বিশ্ব নবী সা.এর বিশ্বব্যাপী দাওয়াতি প্রোগ্রাম : মাহবুবুর রহমান নোমানি

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে নবী! আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা, সতর্ককারী, আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী এবং উজ্জ্বল প্রদীপরূপে।’ [সূরা আহযাব:৪৫-৪৬]
মহানবী হযরত মোহাম্মদ সা. চল্লিশ বছর বয়সে নবুওয়াত লাভ করেন। নবুওয়াত প্রাপ্তির পরপরই তাঁর ওপর অর্পিত হয় ইসলামের প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব। বিবি খাদিজা রা. কে ইসলামের প্রতি দাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর দাওয়াতি জীবন। প্রথম কিছুদিন গোপনে দাওয়াত দেওয়ার পর প্রকাশ্যে ইসলামের প্রচার কার্য শুরু করেন। পরিণামে নেমে আসে তাঁর ওপর নির্যাতনের ষ্টীমরোলার। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘প্রত্যেক নবীকেই দাওয়াতের কাজ করতে গিয়ে জুলুম-নির্যাতনের সম্মুখিন হতে হয়েছে, তবে আমার প্রতি নির্যাতনের মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি।’
মক্কাবাসীর প্রতি নিরাশ হয়ে তিনি শৈশবের স্মৃতিবিজরিত যমীন তায়েফে গমন করেন। কিন্তু তায়েফবাসীর নির্যাতন ছিল ইতিহাসের লোমহর্ষক নিষ্ঠুরতম নির্যাতন। ফিরে আসেন মক্কায়। দমে যাননি দাওয়াতের কাজ থেকে। বারবার মানুষের ঘরে-ঘরে, দ্বারে-দ্বারে, বাজারে-দোকানে, মজমা-সমাবেশে দাওয়াতের কাজ নিয়ে ছুটে গেছেন। এভাবেই কেটেছে তাঁর মক্কার দীর্ঘ তেরটি বছর। মদীনার জীবনে দাওয়াত: মক্কাতে ইসলাম প্রসারের গতি ছিল মন্থর। তাই আল্লাহ পাকের নির্দেশে তিনি হিজরত করেন মদীনাতুল মুনাওয়ারায়। সেখানে তিনি রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ভিত্তিতে শুরু করেন দ্বীন প্রচারের কার্যক্রম। মদীনায় বসবাসরত সকল ধর্মের লোকদেরকে নিয়ে রচনা করেন ঐতিহাসিক মদীনা সনদ। নির্বিঘেœ ইসলাম প্রচারের জন্য যা ছিল অত্যন্ত কার্যকরী প্রদক্ষেপ। শনৈ শনৈ ইসলামের বাণী প্রচারিত হতে থাকে মদীনার ভূখণ্ডে। ইসলামের অনুপম আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আসতে থাকে। বিভিন্ন কবিলার প্রতিনিধি আসতে শুরু করে তাঁর দরবারে। অল্পদিনেই ইসলামের আলো মদীনার গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র আরববিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে নবাগত মুসলিমদের দ্বীনি তালিমের জন্য মদীনার মসজিদের কোণে গড়ে তোলেন শিক্ষালয়। প্রোগ্রাম করে সাহাবাদেরকে দাওয়াতের কাজে পাঠাতেন বিভিন্ন এলাকায়। কখনও কখনও ইসলাম বিরোধীদের অপপ্রচার ও আক্রমণ প্রতিহতের জন্য জিহাদি কাফেলা প্রেরণ করতেন। স্বয়ং তিনিও সাতাইশটি যুদ্ধে সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
বিশ্ব রাজন্যবর্গের প্রতি দাওয়াতি পত্র
৬ষ্ঠ হিজরিতে কুরাইশদের সাথে সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পর মহানবী সা. বিশ্বের সকল রাজা-বাদশাদের নিকট ইসলামের দাওয়াতপত্র প্রেরণ করেন। সে মতে আবিসিনিয়ার বাদশাহ আসহামা নাজ্জাশির কাছে আমর ইবনে উমাইয়াকে রা. প্রেরণ করেন। বিশ্ব নবীর পত্র পেয়ে সম্রাট সিংহাসন হতে মাটিতে অবতরণ করে পত্রটি চোখে-মুখে লাগান এবং ইসলাম কবুল করেন।
রোম সম্রাটের প্রতি দাওয়াত তদানীন্তন পৃথিবীর সুপার পাওয়ার রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট দাহিয়া কালবির মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াতপত্র প্রেরণ করেন। হিরাক্লিয়াস যথেষ্ট প্রমাণাদি ও পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবের মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন যে, ইনি সত্য নবী। তাই পত্র পাওয়ামাত্র তিনি ইসলাম কবুলের ইচ্ছা করেন। অতঃপর সভাসদ ডেকে সে ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করলে তারা ক্ষিপ্ত  হয়ে ওঠে। অবস্থা বেগতিক দেখে তিনি ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন।
পারস্য সম্রাটের প্রতি পত্র তৎকালীন পৃথিবীর আরেক পরাশক্তি কেসরা। পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজ কেসরার প্রতি রাসূলুল্লাহ সা. দাওয়াত প্রেরণ করেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হুযায়ফা রা. এর মারফতে। নরাধম প্রিয় নবীর পত্রের সাথে ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ করে এবং তা ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে।  এ খবর পেয়ে রাসূলুল্লাহ সা. তার জন্য এভাবে বদদোআ করেনÑআল্লাহ যেন তার রাজত্ব এরুপ খণ্ড-বিখণ্ড করে দেন, যেরুপ সে আমার চিঠি খণ্ড-বিখণ্ড করেছে।’ প্রিয় নবীর বদদোআয় অল্পদিনেই তার সাম্রাজ্য টুকরো টুকরো হয়ে যায় এবং সে নিজ পুত্রের হাতে নিহত হয়।
মিশর অধিপতির কাছে পত্র
মিশর ও আলেকজাণ্ডারিয়ার সম্রাট মুকাওকিসের নিকট হযরত হাতেব ইবনে আবু বালতা রা. কে প্রেরণ করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সা.কে সত্য নবী হিসেবে বিশ্বাস করেন। হযরত আবু বালতার সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং নবীজি সা.এর জন্য উপঢৌকন প্রেরণ করেন। তন্মধ্যে দাসি মারিয়া কিবতিয়া এবং দুলদুল নামে একটি সাদা খচ্চর ছিল। এভাবে বিশ্ব নবী সা. বাহরাইন, উম্মান, ইয়েমেন, ইয়ামামা প্রভৃতি দেশের রাজন্যবর্গ ও দলপতির কাছে ইসলামের দাওয়াতি পত্র প্রেরণ করেন।
দাওয়াত বিশ্ব নবীর মিরাস  রাসূলুল্লাহ সা. কোনো অর্থ-বিত্ত, সম্পদ-সম্পত্তি রেখে যান নি। তিনি উম্মতের কাছে দ্বীন রেখে গেছেন। তিঁনি ছিলেন বিশ্বনবী। তাঁর নবুওয়াতি দায়িত্ব বিশ্বব্যাপী। কিয়ামত অবধি জ্বিন ও মানবজাতির নবী হয়ে তিনি আগমন করেছেন। মানুষের ন্যায় জ্বিনেরাও তাঁর কাছে ইসলাম কবুল করেছে এবং নিজ নিজ কওমের কাছে গিয়ে তা প্রচার করেছে। তিনি নির্দেশিত হয়েছিলেন মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধিকরণে। তাই মানুষের চিন্তায় তিনি অস্থির হয়ে যেতেন। তাঁর আহার, নিদ্রা উড়ে যেতো। মাঝে-মধ্যে আল্লাহ পাক তাঁকে সান্ত্বনা দিতেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছেÑ মানুষ ঈমান আনেনাÑএই চিন্তায় কি আপনি নিজেকে ধ্বংস করে দিবেন? [সূরা শুআরা.৩] হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, ‘জনৈক ব্যক্তি আগুন প্রজ্জলিত করেছে, আর তাতে পতঙ্গরা ঝাঁপ দিচ্ছে। সে ব্যক্তি ওদের বাঁচার প্রচেষ্টা করে কুলিয়ে ওঠতে পারছে না। প্রিয় নবী সা. বলেন, তোমাদের সঙ্গে আমার দৃষ্টান্ত হলো অনুরুপ। আমি তোমাদের কোমর ধরে ধরে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু তোমরা আমাকে পরাস্ত করে সেই আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ছো। [মুসলিম:৩০৯৭]
নবুওয়াতের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। কিয়ামত অবধি আর কোনো নবীর আগমণ ঘটবে না। বিশ্ব নবী সা.-এর অনুসারীদের দায়িত্ব হলোÑতাঁর প্রচারিত আদর্শ সংরক্ষণ করা, অনুসরণ করা, সম্প্রচার করা এবং মানুষকে দ্বীনের পথে আহ্বান করা। একজন মুসলমানের প্রাথমিক ও বুনিয়াদি কাজ হচ্ছে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া। হযরত আবুবকর সিদ্দিক রা. ইসলাম কবুল করার পর রাসূলুল্লাহ সা.কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এখন আমার কাজ কী? তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমার যে কাজ তোমারও সেই কাজ।’ হযরত আবুবকর রা. এর দাওয়াতে হযরত উসমান ইবনে আফ্ফান, আব্দুর রহমান ইবনে আওফ, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, যুবাইর ইবনে আওয়াম, তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ প্রমুখ সাহাবি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর সাহাবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল দ্বীনের প্রচার-প্রসার। বিদায় হজ্জের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি সমবেত সাহাবাকে বলেছিলেন, ‘তোমরা যারা উপস্থিত, আমার দ্বীন অনুপস্থিতদের কাছে পৌঁছে দাও।’ [ইবনে মাজাহ]  তিনি আরও বলেছেন, ‘ আমার একটি কথাও যদি তোমাদের জানা থাকে, তা অন্যের কাছে পৌঁছে দাও। [বুখারি ও মুসলিম]
রাসূল সা. এর এই নির্দেশ পালন করা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আল্লাহর পথের দাঈ হওয়া সবচেয়ে ঈমানদারের বড় গুণ। আমাদের প্রত্যেকের পক্ষে পয়গাম্বরদেরমতো সর্বোত্তম মহামানব হওয়া সম্ভব নয়; কিন্তু যে কোন ব্যক্তির পক্ষেই সর্বোত্তম কাজে অন্তত শরীক হওয়া সম্ভব এবং অতি সহজ। তা হচ্ছে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ করা। মহান আল্লাহর কাছে একাজই অধিক পছন্দনীয়। তিনি বলেন, ঐ ব্যক্তির কথার চাইতে উত্তম কথা আর কার হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, আর বলে আমি একজন মুসলমান।” [হা-মীম সেজদা:৩৩]
লেখক:প্রবন্ধকার, মুহাদ্দিস, জামিয়া উসমানিয়া দারুল উলুম সাতাইশ, টঙ্গী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight