ভাষার সৌন্দর্য ও আমাদের বাংলা ভাষা : শামসুদ্দীন সাদী

আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন তামাম বিশ্বজাহান। চাঁদ সূর্য গ্রহ নক্ষত্র। গাছপালা তরুলতা। পশুপাখি। সুদূর আকাশ। বিস্তৃত জমিন। এসব কিছুই মহান আল্লাহর সৃষ্টি। বায়ু ও বায়ুম-ল, জল ও জলবায়ু সবই তাঁর অনুপম সৃষ্টিকুশলতার অপার নিদর্শন। পাখির কণ্ঠে, পাতার মর্মর শব্দে তাঁরই গুণ প্রতিধ্বনিত হয়। সাগর মহাসাগরের অতল দরিয়ায় বিশাল জলরাশি মহান আল্লাহর নিপুণ সৃষ্টি। সুউচ্চ পাহাড় সবুজ মাঠ সবই তাঁর কুদরতের কারিশমা।
এই আকাশ পানি বায়ু গ্রহ তারা পশুপাখি বায়ুম-ল আর চাঁদ সূর্য সবকিছু মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। সবই আল্লাহর দান। আল্লাহর যত দান আমরা প্রতিনিয়ত ভোগ করছি তার মধ্যে অন্যতম হলো ভাষা। পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করার জন্য যেমন অসংখ্য বস্তু আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন; তদ্রুপ মানুষ যেন নিজেদের প্রয়োজনে পারস্পরিক ভাব বিনিময় করতে পারে তার জন্য সৃষ্টি করেছেন ভাষা।
মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী। যদিও মানুষ ব্যতীত অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে বুদ্ধির উপস্থিতি লক্ষ করা যায় কিন্তু তা খুবই সাময়িক ব্যাপার। এবং মানবজাতিই হচ্ছে পৃথিবীর প্রতিপাদ্য বিষয়। মানবজাতির অস্তিত্ব ব্যতীত পৃথিবী জৌলুসহীন। মানবজাতি পৃথিবীর সৌন্দর্য। মানব-সৃষ্টিকুলতা মহান আল্লাহর কুদরতেরই বহিঃপ্রকাশ। মানুষের সাড়ে তিন হাত দেহের মধ্যে যদি আল্লাহর কুদরত নিয়ে গবেষণা করা হয় তাহলে একজন নাস্তিকও আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে অনায়াসে।
বর্ণে, আচার-আচরণে, জাত ও সম্প্রদায়ে যেমন নানা কিসিমের মানুষ পৃথিবীতে বসবাস করে; তদ্রুপ মানুষের ভাষার মধ্যেও রয়েছে বৈচিত্র্য। ভাষার ব্যবধান বর্ণমালার ভিন্নতা এবং উচ্চারণের পার্থক্য প্রতিটি ভাষাকে আলাদা মাত্রা দান করেছে। বাংলা, আরবি, স্পেনিশ, মারাঠি, চাইনিজ, উর্দু, ফারসি, মালয়, ইংরেজি, হিন্দি, পাঞ্জাবি, জাপানিসহ আরো কত বিচিত্র ভাষা রয়েছে। ভাষার এই ব্যবধান ও ভিন্নতা আল্লাহরই সৃষ্টি।
এক ভাষার মধ্যে আবার আছে অনেক উপভাষা। ভাষার এই ভিন্নতা একদিকে সৃষ্টি করে বৈচিত্র্য, অন্য দিকে জটিলতাও তৈরি করে।
তবে ভাষা বর্ণ ও ভূখ-ের ওপর ভিত্তি করে মানুষে মানুষে দেয়াল তৈরি করা ইসলাম মোটেই সমর্থন করে না। রাজনীতির ভাষায় যাকে বলে জাতীয়তাবাদ। অর্থাৎ, ভাষা বর্ণ বা ভূখ-ের ভিন্নতার ভিত্তিতে কোনো জাতীয়তাবাদকে ইসলাম অনুমোদন করে না।
জন্মের পরে মায়ের কাছে যে ভাষা শিখি তাই মাতৃভাষা। মাতৃভাষাকে মানুষ অনেক আপন মনে করে। ভাষাকে মায়ের মতোই ভালোবাসে। মুখের এই ভাষা মানুষের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। ভাষা ছাড়া যেমন একজন মানুষের সঠিক বিকাশ হয় না, তদ্রƒপ মানবজাতি ও সভ্যতাও বিকশিত হয় না। ভাষাকে বাধা দেওয়া মানে একজন মানুষের অধিকার ক্ষুণœ করা এবং সভ্যতার বিকাশ বাধাগ্রস্ত করা। যার ফলে কখনো শুভ হয় না।
বাংলা ভাষা আন্দোলন
বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। বাংলাকে আমরা পরম মমতায় লালন করি। এ ভাষায় কথা বলি। এ ভাষায় লিখি। গল্প করি। বাংলা পৃথিবীর একমাত্র ভাষা যার জন্য মানুষ লড়াই করেছে। জীবন দিয়েছে। দেশ ভাগের পর থেকেই ভাষার প্রশ্নটা সামনে আসে। এক হাজার মাইল ব্যবধান ও ভাষার ভিন্নতা সত্ত্বেও অভিন্ন ধর্ম ও আবেগ অনুভূতির কারণে দুই প্রান্তের দুটি ভূখ- মিলে গঠিত হয় পাকিস্তান। কিন্তু পাকিস্তানের অপরিনামদর্শী শাসকশ্রেণি মানুষের আবেগ অনুভূতির জায়গাটা বুঝতে ব্যর্থ হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দুকে বাংলাভাষীদের ওপর চাপিয়ে দেয়। ফলে বাংলাভাষী ৭ কোটি জনতা ফুঁসে ওঠে। পাকিস্তানের শাসক ইয়াহইয়া খান ঢাকা ভার্সিটিতে প্রদত্ত এক ভাষণে বলেন, উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ আরম্ভ হয়। প্রতিবাদের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। তমদ্দুন মজলিস ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদানকারী। তৎকালীন ভাষা সংগ্রামীরা তমদ্দুন মজলিসের ব্যানারে ভাষা আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত গড়ে দেন। সারাদেশে ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে বই পুস্তক লিফলেট প্রচারপত্র বিতরণ করে। ফলে ভাষা আন্দোলনের বিষয়টি আর ভার্সিটির গ-িতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভাষার দাবি হয়ে ওঠে বাংলার আপামর জনগণের প্রাণের দাবি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা যেন আগুনে ঘি ঢালে। মুহূর্তে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সারাদেশ। ঢাকাসহ সারা দেশে সরকার মিটিং মিছিলের ওপর ১৪৪ ধারা জারি করে। ফলে সংঘর্ষ বাঁধে বিভিন্ন স্থানে। ঢাকা ভার্সিটির ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নেয় ১৪৪ ধারা ভেঙে ভাষার পক্ষে মিটিং মিছিল করার। সে মতে ৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকালেই বটতলায় জড়ো হতে থাকে ছাত্ররা। ভাষার পক্ষে মিছিল ও সমাবেশ করে। এই সমাবেশেই হঠাৎ আক্রমণ করে পুলিশ। বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা। নিজের ভাষার অধিকার রক্ষা করার জন্য। পুলিশের গুলিতে ঝরে পড়ে বেশ কিছু তাজা প্রাণ। ভাষার জন্য মায়ের ভাষা রক্ষার জন্য বাঙালি নিজের রক্ত ঢেলে দেয়। পাকিস্তানের শাসকশ্রেণির অদূরদর্শিতার ফলে ভাষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলন ধীরে ধীরে স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপ ধারণ করে। যার ফলশ্রুতিতে পাকিস্তান দ্বিখ-িত হয়। গড়ে ওঠে নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ।

মাতৃভাষায় আলেম সমাজ
জ্ঞানের চর্চা ও স্থায়িত্বের উৎকৃষ্ট মাধ্যম হলো ভাষা। শত শত বছর পর এসেও আমরা শেখ সাদী, জালালুদ্দীন রুমি, ফরিদুদ্দীন আত্তার, গ্যালিলিও, ওমর খৈয়াম, আইনস্টাইনসহ জগৎ আলোকিত করা মহামনীষীদের যেসব রচনা সম্ভার থেকে আমরা উপকৃত হচ্ছি। এটাই ভাষার বিশেষত্ব শ্রেষ্ঠত্ব।
মানুষের হাত ধরেই হয়েছে ভাষার উদ্ভব। ক্রমান্বয়ে তার সমৃদ্ধি হয়েছে ব্যুৎপত্তি অর্জন হয়েছে। ভাষার সৌন্দর্য অপরিসীম। ভাষা সভ্যতা সংস্কৃতির বাহন। ভাষার মাধ্যমেই সাধিত হয় সভ্যতার উৎকর্ষ। ভাষা ও সাহিত্যের প্রভাব আধুনিক এই যুগেও কোনো অংশে কম নয়। রুশ সমাজতান্ত্রি বিপ্লব সাধিত হয় সাহিত্যের হাত ধরেই। সুতরাং ভাষা ও সাহিত্য উপেক্ষা করা বোকামি বৈ কিছু নয়।
এদেশের আলেম সমাজে মাতৃভাষার গুরুত্ব তুলে ধরে ছিলেন জ্ঞানতাপস সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভি রহ.। আশির দশকে তিনি প্রথম বাংলাদেশে আগমন করেন এবং বাংলাভাষায় আলেম সমাজের দায়িত্ব ও করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা প্রদান করেন। স্বাধীনতাপূর্ব কালে এদেশের আলেমকুল শিরোমণি সমাজ সংস্কারক মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (সদর সাহেব) রহ. আলেম সমাজকে বাংলাভাষায় মনোনিবেশ করেন। তিনি নিজে বাংলাভাষায় ধর্মীয় বহু বইপত্র রচনা করেন এবং আপামর জনসাধারণের মাঝে ধর্মীয় চেতনা জাগ্রত করেন। এই পথ ধরে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, মাওলানা আকরাম খান, মাওলানা আব্দুর রহীম, মাওলানা রেজাউল করীম ইসলামাবাদী প্রমুখ। এর ধারাবাহিতকা বাংলাভাষায় আলেমগণ অগ্রসর হচ্ছেন। ধীরে ধীরে বাংলাভাষায় আলেম সমাজের ভূমিকা অবদান ও গুরুত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ, যাইনুল আবিদীন ও শরীফ মুহাম্মাদরা এখন বাংলা সাহিত্যের সম্পদ।

রক্তে কেনা মায়ের ভাষা কি আমরা ধরে রাখতে পারব?
ইদানীং ভাষা নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা বাড়ছে। দুশ্চিন্তার কারণ অনেক। বাংলা ভাষা যেন বেওয়ারিশ লাশ। যার যেভাবে ইচ্ছা টানা হেঁচরা করছে। বাংলা ভাষার উচ্চারণ হয়ে যাচ্ছে ইংরেজি। রেডিও টিভিতে প্রত্যহ বাংলার ইংরেজি উচ্চারণ শোনে আমরা বিরক্ত। কথায় কথায় ইংরেজি শব্দের প্রয়োগেও আমরা বেশ গর্ব বোধ করি। কথার ফাঁকে ফাঁকে এক দুটা ইংরেজি বলতে না পারলে যেন জাতে ওঠা যায় না। কেমন ক্ষেত ক্ষেত মনে করি। স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স প্রায় ৫০। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আজো প্রশাসন ও বিচারালয়ে বাংলা চালু হয়নি। বিচার ও প্রশাসনে আমরা এখনো বৃটিশের গোলামি ছাড়তে পারিনি। এটা আমাদের জন্য যেমন লজ্জার তেমনি মানসিক পরাজয়ও বটে।
আরেকটি লজ্জাজনক ঘটনা হলো কদিন আগে। দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের দেশে ভারতের নোংড়া কিছু টিভি সম্প্রচারিত হচ্ছে। যার কুপ্রভাব আমাদের সমাজব্যবস্থা ধ্বংস করে দিচ্ছে। নীতি নৈতিকতা বিলীন হয়ে গেছে। সম্মান ও মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত। পাকিস্তানিরা গুলির মুখে আমাদের মাতৃভাষা কাড়তে পারেনি। কিন্তু এখন এসব টিভি সিরিয়ালের মাধ্যমে ঘরে ঘরে বাংলার পরিবর্তে হিন্দি ভাষার চর্চা হচ্ছে। বাংলা না পারুক, আগামী প্রজন্ম হিন্দিভাষা পারবেই। এই আশঙ্কা শুধু আমাদের নয়, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার শ্রী হর্ষবর্ধন বাবু গত কদিন আগে বলেছেন “বাংলাদেশে হিন্দি ভাষার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।” বাঙালি জাতি কি অচিরেই হিন্দিজাতি হতে যাচ্ছে? তাহলে বঙ্গবন্ধু আর বঙ্গবীর এমন উপাধির কি হবে?
উপসংহার
রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষা আমার মায়ের ভাষা। এ ভাষা আমরা ভালোবাসি। আমাদের প্রাণের ভাঁজে ভাঁজে তার অনুভূতি। আমরা চাই এ ভাষার সমৃদ্ধি। আমরা চাই বাংলাভাষা বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। ভাষার মর্যদা রক্ষা হোক। সর্বত্র বাংলা চালু হোক।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক কিশোর পথ, প্রাবন্ধিক, শিক্ষক, গ্রন্থকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight