মাতার অসন্তুষ্টিই তাকে বাকরুদ্ধ করে রেখেছিল”।
কাজেই, সন্তান হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজ নিজ পিতা মাতা বেঁচে থাকতে তাঁদের যথাসাধ্য খেদমতের মাধ্যমে আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি লাভের চেষ্টা করা অথবা মৃত বাবা মা’র জন্য সবসময় দোআ করা, যেন আল্লাহপাক তাঁদের জান্নাতে প্রবেশ করানোর মাধ্যমে সন্তান হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের পিতা মাতার প্রতি যথাযথ কর্তব্য পালনের সুযোগটুকু দান করেন।
মায়ের দিকে মুহাব্বতের নযরে তাকালে মাকবুল হজ্বের সওয়াব পাওয়া যায় । কিন্তু মানুষের তো ঐ হজ্বের দরকার নেই, তাদের শুধু দরকার দুই লাখ তিন লাখ টাকা খরচ করে এই হজ্ব করা! প্রিয় পাঠক আপনার মায়ের হয়ে যান। মায়ের হয়ে গেলে আল্লাহর হয়ে যাবেন। আর আল্লাহর হয়ে গেলে আল্লাহও আপনাদের হয়ে যাবেন। মাকে কখনো কষ্ট দিবেন না। যে মায়ের অবস্থা এমন যে, সন্তান অসুস্থ হলে তাঁর আর কোনো অসুস্থতা থাকে না, নিজের সকল অসুস্থতার কথা ভুলে যান সন্তানের চিন্তায়-সেই মাকে মানুষ কীভাবে মাকে কষ্ট দেয়!
আপনারা যদি বাঁচতে চান তাহলে মায়ের বিষয়টা খেয়াল রাখার চেষ্টা করেন। এটা আমাদের জন্য একটা বিরাট রাস্তা। এই রাস্তায় আমাদের বড় বড় সৌভাগ্য আসতে পারে। আবার এটা আমাদের বরবাদিরও কারণ হতে পারে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- هما جنتك أو نارك মা-বাবা হল তোমার জান্নাত কিংবা জাহান্নাম। অর্থাৎ মা-বাবার মর্যাদা রক্ষা করে কেউ জান্নাতে যাবে আবার মা-বাবার অমর্যাদা করে কেউ জাহান্নামে যাবে। আর আল্লাহ তাআলা তো মুশরিক মা-বাবার সঙ্গেও সদাচরণ করার আদেশ দিয়েছেন।
এই পৃথিবীতে আপনাকে নিয়ে ভাববার কেউ নেই। এমনকি বাবাও আপনাকে নিয়ে তেমন ভাবেন না যেমন ভাবেন আপনার মা। ঘরে ভালো কিছু রান্না হলে আপনি নেই তাই নিজেও খেতে পারেন না। এমন মাকে ভালবাসবে না, সম্মান করবে না তো কাকে করবেন! মাকে ভালবাসলে, মাকে সম্মান করলে নিজেই লাভবান হবে। লেখাপড়া শিখতে মেধা লাগে, শ্রম লাগে, অনেক কিছু লাগে, কিন্তু মাকে ভালবাসতে, মাকে সম্মান করতে, মাকে খুশি করতে কিছুই লাগে না। তো প্রিয় পাঠক/পাঠিকা! মাকে ভালবাসুন, মাকে সম্মান করুন, মাকে সন্তুষ্ট করুন এবং মায়ের দোআ হাসিল করুন। তাহলে দেখবেন দুনিয়া ও আখেরাতের কোথাও আপনি আটকাবে না। আপনার সন্তান হবে মর্যাদার শীর্ষে।

যত দিন ছেলের মা বাবা জীবিত থাকবেন ততদিন ছেলের বউ তাদের খেদমত ও আনুগত্যকে নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে জানবে এবং সে মতে তাদের খেদমত ও আনুগত্য করবে। তাদের সাথে কথা-বার্তা ও উঠা-বসায় আদব-সম্মানের প্রতি খুব লক্ষ্য রাখবে। শ্বশুর-শাশুড়ীর খেদমত করা আইনতঃ ফরয না হলেও নৈতিক ফরয। পাঠক চলুন একটি বাস্তব ঘটনার মাধ্যমে আমরা তা বুঝার চেষ্টা করি। শরিফের আম্মা আজ দুবছর ধরে অসুস্থ। কোন কিছু মনে রাখতে পারে না। কারো সাথে বেশী কথাও বলে না। কখনো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নীরবে কাঁদে। অনেক ডাক্তার দেখিয়েও ওনাকে ভাল করা যাচ্ছে না। তাই শরিফের আম্মাকে নিয়ে বাসার সবাই চিন্তিত। শরিফের বউ, ছোট বোন, ভাবী ও ছোট ভাইয়ের বউ সারাক্ষণ মা-শাশুড়ীর সেবায় ব্যস্ত। সবাই সেবা-যতœ করে চলেছে। তাদের এই সেবা যতেœ শরিফের বাবা ও তাদের আত্বীয়-স্বজনরা সন্তুষ্ট।
শরিফরা কিভাবে বড় হয়েছে তাদের আম্মা যে কত পরিশ্রম করে তাদেরকে, লেখা পড়া শিখিয়ে, আদব কায়দা শিক্ষা দিয়ে মানুষ করেছে সেই বিষয়ে স্ত্রীকে বিয়ের পরেই জানিয়েছিল। শরিফ বাসর রাতে স্ত্রী ইয়াছমিনকে কয়েকটি কথা বলেছিল, “আম্মা একটু রাগী। আম্মার কোন ব্যবহারে মন খারাপ করো না। কোনো কারনে বাসার বাইরে গেলে আম্মাকে বলে যাবে। সাধ্যমত আম্মার সেবা করবে। কোন সমস্যা হলে আমাকে শেয়ার করবে।”
শরিফের গুণবতী স্ত্রী এই কথাগুলো আজও অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছে। আনন্দচিত্তে শাশুড়ীর সেবা করেই যাচ্ছে। শাশুরবাড়ীতে কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে থাকতে মাঝে মধ্যে মন খারাপ হলেও কাউকে বুঝতে দেয় না। সবকিছু হাসি-মুখে মেনে নেয়।
শারিফ তার মায়ের সেবা-যতেœ অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা স্বরণ করে স্ত্রীকে সব সময় বলে, “ইয়াছমিন, এই সেবার প্রতিদান তুমি দুনিয়া ও আখিরাতে পাবে। এর বিনিময়ে বৃদ্ধ বয়সে তোমার সন্তান ও পুত্র বধু তোমার সেবা করবে। আমরা যদি বাবা-মাদের কষ্ট দিই, তাদেরকে অবহেলা করি, তাদেরকে একা রেখে অন্যত্র বসবাস করি তাহলে আমাদের সন্তানেরাও একদিন আমাদের সাথে এমন আচরণ করবে। তাই কখনো বাবা-মায়ের মনে কষ্ট দেয়া যাবে না। আরেকটা কথা, বৃদ্ধ বয়সে সকলের বাবা-মা তো শিশুর মতই আচরণ করে। শিশুকালে আমরা যেমন বাবা-মার সেবা পেয়ে বড় হয়েছিলাম। আজ তারাও আমাদের সেবা-যতেœ বাকী জীবনটা কাটিয়ে দিবে।”
প্রিয় পাঠক! একটি কথা মনে রাখতে হবে যে, আমরা মা-বাবার সঙ্গে যেরূপ আচরণ করবো, ঠিক একই আচরণ আমরা আমাদের সন্তানদের কাছ থেকে পাবো। তাই মা-বাবার সঙ্গে খারাপ আচরণ করলে মনে রাখতে হবে যে, আমাদের জন্যও ঠিক অনুরূপ বা তারচেয়েও নিকৃষ্ট আচরণ অপেক্ষা করছে। হাদিস শরিফে আছে, ‘কামা তুদীনু তুদান’ অর্থাৎ ‘যেমন করবে, তেমন ভোগবে’। আল্লাহ না করুন! যদি কোনো কারণে মা-বাবার প্রতি অসদ্ব্যবহার করে থাকেন, তবে কাল বিলম্ব না করে তাদের কাছে ক্ষমা চান। তাদের প্রতি কোনোরূপ অবহেলা বা অসদাচরণ করার পূর্বে গর্ভকালীন ১০ মাস ১০ দিন মায়ের পেটে আপনার অবস্থানের কথা চিন্তা করুন। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর মা-বাবা কত কষ্ট করে কত ভালবাসায় আমাকে আপনাকে কুলে তোলে বুকে আগলে রেখে লালন-পালন করেছেন, সে চিন্তা করুন। আমাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার জোগান দিতে মা-বাবা কত গলদঘর্ম হয়েছেন, কত মেহনত করেছেন, কত কষ্টের পাহাড় হাসিমুখে ডিঙিয়েছেন, সেই মা বাবার বৃদ্ধবয়সে বৃদ্ধাশ্রমে কেন তাদের ঠিকানা হবে? আমার অনুরোধ থাকবে আজই মা বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে তাদের বৃদ্ধাশ্রম থেকে ফিরিয়ে আনবে এবং বাকী জীবন তাদেরকে মাথার তাজ বানিয়ে রাখবে। তাহলে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম হবে। যেই মা বাবা শিশুকালে ঠিকমত না খাওয়াতে পেরে, অসুখ হলে অর্থের অভাবে চিকিৎসা করতে নাপেরে ডুকরে কাঁদছেন এবং লালন পালন করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় কষ্টে কাঁদছেন, আজ কেন সেই মা বাবার জন্য একটু কষ্ট সইতে পারব না?  হায় আল্লাহ! এমন মাতা পিতার প্রতিদান আমরা কীভাবে দেবো? একটি কথা মনে রাখবেন, আপনাকে যদি আপনার মা বাবা ছোটকালে ভিক্ষা করে, ইটখলায় ইট ভেঙ্গে, লেবারী করে অথবা বাসায় বাসায় কাজ করে কতইনা নির্যাতন সহ্য করে লালন-পালন করতে পারেন, তাহলে আপনি কেন মা বাবাকে কাজ করে খাওয়াতে পারবেন না? মহান আল্লাহ আমাদেরকে মা বাবার জন্য দোআ শিখিয়েছেন যেন মাতা পিতার জন্য দোআ করি ‘রাব্বির হাম্ হুমা রাব্বাইয়ানী ছাগীরা’ (প্রভু হে! আমার মা-বাবার প্রতি রহম করো, যেভাবে তারা শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছেন) আল্লাহ আমাদের বুঝার তাওফিক দিন। আমিন!

3 মন্তব্য রয়েছেঃ মাতা পিতা সন্তানের জান্নাতের পথ : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

  1. Faruk says:

    Sofine, very fine article,It is Very inprtant for all the marrige life family. zajakallah khiran to the onorable writter.

  2. Nazma sultana says:

    লেখাটি অনুকে ভাল হয়েছে। লেখাটিতে লেখক বর্তমানের বেশিরভাগ যৌথ ফ্যামিলির চিত্র ফুটিয়ে তোলেছেন। যেমন রবিন্দ্র নাথ শিশির গল্পে ততকালিন হিন্দু পরিবারের বাল্য বিবাহের চিত্র অঙ্গায়িত করেছিলেন। আশা করি এ লেখাটি অনেকের উপকারে আসবে। ধন্যবাদ লেখিকা সুফিয়া আপাকে। আল্লাহ আপনাকে সতসাহসের উত্তম বদলা দান করুন। আমিন।

  3. মাশাল্লাহ। my dear sister! Beautiful and very excellent writing. I love you

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight