বান্দার আমলের ওজন : সংকলন : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন

al-jannatbd.com, আল জান্নাত । মাসিক ইসলামি ম্যাগাজিন, al-jannatbd.com, quraner alo, মাসিক জান্নাত, islamer alo, www.al-jannatbd.com, al-jannat, bangla islamic magazine, bd islam, islamic magazine bd, ব্লগে জান্নাত, জান্নাতের পথ, আল জান্নাত,

আল্লাহর রহমতে মাফ করা হবে
হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, কস্মিনকালেও কেউ আল্লাহর রহমত ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনিও কি আল্লাহর রহমত ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করতে পাররবেন না? জওয়াবে রাসূলুল্লাহ সা. হাত মাথায় রেখে বলেন, আল্লাহ তাআলা স্বীয় রহমত দ্বারা আমাকে ঢেকে না নিলে আমিও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারব না। [আততারগীব ওয়াত তারহীব]
এ হাদীস দ্বারা আমলে সালেহকারী, বিশেষ করে আবেদ, জাহেদ এবং জাকেরীন ও মুজাহীদদের সতর্ক করা হয়েছে। যারা সর্বদা ভাল এবং নেক কাজে ব্যস্ত থাকেন, তারা যেন মনে না করেন, আমরা বেহেশতের হকদার, অবশ্যই আমরা বেহেশতে যাব। তাদের উচিৎ নিজেদের আমল সম্পর্কে চিন্তা করা এবং নিজেদের আমলকে খুবই সামান্য মনে করা। আর এ ভয় করা, হয়তো আমাদের আমল কবুল হবে না। যদি আল্লাহ পাক কবুলই না করেন তাহলে তাঁর উপর কি কোন জবরদস্তি চলবে? আমাদের নেক আমল কবুল করা এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো সম্পূর্ণই তাঁর রহমত।
যদি সারা জীবন এবাদত করা হয় তাহলেও আল্লাহ পাকের ছোট কোন নেয়ামতের বিনিময় হবে না (যেমন নেয়ামত সম্পর্কে  পূূর্বে হাদীস বর্ণনা করাহয়েছে)। রাসূলুল্লাহ সা. যখন বলেন, আল্লাহর রহমত ব্যতীত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, তখন সাহাবায়ে কেরামের মনে এ প্রশ্ন জাগল, রাসূলুল্লাহ সা. তো আল্লাহ পাকের সব হুকুম পুরাপুরি মেনে চলেন, কঠিন মেহনত, মুজাহাদা করেন, এবাদত-বন্দেগি এবং তাবলীগের কারণে তার কোন আমলে বিন্দু পরিমাণও কোনো ক্রটি নেই। তাই সাহাবায়ে কেরাম হুযূর সা.-এর নিকট আরজ করলেন, আপনি আমলের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেন কিনা? তখন তিনি স্পষ্টভাবে বলে দেন, আমিও আল্লাহর রহমতের মুখাপেক্ষী। তাঁর রহমত ব্যতীত আমিও জান্নাতে যেতে পারব না। আমিও তো আল্লাহর বান্দা, তাহলে আমি কেন আল্লাহর রহমতের মুখাপেক্ষী হব না।
সাহাবায়ে কেরামের উপর আল্লাহর রহমতের বৃষ্টি বর্ষিত হতে থাকুক, যাঁরা ভালভাবে দীনকে বুঝে নিয়েছেন এবং পরবর্তীতে আগমনকারীদের ভালভাবে দীন বুঝার জন্য রাসূলুল্লাহ সা. এর হাদীসের ভাণ্ডার বর্ণনা করে গেছেন।
যে সব লোক, রাসূলুল্লাহ সা. কে আল্লাহর ক্ষমতা অর্পণ করে বলেন, তাই যা নেয়ার সব মুহাম্মদ সা. থেকে নাও। তারা যেন উল্লিখিত হাদীস শরীফ খুব ভালভাবে পড়েন এবং চিন্তা করেন।
সবাই লজ্জিত হবে
হযরত মুহাম্মদ ইবনে আবু ওমায়ের রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, নিঃসন্দেহে কোন ব্যক্তি যদি জন্মথেকে মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহর আনুগত্যে সেজদায় পড়ে থাকে, তাহলে সেও (কেয়ামতের দিন তার সকল আমল তুচ্ছ মনে করে) আকাক্সক্ষা করবে, তাকে পুনরায় দুনিয়াতে পাঠিয়ে দেয়া হোক, যাতে করে সে আরো বেশি সওয়াব এবং নেকী অর্জন করতে পারে। [আহমদ]
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে যারই মৃত্যু হবে সে অবশ্যই লজ্জিত হবে। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সা. কোন বিষয়ে লজ্জিত হবে। বললেন, যদি নেক আমলকারী হয় তাহলে এই চিন্তা করে লজ্জিত হবে, যদি আরো বেশি নেক আমল করে আসতাম তাহলে কতই না ভাল হত? আর যদি বদ আমলকারী হয় তাহলে আফসোস করবে, হায়, আমি যদি আমার জীবনকে খারাপ কাজ থেকে বাঁচিয়ে রাখতাম। [তিরমিযী শরীফ]
শাফাআত
কেয়ামত দিবসে আল্লাহ পাক শাফাআত (সুপারিশ) ও কবুল করবেন। এ দ্বারা ঈমানদারগণ খুবই উপকৃত হবেন। রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, কোয়ামতের দিন তিনটি দল শাফাআত করবে-
১. আম্বিয়ায়ে কেরাম আ., ২. ওলামায়ে কেরাম, ৩. শহীদগণ।
তবে আল্লাহ পাক যাকে শাফাআতের অনুমতি দান করবেন তিনিই শাফাআত করতে পারবেন। কুরআন কারীমে এরশাদ হয়েছে- “কে আছে যে আল্লাহ পাকের দরবারে সুপারিশ করবে তার অনুমতি ব্যতীত।”
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন- “সেদিন তাঁর সমীপে সুপারিশ কোন উপাকারে আসবে না, কিন্তু সে লোকের (উপাকারে আসবে) যার জন্য আল্লাহ পাক অনুমতি দান করবেন এবং তার জন্য বলা পছন্দনীয় হবে।”
যাকে আল্লাহ পাক শাফাআতের অনুমতি দান করবেন, সে-ই শাফাআত করতে পারবে এবং যার জন্য শাফাআতের অনুমতি দেয়া হবে তার জন্যই শাফাআত করা যাবে। কাফেরদের শাফাআতের অনুমতি দেয়া হবে না এবং তাদের এমন বন্ধু থাকবে না যে তাদের জন্য শাফাআতের সুপারিশ করবে।
আল্লাহ পাক এরশাদ করেন- “জালেমদের জন্য কোন বন্ধুও হবে না এবং এমন কোন সুপারিশকারীও হবে না, যার সুপারিশ কবুল করা যায়।
মেশকাত শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ মেরকাতে লিপিবদ্ধ হয়েছে, কেয়ামতের দিন পাঁচভাবে সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।
প্রথম : সুপারিশ হাশরের ময়দানে সকলে উপস্থিত হওয়ার পর হিসাব শুরু করার জন্য। সকল আম্বিয়ায়ে কেরাম সুপারিশ করতে অস্বীকার করার পর হযরত মুহাম্মদ সা. পূর্বাপর সকল মুসলমান এবং কাফেরদের জন্য সুপারিশ করবেন।
দ্বিতীয় : সুপারিশ বিপুল সংখ্যক মোমিনকে বিনা হিসাবে জান্নাত প্রদান করার জন্য করা হবে। এ সুপারিশ হুযূর সা. করবেন।
তৃতীয় : সুপারিশ সেসব লোকের জন্য হবে যারা বদ আমলের কারণে জাহান্নামী সাব্যস্ত হবে। এ সুপারিশ হুযূর সা. নিজে করবেন এবং অন্যান্য মোমিন শহীদ এবং ওলামায়ে কেরাম ও করবেন।
চতুর্থ : সুপারিশ সকল পাপীদের জন্য করা হবে, যারা জাহান্নামে চলে গেছে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনার জন্য আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং ফেরেশতারা এ সুপারিশ করবেন।
পঞ্চম : সুপারিশ জান্নাতীদের দরজা বুলন্দ করার জন্য করা হবে।
হযরত আউফ বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, আমার রবের পক্ষ থেকে একজন বার্তাবাহক এসে আমাকে এই পয়গাম দিল যে হয়তো আমি এই কথা গ্রহণ করি যে, আমার উম্মতের অর্ধেক বিনা হিসাবে এবং বিনা আযাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথবা এ কথা গ্রহণ করি, আমার উম্মতের যার জন্য ইচ্ছা শাফাআত করতে পারি। আমি শাফাআতের কথা গ্রহণ করেছি। আর আমার শাফাআত সে সকল লোকের জন্য হবে যারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করে না। [মেশকাত শরীফ]
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রত্যেক নবীকে একটি মকবুল দোআ (সুযোগ) দান করা হয়েছে। সুতরাং প্রত্যেক নবীই দুনিয়াতে সেই দোআ কবুল করিয়ে নিয়েছেন। আমি এ দোআর সুযোগ দুনিয়াতেই শেষ করে যাইনি; বরং তা কেয়ামতের দিনের জন্য গোপন করে রেখেছি, যাতে করে সে দিন আমার উম্মতের শাফাআতের জন্য এ দোআ কাজে লাগাতে পারি। অতএব আমার প্রত্যেক উম্মতের জন্য অবশ্যই আমার শাফাআত পৌঁছবে, যারা এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে, তারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করেনি। [মুসলিম শরীফ]
এ হাদীস দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায়, আল্লাহ জাল্লা শানুহু তাঁর প্রত্যেক নবীকেই খাসভাবে একটা দোআ করার সুযোগ দিতেন, যা তিনি অবশ্যই কবুল করতেন। যদিও নবীগণ মুসতাজাবুদ দাওয়াত ছিলেন অর্থাৎ তাঁদের দোআ কবুল হত, তবুও আল্লাহ পাক তাঁদের বিশেষভাবে সম্মানিত করার জন্য একবার এমন সুযোগ দিতেন, তাঁরা যা চাইতেন সে দোআই কবুল করতেন। রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, প্রত্যেক নবীই আল্লাহর দেয়া দোআর বিশেষ সুযোগ দুনিয়াতে চেয়ে নিয়েছেন, কিন্তু আমি দুনিয়াতে চাইনি; বরং আখেরাতের জন্য রেখে দিয়েছি। এ সুযোগ আমি আমার উম্মতের শাফাআতের জন্য ব্যবহার করব।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, (আমাদের) এক কেবলার অনুসরণকারীদের মধ্য থেকে এত বিপুল পরিমাণ জাহান্নামে প্রবেশ করবে, যার এলেম একমাত্র আল্লাহ পাকেরই রয়েছে, তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে আল্লাহর নাফরমানী এবং নাফরমানী করার সাহস ও আল্লাহর হুকুমের খেলাফ চলার কারণে।
তখন আমি সেজদায় পড়ে আল্লাহর প্রশংসা করতে থাকব, যেমন দাঁড়িয়ে তাঁর প্রশংসা করি, এরপর (আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে) হুকুম হবে মাথা উঠাও, চাও, তোমার চাওয়া পূরণ করা হবে, শাফাআত কর, তোমার শাফাআত গ্রহণ করা হবে। [তারগীব ওয়াত তারহীব]
হযরত আলী ইবনে আবু তালেব রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, আমি আমার উম্মতের জন্য শাফাআত করতেই থাকব আর আল্লাহ তাআলা আমার শাফআত কবুল করতেই থাকবেন। এমনকি মহান আল্লাহ পাক আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন, হে মুহাম্মদ! তুমি খুশি হয়েছ? আমি আরজ করব, হে রব! আমি খুশি হয়েছি। [তারগীব ওয়াত তারহীব]
হযরত ইবনে আব্বাস  রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, কেয়ামতের দিন নবীদের জন্য নূরের মিম্বর স্থাপন করা হবে, যাতে তাঁরা আসীন হবেন। আর আমার মিম্বর খালি থাকবে। আমি তাতে এ ভয়ে বসব না, আমাকে নাজানি জান্নাতে পাঠানো হয় আর আমার উম্মত শাফাআত থেকে বঞ্চিত হয়। আমি আরজ করব, হে আমার রব! আমার উম্মত! আমার উম্মত! আমার উম্মত! আল্লাহ জাল্লা শানুহ এরশাদ করবেন, হে মুহাম্মদ সা. তুমি তোমার উম্মতের জন্য আমার কাছে কি চাও। আমি আরজ করব, “তাদের হিসাব জলদি করে নিন।” সুতরাং উম্মতকে ডেকে তাদের হিসাব নেয়া শরু হবে। হিসাবের ফলে তাদের কেউ আল্লাহর রহমতে এবং কেউ কেউ আমার শাফাআতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি সুপারিশ করতেই থাকব। এমন কি যারা জাহান্নামে চলে যাবে তাদের বের করার জন্য (আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে) আমাকে তাদের একটা লিস্ট দেয়া হবে। এমন কি জাহান্নামের দারোয়ান আমাকে বলবেন, আপনি তো আপনার উম্মতের কাউকেই আল্লাহর ক্রোধের মধ্যে রেখে যাননি (সবাইকে বের করে নিয়েছেন), যারা আযাবের মধ্যে ছিল তারা মুক্তি পেয়ে জান্নাতে চলে যাচ্ছে। [তারগীব ওয়াত তারহীব]বি. দ্র. হুযূর সা. অবশ্যই শাফাআত করবেন এবং হাদীসে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে তা পুরোপুরিই সত্য, কিন্তু হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাফাআত করবেন এ আশায় আমল ছেড়ে দেয়া এবং গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়া মূর্খতা ছাড়া আর কিছু নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight