বান্দার হক আদায়ে নেকি বদির লেনদেনসংকলনে : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

সহজ হিসাবহযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, একদা রাসুলুল্লাহ সা. নামাযের মধ্যে দু’আ করছিলেন- ‘হে আল্লাহ আমার সহজ হিসাব নিও।’ আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সা. ‘সহজ হিসাব’ কথার উদ্দেশ্য কি? হুযুর সা. এরশাদ করেন, আমলনামার মধ্যে শুধু নজর বুলিয়ে নেয়া (ভালভাবে পর্যবেক্ষণ না করা)। যার হিসাব ভালভাবে নেয়া হবে সে ধ্বংস হবে। [মুসনাদে আহমদ]
কঠিন হিসাব
হযরত আয়েশা রা. আরো বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সা. এরশাদ করেছেন, কেয়ামতের দিন যার থেকে (সঠিক) হিসাব নেয়া হবে, সে ধ্বংসের মুখে পড়বে। এটা শুনে আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সা. আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন- “যার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হয়েছে তার থেকে শিগগিরই সহজ হিসাব নেয়া হবে। এ দ্বারা বুঝা যায়, কিছু হিসাবদানকারী এমনও হবে যারা নাজাত পেয়ে যাবে। হুযুর সা. এ পশ্নের জওয়াবে বলেন, সহজ হিসাবের অর্থ নিজে হিসাব দিবে, পর্যবেক্ষণ করে হিসাব নেয়া হবে না; বরং সহজ হিসাব দ্বারা উদ্দেশ্য, বান্দার সামনে শুধু আমলনামা পেশ করেই ছেড়ে দেয়া হবে, কিন্তু যার হিসাব পুরোপুরিভাবে নেয়া হবে সে তো ধ্বংসের মুখে পতিত হবে। [বুখারি, মুসলিম]
মোমিনের উপর আল্লাহর খাস রহমত
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, নিশ্চয়ই কেয়ামতের দিন আল্লাহ পাক মোমিনকে তার নিকটবর্তী করবেন এবং (হাশরের ময়দানে লোকদের না শুনিয়ে) বলবেন, তোমার অমুক গুনাহের কথা স্মরণ আছে? তোমার অমুক গুনাহের কথা মনে আছে? সে জওয়াবে আরজ করবে, হ্যাঁ, ইয়া আল্লাহ, মনে আছে। আল্লাহ তাআলা তার থেকে স্বীকারোক্তি নিবেন। আর বান্দার মনে এই বিশ্বাস হবে, আমি ধ্বংস হয়ে গেছি। (তখন) আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি দুনিয়াতে তোমার গুনাহ গোপন করেছি, প্রকাশ হতে দেইনি। আর এখন আমি তোমাকে পুরস্কার দিচ্ছি। এরপর তার নেকির আমলনামা তাকে দান করা হবে, কিন্তু কাফের এবং মুনাফেকদের অপমানিত করা হবে। সব  মাখলুকের সামনে ডেকে বলা হবে, এরা সেসব লোক, যারা স্বীয় রŸের ব্যাপারে মিথ্যা বলতো সাবধান,
আল্লাহর লা’নত জালেমদের উপর।
কোন মাধ্যম এবং পর্দা ব্যতীত আল্লাহর কাছে জওয়াব দিতে হবে।
হযরত আদী বিন হাতেম রা. বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সা. এরশাদ করেছেন, তোমাদের মধ্যে এমন কেউই হবে না যার রব (হিসাব নিতে) তার সাথে কথা বলবেন না। এ সময় বান্দা এবং তার রবের মাঝে কোন প্রকার মাধ্যম বা পর্দা থাকবে না। সে সময় বান্দা তার ডান দিকে তাকালে নিজ আমল ব্যতীত আর কিছুই দেখবে না এবং বাম দিকে তাকালে যা পূর্বে (দুনিয়া থেকে) পঠিয়েছিল তা দেখবে। আর সামনের দিকে তাকালে জাহান্নামের দিকেই দৃষ্টি পড়বে। এরপর হুযুর সা. এরশাদ করেন, অতএব তোমরা জাহান্নাম থেকে বাঁচ যদি এক টুকরা খেজুর (আল্লাহর রাস্তায়) দান করেও হয়। [বুখারি ও মুসলিম]
কারো উপর অবিচার হবে না, তিল পরিমাণ ভাল মন্দও বিদ্যমান থাকবে
কুরআন শরিফে এরশাদ হয়েছে-
সে দিন কারো উপর জুলুম করা হবে না, আর তোমাদের ততটুকুই বদলা দেয়া হবে যা তোমরা করেছ। আরও এরশাদ হয়েছে-
যে ব্যক্তি দুনিয়াতে অণু পরিমাণ নেকি করেছে সে (সেখানে) তা দেখতে পাবে, আর যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ বদি করেছে সেও (সেখানে) তাও দেখতে পাবে।
সুরা মোমিনে এরশাদ হয়েছে- “আজ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কাজের বদলা দেয়া হবে। আজকের দিনে কারো উপর জুলুম করা হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।

হুকুকুল এবাদ তথা বান্দার হক
কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার ‘হক’ (নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি)-এর হিসাব তো নেয়া হবেই, তার সাথে বান্দার হকের হিসাবও নেয়া হবে। দুনিয়াতে যদি কারো হক মেরে থাকে, জুলুম করে থাকে অথবা অন্যায়ভাবে জোর খাটিয়ে থাকে, তার হিসাব ও ফয়সালা কেয়ামতের দিন হবে।
বুযুর্গ লোকেরা বলেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ পাকের হক নষ্টকারী হওয়া যতখানি বিপজ্জনক, তার চেয়ে বেশি বিপজ্জনক হল কোন বান্দার উপর জুলুম-অত্যাচারকারী হওয়া, কারো হক নষ্টকারী হওয়া। কেননা, আল্লাহ পাক মহা দয়ালু, তিনি তাঁর হক নষ্টকারী অপরাধীকে মাফ করে দিতে পারেন, কিন্তু বান্দা থেকে এ রকম আশাই করা যায় না। কারণ সেদিন বান্দার নেকির অনেক অনেক প্রয়োজন হবে এবং এক এক নেকি দ্বারা হয়তো নাজাতেরই ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তাই বান্দা সেদিন তার হক ছেড়ে দিবে না। আর এরকম আশাও করা যায় না, সেদিন বান্দার নিকট কোন ধন-সম্পদ থাকবেনা। কাজেই নেকি দ্বারা অন্যের বিনিময় আদায় করতে হবে। হক এমনভাবে আদায় করা হবে যে, জানোয়ারেরাও একে অপরের উপর যে জুলুম করেছে তারও বদলা নেয়া হবে।
নেকি এবং বদি দ্বারা লেনদেন হবে
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি তার কোন ভাইয়ের উপর জুলুম করেছে, মনে কষ্ট দিয়েছে, কোন ক্ষতি করেছে, তার উচিত (হক আদায় করে মাফ চেয়ে) সেদিন আসার পূর্বেই সমঝোতা করে নেয়া, যেদিন কোন দেরহাম দীনার থাকবে না। অতঃপর এরশাদ করেন, যদি তার (জালেমের) নেক আমল থাকে তাহলে জুলুম অনুপাতে (মজলুমকে) তা দিয়ে দেয়া হবে। আর যদি নেক আমল না থাকে তাহলে মজলুমের বদ আমলগুলো জালেমের মাথায় চাপিয়ে দেয়া হবে। [বুখারি শরিফ]
কেয়ামতের দিন সবচেয়ে বড় নিঃস্ব
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, একদা নবী করিম সা. সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা জান, সবচেয়ে বড় নিঃস্ব কে? সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, আমরা তো এমন লোককেই নিঃস্ব মনে করি, যার ধন-সম্পদ কিছুই নেই। হুযুর সা. এরশাদ করেন, আমার উম্মতের মধ্যে (প্রকৃত) নিঃস্ব সে ব্যক্তি, যে কেয়াতের দিন নামায, রোযা ও যাকাত নিয়ে আসবে। তার নামায, রোযা, যাকাত সবই ঠিক থাকবে, তা সত্ত্বেও সে এ অবস্থায় হাশরের ময়দানে উপস্থিত হবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে অথবা কারো হক অন্যায়ভাবে নষ্ট করেছে, কারো উপর অপবাদ দিয়েছে, অন্যায়ভাবে কারো মাল খেয়েছে অথবা কারো রক্ত ঝরিয়েছে, অন্যায়ভাবে কাউকে মারপিট করেছে যেহেতু কেয়ামতের দিন সঠিক ফয়সালা এবং ইনসাফ কায়েম হবে, এজন্য তার ফায়সালা এভাবে করা হবে, সে যাদের উপর জুলুম করেছে, হক নষ্ট করেছে, গালি দিয়েছে, তাদের সবাইকে তার নেক আমলসমূহ ভাগ করে দেয়া হবে। কিছু নেকি একে, কিছু ওকে দেয়া হবে। এভাবে তার সব নেকিই পাওনাদারদের ভাগ করে দেয়া হবে। এরপরও যদি কারো হক আদায় না হওয়ার আগেই তার নেকি শেষ হয়ে যায়, তাহলে অবশিষ্ট হকদারদের গুনাহসমূহ তার মাথায় চাপিয়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। [মুসলিম শরিফ]
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উনাইস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ পাক তার বান্দাদের সবাইকে একত্রিত করবেন, যারা হবে বস্ত্রহীন, খতনাবিহীন এবং খালি হাত। অতঃপর এমন আওয়াজে তাদের ডাকা হবে, যে দূরে থাকবে সে কাছে থেকে শুনার মত শুনতে পাবে। সে সময় বলা হবে, আজ কোন জাহান্নামি ততক্ষণ পর্যন্ত জাহান্নামে যেতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত সামান্য অধিকার আদায় না করা হবে, যা কোন  জান্নাতির উপর রয়েছে। আর কোন জান্নাতিও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যার সামান্য হকও কোন জাহান্নামির উপর রয়েছে। এমনকি যদি কাউকে অন্যায়ভাবে একটি থাপ্পড়ও মারা হয়, তারও বদলা নেয়া হবে।
বর্ণনাকারী সাহাবি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সা. কে জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ সা. বদলা কিভাবে নেয়া হবে? তখন তো আমরা থাকব বস্ত্রহীন, উলঙ্গ এবং খালি হাতে? জওয়াবে রাসুলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, নেকি বদি লেনদেনের মাধ্যমে বদলা নেয়া হবে। [মুসনাদে আহমাদ]
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, যে তার কেনা গোলামকেও অন্যায়ভাবে একটি চাবুক মারবে, কেয়ামতের দিন তারও বদলা নেয়া হবে। [তারগিব ওয়া তারহিব]
পিতা মাতাও হক ছাড়তে রাজি হবে না
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, যদি পিতা-মাতা তাদের সন্তানের উপর কোন হক পাওনা থাকে, তাহলে কেয়ামতের দিন তারাও সন্তান থেকে সে পাওনা চাইবে। তখন সন্তান বলবে, আমি তো তোমাদের সন্তান। তারা তার এ জওয়াবে ভ্রুক্ষেপ করবে না; বরং পাওনা আদায়ের জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকবে। আক্ষেপ করবে, হায়! আমরা যা পাওনা আছি যদি এর চেয়ে বেশি পাওনা থাকতাম।

প্রথম বাদী এবং বিবাদী
হযরত ওকবা বিন আমের রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বাদী হবে দুই প্রতিবেশী। [মুসনাদে আহমাদ]
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক।

3 মন্তব্য রয়েছেঃ বান্দার হক আদায়ে নেকি বদির লেনদেনসংকলনে : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

  1. হাবিব উল্লাহ says:

    আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হোফাজত করুণ। আমিন।।

  2. খুরশেদ আলম says:

    হে আল্লাহ আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রা করুন। আমাদের জন্য কিয়ামতের দিনের হিসাব সহজ করে দিন। হে আল্লাহ এই দুনিয়ায় আপনার সকল হুকুম আহকাম মানতে পারি সেই তাওফিক দান করুন। আমিন।।

  3. হুসাইন আহমেদ says:

    আমরা সকলেই যেন জাহান্নামের আযাব থেকে রা পেতে পারি। হাশরের দিন বিনা হিসাবে জান্নাতে যাওয়ারমত আমল যেন আমরা করতে পার্।ি মহান আল্লাহ আমাদেরকে সেই তাওফিক দান করুন। আমিন।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight