বিশ্বনবীর আদর্শ ও আমাদের প্রাত্যহিক জীবন : মুহাম্মদ কামরুল ইসলাম

jashn_e_eid_milad_un_nabi_01_by_sheikhnaveed-d38ebik

উভয় জাহানের সর্দার, সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও বৃদ্ধকাল এবং তার কথা কাজ ও ইবাদত বন্দেগি এবং আকীদা বিশ্বাস মোটকথা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের নাম সিরাত বা চরিত্র। ধর্মীয় বিষয়ে জ্ঞান রাখেন এমন কোন মুসলমানের এ কথা অজানা নয় যে, মানুষের জন্য নবী কারীম সা. এর জীবনীতে সর্বোত্তম আদর্শ রয়েছে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- ‘তোমাদের জন্য নিশ্চয় আল্লাহর রাসূলের জীবনীতে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।’ [আহযাব-২১]। স্বীয় উম্মতের জন্য তার সীমাহীন দয়া এবং মুসলমানদের কল্যাণ ও উন্নতির জন্য আত্মিক স্পন্দন এবং ধারাবাহিক উদ্যোগ এর মূল বিষয়বস্তু কুরআন ও হাদীসে অগণিত রয়েছে। যেমন কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে- তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য হতেই একজন রাসূল। তোমাদের দুঃখ কষ্ট তার পক্ষে দুঃসহ, তিনি তোমাদের মঙ্গলকামি। মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল দয়াময়। [তাওবাহ-১২৮]
এমন দয়া আর উদারতা সম্পর্কে এক হাদীসে বলা হয়েছে- হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর  ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূল সা. কুরআনুল কারীম থেকে হযরত ইবরাহীম আ. স¤পর্কে একটি আয়াত পাঠ করলেন যার অর্থ- হে প্রভু! তারা (এই মূর্তিপূজারীরা) অনেক লোকদিগকে পথভ্রষ্ট করে দিয়েছে। অর্থাৎ তাদের কারণে অনেক মানুষ পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে, সুতরাং যে আমার  অনুসরণ করবে সেই আমার দলভুক্ত। আর যে আমাকে অমান্য করবে (আমি তাদের জন্য আপনার নিকট দোআ করতেছি তাদেরকে আপনি ক্ষমা করে দিন।) আপনিই তো পরিত্রাণকারী অফুরন্ত ফলদাতা। [সূরা ইবরাহীম : ৩৬] তারপর তিনি এই আয়াতটি তেলাওয়াত করেন- হে আল্লাহ! আপনি যদি তাদের শাস্তি দেন তাহলে তো তারা আপনারই বান্দা। মায়েদা : ১১৮] অর্থাৎ আপনি শাস্তি দেওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার রাখেন। তারপর হুজুর সা. দোআর জন্য স্বীয় হাত উত্তোলন করলেন এবং ‘আমার উম্মত’ ‘আমার উম্মত’ এই বলে কাঁদতে লাগলেন। আল্লাহ তাআলা জিবরাঈল আ. কে বললেন, মুহাম্মদ এর নিকট যাও, যদিও তোমাদের পালনকর্তা ভাল করেই জানেন, তবুও তুমি গিয়ে আমার পক্ষ থেকে জিজ্ঞেস করবে, তার কাঁদার কারণ কি? অতএব জিবরাঈল আ. হুজুর সা. এর নিকট আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, হুজুর সা. তাকে বলে দিলেন  যা আল্লাহর নিকট দোআ করেছিলেন। জিবরাঈল গিয়ে আল্লাহর নিকট বর্ণনা করলেন, তখন আল্লাহ তাআলা তাকে বললেন মুহাম্মদ এর নিকট যাও এবং আমার পক্ষ হতে তাকে বলো, আপনার উম্মতের ব্যাপারে আল্লাহ আপনাকে সন্তুষ্ট করবেন পেরেশান করবেন না। হুজুর সা. অন্যত্র ইরশাদ করেন- হযরত আয়েশা ছিদ্দিকা রা. এই দোআ শুনে এমন ভাবে হাসলেন যে তার মাথা হুজুর সা. এর কোলে ঝুকে পড়েছিলো তখন হুজুর সা. বললেন, আমার দোআ কি তোমাকে খুশি করে দিয়েছে নাকি? হযরত আয়েশা রা. বলেন, আপনার দোআয় কেন খুশি হবোনা, হুজুর সা. বললেন, আল্লাহর কসম এটাই আমার দোআ আমার সকল উম্মতের জন্য প্রত্যেক নামাযের পর করা হয়। [মাজমাউয যাওয়ায়েদ : খন্ড/২৪৪] এই উম্মতের জন্য চিন্তা ও ফিকির এবং কল্যাণকামিতার আবেগ ও অনূভুতিতে পরিপূর্ণ ছিল প্রিয় নবীর ষোলআনা জীবন, যা সবসময় তাকে অস্থির ও ব্যকুল করে রাখতো। আর এই দোআ, ফিকির ও সহানুভূতির ধারাবাহিকতা শুধু দুনিয়াতেই সিমাবদ্ধ ছিলনা; বরং হাশরের ময়দানে যখন সকল মানুষ এমনকি নবীগণসহ ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি বলতে থাকবে। তখনও নবীজীর সা. যবান থেকে উম্মাতি উম্মাতি চালু থাকবে। ঐ সময় অন্যান্য উম্মতের সাথে সাথে প্রিয় নবী সা. এর উম্মতের জন্য বিশেষ সুপারিশ করবেন। তারপরও এই উম্মতে মুহাম্মাদীর প্রতি রাসূল সা. এর অকৃতিম ভালবাসার টান অপরদিকে মুসলমানগণ সুন্নতে নববী থেকে দূরে সরে থাকা নিশ্চিতরুপে বেদনাদায়ক। আল্লাহ তাআলাই আমাদের উপর দয়া করবেন। যেই নবীকে চুড়ান্ত আদর্শ হিসেবে মহান আল্লাহ দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন সেই নবীয়ে রহমত দীনের কোন শাখায় কোন প্রকার কমতি করেন নি; বরং পরিপূর্ণভাবে দীনের প্রতিটি শাখায় কথা কাজ এবং বাস্তব জীবনে পালন করে দেখিয়ে গেছেন। চাই এসকল বিষয়ের সম্পর্ক ইবাদতের সাথে হোক অথবা লেনদেন বা ব্যবসা বাণিজ্যের সাথে হোক। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নবুওয়াতের সূর্যের আলো প্রকাশ হয়েছে। আমাদের জীবনে সবচেয়ে বড় কমজুরি হচ্ছে আমরা বে আমলের শিকার। নিকৃষ্ট দুনিয়ার লোভ এবং চাহিদার মূল পর্দা আমাদেরকে সম্পূর্ণভাবে ঢেকে রেখেছে। এ কারণেই গন্তব্যের সহীহ শুদ্ধ পথ চিনার পরও সে পথে চলতে আমরা অসহায়। এই কথা অতীব প্রয়োজনীয় যে আমরা আমাদের ইবাদতে হিসাব নিয়ে দেখি নবীর নামাযের সাথে আমাদের নামাযের মিল আছে কিনা? যাকাত এবং রমজানের রোযা হজ্জ ও অন্যান্য ইবাদতে আমরা আমাদের প্রিয় নবীর সুন্নতের অনুসরণ কতটুকু করতে পেরেছি? এমনিভাবে লেনদেনের ক্ষেত্রে হিসাব নিয়ে দেখি, নবীর আদর্শের সাথে কি পরিমাণ সাদৃশ্য রয়েছে? লেনদেনের পবিত্রতা ও সততা সম্পর্কে রহমতের নবীর শিক্ষা  ও উপদেশের উপর আমরা কতটুকু ভরসা বা আমল করতে পেরেছি? মানুষের সাথে আচার ব্যবহার এবং বসবাসের ক্ষেত্রে আমরা নিজেদের কর্মে দৃষ্টিপাত করি যে, নবীর আচার ব্যবহার থেকে আমাদের অভ্যাস এবং চরিত্রে কতটুকু প্রভাব পড়েছে? হিংসা বিদ্বেষ লোভ লালসা এবং সন্তান সন্ততির ভালোবাসা অহংকার এবং কপটতা মিথ্যা এবং ধোঁকা গর্ব ও ঔদ্ধতা অসন্তুষ্টি এবং সংকীর্ণতা হীনমন্য এবং এই ধরনের নিকৃষ্ট অভ্যাসগুলো আমরা কতটুকু ঘৃণা করি? এমনিভাবে উত্তম চরিত্র বিনয়ী ও শিষ্টতা তওবা ইস্তিগফার, সম্প্রীতি ভালবাসা এবং আল্লাহর প্রতি ভরসা, ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা এবং সহনশীলতা একনিষ্ঠতা আন্তরিকতা, অনুগ্রহ এবং সন্তুষ্টি লজ্জা ও অত্মসম্ভ্রম নম্রচিত্ত এবং মহানুভবতা এই ধরনের মহৎগুণগুলো আমাদের চরিত্রে কি পরিমাণ যুক্ত রয়েছে? এমনিভাবে সামাজিক জীবনটাকে নিরীক্ষণ করি এবং অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে হিসাব লাগিয়ে দেখি যে. গোত্র বংশ আত্মীয় স্বজন এবং মিত্রবর্গ পাড়া প্রতিবেশিসহ অন্যান্য মানুষদের প্রতি আচার ব্যাবহার ভাল করছি, নাকি তাদের সাথে মন্দ আচরণ করছি? নিজের গ্রাম মহল্লা এবং বাড়ির মধ্যে ভালবাসা এবং বন্ধুত্বের স্তর কতটুকু? নাকি ঘৃণা এবং হতাশার আস্তানা গেঢ়ে বসেছে। বড়দের সম্মান এবং মর্যাদা, ছোটদেরকে স্নেহ এবং ভালোবাসা, সমবয়সীদের সাথে উত্তম আচরণ, মানুষের অপরাধ এবং ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করা, দূর্বলদের সাহায্য করা, মেহমানদের অথিতেয়তা ও ক্ষুধার্তদের কে আপ্যায়ন করা, অত্যাচারিত নিপীড়িত মানুষের সাহায্য করা এবং প্রত্যেক মানুষের সাথে ভালোবাসা ও সুন্দর ব্যাবহার করার মধ্যে আমাদের জীবনের কতটুকু অংশ অতিবাহিত হয়েছে? বস্তত এই ধরনের মহৎগুণাবলীর মাধ্যমে মানুষ সম্মানিত এবং উঁচু মর্যাদার অধিকারী হয়।
সারকথা হলো আমরা নিজেদের আমলের হিসাব নেই  এবং আমাদের পরিবার পরিজনদেরও অনুসন্ধান করে দেখি। আজ আমাদের ছেলেমেয়েরা মোবাইল ও টেলিভিশনের মাধ্যমে খেলা ও খেলোয়ারদের নাম এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রে খেলে এমন ম্যাচের রেকর্ড   বিভিন্ন রকমের ছবি ও ফিল্মের নগ্ন নায়ক নায়িকাদের কথা খুবই স্মরণ থাকে, তবে স্মরণ থাকেনা প্রিয় নবীর জীবন বিধান। নিশ্চিতরুপে এগুলোর পেছনে আমাদের যথেষ্ট এুটি রয়েছে। আমি নিজেও হুজুর সা. এর সীরাতের অনুসারী না সম্পূর্ণ উদাসিনতার মধ্যে রয়েছি। নবী কারীম সা. এর পবিত্র জীবনের না অবস্থা জানা আছে আমাদের, না জানার ইচ্ছা আছে! মোটকথা মুখে মুখে ভালবাসার দাবীদার খুব দেখাই; যদি প্রিয় নবীর শানে কোন খারাপ কথা শুনি  রক্ত গরম  হয়ে যায়। হ্যাঁ গরম হওয়া উচিত এবং যতটুকু হয় তাও কম হয়। তবে সাথে সাথে এটাও লক্ষণীয় যে, নবীর সাথে আমরা কি পরিমাণ সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছি? আমাদের জীবন কে আল্লাহর নবীর সুন্নত দ্বারা কতটুকু পরিপূর্ণ করতে পেরেছি? এসব ব্যাপারে আমাদের হিসাব মিলানো প্রয়োজন- আমাদের সন্তানদের নিকট  আল্লাহর নবীর জীবনী কি পরিমাণ আলোচনা করা হয়? আমাদের ঘরে প্রিয় নবীর সুন্নত কতটুকু জীবিত? তবে এর সহজ এবং কার্যকরী পদ্ধতি হচ্ছে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রতিদিন একবার মাসনূন দোআ সমূহ পড়বে স্ত্রী সন্তানদের কে তালিম দিবে এবং পরিবারের অন্যদের কে শুনাবে। এতে করে সুন্নতের উপর আমল করার আকাঙ্খা তৈরি হবে এবং আমাদের জীবন চরিত্র সুন্নতের পবিত্র রঙ্গে রঙ্গীন হয়ে যাবে। আর এভাবেই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নবীর আদর্শ কে অনুসরণ করে চলতে থাকলে নিঃসন্দেহে উভয় জাহানের সফলতার অধিকারী হয়ে যাবো এবং এর পবিত্র প্রভাব আমাদের জীবনেই যে শুধু প্রকাশ পাবে এমন নয়; বরং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মরাও এর থেকে উপকৃত হবে ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আমল করার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নবীর সুন্নত কে বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

একটি মন্তব্য রয়েছেঃ বিশ্বনবীর আদর্শ ও আমাদের প্রাত্যহিক জীবন : মুহাম্মদ কামরুল ইসলাম

  1. said says:

    অনেক ধন্যবাদ লেখককে। তিনি তো অল্প কথায় রাসূলের জীবনাদর্শ আমাদের মাঝে ফুটেয়ে তুলেছেন। হে আল্লাহ আমাদেরকে সেই মত আমল করার তাওফিক দাও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight