প্রেমের ভয়ংকর পরিণতি : মোহাম্মদ ইউসুফ আহমেদ

Biye

নোয়াখালীর সোনাপুরী প্রধান সড়কের পূর্বে অবস্থিত এখলাসপুর গ্রাম। মনোরম সেই গ্রামের একটি বিলের পাশে মালেক সর্দারের বাড়ি। বাড়ির সদস্য হিসাবে রফিকুল্লাহরও একটি আবাসন রয়েছে সর্দার বাড়িতে। ছয় সন্তুান নিয়ে ছোট্ট সংসার তার। দু বেলা খাবার পেলে তৃতীয় বেলা টানাটানি। এদিকে দরিদ্রতার যাতাকলে পিষ্ট হয়ে চলতে থাকে তাদের দুরুহ সংসার। একদা রফিকুল্লাহ ফজরের নামায আদায় করে বাড়ির পথ ধরে চলছেন। পথের দুপাশে সারিবদ্ধ ভাবে দণ্ডয়মান আকাশচুম্বি নানারকম বৃক্ষরাজিগুলো তাদের পত্র পল্লব নেড়ে দক্ষিণা হিমেল হাওয়ার পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে রফিক মিয়ার গায়ে। চলার পথে হঠাৎ তার হৃদয় গহীনে কিছু ভাবনা উদয় হয়। তার বড় আশা ছেলে রাজুকে উচ্চ শিক্ষিত করাবেন। কিন্তু শিক্ষার জন্য টাকার প্রয়োজন। তিনি কোথায় পাবেন এত টাকা? তাছাড়া রাজু এখন ক্লাস টেনের ছাত্র। গাইড বুক, নোট বুক, বই পুস্তক এবং খাতা কলম সিলেবাস ইত্যাদির ব্যয় এবং প্রাইভেট খরচ ও মাসিক স্কুল বেতন পরিশোধের জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। এসব চিন্তা করতে করতে কখন যে বাড়ির সীমানায় পা পড়ে গেল রফিক মিয়া তা অনুভব করতে পারল না। বিষন্ন চেহারা দেখে রাজুর মা জিজ্ঞেস করল, কি গো আপনাকে এমন চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন? কোন সাড়া দিল না সে। হতাশার ভাব নিয়ে রাজুর মায়ের পুনরায় প্রশ্ন, কি হয়েছে বলুন? এবার রফিক মিয়া বিষন্ন চেহারায় রাজুর মায়ের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রফিক মিয়া তার গিন্নিকে বলল, রাজুর মা! কাল থেকে রাজুকে কোন রেস্টুরেন্টে পাঠিয়ে দাও। আমি আর তার পড়ার খরচ চালাতে পারবনা। এতদশ্রবনে রাজুর মায়ের মাথায় যেন বজ্রপাত হলো, পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। দু’ নয়নে অশ্র“ বয়ে চলল চেহারার উপর দিয়ে। চারপাশ কেমন যেন ঝাপসা হয়ে গেল রাজুর মায়ের কাছে। ছেলের ব্যাপারে এ কি শুনল সে? পুরো শরীর যেন নিস্তব্দ হয়ে গেল তার। শত চেষ্টা করেও যেন তিনি কোন কথা বের করতে পারছেন না তার মুখ থেকে। কোন কথা না বলে পাকঘরে গিয়ে চুলার সামনে রাখা কাটের টুকরাটির উপর বসল রাজুর মা। ছেলের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সে গুমরে কাঁদতে লাগল। আর কিছুক্ষণ পর পর আচল দিয়ে চোখের জল মুছতে লাগল। অনেক্ষণ কান্নার পর কিছুটা স্বাভাবিক  হলো সে।  তবুও কিছুক্ষণ পরপর হিচকি টানছে। ওমনি হঠাৎ করে কি যেন মনে পড়ল তার। অস্পষ্ট স্বরেই মনে মনে বলল। নিজের জীবনের আর কি দাম আছে যদি ছেলেটাকেই মানুষ করতে না পারি! মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, গায়ের কালো রং সাদা হয়ে যাবে অথবা সাদা রং কালো হয়ে যাবে তবুও ওকে পড়াশুনা আমি করাবই। আস্তে আস্তে উঠলেন তিনি। পাক ঘর থেকে বের হয়ে বড় ঘরে গেলেন। চৌকির নিচে দুটো ইটের উপর রাখা জঙ্গধরা পুরাতন ট্রাংকটার কাছে গিয়ে নিচু হল রাজুর মা, আচলে রাখা চাবিটা দিয়ে ট্রাংটা খুলে উপরের পাট্টাটা উচু করে রেখে একে একে উপরের কাপড়গুলো বের করল, ট্রাংকের নিচ থেকে বের করল তার শশুরের দেয়া সেই পুরোনো গলার হারটি। পুত্র বধু ঘরে তোলার সময় মেয়ে হিসেবে ঘোষণা দিয়ে উপহারস্বরূপ এই হারটি দিয়েছিল আলিমুদ্দিন মিয়া। খুব আদর করত তাকে তার শশুর ঠিক মেয়ের মতন। সেই হারটা নিয়ে তিনি রাজুর বাবার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, জানি আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে সংসার চালাতে; সেখানে ছেলের খরচ  কোত্থেকে দিবেন? তাই বলে তো আর আমরা বসে থাকতে পারি না। ওই তো আমাদের ভবিষ্যত। যান এইটা বিক্রি কইরা আপাতত ওর বেতন বকেয়া দিয়ে স্কুলে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। পরের ব্যবস্থা আল্লাহ করবো। ‘আল্লাহ আমাগো মানিকেরে দেখবো। আল্লাহর উপর ভরসা রাখেন। এতো চিন্তা কইরা কি ওইবো।’ কথাগুলো বলতে বলতে তার কন্ঠ ভারি হয়ে গেল। আস্তে আস্তে আবার পাকঘরের দিকে চলে গেল। এদিকে রফিক মিয়া একেবারে অবাক হয়ে গেলেন। অমত করতে চাইল রফিক মিয়া; কিন্তু সে ভালো করেই জানে যে, তার গিন্নি যাই হোক ছেলের ব্যাপারে কোন বিষয়ে আপোষ করবে না। অগত্যা রফিক মিয়া বাজারে নিয়ে গেল হারটি। বিক্রি করে সোজা চলে গেল স্কুলে। সব পাওনা পরিশোধ করল। তারপর প্রাইভেটের টাকা পরিশোধ করে  বাড়ি আসল। পরদিন থেকে রাজু রীতিমত স্কুলে যাওয়া শুরু করলো। মা পিছন থেকে তাকিয়ে দেখে ছেলেটা কেমন যেন দেখতে দেখতে বড় হয়ে যাচ্ছে। কদিন আগেও ব্যগটা নিয়ে যেতে পারত না ও। মা বার বার ঠিক করে দিত। আর এখন কত বড় দেখা যায়। যাহোক মায়ের সব দুঃখ যেন মুছে গেলো তার ছেলের স্কুলে যাওয়া দেখে। তখন রফিক মিয়াও বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছেলের স্কুলে যাওয়া দেখছিল। রাজুর মা তখন রফিক মিয়ার খুব কাছে  ঘেঁসে দাড়াল এবং স্বামীর ঝুলে থাকা হাতের আঙ্গুলের ভেতর নিজের আঙ্গুলগুলি ডুকিয়ে একটা উষ্ণ চাপ দিল। আর আনমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছেলের স্বপ্নিল ভবিষ্যতের ছবি আঁকতেছিল। কোন ফাঁকে যে ছেলে আড়াল হয়ে গেল তা রাজুর মা টেরই পেল না। রফিক মিয়ার মৃদু স্পর্শে সে যেন স্বপ্নের ভূবন থেকে যমীনে ফিরে এলো। খালি পায়ের তলায় শীতল মাটির অস্তিত্ব টের পেল। কি হলো ঘরে চলো, বলল রফিক। রাজুর মা পথের দিকে  আবার তাকিয়ে নিশ্চিত হলো যে, ছেলে চলে গেছে। হ.. চলেন, বলে স্বামীর হাত টেনে স্বামীকে ঘরে নিয়ে গেল রাজুর মা। ওদিকে রাজু প্রতিদিনের মত ক্লাসে উপস্থিত হলো। নির্ধারিত টেবিলে বসল সে। কিছুক্ষণ পরেই ঘন্টা বাজলো। প্রথম ক্লাস ইংরেজি। তানভীর স্যার ক্লাসে হাজির হয়ে গেল ঘন্টা পরার সাথে সাথে। তিনি একটু রসিক টাইপের, পড়ার ফাঁকে স্যার একটা কৌতুক বললেন, সবাই একত্রে হা হা করে হাসতে শুরু করল।  কিছুক্ষণের জন্য যেন ক্লাসে হাস্যরোল পড়ে গেল। রাজু হাসতে হাসতে কেন যেন পিছনে তাকালো। অমনি চোখ পড়ল নিলুফার চোখের উপর। নিলুফা সাথে সাথে হাসির বাগিচা হতে অন্য রকম ব্যখ্যাহীন একটা হাসি উপহার দিল রাজুকে। হাসিটা দেখে রাজুর হৃদয়টা কেমন যেন ছ্যাঁত করে উঠল। কেমন যেন একটা গরম হাওয়া তাকে এফোর ওফোর করে চলে গেল। তার হৃদয়ে অন্য রকম একটা ঢেউ দোলা দিল। একের পর এক করে একটা পর্যন্ত ক্লাস চলল তাদের।
গ্রীম্মের দুপুর। কাক মরা রোদ্র। দীপ্তিমান সূর্যের তেজদীপ্ত কিরণে চতুর্দিকের ভূমি ফেটে চৌচির হয়ে রয়েছে। ঠিক এই মূহুর্তে ক্লাস ছুটি হলো তাদের। সহপাঠীরা সবাই যার যার গন্তব্যের দিকে হাটা শুরু করেছে। কেউ বা বড় রাস্তায় কেউ বা ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে মেঠো পথধরে হাটতে থাকে। এক নজরে দৃশ্যটা দেখতে খুব সুন্দর লাগে। সাবার মত রাজুও তার বাড়ির পথ ধরল। প্রখর রৌদ্রের মধ্যেই হাটছে সে। তার পিছনে কারো হেটে আসার আবাস পেল রাজু। তবে সেদিকে ফিরে তাকালো না। কারণ রাস্তায় তো কতো মানুষই হাটে। সে নিজের মত করে হাটতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যে পিছনের ছায়াটি তার কাছাকাছি আসল এবং সে তার মাথার উপর একটি ছাতার ছায়া অনুভব করল। তাকে রৌদ্রে থেকে বাঁচাতে তার উপর ছাতা ধরেছে পিছন থেকে আসা লোকটি। ও থমকে দাড়াল। ফিরে দেখে আর কেউ নয়, সে নিলুফা। যে ক্লাসে তাকে আজ একটি মুচকি হাসি উপহার দিয়েছিলো। সে চমকে উঠলো নিলুফার এই আচরণে। অনেকটা ইতস্ত বোধ করল রাজু। তারপরও নিলুফার জোরাজোরিতে একি ছাতার ছায়ায় পথ চলতে লাগল রাজু।
নিলুফা আর রাজু একি এলাকার। সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে নিলুফা। বিশাল বড় বাড়ি তাদের। বাড়ির সামনে বড় দুটো পুকুর। পুকুরের দু’পাশে দুটো পাকা ঘাট। তার দাদা হজ্জ থেকে এসে সমাজসেবার উদ্দেশ্যে ঘাট দুটো করেছিলো। তখন নিলুফার বাবা যুবক ছিলো, তবে তখনও বিয়ে করেনি। বংশগত বড়লোক নিলুফার পরিবার। পুকুরের উত্তর পাশে একটি জামে মসজিদও করেছে তার দাদা। সারা এলাকার মানুষ এখানে এসে নামায পড়ে। পুকুরের চার পাশে অনেক ফলের গাছ। তার দাদা মারা যাওয়ার সময় নাকি গাছগুলোর ফল ফলাদি সবার জন্য উন্মুক্ত করে গিয়েছিলেন এই পূণ্যবান হাজী সাহেব। তার দাদার নাম টিকিয়ে রাখছে তার বাবা। তিনি বর্তমান তাদের হাই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এবং এলাকার গণ্যমান্য লোকদের একজন। অপর দিকে রাজু হলো সাধারণ এক দরিদ্র পরিবারের ছেলে। তবে তাদের পরিবারেও একটা সময় নাম ডাক ছিলো। বাকি অর্থের অভাবে সেই জৌলুসটুকু এখন আর নেই। যায়হোক, রাজু যতটুকুই বুঝুক আর না বুঝুক এটা জানে যে, তাদের এলাকায় নিলুফাদের সামনে কেউ মাথা তুলে তাকাতে পারে না। একথাগুলো রাজুর মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল, তাই তার ভিতরে একটা পিছু টান ছিল। অপর দিকে অপরুপ সুন্দরী এক মেয়ের এমন সাদামনা নিবেদনও যেন সে ফেলতে পারছিলো না। মাইল খানিক এভাবে একি ছাতার ছায়ায় চলার পর নিলুফাদের বাড়ির কাছ পর্যন্ত এসে পৌঁছল তারা। রাজুদের বাড়ি হলো এলাকার শেষ প্রান্তে নদীর পারে।
ভাইয়া কালকে আসবেন না স্কুলে? বলে নিলুফা তাদের বাড়ির দিকে চলে গেল। উত্তরে হ্যা সূঁচক মাথা নড়িয়ে সেও সামনের দিকে হাটতে লগল। এতক্ষণ যেন রাজু একটি ঘোরে ছিল। নিলুফা চলে যাওয়ার পর ও যখন একা হলো তখন যেন আস্তে আস্তে সে ঘোর কাটতে লাগল। অনেক প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছিল তার মনে। যে মেয়েটির পিছনে ক্লাসের ফাষ্টবয়রা ঘুর ঘুর করে কোন চান্স পায়না। সেই মেয়েই কিনা এক ছাতার নিচে তাকে চলতে বাধ্য করল। তাহলে কি নিলুফা আমাকে ভালবাসে। আসলে গরীব ছেলেদের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ এমনই হয়। ওরা অভাবের যাতা কলে পিষ্ট হয়ে সব সময় কেমন যেন মায়াবী হয়ে থাকে দেখলেই যেন মায়া লাগে ওদের। তারপর আবার থাকে শান্তশিষ্ট। ধনির দুলালরা টিফিনের সময় যখন পাশের ক্যান্টিনে আড্ডা জমায় আর মেয়েদের নিয়ে গল্পে মজে, বাধ্য হয়েই এরা তখন হয়ত ক্লাসের এক কোনে বসে পড়তে থাকে। তা না হলে মাঠের কোন গাছের নিছে তাদের মত কয়েকজন অগোছালো কিছু হই হুল্লুড় করে। আর এই জিনিসটা গরীব টাইপের মেয়েরা উপভোগ না করতে পারলেও বড়লোক মেয়েদের চোখ এড়ায় না। এরা যেহেতু সুখী তাই দুঃখী ছেলেদের প্রতি এদের করুণা হয়। ফলে কখনও কখনও দেখা যায় কোন ধনীর দুলালিও সেই ক্লাসের কোনে বসে থাকা ছেলেটাকে তার টিফিনের অর্ধেক শেয়ার করে। দরিদ্র ছেলের অমতটা এখানে বেশি একটা টেকে না। সেই হিসেবেই নিলুফার রাজুর সাথে এমন আচরণ। যাহোক রাজু বুঝতে পারছিলনা নিলুফার আচরণ কোন হিসেবে নিবে। তবে বুঝতে না পারলেও ছেলের মন তো সে এটাকে নিলুফার দূর্বলতাই ধরে নিল। আর নিলুফাও যে রাজুর প্রতি দূর্বল ছিল না তা বলা যায় না। এভাবেই তাদের দিন চলতে লাগল। প্রায়ই নিলুফার টিফিন বক্সে ডাক পড়ত রাজুর। বিভিন্ন উৎসবে পরিবারের অনুমতি নিয়েই বিভিন্ন কাপড়  দিতো রাজুকে। নিলুফার বাবা এটাকে কিছু মনে করতো না। কারণ রাজুর দাদা এবং নিলুফার দাদার মধ্যে একটা ভাব ভাব অবস্থা ছিল। যদিও নিলুফাদের মত ওরা এত টাকা ওয়ালা ছিল না। আগের দিনে এমনি হতো খুব বেশি ভেদাভেদ ছিল না ধনি গরীবদের মাঝে। তাই রাজুদের পরিবারকে কিছু দেওয়া তার কাছে অন্য রকম মনে হয়না। বংশগত বড়লোকদের অবস্থাটা এমনি হয়। যাহোক এভাবে চলতে চলতে এক পর্যায়ে দুজন দুজনের উপর সত্যি দূর্বল হয়ে পড়ে। সাহস করে রাজু একদিন প্রেম নিবেদন করে ফেলে নিলুফাকে। সেও তো এমন একটি উত্তেজনায় ছিল বিধায় সহজে রাজি হয়ে গেল। চলতে থাকলো তাদের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়।
এরই মধ্যে তারা এস. এস. সি. পাশ করে কলেজে ভার্তি হয়েছে। এদিকে রাজুর মা তার পড়াশুনার খরচ মিটাতে গিয়ে কখনও পিঠা  বিক্রি করত কখনও বা মুড়ি ভেজে খই বিক্রি করত। শেষ পর্যন্ত সেলায়ের কাজটা শিখেছিলো ছেলের পড়াশুনাটা চালিয়ে নেয়ার জন্য। আর এভাবেই রাজুর মা যুদ্ধ করতে লাগল তার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য। কিন্তু মা তখনও বুঝতে পারেনি তার ছেলে বায়রোডে হাটতে শিখেছে। এতদিনে রাজুর অবস্থাটা বেশ পরিবর্তন হয়ে গেল। যে ছেলের ঘর থেকে সর্বক্ষণ পড়ার আওয়াজ আসত। সেই ঘর থেকে যেন  কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই আওয়াজটি একেবারেই হারিয়ে গেল। আস্তে আস্তে তার পড়ার রুমটা যেন ছোট খাটো আড্ডাখানায় রুপ নিল।  ঘরে ঢুকলেই যাকে দেখা যেত একধ্যানে পড়ছে বা লেখছে, তাকে এখন দেখা যায় রেডিও ছেড়ে গান শুনছে আর তার তালে নিজের শরীর নাচাচ্ছে। ছেলেটাও কেমন যেন আগের মত আর ভদ্র নেই। নেই সেই শান্ত শিষ্ট চেহারা। সব কিছুতেই একটা পরিবর্তন এসে গেছে। রাজুর মা আর রফিক মিয়া বিষয়টা নিয়ে অনেক চিন্তা করেও এর কোন উপযুক্ত কারণ খোঁজে পেল না। তবে নিলুফার সাথে কালে ভাদ্রে তার কথা বার্তা হয় এটা তারা জানে। এর বেশি জানে না। এর মধ্যে নিলুফা একদিন কোন এক ব্যাপারে রাজুর সাথে অভিমান করল। রাজুর তো মাথা একেবারেই খারাপ হয়ে গেল। কিভাবে তার অভিমান ভাঙ্গানো যায় ভাবতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর একটি আয়ডিয়া তার মাথায় আসলো। হ্যাঁ, তাকে একটি ভালো দামি কিছু গিফট করতে হবে; কিন্তু টাকা কই? ওমনি তার মাথায় এলো পাশের বাড়ির আকবর চাচার একটা ছাগল আছে। ওটা সাড়া দিন নদীর পারে পরে  থাকে। আর ভেঁ ভেঁ করে। হুঁম ভাল বুদ্ধি! ওটাই কোন এক চান্সে বিক্রি করে ফেলতে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। পরের দিন সে কলেজে যায়নি। নদীর পারে কয়েক বার গেল তার মতলব পুরা করতে, কিন্তু সুযোগ পেল না। হঠাৎ দুপুর বেলা পুরো এলাকাটাকে খালি মনে হলো তার কাছে। ছুটে গেল নদীর পারে। ছাগলটা সুযোগ মত নিয়ে গেল। বিক্রি করল ছয় হাজার টাকা। কি কিনবে ভাবতে ভাবতে গেল একটি জুয়েলার্সের দোকানে। সুন্দর দেখে একটি আংটি কিনল নিলুফার জন্য। অংটি নিয়ে ফিরল যখন তখন প্রায় রাত দশটা। এদিকে বিকাল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা হলো তখন আকবর আলী ছাগল না পেয়ে তা খোঁজতে গেল চেয়্যারম্যান বাড়িতে। কারণ তাদের এলাকার নিয়ম ছিল কারো গরু ছাগল যদি অন্যের ক্ষেতের ফসল নষ্ট করে তাহলে ঐ ছাগল চেয়ারম্যান বাড়ি নিয়ে বেঁেধ রাখা হতো। মালিক জরিমানা দিয়ে তা ছাড়িয়ে আনতো। আকবর আলীও গেল সেখানে, গিয়ে দেখে ছাগল নেই। বুড়ো মানুষ ওমনি চিল্লাচিল্লি শুরু করে দিল। সবাই তাকে বুঝাতে লাগল। চাচা ভালো করে খোঁজে দেখুন হয়ত পেয়ে যাবেন। চেয়ারম্যানের ঘরে এক বিধবা কাজের মহিলা ছিল নদীর অপর পারে তাদের বাড়ি। সে  হঠাৎ আগ বাড়িয়ে এসে বলল, চাচা আপনের ছাগলডা কি কালা? একটু মোডাতাজা? হ্যাঁ কেন কোথাও দেখছ নাকি? বলল আকরব আলী। হ্যাঁ চাচা, নদী পার হওয়ার সময় রফিকুলের পোলাডারে দেখছি  একটা ছাগল ধইরা তাড়াতাড়ি নদী পার ওইয়া চইলা গেল। আমার দিকে খেয়াল করে নাই। মনে  হয় অন্য কোন খেয়ালে ছিল। হুম মাথা নাড়িয়ে আকবর আলী ঘরে ফিরে এলো। আটটার দিকে যখন তার বড় ছেলে শহর থেকে আসল। তার কাছে আকবর আলী পুরো ঘটনা খুলে বলল। রাজুর কথা শুনেই তার কান খারা হয়ে গেল। হ বাবা, আমি তো আজ দেখলাম রফিকুলের পোলারে আকরাম আলীর জুয়েলার্সের দোকান থেকে বের হইতাছে। আকবর আলীর বড় ছেলের দোকান সেই জুয়েলার্সের দোকানের উল্টা পাশে। তৎক্ষণাৎ সে খোঁজ নিল। হ্যাঁ, রফিকুলের পোলাই একটা আংটি কিনছে সাড়ে চার হাজার টাকা দিয়া। ব্যাস মামলা পরিষ্কার। এদিকে রাজু অপেক্ষায় রইল কাল কলেজে গিয়ে নিলুফার সামনে পছন্দের গিফটা নিয়ে হাজির হব। অনেক রাত্র পর্যন্ত সে ঘুমুতে পারেনি উত্তেজনায়। কখন ঘুমিয়েছে বলতে পারবেনা সে। এদিকে আকবর আলীর বড় ছেলে সকাল বেলায় সেই জুয়েলার্সের ম্যানেজার, নিলুফার বাবা, বিধবা কাজের মহিলা এবং এলাকার কয়েজন লোক নিয়ে হাজির রাজুদের বাড়ি। রাজুর বাপ মা কিছুই বুঝতে পারল না প্রথমে। এসেই তারা রফিক মিয়ার সাথে বিশ্রি আচরণ শুরু করে দিল। তোর পোলারে আগে ডাক, বলল আকবর আলী। তখন রফিক মিয়া গেল রাজুর রুমে। ডাক দিল রাজুকে। ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে লাফ দিয়ে উঠল সে। কিরে তুই কি করছস? আকবর চাচা এত লোক লইয়া আমাগো বাড়ি আইয়া আমাগোরে এমন বকতাছে ক্যান? রাজুকে কথা গুলো বলল তার বাবা। ঘুম থেকে উঠে যেন সে এবার মরা মানুষের মত হয়ে গেল। চুপসে গেল সে। বিবর্ণ হয়ে গেল তার চেহারা। অজানা এক অতঙ্কে আতঙ্কিত হয়ে গেল রাজু। সবাই বসা ছিল উঠনে। কাঁপতে কাঁপতে সে এলো উঠানের সামনে। তার পরের ঘটনা তো বুঝাই যায়। সবার সামনে জুতোর বাড়ি খেল ছেলে। আর বাবার খেতে হলো চেয়ারম্যানের থাপ্পর। অপমান সহ্য করতে না পেরে রফিক মিয়া ধপাস করে পড়ে গেল উঠানের মাঝখানে।  ও দিকে রাজুর মার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তার ছেলের জন্য কত কিছুই না সে করেছে, পিঠা বিক্রি করেছে, রাস্তায় বসে খই বিক্রি করেছে সে, তার এই রাজুর জন্য! কিন্তু একি হলো তার ছেলের? রাজুর মা আর কিছু ভাবতে পারল না। বেহুশ হয়ে গেল রাজুর মা। এরপর আর কোন কথা বলতে পারেনি সে। চির দিনের মত হয়ে গেল বাক প্রতিবন্ধি। মায়ের শোকে ছেলেও যেন অনেকটা পাগলের মত হয়ে গেল। বুঝতে পারল তার প্রেমের ভয়ংকর পরিণতি। কিন্তু এখন বুঝে লাভ কি? যা হবার তা তো হয়েই গেছে। রাজুও সম্ভবত সেই অপমানের চাপটা সহ্য করতে পারল না।  আবোল তাবোল বলা শুরু করে দিল সে। তারপর কি যেন বলতে বলতে বের হয়ে গেল বাড়ি থেকে। তখনও পুরো পুরি পাগল না হলেও কয়েকদিন পর সে পুরোই পাগল হয়ে গেল।  তার এখন আশ্রয় হলো হাট ঘাট বা কোন রেল স্টেশন।। তাকে মানুষ এখন নিলু পাগল বলে ডাকে। কেউ কেউ আবার মা পাগলও বলে। কারণ সে বেশির ভাগ সময় হয়ত মা মা করে গলা ফাটায় অথবা নিলু নিলু বলে হায় হায় করে। কিছুদিন পর হঠাৎ একদিন এই নিলু পাগল চৌমুহানী রেল স্টেশন থেকে সামনের দিকে হেটে যাচ্ছিল রেল লাইনের উপর দিয়ে। আর বিল বিল করে কি যেন বলছিল। হঠাৎ ট্রেনের হুইসেল ভেসে এলে নিলুর উল্টা পাশ থেকে একটি ট্রেন শাঁ শাঁ করে আসছে তার দিকে। ড্রাইভার হয়ত বুঝতে পেরেছিলো তাই বার বার সে হুইসেল দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু না হুইসেলের বিকট আওয়াজ সবাই শুনলেও তা রাজুর কানে গেল না। সে খুড়িয়ে খুড়িয়ে মাথা হেলে দুলে সামনের দিগেই এগুচ্ছিল। আর মানুষেরা চারপাশ থেকে চিৎকার করছিলো তাকে বাঁচাতে। কিন্তু না, ধেয়ে আসা ট্রেনটিতে সে এমন জোরে টাক্কর লাগলো যে, একধম ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল তার দেহ। খণ্ড বিখণ্ড হয়ে গেল তার মাথা। দূর থেকে সবাই চিৎকার করতে করতে আসলো দূর্ঘটনা স্থলে। ট্রেনটি যখন চলে গেল তখন নিলু পাগলের মস্তক বিহীন লাশটি বের হয়ে এলো ট্রেনের নিচ থেকে।  নিথর হয়ে পড়ে রইল নিলু পাগলের দেহ। কিন্তু কেউই হয়ত যানে না এটা নিলু পাগল না, এটা রাজুর দেহ। এও হয়ত জানে না যে, কেন তার এই ভয়ংকর পরিণতি? অথচ এই রাজুকে নিয়ে কতকিছুই না ভেবে রেখেছিল তার মা বাবা…….। একটি প্রেমের কারণে সব আশা ভরসাই আজ ট্রেনের নিচে পিষ্ট হয়ে গেল।
প্রিয় পাঠক পাঠিকা! ঘটনাটি লেখার পর আপনাদের জন্য কিছু লিখতে চাচ্ছিলাম কিন্তু……। না, কলম চলছে না। মনটা একেবারে বিষন্ন হয়ে গেল। শুধু এতটুকু বলছি চলুন আমরা জেনে শুনে এমন ভয়ংকর পরিণতির সম্মুাখিন না হই। সচেতন হই সবাই নিজের প্রতি।
লেখক :উপন্যাসিক, গল্পকার,  শিক্ষার্থী : ফরিদাবাদ মাদরাসা, ঢাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight