ব্যক্তি জীবনে রাসূল সা. ও আমরা : ড. মুফতি আব্দুল মুকিত

তাওরাত ও কুরআনের মধ্যে উল্লেখ আছে যে, রাসূল সা. এর অন্যতম একটি গুণ ছিল, তিনি মন্দকে মন্দ উপায়ে দমন করতেন না। [বোখারি: ২১২৫] আল্লাহ তায়ালা বলেন, আপনি ক্ষমা আকড়ে ধরুন, ভাল কাজের আদেশ করুন এবং মূর্খদের কাছ থেকে বিরত থাকুন (তারা কি বলে বা কি তিরস্কার করে তার প্রতি কর্ণপাত করবেন না)।[সূরা আরাফ : ১৯৯] রাসূল সা. বলেন, যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তার সাথে সম্পর্কের বন্ধন কর, যে তোমাকে বঞ্চিত করে তাকে প্রদান কর এবং যে তোমার প্রতি জুলুম করে তাকে ক্ষমা কর। [মুসনাদে আহমদ :১৭১২১] রাসূল সা. এ গুণের উপদেশ শুধু দেননি, রাসূল সা. কে এমন গুণ অর্জনের জন্য আল্লাহ শুধু আদেশ করেন নি বা রাসূল সা. এর মধ্যে এমন গুণ বিদ্ধমান ছিল তা শুধু দাবী করা হয়নি; বরং রাসূল সা. বাস্তব জীবনে এর উজ্জ্বল নমুনা মুসলিম জাতির সামনে রেখে গেছেন।
ইসলামের ঘোরতর এক শত্রু ছামামা বিন আসাল কে আটক করে মদিনায় ধরে আনা হয়। সে বন্দিকে মসজিদের এক খুটির সাথে আটক করে রাখা হয়। রাসূল সা. তার কাছে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিলে সে বলে, আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন তবে রক্ত ওয়ালা মানুষকে হত্যা করবেন। অর্থাৎ আপনি যদি আমাকে হত্যা করেন তবে আমার রক্ত বৃথা যাবে না। বরং আমার রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে। আর যদি আমার প্রতি দয়া করেন তবে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির উপর দয়া করবেন। অর্থাৎ যদি আমার প্রতি দয়া করেন আমি একজন কৃতজ্ঞ বলে সর্বদা আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব, কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করব না। রাসূল সা. চলে গেলেন আর সে খুটিতে বাধাবস্থায় সাহাবায়ে কেরামদের আচরন দেখছেন। সে ইসলামের এত শত্রুতা করা সত্ত্বেও কোন সাহাবা তার সাথে দূর্ব্যবহার করেননি বরং সকল সাহাবা তার সাথে সুন্দর আচরন করছেন। এভাবে একদিন পার হলে পরের দিন রাসূল সা. তার কাছে এসে আবার ইসলামের দাওয়াত দিলে সে আবার একই কথা বলল। রাসূল সা. চলে গেলে সে মসজিদের খুটির সাথে বাধাবস্থায় সাহাবাদের কার্যক্রম, এবাদত ও সুন্দর আচরন অবলোকন করতে লাগল। তৃতীয় দিন রাসূল সা. তার কাছে এসে আবার দাওয়াত দিলে সে একই কথা বলল। তখন রাসূল সা. তাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য আদেশ করলেন। তাকে মুক্ত করা হলে সে একস্থানে গিয়ে গোসল করে আবার ফিরে আসে ও ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেয়। তখন একজন তাকে বলল, আপনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন তবে কেন আগে ইসলাম গ্রহণ করেননি? তবে তো আপনাকে আর বন্দি অবস্থায় থাকতে হত না। তিনি বললেন, আমি আটক অবস্থায় এ কারণে ইসলাম গ্রহণ করেনি যে, যদি আমি তখন ইসলাম গ্রহণ করতাম তবে আমাকে নিয়ে মানুষ এ কথা বলত যে, আমি ভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছি। তাই আমি মুক্ত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছি যাতে এটা বুঝা যায় যে আমি স্বজ্ঞানে ও স্ব-ইচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছি। তারপর রাসূল সা. এর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নিজ এলাকায় চলে গেলেন। তিনি তার গোত্রের নেতা ছিলেন। তার এলাকা ইয়ামামা থেকে মক্কার খাদ্য শস্য রপ্তানি হত। তিনি তার এলাকায় গিয়ে ঘোষণা করলেন, যেহেতু মক্কার লোকেরা রাসূল সা. ও মুসলমানদেরকে বিতারিত করেছে ও ইসলামের শত্রুতা করেছে তাই তার এলাকা থেকে কোন খাদ্যশস্য মক্কায় রপ্তানী করা হবে না। [মুসলিম : ১৩৮৬] এর ফলে মক্কায় খাদ্যের অভাব দেখা দিল। তখন মক্কার নেতারা রাসূল সা. এর কাছে প্রতিনিধি পাঠিয়ে আবদার করল যে, আমরা আপনার আত্মীয়, আর ইয়ামামা থেকে খাদ্য রপ্তানী বন্ধ করে দেয়ায় আমরা মক্কাবাসীরা ও আপনার আত্মীয়রা খাদ্যের অভাবে মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছি। তাই আপনার কাছে আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে আবদার করছি, আপনি ছামামা বিন আছাল রা. কে খাদ্য রপ্তানী বন্ধ না রাখার জন্য বলে দেন। তখন রাসূল সা. ছামামা রা. কে খাদ্য রপ্তানী বন্ধ না করার জন্য খবর পাঠান।
মক্কার লোকেরা রাসূল সা. ও সাহাবাদের উপর চরম নির্যাতন ও নিপিড়ন করেছে। মুসলমানদের ঘর-বাড়ি, জায়গা-জমি সহ সকল ধন-সম্পদ তারা দখল করে নিয়েছে, এবং তাদেরকে তাদের মাতৃভূমি থেকে অন্যায় ভাবে বের করে দিয়েছে। মুসলমানদের সাথে তারা চরম শত্রুভাবাপন্ন আচরন করেছে। অথচ তারা যখন রাসূল সা. এর কাছে মানবতার দাবী নিয়ে আসছে, খাবার রপ্তানী বন্ধ না করার আবদার নিয়ে আসছে রাসূল সা. তখন তাদের অনুরোধে সাড়া দিয়েছেন। কারণ রাসূল সা. প্রতিশোধ পরায়ণ ছিলেন না। তিনি মন্দকে মন্দ উপায়ে দমন করতেন না। বরং মন্দকে ভাল উপায়ে রোধ করতেন। কেউ খারাপ আচরন করলে রাসূল সা. উত্তম আচরন প্রদর্শন করতেন। বরং অত্যাচারী, পাপী বা অপরাধী কোন দোষ করলে তাদেরকেও ক্ষমা করে দিতেন।
মদিনার মুনাফেক নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবাই ইসলাম ও মুসলমানের চরম শত্রু ছিল। সে রাসূল সা. কে চরম কষ্ট দিয়েছে। কেউ যদি আঘাত করে বা ধাক্কা দেয় বা ক্ষত-বিক্ষত করে তবুও যতটা না কষ্ট হয় তার চেয়ে বেশী কষ্ট অনুভব হয় যখন কেউ মানসিক আঘাত করে। সম্ভবত হযরত আলী রা. বলেছিলেন, তালোয়ারের আঘাতের ক্ষত একসময় শুকিয়ে যায়; কিন্তু জিহবার আঘাতের ক্ষত শুকায় না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আপনাকে আপনার জানে ও আপনার সম্পদের মধ্যে কষ্ট দেয়া হবে এবং মুশরিকদের কাছ থেকে অনেক কষ্ট শুনবেন৫। অর্থাৎ আপনি শারীরিক বা অর্থনৈতিক কষ্ট যতটা পাবেন তার চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট পাবেন আপনি (মানুষের সমালোচনা ও গালিগালাজ) শুনা থেকে। আপনাকে তারা তিরস্কার করবে, আপনার সমালোচনা করবে, আপনাকে পাগল, জাদুকর, নির্বোধ, লেজকাটা ইত্যাদি অনেক অপমানজনক কথা তারা বলবে। শত্রুদের কিছু আপনার বন্ধু সেজে আপনার দলে ঢুকে ভিতর থেকে আপনাকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দিতে থাকবে। অনেক নবী শত্রুদের আঘাতে নিহত হলেও রাসূল সা. এই মানসিক কষ্ট সকল নবীগণের চেয়ে বেশী পেয়েছেন বলেই রাসূল সা.বলেছেন, সকল নবীগণের চেয়ে আমাকে বেশী কষ্ট দেয়া হয়েছে। [মুসনাদে আবি ওয়ালা : ৪৭০১] আর মুনাফিক নেতা উবাই রাসূল সা. কে যদিও শারীরিক আঘাত তেমন করে নি, কিন্তু সে প্রতিনিয়ত রাসূল সা. কে চরম মানসিক কষ্ট দিয়েছে। সে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছে কিন্তু গোপনে গোপনে মুসলমানদের মধ্যে থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের যত ধরনের ক্ষতি করা যায় তা সে ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা করত। কুরআনের মধ্যে তাদের বিবরণ আল্লাহ তায়ালা বলেন, যখন তারা মুমিনগণের সাথে সাক্ষাত করে তারা বলে, আমরা ঈমান এনেছি। আর যখন তারা তাদের শয়তানদের (কাফেরদের) সাথে একান্তে মিলিত হয় তখন তারা বলে, আমরা তোমাদের সাথে আছি, আমরা ঠাট্রা করছিলাম। [সূরা বাকারা : ১৪] আল্লাহ আরো বলেন, যখন তাদেরকে বলা হয় তোমরা সেরকম ঈমান আন যেরকম মানুষগণ (সাহাবাগণ) ঈমান এনেছে; তখন তারা (উপহাস করে) বলে, নির্বোধরা যেরকম ঈমান এনেছে সেভাবে আমরা ঈমান আনব? মূলতঃ তারাই (মুনাফেকরাই) নির্বোধ অথচ তারা জানে না। [সূরা বাকারা : ১৩]
সেই আব্দুল্লাহ বিন উবাই যখন মৃত্যুবরণ করে তখন তার মুসলমান ছেলে আব্দুল্লাহ রাসূল সা. এর কাছে আবদার করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি জানি আমার বাবা জীবিতাবস্থায় কত অপরাধ করেছে তবে আমি চাচ্ছি, তার শেষটা যেন একটু ভাল হয়। আমি আপনার জামাটা চাই, তাতে আমার বাবাকে কাফন দিব ও আপনি দয়া করে আমার বাবার জানাযার নামায পড়াবেন। রাসূল সা.এই চরম শত্রুর সাথে কি করলেন? যে সারা জীবন রাসূল সা. কে কষ্ট দিয়েছে ও সর্বদা ইসলামের ক্ষতি করেছে। যে জীবনভর শত্রুপক্ষের নেতৃত্ব দিয়েছে। রাসূল সা. তার চরম শত্রুর কাফনের জন্য নিজের জামা খুলে দিলেন। তার জানাযার নামায পড়ানোর জন্য রওয়ানা হলেন। হযরত ওমর রা. যখন শুনেছেন, রাসূল সা. মুনাফেক নেতা উবাইয়ের জানাযা পড়ানোর জন্য রওয়ানা হয়েছেন, তিনি রাসূল সা. এর পথরোধ করে তার সামনে দাঁড়িয়ে গেছেন আর বলছেন, আাপনি এই মুনাফেক নেতার জানাযা পড়াতে পারেন না। রাসূল সা. মুচকি হাসছেন আর বললেন, সরে যাও। রাসূল সা. তার পাশ থেকে গিয়ে আবার চলা শুরু করলেন। হযরত ওমর রা. আবার রাসূল সা. এর সামনে দাঁড়িয়ে গিয়ে পথরোধ করলেন ও বললেন, আপনি কি ভুলে গেছেন, সে অমুক দিন আপনাকে গালি দিয়ে বলেছিল, তোমরা তোমাদের কুকুরকে হৃষ্টপুষ্ঠ করছ তারপর সে তোমাদের খাবে। রাসূল সা. বললেন, সরে যাও এবং তার পাশ থেকে গিয়ে আবার চলা শুরু করলেন। হযরত ওমর রা. আবার রাসূল সা. এর সামনে দাঁড়িয়ে গিয়ে পথরোধ করলেন ও বললেন, আপনি কি ভুলে গেছেন সে অমুক দিন বলেছিল, মদিনায় ফিরে আমরা সম্মানিতরা অপমানিতদেরকে বের করে দিব। সে আপনার স্ত্রী হযরত আয়েশা রা. এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটিয়েছিল। এভাবে সেই মুনাফেক নেতার প্রমানিত অপরাধ ও কুকর্মগুলো স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে অপরাধগুলোর বিবরণ আল্লাহ তায়ালা কুরআনের মধ্যে উল্লেখ করেছেন। এমনকি আল্লাহ তায়ালা সে মুনাফেকদের সম্পর্কে বলেছিলেন, আপনি তাদের জন্য সত্তরবার ক্ষমা চান বা না চান আল্লাহ কখনো তাদেরকে ক্ষমা করবেন না। রাসূল সা. হযরত ওমর রা. কে বললেন- আমাকে তার জানাযা পড়ানোর ব্যাপারে আমাকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে এবং তার জানাযা পড়া থেকে আল্লাহ তায়ালা নিষেধ করেন নি তাই আমি তার জানাযা পড়াব। তারপর বললেন, সরে যাও এবং তিনি নামায পড়ান। অতপর আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাযেল করেন, (হে রাসূল!) তাদের (মুনাফেকদের) মধ্যে কেউ মারা গেলে তাদের উপর কখনো নামায পড়াবেন না ও তাদের কবরের পাশেও দাঁড়াবেন না। হযরত ওমর রা. বলেন, রাসূল সা. এর কাজে এভাবে বাধা দেওয়া ও তার পথরোধ করার জন্য সারা জীবন অনুতপ্ত ও লজ্জিত ছিলাম। এ ভুলের জন্য অনেক ক্ষমা চেয়েছি ও অনেক সাদাকা করেছি। [তিরমিযী : ৩০৪১] সে মুনাফেক নেতা রাসূল সা. এর সবচেয়ে প্রকাশ্য শত্রু ছিল এবং সে রাসূল সা.ও মুসলমানদেরকে সবচেয়ে বেশী কষ্ট দিয়েছে অথচ রাসূল সা. তাকেও ক্ষমা করে দিচ্ছেন। শুধু ক্ষমা না বরং তাকে রাসূল সা. নিজের জামা উপহার দিচ্ছেন ও তার জানাযাও তিনি পড়িয়েছেন। এরকম মহানুভবতা রাসূল সা. ছাড়া কে দেখাতে পারবে?
মুনাফেকরা রাসূল সা. কে যত কষ্ট দিয়েছে তার মধ্যে অন্যতম ছিল তার প্রাণপ্রিয় স্ত্রী হযরত আয়েশা রা. এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ। শয়তানের দোষর মুনাফিকরা রাসূল সা. এর প্রিয়তম স্ত্রী, শ্রেষ্ঠ পরিবার হযরত আবু বকর রা. এর পরিবার এর শ্রেষ্ঠ সন্তান হযরত আয়েশা রা. এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটিয়েছিল, যার ফলে রাসূল সা. এবং জগতশ্রেষ্ট পরিবার হযরত আবু বকর রা. এর পরিবার এক মাস যাবত অসহ্য যন্ত্রণা বরদাশত করেছেন। অবশেষে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা হযরত আয়েশা রা. এর পবিত্রতা সম্পর্কে কুরআনের আয়াত নাযেল করেন।
হযরত আয়েশা রা. বলেন, যখন কোন সফরের আয়োজন হতো তখন রাসূলের স্ত্রীদের মধ্যে রাসূলের সফরসঙ্গী হওয়ার ব্যাপারে লটারি করা হতো। যার পক্ষে লটারী উঠতো সে রাসূলের সফরসঙ্গী হতেন। মুসতালাক অভিযানের সময় আমার পক্ষে লটারি উঠল। রাসূল সা. আমাকে নিয়ে সে অভিযানে বের হলেন। আমার জন্য উট প্রস্তুত করা হলো। আমি হাওদাজে বসলে আমার হাওদাজের নিচের অংশ ধরে উটের উপর রেখে উটের সাথে বেঁধে দিত। তারপর তারা উটের মাথা ধরে চলতে থাকতো। এ অভিযান শেষ করার পর মদিনায় ফেরার পথে মদিনার নিকটবর্তী এসে এক স্থানে রাতের প্রথম ভাগে যাত্রাবিরতি করা হলো। আমিও বের হয়ে প্রয়োজন পূরণ করলাম। আমার গলায় একটা হাঁড় ছিল। হাওদাজে ফেরার পর হাঁড়টা খুঁজে পেলাম না। হাঁড় খুঁজতে খুঁজতে যেখানে এসেছিলাম সেখানে চলে আসলাম এবং হাঁড়টা খুঁজে পেলাম। এদিকে প্রস্থানের ঘোষণা আসলে সবাই রওয়ানা হলো। যারা আমার হাওদাজকে বহন করতো তারা ধারণা করলো যে, আমি ভিতরেই আছি। তারা আমার হাওদাজকে বহন করে উটের পিঠে বেঁধে রওয়ানা হলো। আমি কাফেলার কাছে ফিরে এসে দেখি যে, কেউ নেই। সবাই চলে গেছে। তখন আমি আমার ওড়না পেঁচিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম এবং ভাবলাম, যখন আমাকে খুঁজে পাবে না তখন আমাকে খুঁজতে এখানে আসবে। সফওয়ান ইবনে মুআত্তাল কোন কারণে পিছনে রয়ে গিয়েছিল। সে আমার কাছ থেকে অতিক্রম করার সময় আমার কালো বোরকা দেখতে পেলো। পর্দার আগে সে আমাকে দেখেছিল। আমার কাছে এসে যখন আমাকে দেখল, সে বলল, ইন্না লিল্লাহি ও ইন্না ইলাইহী রাজিউন। এতো রাসূল সা. এর স্ত্রী। তখন আমি কাপড়ে আবৃত ছিলাম। সে বলল, কি ব্যাপার, আপনি পিছনে রয়ে গেছেন কেন? আমি তার সাথে কোন কথা বললাম না। তখন সে বাহনটা কাছে এনে আমাকে তাতে আরোহণ করতে বললেন এবং পিছনে সরে গেলেন। আমি আরোহণ করলাম এবং সে উটের মাথা ধরে টানতে লাগলো। কাফেলার সন্ধানে সে দ্রুত চলতে লাগল। খোদার কসম! কাফেলার কেউ আমার সন্ধান করেনি। তারা সারারাত পথচলার পর সকালে এক স্থানে যাত্রাবিরতি করল। সকালবেলা সবাই যখন বিশ্রামে ছিল তখন দেখল যে আমার বাহনকে টেনে টেনে এক ব্যক্তি নিয়ে আসছে। তারপর অপবাদ রটনাকারীরা যা রটনা করার করলো এবং কাফেলার ভিতরে কম্পন সৃষ্টি হলো। অথচ আমি কিছুই জানতাম না। তারপর মদিনায় ফিরে অসুস্থ হয়ে পড়লাম এবং অনেকদিন অসুস্থ হয়ে বিছানায় ছিলাম। যার কারণে আমার কাছে অপবাদের কোন খবর পৌছল না। আমার বাবা আর রাসূলের কাছে যে খবরগুলো পৌছতো, তার কোন কিছু আমার কাছে বলতো না। তবে রাসূলের আচরণে কিছুটা পরিবর্তন অনুভব করলাম। পূর্বে অসুস্থ হলে আমার সাথে যেরকম সোহাগ করতো, সেরকম সোহাগ এবারের অসুখে কম লক্ষ্য করলাম। আমার কাছে যখন রাসূল সা. আসতেন এবং আমার মা আমার সেবা করতেন তখন শুধু জিজ্ঞাসা করতেন, কেমন আছো? এর চেয়ে বেশী কিছু বলতেন না। এ অবস্থা দেখে রাসূল সা. কে বললাম, অনুমতি দিলে আমি আমার বাবার বাড়ি যাব। অনুমতি দেয়ার পর মায়ের কাছে চলে আসলাম। রটনার কোন খবর আমি জানতাম না। বিশ-পচিঁশ দিন পরে কোন প্রয়োজনে এক রাতে উম্মে মাছতাহ বিনতে আবু রাহাম এর সাথে ঘরের বাইরে বের হলাম। চলতে চলতে এক জায়গায় আমার চাদরের সাথে হোঁচট খেলাম। তখন উম্মে মেছতা বলল, মেছতার নাশ হোক। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আপনি এগুলো কি বলছেন, এমন একজন ব্যক্তি সম্পর্কে যিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। উম্মে মেছতাহ বলল, হে আবু বকরের মেয়ে! তোমার কাছে কি খবর পৌঁছেনি? হযরত আয়েশা রা. বললেন, কি খবর? তারপর তিনি রটনাকারীরা যা বলে সেগুলো আমাকে বলল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, সত্যিই এমন রটনা হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। খোদার কসম! তারপর আর আমার প্রয়োজন সাড়তে পারিনি। দ্রুত ফিরে আসলাম এবং কাঁদতে থাকলাম। এমনকি আমার মনে হলো যে, কান্নার কারণে আমার বুকে ব্যথা শুরু হলো। আমার মাকে বললাম, লোকেরা এরকম অপবাদ রটিয়েছে, আর আপনারা আমাকে কিছুই বলেননি। আমার মা বলল, সহজ হও। সুন্দরী মেয়ে এমন স্বামীর সাথে থাকে, যে স্বামী তাকে অন্য সতীনদের চেয়ে বেশী ভালবাসে, তার ব্যাপারে অনেক কিছুই ঘটতে পারে।
জগতসেরা পরিবার, রাসূল সা. এর সবচেয়ে বেশী প্রিয় পরিবার ও তার প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর বিরুদ্ধে এরকম রটনা রাসূল সা. কতটা মানসিক কষ্টে দিনাতিপাত করছেন? হযরত আমর বিন আস রা. বলেন, রাসূল সা. আমার সাথে এরকমন সুন্দর আচরন করতেন যে আমি ভাবতে লাগলাম, রাসূল সা.সম্ভবত আমাকে সবচেয়ে বেশী ভালবাসেন। রাসূল সা. এর চরিত্রই সবার সাথে এরকম সুন্দর আচরন করা। হযরত আমর রা. বলেন, তাই আমি একবার রাসূল সা. কে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, হযরত আয়েশা রা.। আমি বললাম, পুরুষের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় কে?  রাসূল সা. বললেন, তার বাবা হযরত আবু বকর রা.। আমি বললাম, তরপর কে? রাসূল সা. বললেন, ওমুক। আমি এভাবে জিজ্ঞাসা করতে লাগলাম আর রাসূল সা. এভাবে উত্তর দিতে থাকলেন। অতপর প্রশ্ন করা বন্ধ করে দিলাম এটা ভেবে যে আমার সিরিয়াল হয়ত সবার শেষে হবে। অতএব হযরত আয়েশা রা. ও তার পরিবার রাসূল সা.এর সবচেয়ে বেশী প্রিয় পরিবার সম্পর্কে এরকম মিথ্যা রটনা কতটা মানসিক যন্ত্রণার কারণ! অবশেষে রাসূল সা. মসজিদে দাড়িঁয়ে খুতবা প্রদান করলেন। তিনি বললেন যে, আমাকে ঐ লোকের হাত থেকে কে রক্ষা করবে? যে আমাকে কষ্ট দিচ্ছে এবং তার কষ্ট প্রদান চরম সীমায় পৈাছেছে? লোকদের কি হলো? তারা আমার পরিবার সম্পর্কে আজেবাজে কথা বলে, অথচ আমার পরিবার সম্পর্কে ভাল ব্যতীত অন্য কিছু জানিনা। তারা এমন ব্যক্তি (হযরত সাফওয়ান বিন মুআত্তাল) কে নিয়ে আজেবাজে কথা বলে, যার সম্পর্কে ভাল ছাড়া অন্য কিছু জানি না এবং সে কখনো আমার উপস্থিতি ছাড়া আমার বাসায় প্রবেশ করিনি। সা’দ বিন মোআ’জ রা. দাঁড়িয়ে বললেন, সে যদি আমার বংশের হয় তবে আমি তাকে মৃত্যুদন্ড দিব আর যদি সে খাজরাজ গোত্রের হয় তবে তাকেও মৃত্যুদন্ড দিব। তখন খাজরাজ নেতা হযরত সা’দ বিন ওবাদা রা. দাঁড়িয়ে বলছেন, আপনি আপনার গোত্র সম্পর্কে বলেন, আমার গোত্রের কারো উপর আপনি হাত উঠাতে পারবেন না। হযরত সা’দ বিন উবাদা রা. বড় সাহাবী ছিলেন তবে তার মধ্যে গোত্রপ্রীতি একটু বেশী ছিল। তখন হযরত উসাইদ বিন হুজাইর রা. দাঁড়িয়ে বললেন, রাসূল সা. কে কষ্ট প্রদানকারী যদি তোমার বংশেরও হয় তবুও তাকে আমরা হত্যা করব। এ কারণে আওছ এবং খাজরাজ গোত্রদ্বয় মসজিদের মধ্যে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়ে গেল এমনকি তারা প্রায় যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। আর রাসূল সা. তাদেরকে শান্ত হতে বলছেন। হযরত আবু বকর রা. কাঁদতেছেন আর বলছেন, আবু বকরের বাড়িতে যে দূঃখ আর দূর্দশা নেমে আসছে এরকম দূঃখের সম্মুখিন তারা কখনো হননি। তিনি সারা জীবন সাধনা করে যা অর্জন করেছেন সব ধুলিস্যাত হয়ে যাচ্ছে। সবাই তাকে ভালবাসত, তার পরিবারকে ভালবাসত। সবাই তাদেরকে সম্মান করত এবং তাদেরকে আদর্শ পরিবার মানত আর আজ তাদের বিরুদ্ধে অপবাদ রটছে। জগতের সেরা পরিবারের এ কি করুণ হতাশা!
হযরত আয়েশা রা. বলেন, এ রটনার পিছনে ছিল মেছতা এবং হামনা বিনতে জাহাশ। আমি তার বোন জায়নাব বিনতে জাহশের সতীন হওয়ার কারণে সে এর পিছনে ছিল। কিন্তু হযরত জায়নাব কে আল্লাহ তায়ালা হেফাজত করেছেন। মোনাফেক আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এটাকে আরো ব্যাপক করে দিয়েছে। এ কারণে আওছ এবং খাজরাজ গোত্রদ্বয় প্রায় যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। রাসূল সা. আমার বাড়িতে এসে হযরত আলী এবং হযরত উসামাকে ডেকে পরামর্শ তলব করলেন। হযরত উসামা রা. ভাল ছাড়া কোন খারাপ কিছু বলেননি। সে বলল, আপনার পরিবার সম্পর্কে মন্দ কিছু জানি না। এগুলো সব মিথ্যা। হযরত আলী রা. বললেন, আল্লাহর রাসূল! মহিলা অনেক আছে। আপনি ইচ্ছা করলে পরিবর্তন করে নিতে পারেন। তার চাকরানীকে আপনি জিজ্ঞাসা করেন, সে সত্য বলবে। রাসূল সা. হযরত বারিরা রা. কে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন। হযরত আলী রা. একবার দাঁড়িয়ে বারিরা রা. কে মারলেন এবং বললেন, রাসূলের কাছে সত্য বল। হযরত বারিরা রা. বললেন, হযরত আয়েশা রা. সম্পর্কে ভাল ছাড়া কিছুই জানিনা। তাকে কোন দোষারুপ করি না। তবে মাঝেমধ্যে আমি আটাগুলো তাকে দেখতে বললে সে ঘুমিয়ে পরতো এবং ছাগল এসে খেয়ে ফেলতো (অর্থাৎ একটু উদাসীন ধরনের মেয়ে)। তারপর রাসূল সা. আমার কাছে আসলেন। আমার বাবা-মা এবং এক আনসারী মহিলা আমাদের বাড়িতে ছিল। আমি কাঁদতেছিলাম, আমার মা ও কাঁদতেছিল। রাসূল সা. বসে আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন, হে আয়েশা! লোকেরা যা বলে তা শুনেছো? আল্লাহকে ভয় কর, লোকেরা যেমন বলে সেরকম কিছু করে থাকলে, আল্লাহর কাছে তওবা কর। কারণ আল্লাহ তায়ালা স্বীয় বান্দার দোয়া কবুল করেন। আল্লাহর কসম! যখনই রাসূল সা. এ কথা বললেন, আমার অশ্রু শুকিয়ে গেল। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। অপেক্ষা করলাম যে, আমার বাবা-মা কোন উত্তর দিবে, কিন্তু কিছুই বললেন না। মনে মনে আমার বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহ তায়ালার যে কুরআন সবসময় পড়া হয় এবং নামাযে যা তেলাওয়াত করা হয় সেখানে তো কিছু উল্লেখ করবেন না, কিন্তু কমপক্ষে আল্লাহ তায়ালা রাসূল সা. কে স্বপ্নের মাধ্যমে আমার পবিত্রতা সম্পর্কে জানিয়ে দিবেন। যখন দেখলাম, আমার মা-বাবারা কিছু বললনা তখন আমি বললাম যে, আপনারা রাসূলের কোন উত্তর দিলেন না। তারা বলল, কি উত্তর দিব? আল্লাহর কসম! আমার জানা নেই যে, আবু বকরের বাড়িতে এ সময়ে যেরকম বিপদ এসেছে, সেরকম বিপদ আর কারো বাড়িতে হয়েছে কি না? যখন বাবা-মা উভয়  আমার সামনে বোবা হয়ে গেল, তখন আমার চোখে অশ্রু আসলো এবং কাঁদলাম। আমি বললাম, আপনি যা বলেছেন এজন্য কখনো তওবা করবো না। আল্লাহর কসম! মানুষ যা বলে সেগুলো যদি স্বীকার করি, অথচ আল্লাহ তায়ালা জানেন যে, আমি পবিত্র, তাহলে আমি যা করিনি তা’ স্বীকার করলাম। আর যদি তা’ অস্বীকার করি তাহলে আপনারা বিশ্বাস করবেন না। হযরত ইয়াকুব আ. এর নাম মনে করতে চাইলাম, কিন্তু অতি দুঃখের কারণে মনে করতে পারলাম না। তারপর বললাম যে, আমি তেমনি বলব যেমন হযরত ইউসুফের বাবা বলেছিলেন, ‘সুন্দর ধৈর্যধারণ করা উচিত, তোমরা যা বল, তার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে আমি সাহায্য প্রার্থনা করি। [সূরা ইউসুফ:১৮]
হযরত আয়েশা রা. বলেন, রাসূল সা. সে স্থানেই বসা ছিলেন। এমতাবস্থায় ওহী অবতরনের সময় যেরকম আচ্ছন্ন হন সেকরকম আচ্ছন্ন হলেন। তার কাপড় দ্বারা তাকে ঢেকে দেয়া হলো। তার মাথার নীচে বালিশ দেয়া হলো। আমি যখন এ অবস্থা দেখলাম, আমি কোন ভয় পেলাম না। কারণ আমি জানি যে, আমি পবিত্র নারী, আল্লাহ আমার উপর জুলম করবেন না। আর আমার মা-বাবার অবস্থা এমন ছিল যে, যখন থেকে রাসূল আচ্ছন্ন হলেন, তখন থেকে তারা ভয়ে তাদের আত্মা বের হয়ে যাবে। তারা ভীত ছিলেন যে, হয়তো আল্লাহ তায়ালা মানুষ যা বলে এগুলোর স্বীকৃতি দিবে। কিছুক্ষণ পর রাসূল সা. চেহারার ঘাম মুছতে মুছতে বলতে লাগলেন, হে আয়েশা! সুসংবাদ গ্রহণ কর। আল্লাহ তায়ালা তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করেছেন। আমি বললাম, সকল প্রশংসা আল্লাহর। তারপর রাসূল সা. মানুষের কাছে গিয়ে খুতবা দিলেন এবং অবতীর্ণ আয়াতগুলো তেলাওয়াত করলেন। যারা অপবাদ দিয়েছে, তারা তোমাদের একটা দল। তোমরা এটাকে তোমাদের জন্য মন্দ মনে কর না; বরং এটা তোমাদের জন্য ভাল। পাপ যারা করে তাদেরকেই এর পরিনাম ভোগ করতে হবে। যারা বড় অপবাদ করে তাদের জন্য নির্ধারিত আছে কঠিন শাস্তি। [সূরা নূর:১১] তারপর মেছতা, হামনা এবং হাচ্ছান বিন সাবিত সহ যারা অপবাদ রটিয়ে ছিল রাসূল সা. তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। [তাফসীরে ইবনে কাসীর, তাফসীরুল কুরআন:৬/২২]
হযরত আবু বকর রা. হযরত মেছতা রা. কে সর্বদা অনুদান দিতেন। সেই হযরত মেছতা যখন হযরত আবু বকর রা. এর পরিবারের বিরুদ্ধে এমন দূর্ণাম রটাতে ইন্ধন দিয়েছে তখন হযরত আবু বকর রা. শপথ করলেন, তিনি আর মেছতা রা. কে আগের মত অনুদান দিবেন না। তখন আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাযেল করে বলেন, তোমাদের মধ্যে কোন স্বচ্ছল ও দয়াবান (হযরত আবু বকর) যেন তার আত্মীয়দেরকে দান করা বন্ধ না করে; বরং যেন ক্ষমা করে দেয়। মুসলমান এর চরিত্র এমন হতে হবে যে, কেউ তার ক্ষতি করলেও সে তাকে ক্ষমা করে দিবে এবং অনুদানও বহাল রাখবে। হযরত আবু বকর রা. হযরত মেছতা রা. কে ক্ষমা করে দিলেন ও আগের মত অনুদান দিতে থাকলেন।
হযরত আবু সাইদ রা. বলেন, হযরত আলী রা. ইয়ামান থেকে কিছু স্বর্ণ রাসূল সা. এর কাছে পাঠালেন। অতপর রাসূল সা. তা আকরা’ বিন হাবিস, বনী মুজাশী এর একজন, উআইনা বিন বদর, আলকামা, বনী কিলাবের একজন, জায়েদ আল-খাইল এবং বনী নাবহান এর মাঝে বন্টন করে দিলেন। তখন কুরাইশ এবং আনসারগণ রাগ করলেন এবং বললেন, তিনি নাজদের নেতাদেরকে প্রদান করে আর আমাদেরকে বাদ দেয়। রাসূল সা. বললেন, আমি তাদের মন যোগাতে চাচ্ছি (তারা দুনিয়ার লোভে হলেও যাতে ইসলামে অটল থাকে)। তখন এক ব্যক্তি দাঁড়াল যার চোখ দুটি গভীর, গালদুটি ফুলা, কপাল উচু ও তার মাথা মুন্ডানো। সে বলল, হে মুহাম্মাদ সা.! আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। রাসূল সা. বললেন, ধ্বংস হোক! আমি যদি আল্লাহকে না মানি তবে আল্লাহকে কে মানবে! আল্লাহ আমাকে পৃথিবীবাসীর ব্যাপারে বিশ্বাস করেন আর তোমরা আমাকে বিশ্বাস কর না। হযরত খালেদ ইবনে ওলীদ রা. যখন কতল করার অনুমতি চাইলো রাসূল সা. মানা করলেন। [বোখারি : ৫৯০৪]
রাসূল সা. বন্টন করছিলেন তখন বনী তামীমের একজন ব্যক্তি জুল খুআইসারা এসে বলল, আপনি ইনসাফ করুন। অর্থাৎ আপনি আমাদেরকে বেশী দেননি ও আপনি আমাদের মাঝে ইনসাফের ফয়সালা করেন নি; (বরং আপনি অন্যায় করেছেন। রাসূল সা. কে সবার সামনে এভাবে বললে) রাসূল সা. উত্তেজিত হয়ে বলেন, আমি যদি ন্যায় ও ইনসাফ না করি তবে কে ইনসাফ ও ন্যায় করবে? তুমি ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছ। হযরত ওমর রা. বলেন, আমাকে তাকে হত্যা করার অনুমতি দিন। রাসূল সা. বাধা দিলেন। [বোখারি : ৩৩৬৪]
হুনাইনের যুদ্ধে রাসূল সা. নতুন মুসলমান হযরত উআইনা বিন হুসাইন ও তার মত আর কিছুকে বেশি করে দেন। এ কারণে অনেক সাহাবী মনে কষ্ট পান এমনকি আনসারী সাহাবাগণও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাসূল সা. তার আত্মীয় স্বজনকে পেয়ে আমাদেরকে ভুলে গেছেন। তারপর রাসূল সা. সকল আনসারী সাহাবীদেরকে একত্রিত করে বললেন, তোমরা পথহারা ছিলে আর আল্লাহ আমাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়ে তোমাদের কে সঠিক পথ দেখিয়েছেন। তোমরা অভাবী ছিলে আল্লাহ তোমাদেরকে ধনী বানিয়েছেন। তোমরা বিভক্ত ছিলে আল্লাহ তোমাদেরকে একতা দান করেছেন। তবে তোমরা যদি বলতে চাও বলতে পার, আপনি আমাদের কাছে বিতারিত হয়ে এসেছেন আর আমরা আশ্রয় দিয়েছি, আপনি অত্যাচারিত হয়ে এসেছেন আর আমরা সাহায্য করেছি, আপনি অভাবী এসেছেন আর আমরা সহমর্মিতা প্রদর্শন করেছি, আপনি আতংকিত হয়ে এসেছেন আর আমরা নিরাপত্তা দিয়েছি। সবাই  তোমাদের সমর্থন করবে এবং তোমাদের কথা সবাই সঠিক বলবে। তারা নতুন মুসলমান বলে আমি দুনিয়ার সামান্য ঘাষ তাদেরকে দিয়ে তাদের মন জয় করেছি আর তোমাদের কাছে দুনিয়া মূল্যহীন বলে তোমাদেরকে এগুলো দেইনি। এ কারণে তোমরা আমার প্রতি রাগ করেছ? লোকেরা উট, ছাগল নিয়ে যাবে আর তোমরা তোমাদের রাসূলকে নিয়ে যাবে তবে কি তোমরা খূশি হবে না। [মুসলিম:১৭৬৫] সাহাবাগণ সবাই কাঁদলেন ও একবাক্যে বললেন, আমরা রাসূল কে নিয়ে সন্তুষ্ট।
রাসূল সা. এরকম অনেক কষ্ট পেয়েছেন আর তিনি সবাইকে হাসিমুখে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কখনো রাসূল সা. প্রতিশোধ গ্রহণ করেন নি। বরং খারাপ ব্যবহারকে ভাল ব্যবহার দ্বারা দমন করেছেন। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight