বৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদে দারিদ্র বিমোচন : মমিনুল ইসলাম মোল্লা

রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন প্রতিটি মানুষকেই উপার্জন করতে হয়। আল্লাহতায়ালা তার সমগ্র সৃষ্টিকে মানুষের খেদমতে নিয়োজিত করেছেন। মানুষ আল্লাহর নির্দেশিত পথে সম্পদ উপার্জন করতে পারে। উপার্জনের ক্ষেত্রে মানুষের জন্য হালাল-হারামের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হারাম উপায়ে অর্জিত সম্পদ কোন কাজে আসবে না। মদের ব্যবসা হারাম। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে মদকে ভিন্ন নামে পরিচিত করে মুসলমানরা সে ব্যবসার সাথে জড়িত হচ্ছে। মদকে ভিন্ন নামে নামকরণ করে তা হালাল মনে করা প্রসঙ্গে হিশাম ইবনু আম্মার আব্দুর রহমান ইবনু গানাম আশআরী র. থেকে বর্ণিত । তিনি বলেন, আবু মালেক আশআরী র. বলেন, রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মতের মাঝে অবশ্যই এমন কতগুলো দলের সৃষ্টি হবে, যারা ব্যাভিচার, রেশমী কাপড়, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল জ্ঞান করবে। [বুখারী শরীফ : হাদীস নং ৫১৭৬]
অবৈধভাবে ব্যবসায়িক পদ্ধতিতে সম্পদ উপার্জন সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে জুলুমের আশ্রয় নেয়া যাবে না। এ ব্যাপারে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন বলেন, “হে আমার বান্দা, আমি নিজের উপর জুলুমকে হারাম করেছি। অতএব, তোমরা পরস্পরের উপর জুলুম করো না। [মুসলিম শরীফ : হাদীস নং ২৫৭৭]
জুলুমের কারনে ব্যক্তি নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অতীতে পুরো জাতিকেই আল্লাহ ধ্বংস করে দিয়েছেন। হালাল বা বৈধ কোনগুলো তা কুরআন-হাদীসে বলে দেয়া হয়েছে। হারাম বা অবৈধ কাজ ও খাদ্যের ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। হালাল ও হারাম এর মধ্যবর্তী বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকতে বলা হয়েছে। যে সন্দেহজনক বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকবে সে তার ধর্ম রক্ষা করলো। আমাদের আর্থিক শারিরীক ও দৈহিক ইবাদতসহ সকল ইবাদত হতে হবে আল্লাহর জন্য। কিয়ামতের দিন বান্দাকে ৫টি প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। এ পাঁচটি প্রশ্নের মধ্যে ২টি হচ্ছে অর্থনীতি বিষয়ক প্রশ্ন। কোন উপায়ে সম্পদ উপার্জন করেছো আর কি উপায়ে তা খরচ করেছো? এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বান্দা এক পাও এগুতে পারবে না। তাই অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। ব্যবসায়ীরা পণ্য-দ্রব্য মজুদ করতে ভালবাসেন। যে মজুদদারীর কারনে দাম বেড়ে যায় বাজারে পণ্যের সঙ্কট দেখা দেয় তা অবৈধ। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে মওজুদদারী করে সে পাপী [মুসলিম শরীফ : হাদীস নং ৪২০৬]
ছবি অঙ্কনজনিত ব্যবসায়ের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা জায়েজ নয়। রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছবি অঙ্কনকারীদের প্রতি অভিশাপ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে মানুষের মধ্যে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে ছবি অঙ্কনকারীগণ, বলা হবে তোমরা যা অঙ্কন করেছ তাতে আত্মা ও জীবন দাও। [বুখারি শরীফ : হাদীস নং ৪৭৮৩]
সুদকে হালাল বা বৈধ মনে করা যাবে না। কেননা আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিন বলেন, “আর আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ করেছেন। আর সুদকে করেছেন হারাম। [সূরা বাকারা : আয়াত ২/১৭৫]
ঘুষের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধি করা যাবে না। ঘুষ দেয়া-নেয়া এবং এর সাথে যে কোনভাবে সম্পৃক্ত হওয়া যাবে না। অব্দুল্লাহ ইবন আমের রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুষদাতা ও ঘুষ গ্রহণকারী উভয়কে লানত করেছেন। [ইবনে মাযাহ : হাদীস নং ২৩১৩]
ঘুষ বা অবৈধ লেনদেন চাকুরি বা ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত রয়েছে। এটি ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে, আব্দুল্লাহ ইবনু মোহাম্মদ আবু হুমায়দ সাঈদী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আযাদ গোত্রের ইবনু উতরিয়া নামক এক ব্যক্তিকে সাদকা সংগ্রহের কাজে নিয়োগ করেছিলেন। তিনি ফিরে এসে বলেন, এগুলো আপনাদের (অর্থাৎ সাদকার মাল) আর এগুলো আমাকে হাদিয়া দেওয়া হয়েছে। এটি ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে তার বাবার ঘরে কিংবা তার মায়ের ঘরে কেন বসে থাকলো না? তখন সে দেখত তাকে কেউ হাদিয়া দেয় কি না ? যার হাতে আমার প্রাণ সেই সত্তার কসম, সাদকার মাল থেকে সামান্য পরিমাণও যে আত্মসাৎ করবে সে তা কাধে করে কিয়ামতের দিন হাযির হবে। কোন ব্যক্তি মুসলমানদের সম্পদ (যা তার কাছে রয়েছে) আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা কসম খায় সে আল্লাহর সঙ্গে এমন অবস্থায় মিলিত হবে যে আল্লাহ তার উপর অসন্তুষ্ট থাকবেন। যারা দুনিয়ার কোন সুবিধার বিনিময়ে নিজেদের শপথকে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রয় করে তাদের পরিণাম ভাল হবে না। কৃষকগণ জমি চাষের সময় অন্যের জমি আত্মসাতের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া বাড়ি তৈরির সময় সরকারি জমিতে বা প্রতিবেশীর জমি আত্মসাৎ করতে পারেন। বিশ্বের সর্বত্রই জমি সংক্রান্ত বিরোধ বিদ্যমান। আয়েশা রা. এর জীবদ্ধশায় কয়েকজন বিবাদ করছিল। তখন তিনি বললেন, হে আবু সালমা! জমি-জমার ঝামেলা হতে দূরে থাক। কেননা রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি এক বিঘত পরিমাণ অন্যের জমি জুলুম করে আত্মসাৎ করেছে, কিয়ামতের দিন সাত তবক যমীনের হার তার গলায় পরানো হবে। [বুখারী শরীফ : হাদীস নং ২৯৬৮]
আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিন বলেন, যারা ইহুদী ছিল, তাদের যুলুমের কারনে আমরা তাদের উপর এমন সব পবিত্র বস্তু হারাম করে দিয়েছি যা ছিল তাদের জন্য হালাল। এছাড়া আল্লাহর পথে অন্যকে বাধা দেয়ার জন্য তা করেছিলাম এবং তারা সুদ গ্রহণের কারনে, তাদেরকে অন্যায়ভাবে লোকের ধন সম্পদ গ্রাস করার জন্য নিষেধ করা হয়েছিল। কাফিরদের মর্মন্তুদ শাস্তি প্রস্তুত রেখিছি। [সূরা নিসা : আয়াত ১৬০] অসৎভাবে উপার্জন করে জমি-জমা, গাড়ি-বাড়ি, বিত্ত-বৈভব, আর্থিক প্রভাব-প্রতিপত্তি কোন কাজে লাগবে না। হারাম খেয়ে যে রক্ত মাংশ গঠিত হবে সে দেহ নিয়ে ইবাদত করলে তা কিভাবে কবুল হবে?
মানুষকে মৌলিক চাহিদা হিসাবে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার কথা চিন্তা করতে হয়। নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি স্ত্রী-সন্তান, এবং বৃদ্ধ পিতা-মাতাসহ আত্মীয় স্বজনের চাহিদাও পূরণ করতে হয়। তাছাড়া দান-সাদকা করাও ইবাদতের অংশ। তাই মুমিন ব্যক্তির জীবনে সচ্ছলতা অপরিহার্য। ইসলাম স্বচ্ছলতার ব্যাপারে বহু দিক নির্দেশনা দিয়েছে। সাধারণভাবে আমাদের মধ্যে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, তাকওয়া, সাধুতা ও সততার পথ অবলম্বন করলে দুনিয়াতে অনেক দুঃখ-কষ্ট ও দারিদ্রের শিকার হতে হয়। এ ধারণা সঠিক নয়। আল্লাহ বলেন সঠিক পথ অবলম্বন করলে তোমরা শুধুমাত্র আখেরাতই নয় দুনিয়াতেও মর্যাদা এবং সাফল্যময় জীবন যাপন করতে পারবে। বর্তমানে পৃথিবীর ধনী রাষ্ট্রগুলোর উন্নতির কারণ হচ্ছে শিক্ষা, মেধা ও পরিশ্রম। একজন মুমিন বান্দাকেও সচ্ছলতার জন্য পরিশ্রম করতে হবে। নামাজ শেষ করে সবাইকে রিজিক খোঁজ করার জন্য যমিনে ছড়িয়ে পড়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে এসময়ও আল্লাহকে স্মরণ করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ কাজ-কর্ম এবং ব্যবসা বাণিজ্যে লিপ্ত থাকার অজুহাতে আল্লাহকে ভুলে গেলে চলবে না। সম্পদ “দিয়ে” এবং “না দিয়ে” উভয়ভাবেই আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা করেন। শুধু ব্যক্তিগতভাবেই নয় এ পরীক্ষা হতে পারে ব্যক্তি, পরিবার কিংবা সমাজের ক্ষেত্রে । সুদ ভিত্তিক অর্থনীতি ব্যক্তিগতভাবে কেউ কেউ লাভবান হলেও সামাজিকভাবে যে এটি ক্ষতিকর তা ইতিমধ্যে সারা বিশ্বে প্রমাণিত হয়ে গেছে। তাই এখন সবাই এর বিকল্প খুঁজছে। সম্পদের হ্রাস-বৃদ্ধি সরাসরি আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। তাই দেখা যায় অনেকে বহু কষ্ট করেও স্বাবলম্বী হতে পারে না। কেউ কেউ আবার অল্প ক’দিনেই “আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ” হয়ে যাচ্ছেন। পবিত্র কুরাআনে আল্লাহ বলেন, “তুমি রাত্রিকে দিবসে পরিণত কর এবং দিবসকে রাত্রিতে পরিণত কর, এবং মৃত হতে জীবিতকে নির্গত কর আর জীবিতকে মৃততে নির্গত কর এবং তুমি যাকে ইচ্ছা অপরিমিত জীবিকা দান করে থাকো। [সূরা আলে-ইমরান : আয়াত ৩/২৭]
আল্লাহ আমাদেরকে যা দিয়েছেন তা নিয়েই আমাদেরকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। তিনি যদি কাউকে বেশি সম্পদ দেন তাহলে অন্য কেউ সেটি নিয়ে ভিন্নভাবে চিন্তা করার কোন অবকাশ নেই। এ ব্যাপারে কারো কোন মনোকষ্ট করার কারণ নেই।
কেউ কেউ মনে করেন মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে দারিদ্রের হার বেশি। বিধর্মীরা প্রাচুর্যের মধ্যে সুখে-সাচ্ছন্দে বসবাস করছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরণের ধারণা ভুল।
সুরা যুখরফ (৪৩/৩২) আল্লাহ বলেন, “তোমার রবের রহমত কি এরা বন্টন করে? দুনিয়ার জীবনে এদের মধ্যে জীবন যাপনের উপায় উপকরণ আমি বন্টন করেছি এবং এদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক লোকের ওপর অনেক বেশি মর্যাদা দিয়েছি যাতে এরা একে অপরের সেবা গ্রহণ করতে পারে (এদের নেতারা) যে সম্পদ অর্জন করছে তোমার রবের রহমত তার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।” আল্লাহর সৃষ্টিতে বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। এক এক প্রাণীর এক এক গুণ রয়েছে এবং এক এক ধরণের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান রয়েছে। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে সর্বত্র পার্থক্য দেখতে পাওয়া যায়। এ নিয়ে কেউ কোন প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে না। আল্লাহ অমুককে দেয় আমাকে দেয় না কেন? একথা কোন মুমিন বান্দা বলতে পারে না। আর্থিক ব্যাপারে আল্লাহ যে দিক নির্দেশনা পবিত্র কুরআনে দিয়েছেন সেগুলোকে কোন ব্যক্তি বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হারাম বা নিষিদ্ধ করতে পারে না। আল্লাহ দুনিয়ার সমস্ত শোভা-সৌন্দর্য ও সমস্ত পাক পবিত্র জিনিস তার প্রিয় বান্দাদের জন্য বরাদ্দ করে রেখেছেন। শুধুমাত্র দুনিয়া নয় কিয়ামতের দিনও এগুলোর ফল তারা ভোগ করবে। সুরা হুদের ৩ নম্বর আয়াতে দুিনয়ায় সুখ স্বাচ্ছন্দ ভোগের ব্যাপারে বলা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে যারা শুধুমাত্র দুনিয়ার সুখকে বড় করে দেখে তাদের জন্য দুনিয়ার সুখ সরঞ্জাম “ধোকার সরঞ্জাম” বলে গণ্য হবে। অন্যদিকে যে আখেরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সাথে সাথে তার দ্বারা উপকৃত হবে, তার জন্য পৃথিবীর “ভোগ-বিলাস” উৎকৃষ্ট সরঞ্জাম। কারণ সে তা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবহার করে।
আল্লাহর রহমতকে কাজে লাগিয়ে মুমিন নর-নারীরা সচ্ছলতা লাভ করতে পারেন। সচ্ছলতা লাভের জন্য আল্লাহর কাছে চাইতে হবে। আল্লাহ যেন নিজ অনুগ্রহে নিজে থেকেই অমাদের অনুগত হয়ে যায়নি। আল্লাহর হিকমত ও কুদরতেই তা হচ্ছে। আল্লাহর রহমতের পরশেই পৃথিবীতে জীবন ধারণ সম্ভব হচ্ছে। বিশাল গ্রহটি শান্তিময় হয়ে উঠায় আমরা আল্লাহর রহমতে এখানে নিশ্চিন্তে জীবিকার অনুসন্ধান করতে পারছি। তাই সব সময় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে।
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক, সাংবাদিক ও ধর্মীয় গবেষক, কুমিল্লা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight