বান্দার আমলের ওজন : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

এক বান্দার আমলের ওজন
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, নিশ্চয়ই কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা সমস্ত মাখলুকের সামনে পুরো উপস্থিতি থেকে আমার এক উম্মতকে আলাদা করবেন। তার সামনে নিরানব্বইটি দফতর খুলে দেয়া হবে। প্রত্যেকটি দফতর এমন হবে যার পরিধি দৃষ্টিসীমার বাইরে থাকবে (এ সবগুলো দফতরই গুনাহের হবে)। এরপর আল্লাহ পাক তাকে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি এ আমলগুলো থেকে কোনটা অস্বীকার কর? আমার (নিয়োগকৃত) আমল লেখক ফেরেশতা কি তোমার উপর জুলুম করেছে? (কোন গুনাহ বেশি লেখেছে?) সে বলবে, না (অস্বীকারও নয় জুলুমের দাবিও নায়)। আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞাসা করবেন, তোমার কাছে কি এ বদআমল (গুনাহ)-এর কোন ওজর আছে? সে আরজ করবে, হে পরওয়ারদেগার! আমার কোন ওজর নেই। এরপর মহান আল্লাহ পাক বলবেন, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই তোমার একটি নেকি আমার নিকট সংরক্ষিত আছে (সেটাও তোমার সামনে আসছে)। তারপর একটি কাগজ বের করা হবে যার মধ্যে লেখা থাকবে-

এরপর তাকে বলা হবে, যাও তোমার আমল ওজন করা হচ্ছে, দেখে নাও।সে বান্দা আরজ করবে ওজনে তো আমার ধ্বংস অনিবার্য। কেননা, ওই বড় বড় দফতরগুলোর উপস্থিতিতে এ কাগজের কি মূল্য আছে? আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলবেন, বিশ্বাস কর, তোমার উপর জুলুম করা হবে না। সুতরাং সমস্ত (গুনাহের) দফতর পাল্লার এক পাশে হবে আর সেই কাগজ অন্য পাশে রাখা হবে। (ওজনের ফল হবে,) সে সমস্ত (গুনাহের) দফতর হালকা হয়ে যাবে, আর কাগজের ওজন ভারী হবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, আসল কথা হল, আল্লাহর নামের উপস্থিতিতে অন্য কোন কিছুই ভারী হতে পারবে না। [তিরমিযি, ইবনে মাজাহ]
এটা এখলাস, আন্তরিকতা, একাগ্রতা ও মহব্বতের সাথে আল্লাহর নাম পড়ার বরকত। আল্লাহর নাম নেয়া সে সময়ই নেকির কাজ হয়, যখন কেউ তা খালেস নিয়তে পড়ে। কেননা কাফেররাও বিভিন্ন সময় আল্লাহ পাকের কালেমা পড়ে, কিন্তু তাদের এই কালেমা পড়া শুধু মুখেই থাকে। আখেরাতে এটা কোন কাজে আসবেনা, নাজাতের উপায়ও হবে না। যদি ঈমান থাকে এবং এখলাসের সাথে পড়ে তাহলে তার ওজন ভারী হয়।
সবচেয়ে ভারী আমল
হযরত আবু দারদা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা.  এরশাদ করেন, নিশ্চয়ই কেয়ামতের দিন পাল্লার মধ্যে মোমিনের সবচেয়ে ভারী আমল হবে আখলাক (উত্তম চরিত্র)। এরপর এরশাদ করেন, নিঃসন্দেহে আল্লাহ পাক অশ্লিল এবং নির্লজ্জদের উপর রাগান্বিত থাকেন। [মেশকাত শরীফ]
কাফেরদের নেকি হবে ওজনহীন
সূরা কাহাফের শেষ রুকুতে এরশাদ হয়েছে- (হে   নবী) আপনি বলে দিন, আমি কি তোমাদের এমন লোকদের কথা বলব যারা আমলের দিক থেকে বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত? তারা হল সেসব লোক যাদের দুনিয়ার সমস্ত আমলই নিষ্ফল হয়ে গেছে, অথচ তারা ভাবছে তারা খুব ভাল কাজ করে যাচ্ছে। এরা হল তারা যারা তাদের পরওয়ারদেগারের আয়াতসমূহ এবং তাঁর সাথে সাক্ষাৎ অস্বীকার করেছে। সে কারণেই তাদের সমস্ত আমলই বরবাদ হয়ে গেছে। তাই রোজ কেয়ামতে আমি তাদের জন্য কোন ওজন বা দাঁড়িপাল্লার ব্যবস্থা করব না।
প্রকৃতপক্ষে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত তারাই হবে যারা বছরের পর বছর দুনিয়াতে অতিবাহিত করেছে, কষ্ট ক্লেশ করে দুনিয়া কামিয়েছে, আনন্দ ফূর্তি করেছে, আর তাদের এ বিশ্বাস ছিল, তারা সফলকাম হয়েছ। হাজার থেকে লাখপতি, লাখ থেকে কোটিপতি হয়েছে। মেম্বার হয়েছে, মেম্বার থেকে  চেয়ারম্যান, চেয়ারম্যান থেকে এমপি-মন্ত্রী ইত্যাদি উচ্চ থেকে উচ্চ পদে আসীন হয়েছে। এভাবেই জীবন অতিবাহিত করেছে। আল্লাহর কথা মানেনি। তাঁর আদেশ অস্বীকার করেছে। ‘কেয়ামত দিবসে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে’ এ চির সত্যকে মিথ্যা বলেছে। মৃত্যুর পরে কি হবে তা কখনো চিন্তা না করে দুনিয়ার কামিয়াবির পিছনে লেগে থেকেছে এবং দুনিয়াকেই প্রাধান্য দিয়েছে। তাদের পুরো জীবনের আমলই যখন দুনিয়ার জন্য হবে, তখন তার এ আমলের ওজনই আর কি হবে। কোন ওজনই হবে না, যার কারণে তাদের জাহান্নামেই যেতে হবে। আর সে সময় তারা দেখতে পাবে প্রকৃত সফলতা কিসে ছিল।
ইহুদি নাসারারা তাদের খেয়ালে দুনিয়াতে যে সকল নেক কাজ করে, যেমন জনসাধারণের জন্য পানি পানের ব্যবস্থা করে, অসহায়দের সাহায্য করে, আল্লাহর নামের সম্মান করে, ইত্যাদি এর বিনিময়েও তারা আখেরাতে নাজাত পাবে না। সাধু, পাদ্রী, যারা বড় সাধনা মুজাহাদা করে নফসকে দমিয়ে রাখে, ইহুদি নাসারাদের রাহেব এবং পাদ্রী যারা নেক উদ্দেশে বিবাহ বর্জন করে, ইত্যাদি সকল আমল-সাধনাই কেয়ামতের দিন কোন কাজে আসবে না শুধু কুফররি কারণে। কাফেরদের নেক কাজসমূহ মৃতের মত। তারা কেয়ামতের দিন খালি হাতেই উপস্থিত হবে।
সূরা ইবরাহীমে এরশাদ হয়েছে- সেই কাফেররা যারা তাদের নাজাতের ব্যাপারে এ খেয়াল করে যে আমাদের আমল আমাদের উপকৃত করবে, তাদের ব্যাপারে শুনে নিন, যে সমস্ত লোক স্বীয় পরওয়ারদেগারের সাথে কুফরী করে, তাদের অবস্থা (আমল) এরূপ, যেমন কিছু ছাই প্রচণ্ড ঝড়ের সময় রেখে দেয়া হল আর তা বাতাস উড়িয়ে নিয়ে গেল (এ ঝড়ের পরে কি সেই ছাই আর পাওয়া যাবে? তার নাম নিশানাও থাকবে না), ঠিক এমনিভাবেই তারা যে আমল করেছে তার কিছুই বাকি থাকবে না, বরং ছাইয়েরমত বরবাদ হয়ে যাবে। শুধুমাত্র গুনাহগুলোই থাকবে। কেয়ামতের দিন সেগুলো নিয়েই তারা উঠবে, এটা বড়ই গোমরাহি। তারা ধারণা করতো, তাদের আমল কাজে আসবে, কিন্তু তাদের আমল কোন কাজেই আসবে না। [বয়ানুল কুরআন]
তাফসীরে মাযহারিতে-                      লেখা হয়েছে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলার নিকট কাফেরদের কোন আমলেরই গুরুত্ব এবং মূল্যায়ন হবে না। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, কেয়ামতের দিন মর্যাদা এবং ওজনে মোটা-তাজা ভারী কত লোককে উপস্থিত করা হবে, যাদের ওজন আল্লাহর নিকট মশার ডানার সমানও হবে না। এরপর হুযূর সা. বলেন, যদি তোমরা চাও তাহলে এ আয়াত পড়-                           তারপর তাফসীরে মাযহারির প্রণেতা এ আয়াতের আরেক তাফসীর করে বলেন, এ আয়াতের অর্থ হল কাফেরদের জন্য পাল্লারই ব্যবস্থা করা হবে না, ওজন করা তো পরের কথা। কেননা, সেখানে তাদের নেক আমলে কোন মূল্যই হবে না। তাই তাদের সরাসরি জাহান্নামেই নিক্ষেপ করা হবে। আয়াতের তৃতীয় তাফসীর হল, কাফেররা তাদের যে আমলকে নেক আমল মনে করে, তার কোন ওজনই কেয়ামতের দিন হবে না। কেননা সেই নেক আমলেরই ওজন হবে, যার সাথে ঈমান এবং এখলাস থাকবে।
এরপর তাফসীরে মাযহারি প্রণেতা আল্লামা সুয়ূতি রহ.-এর অভিমত উদ্ধৃত করে বলেছেন, আহলে এলেম এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। কোন কোন আলেম বলেন, কাফেরদের আমল ওজন করা হবে না, শুধু মোমিনদের আমলই ওজন করা হবে। কেননা, কাফেরদের নেক আমল করার সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায়। যখন ওজন করার জন্য কিছুই থাকবে না তখন তা পাল্লায় ওজনই বা কিভাবে করা হবে। তাদের দলীল হল-
আয়াত। কোন কোন আলেম বলেন, কাফেরদের আমলও পাল্লায় উঠানো হবে, তবে তা ওজনহীন (হালকা) হবে। তাঁদের দলীল হল- ‘আর যাদের ওজন হালকা হবে তারা নিজেদেরই ক্ষতিসাধন করবে, তারা চিরকাল জাহান্নামেই থাকবে।’ [মুমিনূন : ১০৩] আল্লাহ পাক ‘তারা সেখানে চিরকাল থাকবে’ হালকা ওজনওয়ালাদের সম্পর্কেই বলেছেন। এর দ্বারা বুঝা যায়, কাফেরদের আমলও পাল্লায় উঠানো হবে। কেননা এ বিষয়ে সবাই একমত, মোমিনরা চিরদিন জাহান্নামে থাকবে না।
তাফসীরে কুরতুবি প্রণেতা আল্লামা কুরতুবি রহ. বলেন, প্রত্যেক ব্যক্তিরই আমল ওজন করা হবে (তবে তার ব্যাখ্যা আছে)। কেউ কেউ হাশরের ময়দান থেকে বিনা হিসাবেই জান্নাতে যাবে এবং কেউ কেউ জাহান্নামে যাবে। এ দুই দলের আমল ওজন করা হবে না। এছাড়া প্রত্যেক মোমিন এবং কাফেরের আমলই ওজন করা হবে। তাফসীরে মাযহারিতে বর্ণিত আলেমদের ভিন্ন ভিন্ন মতামত প্রকৃতপক্ষে একই হয়ে যায়।
হযরত হাকীমূল উম্মত আশরাফ আলী থানভী রহ. তাঁর প্রণীত তাফসীর গ্রন্থ বয়ানুল কুরআনে সূরা আরাফের ভূমিকায় লেখেন, পাল্লায় ঈমান এবং কুফরি ওজন করা হবে। পাল্লার এক পাশে খালি থাকবে, অন্য পাশে যদি সে মোমিন হয় তাহলে ঈমান, যদি কাফের হয় কুফরি রাখা হবে। যখন এই ওজন দ্বারা মোমিন এবং কাফের পৃথক হয়ে যাবে, তখন শুধু এক পাল্লায় মোমিনদের নেক কাজ এবং অন্য পাল্লায় বদ কাজ রেখে ওজন করা হবে। যেমন তাফসীরে দুররে মানসূরে রয়েছে, হযরত ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, যদি নেক আমলের পাল্লা ভারী হয় তাহলে জান্নাত, আর যদি বদ আমলের পাল্লা ভারী হয়ে তাহলে জাহান্নাম। আর যদি নেক এবং বদ উভয়টা সমান সমান হয় তাহলে আরাফ নির্বাচিত হবে। তারঃপর শাফায়াতের পূর্বে শাস্তি অথবা শাস্তির পর মাফ হয়ে যাবে এবং যারা জাহান্নামে যাওয়ার তারা জাহান্নামে এবং আরাফবাসীরা জান্নাতে প্রবেশ করবে।
সমাপ্ত

5 মন্তব্য রয়েছেঃ বান্দার আমলের ওজন : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

  1. ইছমাঈল হোসাইন ছানি says:

    সম্মানিতা লেখকে ধন্যবাদ দিয়ে ছুটই করা হবে। আমি তাকে ধন্যবাদ নাদিয়ে তার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি, হে আল্লাহ! লেখিকা যেন এই আখেরি যামানায়, মানব জাতীর এই ইসলামিক অধপতনের সময়; ইসলামের কান্ডারী হতে পারেন। লেখিকার এই লেখাটি পড়ে আমি আমার মধ্যে এক বিশাল পরিবর্তনের তাগিদ পেয়েছি, আমল আখলাকের প্রতি আমার যে আরো যন্তবান হতে হবে তা অনুভব করতে পেরেছি। এমনি ভাবে আরো সকল মানুষ যেন উপকৃত হতে পারে, ইসলামের হুকুম-আহকাম সম্পর্কে আরো সচেতন হতে পারে। হে আল্লাহ! সম্মানিতা লেখিকাকে সেই ভাবে বেপক খেদমতের সুযুগ দান করুন।

    হে আল্লাহ! কেয়ামতের দিন আমাদের সকল নেক আমলের ওজন অনেক বেশি ভারি করে দিও। হে আল্লাহ! আমাদের গুনাহগুলো মাফ করে দিও। হে আল্লাহ তুমিত ক্ষমাশীল, এবং ক্ষমাকে তুমি পছন্দ কর, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমীন।

  2. জাসিম উদ্দিন says:

    লেখাটি থেকে অনেক উপকার পেলাম। লেখককে ধন্যবাদ।

  3. তানজিমুল ইসলাম says:

    লেখাটি অনেক ভাল।

  4. nurul absar says:

    আপনাদের কাছ থেকে নামাযের ফরয ১৪ ঠির দলিল সহ জানতে চাই

  5. amina khatun says:

    হে খোদা, হে ক্ষমাশীল, হে রাহমানুর রাহীম—
    দুনিায়ার সমস্ত কাফেরদের ঈমান দাও,আমাকে, আমার সন্তানদের,আমার প্রতিবেশীদের,আমার আত্মীয়দেরকে বেশী বেশী নেক আমল করার তৌফিকদান কর আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight