বিশ্ব ইস্তেমা : দা‘ওয়াত ও তাবলীগ : মুফতি মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ

আরবী ‘ইস্তেমা‘ শব্দটির বাংলা অর্থ হচ্ছে, শ্রবণ-শোনা, মনোযোগসহ শ্রবণ। আর ‘ইজতেমা’ মানে হচ্ছে, সম্মিলন, সাক্ষাৎ, বৈঠক, সভা, সমাবেশ, সম্মেলন, সমাজ, সমাজবদ্ধতা, সামাজিকতা, সমাজজীবন।
শব্দ দু’টির অর্থের প্রতি মনোযোগ দিলে ‘বিশ্ব ইস্তেমা’ ও ‘বিশ্ব  ইজতেমা’-বাক্যদ্বয়ের মর্মার্থ বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। অর্থাৎ বিশ্ব মুসলিমের মনোযোগসহ শোনার বিষয় বা অনুষ্ঠান; বিশ্বর মুসলমানদের সম্মিলন বা সম্মেলন বা সভা-সমাবেশ-বৈঠক। তবে ‘ইস্তেমা’-এর স্থলে ‘ইজতেমা’ শব্দটি অধিক উপযোগী। এ ছাড়া, যেহেতু পরিচিত বিশ্বর অনেক বা বেশিরভাগ দেশই এতে অংশগ্রহণ করে, তাই এটিকে ‘বিশ্ব ইজতেমা’ বলতে অবাস্তব বা দোষের কিছু নেই।
দা‘ওয়াত: ‘দা‘ওয়াত’ আরবী শব্দটির অর্থ হচ্ছে, ডাক, আহবান ও প্রচার। ‘তাবলীগ’ শব্দটিও আরবী। এর মানে হচ্ছে, প্রচার, ঘোষণা বা পৌঁছে দেওয়া, ‘দ্বীনী দা‘ওয়াত’ তথা ধর্মের বাণী প্রচার করা বা পৌঁছে দেওয়া। সুতরাং সহজবোধ্যভাবে আমরা বলতে পারি,  ‘দা ওয়াত ও তাবলীগ’ মানে ইসলাম ধর্মের প্রচার-প্রসার এবং ইসলামের বাণী-পয়গাম সারা বিশ্ব পৌঁছে দেওয়া, ছড়িয়ে দেওয়া।”
ইসলাম ধর্মের মৌলিক ও সেবামূলক যত কাজ আমরা করে থাকি তার সবগুলোর উদ্দেশ্যই হচ্ছে, মুসলমানদের ঈমান-আমল, তাকওয়া-পরিশুদ্ধি, সততা ও যোগ্যতা অর্জিত হয়ে যেন আমরা ইহকাল ও পরকাল উভয় জাহানে সফল ও সোনার মানুষ হতে পারি। আর এ লক্ষ্যে পরিচালিত মসজিদ-মাদরাসা, খানকা, নায়েবে নবী, হাক্কানী আলেমগণ, ওলী-আউলিয়া, পীর-মাশায়েখ, ইমাম-খতীব-বক্তা ও দা‘ঈগণ এক কথায় সকলের মেহনত, তৎপরতার অবদান ও সফলতা অনস্বীকার্য এবং কমবেশি সকলেই প্রশংসারযোগ্য। অবশ্য, এটি লক্ষণীয় যে, এঁদের সকলের ঈমান-আমল-তাকওয়া ও খাঁটি মুসলমান বানানোর যৌথ মেহনতের পাশাপাশি মাদরাসা শিক্ষার সঙ্গে জড়িতরা মৌলিক দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার দিকটিকে যেমন প্রাধান্য দিয়ে থাকেন তেমনি পীর-মাশায়েখগণ আতœশুদ্ধি ও আল্লাহ্র পরিচয়-প্রেম-ভালোবাসাকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। একইভাবে তাবলীগ সংশ্লিষ্টরা ‘দা ওয়াত’-এর মেহনতের প্রতি অধিক জোর দিয়ে থাকেন। মহান আল্লাহ্ সকলের মেহনত ও সেবাকে কবূল করুন!
বাস্তবতার নিরীখে বিচার করতে গেলে বলতে হবে যে, বর্তমানকার ‘দা‘ওয়াত ও তাবলীগ’ নামের পরিচিত যে-জামাতকে আমরা জানি ও চিনি এদের মেহনত-তৎপরতার ব্যাপকতার পাশাপাশি, অল্প সময়ে, সকল মহলে, এতো অধিক সংখ্যক মুসলমানের ঈমান-আমল-তাকওয়ার দিকে পরিবর্তন, সুন্নাত-নফলের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি, সত্যিই আল্লাহ্ তা‘আলার বিশেষ দান।
তারপরও, পুরো কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা‘ ও কিয়াসকে সামনে রেখে শরীয়তের মাপকাঠিতে ‘তাবলীগ’ বিষয়টিকে, আমাদের মূল্যায়ন করতে হবে।
তাবলীগ-এর প্রয়োজনীয়তা:
মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের বাণী অনুযায়ী যেহেতু মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ নবী। তাঁর পরে আর কোন নবী-রাসূল আসবেন না; অথচ তাঁর প্রতি অবতীর্ণ ‘সর্বশেষ ধর্ম’ এবং এই ধর্মের যাবতীয় বিধি-বিধান সম্বলিত সর্বশেষ আসমানী গ্রন্থ ‘আল-কুরআন’ কিয়ামত পর্যন্ত আগত তামাম বিশ^বাসীর হিদায়েত প্রাপ্তির সর্বশেষ মূল উৎস। তাই এ ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থের বাণী,তার আহবান বিশ্ব মানবতার দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেওয়া এবং এর প্রচার-প্রসার একমাত্র ‘দাও য়াত ও তাবলীগ’ এর মাধ্যমেই সম্ভব। এ থেকে, ‘দা ওয়াত ও তাবলীগের’ প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য সহজেই অনুমেয়।
তাবলীগ ও আল-কুরআন:
পবিত্র গ্রন্থ আল-কুরআনের নিক্ত আয়াতগুলোর প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করলে, আমরা দা‘ওয়াত ও তাবলীগের গুরুত্ব ও তাৎপর্য আরও অধিক উপলব্ধি করতে পারবো। উদাহরণত:
(১) আল্লাহ্ তা‘আলা ইরশাদ করেন, “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানব জাতির (কল্যাণের) জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে, অসৎকাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহ্র ওপর বিশ্বাস রাখবে। [০৩:১১০]
(২) তিনি আরও ইরশাদ করেন, “তোমাদের মধ্যে এমন একদল থাকতে হবে, যারা ভালো কাজের দিকে আহবান করবেএবং সৎকর্মের নির্দেশ দিবে ও অসৎকর্মে নিষেধ করবে; আর এরাই সফলকাম”। [০৩:১০৪]
(৩) মহান আল্লাহ আরও বলেন, “ওই ব্যক্তি অপেক্ষা কথায় কে উত্তম, যে (মানুষকে) আল্লাহ্র দিকে আহবান করে, নেক আমল করে এবং বলে, ‘আমি তো অনুগতদের অন্তর্ভূক্ত’।” [৪১:৩৩]
(৪) তিনি আরও বলেন, “আপনি উপদেশ দিতে থাকুন, কারণ উপদেশ মু’মিনদের উপকারে আসে।” [৫১:৫৫]
(৫) তিনি আরও বলেন, “আর আপনি আপনার পরিবার-পরিজনকে নামাযের আদেশ দিন এবং তাতে নিজেও অবিচল থাকুনÑ।” [২০:১৩২]
উপরিউক্ত সবগুলো আয়াত থেকেই আল্লাহ্র দিকে আহবান করা, কল্যাণের দিকে ডাকা, সৎকাজে আদেশদান, অসৎকাজে নিষেধ করা, নামাযের নির্দেশদান ইত্যাদি যা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এসবই প্রকারান্তরে ‘দা‘ওয়াত ও তাবলীগ’-এর অন্তর্গত।
তাবলীগ-এর প্রকারভেদ:
উল্লেখ্য, ব্যক্তি ও অবস্থাভেদে ‘সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ’-এর দায়িত্ব অর্থাৎ ‘তাবলীগ’ করা ফরয। (আহসানুল ফাতাওয়া:খ-১,পৃ-৫১২) এ ‘ফরয’ মৌলিক বিবেচনায়, অর্থাৎ সত্য-সঠিক ধর্ম ‘ইসলাম’, বিশ্বমানবতার জন্য বিশ্ব প্রভুর একমাত্র মনোনিত জীবনব্যবস্থা, তিনি তা মহাপ্রলয় পর্যন্ত বাকী রাখবেন, অক্ষুণ রাখবেন এই তাবলীগ এর মাধ্যমেই। সুতরাং তা ফরয হওয়াই স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। তবে অবস্থাভেদে উক্ত দায়িত্ব পালনে তারতম্য হতে পারে যেমন, ফরযের তাবলীগ ফরয, ওয়াজিবের তাবলীগ ওয়াজিব, সুন্নাতের তাবলীগ সুন্নাত ও নফলের তাবলীগ নফল। একইভাবে ব্যক্তি পর্যায়ে যিনি যতটুকুর সহীহ জ্ঞান রাখেন, তার ওপর ততটুকুর তাবলীগ করা জরুরী; এবং সামর্থ অনুসারে নিজের অধীনস্থ, আওতাভুক্ত বা আওতা-বহির্ভূতক্ষেত্রে ও পরিবেশের বিবেচনায় ‘তাবলীগ’ ফরযও হতে পারে, ওয়াজিবও হতে পারে, সুন্নাত-মুস্তাহাবও হতে পারে। আবার সহীহ জ্ঞান না থাকলে বা যথাযথ পন্থা-পদ্ধতি অজ্ঞাত হলে কিংবা স্থান-কাল-পাত্রের বিবেচনা করার মত যোগ্যতা-অভিজ্ঞতা না থাকলে কিংবা হিতে বিপরীত হওয়ার মত পরিবেশ হলে; সেক্ষেত্রে বরং তাবলীগ না করাই বিধেয় হবে।
‘ফরয তাবলীগ’ দু’প্রকার। যথা: (১) ‘ফরযে আইন’ ও (২) ‘ফরযে কিফায়া’।
‘ফরযে আইন তাবলীগ’ হচ্ছে ওই তাবলীগ যা প্রত্যেক মুসলমানকে করতে হয়। আর তা প্রযোজ্য হয়ে থাকে নিজ অধীনস্থ ও পরিবারস্থদের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ যাদের ভালোমন্দ দায়-দায়িত্ব, জবাবদেহিতা এবং ভরণ-পোষণ ইত্যাদি নিজের ওপর বর্তায়। উদাহরণত, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা প্রমুখ অথবা পরিবার-সমাজ, অফিস-আদালত, দেশ-জাতি-রাষ্ট্রের যে যে-ক্ষেত্রে তার দায়-দায়িত্ব আছে; এবং যেখানে যারা তার অধীনস্থ আছে বা তার নিজের সংশ্লিষ্টতা আছে তাদের ক্ষেত্রে ‘ফরযে আইন’ প্রযোজ্য হয়ে থাকে।
‘ফরযে কিফায়া তাবলীগ’ হচ্ছে ওই তাবলীগ যা সরাসরি উপরিউক্তভাবে ব্যক্তির নিজের ওপর বর্তায় না বটে; তবে পরোক্ষভাবে প্রতিবেশী হিসাবে, সমাজ হিসাবে,স্বজন হিসাবে; দেশের স্বার্থে, দলের স্বার্থে সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ তথা তাবলীগ করা ‘ফরযে কিফায়া’ হিসাবে প্রযোজ্য ও  দায়িত্বভুক্ত হয়ে যায়; এবং তার প্রয়োজনীয় শক্তি-সামর্থও বিদ্যমান থাকে।
অসৎকাজে নিষেধও ফরয:
গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাচ্ছে, কুরআন ও হাদীসের প্রায় সর্বত্রই ‘সৎকাজের আদেশের পাশাপাশি অসৎকাজে নিষেধের নির্দেশ সমান্তরালে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং ‘অসৎকাজে নিষেধ’ বাদ দিয়ে কেবল সৎকাজে আদেশদানের তাবলীগ করলেই উক্ত পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় ফরয দায়িত্ব পালিত হয়েছে বলে গণ্য হবে না। দুটি দায়িত্বই পাশাপাশি চালিয়ে যেতে হবে। অবশ্য অসৎকাজে নিষেধ-এর তাবলীগ কালীন, এই ( “আপনি মানুষকে আপনার প্রতিপালকের পথে প্রজ্ঞা-কৌশলের মাধ্যমে এবং উত্তম উপদেশ দ্বারা আহবান করুন” [১৬:১২৫] আয়াতখানার আলোকে ন¤্রভাবে, দয়াদ্র হয়ে, সংশ্লিষ্টদের কল্যাণ চিন্তায়, কৌশলী পন্থা অবলম্বন করে তাবলীগ করতে হবে। সুতরাং এমন চিন্তা ও বক্তব্য যে, “অসৎকাজে নিষেধ করতে গেলে হিংসা, হঠকারিতা ও অসন্তোষ জন্ম নিতে পারে; তাই কেবল সৎকাজে আদেশদানের মধ্যেই তাবলীগকে সীমীত রাখতে হবে”  এমন ধারণা আদৌ সঠিক নয়। [প্রাগুক্ত:৫১৩পৃ.]
অসৎকাজে নিষেধ-তাবলীগ-এর দ্বিবিধ পদ্ধতি:
যেসব লোকজন আপনার দায়িত্বে ও অধীনস্থে রয়েছে, যেমন স্ত্রী-পুত্র-কন্যা ও চাকুরে প্রমুখ। এদের পাপ, অসৎকাজ থেকে বিরত রাখার জন্য যথাসাধ্য, সম্ভাব্য সব উপায়ে চেষ্টা চালানো ফরয। কিন্তু যারা আপনার অধীনস্থ নয়, তাদের পাপ-অপরাধ থেকে ফেরানো সকলের পক্ষে ফরয নয়; তা বরং ফরযে কিফায়া। তেমন লোকদের অসৎকাজে নিষেধের তাবলীগ করার দু’টি পদ্ধতি রয়েছে: (১) বিশেষ সম্বোধন, ও (২) ব্যাপক সম্বোধন।
বিশেষ সম্বোধন: কোন লোক যদি এমন হয় যে, তার সঙ্গে আপনার এমন খোলামেলা সম্পর্ক যে, আপনি যদি তাকে কোন গুনাহ-পাপকার্যে লিপ্ত দেখে সতর্ক করেন, তা হলে সে অসন্তুষ্ট না হয়ে বরং খুশি হবে এবং আপনার সতর্ক করার দরুন, আপনি তার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন বলে, মনে করবে। তা হলে তেমন ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পাপকর্মে জড়িত দেখলে, তাকে সরাসরি বিশেষ সম্বোধনের মাধ্যমে অপরাধ থেকে বাধাদান আপনার জন্য ফরয হিসাবে গণ্য হবে। কিন্তু কারও সঙ্গে যদি তেমন খোলামেলা সম্পর্ক না থাকে কিংবা অজানা-অচেনা হয়; তা হলে তেমন লোককে বিশেষ সম্বোধনের দ্বারা পাপ থেকে বাধাদান ফরযও নয়, উচিতও নয়। এটি ব্যক্তি পর্যায়ের জন্য প্রযোজ্য বিধান। অর্থাৎ এহেন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আপনাকে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে দেখা যাবে, যাকে তাবলীগ করবেন সে যদি  এমন লোক বাহ্যিকভাবে যদি ধার্মিক হয়, তা হলে আপনার তাবলীগে তার অসন্তোষ জন্ম নেবে এবং আপনার প্রতি তার অন্তরে ক্রোধ ও শত্রুতা জন্ম নেবে; এবং সে তার পাপকর্মের ভুল ব্যাখ্যাও দিতে শুরু করবে।
যদি লোকটি বাহ্যিকভাবে ধার্মিক না হয় এবং ধার্মিকদের প্রতি তার অন্তরে কিছুটা সম্মানবোধ থাকে তা হলে আপনার তাবলীগে তারও কিছুটা অসন্তোষ জন্ম নেবে; কিন্তু অন্তরে কিছুটা সম্মানবোধ থাকায় মুখে সে কিছু বলবে না; কিন্তু তার অন্তর থেকে ধার্মিকদের প্রভাব চলে যাবে এবং সে আগামীতে ধার্মিকদের থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করবে। কেননা, তার অন্তরের বক্তব্য হবে, ‘এরা কেবল কথায়-কথায়,পদে-পদে ভুল ধরে, বারণ করে’! আর যদি লোকটি ধর্ম-কর্ম থেকে এমন দূরে হয় যে, তার অন্তরে ধর্ম ও ধার্মিক লোকদের ব্যাপারে কোন সম্মানবোধ ও প্রভাব না থাকে; তা হলে সে আপনার তাবলীগ শুনে তাৎক্ষণিক এমন কুফরী কথা বলে উঠবে যে, তার ঈমানটুকুই চলে যাবে। যেমন কাউকে আপনি দাড়ি রাখার তাবলীগ করলেন, এতে সে বলে উঠলো, “যাও এটা তো মৌলবীদের কাজ!” কিংবা বলে উঠলো, “আরে দাড়ি রাখলে তো চেহারাটা ছাগলের ন্যায় হয়ে যায়!” তা হলে সে তাৎক্ষণিক কাফির হয়ে গেল এবং আপনি তার কুফরির কারণ হয়ে যাবেন!
ব্যাপক সম্বোধন: অসৎকাজে নিষেধের তাবলীগ-এর দ্বিতীয় পদ্ধতি হচ্ছে, লোকজনের একত্র অনুষ্ঠানে সমাজে ছড়িয়ে পড়া পাপ-অন্যায় কর্মের ক্ষতি, অপকারিতা, পরিণাম ভালো করে বয়ান করে দেবে। তবে ওই ব্যাপক সম্বোধনেও এ বিষয়টির প্রতি যত্নবান থাকা অত্যন্ত জরুরী, যেন বক্তব্য উপস্থাপন এমন কঠোর ও সমালোচনাকেন্দ্রিক না হয় যে, শ্রোতাদের মনে ঘৃণার জন্ম হয় এবং তারা অপমান বোধ করে। বরং উপস্থাপন ও সম্বোধন মহব্বত,  ও আবেগঘন অন্তরে হওয়া চাই। তার কারণ, অন্তরের দরদমাখা কথায় প্রভাব অধিক হয়ে থাকে। [প্রাগুক্ত: খ-৯,পৃ-১১১-১১২]
‘তাবলীগ ও শাস্তি’: অসৎকাজে নিষেধের তাবলীগ করতে গিয়ে কখনও সাজা-শাস্তি, শাসনের প্রয়োজন দেখা দেয়, তা হলে কি তেমন প্রয়োজনে কাউকে শাস্তি দেওয়া জায়েয হবে? তার জবাব হচ্ছে, পাপকাজ থেকে বিরত রাখার জন্য যে-কেউ যাকে ইচ্ছা, তেমন শাস্তি প্রদান জায়েয হবে না। যে-কারণে প্রচলিত তাবলীগ জামাতেও তেমন শাস্তির কোন ব্যবস্থা নেই। তবে ‘ফরযে আইন’ তাবলীগের ক্ষেত্রে যাদের দায়-দায়িত্ব নিজের ওপর বর্তায় তাদেরকে ‘তা‘যীর’ প্রকৃতির সাধারণ কিছু সমীচীন শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। উদাহরণত, পিতা-মাতার পক্ষে নিজ নাবালক সন্তানকে, স্বামীর পক্ষে স্ত্রীকে, শিক্ষকের পক্ষে ছাত্রকে এবং শায়খ বা পীরের পক্ষে মুরীদকে। যেমন অবস্থা বুঝে কিছু বকাঝকা, শরীয়তের সীমার ভেতরে থেকে হাল্কা প্রহার ইত্যাদি। এতেও আবার শর্ত হচ্ছে, নিয়ত একান্ত বিশুদ্ধ হতে হবে। একমাত্র মহান আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা উদ্দেশ্য হতে হবে। এমনটি হতে পারবে না যে, তার প্রতি ক্রোধান্বিত অন্য কোন কারণে; শরীয়তের তেমন বৈধতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতিশোধ গ্রহণ করা হচ্ছে! এমনটি যেন না হয়।
উক্তসব সম্পর্ক ও স¦জন ব্যতীত অন্য কারও পক্ষে তাবলীগ করতে গিয়ে অপরাধী বা অভিযুক্তকে, কোন প্রকার শাস্তিদান জায়েয নেই। আর শাস্তি যদি ইসলামী শরীয়তের ‘হুদূদ’ তথা দ-বিধি প্রকৃতির হয়, তা হলে তেমন শাস্তিদান রাষ্ট্র ও প্রশাসন ব্যতীত কারও পক্ষেই জায়েয নেই।
তাবলীগ-এর বিভিন্ন বিভাগ
যে-রকমভাবে পৃথিবির রাষ্ট্রসমূহের নিজ নিজ রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনীয় ও জরুরী কর্মকা-সমূহ সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পাদন ও  ব্যবস্থাপনার স্বার্থে মৌলিক ও সহায়ক কার্যাদি বিভিন্নভাগে বন্টন করে এক-একটি বিভাগের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। কোন বিভাগ শিল্প ও ব্যবসায়-বাণিজ্যের, কোনটি মন্ত্রী-পরিষদ ও বিচার বিভাগ, কোনটি যোগাযোগ বিভাগ; আবার কোনটি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিভাগ-ইত্যাদি। এগুলোর অধীনে আবার বিভিন্ন শাখা-সেলসমূহ হয়ে থাকে। তেমনিভাবে ‘ইসলাম’ ধর্মের শিক্ষা-দীক্ষা, আমল, ইসলাহ্-সংশোধন, হিফাযত-সংরক্ষণ, স্থায়িত্ব ও প্রচার-প্রসারের নিমিত্তে ধর্মীয়-কাজ ও সেবাসমূহকে বিভিন্ন বিভাগে বন্টনের বিকল্প নেই। কোন বিভাগ শিক্ষা ও শিক্ষাদানের, কোনটি ফাতওয়া ও বিধি-বিধান গবেষণার, কোনটি ফাতওয়া শিক্ষাদান ও তা অনুশীলনের, কোনটি ইসলাহ্-সংশোধনের লক্ষ্যে হাতে-কলমে অনুশীলনের, কোনটি সর্ব-সাধারণের মাঝে ওয়ায-উপদেশদান ও ‘তাবলীগ’ করার জন্য, কোনটি অস্ত্র-হাতিয়ারের দ্বারা যুদ্ধ-জিহাদ চালিয়ে যাওয়ার, আবার কোনটি কলম-লেখা, রচনা-গ্রন্থনা-গবেষণার মাধ্যমে প্রচার-প্রসারের জিহাদ ও তাবলীগ চালিয়ে যাওয়া এবং ধর্মের সবরকম বিরোধিতাকে প্রতিহত করে তা সুষ্ঠু-সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা। আবার এসব বিভাগের আওতায়ও বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা হয়ে থাকে।
যেভাবে জাগতিক জীবনের উক্ত বিভিন্ন বিভাগকে বিলুপ্ত করে শুধু একটি বিভাগ বহাল রাখার পরামর্শদান যেমন “কেবল ‘শিল্প ও ব্যবসায়-বাণিজ্য বিভাগ’ বহাল রেখে বাকী সকল বিভাগ বিলুপ্ত করে, ওইসব বিভাগে কর্মরত সবাইকে এই একই বিভাগে কাজে লাগানো হোক” এমন দাবী করা, মারাত্মক বোকামী ও যুক্তিবিরুদ্ধ। তেমনিভাবে ইসলাম ধর্মের বহুমুখী কর্মকা্ডর বিভিন্ন বিভাগের সকলকে সবকিছু ছেড়ে ‘ুাবলীগ’ এর কাজে অংশগ্রহণ করতে বলাও, ধর্ম বিষয়ে সার্বিক জ্ঞানের অনুপস্থিতির পরিচায়ক এবং নিরেট বোকামীর নামান্তর। বরং বাস্তবতা হচ্ছে ধর্মের উক্তসবগুলো বিভাগই ‘তাবলীগ’ এর এক-একটি বিভাগের নামান্তর। পার্থক্য শুধু এ টুকু যে, ধর্ম প্রচারের পরিচিত এই ‘তাবলীগ’ বিভাগটি সাধারণ জনগণের ময়দানে কাজ করে; আর বাকী বিভাগগুলো বিশেষ বিশেষ ময়দানে কাজ করে। ‘তাবলীগ’ এর এই বিশেষ বিভাগগুলো হচ্ছে, শিক্ষাদান বিভাগ, ধর্মীয় গ্রন্থাদি প্রকাশনা, রচনা, গবেষণা, অনুবাদ-ব্যাখ্যা-ফাতওয়া বিভাগসমূহ্ এবং আত্মিক-আধ্যাত্মিক সাধনা ও সংশোধন তথা পীর-মুরীদী বিভাগ, মসজিদ-মাদরাসা পরিচালনা বিভাগ, ইত্যাদি। তাবলীগ এর এই বিশেষ বিভাগগুলো কয়েকটি কারণে সর্ব-সাধারণের ময়দানে পরিচিত ও প্রচলিত ‘তাবলীগ’-এর চেয়েও অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। যে কারণগুলো :-
এ সব মৌলিক ও ‘বিশেষ শ্রেণি’র তাবলীগ-এর মাধ্যমে ধর্মের মৌলিক সেবাসমূহ্ সম্পাদন করা হয়। উদাহরণত, পবিত্র কুরআন ও হাদীসের সহীহ-সঠিক ভাব-ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও নির্ধারণ করা হয়। মহান আল্লাহ্ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হুকুম-আহকাম, বিধি-বিধানসমূহের স্পষ্টকরণ ও নির্ধারণ, ইসলামের শত্রুদের পক্ষ থেকে ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থাপিত, দৃষ্টিভঙ্গিগত সমালোচনা-অপবাদের ফিতনাসমূহের শিকড় উপড়ে ফেলে ইসলামের দূর্গসমূহের হিফাযত ও দৃঢ়করণ ইত্যাদি।
এসব ক্ষেত্রে সেসব লোকদের তাবলীগ করা হয় যারা দূর-দূরান্ত থেকে পিপাসা নিয়ে আসে। আর এটা জানা কথা যে, যারা দ্বীন শেখা ও জানার পিপাসা নিয়ে উপস্থিত হয়, তাদের বাদ দিয়ে অন্যদের প্রতি মনোযোগ দেওয়া বা অন্যদের পিছনে মেহনত বা প্রাধান্যদান জায়েয নয়। যেমনটি সূরা ‘আবাসা’, অন্ধ সাহাবী ইবন উম্মে মাকতুমসহ কুরআন-হাদীসের অনেক আয়াত ও ঘটনা থেকেই প্রমাণিত।
এ সব শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধর্মের মৌলিক সেবাসমূহ সম্পাদনের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়ে থাকে। ধর্মের এসব মৌলিক সেবার গুরুত্ব ক্রমিক-১ এ বলা হয়েছে।
উক্ত আলোচনা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, যেসব আলেমকে আল্লাহ্ তা‘আলা ইসলামের উক্তসব জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়াদির তাবলীগ ও হিফাযত করার যোগ্যতা নসীব করেছেন, তাদের পক্ষে তা ছেড়ে ‘সাধারণ তাবলীগ’-এর জন্য বেরিয়ে পড়া মোটেও জায়েয নেই। একইভাবে সেসব শিক্ষার্থীদের পক্ষেও বেরিয়ে পড়া জায়েয নেই যাদের মধ্যে তেমন যোগ্যতা অর্জিত হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। তবে মাঠে-ময়দানে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের লক্ষ্যে মাঝে-মধ্যে, ছুটির দিনগুলোতে ছাত্ররা তাতে অংশগ্রহণ করতে পারে। এ ছাড়া, যাদের বেলায় তেমন প্রত্যাশা করা যায় না, তাদের জন্য উক্ত সাধারণ তাবলীগে বেরিয়ে পড়া জরুরী। এদের পক্ষে মাদরাসায় পড়ে থেকে সময় নষ্ট করা জায়েয নয়। এ দায়িত্ব মাদরাসাগুলোর পরিচালকদের ওপর বর্তায়। তাঁদের জন্য ফরয, এমন অযোগ্য-অকর্মা ছাত্রদের মাদরাসায় ভর্তি করা ও আটকে রাখার পরিবর্তে, তাদের সাধারণ তাবলীগে বা অন্যকোন ধর্মীয় কাজে লাগিয়ে দেওয়া।
তাবলীগ ও আল-হাদীস: (১) হযরত আবূ সাঈদ খুদরী  রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, “তোমাদের মধ্যে কেউ মন্দ/অসৎকাজ দেখলে, তা যেন সে নিজ হাতে প্রতিরোধ করে। যদি তেমন শক্তি-সামর্থ না থাকে, তা হলে সে যেন তার মুখ দিয়ে তা প্রতিহত করে। যদি তা-ও না পারে তা হলে সে যেন তার অন্তর দিয়ে তা প্রতিরোধ/ প্রত্যাখ্যান/ঘৃণা করে। আর এটি হচ্ছে নূন্তম ঈমানের স্তর।” [মুসলিম শরীফ]
‘অন্তর দিয়ে প্রতিরোধ’: “অন্তর দ্বারা অসৎকাজ প্রতিরোধ মানে হচ্ছে, অন্তরে এমন প্রতিজ্ঞা থাকা যে, এ মুহূর্তে যদিও অন্যায় কাজটি প্রতিরোধ করতে পারছি না; তবে ভবিষ্যতে যখনই তেমন সুযোগ পাবো তা প্রতিরোধ করবো। কেবল ‘মনে মনে অপকর্মটিকে ঘৃণা করা’ হাদীসটির এমন তরজমা সঠিক নয়। তার কারণ, (যদি হাত দ্বারাও মিটানোর ক্ষমতা না রাখে, তা হলে অন্তর দিয়ে মিটিয়ে দেবে) হাদীসটির মূল মতন এর দিকে লক্ষ করলে, বোঝা যাবে ‘হাত দ্বারা প্রতিরোধ/মিটানো… মুখ দ্বারা প্রতিরোধ…অন্তর দ্বারা প্রতিরোধ/মিটানো (অন্তর দিয়ে মিটায় বা শেষ করে দেয় বা প্রতিহত করে) এর মূলভাব ও ব্যাখ্যা ‘ঘৃণা’ শব্দে আদায় হয় না। মন দিয়ে ঘৃণা করা তো সহজ ব্যাপার। এতদসংক্রান্ত অপরাপর কঠোর বাণী ও আযাব-গযব সম্বলিত যেসব হাদীস বিদ্যমান তার নিরীখে, কেবল মনে মনে ঘৃণা দ্বারাই দায়িত্বমুক্তি ও শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। সুতরাং শরীয়তের আলোকে কেবল সৎকাজে আদেশের আংশিক দায়িত্ব পালন করে এবং অসৎ-অন্যায় কাজে শুধু ঘৃণা করে ইসলামের পরিপূর্ণ ‘দা‘য়ী ও ‘মুবাল্লিগ’ হওয়া যাবে না। এটি মনে রাখতে হবে যে, ‘নাহী ‘আনেল-মুনকার’ তথা অসৎকাজে নিষেধও অন্যতম একটি ফরয আমল, দায়িত্ব”।  [আহসান: খ-৯,পৃ-৯৯]
‘শক্তি-সামর্থ’: তাফসীর ও ফাতওয়া গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘শক্তি-সামর্থ’ মানে দৈহিক সামর্থ নয়, উদ্দেশ্য হচ্ছে যাকে অসৎ কাজে নিষেধ করা হবে, তার পক্ষ থেকে তা গ্রহণ করবে বলে প্রত্যাশা থাকা এবং সে কোন ক্ষতি করবে না বলে প্রবল ধারণা হওয়া তা হলে, ‘অসৎকাজে নিষেধ’-এর ‘তাবলীগ’ করাও ওয়াজিব বলে গণ্য হবে। যদি তেমন প্রত্যাশা না থাকে এবং হিতে বিপরীতের সম্ভাবনা দেখা দেয়; তা হলে ওয়াজিব নয়। [প্রাগুক্ত: পৃ-৫১২]
(২) হযরত ইবন মাসঊদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “বনী-ইসরাঈল জাতির অধঃপতন বা ধ্বংসের সূচনা হয়েছিল এভাবে যে, তারা যখন একে-অন্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ হত তখন মন্দকাজ দেখে বলতো, হে অমুক! আল্লাহকে ভয় করো এবং যা করছো তা ছেড়ে দাও; তা তোমার জন্য বৈধ নয়। তারপর আবার পরেরদিন তার সঙ্গে তার অপকর্মরত অবস্থায় মিশতো এবং তাকে নিষেধ করতো না; অথচ একইসঙ্গে পানাহার, উঠাবসা করতে থাকতো। এক পর্যায়ে তাদের ভালো-মন্দ অন্তর পরস্পর সমান হয়ে গেল অতঃপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শপথ করে জোর তাকিদসহ বললেন, অবশ্য অবশ্য তোমরা ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং খারাপ কাজে নিষেধ করবে এবং অবশ্যই তোমরা জালেমকে প্রতিহত করবে এবং তাকে সত্য ও ন্যায়ের ওপর উঠতে বাধ্য করবে।” [আবূ দাঊদ, তিরমিযী]
অর্থাৎ সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ অব্যাহত না রাখায় এক সময় তারা ধংস হয়ে গেল।
(৩) হযরত জারীর ইবন আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, “কোন সম্প্রদায় বা জাতির মধ্যে কোন ব্যক্তি যখন পাপকাজ করতে থাকে। আর ওই জাতির লোকজনের লোকটিকে প্রতিরোধ-প্রতিহত করার সামর্থ থাকে; অথচ তারপরও তাকে প্রতিহত করে না (নিষেধ করে না, বাধা দেয় না, পাপকর্ম বন্ধ করতে সচেষ্ট হয় না)। তা হলে মৃত্যুর পূর্বে অবশ্যই সংশ্লিষ্টদের ওপর আল্লাহ্র আযাব নাযিল হবে!” [আবূ দাউদ, ইবনে মাজা, ইবনে হিব্বান, তারগীব ইত্যাদি]
(৪) হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে গৃহে প্রবেশ করলেন। তখন আমি তাঁর চেহারা দেখে বুঝতে পারলাম, একটা কিছু ঘটেছে! তিনি উযূ করলেন, কারও সঙ্গে কথা বললেন না। আমি  হুজরার সঙ্গে ঘেঁষে কান পেতে, তিনি কি বলেন, তা শোনার জন্য দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি মিম্বরে আরোহণ করে বসলেন, তারপর আল্লাহ্র প্রশংসা ও গুণগান করলেন এবং ইরশাদ করলেন, “হে লোকসকল! নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে বলছেন, ‘তোমরা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করতে থাকো, ওই পরিস্থিতির পূর্বে যে, তোমরা আমার কাছে প্রার্থনা করবে, আমি তোমাদের দু‘আ কবূল করবো না; তোমরা আমার কাছে চাইবে, আমি তোমাদের চাহিদা পূর্ণ করবো না; এবং তোমরা আমার কাছে (শত্রুর বিরুদ্ধে) সাহায্য চাইবে, আমি তোমাদেরকে সাহায্য করবো না। এর চেয়ে বেশি কিছু না বলে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বর থেকে নেমে গেলেন।” [প্রাগুক্ত]
(৫) হযরত আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “আমার উম্মত যখন দুনিয়াকে বড় করে দেখবে, তাদের অন্তর থেকে ইসলাম-এর প্রভাব ও বড়ত্ব তুলে নেওয়া হবে। তারা যখন সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ ছেড়ে দেবে, তখন ওহীর বরকত থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করে দেওয়া হবে। আর আমার উম্মত যখন পরস্পর গাল-মন্দে জড়িয়ে পড়বে, আল্লাহর রহমতের দৃষ্টি থেকে দূরে ছিটকে পড়বে।” [হাকিম,তিরমিযী]
তাবলীগ না করার পরিণাম:  এ পর্যায়ে আমরা ‘তাবলীগ’ বিষয়ক পবিত্র কুরআন ও হাদীসের দলীল-প্রমাণের বিশাল ভা-ারের দিকে দৃষ্টি না বুলিয়ে, কেবল ওপরে আলোচিত কুরআন-হাদীসের বাণীগুলোতে চোখ বুলিয়ে দেখি। মহান আল্লাহ্ ‘তাবলীগ ও দা‘ওয়াত’-এর কাজ না করলে কি কি ক্ষতির কথা বলেছেন:
(১) সূরা আলে-ইমরান এর উপর্যুক্ত ১১০ নং আয়াতটি থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা শ্রেষ্ঠউম্মত এ কারণে যে, আমরা তাবলীগ এর কাজ করবো। সুতরাং তাবলীগ না করলে, আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব থাকে কি করে!
(২) একই সূরার ১০৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে, যারা তাবলীগ-এর দায়িত্ব পালন করবে, তারাই সফলকাম হবে। সুতরাং আমরা যদি তাবলীগ না করি, তা হলে প্রকৃত সফলকাম হতে পারবো না।
(৩) সূরা হা-মীম আসসিজদা-এর ৩৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে, জগতে যত রকম কথা/বাক্য/বাক্যালাপ রয়েছে, তার মধ্যে আল্লাহ্র দিকে আহবানকারীর ‘কথা’-ই সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ। উক্ত সর্বোত্তম তাবলীগ-এর কাজ না করে, আমরা কিভাবে শ্রেষ্ঠ মানুষ ও শ্রেষ্ঠ উম্মত হতে পারি!
(৪) সূরা আয্যারিয়াত-এর ৫৫ নং আয়াতে বলা হযেছে, উপদেশ দিন, নসীহত করুন যা কিনা তাবলীগ কমের্রই নামান্তর। আর তাতে বলা হয়েছে, মু’মিনদের উপকার ও কল্যাণ পৌঁছানো-এ তাবলীগ কর্মের মধ্যে নিহিত। সুতরাং কল্যাণকামী মানুষের কাজই হচ্ছে তাবলীগ করা।
(৫) সূরা ‘ত্বা-হা’-এর ১৩২নং আয়াতে বলা হয়েছে, নিজ পরিবার-পরিজনদের ‘সালাত’ এর নির্দেশ তথা তাবলীগ করতে থাকুন। তা না করলে, আমরা অবশ্যই খোদ আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ অমান্যকারী সাব্যস্ত হবো। আর তাঁর নির্দেশ অমান্যকারীর পরিণতি কি হতে পারে, তা তো অনেকটা সকলেরই জানা!
এক নজরে উক্ত সবগুলো আয়াতের প্রতি তাকালে ইজমালীভাবে বোঝা যাচ্ছে, নিজে তাবলীগ করা, তাতে অটল থাকা যেমন জরুরী তেমনি পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র, আপন-পর, কাছে-দূরে, ব্যষ্টি-সমষ্টি, নারী-পুরুষ নির্বিষেশে সকলের, পরস্পরের ওপর তাবলীগের দায়িত্ব রয়েছে।
এ ছাড়া, উপরের আয়াতগুলো থেকে যদিও ‘তাবলীগ’ পরিহারকারীদের, কল্যাণ-বঞ্চিত হওয়া, শ্রেষ্ঠত্ব হারিয়ে ফেলা, শ্রেষ্ঠ মানুষ হতে না পারা, দায়িত্বহীন হওয়া এবং অসফল হওয়া- ইত্যাদি বোঝা যাচ্ছে; যা ইহকাল ও পরকাল উভয় জাহানেই হতে পারে । কিন্তু, তা থেকে জাগতিক জীবনের মারাত্মক পরিণতির বিষয়টি কম বোঝা যাচ্ছে। অবশ্য উপরে আলোচিত হাদীসগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে, তাবলীগ পরিহারের দরুন ইহকালেও মারাতœক পরিণতি, আযাব-গযব ও লাঞ্চনা- বঞ্চনা রয়েছে। যেমন,
(৬) আলোচিত হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. এর প্রথম হাদীসটি থেকে বোঝা যাচ্ছে, তাবলীগ-এর কাজটির ঈমানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। কেননা, তা থেকে বোঝা যাচ্ছে, যারা পুরোপুরি শক্তি-সামর্থের ও যোগ্যতার সঙ্গে তাবলীগ করতে পারেন, তারা প্রথমশ্রেণির পাকা মুমিন। আর যারা মধ্যমস্তরের সময়-সামর্থ-যোগ্যতা ব্যয়ে তাবলীগ করেন তারা দ্বিতীয়শ্রেণির মুমিন। আর যারা ‘ভালো’র বেলায় কেবল অন্তরে মহব্বত পোষণ করেন এবং মন্দের ক্ষেত্রে ঘৃণা পোষণ করেন, তারা তৃতীয়শ্রেণির মুমিন। এ ক্ষেত্রে চিন্তার খোরাক হচ্ছে, যারা উক্ত তাবলীগ তো করেই না বরং উল্টো বিরোধিতা করে; তাদের  ঈমানের  স্তর-পর্যায় কোথায়?
তবে হ্যাঁ, এটা ভিন্ন কথা যে, কেউ যদি বলে, আমি অবশ্যই কুরআন-হাদীসের উক্ত তাবলীগ করাকে জরুরী মনে করি এবং তা অপরাপর বিভিন্ন পন্থায় করে থাকি; যদিও প্রচলিত ও পরিচিত ‘তাবলীগ’- জামাতে যাই না। তার কথা ভিন্ন। মোটকথা, তাবলীগ করতে হবে, অবশ্যই করতে হবে; কুরআন-সুন্নাহ্র ভিত্তিতে করতে হবে; হোক তা যে-কোন নামে-সাইনবোর্ডে।
(৭) হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রা. কর্তৃক বর্ণিত দ্বিতীয় হাদীসটি থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে যে, সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ তথা ‘তাবলীগ’ ছেড়ে  দেওয়া মানে অনিবার্য ধ্বংস ডেকে আনা। কেননা বনী-ইসরাঈল জাতিও এ তাবলীগ -এর কাজ ছেড়ে দেওয়াতে পর্যায়ক্রমে দুনিয়াতেই তারা অধঃপতিত ও ধংস হয়েছিল।
(৮) হযরত জারীর ইবন আবদুল্লাহ রা. কর্তৃক বর্ণিত তৃতীয় হাদীসটি থেকে বোঝা যাচ্ছে, ‘দা‘ওয়াত ও তাবলীগ’ এর দায়িত্ব পালন না করলে, এ জগতেই সংশ্লিষ্টদের ওপর পরাক্রমশালী আল্লাহর আযাব এসে পড়বে!
(৯) আম্মাজান হযরত আয়েশা রা. কর্তৃক বর্ণিত চতুর্থ হাদীসটি থেকে পরিস্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে, ‘তাবলীগ’ এর কাজ না করলে, মুসলমানদের  দু‘আ-প্রার্থনা মহান আল্লাহ কবূল করবেন না; তাদের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করবেন না; শত্রুর বিরুদ্ধে কাঙ্খিত সাহায্য তাদেরকে দেবেন না। সুতরাং মুসলিম জাতির অধঃপতন ও ধংসের জন্য তো এটুকুই যথেষ্ট যে, তারা তাবলীগ এর কাজ ছেড়ে বসবে!
(১০) হযরত আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত পঞ্চম হাদীসটি থেকে বোঝা যাচ্ছে, মুসলিম উম্মাহ যখন ‘তাবলীগ’ এর মেহনত ছেড়ে দেবে, তারা ‘ওহী’র বরকত-কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে! ‘ওহীর বরকত’ কি? এ প্রশ্নের জবাবে সংক্ষেপে আমরা বলতে পারি, খোদ মহান আল্লাহ ৩০ পারা পবিত্র কুরআন নাযিল করে, তাতেই ইরশাদ করেছেন “আমি অবতীর্ণ করছি কুরআন, যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত”  [১৭:৮২]
অর্থাৎ কুরআনের পঠন-পাঠন, শিক্ষা-দীক্ষা ও আমল-ওযীফা ইত্যাদির মধ্যে যেসব জাগতিক কল্যাণ-উপকারিতা অন্তর্নিহিত; এবং ফলাফল পাওয়ার ছিল। তাবলীগ-এর কাজ ছেড়ে বসলে, সেসব থেকে বঞ্চিত হতে হবে।
তাবলীগরতদের জন্য শরীয়তের আবশ্যকীয় আইন: যারা প্রচলিত তাবলীগ ও ধর্মীয় অপরাপর কাজের তাবলীগে আত্মনিয়োগ করবেন তাদেরকে অবশ্যই নি¤েœাক্ত আইন-বিধান মেনে চলতে হবে:
প্রথম আইন: কোন কল্যাণ-লক্ষ্যের যুক্তিতেই যে-কোন ছোট পাপের কাজেও জড়িয়ে পড়া জায়েয নেই। এক্ষেত্রে মহান আল্লাহ্র বিধান হচ্ছে, তোমরা আমার মনোনীত ধর্মের কাজ করো; কিন্তু ধর্মের সেবার দোহাই দিয়ে কোথাও আমার নির্ধারিত আইন-বিধানের সামান্যতম কাট-ছাটেরও অনুমতি নেই। উদাহরণত, এমন বক্তব্য বা যুক্তি দেয়া যে, “তাবলীগ বা দাওয়াতের স্বার্থে আপাতত বিদআত কর্মে, পাপের অনুষ্ঠানে, সুদখোর বা ঘুষখোরের বাড়ীতে খেয়ে নাও; কল্যাণ চিন্তা মাথায় রেখে অনুরূপ কোন পাপ কাজে অংশগ্রহণ জায়েয; বরং তাতেও সওয়াব রয়েছে”!(নাঊযুবিল্লাহ্)
দ্বিতীয় আইন: ছোট-বড় যে-কোন পাপকর্ম দেখলে তা সামর্থ অনুযায়ী প্রতিহত বা প্রতিরোধ করা ফরয। এ বিধানটি তাবলীগ কর্মে জড়িত বা অন্য যে-কোন ধর্মীয় কাজে জড়িতদের মনে রাখতে হবে। একইভাবে তাবলীগ এর দুটি ডানা ‘সৎকাজে আদেশ’ ও ‘অসৎকাজে নিষেধ’ বিষয়টি খোদ তাবলীগ সংক্রান্ত কুরআনের আয়াতগুলোতেই যেখানে বিদ্যমান সেখানে ‘অসৎকাজে নিষেধ’কে এড়িয়ে যাওয়া অথবা নিজের খেয়াল-খুশি মতে, প্রয়োজনে অসৎকাজে অংশগ্রহণও জায়েয বলা, মারাত্মক শরীয়ত বিরোধী বক্তব্য।
তৃতীয় অইন: প্রয়োজনে যুদ্ধ-জিহাদের  তাবলীগও ফরয। পূর্বে বলা হয়েছে যে, তাবলীগ এর বিভিন্ন বিভাগ ও শাখা রয়েছে। যার অন্যতম এটিও যে, নিজ দেশের প্রয়োজনে, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের  প্রয়োজনে, নিজ ঈমান ও ধর্মের স্বার্থে প্রয়োজন মুহূর্তে বিধি মোতাবেক যুদ্ধ-জিহাদের তাবলীগ করাও ফরয এটি সংশ্লিষ্ট সকলকে মনে রাখতে হবে।
চতুর্থ আইন: ধর্মের অপরাপর বিভাগ ও শাখায় কর্মরতদের হেয় বা ছোট মনে করা যাবে না। ধর্মের বহুমুখী ও বিভিন্ন বিভাগে জড়িতরা পরস্পর একে-অন্যকে হেয় করা হারাম ও কবীরা গুনাহ। যে-কারণে, শরীয়তের সীমার ভেতরে যারা আল্লাহ্র বিধান মোতাবেক  মুসলমানদের সমাজ ও রাষ্ট্র পারচালিত হওয়ার লক্ষ্যে রাজনীতি করেন, তাদের এমন বক্তব্য বা দাবী যে, “আমরাই কেবল ইসলামের আসল ফরয আদায় করছি”! কিংবা যারা তাবলীগ করেন, তাদের এমন দাবী যে, “খাঁটি ইসলামের কাজ এবং সঠিক তাবলীগের কাজ আমরাই করছি”! কিংবা মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের এমন কথা যে, “আসল দীনীকাজ তো আমরাই করছি!” এমনসব বক্তব্য/দাবী মোটেও জায়েয নেই।
পঞ্চম আইন: অন্যদের তুলনায় নিজের ও স্বীয় পুত্র-কন্যাদের ইসলাহ্-সংশোধনের চিন্তা-ফিকির অধিক জরুরী ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, মহান আল্লাহ্র নির্দেশ, “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনদের অগ্নি হতে রক্ষা করো। [৬৬:০৬]
ষষ্ঠ আইন: যারা স্বেচ্ছায় দীন-ধর্ম শিখতে পিপাসা-আগ্রহ নিয়ে উপস্থিত হয়, অন্যদের চেয়ে তাদের প্রাধান্য দিতে হবে। ধর্মের তাবলীগ ও শিক্ষা সবার কাছেই পৌঁছাতে হবে; সংশ্লিষ্টদের আগ্রহ্ থাকুক বা না থাকুক। তারপরও, যারা আগ্রহী ও উপস্থিত তাদের হক অগ্রগণ্য।
সপ্তম আইন: যিকির ও ফিকির-এর অধিক হারে অনুশীলন। কেননা, যে-ব্যক্তি অধিকহারে নিজের ইসলাহ্ ও পরিশুদ্ধির চিন্তা-চেতনা রাখবে এবং নির্জনে আমল-ইবাদত, যিকির-তাসবীহ, মুরাকাবা-মুহাসাবার প্রতি যতœবান থাকবে; তার তাবলীগ, তা‘লীম ও পরিশুদ্ধির মেহনত অধিক কার্যকরী ও ফলদায়ক হবে। [প্রাগুক্ত;খ-৯,পৃ ১৪২-১৬২]
মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে শরীয়তের মাপকাঠি অনুযায়ী ‘দা’ওয়াত ও তাবলীগ’ এর কাজের গুরুত্ব বোঝার এবং সেই অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন!
লেখক: মুফতী ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight