মসজিদের আঙ্গিনায় ফিরে আসুক মক্তব: মমিনুল ইসলাম মোল্লা

আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন বলেছেন, “পড়ন আপনার প্রভুর নামে যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন। ” [সূরা আলাক: আয়াত ১]
বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় মক্তব হলো প্রাথমিক স্তরের দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অন্য কথায় মক্তব হলো মুসলমান ছেলে-মেয়েদের ইসলামের বুনিয়াদি শিক্ষার  প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখানে নামাজ, রোজা, ও ইসলামের বেসিক নলেজ দেয়া হয়। হযরত ওসমান রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তি উত্তম যে নিজে কুরআন শিখে এবং অপরকে শেখায় [বুখারি, তিরমিযি, ২৮৪৩]
মক্তব আরবী শব্দ। এটি ধর্মীয় শিক্ষার প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিশ শতকের আগ পর্যন্ত মক্তব মুসলিম বিশ্বে জনশিক্ষার একটি অন্যতম মাধ্যম ছিল। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে মক্তব পরিচালিত হতো। বর্তমানে কেজি স্কুল,  মক্তব শিক্ষায়  অব্যবস্থাপনা ও দক্ষ শিক্ষকের অভাবে মক্তবগুলো প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম। শহরাঞ্চলের অধিকাংশ মক্তব ইতিমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে যে মক্তবগুলো চালু রয়েছে তাতে সনাতন ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থা বিরাজ করছে। এতে কোন চেয়ার, টেবিল, বেঞ্চ ব্যবহৃত হয় না। তবে কোথাও কোথাও দোকানদারদের ক্যাশবাক্সের মতো ছোট বাক্সের উপর কুরআনুল কারিম রেখে  পড়তে দেখা যায়। শিক্ষকের ব্যবহৃত বাক্সেরে ভেতরে  প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও হাজিরা খাতা থাকে। কোন কোন মক্তবে শিক্ষার্থীদের হাজিরা খাতাও ব্যবহৃত হয় না। মক্তবের শিক্ষার্থীরা হেলেদুলে-মাথা ঝাঁকিয়ে মেঝেতে বসে লেখাপড়া করে। কোন কোন মক্তবে লেখা শিখানো হলেও অধিকাংশ মক্তবে শুধুমাত্র মুখস্ত করানোর দিকে মনযোগ দেয়া হয়। ইতিহাসের মাধ্যমে জানা যায়, মক্তবের ব্যায় নির্বাহের জন্য উপমহাদেশে সুলতানী ও মুঘল শাসনামলে লাখেরাজ সম্পদের ব্যবস্থা করা হতো। এ ব্যবস্থা “মদদ ই মাশ” নামে পরিচিত ছিল। সরকারের পাশাপাশি বিত্তশালী ব্যক্তিবর্গ এসকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, শিক্ষক সংগ্রহ, ভূমি দান, অর্থ দান, বেতন ও অনুদান ইত্যাদির ব্যবস্থা করতেন। এছাড়া মসজিদের সঙ্গে মক্তব থাকায় মসজিদের আদায়ী অর্থ জাকাতের অর্থ দ্বারা এ শিক্ষা পরিচালনা করতেন।  ১০ শতকে বিশিষ্ট আইনবিদ ইবনে হাজার আল হায়তামী মক্তবের ব্যাপারে বিশেষভাবে আলোচনা করেন। তিনি এতিমদের বিশেষ সুবিধা দানের কথা বলেন। বর্তমানে অনেক মসজিদে মক্তবের ব্যবস্থা নেই। তাই অভিভাবকগণ বাড়িতে মসজিদের ইমাম অথবা মুয়াজ্জিন এনে ছেলে-মেয়েদের ধর্মীয় শিক্ষা দিচ্ছেন। এটি কখনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিকল্প নয়। ছোট আঙ্গিকে হলেও মক্তব একটি প্রতিষ্ঠান। ১১ শতকে মুসলিম দার্শনিক ইবনে সিনা মক্তব শিক্ষকদের দিক নির্দেশনা দিয়ে পুস্তক লিখেন। একটি শিশুর বয়স চার বছর চার মাস চার দিন হলে তার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা দানের কাজ শুরু হতো। মক্তবে শিশুর আনুষ্ঠানিক প্রবেশ “বিসমিল্লাহখানি” অনুষ্ঠান নামে পরিচিত ছিল। সমগ্র মুসলিম ভারতে এ অনুষ্ঠান পালন করা হতো। মসজিদে নববীতে সাহাবাগণ কুরআন-হাদিসের জ্ঞান দান করতেন। এ ধারা খোলাফায়ে রাশেদীনের, উমাইয়া ও আব্বাসীয় ও ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম শাসকরাও মোট জমির চারভাগের একভাগ লাখেরাজ হিসাবে  মসজিদ মাদ্রাসা ও খানকায়ে বরাদ্দ রাখতেন।
৭১২ সালে সিন্ধুরাজ দাহিরকে পরাজিত করে ভারতীয় উপমহাদেশে মুহাম্মদ বিন কাশিম ইসলামের পতাকা উত্তোলন করেন। তবে মুসলিম শাসন বাংলাদেশে শুরু হয় ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির আমল থেকে। তিনি নদীয়া জয় করে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। তখন বহু মসজিদ, মক্তব, ও মাদ্রাসা তার পৃষ্ঠপোষকতায় স্থাপিত হয়। পরবর্তীকালে সুলতান মুহাম্মদ ঘুরী, সুলতান ইলতুৎমিশ, তার কন্যা সুলতান রাজিয়া, সুলতান নাসির উদ্দিন ,সুলতান গিয়াস উদ্দিন বলবন, এরা সবাই ইসলামী শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা করেন। মুঘল আমলে মুসলমানদের জন্য যেমন মক্তব মসজিদ ছিল তেমনি হিন্দুদের জন্য ছিল টোল এবং পাঠশালা প্রভৃতি। ব্রিটিশরা কৌশলে মক্তবের শিক্ষা ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। তারা বিশেষ করে মসজিদ মক্তবের নামে যেসব লা খেরাজ সম্পত্তি রয়েছে তা বাজেয়াপ্ত করে। ইংরেজদের বাধা সত্তেও ঈমানদার মুসলমানরা মক্তব চালু রাখে। এদেশের মা বোনেরা মুষ্টি চাল, গাছের ফল, মুরগীর ডিম ও দান খয়রাত দিয়ে ৮০ হাজার মক্তব চালু রাখে। ফলে তখন ৪০% লোক কুরআন পড়তে পারতো। বর্তমান ডিজিটাল যুগেও এ পরিমান মুসলমান সহিশুদ্ধভাবে কুরআন পড়তে পারে কিনা সন্দেহ। এর কারণ একটিই, তা হচ্ছে দিনের পর দিন মক্তবের সংখ্যা কমে যাওয়া। আমাদেরকে কুরআন পড়তে হবে এবং তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে।  আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন বলেন, তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের নির্দেশ দাও এবং নিজেরা নিজেদেরকে ভুলে যাও, অথচ তোমরা কিতাব পাঠ কর? তবুও কি তোমরা চিন্তা কর না  [সূরা বাকারা: আয়াত ৪৪]
বর্তমানে সকল মসজিদ ও খানকাতে মক্তব নেই। অধিকাংশ মক্তব সরকারি বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কুরআনুল কারিমে বর্ণিত হয়েছে, “যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, সালাত কায়েম করে, আল্লাহর দেয়া রিজিক থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যায় করে তারাই আশা করতে পারে এমন ব্যবসার যা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না ” [সূরা ফাতির: আয়াত ২৯৩৫- ফাতির/২৯]  মক্তব শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের সোনামনিরা যা শিখে তা অন্য কোন প্রতিষ্ঠান থেকে শিখার কোন ব্যবস্থা নেই। কেজি স্কুলে বর্তমানে নার্সারী কাশ থেকে ইসলাম ধর্ম শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও ৫ম শ্রেনি পাশ করেও শুধু মাত্র বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে শুদ্ধভাবে কুরআন পাঠ সম্ভব হয় না। তাই মক্তব শিক্ষাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে। অতীতে মক্তবগুলোতে ছাত্ররা ফজরের নামাজের পর পরই মসজিদে প্রবেশ করত। মসজিদের দোয়া পাঠ করে মসজিদে প্রবেশ করে আগের দিনের পাঠ শোনাত। পূর্বদিনের পাঠ পুরোপুরিভাবে শেখা হলে নতুন করে সবক দেয়া হতো। সামান্য এদিক ওদিক হলেই তখন আগের পড়া পড়তে হতো। বৃহস্পতিবার কোন পাঠ দেয়া হতো না। ঐদিন পুরো সপ্তাহের পাঠ শোনাতে হতো। এ শিক্ষার কোন সার্বজনীন সিলেবাস না থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম স্বার্থকভাবে করা যায় না। তাই মক্তবে কি কি বিষয় পড়ানো হবে সে বিষয়ে ইবনে সিনা বিশেষভাবে আলোকপাত করেন। তিনি ৬ বছর বয়সে শিশুদেরকে মক্তবে পাঠানোর কথা বলেন। এসময় তারা কুরআন, ইসলামী অধিবিদ্যা, ভাষা, সাহিত্য নীতিবিদ্যা, ও বিভিন্ন বিষয়ে ব্যবহারিক জ্ঞান লাভ করার ব্যবস্থা করা হয়। মক্তবের সিলেবাস মুসলমানদের মৌলিক বিষয়গুলো থাকা প্রয়োজন। যেমন ইমান, সালাত, সাওম, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি। এছাড়া আল্লাহ ও রাসুল , আসমানী কিতাব, তাকদীর, পরকাল ইত্যাদি সম্পর্কে অবশই জানতে পাবে।
একজন মুসলমান মাত্রই জানেন আমাদেরকে নির্দিষ্ট সময়ে মৃত্যুবরণ করতে হবে। কবরে শোয়ানোর পর দুজন ফেরেস্তা এসে আমাদেরকে উঠাবেন। তখন সবাইকে ৩টি প্রশ্ন করা হবে । এগুলো হচ্ছে, তোমার রব কে? তোমার ধর্ম কী ? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ব্যাপারে প্রশ্ন করা হবে, তিনি কে বা তুমি কি তাকে নবী হিসাবে বিশ্বাস করেছিলে? [আবু দাউদ: হাদিস ৪৭৫৩]
হাশরের ময়দানেও করা হবে ৫টি প্রশ্ন। আবু বারযা মাদলা ইবনে উবায়েদ আসলামী রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কেয়ামতের দিন (হাশরের ময়দানে) বান্দা তার স্থানেই দাঁড়িয়ে থাকবে যে পর্যন্ত না তাকে জিজ্ঞেস করা হবে ১. তার জীবনকাল কিভাবে কাটিয়েছে ২. তার জ্ঞান কি কাজে লাগিয়েছে ৩. তার সম্পদ কোথা থেকে অর্জন করেছে এবং ৪. তার সম্পদ কোথায় খরচ করেছে ৫. তার শরীর কিভাবে বিনাশ করেছে [তিরমিযি: হাদিস ২৪১৭]
আমাদেরকে কবর এবং হাশরের প্রশ্নগুলোর জবাব পৃথিবী থেকেই শিখে যেতে হবে। তবে শুধুমাত্র মুখস্ত করলেই চলবে না বাস্তবে এর পক্ষে প্রমাণ দেখাতে হবে। আর এজন্য চাই দ্বীনি শিক্ষা। যারা মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছেন তারা মোটামোটি জ্ঞান অর্জন করতে পারেন আর বাকীদের জ্ঞান অর্জণের পথ খুবই কঠিন। কারণ পৃথীবীতে এমন কোন বিষয় নেই যা না পড়ে শুধু মাত্র জ্ঞানী ব্যক্তিদের নিকট থেকে শুনে শুনে পরিপূর্ণভাবে বোঝা যায়। এজন্য অবশ্যই পড়তে হবে।  নিজে নিজে কুরআন-হাদিস শিক্ষা করা খুবই কঠিন। তাই মক্তবে যদি কোমলমতি শিশুদের ধর্ম শিক্ষা দেয়া যায় তাহলে সে শিক্ষা সারাজীবন তারা কাজে লাগাতে পারবে। অন্য হাদিসে আছে, কবরের প্রশ্ন সম্পর্কে আরেকটি প্রশ্নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বান্দা যখন ৩টি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিবে তখন বলা হবে তুমি কি এগুলো কুরআন থেকে শিখেছ অথবা তুমি কি কুরআন ভিত্তিক জীবন গড়েছ? মক্তবে প্রধানত কুরআন শিক্ষা দেয়া হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য বাংলাদেশের অধিকাংশ মক্তবে কোন সুনির্দিষ্ট সিলেবাস অনুসরণ করা হয় না। কুরআন শিক্ষাকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করে শিখলে তা শিশুদের জন্য সহজ হয়ে যায়।  আরবী হরফ পরিচয়, আরবী হরফের অনুশীলন, আরবী হরফ সহীহ করার পদ্ধতি (পার্থক্য নির্ণয়) আরবী যুক্তাক্ষরের পরিচিতি, আরবি হরকতের পরিচয় ও ব্যবহারের নিয়ম, আরবী জযম, তাশদীদ ও তানবীনের আরবী জযম, তাশদীদ ও তানবীনের পরিচয়, এবং ব্যবহার হরকত অনুশীলন, জযম, তাশদীদ অনুশীলন ও আহকাম বর্ণনা , মাদ্দের নিয়ম, ও ওকাফের নিয়ম এভাবে স্তরে স্তরে সিলেবাস ভাগ করে পড়ানো যায়। মানব জীবনে নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।
পিতা-মাতার খেদমত, বন্ধু-বান্ধবের সাথে সম্পর্ক, সমাজের উচু-নিচু সকল শ্রেণি-পেশার সানুষের সাথে সুসম্পর্ক রাখার শিক্ষা মক্তবেই দেয়া হয়।  পিতা মাতার খেদমতের সাথে সাথে তার আনুগত্য করতে হবে। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন বলেন, “তোমার প্রভু বিধান করেছেন, তাকে ছাড়া তোমরা অন্যের উপাসনা করো না। আর পিতা মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার, যদি তোমাদের সামনে তাদের একজন বা উভয়ে  বার্ধক্যে পৌঁছায়, তবুও তাদের প্রতি “উহ” বলো না। তাদের তিরস্কার করো না। বরং তাঁদের সাথে বিনয়ের সাথে কথা বলবে” [সূরা বনি ইসরাঈল: আয়াত ১৭-বনি ইসরাইল/ ২৩]
তারা কুরআন-হাদিস শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন নবী সাহাবী ও হক পন্থী অলি-আউলিয়াদের জীবনী থেকে অনেক উপদেশ বানী শিখতে পারে। মক্তব দ্বীন শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। এ শিক্ষা ব্যবস্থায় কোমলমতি শিশুদের মনে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, পিতামাতার প্রতি সদাচার, পাড়া-প্রতিবেশীর সাথে বদ্ব্যবহার ইত্যাদি শিখতে পারে। বাংলাদেশী শিক্ষা নীতিমালায় ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর আলোকে মক্তবের শিক্ষাকে আরো সম্প্রসারিত করা যেত। একটি বিশেষ ভাবে লক্ষণীয় যে ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হলেও প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে ধর্মীয় বিষয় সিলেবাসে নেই। মা বাবার খেদমত কিভাবে করতে হবে তাও মক্তবে থেকে শিক্ষা দেয়া হয়। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দুটি গোনাহের শাস্তির জন্য কেয়ামতের অপেক্ষা করা হবে না, দুনিয়াতেই তাদের শাস্তি দেয়া হবে একটি জুলুম-অত্যাচার, অন্যটি মা-বাবার নাফরমানি করা, মা-বাপকে কষ্ট দেয়া। বাংলাদেশে কিছু কিছু মক্তব রয়েছে খুবই নিয়ম ভিত্তিক। এগুলোর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে মক্তব ফাউ-েশন। এ ফাউ-েশনের দাবী হচ্ছে, ফজরের নামাযের পর ২ ঘন্টা মক্তবের সময় নির্ধারণ করে সরকারি ঘোষণা, এ সময় অন্য কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু না রাখা, এ মর্মে সরকারী ঘোষণা। বিনামূল্যে বই বিতরণ এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনকে ভাতা দেয়ার জন্য তারা সরকারের নিকট দাবী জানান। শুধুমাত্র মসজিদস্থ মক্তব, ফুরকানিয়া মাদ্রাসা নয়, ইচ্ছে করলে উঠানে মহিলাদের জন্য মক্তব চালু করা যায়। বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষিত বহু মহিলা আছেন যারা মক্তব পরিচালনা করতে পারবেন। তাদেরকে শিক্ষিকা হিসাবে নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। এ মক্তবে নির্দিষ্ট এলাকার মহিলা ও মেয়েরা কুরআন-হাদিস শিক্ষা করতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান মক্তব শিক্ষা ব্যবস্থায় কোন সার্বজনীন সিলেবাস নেই। কোন নির্দিষ্ট পাঠক্রম নেই। শিক্ষা বৎসর কোন মাস থেকে শুরু হবে তা নির্ধারিত না থাকায় শেষও জানা নেই। ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির কোন নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। ছাত্র-ছাত্রীদের কøাশ ডিউরেশন কতটুকু তা নির্দিষ্ট নেই। বাৎসরিক কোন প্রকারের পরীক্ষা না থাকায় পাস-ফেলও নেই। কোন সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা নেই। যাদেরকে শিক্ষক নির্বাচন করা হয়, তারাও ধর্মীয় শিক্ষায় অনভিজ্ঞ এবং শিশু মনস্তাত্তিক বিজ্ঞান সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত নন। ‘বাংলাদেশ নূরানী তালীমুল কুরআন ওয়াক্ফ এস্টেটের সহায়তায় ২৫ দিন ব্যাপী নূরানী বয়স্ক ট্রেনিং এর মাধ্যমে সর্বস্তরের লোকদেরকে প্রতিদিন ১ ঘণ্টা করে মাত্র ২৫ ঘণ্টায় কুরআন মজিদ তাজবীদসহ  শিক্ষা দেয়া হয়। এর সঙ্গে পবিত্রতা, অজু, নামাজ ইত্যাদির মাসায়েল ও বাস্তব আমল শিক্ষা দেয়া হয়। এক পরিসংখানে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ৩ লক্ষ মসজিদ রয়েছে। এসব মসজিদের অধিকাংশ ইমামই কামিল, ফাযিল পাশ। একটু সুযোগ-সুবিধা দিলে তাদের মাধ্যমে একটি মডারেট মুসলিম জাতি গঠন করা সম্ভব। কিছু কিছু মসজিদে ইসলামিক ফাউ-েশনের মক্তব চালু থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আমাদেরকে মনে রাখতে হবে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে যদি-মসজিদ মক্তব-ফুরকানিয়া মাদ্রাসার শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায় তবে জাতি চরিত্রবান মানুষ হারাবে, হারাবে ঈমানদার নামাযী মানুষ, গ্রাম-গঞ্জের ঘরে-ঘরে আর শোনা যাবে না রোদেলা সকালে সুমধুর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত। আর এর দায়ভার বহন করতে হবে আমাদের সবাইকে।

লেখক: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক, কলামিস্টও সাংবাদিক, কুমিল্লা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight