বিবাহের ক্ষেত্রে রাসূল সা.-এর উত্তম আদর্শ / ড. মুফতী আবদুল মুকীত আযহারী

বিবাহ নবীগণের সুন্নাত
শিশু অধিকারের সপ্তম অধিকার হলো : শিশু বড় হলে তাকে বিয়ে দেয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত (পুরুষ হোক না নারী) তাদেরকে বিবাহ করিয়ে দাও এবং তোমারেদ মধ্যে দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ, তাদেরও (বিবাহ করিয়ে দাও)। যদি তারা অভাবী হয় আল্লাহ তাআলা নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে ধনী বানিয়ে দেবেন।১ আল্লাহ তাআলা অবিভাবকদের বলছেন, সমাজকে বলছেন, সংশ্লিষ্ট সবাইকে বলছেন, যারা অবিবাহিত তাদেরকে তোমরা বিবাহ করিয়ে দাও।
রাসূল সা. বলেন, বিবাহ আমার সুন্নত, আমার আদর্শ, যে ব্যক্তি আমার সুন্নত থেকে বিমুখ হবে সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত না।২ অন্য এক হাদীসে আল্লাহর রাসূল সা. বলেন, যে অভাবের ভয়ে বিবাহ পরিত্যাগ করল, সে আমার উম্মত না।৩ অন্য এক হাদীসে বলেন, তোমাদের মধ্যে যারা সামর্থ্য রাখে, শারীরিক সামর্থ্য, অর্থনৈতিক সামর্থ্য, তারা যেন অবশ্যই বিবাহ করে। কারণ বিবাহ চোখকে অবনত রাখে ও লজ্জাস্থানকে হেফাজত রাখে।৪ বিবাহ করা ইসলামে বড় একটা কর্তব্য। রাসূল সা. বলেন, যে বিবাহ করতে পারে তারপরও বিবাহ করল না সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত না।৫ রাসূল সা. বলেন, তোমরা মমতাময়ী ও অধিক সন্তান জন্ম দেয় এমন নারীকে বিবাহ কর। কারণ আমি অধিক উম্মত নিয়ে গর্ব কর।৬ রাসূল সা. বলেন, তোমরা বিবাহ কর। কারণ আমি অধিক উম্মত নিয়ে অন্য উম্মতের সঙ্গে গর্ব করব আর তোমরা খ্রিষ্টান পাদ্রিদের মত হবে না।৭
বিবাহ নবীগণের সুন্নত। নবীগণের চারটা সুন্নত বা চারটা আদর্শ, কোন নবীই এর বাইরে নন। লজ্জাশীল হওয়া, সমস্ত নবী লজ্জাশীল ছিলেন। বিবাহ সমস্ত নবীর সুন্নত। রাসূল সা. বলেন, সমস্ত নবীর চারটা সুন্নত বা চারটা আদর্শ। লজ্জাশীল হওয়া, সুগন্ধি ব্যবহার করা, মেসওয়াক করা এবং বিবাহ করা।৮ সমস্ত নবী বিবাহ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, হে রাসূল, আপনার আগে আমি আরো অনেক রাসূল পাঠিয়েছি। আর সকল রাসূলের জন্য আমি স্ত্রী রেখেছি এবং সন্তান রেখেছি।৯ অর্থাৎ পরিবার রেখেছি। সকল নবীগণের জন্য আমি সন্তান রেখেছি ও স্ত্রী রেখেছি। আল্লাহ তাআলা বলেন, আল্লাহ তাআলা নির্বাচন করেছেন আদম আ., নূহ আ. এবং ইবরাহীম আ.-এর পরিবারকে এবং ইমরান আ.-এর পরিবারকে সৃষ্টিজগতের উপর নির্বাচন করেছেন। তাই সমস্ত নবীর সুন্নত হলো বিবাহ করা।

বিবাহ একটি এবাদত
রাসূল সা. এক হাদীসের মধ্যে বলেন, যে বিবাহ করল তার অর্ধেক ইমান পরিপূর্ণ হলো। আর বাকি অর্ধেক নিয়ে সে যেন চেষ্টা করে।১০ অন্য এক বর্ণনায় রাসূল সা. বলেন, আল্লাহ তাআলা যাকে নেক স্ত্রী দান করেছেন তাকে তিনি অর্ধেক দ্বীনের ব্যাপারে সহযোগিতা করলেন। অতএব সে যেন বাকী অর্ধেকের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে।১১ অন্য হাদীসে আছে, রাসূল সা. বলেন, তুমি যা খাও তা তোমার জন্য সদকার সাওয়াব। তোমার সন্তান যা খায় তা তোমার জন্য সদকার সাওয়াব। তোমার স্ত্রী যা খায় তা তোমার জন্য সদকার সাওয়াব। তোমার কর্মচারী যা খায় তা তোমার জন্য সদকার সাওয়াব।১২ অতএব যখন কোন মানুষ বিয়ে করে আর এ বিয়ের ক্ষেত্রে, পরিবারের ক্ষেত্রে সে যত টাকা খরচ করে তার প্রতিটা টাকা সদকাহরূপে গণ্য হবে। আল্লাহর রাস্তায় খরচ করলে সে যত সাওয়াব পেত নিজ পরিবারের উপর খরচ করে সে সেই পরিমাণ সাওয়াব পাচ্ছে।
অন্য হাদীসে আছে, রাসূল সা. বলেন, যখন কোন  ব্যক্তি তার পরিবারের উপর খরচ করে আর সে এটাকে সাওয়াব মনে করে তবে এটা তার জন্য সদকার সাওয়াব।১৩ অতএব যখন কোন মানুষ বিয়ে করে আর এ বিয়ের ক্ষেত্রে, পরিবারের ক্ষেত্রে সে যত টাকা খরচ করে; তার প্রতিটা টাকা সদকাহ রুপে গণ্য হবে। আল্লাহর রাস্তায় খরচ করলে সে যত সাওয়াব পেত নিজ পরিবারের উপর খরচ করে সে সেই পরিমাণ সাওয়াব পাচ্ছে।

সামাজিক শৃংখলায় বিবাহ
পিতা-মাতা ও অভিভাবকের উপর সন্তানের অন্যতম অধিকার হল, সন্তানকে বিয়ে করিয়ে দেয়া। রাসূল সা. বলেন, যখন তোমাদের কাছে এমন ছেলে বা মেয়ে আসে যার দ্বীনের ব্যাপারে তোমরা খুশি থাক তবে তাকে বিয়ে করিয়ে দাও। যদি তোমরা তা না করাও তবে বড় ফেতনা হবে ও অনেক বিশৃংখলা হবে।১৪ দুনয়াতে যত ধরনের মজা বা চাহিদা আছে সবগুলো ভোগ করার জন্য আল্লাহ তাআলা একটি পবিত্র পথ রেখেছেন।
রাস্তার মধ্যে একটি সুয়ারেজ লাইন থাকে যার মাধ্যমে মানুষের বাড়ি-ঘরের সব ময়লা ও ব্যবহৃত পানি নিষ্কাশন হয়। যদি এ সুয়ারেজ লাইনটির কোন অংশ নষ্ট হয় বা কোথাও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় তবে সে ময়লা রাস্তা-ঘাটে উঠে যাবে এবং মানুষের চলাচল ও বসবাসের ক্ষেত্রে বিরাট বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে। এ কারণে কখনো রাস্তার মধ্যে কোন ময়লা পানি দেখা দিলে সর্বপ্রথম সবাই খুঁজতে থাকে যে, কোথায় পানির স্বাভাবিক গতি নষ্ট হয়েছে, কোথায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। সে প্রতিবন্ধকতা হয়তবা পলিথিনের ব্যাগ অথবা অন্যকিছু হতে পারে। সে ময়লা দূর করে যদি সে সুয়ারেজ লাইন পরিষ্কার করা যায় ও এর স্বাভাবিক গতি ফিরানো যায় তবে রাস্তার সকল ময়লা ও সকল বিশৃংখলা দূর হয়ে যাবে।
এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা পুরুষ ও নারীর যৌন চাহিদা পূরণ এবং আনন্দ-মজার জন্য স্বাভাবিক পথ রেখেছেন। নারী-পুরুষের আনন্দ-সুখ উপভোগের বৈধ পথ রেখেছেন। তা হল বিবাহ। আর যখন এ বৈধ পথ বাধাগ্রস্ত হবে বা বিবাহ -শাদির পথ রুদ্ধ বা কঠিন হবে তখন বিভিন্ন রকমের বিশৃংখলা সমাজে দেখা যাবে। যার ফলে আমরা দেখতে পাই, বর্তমানে যখন বৈধ পথ কঠিন করা হয়েছে তখন ছেলে-মেয়ে অবৈধ পথে পার্কে গিয়ে ডেটিং করে সে আনন্দ ভোগ করে। বিভিন্ন জায়গায়, অলিতে-গলিতে এমন মজাভোগের সামজিক বিশৃংখলা দেখা যায়। বান্ধবী পটানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা যুবক-কিশোরদের মধ্যে লক্ষ করা যায়। বরং নারীদেরকে ইভটিজিং এবং প্রেম প্রস্তাবের বিভিন্ন বিরক্তিকর ও আপত্তিকর কর্মকা- লক্ষ করা যায়।
অথচ এ সকল অপকর্মগুলো কিশোর-যুবকরা নায়কোচিত আচরণ মনে করে করে। এ সকল কুকর্মকে প্রেমের কৌশল মনে করা হয়। নাটক, সিনেমা, টেলিফিল্ম, নাচ-গানের আসর ইত্যাদিতে একটিমাত্র শিক্ষা যা আমাদের ছেলে মেয়েরা রপ্ত করতে পারে; তা হল প্রেমের কৌশল। কিভাবে মেয়েকে পটানো যায়, কিভাবে অন্যের প্রেমিকাকে ভাগানো যায়, কিভাবে অন্যের স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া প্রেম করা যায়, কিভাবে ছেলে-মেয়ের রোমান্সের মাঝে বাধা-হয়ে-দাঁড়ানো বাবা-মাকে খতম করা যায়, কিভাবে প্রেমের জন্য বাবা-মা, ভাই-বোন সকল আত্মীয়স্বজনকে বিসর্জন দেয়া যায় – এ সকল অপশিক্ষা আমাদের ছেলে-মেয়েরা গ্রহণ করে।
বরং এ সকল অপকৌশলের বাস্তবায়নও আমরা অহরহ দৈনিক কাগজগুলোতে দেখতে পাচ্ছি। ঐশীর মত অনেক ছেলেমেয়ে এ সকল অবৈধ ভোগের জন্য বাবা-মা, প্রেমিকার স্বামী, সহপাঠীসহ সকল প্রতিবন্ধকতাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছে, এরকম অনেক ঘটনা প্রতিদিন দেখতে পাই। আরো ভয়ংকর ব্যাপার হল যে, এ সকল অপশিক্ষা যখন বিভিন্ন চ্যানেলে প্রদর্শন করা হয় তখন বাবা-মা, ভাইবোন সকলে মিলে গিলতে থাকে। বাবা-মা বা বড়দের মধ্যে কেউ শুধরিয়ে দেয় না যে, নাটক বা সিনেমার এরকম শিক্ষা হল অপশিক্ষা, কুশিক্ষা। বরং কখনো কখনো বাবা-মা বা বড়রা সিনেমার নায়কের নায়িকার সঙ্গে ইভটিজিংকে সমর্থন করে থাকেন। যার ফলে কিশোর-যুবকরা বুঝতেও পারে না যে, কোনটা ভাল কাজ আর কোনটা মন্দ কাজ।
হযরত জাফর বিন আবু তালিব রা. যখন নাজাশী বাদশার সামনে বক্তৃতা করেন তখন বলেন, আমরা লাশ খেতাম, আমরা অপকর্ম করতাম, আত্মীয়তার বন্ধন নষ্ট করতাম, প্রতিবেশীর অধিকার নষ্ট করতাম, অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রাস করতাম এবং আমাদের মধ্যে শক্তিশালীরা দুর্বলদেরকে খেয়ে ফেলত। অতঃপর আল্লাহ তাআলা আমাদের মাঝে একজন রাসূল পাঠান। আমরা তাঁর বংশ, তাঁর সততা ও পবিত্রতা সম্পর্কে জানি। তিনি আমাদেরকে আদেশ করেন যেন আমরা মূর্তিপূজা ত্যাগ করি ও এক আল্লাহর এবাদত করি। তিনি আমাদেরকে আত্মীয়তা রক্ষা, প্রতিবেশীর সঙ্গে ভাল ব্যবহার, সত্য কথা বলা, সৎ ও পবিত্র থাকা এবং  সকল নিষেধাবলি থেকে দূরে থাকার আদেশ করেন।১৫

জাহিলিয়াত যুগের ছয় প্রকার বিবাহ ও বর্তমান সমাজ
জাহিলিয়াত যুগে ছয় রকম বিবাহের প্রচলন ছিল:
প্রথম : বৈধ বিবাহ
এটা বর্তমানে প্রচলিত আছে। পুরুষ বা তার অভিভাবক নারী বা নারীর অভিভাবকের কাছে বিবাহের প্রস্তাব দেবে এবং উভয়ের সম্মতিতে বিবাহ সম্পাদন হবে।
দ্বিতীয় : নিকাহুল খাদান
এটা প্রেমিকাকে গোপনে বিয়ে করা । তারা বলত, যা গোপনে তাতে কোন দোষ নেই আর যা প্রকাশ্যে তাতে দোষ আছে। এ বিবাহের পদ্ধতিকে পৃথিবীর বর্তমান আইনে বৈধতা প্রদান করা আছে। ছেলে আর মেয়ে যদি রাজি থাকে তবে গোপনে বা প্রকাশ্যে তাদের যা ইচ্ছায় সব করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে বাবা-মা, ভাইবোন বা কোন মানুষের কিছু বলার অধিকার নেই।
তৃতীয় : নিকাহুল ইআওজ
নিকাহুল ইআওজ অদল-বদল বিবাহ বা বর্তমান ভাষায় পরস্ত্রীকে বিবাহ। সে যুগে কোন বন্ধু তার বন্ধুকে বলত যে, আমি তোমার বউকে বিয়ে করব তার পরিবর্তে তুমি আমার বউকে বিয়ে করবে।১৬ চতুর্থ হল নিকাহুর রাহাত বা বন্ধুদের বিবাহ। পঞ্চম হল নিকাহুল ইসতেবদা বা বর্তমান ভাষায় গর্ভ ব্যবহার। ষষ্ঠ হল, ব্যভিচারীদের সঙ্গে বিবাহ।
হযরত আয়েশা রা. বলেন, জাহিলিয়াত যুগে চার রকম বিবাহের প্রচলন ছিল। তার মধ্যে প্রথম হল যা বর্তমানে প্রচলিত আছে। পুরুষ বা তার অভিভাবক নারী বা নারীর অভিভাবকের কাছে বিবাহের প্রস্তাব দিবে আর উভয়ের সম্মতিতে বিবাহ সম্পাদন হবে।
চতুর্থ : নিকাহুর রাহাত
নিকাহুর রাহাত বা বন্ধুদের বিবাহ। অর্থাৎ সাত-আটজন পুরুষের একজন বান্ধবী এবং সে সাত আটজন বন্ধু তাদের সে বান্ধবীর সঙ্গে সকল কাজ করতে পারত। তবে তখনকার যুগে নারী অধিকার ছিল যা বর্তমানে নেই। সেই বান্ধবী বন্ধুদের সঙ্গে মিলনের ফলে গর্ভবতী হয়ে গেলে তার বন্ধুদের ডেকে বলত, আমার পেটের সন্তানের বাবা হল অমুক। তখন সেই সাত আটজনের মধ্যে বান্ধবীটি যাকে বাবা বলে নির্ধারণ করত সে বন্ধুটির অস্বীকার করার আর কোন উপায় থাকত না। সে বন্ধুটিকে তখন সে নারীর গর্ভকালীর সকল খরচ ও সে সন্তানের সকল ব্যয়ভার বহন করতে হত।
পঞ্চম : নিকাহুল ইসতেবদা
নিকাহুল ইসতেবদা বর্তমান ভাষায় গর্ভ ব্যবহার। অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী ভাবল যে তাদের চেহারা বা গঠন ভাল নয় তাই স্ত্রী সন্তানের বীজ একজন সুপুরুষ ও সুদর্শন পুরুষের কাছ থেকে গ্রহণ করবে যাতে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুন্দর হয়। আর এ উদ্দেশ্যে স্বামী স্ত্রী মিলে এবং স্বামীর সম্মতিতে এরকম সুদর্শন পুরুষের সঙ্গে মিলনের সুযোগ করে দিত।
ষষ্ঠ : ব্যভিচারিণীদের সঙ্গে বিবাহ
ব্যভিচারিণীর বাসার সামনে লেখা থাকত যে এটা ব্যভিচারিণীর  বাসা। যেমনটি বর্তমানেও আছে। তবে বর্তমান যুগের চেয়ে তাদের নারী অধিকার আরো বেশি ছিল।  সে যুগে সেই ব্যভিচারিণী নারী যদি কোনসময় গর্ভধারণ করত তখন যতগুলো পুরুষ তার বাসায় এসেছিল বা তার সঙ্গে মিলন করেছিল তাদের সকলকে তার বাসায় আসতে হত। তখন সে নির্ধারণ করে দিত যে, এ শিশুর পিতা অমুক। তখন সে পুরুষকে সকল খরচ ও ব্যয়ভার বহন করতে হত। তার অস্বীকার করার কোন উপায় থাকত না। তারপরও কেউ যদি অস্বীকার করত তবে শালিস ও মামলার মাধ্যমে বিচারক যাচাই করত যে, এ শিশু দেখতে কার মত হয়েছে। যার চেহারার সঙ্গে বেশি মিল থাকত তাকে তার পিতা হিসেবে ঘোষণা করা হত। আর এটা অস্বীকার করার কোন উপায় থাকত না।১৭ বর্তমানে নারী অধিকারের এত উন্নতি হয়েছে তারপরও অন্ধকার যুগের কাছেও পৌঁছতে পারি নি। বোঝাই যায় যে, তারা নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে নারীগণের অধিকারকে অন্ধকার যুগের চেয়েও নি¤œস্তরে নিয়ে গেছে।

বিবাহ ও ভালোবাসা নিয়ে বিভ্রান্তি
অনেকে বিভ্রান্তি ছড়ান যে, নারীঅধিকার হল নারী যাকে খুশি তাকে সে পছন্দ করতে পারবে। যার সঙ্গে সে মিলন করতে পছন্দ করে সে করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে তাকে বাধা দেয়া তার অধিকার লংঘনের শামিল। এর দ্বারা কখনো নারীঅধিকার প্রতিষ্ঠা হয় না। বরং নারীঅধিকার ভুলন্ঠিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা নারীদেরকে বিবাহ কর তাদের পরিবারের সম্মতিতে এবং তাদেরকে নিয়ম অনুযায়ী মহর প্রদান কর এমতাবস্থায় যে, তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবে, ব্যভিচারিণী কিংবা গোপন প্রণয়িনী হবে না।১৮
অনেকে বিভ্রান্তি ছড়ান যে, বিবাহের মূল বিষয় হল ভালোবাসা। একজন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে সংসার কিভাবে করা যায়? এ কারণে বিয়ের আগে অবশ্যই ভালোবাসার সম্পর্ক বা প্রেম করতে হবে। এটা অবৈধ বলা বা এ সম্পর্র্ককে নিন্দা করা গ্রাম্য লোকদের ধ্যানধারণা। কখনোই এটা আধুনিক চেতনা বা মননশিলতার প্রতিক হতে পারে না।

ভালোবাসার বিয়ের ব্যর্থতার দু’টি কারণ
ফ্রান্সের সামাজিক গবেষক জনসন একটি সামাজিক জরিপ পরিচালনা করেছেন। তার জরিপের ফলাফল হয় এরকম :  যারা ভালোবাসা বা প্রেম করে বিয়ে করেছে তাদের চল্লিশ শতাংশ বিবাহ বিচ্ছেদে রূপ নিয়েছে। ভালোবাসার বিয়েগুলো স্থায়ী হয়নি। কেন?

প্রথম কারণ : সফল বিয়ের উপকরণগুলোর অনুপস্থিতি
কারণ ভালোবাসার সময় আবেগ থাকে। তাই ছেলে আমার উপযুক্ত কি না বা মেয়ে আমার উপযুক্ত কি না তা দেখার মত চোখ থাকে না।
রাসূল সা. বলেন, বিবাহ সাধারণত চার কারণে হয়। সৌন্দর্য দেখে, সম্পদ দেখে, বংশ দেখে বা দ্বীন দেখে। তবে বিয়ের ক্ষেত্রে দ্বীনকে অগ্রাধিকার দেবে।১৯ প্রেমের সময় প্রেম-ভালোবাসা প্রেমিক-প্রেমিকাকে অন্ধ করে দেয়। তাই বিবাহ স্থায়ী হওয়ার উপকরণগুলো যা রাসূল সা. উল্লেখ করেছেন তা দেখার মত চোখ থাকে না। তাই বিয়ের পর যখন আবেগ শেষ হয়ে যায় তখন চোখের উপর খেবে পর্দা দূর হয়ে যায়। তখন ছেলে বা মেয়ে দেখতে থাকে যে, আমার সঙ্গীটি তো আমার উপযুক্ত না। তার সঙ্গে সংসার করা তো সম্ভব না। কারণ সমাজে, বন্ধু বান্ধবের মাঝে আমার সঙ্গীর পরিচয় দিতে পারি না। বিয়ের সময় অন্ধ ছিল বলে মেয়ে বা ছেলেটা সুন্দর কি বিশ্রী তা চোখে ধরা পরেনি। বিয়ের কিছুদিন পর যখন আবেগ শেষ হয়ে যায় তখন ছেলে বা মেয়ের চোখে তার সঙ্গীকে আর ভাল লাগে না। সঙ্গীর জন্য আর কোন টান অনুভব করে না। তারপর যদি বন্ধু-বান্ধব তার সঙ্গীর চেহারা নিয়ে বা লম্বা-খাটো গঠন নিয়ে সমালেচনা করে তখন সঙ্গীর সঙ্গে মুহূর্তের জন্য থাকাটা কঠিন হয়ে পরে।
এমনিভাবে প্রেমের সময় ছেলে বা মেয়েটির বংশগত বা সমাজিক বা অর্থনৈতিক অবস্থান খুব একটা চোখে পরে না। বিয়ের পরে যখন আবেগের পর্দা সরে যায় এবং আসল চক্ষু দ্বারা দেখে যে তার পছন্দ-করা সঙ্গীটির সমাজিক বা বংশীয় অবস্থান নিয়ে মানুষ কটাক্ষ করে, তখন তার সে সঙ্গীর সঙ্গে একত্রে বাস করা কঠিন হয়ে যায়। যখন পরিচিতজন বলে, তোমার স্বামীর বাবা তো একজন রিকশাওয়ালা ছিল বা তোমার স্ত্রীর মা তো কাজের বুয়া ছিল। অথবা কোন পরিচিতজন যদি বলে যে, তোমার স্বামী বা স্ত্রীর মামা বা চাচা তো আমাদের অফিসের দারোয়ান বা পিয়ন ছিল তখন সে সঙ্গীর সঙ্গে একত্রে দিনাতিপাত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এমনিভাবে প্রেমের সময় ছেলেটির অর্থনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে খুব একটা জানা হয় না বা জানা যায় না। কারণ প্রেমের সময় বা কোথাও ঘুরতে যাওয়ার সময় ছেলেটা সাধারণত বন্ধুদের জামা বা বাইক ঋণ করে যায়। ফলে প্রেমের সময় ছেলে বা মেয়ের অর্থনৈতিক অবস্থান ভালোভাবে জানা যায় না। তবে বিয়ের পরে যখন দেখা যায় যে, মেয়েটি তার বাবার বাড়িতে থাকার সময় সবসময় শীতাতাপনিয়ন্ত্রিত রুমে এবং গাড়িতে চলাফেরা করত, এখন বিয়ের পর মেয়েটিকে সাধারণ বাসায় থাকতে হয়। সাধারণ পাবলিক বাসে চলাফেরা করতে হয়। এমন বাস্তবতার সম্মুখীন হলে মেয়েটির পক্ষে বেশি দিন এমন সংসার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমন মেয়ের পক্ষে ফ্যানের বাতাসে ঘুমানো কঠিন হয়ে যায়।  সাধারণ বাথরুম, সাধারণ রান্নাঘর এবং অল্প খরচে সংসার করা এমন মেয়ের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ভালোবাসা, আবেগ শেষ হয়ে গেলে এমন সংসার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এমনিভাবে রাসূল সা.-এর ভাষ্যমতে বিবাহ স্থায়ী হওয়ার চতুর্থ উপায় হল দ্বীন। সাধারণত প্রেম-ভালোবাসা তারাই করে যারা দ্বীনের ব্যাপারে উদাসীন থাকে। যার ফলে প্রেম-ভালোবাসার বিয়েগুলো স্থায়ী হয় না।
দ্বিতীয় কারণ : অভিনয় ও বাস্তবতা
বিয়ের আগে ভালোবাসা ও প্রেমের সময় ছেলে ও মেয়ে একে অপরের প্রতি খুব যতœশীল থাকে। ফোন করার আগেই বলে যে, আমি তোমার ফোনের অপেক্ষায় ছিলাম। মোবাইল রিচার্জের কথা বললেই ৫০০ টাকা রিচার্জ করে দেয়। কোন পছন্দের কথা বললেই তা হাজির করার জন্য জীবন বাজি রাখে। কিন্তু এই একই প্রেমিক যখন বিয়ে করে এবং তার আবেগের সমাপ্তি ঘটে তখন হাজার বার ফেন করলেও ফোন ধরার সময় থাকে না। বরং কেন বারবার ফোন করে সে জন্য বিরক্তি প্রকাশ করে। পছন্দের বিষয় তো দূরের কথা প্রয়োজনের বাজার করার মত অর্থ থাকে না। মনের চাহিদা পূরণ করা, কোথাও বেড়াতে যাওয়া তো দূরের কথা, মেয়েটির মা-বাবার সঙ্গে দেখা করার জন্য বেড়াতে যাওয়ার সময় থাকে না।  তখন মেয়ে বলতে থাকে যে, তুমি বিয়ের আগে তো আমাকে কত কেয়ার করতে আর এখন আমাকে পাত্তাই দাও না।
বরং আগের পাত্তা দেওয়া ও যতœ নেওয়া মূলত কিছু না। এমন আচরণই স্বাভাবিক আচরণ। আগে শুধু অভিনয় করত আর এখন অভিনয় করে না। বরং স্বাভাবিক আচরণ করে। এ কারণে বিয়ে যদি শুধু ভালোবাসা ও আবেগের ভিত্তিতে হয় তবে এ আবেগের বহিঃপ্রকাশ সব সময় একরকম থাকে না। আর তাই তখন সঙ্গীটি ভাবতে থাকে যে, আমি বাবা-মা, সামাজিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক অবস্থান বিসর্জন করে শুধুমাত্র ভালোবাসার টানে আসলাম আর এখন দেখছি সে ভালোবাসাও নেই, তবে কেন আমি এ সংসারে থাকব। আর তখনই এরকম প্রেম-ভালোবাসার সংসারের ইতি টানা শুরু হয়ে যায়।

অধিকার সচেতনতায় আদর্শ ও স্থায়ী বিবাহ হয়
আদর্শ এবং স্থায়ী বিয়ের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা নির্দেশনা দিয়েছেন : ‘তোমরা তাদেরকে (নারীদেরকে) তাদের অভিভাবকের অনুমতি সাপেক্ষে বিয়ে কর। আর তাদের স্বাভাবিক পাওনা পরিশোধ কর।’ নারীর স্বাভাবিক পাওনা হল : তার দেনমহর, তার জন্য উপযোগী বাসস্থান, অন্ন-বস্ত্রের ব্যবস্থা। অন্যস্থানে আল্লাহ তাআলা বলেন, তুমি যেখানে থাকবে সেখানে তাকে (স্ত্রীকে) তোমার সামর্থ্য অনুযায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করবে।২০ আর এভাবেই বিবাহ স্থায়ী হওয়া সম্ভব। স্ত্রীর পাওনা স্বামীকে পূরণ করা আবশ্যক কর্তব্য। এখন যদি কারো সে পাওনা দেয়ার সামর্থ্য না থাকে তবে সে বিবাহ করবে না।
হযরত ফাতেমা বিনতে কাইস রা. রাসূল সা.-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে দু’ জন বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। একজন হলেন আবু জাহম, অপরজন হলেন মুআবিয়া বিন আবু সুফিয়ান রা.। আমি এখন কী করব? রাসূল সা. তখন বললেন, আবু জাহম এমন একজন পুরুষ যে তার কাঁধ থেকে লাঠি সরায় না। অর্থাৎ, সে কখনো কখনো নারীদেরকে আঘাত করতে পারে। আর মুয়াবিয়া হল নিঃস্ব, তার ভরণপোষণ দেয়ার মত সামর্থ্য নেই। অতএব তুমি উসামা বিন জাইদকে বিয়ে কর। কিন্তুফাতেমা বিনতে কাইস হযরত উসামাকে পছন্দ করেন নি।২১

স্থায়ী বিয়ের অন্যতম উপায় হল ধর্মীয় পবিত্র সম্পর্ক
বিয়ে সাধারণত চারটা বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে হয়। তাই বলে কেউ যদি চারও বিষয় কোন মেয়ের মধ্যে তালাশ করে ও চারটির কোন একটি না পেলে বিয়ে না করার পণ করে তবে সে বিয়ে করতে পারবে না। অতএব বিয়ের সময় এ চারটি বিষয় দেখতে হবে। তবে তিনটি বিষয় – সৌন্দর্য, বংশ ও অর্থের ব্যাপারে ছাড় দিতে হবে। তবে শুধুমাত্র চতুর্থ বিষয় অর্থাৎ দ্বীনের ব্যাপারে কোন আপোস করা যাবে না। আর তাই রাসূল সা. বলেছেন, দ্বীনদারকে অগ্রাধিকার প্রদান কর। কারো মধ্যে সৌন্দর্য আছে তবে আশানুরূপ নয়, তবুও আপোস করতে হবে। বংশ আছে তবে চাহিদামাফিক নয় তবুও ছাড় দিতে হবে। অর্থ আছে চলার মত, কিন্তু আশানুরূপ নয় তারপরও আপোস করতে হবে। শুধুমাত্র দ্বীনের ব্যাপারে কোন ছাড় দেয়া যাবে না। কারণ ছেলে বা মেয়ে যদি ধার্মিক হয় তবে অর্থ, বংশ বা সৌন্দর্য আল্লাহর জন্য ছাড় দিতে পারবে। এ বিষয়গুলো মনমত না হলেও আখেরাতের আশায় ছাড় দিতে পারবে। সব মনমত না হলেও জুলম বা অন্যায়ের পথে পা বাড়াবে না।
হযরত হাসান রা. বলেন, তুমি এমন পুরুষের কাছে মেয়েকে বিবাহ দাও যে আল্লাহকে ভয় করে। কারণ সে যদি তাকে ভালোবাসে তবে তাকে সম্মান করবে আর যদি সে তাকে অপছন্দ করে তবে সে তাকে অপমান করবে না।২২ এবং সে নারীর প্রতি অবিচার করবে না। স্ত্রীর সকল পাওনা সে পূরণ করবে।
হযরত ফাতেমা বিনতে কাইসের হয়তবা হযরত উসামা রা.-এর অর্থ, বংশ বা সৌন্দর্য পছন্দ হয়নি। হযরত উসামা রা. সুন্দর ছিলেন না, উচ্চবংশীয় ছিলেন না। কারণ তার বাবা ছিলেন একজন মুক্ত-করা গোলাম। তারপরও রাসূল সা.-এর পরামর্শে হযরত ফাতেমা রা. হযরত উসামাকে বিয়ে করেন। আল্লাহ তাআলা তাদের দাম্পত্য জীবন সুখী করে দিয়েছিলেন।২৩
আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা নারীদেরকে বিবাহ কর তাদের পরিবারের সম্মতিতে এবং তাদেরকে নিয়ম অনুযায়ী মহর প্রদান কর এমতাবস্থায় যে, তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে- ব্যভিচারিণী কিংবা গোপন প্রণয়িনী হবে না।২৪ অর্থাৎ বিয়েটা অবশ্যই পবিত্র উপায়ে হতে হবে। এমন যেন না হয় যে, গোপনে অসৎ কাজ, কুকাজ, অসভ্য কাজ করা হল তারপরে পেটে সন্তান আসার ফলে বাধ্য হয়ে বিয়ে করা হল। অথবা বিয়ের আগে সঙ্গী সম্পর্কে বাস্তবিকভাবে জানতে হবে এবং ভালোবাসা ছাড়া বিয়ে হয় না তাই বিয়ের আগে প্রেম-ভালোবাসা করতে কবে। অথবা গোপনে সে সঙ্গীর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে থাকল। গোপনে প্রেম ভালোবাসার নামে আরো কত অসভ্য কাজ হয়ে গেল। আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে এ সকল কাজ সম্পর্ক থেকে নিষেধ করেছেন। কারণ বিবাহ হতে হবে পবিত্র উপায়ে এবং প্রকাশ্যে সকল মানুষের সামনে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হল পবিত্র সম্পর্ক।

পারিবারিক বন্ধন নষ্ট করতে পৃথিবীব্যাপী ষড়যন্ত্র
বর্তমানে সারা পৃথিবী মিলে ইসলামের সুন্দর সম্পর্ক ধ্বংস করার জন্য এবং আমাদের মুসলমানদের পারিবারিক শক্ত বন্ধনকে সমূলে শেষ করার জন্য সাঁড়াশি আক্রমণ চালাচ্ছে। পৃথিবীর সকল চ্যানেলের সকল নাটক, সকল সিনেমা, সকল কার্টুন, সকল অনুষ্ঠানের একটাই উদ্দেশ্য যে, কিভাবে নারী-পুরুষের সম্পর্ককে অবৈধ করা যায়। সকল চ্যানেলের একটাই শিক্ষা যে, বিয়ে-শাদি কখনো প্রেম-ভালোবাসা ছাড়া সার্থক নয়। অতএব সে অবৈধ প্রেম-ভালোবাসা কিভাবে করা যাবে, কিভাবে অন্য প্রেমিকের প্রেমিকাকে ছিনিয়ে আনা যাবে, কিভাবে অন্য স্বামীর স্ত্রীকে ভাগিয়ে আনা যাবে, এসকল অবৈধ প্রেমের কৌশল শিখানোই হল সকল নাটক-সিনেমার একমাত্র উদ্দেশ্য।
এভাবে পৃথিবীব্যাপী ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছে, কিভাবে আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে পবিত্র সম্পর্কের ব্যাপারে অনীহ করে তোলা যায়, কিভাবে আমাদের অটুট পারিবারিক বন্ধনকে ধ্বংস করা যায়, কিভাবে আগত প্রজন্মকে পিতা-মাতার প্রতি বীতশ্রদ্ধ ও অমানুষ করা যায়। এর কলাকৌশল শিখানোই সকল চ্যানেল ও আধুনিক পশ্চিমা সাংস্কৃতির মূল উপাদান। যে ছেলে মা-বাবার হাত থেকে মেয়েকে অপহরণ করতে পারে সে হল নায়ক। এ কারণে রাসূল সা. বলেছেন, যখন তোমার সন্তানগণ প্রাপ্তবয়স্ক হয় এবং পছন্দমত দ্বীনদার পাত্রপাত্রী পাও তবে বিয়ে দিয়ে দাও। আর যদি বিয়ে না দাও তবে বড় ফেতনা বা সামাজিক বিশৃংখলা হবে।২৫

সমাজকে পবিত্র রাখার উপায় হল দৃষ্টি অবনত রাখা
সমাজকে পবিত্র রাখা সকল মুসলমান নর ও নারীর কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, আপনি মুমিন পুরুষগণকে বলেন, তারা যেন তাদের চোখ অবনত করে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত রাখে। .. আপনি মুমিন নারীগণকে বলেন, তারা যেন তাদের চোখ অবনত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত রাখে।২৬ কারণ লজ্জাস্থান তখনই হেফাজতে রাখা সম্ভব হবে যখন চোখ হেফাজতে রাখা যাবে। রাসূল সা. বলেন, দৃষ্টি হল ইবলিস শয়তানের বিষাক্ত তীরসমূহের একটি তীর। যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে দৃষ্টি হেফাজত করে, আল্লাহ তাআলা তাকে এমন ঈমান দান করবেন যার স্বাদ সে তার অন্তরে অনুভব করবে।২৭ অর্থাৎ বিষাক্ত তীর যদি কোন শরীরে বিদ্ধ হয় তবে সে বিষ পুরো শরীরে ছড়িয়ে যাবে এবং সে শরীর বিষাক্ত হয়ে যাবে ও বিপদগ্রস্ত হবে। এমনিভাবে চোখ যখন কোন নারীর প্রতি কুদৃষ্টি প্রদান করে তখন পুরো শরীরের মধ্যে অন্যায় যৌনাসক্তির বিষ ছড়িয়ে পড়ে। তখন সে যুবকের মনের মধ্যে শুধু কুচিন্তা আর কুচিন্তা। এখন যদি সে সেই নারীকে পায় তবে তো ব্যভিচার। আর যদি না পায় তবে তো হতাশা। বর্তমানে অনেক খবর প্রকাশিত হয় যে, অনেক যুবক কোন নারীকে পছন্দ করেছে কিন্তু সে সে নারীকে পায়নি তাই আত্মহত্যা করেছে বা হতাশ হয়ে অকর্মণ্য হয়ে গেছে। এ কারণে আল্লাহ তাআলা বলেন, আপনি তাদেরকে চোখ অবনত রাখতে বলুন।২৮ কারণ চোখ অবনত রাখতে পারলে লজ্জাস্থান হেফাজত করাও সহজ।
রাসূল সা. বলেন, তিন চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। এক চোখ যেটা আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে। দ্বিতীয় হল সে চোখ যেটা আল্লাহর রাস্তায় পাহারায় জাগ্রত থেকেছে। আর তৃতীয় হল সে চোখ যে চোখ আল্লাহর নিষেধাবলি থেকে বিরত থেকেছে।২৯ অর্থাৎ যে চোখ এমন নারীর প্রতি দৃষ্টি দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে যে নারীর প্রতি তাকানো সে চোখের জন্য আল্লাহ তাআলা নিষিদ্ধ করেছেন।
যে মুসলিম কোন নারীর সৌন্দর্যের প্রতি দৃষ্টিপাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলার ভয়ে দৃষ্টি অবনত করে, আল্লাহ তাআলা তার অন্তরের মধ্যে সুখ প্রদান করেন।
রাসূল সা. বলেছেন, তিন ব্যক্তিকে সাহায্য করা আল্লাহর জন্য কর্তব্য বা ওয়াজিব : যে ব্যক্তি জিহাদে যেতে চায় তার সম্বল সংগ্রহের জন্য আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন। যে ব্যক্তি ঋণ পরিশোধ করার ইচ্ছা করে আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন। আর যে ব্যক্তি বিয়ে করার ইচ্ছা করে তাকে সাহায্য করা আল্লাহ তাআলার কর্তব্য হয়ে যায়।৩০

(টীকা)
১- কুরআন কারীম:২৪:৩২
২ – ইবনে মাজা:১৮৪৬, বুখারী শরীফ:১৯৪৯
৩-ইয়াহয়া উলূমুদ্দীন:১২৪৬
৪ -মুসলিস শরীফ:১৪০০
৫ -দারামী শরীফ:২১৬৪
৬ – নাসাই শরীফ:২০৫০
৭ – বাইহাকী শরীফ:৭:৭৮
৮ – তিরমিজী শরীফ:১০৮০
৯ – কুরআন কারীম:১৩:৩৮
১০ – বায়হাক্কী শরীফ:৫৪৮৬
১১ – তাবারনী শরীফ:৯৭৬
১২ – মুসনাদ আহমাদ:৪৫৩
১৩ – মুসলিম শরীফ:১০০২
১৪ – মুসতাদরাক হাকিম:২৭৪২,  তিরমিজী শরীফ:১০৮৪
১৫ – সহীহ ইবনে খুজাইমা :২২৬০
১৬ – ফাতহুল বারী :১৩:৯১
১৭ – বুখারী শরীফ:৪৮৩৪
১৮ – কুরআন কারীম:৪:২৫
১৯  – বুখারী শরীফ:৪৮০২
২০ – কুরআন কারীম:৬৫:৬
২১ – মুসলিম শরীফ:১৪৮০
২২ – ইবনে আবীদ দুনিয়া :১২১
২৩ – মুসলিম শরীফ:১৪৮০
২৪ – কুরআন কারীম:৪:২৫
২৫ – মুসতাদরাক হাকিম:২৭৪২,  তিরমিজী শরীফ:১০৮৪
২৬ – কুরআন কারীম:২৪:৩০-৩১
২৭ – মুসতাদরাক হাকিম:৭৮৭৫
২৮ – কুরআন কারীম:২৪:৩০
২৯ – মুসতাদরাক হাকিম:৯৮৮
৩০ -তিরমিজী শরীফ:১৬৫৫

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight