বিয়েতে অবহেলিত কিছু আমল / মুফতী পিয়ার মাহমুদ

বিয়ের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান ও চিকিৎসা যেভাবে মানব জীবনের অপরিহার্য প্রয়োজন, শিা-দীার প্রয়োজনীয়তা যেভাবে যুক্তিতর্কের ঊর্ধ্বে, একজন যৌবনদীপ্ত মানুষের সুস্থ জীবন যাপনের জন্য বিয়ের অপরিহার্যতা তেমনই। তাই ইসলামে এর গুরুত্ব অপরিসীম। ফযীলত ও মর্যাদা তুলনাহীন। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে যে পুরুষের স্ত্রী নেই আর যে নারীর স্বামী নেই তাদের এবং তোমাদের দাস-দাসীর মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ তাদের বিয়ে সম্পাদন করে দাও। তারা যদি নিঃস্ব হয়, তাহলে আল্লাহ (বিয়ের বরকতে) নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছলতা দান করবেন। আল্লাহ বড় প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। [সূরা নূর : আয়াত ৩২] অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আপনার পূর্বে প্রেরণ করেছি অনেক রাসূল এবং তাদেরকে দিয়েছি স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি।” [সূরা রাদ : আয়াত ৩৮] হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের রা. বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মাঝে যারা বিয়ে করতে সম তারা যেন বিয়ে করে নেয়। কারণ বিয়ে দৃষ্টি অবনত রাখতে এবং লজ্জাস্থানের পবিত্রতা রায় অধিক সহায়ক আর যে বিয়ে করতে সম নয় সে যেন রোযা রাখে। কেননা রোযা তার যৌনবাসনাকে দমিত করবে।” [বুখারী : ২/৭৫৮; মুসলিম : ১/৪৪৯, ইবনে মাজা : ১৩২]  হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. বর্ণনা করেন, মহানবী সা. ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি পূতঃপবিত্র অবস্থায় আল্লাহর সঙ্গে সাাৎ করতে চায় সে যেন বিয়ে করে স্বাধীন নারীকে।” [ইবনে মাজাহ : ১৩৫]
মহানবী সা. ইরশাদ করেছেন, “কোন ব্যক্তি যখন বিয়ে করল তখন সে দ্বীনের অর্ধেকটা পূর্ণ করে ফেলল। এখন সে যেন বাকী অর্ধাংশের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে।” [মিশকাত : ২/২৬৮] হযরত আবু আইয়ুব রা. থেকে বর্ণিত, মহানবী সা. বলেছেন, “নবী-রসূলগণের চারটি  সুন্নত রয়েছে। সেগুলো হলো ১.লজ্জাবোধ, ২. সুগন্ধি ব্যবহার, ৩. মিসওয়াক করা, ৪. বিয়ে করা।” [তিরমিযী : ১/১২৮] রাসূলুল্লাহ সা. আরও ইরশাদ  করেন, তিন শ্রেণীর লোককে আল্লাহ অবশ্যই সাহায্য করবেন : ১. স্বাধীন হওয়ার চুক্তিতে আবদ্ধ গোলাম, যে নিজ মুক্তিপণ আদায়ের ইচ্ছা রাখে, ২. চারিত্রিক পবিত্রতা রার উদ্দেশ্যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ব্যক্তি, ৩. আল্লাহর পথে জিহাদকারী। [তিরমিযী : ২/২৯৪-৫; নাসায়ী : ২/৫৮; ইবনে মাজা ; ১৮১] সুবহানাল্লাহ! কি অসাধারণ ফযীলত! মানুষ মানবিক প্রাকৃতিক চাহিদার কারণেই বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। অথচ আমাদের প্রাণের স্পন্দন ইসলাম বলেছে বিয়ে আর্থিক সচ্ছলতার কার্যকর উপায়। কখনো বলেছে, চরিত্রিক পবিত্রতার কার্যকর মাধ্যম। আবার কখনও বলেছে দ্বীনের অর্ধেক। কখনও বা আখ্যায়িত করেছে আল্লাহর সাহায্য লাভের মাধ্যম হিসাবে। সম্ভবত এত ফযীলত ও মর্যাদার কথা অন্য কোন ইবাদত সম্পর্কে বলা হয়নি। কারণও আছে। কেননা সকল ইবাদত বিশুদ্ধ ও পরিপূর্ণ রূপে আদায়ের জন্য প্রয়োজন শারীরিক, মানসিক ও চারিত্রিক শুদ্ধতা, পবিত্রতা এবং স্থিতিশীলতা। যার অনেকটাই নির্ভর করে বিয়ের উপর।

বিয়ে না করার কুফল ও তি
ধর্মীয় ও পার্থিব দৃষ্টিকোণ থেকে বিয়ে না করার তি অনেক। প্রথমত সামর্থ্যবান পুরুষকে বিয়ের নির্দেশ দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল। ফাযায়েলও বর্ণিত হয়েছে প্রচুর। যা আমরা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। একজন মুমিনের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ লঙ্ঘন এবং বর্ণিত ফাযায়েল অর্জন না করার চেয়ে তিকর বিষয় আর কী হতে পারে? এ তো ইহকাল ও পরকালে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত থেকে মাহরুম হওয়ার কারণ। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, মহানবী সা. ইরশাদ করেন, “দ্বীনদারী ও চারিত্রিক দিক বিবেচনায় তোমাদের পছন্দ হয়, এমন ব্যক্তি তোমাদের নিকট বিয়ের প্রস্তাব দিলে [উপযুক্ত পাত্রীকে] তার সাথে বিয়ে দিয়ে দাও। যদি বিয়ে না দাও, তাহলে সমাজে বিরাট ফিতনা ও ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিবে। [তিরমিযী : ১/২০৭] উল্লিখিত হাদীসের ভাষ্যমতে উপযুক্ত পাত্র-পাত্রী পাওয়া সত্ত্বেও বিয়ে সম্পাদিত না হলে ভূখ-ে দেখা দিবে ফিতনা ও বিপর্যয়। কি সেই ফিতনা ও বিপর্যয়? তিরমিযী শরীফের অন্যতম ব্যাখ্যাগ্রন্থ কুতুল মুগতাযীতে উল্লেখ আছে, উল্লিখিত হাদিসে ফিতনা ও বিপর্যয় দ্বারা উদ্দেশ্য হলো উপযুক্ত পাত্র-পাত্রী থাকা সত্ত্বেও বিবাহ কার্য সম্পাদিত না হলে অনেক নারী-পুরুষ অবিবাহিত অবস্থায় থেকে যাবে। ফলে যিনা-ব্যভিচার ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করবে। এতে অভিবাবকগণ শিকার হবেন অপমান ও লজ্জার। যার অনিবার্য ফল হিসাবে শুরু হবে হানাহানি ও মারামারি। [তিরমিযী : ১/২০৭, টীকা নং-৪] এছাড়াও সামর্থ্যবান যুবকের বিয়ে না করাটা সাস্থ্যের জন্য চরম তিকর। ভেঙ্গে পড়ে শরীর। উড়ে যায় সুখনিদ্রা। কর্মস্পৃহায় ভাটা পড়ে। যুবসমাজ শিকার হয চরিত্রহীনতা ও অসভ্যতার। যার অনিবার্য প্রভাব আক্রমণ করে সমাজ জীবনকে। ফলে দূষিত হয় সমাজ ও রাষ্ট্র। এই বিয়েকে ঘিরে বেশ কিছু আমলের কথাও বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। যে আমলগুলো আজ মুসলিম উম্মাহর চরম অবহেলার শিকার। নি¤েœ আমরা সেই অবহেলিত আমলগুলো কয়েকটি উল্লেখ করলাম।
অন্যের প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব
অনেক সময় দেখা যায় একপ অপরপকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। আলোচনাও পাকাপাকি । অথবা পাকাপাকি হয়নি কিন্তু আলোচনা চলছে। এ অবস্থায় তৃতীয় প এসে বর কিংবা  কনে পকে অন্য আরেক বিয়ের প্রস্তাব করে। অনেক সময় লোভে পড়ে বা অন্যকোন কারণে চলমান আলোচনা ভেঙ্গে দিয়ে নতুন করে প্রস্তাবকৃত বিয়ের আলোচনা শুরু করে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি নিষিদ্ধ কাজ। রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন “তোমাদের কেউ যেন অপরের বিয়ের প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব না করে।” [বুখারী : ২/৭৭৩]। কেননা এতে পরস্পরে সৃষ্টি হয় ঘৃণা ও দূরত্ব। দেখা দেয় সামাজিক অস্থিরতা। অবশ্য এই নিষেধাজ্ঞা তখনই প্রযোজ্য হবে যখন প্রথম প বিয়ের প্রস্তাব করার পর দ্বিতীয় প তা আমলে নেয়। আর যদি আমলে না নেয় অর্থাৎ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে কিংবা প্রস্তাবের পর হ্যাঁ-না কিছুই না বলে তাহলে অবশ্য অপর পরে জন্য প্রস্তাব করার সুযোগ আছে।
বিয়ের খুতবা
বিয়ের খুতবা পাঠ করা সুন্নাত আর নীরবতার সাথে শ্রবণ করা ওয়াজিব। এই খুতবা দাঁড়িয়ে দেয়া সুন্নত। বসেও দেয়া জায়েয আছে। [রদ্দুলমুহতার : ২/৩৫৯; ফাতওয়া রহীমিয়্যাহ : ৮/১৪৭; আহসানুল ফাতওয়া : ৫/৩৫]। ইসলামপূর্ব যুগেও বিয়ের পূর্বে খুতবা দেয়ার রেওয়াজ ছিল। তবে সেকালের খুতবা ছিল অহংকার, বড়ত্ব, বংশীয় গৌরবগাথা ও পূর্বপুরুষদের প্রশংসার সাতকাহন। কিন্তু ইসলাম নির্বাচন করেছে এমন খুতবা যাতে থাকবে আল্লাহর হামদ-ছানা ও তাওহীদ-রিসালাতের স্যা। তাতে স্থান পাবে তাকওয়া ও খোদাভীতি। আরো স্থান পাবে কুরআন ও হাদীসের এমন বাণী যাতে রয়েছে মানব জীবনের মূল ল্য ও উদ্দেশ্যের সুস্পষ্ট নির্দেশনা।
বিয়েতে এলান
বিয়ের একটি অন্যতম সুন্নাত হলো, এলান বা সবাইকে জানিয়ে বিয়ের আকদ সম্পন্ন করা। বিনা কারণে গোপনে বিয়ে করা সুন্নতের খেলাফ। রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন “তোমরা বিয়েকে প্রচার কর।” [তিরমিযী : ১/২০৭; রহীমিয্যাহ : ৮/১৪৭; আল বাহরুর রায়েক, কিতাবুন নিকাহ ]
মসজিদে বিয়ে
বিয়ে মসজিদে সম্পন্ন হওয়াও বিয়ের অন্যতম সুন্নাত। মহানবী সা. ইরশাদ করেন,“বিয়ে মসজিদে সম্পাদন কর।” [তিরমিযী : ১/১৪৭]। কিন্তু বড় পরিতাপের ব্যাপার হলো মুসলমানদের মুসলমানিত্ব ও দ্বীনদারির চরম অধঃপতনের এ যুগে মহান এই সুন্নাতটি চরমভাবে অবহেলিত। বিয়েতে এই সুন্নাত পালন তো অনেক পরের কথা অনেক মুসলমান এটা জানেও না যে, মসজিদে বিয়ে পড়ানো সুন্নাত। কমিউনিটি সেন্টার ও পার্টি সেন্টারের এ যুগে বিয়েতে এ সব সুন্নাত পালনের পরিবর্তে বিয়ে হয়ে উঠে বহু অপরাধ ও শালীনতাহীনতায় ভরপুর এক অনুষ্ঠান। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।
খেজুর ছড়ানো
বিয়ের পর খেজুর ছিটিয়ে দেয়া সুন্নাত। মহানবীর সা.-এর এ সুন্নতটিও মৃতপ্রায়। উল্লেখ্য যে, খেজুর ছিটিয়ে দিলে যদি মনোমালিন্য কিংবা মসজিদের আদব পরিপন্থী পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার আশংকা দেখা দেয়, তাহলে ছিটিয়ে না দিয়ে বন্টন করে দেয়াই উচিত। অবশ্য একথাও সত্য এবং অভিজ্ঞতাও স্যা দেয় যে, এজাতীয় অনুষ্ঠানে যে ধাক্কা-ধাক্কি, ঠেলাঠেলি ও কাড়াকাড়ি হয়, তা কখন মনমালিন্য কিংবা ঝগড়া-বিবাদ পর্যন্ত গড়ায় না বরং এর ভিতর আনন্দই প্রকাশ পায়। তাই এ ব্যাপারে অবস্থা দেখে ব্যবস্থা নিতে হবে। [হিন্দিয়া : ৫/৩৪৫; আল মুগনী : ৭/২১৯]
বিয়ের দিন ও মাস
বিয়ে শাউয়াল মাসে ও জুমার দিনে সম্পন্ন করা উত্তম ও মুস্তাহাব। তাই এ ব্যাপারে সকলের খেয়াল করা উচিত। তবে অন্য যে কোন মাস বা দিন কিংবা সময়েও বিয়ে করা জায়েয আছে। কিছু কিছু মানুষ মহররম, সফর, জিলক্বদ, চৈত্র ইত্যাদি মাসে এবং শনিবারে বিয়ে করাকে অশুভ ও অমঙ্গলজনক মনে করে। এসব ধারণা মূলত কুসংস্কার ও ইসলাম পরিপন্থী। ইসলামে এসব চিন্তা ধারণার কোনই স্থান নেই। কেননা ইসলামের দৃষ্টিতে অশুভ বলতে কোন সময় নেই। [তিরমিযী : ১/২০৭; ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন : ২/৩৬; ফাতহুল কাদীর : ৩/২১৯]
বিয়ের পর নিম্নের দোয়াটি পড়া
মুসলমানের সকল কিছুতেই এখন উল্টো স্রোত বইছে। মহানবীর সা. সুন্নত হলো বিয়ের পর উপস্থিত লোকেরা কিংবা এ বিয়ের খবর যারা জানবে তারা নব-দম্পতির জন্য  নিম্নের দোয়াটি পড়া সুন্নত, “বারাকাল্লাহু ওয়া বারাকা আলাইকা ওয়া জামা’আ বাইনাকুমা ফি খাইরিন”। আল্লাহ বরকত দিন। বরকত অবতীর্ণ করুন তোমার উপর এবং তোমাদের উভয়কে একত্র করুন কল্যাণ ও মঙ্গলের উপর [তিরমিযী : ১/২০৭; আবু দাউদ : ১/২৯০] এখানেও বইছে উল্টো স্রোত। উক্ত হদীসের ভাষ্যমতে যে বিয়ের খবর  জানবে সে নব-দম্পতির জন্যকরবে। এই গুরুগম্ভীর ও বরকতপূর্ণ দোয়া তো কেউ পড়েই না। উল্টো আকদ সম্পন্ন হওয়ার পর বর দাঁড়িয়ে সকলকে উদ্দেশ্য করে সালাম দেয়। অনেকেই আবার মুসাফাহাও করে থাকে যা ইসলাম পরিপন্থী। [মাহমুদিয়া : ৩]

মুফতী পিয়ার মাহমুদ
গ্রন্থ প্রণেতা, ধর্মীয় গবেষক ও সিনিয়র মুহাদ্দিস
জামিয়া মিফতাহুল উলুম, নেত্রকোনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight