বৃদ্ধাশ্রম নয়, মা-বাবার শেষ আশ্রয় হোক আপন নীড়ে / মুফতী পিয়ার মাহমুদ

বর্তমান সময়ের নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রম। এই বৃদ্ধাশ্রম মানব ও মানবতার প্রতি চরম উপহাস। বলা হয় ‘বৃদ্ধাশ্রম মানবতার কলঙ্কিত কারাগার।’ পৃথিবীর দেশে দেশে গড়ে উঠেছে বৃদ্ধাশ্রম নামের এই কারাগার। বিশেষ করে আধুনিক দুনিয়ার প্রায় সকল ‘সভ্য’ দেশেই এই আধুনিক কারাগরের অস্তিত্ব বিদ্যমান। বৃদ্ধাশ্রমের আইডিয়া এসেছে মূলত পাশ্চত্যের সমাজব্যবস্থা থেকে। পাশ্চত্যের ‘একলা চলো’ জীবনব্যবস্থায় বৃদ্ধ বাবা-মাকে মনে করা হয় ‘উটকো ঝামেলা’। বাবা-মা বেচারা সন্তান জন্ম দিয়ে বড় অন্যায় করেছে! তাই তারা বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে পড়েছে ‘মহাবিপাকে’। সন্তান জন্ম ও লালন-পালন করতে গিয়ে মা-বাবা অশেষ কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন, নিজের মুখের খাবার সন্তানের মুখে তুলে দিয়ে পরম শান্তি অনুভব করেছেন, পেশাব-পায়খানায় নোংরা কাপড় নিয়ে রাত পার করেছেন, বাইরে গেলে মনটা আনচান করে মানিক-রতনের কিছু হয় কি ন, যাকে নিয়ে হিমালয়সম স্বপ্নের জাল বুনে নিরবে। সেই বাবা-মার জীবনের পড়ন্ত বেলায় যখন খুব বেশী প্রয়োজন একটু সেবা-যতেœর, দরকার পরম জনের সঙ্গ দানের, আরো দরকার ছেলে-মেয়েদের সন্তানের হাত ধরে ঘুরে বেড়ানোর, ঠিক সেই সময় বুড়ো বাবা-মার জীবন কাটানোর জন্য বৃদ্ধাশ্রম নামের কারাগার আবিস্কারের আইডিয়া। কি নিমর্ম আইডিয়া! কি নিষ্ঠুর পরিকল্পনা! পৃথিবীর সবচে দরদী মানুষ দ’ুটো আজ সংসারের ‘বড় বোঝা’ হয়ে দাড়িয়েছে। কলজে ছেঁড়া ধনের কাছে তারা আজ অনেক ভারী বোঝা! যে বোঝা বহনের সাধ্য তাদের নেই। তাই তো এই গরু-ছাগলের ‘খোয়াড়’ আবিষ্কার! হাদীসের একটি গল্প বলি। আম্মাজান আয়েশা রা বলেন, ‘একদিন আমার নিকট একজন ভিক্ষুক নারী এলো। সাথে ছিল তার দুটি কন্যা। তাকে আমি তিনটি খেজুর দিলাম। সে খেজুর তিনটি থেকে দুটি দুই মেয়েকে দিল। আরেকটি নিজে খাওয়ার জন্য মুখের কাছে নিল। এমতাবস্থায় সেই একটি খেজুরও মেয়েরা খেতে চাইল। আর অমনি সেই খেজুরটিকে সে দুই ভাগ করে দুই মেয়ের মুখে উঠিয়ে দিল। আয়েশা রা বলেন, এ ঘটনা আমাকে প্রচন্ডভাবে নাড়া দিল। ফলে ঘটনাটি আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শুনালাম। সব শুনে তিনি বললেন, নিশ্চয় এই খজুরের বদলায় আল্লাহ এই মা এর জন্য জান্নাত ওয়াজিব করে দিয়েছেন। অথবা তিনি বলেছেন, নিশ্চয় এই খজুরের বদলায় আল্লাহ এই মাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন। [মুসলিম, হাদীস: ২৬৩০] সন্তানের প্রতি বাবা-মার দরদ ও ভালবাসা এমনই হয়। মুখের খাবার খাইয়ে পরম তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন যে মা-বাবা, তারাই আজ কি না সন্তানের জন্য বড্ড ‘ভারী বোঝা’। এ এক অদ্ভুত নিয়তি! পাশ্চত্যের এই বমন গিলতে শুরু করেছে এ দেশের মানুষও। হাজার বছরের ঐতিহ্য আর ইসলামের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গালী দেখিয়ে এ দেশ ও মাটির চির চেনা সামাজিক ও পারিবারিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে বাবা-মাকে রেখে আসছে ইসলাম ও ইসলামের নবীর অনুসারীগণ বৃদ্ধাশ্রমে। কি নর্মম নিয়তি! মানব ও মানবতার প্রতি কি নির্মমা উপহাস! এক-দু’ দশক আগেও আমাদের দেশের মানুষ বৃদ্ধাশ্রম কি তা চিনতো না, জানতো না। কিন্তু এখন জাগায় জাগায় গড়ে উঠছে বৃদ্ধাশ্রম। উত্তরোত্তর এর সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে সন্তান বাবা-মাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারতো না, যে বাবা-মাই ছিল এক সময়কার সকল কিছুর ভরসা ও আশ্রয়স্থল, তারাই কিনা আজ তাদের কাছে উটকো ঝামেলা! তাদেরকেই রেখে আসছে বৃদ্ধাশ্রমে। কিংবা অবহেলা ও দুর্ব্যবহার করে এমন অবস্থার সৃষ্টি করছে যে, তারা নিজেরাই বাধ্য হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাচ্ছে। অনেক সন্তানের ভাব এমন, তাদের টাকা-পয়সার অভাব না থাকলেও বাবা-মাকে দেওয়ার মতো সময়ের বড় অভাব আছে। তাদেরকে সঙ্গ দেওয়ার ও তাদের সাথে কথা বলার মতো পর্যাপ্ত সময় তাদের নেই। তাই বাবা-মা একা একা থাকার চেয়ে বৃদ্ধাশ্রমে অন্যদের সঙ্গে থাকাটাই শ্রেয়। এ ধরনের ঠুনকো অজুহাতে জন্মদাতা বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রম নামের কারাগারে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে পরিবার ও সন্তান-সন্ততি থাকা সত্তেও কষ্টের পাথর বুকে চেপে নিদারুণ জীবন যাপন করছেন তারা। একজন মা-বাবার পক্ষে এরচে’ বড় দঃখ আর কি হতে পারে? বিভিন্ন সময়ই বৃদ্ধাশ্রম থেকে সন্তানদের কাছে লেখা বৃদ্ধ বাবা-মার চিঠি পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়। যা পড়ে চোখের পানি সংবরণ করা যায় না। এমনি একজন অসহায় বৃদ্ধা মায়ের চিঠি এখানে পত্রস্থ করা হলো- বৃদ্ধা মা তার আদরের দুলালকে লিখেছেন, ‘বাবা! আমার আদর ও ভালবাসা নিও। অনেক দিন তোমাকে দেখিনা। আমার খুব কষ্ট হয়। কান্নায় আমার বুক ভেঙ্গে যায়। আমার জন্য তোমার কি অতুভূতি আমি তা জানি না। বাবা! শোন, ছোট বেলায় তুমি আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝতে না। আমি যদি কখনো তোমার চোখের আড়াল হতাম, তখন তুমি মা মা বলে চিৎকার করতে। মাকে ছাড়া কারো কোলে তুমি যেতে না। সাত বছর বয়সে তুমি আমগাছ থেকে পড়ে হাটুতে ব্যথা পেয়েছিলে। তোমার বাবা হালের বলদ বিক্রি করে তোমার চিকিৎসা করিয়েছেন। তখন তিনদিন তিনরাত না ঘুমিয়ে, না খেয়ে, না গোসল করে তোমার পাশে কাটিয়েছিলাম। এগুলো তোমার মনে থাকার কথা নয়। তুমি এক মুহূর্ত আমাকে না দেখে থাকতে পারতে না। বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার বিয়ের গয়না বিক্রি করে তোমার পড়ার খরচ জুগিয়েছি। হাটুর ব্যথাটা তোমার মাঝে মধ্যেই হতো। বাবা! এখনও কি তোমার সেই ব্যথাটা আছে? রাতের বেলায় তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে না দিলে তুমি ঘুমাতে না। এখন তোমার কেমন ঘুম হয়? আমার কপালে যা লেখা আছে হবে। আমার জন্য তুমি কোন চিন্তা করো না। আমি খুব ভাল আছি। কেবল তোমার চাঁদ মুখখানি দেখতে আমার খুব মন চায়। আমি দুআ করি, তোমাকে যেন আমার মতো বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে না হয়। কোন জ্যোৎস্নাভরা রাতে আকাশ পানে তাকিয়ে জীবনের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে একটু ভেবে নিও। বিবেকের কাছে উত্তর পেয়ে যাবে। তোমার কাছে আমার শেষ একটা ইচ্ছা আছে। সেটি হলো, আমি মারা গেলে বৃদ্ধাশ্রম থেকে নিয়ে আমাকে তোমার বাবার কবরের পাশে কবর দিও। এজন্য তোমাকে কোন টাকা খরচ করতে হবে না। তোমার বাবা বিয়ের সময় যে নাকফুলটা দিয়েছিল সেটা আমার কাপড়ের আঁচলে বেঁধে রেখেছি। নাকফুলটা বিক্রি করে আমার কাফনের কাপড় কিনে নিও।’ [মাসিক আল কারীম: পৃষ্টা, ৪৬, জুলাই, ২০১৫] একজন নয়, এমন অসংখ্য বাবা-মা প্রতিদিন চোখের জলে বুক ভাসিয়ে যাচ্ছেন। আর অপেক্ষা করছেন কাফনের কাপড়ের জন্য। আজকে আমরা যারা বাবা-মাকে অবহেলা করছি, তাদেরকে ‘ভারী বোঝা’ মনে করে বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে রেখেছি, তারা কি একবারো ভেবে দেখেছি আজ তারা বৃদ্ধ। একদিন আমরাও বৃদ্ধ হবো। তখন আমাদেরও যদি বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হয়, তাহলে কেমন হবে? আরও ভাবা দরকার, আজ তারা বৃদ্ধ। তারা তো পৃথিবীতে বৃদ্ধ হয়ে আসেননি। তারা তো পরিবারের বোঝা ছিলেন না; বরং আমরা সন্তানরাই তো তাদের বোঝা ছিলাম। তারাই ছিলেন আমাদের একমাত্র সম্বল। তারা তো কখনো আমাদেরকে বোঝা মনে করেননি; বরং পরম আদরে বুকে টেনে নিয়েছেন। আগলিয়ে রেখেছেন পরম যতেœ। গর্ভধারণ, প্রসব, স্তন্যদান, ভেজা কাপরে রাত কাটানো ইত্যাদির কি সীমাহীন কষ্ট তিনি সহ্য করেছেন তার কি বিবরণ দেওয়া সম্ভব? পৃথিবীর সকল মায়েরাই এ কষ্টগুলো সহ্য করে থাকেন। আল্লাহ তাআলা মায়ের কষ্ট ও তাদের প্রতি সন্তানদের করণীয় বর্ণনা করে কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেছেন, ‘আর আমি মানুষকে তার মা-বাবার সাথে ভাল ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। কারণ তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সয়ে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো হয় দু’ বছরে। [আমি আরো নির্দেশ দিয়েছি] তুমি কৃতজ্ঞ হও আমার ও তোমার মা-বাবার প্রতি। অবশেষে আমার নিকটই ফিরে আসতে হবে। আর মা-বাবা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন কোন কিছুকে শরীক করতে চাপ প্রয়োগ করে যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তুমি তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করবে। তুমি তার পথই অনুসরণ করবে, যে আমার অভিমুখী হয়।’ [ লুকমান:১৪-১৫] বর্ণিত দ্বিতীয় আয়াতের ‘দুনিয়াতে তুমি তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করবে’ এই বাক্যাংশটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, মা-বাবা কাফের হলেও দুনিয়াতে তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করতে হবে। আল্লাহর অবাধ্যতা হয়, এমন ক্ষেত্রে তাদের কথা মানা না গেলেও অন্য সকল ক্ষেত্রেই তাদের সাথে উত্তম আচরণ করতে হবে। তাদের সাথে বেআদবী ও অশালীনতাপূর্ণ আচার-আচরণ করা যাবে না। তাদের মনোবেদনার উদ্রেক হয়, এমন কোন কাজ  করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাকে ছাড়া আর কারো ইবাদত করো না এবং মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার কর। মা-বাবার কোনও একজন কিংবা উভয়ে যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে উফ্ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল এবং তাদের প্রতি মমতাপূর্ণ আচরণের সাথে তাদের সামনে নিজেকে বিনয়াবনত কর এবং এই দুআ কর, হে আমার প্রতিপালক! তারা যেভাবে আমার শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন, তেমনি আপনিও তাদের প্রতি দয়া করুন।’ [ বনী ইসরাঈল: ২৩-২৪] উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসিসরীনে কিরাম লিখেছেন- বাবা-মার সেবা-যত্ন ও আনুগাত্য কোন সময় ও বয়সের গ-িতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সব বয়সেই এবং সর্বাবস্থায় মা-বাবার সেবা-যত্ন, আনুগত্য ও তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা ফরজ। তবে মা-বাবা বার্ধক্যে উপনীত হয়ে সন্তানের খেদমত ও সেবা-যত্নের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে এবং তাদের জীবন নির্বাহ সন্তানের দয়া ও কৃপার উপর পুরোপুরি নির্ভশীল হয়ে পড়ে। অপরদিকে বার্ধক্যের উপসর্গসমূহ স্বভাবগতভাবেই মানুষকে খিটখিটে করে দেয়। তৃতীয়য়তঃ বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে বুদ্ধি-বিবেচনাও যখন অকেজো হয়ে পড়ে, তখন তাদের বাসনা ও দাবী-দাওয়াও এমনি হয়ে যায়, যা পূর্ণ করা সন্তানের পক্ষে কঠিন হয়। এহেন অবস্থায়ও তাদেরকে উহ্ বলা বা বিরক্তি প্রকাশ পায় এমন কোন শব্দ উচ্চারণ কিংবা বিরক্তিবোধক দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়াও নিষেধ। [মাআরিফুল কুরআন: ৪৫৮-৪৫৯] যেই বাবা-মার আচার-আচরণে কষ্ট পেয়ে বিরক্তিবোধক দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়াও হারাম ও নিষেধ, সেই বাবা-মাকে ঠুনকো অজুহাতে বার্ধক্যে বৃদ্ধাশমে পাঠিয়ে দিয়ে স্ত্রী সন্তানাদী নিয়ে সুখের পিদিম জেলে তৃপ্তিবোধ করা যে কতোখানি অমানবিক ও অন্যায় মনে হয় তা বলে বুঝানোর অপেক্ষা রাখে না। মা-বাবাকে অবহেলা করা এবং তাদের যথাযথ সেবাযতœ না করা ইহকাল ও পরকালে বরবাদীর কারণ হয়। সাহাবী জাবের ইবনে আব্দুল্লাহর বর্ণনায় এক হাদীসে আছে- তিনি বলেন, একদা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মেম্বারে আরোহণ করলেন। প্রথম ধাপে উঠে বললেন, আমীন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপেও উঠে বললেন আমীন। সাহাবাগণ জিজ্ঞাস করলেন, কি বিষয় আল্লাহর রাসূল! আপনাকে এভাবে তিনবার আমীন বলতে শুনলাম। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া বললেন, আমি যখন মেম্বারের প্রথম সিড়ীতে উঠলাম, তখন জিবরীল আ. আগমন করে বললেন, সেই ব্যক্তি হতভাগা, যে রমযান পেয়েও নিজ গুনাহ মাফ করাতে পারলো না। আমি বললাম আমীন। অতপর বললেন, সেই ব্যক্তি হতভাগা, যে বাবা-মাকে অথবা কোন একজনকে পেল অথচ তারা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালো না। অর্থাৎ সে বাবা-মার খেদমত করে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারলো না। আমি বললাম আমীন। তৃতীয় বার বললেন, সেই ব্যক্তি হতভাগা, যার সামনে আপনার নাম উচ্চরিত হলো আর সে আপনার উপর দুরুদ পাঠ করলো না। আমি বললাম আমীন।’ [আল আদাবুল মুফরাদ, ইমাম বুখারী, হাদীস: ৬৪৪; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ৭৪৫১] জিবরীল আ. এর বদদুআ আর তাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আমীন বলা, এ দুটো বিষয় লক্ষ্য করলেই বোঝতে বাকী থাকে না যে, বাবা-মার সেবা-যত্ন করাটা কত বড় বিষয়। আর সেবা-যত্ন না করাটা কত বড় অপরাধ। এ ব্যাপারে বিখ্যাত তাবেয়ী উওয়াইস কারনী রহ. এর ঘটনা তো আমাদের সবারই জানা। তিনি মায়ের সেবার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে সাক্ষাৎ করে সাহাবী হওয়ার সুমহান মর্যদা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এরপরও উমর রা.কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উওয়াইস কারনী রহ. এর দ্বারা দুআ করানোর অসীয়ত করে গিয়েছিলেন। [মুসলিম, হাদীস: ২৫৪২] এ ছাড়াও বহু হাদীসেই মা-বাবার সেবা-যতেœর তাকীদ ও সুফল আর না করার কুফলের কথা বর্ণিত হয়েছে। উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসগুলোর আলোকে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়’ একজন মুমিন স্বীয় বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে রাখার কল্পনাও করতে পারে ন। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও মানবতার দাবী এটাই। কিন্তু মানুষের ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি অবহেলা ও অজ্ঞতা এবং সামাজিক, মানসিক ও আদর্শিক নানা পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে একান্নবর্তী পরিবার বা যৌথ ফ্যামেলি ব্যবস্থা ক্রমশই ভেঙ্গে পড়ছে। পাশাপাশি মানুষের ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি অবহেলা, অজ্ঞতা ও ধর্মের প্রতি অনুরাগ হ্রাস পাওয়ায় বাবা-মা সন্তান-সন্ততির কাছে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। তাই বৃদ্ধাশ্রম বর্তমান সময়ের এক তিক্ত বাস্তবতা। এহেন অবস্থায় যারা পরিবর্তিত এই সমাজ ব্যবস্থার তিক্ত বাস্তবতাকে সামনে রেখে অসহায় বৃদ্ধ মানুষের জন্য নিজ উদ্যেগে, নিজ খরচে বৃদ্ধাশ্রম তৈরি করছেন এবং ভোরণ-পোষণ, চিকিৎসা সেবা ইত্যাদি দিয়ে অসহায় বৃদ্ধদের পাশে দাড়াচ্ছেন, তাদের এই মহৎ উদ্যেগ অবশ্যই প্রশংসার দাবী রাখে। এ ক্ষেত্রেও দীনদার বিত্তবানদের এগিয়ে আসা সময়ের দাবী। সমাজে অবহেলিত, সন্তানের আদর-যত্ন বঞ্চিত অসহায় বৃদ্ধ বাবা-মাকে তাদের জীবনের পড়ন্ত বেলায় একটু ভালবাসা, মায়া-মমতা ও প্রয়োজনীয় সেবা-যত্ন প্রদান করে তারাও হতে পারেন অশেষ কল্যাণ ও পূণ্যের অধিকারী। সাহাবী আবু হুরায়রা রা. এর বাচনিক এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোন মুমিনকে দুনিয়ার কোন বিপদ থেকে উদ্ধার করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামত দিবসের বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন এবং যে ব্যক্তি কোন অভাবী বা বিপদগ্রস্থের প্রতি দুনিয়াতে সহজ আচরণ করবে, আল্লাহ তাআলা তার প্রতি দুনিয়া ও আখেরাতে সহজ আচরণ করবেন এবং যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ গোপন করবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখেরাতে তার দোষ গোপন করবেন এবং আল্লাহ তাআলা বান্দাকে ততক্ষণ সাহয্য করতে থাকেন, যতক্ষণ সে অপরকে সাহায্য করতে থাকে। [মুসলিম: ২৬৯৯; বুখারী: ৫৭; আবু দাউদ: ৪৯৪৬; তিরমিযী: ১৪২৫, ১৯৩০,২৯৪৫; ইবনে মাজা: ২২৫] যারা অবহেলিত, সন্তানের আদর-যতœ বঞ্চিত অসহায় বৃদ্ধ বাবা-মাকে তাদের জীবনের পড়ন্ত বেলায় একটু ভালবাসা, একটু আদর ও মায়া-মমতা এবং প্রয়োজনীয় সেবা-যতœ প্রদান করবে তারাও উক্ত হাদীসের মর্মের  মাধ্যে শামিল হবেন বৈ কি। তবে বৃদ্ধাশ্রমগুলো যেন বাস্তব অর্থেই তাদের জীবনের পড়ন্ত বেলায় একটু ভালবাসা, মায়া-মমতা ও প্রয়োজনীয় সেবা-যতেœর আবাসস্থল হয় সে দিকেও নজর দেওয়া জরুরী। সে লক্ষ্যে নিচের বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা একান্ত জরুরী। ১. বৃদ্ধাশ্রম যেহেতু একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান তাই বৃদ্ধাশ্রমগুলো যেন শতভাগ সেবামূলক হয় সেদিকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। ব্যবসায়ী মনোভাব বা দায়সারাভাব যেন বৃদ্ধাশ্রমগুলোর সেবামূলক কাজের স্বাতন্ত্র্য বিনষ্ট না করে দেয়। যা কিনা সময়ে সময়ে বিভিন্ন রির্পোটে প্রকাশিত হয়ে থাকে। ২. বৃদ্ধাশ্রম যেহেত অবহেলিত, অসহায় বৃদ্ধ  মানুষের আশ্রয়স্থল, তাই সেবক-সেবিকারা যেন তাদের সাথে মমতা ও সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণ করেন, সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। এটি মানবতার দাবীও বটে। ৩. যারা বৃদ্ধাশ্রমে আসেন তারা যেহেতু জীবনের শেষ সময়টা এখানেই কাটান, তাই তাদের শেষ সময়টা যেন দীনী পরিবেশে, ইবাদত-বন্দেগী ও তাওবা-ইস্তাগফারের মাধ্যমেই কাটে সে দিকেও বিশেষ যতœ নিতে হবে। বৃদ্ধাশ্রমে যদি দীনী পরিবেশ কায়েম করা যায়, তাহলে এতে তারা বিধ্বস্ত হৃদয়ে প্রশান্তিও লাভ করবেন। হৃদয়ের প্রশান্তি মানুষকে হতাশা, দুঃখ ও বেদনা থেকে মুক্তি দেয়। মানুষ কষ্টের মাঝেও এক অনাবিল সুখের সন্ধান পায়। এজন্য বৃদ্ধাশ্রমকে যদি দীনী তালীম ও ইবাদতের উপযোগী করে তোলা যায়, তাহলে অন্তত শেষ জীবনে হলেও তারা নিজেদেরকে পরকালমুখী করে ঈমান ও আমলের দৌলত নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পারবেন। আর এভাবে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পারলে প্রকৃত সফলতা সে লাভ করবে। ৪. বৃদ্ধাশ্রমের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক সভা-সেমিনারের আয়োজন করে মা-বাবাকে অবহেলাকারী সন্তানদের মাঝে ধর্মীয় ও মানবিক চেতনা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করা। পাশাপশি যে সকল হতভাগা সন্তান বৃদ্ধ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশমে রেখে যেতে আসে তাদেরকে মা-বাবার সেবা-যত্ন করার সওয়াব ও সুফল এবং সেবা-যত্ন না করার শাস্তি ও কুফলের কথা বুঝিয়ে তাদের মাঝে মানবতাবোধ ও ধর্মী চেতনা জাগিয়ে তোলা, যেন তারা বাবা-মার  সেবা-যত্ন করতে এবং নিজেদের কাছে রাখতে উৎসাহী হোন। আশা করি এতে কিছুটা হলেও এই অমানবিক প্রবণতা হ্রাস পাবে। পরিশেষে বলতে চাই, বৃদ্ধাশ্রম নয়, মা-বাবার শেষ আশ্রয় হোক আপন নীড়ে। এই হোক ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের দৃপ্ত অঙ্গিকার।

মুফতী পিয়ার মাহমুদ
গ্রন্থ প্রণেতা, ধর্মীয় গবেষক ও সিনিয়র মুহাদ্দিস
জামিয়া মিফতাহুল উলূম মাদরাসা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight