মদীনার পথে প্রিয় নবীজী সা.: আয়েশা সিদ্দীকা বিনতে সুলাইমান

নবুওয়তের একাদ্বশ বর্ষ। ৬২১ সন। মক্কায় আগমন করলো মদীনার আওস গোত্রের নেতা আবুল হাফসার আনাস ইবনে রাফে। সাথে একদল টগবগে যুবক। তারুণ্যের দীপ্ত প্রভা তাদের সমগ্র দেহে যেন ঢেউ খেলছে। এই যুবক দলের একজন ছিলেন ইয়াস ইবনে মুয়াজ। মদীনার যুবক দলটিকে নবীজী দাওয়াত দিলেন ইসলামের পথে। কিন্তু তাদের কেউ সেদিন সাড়া দেয়নি নবীজীর দাওয়াতে। তবে যুবক ইয়াসের হৃদয়ে গেঁথে গেলো তাওহীদী কালিমা। দলের সকলে মদীনায় ফিরে গেল শূণ্য হাতে। ইয়াস ফিরলো ইসলাম বুকে নিয়ে। ইয়াসের সীনায় ভর করে মদীনায় প্রবেশ কররো ইসলাম। [আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/১৪৮]
এ বছরই খাজরাজ গোত্রের কিছু লোক মক্কায় এলো। নবীজী তাদেরকেও ইসলামের দাওয়াত দিলেন। অকুণ্ঠচিত্তে তারা গ্রহণ করে নিলো ইসলাম। মদীনার দিকে তীব্র বেগে বইতে শুরু কররো ইসলামের শ্রোতধারা। [ইবনে হিশাম, ১/ ১৫০; ফতহুলবারী, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/ ১৪৮]
নবুওয়াতের দ্বাদশ বর্ষে এমনই একটি কাফেলা মক্কায় এসে নবীজীর হাতে কবুল করে নেয় শাশ্বত ধর্ম ইসলাম। এভাবে ধীরে ধীরে আরো মজবুতভাবে শিকড় বিস্তার করতে লাগলো আল্লাহর দীন। ইসলামের জন্য মদীনা হতে থাকলো উর্বর ভূমি। এদিকে মক্কায় ইসলাম ও মুসলমানেরা ক্ষত বিক্ষত হতে থাকলো কাফেরদের নির্মম আঘাতে আঘাতে। ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে হিজরতের নির্দেশ এলো। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে সাহাবায়ে কেরামকে মদীনার পথে হিজরত করার আদেশ দেন। [যুবকানী, ১/৩১৮]
সর্বপ্রথম হিজরত করেন নবীজীর দুধ ভাই আবু সালামা ইবনে আবদুল আসাদ মাখযুমী রা.। [বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/ ১৬৯]
এরপর একে একে মুহাজির কাফেলা প্রলম্বিত হতে থাকে মদীনার পথে। দেখতে দেখতে উপস্থিত হলো সেই দিন। যেদিন হিজরত করতে মনস্থ করলেন প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। [ইবনে হিশাম, ১/১৬৩]
মক্কার বুকে রাত নেমে এসেছে। নেমে এসেছে নিবিড় অন্ধকার। এরমধ্যে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ি মক্কার কাফের দল ঘেরাও করে ফেললো নবীজির বাসভবন। নবীজি ঘুমিয়ে পড়লেই তাঁর উপর একযোগে আক্রমণ করাই ছিল তাদের পরিকল্পনা। কিন্তু আল্লাহ কাফেরদের চোখে ছড়িয়ে দিলেন ভারি পর্দা। ফলে তারা দেখতে পেলো না নবীজিকে। সকলের সামনে দিয়ে অথচ সকলের দৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল করে বের হয়ে পড়লেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। রওয়ানা দিলেন তাঁর প্রিয় সহচর আবু বকর রা. কে নিয়ে। রওয়ানা করলেন মদীনার পথে। চলতে থাকলেন নির্ভয়ে। দৃঢ়পদে। রাতের নির্জনতাকে সঙ্গী করে নবীজি এবং তাঁর সহচর উপনীত হলেন সাওর পর্বতে। মক্কার অদূরে পাহাড়টি। পাহাড়ের শৃঙ্গের একটি গুহায় গিয়ে প্রবেশ করলেন প্রিয় নবীজি এবং তাঁর প্রিয় সঙ্গী। আল্লাহর রহমতের কী অফুরন্ত ফল্গুধারা! কী অসীম কুদরত তাঁর! কাফেরদের একটি দল নবীজিকে খুঁজতে খুঁজতে চলে এলো এই পর্বতশৃঙ্গে।
কিন্তু আল্লাহর প্রেরিত মাকড়সার জাল আর বন্য কবুতরের উপস্থিতি তাদেরকে ফেলে দিলো যেন গোলক ধাঁধায়। ফলে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে গেল তারা। বেঁচে গেলেন আল্লাহর বান্দারা। তিনদিন অবস্থানের পর তাঁরা আবার চলতে লাগলেন। মদীনার পথে তাঁরা আবার পা বাড়ালেন। [ফতহুল বারী, ১/ ১৮৬]
চারদিকে সংবাদ ছড়িয়ে  পড়েছে মানবতার নবী মদীনায় আসছেন। মদীনার ঘরে ঘরে বইতে লাগলো যেন আনন্দের বন্যা। নদীর কলকল ধ্বনির মত বাজতে লাগলো খুশির কলরব। মুসলিম অমুসলিম সকলে শহরের উপকণ্ঠে এসে উপস্থিত। সকলের সেকি প্রতিক্ষা নবীজির জন্য। হঠাৎ, দেখা গেল তিনি আসছেন। সমগ্র এলাকা দুলে উঠলো আনন্দেরহ হর্ষশ্রোতে। শিশুরা তলা আল বাদরু আলাই না। গান গাইতে লাগলো। যুবক বৃদ্ধ সকলে জানাতে  লাগলেন আহলান সাহলান। সকলে নিবেদন করতে লাগলেন স্বাগতম স্বাগতম। বিমল আনন্দের উচ্ছসিত তরঙ্গ দোল খেতে লাগলো পুরো মদীনাবাসী। সমগ্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা নিবেদিত হতে লাগলো নবীজির পদতলে। প্রাণভরা আনন্দধারা লহরিত হতে লাগলো মদীনার পথে পথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight