মসজিদে নামাযের জামাতে নারীর অংশগ্রহণ : হাসান মুহাম্মাদ শরীফ

আমাদের অজানা নয় যে, এ বিশ্বের গোটা রক্ষা ব্যবস্থা মানুষের পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। যদি একজন অন্য জনকে সাহায্য না করে, তবে একাকী মানুষ হিসেবে সে যতই বুদ্ধিমান, শক্তিশালী ও বিত্তশালী হোক, জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় আসবাব-পত্র কিছুতেই সংগ্রহ করতে পারবে না। একাকী মানুষ স্বীয় খাদ্যের জন্য শস্য উৎপাদন থেকে শুরু করে আহার্য করা পর্যন্ত সব স্তর অতিক্রম করতে পারে না। এমনিভাবে পোশাক-পরিচ্ছদের জন্য তুলা চাষ থেকে শুরু করে দেহের মানানসই পোশাক তৈরি করা পর্যন্ত অসংখ্য সমস্যার সমাধান করতে একাকী কোন মানুষ কিছুতেই সক্ষম নয়। আল্লাহ তা’আলা স্বীয় অসীম জ্ঞান ও পরিপূর্ণ ক্ষমতায় বিশ্ব চরাচরের জন্যে এমন অটুট ব্যবস্থাপনা রচনা করেছেন, যাতে প্রত্যেকটি মানুষই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অন্য হাজারো লাখো মানুষের মুখাপেক্ষী। দরিদ্র ব্যক্তি পয়সার জন্যে যেমন ধনীর মুখাপেক্ষী, তেমনি শ্রেষ্ঠতম ধনী ব্যক্তিও পরিশ্রম ও মেহনতের জন্যে দিনমজুরের মুখাপেক্ষী। তদ্রুপ ব্যবসায়ী গ্রাহকের মুখাপেক্ষী আর গ্রাহক ব্যবসায়ীর মুখাপেক্ষী। গৃহনির্মাতা রাজমিস্ত্রী ও কর্মকারের মুখাপেক্ষী, আর এরা গৃহনির্মাতার মুখাপেক্ষী। চিন্তা করলে দেখা যায়, এ সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা শুধু পার্থিব জীবনের জন্যে নয় বরং মৃত্যু থেকে নিয়ে কবরে সমাহিত হওয়া পর্যন্ত সকল স্তরে এ সাহায্য সহযোগিতার মুখাপেক্ষী। বরং এরপরও মানুষ জীবিতদের ইছালে ছওয়াব ও দুআয়ে-মাগফিরাতের মুখাপেক্ষী থাকে। যদি এহেন সর্বব্যাপী মুখাপেক্ষিতা না থাকতো, তবে কে কার সাহায্যে এগিয়ে আসতো। মোটকথা, সমগ্র বিশ্বের ব্যবস্থাপনা পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এ চিত্রের একটা ভিন্ন পিঠও আছে। তা এই যে, যদি চুরি, ডাকাতি, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদির জন্যে পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা হতে থাকে ও চোর ডাকাতদের বড় বড় দল গঠিত হয়ে যায়, তবে এ সাহায্য ও সহযোগিতাই বিশ্বব্যবস্থাকে বিধ্বস্ত ও তছনছ করে দেয়। এতে বুঝা গেল যে, পারস্পরিক সহযোগিতা একটি দুধারী তরবারী। যা প্রয়োগ ব্যতীত বিশ্বের ব্যবস্থাপনা চলে না। ক্ষুর এর ভুল ব্যবহার গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে বানচাল করে দেয়। সেজন্য কুরআন সুন্নাহ পরস্পর সহযোগিতার একটি মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। যা অবলম্বনে বিশ্বব্যবস্থা অটুট থাকবে আর মানুষের জীবনে নেমে আসবে সুখ-শান্তি, আরাম ও আনন্দের স্রোতধারা। এ মর্মে আল্লাহ তা’আলা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন, তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতিতে একে অন্যের সহযোগিতা করো, গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহায়তা করো না। [সূরা মায়েদা : ২] চিন্তা করলে দেখা যায় যে, কুরআনে কারীম এ আয়াত কেবল মুসলমানদেরকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিচ্ছে। তাও শুধু সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির ক্ষেত্রে। এর দ্বারা সুস্পষ্টভাবে একথা প্রতীয়মান হয় যে, গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে কাউকে সহযোগিতা করা যাবে না, যদিও সে মুসলমান হয়। বরং তাকে গুনাহ ও জুলুম থেকে বিরত রাখাই হবে প্রকৃত সহায়তা। বুখারি শরীফে হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, তোমার (মুসলিম) ভাইকে সাহায্য কর, চাই সে জালেম হোক কিংবা মাজলুম হোক। সাহাবায়ে কেরাম রা. বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! মাজলুমকে সাহায্য করার অর্থ বুঝতে পেরেছি, কিন্তু জালেমকে সাহায্য করার দ্বারা কি উদ্দেশ্য? তখন রাসূল সা. ইরশাদ করেন, তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখ, এটিই তার সাহায্য। [বুখারি : ৩/১৩৮-হাদীস নং ২৪৪৪] কুরআন পাকের এ শিক্ষা, সৎকর্ম ও তাকওয়া তথা আল্লাহভীতিকে মাপকাঠি বানিয়েছে। এর ভিত্তিতেই পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে। আর এর বিপরীতে পাপ ও অত্যাচারকে কঠোর অপরাধ গণ্য করেছে এবং এতে সাহায্য-সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছে। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি হেদায়েত ও সৎকর্মের প্রতি আহ্বান জানায়, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারী লোকদের ছাওয়াবের সমপরিমাণ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের ছাওয়াব হ্রাস করা হবে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পাপের প্রতি আহবান করে, কেয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়াদানকারীদের গুনাহের সমপরিমাণ গুনাহ তাকে দেয়া হবে। এতে তাদের গুনাহ হ্রাস করা হবে না। [মুসলিম শরীফ : ৪/২০৬০- হাদীস নং ২৬৭৪] অন্য রেওয়ায়েতে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন অত্যাচারীর সাথে তার সাহায্যার্থে বের হয়, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়। [মুজামুল কাবীর তাবরানী : ১/২২৭] হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন ঝগড়া-বিবাদে অন্যায় পথে সহযোগিতা করে, সে আল্লাহর অসন্তুষ্টির মধ্যে থাকে, যতক্ষণ না তা হতে ফিরে আসে। [মুসতাদরাকে হাকেম : ৪/৯৯- হাদসি নং ৭০৫১, বাইহাকী : ৬/১২৩- হা. ৭৬৭৬] এছাড়াও হাদীসের গ্রন্থাবলীতে এ প্রসঙ্গে আরও অসংখ্য হাদীস বর্ণিত রয়েছে, যেগুলি অধ্যয়ন করলে একথাই পরিস্ফুটিত হয় যে, সৎকাজ ও আল্লাহভীতিতে সহায়তা করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য আর গুনাহ ও জুলুমের ক্ষেত্রে সহায়তা হারাম। গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা করার কয়েকটি চিত্র আল্লামা আশেকে ইলাহী বুলন্দশহরী রহ. স্বীয় তাফসীর গ্রন্থ আনওয়ারুল বয়ানে উল্লেখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেন, যে চাকরী বা পদের কারণে গুনাহে লিপ্ত হতে হয়, তা গ্রহণ করা হারাম, এভাবে গুনাহের আইন প্রণয়ন করাও হারাম। কেননা, এর দ্বারা গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হয়। এমনিভাবে মদের কারখানায় চাকুরী করা কিংবা অন্য কোন মাধ্যমে সহযোগিতা করা অথবা এমন চাকুরী করা যাতে শরীয়ত পরিপন্থী কাজে অন্যকে সহায়তা করা হয় বা সুদ-ঘুষের লেন-দেন করা হয় অথবা সুদ-ঘুষ আদান-প্রদানের মাধ্যম হতে হয়, এধরণের চাকুরী করা হারাম এবং তা থেকে অর্জিত বেতন হারাম। এভাবে চোর, ডাকাত, লুটতরাজকারী ও অত্যাচারীর সহায়তা করাও হারাম। [তাফসীরে আনওয়ারুল বয়ান : খ-৩, পৃ. ১২] রাসূল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এ শিক্ষার সুফল রাসূলুল্লাহ সা. কে যখন দুনিয়ায় প্রেরণ করা হলো তখন ত পুরো ‘আরব উপদ্বীপ’ নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতার নরকে পরিণত ছিল। হত্যা ও নাশকতার বাজার গরম ছিল। লুণ্ঠনকে বীরত্ব ও বাহাদূরী মনে করা হতো। কন্যা সন্তানকে জীবন্ত দাফন করে বড়াই করা হতো। নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থীরতার সেই পরিবেশে রাসূলুল্লাহ সা. সংবাদ দিয়েছিলেন, একটা সময় আসবে একজন নারী একাকী হীরা থেকে ভ্রমণ করে মক্কায় এসে তাওয়াফ করবে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সে ভয় করবে না। [বুখারি শরীফ : ৪/৫৩৮ হাদীস নং ৩৫৯৫] জগদ্বাসী প্রত্যক্ষ করেছে, রাসূল সা. এর ইন্তেকালের পূর্বেই সেই সময় এসেছিল। যে ‘আরব উপদ্বীপ’ হিংসা বিদ্বেষ, শত্র“তা ও অস্থিরতার জলন্ত আঙ্গার ছিল, সেখানে ভালোবাসা, হৃদ্রতা, একতা, শান্তি ও নিরাপত্তার ফুল প্রস্ফুটিত হয়েছিল ও গড়ে উঠেছিল বেহেশতি নহরের পানিতে বিধৈাত একটি সুশীল আদর্শ সমাজ। আরবের এ চিত্র পুলিশ কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে হয়নি। বরং কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষার ফলে হয়েছিল। কুরআন সুন্নাহর এ শিক্ষাই মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিটি ব্যক্তির অন্তরে তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির বীজ রোপণ করে দিয়েছিল। এবং প্রতিটি ব্যক্তিকে অপরাধ উৎপীড়ণ দমনের জন্যে সিপাহী রূপে গড়ে তুলেছিল। আর বানিয়েছিল তাদেরকে তাকওয়া ও সৎকাজের অনন্য সহযোগী। এর ফলে সৎকাজের সহযোগিতায় তারা ছিলেন প্রতিযোগী। আর অসৎকাজ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখতে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায়। তদ্রুপ নিজেকে পাপ ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে তারা ছিলেন সর্বদা সচেতন। এরই অনিবার্য পরিণতি ছিল যে, তারা অপরাধের প্রতি পা বাড়াতেনই না। ঘটনাক্রমে যদি কখনও অপরাধ সংঘটিত হয়ে যেত, আল্লাহর ভয় তাদেরকে অস্থির করে তুলত, তখন নিজেই রাসূল সা. এর দরবারে গিয়ে স্বীকার করতো। যতক্ষণ পর্যন্ত এর পূর্ণ প্রতিকার না হতো পরকালের চিন্তায় ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি পেতো না। কুরআনের এ শিক্ষা পরিহারের পরিণাম কিন্তু আমাদের অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা গুনাহের ক্ষেত্রে সহায়তা ও সৎকাজে বাধা প্রদান করতে ব্যতিব্যস্ত। সচরাচর পরিলক্ষিত হয় যে, যদি কোন ব্যক্তি ইসলামী বেশভূষা গ্রহণ করতে চায়, সুন্নতি পোশাক পরিধান করতে চায়, সুন্নত মোতাবেক জীবন যাপন করতে চায়, তখন তার বন্ধুবান্ধব, পরিবারবর্গ ও অফিসের লোকজন চেষ্টা করে, সে যেন এই ছাওয়াবের কাজ থেকে বিরত থাকে এবং আমাদের ন্যায় (পাপী) হয়ে যায়। আজকাল সৎকাজে সহায়তা করতে কেউ প্রস্তুত নয়। কিন্তু কেউ যদি গুনাহ করার ইচ্ছা করে তখন সবাই তার সহযোগী হয়। হারাম উপার্জন করলে, সুদ গ্রহণ করলে ও দাড়ি মুন্ডালে স্ত্রীও খুশী, মা-বাবাও খুশি, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজের লোকজন খুবই খুশী। যদি সৎপথে চলতে চায়, সুন্নাতের উপর চলতে চায়, তখন সবাই অসন্তুষ্ট। বন্ধু নিজের পকেটের টাকা খরচ করে সিনেমা হলে নিয়ে যায়। গান বাদ্য ও মদের আসরে নিয়ে যায়। তারপর ধোঁকা দিয়ে নাপিতের দোকানে নিয়ে যায়, নিজের পকেটের টাকা দিয়ে দাড়ি কামিয়ে দেয়। আবার অনেকে অন্যের দুনিয়া সাজাতে নিজের আখেরাত ধ্বংস করে। যেমন, নির্বাচনের সময় ভোটার এবং সমর্থকরা একথা ভালোকরেই জানে যে, আমরা যে পার্থীকে পদে বসাতে চাচ্ছি সে একজন ফাসেক ও জালেম। পদ অর্জনের পর তার জুলম আরো বৃদ্ধি পাবে। তবুও তার সহযোগিতায় লিপ্ত থাকে। তাকে সফল করার লক্ষে তার প্রতিপক্ষের দুর্ণাম রটিয়ে বেড়ায়। কখনো কখনো বিপক্ষের লোকদেরকে হত্যাও করা হয়। এটি কতবড় অহমিকা ও নির্বুদ্ধিতা যে, নিজের আখেরাত ধ্বংস হবে আর অন্যের দুনিয়া অর্জন হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন নিকৃষ্টতম ব্যক্তিদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিও হবে যে, অন্যের দুনিয়ার জন্যে নিজের আখেরাত ধ্বংস করেছে। [ইবনে মাজা : ৪/৩৩৯ হা. ৩৯৬৬] আজ আমাদের গুনাহ ও অপরাধের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার কারণে, সারাবিশ্বে অপরাধ, চুরি, ডাকাতি, অশ্লীলতা, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদি ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ তা দমন করতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এহেন দুর্গতি, দুরাবস্থা ও অস্থিরতা থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করতে হলে, কুরআনের এই মূলনীতি অনুসরণ হবে এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত ও অপরাধ দমনের লক্ষে প্রত্যেক ব্যক্তিই সচেষ্ট হতে হবে। শিক্ষার্থী : উচ্চতর তাফসীর গবেষণা বিভাগ, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা।

বিশেষ হেকমতের কারণেই আল্লাহপাক মানুষকে দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। নারী ও পুরুষ। মানুষ হিসেবে তারা উভয়েই সমান। তবে প্রত্যেক শ্রেণীই কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য, গঠনগত কাঠামো, শারীরিক সক্ষমতা, আকর্ষণ-বিকর্ষণসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্রের অধিকারী। স্বাভাবিক জীবন যাপনের ক্ষেত্রে এই পার্থক্যের যেমন প্রভাব রয়েছে ঠিক তেমনি ধর্মীয় বিধি বিধান পালনের ক্ষেত্রেও এর বড় একটা প্রভাব রয়েছে। নারীদের বেশীরভাগ বিধানের ক্ষেত্রেই সতর, পর্দা ও নিরাপত্তার ব্যাপারে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা হয়েছে। যেমন হজের সফরে আর্থিক সচ্ছলতার পাশাপাশি নারীদের জন্য মাহরামেরও ব্যবস্থা থাকতে হবে। ইহরাম অবস্থায় পুরুষের জন্য মাথা ঢেকে রাখা নাজায়েয হলেও নারীদেরকে অবশ্যই মাথা ঢেকে রাখতে হবে। পরপুরুষের সামনে নারীকে পুরুষের তুলনায় বেশী আবৃত হয়ে থাকতে হবে। আযান ইকামাতসহ আরো বেশ কিছু বিষয়ে নারী-পুরুষের বিধান পালনে পদ্ধতিগত পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে। এমনই একটি পার্থক্যপূর্ণ বিষয় হলো মসজিদে নামাযের জামাতে নারীর অংশগ্রহন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে অনেক নারীই পুরুষের মতো মসজিদে নামাযের জামাতে অংশ নিতেন। অবশ্য এক্ষেত্রে তিনি কিছু নীতিমালার কথাও বলে দিয়েছিলেন। যেমন-
– উগ্র কোনো সুগন্ধি বা প্রসাধনী ব্যবহার করে জামাতে আসা যাবে না। [মুসলিম হাদীস-১০২৫, ইবনে মাজাহ হাদীস-৪০০১]
রাস্তার একপাশ দিয়ে যাতায়াত করতে হবে। [আবু দাউদ হাদীস-৫২৭৪]
– তারা সাধারণতঃ রাতের নামাযে (ফজর, মাগরিব, ইশা) আসবে। [বুখারী হাদীস-৮৫৭]
– পর্দার ব্যাপারে পূর্ণ যতœবান থাকতে হবে। [সুরা আল আহযাব-৫৯]
– নারীর কাতার সবার শেষে থাকতে হবে। [ইবনে মাজাহ হাদীস-১০০০]
– পুরুষের আগেই নারীদের মসজিদ থেকে বের হয়ে যেতে হবে। [বুখারী হাদীস-৮২৮]
সর্বাবস্থাতেই পুরুষদের সাথে মেলামেশা এড়িয়ে চলতে হবে। [আবু দাউদ হাদীস-৫২৭৪]
কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন বাধ্যবাধকতাও ছিলো যে, পুরুষরা সেজদা থেকে না উঠা পর্যন্ত নারীরা সেজদা থেকে উঠতে পারবে না। [মুসনাদে আহমাদ বিন হাম্বল: হাদীস-১৫৬০০]
এসব নীতিমালা মেনে চলার পরও গৃহস্থালী ও সন্তান-সন্তুতি দেখভালে কিছুটা ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হওয়ায় কোনো কোনো সাহাবী তাঁর পরিবারস্থ নারীদের মসজিদে যেতে আপত্তি জানাতেন। ফলে একবার কিছু নারী মসজিদে আসার ব্যাপারে তাদের স্বামী/অভিভাবকদের আপত্তির কথা রাসূল সা. কে জানালে পুরুষদের লক্ষ্য করে তিনি বলেন, তোমরা নারীদের মসজিদে আসতে বারণ করো না। তবে পরক্ষণেই রাসূল সা. একথাও বলে দেন যে, মসজিদের চেয়ে ঘরে নামায পড়াই নারীদের জন্য বেশী ভালো। [সহীহ ইবনে খুযাইমা হাদীস-১৬৮৪]
অন্য এক হাদীসে তিনি বলেন, কমন রুমে নামায পড়ার চেয়ে নারীদের জন্য কামরায় নামায পড়া উত্তম। আবার কামরায় নামায পড়ার চেয়ে নিজ কক্ষে নামায পড়া তাদের জন্য বেশী উত্তম। [আবু দাউদ হাদীস-৫৭০]
নারীদের জন্য তুলনামূলক উত্তম জায়গা থাকতেও রাসূল সা. তাদের মসজিদে আসতে উৎসাহিত করেছেন; এর কারণ হলো, নববী যুগ ছিলো ওহী নাযিলের যুগ। তখন নিয়মিতই নতুন নতুন শরঈ বিধানাবলি নাযিল হতো। আর এগুলো জানার সর্বোত্তম উপায় ছিলো জামাতের নামাযে অংশগ্রহণ। কারণ রাসূল সা. সাধারণতঃ নামাযের আগে বা পরে শরঈ বিধানাবলির শিক্ষামূলক আলোচনা করতেন। রাসূল সা. এর কাছ থেকে সে আলোচনা সরাসরি শুনতেই নারীরা আগ্রহভরে মসজিদে আসতেন।
তাছাড়া নৈতিকতার মানদ-ে সে যুগ ছিলো ইতিহাসের সর্বোত্তম যুগ। নিরাপত্তাহীনতা বা সামাজিক অপরাধ তখন ছিলোনা বললে সামান্য বাহুল্য হবেনা। পক্ষান্তরে নববী যুগ পরবর্তী সময়ে শরঈ বিধানাবলি শেখার জন্য মসজিদই একমাত্র জায়গা আর থাকেনি। দ্বীনি শিক্ষা-দীক্ষার এতোটা প্রসার ঘটেছে যে, ঘরে থেকেই কিংবা নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে নানাভাবে অনায়াসেই তা অর্জন করা সম্ভব। অপরদিকে নৈতিকতার অবক্ষয় এবং সমাজ ব্যবস্থায় ক্রম অধঃপতন নেমে আসায় নারীদেরকে যথাযথ মূল্যায়ন করার পরিবেশ প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। যেখানে পরিবেশ ব্যতিক্রম সেখানে বিধানও ব্যতিক্রম হতে পারে। তবে সচরাচর অবস্থায় গৃহে অবস্থানকারী নারীদের শুধু জামাতে অংশগ্রহণের জন্য মসজিদে যাওয়া আদৌ সমীচিন নয়। হোক তা ওয়াক্তিয়া নামায কিংবা জুমআ তারাবী বা ঈদের নামায। অনেক মসজিদে সব ধরণের নামাযে নারীদের জন্য একই সাথে জামাতে নামাযের কথা শোনা গেছে। পরবর্তীতে এটাও শোনা গেছে যে, সেখানকার অভিজ্ঞতা খুব সন্তোষজনক নয়।
তবে যে নারীদের বিভিন্ন উপলক্ষ্যে ঘরের বাইরে যেতে হয় এবং দীর্ঘ সময় সেখানে থাকতে হয় আবার সুবিধামতো জায়গা পেলে নামায পড়ার প্রচ- আগ্রহও তাদের ভেতর জাগ্রত থাকে, তাদের জন্য যদি সংশ্লিষ্ট মসজিদ বা নামাযের জায়গগুলোতে জামাতে বা একাকী নামায পড়ার ব্যবস্থা রাখা হয় তাহলে শুধুমাত্র এই ব্যবস্থাপনার কারণেই এসকল নারীদের মাঝে নামাযের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফরয ইবাদত পালনের প্রবণতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। সাধারণত দেখা যায় স্বামী-স্ত্রী মিলে শপিং বা অন্য কোনো কাজে বাইরে গেলে নামাযের সময়ে স্বামী মসজিদে বা অন্য কোনো নামাযের জায়গায় নামায আদায় করে নেয় আর স্ত্রী পাশে কোথাও দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। এক্ষেত্রে যদি ওই মসজিদ বা নামাযের জায়গায় নারীদের জন্যও নামাযের ব্যবস্থা থাকতো তাহলে স্ত্রীও সহজেই নামায আদায় করে নিতে পারতো। কিন্তু আমাদের এ অঞ্চলে এ ধরণের ব্যবস্থা না থাকার দরুণ অনেক নারী হয়তো পরবর্তীতে এ নামায আদায় করে নেয়। কিন্তু অনেক নারী এমনও আছে যারা এ নামায আর পরবর্তীতে আদায় করেনা। এজন্য শহর বা শহরতলীর মসজিদ সমূহ, বড় বড় মার্কেট, শপিংমল, অফিস-আদালত, হাসপাতাল, গার্মেন্টস, স্টেশন, টার্মিনাল, বিনোদন কেন্দ্র এবং স্কুল কলেজ ও ইউনিভার্সিটিগুলোতে পুরুষের পাশাপাশি বিধান মেনে নারীদের জন্যও  নামাযের ব্যবস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়।
এক্ষেত্রেও সচেতন থাকতে হবে, নামাযের মতো পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত পালন করতে গিয়ে যেন অনাকাঙ্খিত কোনো অবস্থার সৃষ্টি না হয়।
লেখক: প্রবন্ধার, শিক্ষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight