প্রিয়নবীর সা. ভালোবাসায় জাগুক জীবন: ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

আনাস রা. হতে বর্ণিত, মদীনায়  মসজিদে নববীতে রাসূলে পাক সা. এর কাছে এক আগন্তুক এসে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামত কবে হবে? (জামাতের সময় হয়েছিল, তাই লোকটির প্রতি একনজর দৃষ্টিপাত করে) নবীজি সা. নামাজে দাঁড়ালেন।  নামাজ শেষ হলে হযরত জানতে চাইলেন, কেয়ামত সম্পর্কে প্রশ্নকারী লোকটি কোথায়? লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! এই তো আমি। হযরত লোকটিকে প্রশ্ন করলেন, কিয়ামতের জন্য তোমার কী প্রস্তুতি আছে? লোকটি জবাবে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিয়ামতের জন্য আমার (তেমন কোনো প্রস্তুতি নাই।) বেশি বেশি নামাজ ও রোযার সঞ্চয় নিয়ে আমার প্রস্তুতি নাই। তবে (কিয়ামতের দিনের সম্বল বলতে একটি মনোবল আমার আছে। তা হলো,) আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্ল্হাু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন ইরশাদ করলেন, যে যাকে ভালোবাসে সে তার সাথেই থাকে। আর তুমিও যাকে ভালোবাস (কিয়ামতের দিন) তুমি তার সাথেই থাকবে। বর্ণনাকারী আনাস রা. বলেন, ‘সেদিনের ঘোষণা শুনে মুসলমানরা যেভাবে আনন্দিত হয়েছিল ইসলাম গ্রহণের পর সেরূপ আনন্দিত হতে আমি তাদেরকে আর কখনো দেখি নি।’ হযরত আনাস রা. তখন স্বগতোক্তি করে বললেন, আমিও আল্লাহর রাসূলকে, আবু বকরকে ও উমরকে ভালোবাসি। আর আমি আশা করি যে, তাঁদেরকে ভালোবাসার সুবাদে কিয়ামতের দিন আমি তাঁদের সাথী হব, যদিও তাঁদের মতো আমল আমার নেই।’ [বুখারী ৩৬৮৮; মুসলিম ২৬৩৯]
বুখারি, মুসলিমসহ হাদীসের কিতাবসমূহে এই ঘটনার দৃশ্যপট বর্ণিত হয়েছে বিভিন্ন সূত্রে। কোথাও সংক্ষেপ, কোথাও বিস্তারিত বিবরণে প্রশ্নের ধরন আর উত্তরগুলো ছিল বিচিত্র। আগন্তুকের ‘কিয়ামত কবে হবে’ প্রশ্নের নবীজি সরাসরি উত্তর দেন নি; বরং পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘কিয়ামতের জন্য তোমার কী প্রস্তুতি আছে’। লোকটিও উত্তরে সহজ কথাটি ঘুরিয়ে বললেন। অতিরিক্ত নামায বা রোজার সঞ্চয় নয়, বরং কেয়ামতে মুক্তি লাভের সম্বল হিসেবে আল্লাহ ও রাসূলের ভালোবাসার দাবি পেশ করলেন। তখন নবীজি যা বললেন, তা ছিল গোটা উম্মতের জন্য পরম সুসংবাদ। নবীজি তাকে বুঝিয়ে দিলেন, তুমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসার সম্বল ও মনোবল নিয়ে বুক বেঁধেছ! তোমার জন্য সুসংবাদ হল, আমার সঙ্গেই তোমার হাশর হবে।
আজকের মতো পত্র-পত্রিকা বা প্রচার মাধ্যম তখনকার যুগে ছিল না; তবুও নবীজির মুখনিঃসৃত পবিত্র বাণী মুখে মুখে প্রচার হয়ে যেত সর্বত্র। এবারও নামাজের জামাত শেষে আল্লাহর পেয়ারা হাবিবের পবিত্র যবান থেকে নিঃসৃত বাণী মুহূর্তে মদীনার আনাচে-কানাচে ধনিত-প্রতিধ্বনিত হল। আনন্দের ঢেউ খেলে গেল অলি-গলিতে। ঈদের আনন্দের চেয়েও আবেগ-মথিত এ আনন্দে মদীনাবাসী আপ্লুত হল। প্রতিটি মুসলমানের মনে আনন্দের দোলা লাগল অনন্য স্বর্গীয় চেতনায়। হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী ইসলামের আগমনের পর এর চেয়ে গণ-আনন্দের কোনো উপলক্ষ মুসলমানদের জীবনে ইতঃপূর্বে আর আসে নি।
কী ছিল সেই উপলক্ষ? সেই উপলক্ষ ছিল আল্লাহর রাসূলকে ভালোবাসার বিনিময়ে কিয়ামতে তাঁর সাথী হওয়ার সৌভাগ্যের ঘোষণা। মদীনাবাসীর জন্য সুসংবাদ ছিল, তারা প্রিয়নবীকে নিজেদের মাঝে পেয়েছেন, জানমাল উৎসর্গ করে বরণ করে নিয়েছেন। তাঁর ভালোবাসায় জীবনের সবকিছু বিলিয়ে দিয়েছেন। তাতে তাদের ইহকালীন জীবন ধন্য হয়েছে। আর এখন রাসূলে খোদার জবানীতে সুসংবাদ পেলেন, তাদের আখেরাতের জীবনও ধন্য হবে। কারণ, তাঁদের পরম ভালোবাসার পাত্র প্রাণের চেয়ে প্রিয়তম রাসূল সা. এর সাথেই কিয়ামতের দিন তাদের হাশর-নশর হবে।
বর্ণনাকারী আনাস রা. সেদিনের দৃশ্যপটটি তুলে ধরে বলেন, ‘সেই ঘোষণা শুনে মুসলমানরা যেভাবে আনন্দিত হয়েছিল ইসলাম গ্রহণের পর সেরূপ আনন্দিত হতে আমি তাদেরকে আর কখনো দেখি নি।’ হযরত আনাস রা. তখন স্বগতোক্তি করে বললেন, আমিও আল্লাহর রাসূলকে, আবু বকরকে ও উমরকে ভালোবাসি। আর আমি আশা করি যে, তাঁদেরকে ভালোবাসার সুবাদে কিয়ামতের দিন আমি তাঁদের সাথী হব, যদিও তাঁদের মতো আমল আমার নেই।’
আল্লাহর প্রিয় হাবিবের প্রতি এই ভালোবাসার স্বরূপ কী? কারো কারো ধারণা, রাসূলের ভালোবাসার অর্থ তাঁর অনুসরন-অনুকরণ। তাঁরা বলেন, রাসূলের সুন্নাতের উপর আমল করার নামই রাসূলের প্রতি ভালোবাসা। এর বাইরে ভালোবাসার কোনো অস্তিত্ব নেই; কিন্তু উপরিউক্ত হাদীসের বাচনভঙ্গি এই ভুল ভেঙে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। হাদীসে স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে, নামাজ রোজা বা আমল আর ভালোবাসা এক জিনিস নয়। ভালোবাসা হৃদয়গত ব্যাপার। যার সুফল  মুখে ও আচরণে প্রকাশ পায়। আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ভালোবাসাকে যদি বীজ বা চারা-গাছের সাথে তুলনা করা হয়, তাহলে আমল হবে তার ডালপালা কিংবা ফল-ফসল। এ কারণে রাসূল সা. এর প্রতি ভালোবাসার প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে আমলদার হওয়ার দাবি মিথ্যা। হাদীস শরীফে বর্ণিত,
“তোমাদের মধ্যে কেউ ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ আমি রাসূল তার কাছে তার পিতামাতা, সন্তান-সন্তুতি ও দুনিয়ার সকল মানুষের চাইতে অধিক প্রিয় না হব।” [বুখারী ও মুসলিম]
বস্তুত রাসূলের প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ও ইবাদতের অংশ। আর এর আলাদা গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এই ভালোবাসা হৃদয়গত এবং ঈমানের মাপকাঠি। আরেকটি হাদীসের ভাষ্য সামনে আসলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে যাবে।
হযরত উমর রা. একবার হযরতের পাশে ছিলেন। উপরিউক্ত হাদীসের প্রেক্ষাপটে নিজের মনের প্রকৃত অবস্থা তিনি প্রিয় রাসূলের কাছে খুলে বললেন। বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনাকে ভালোবাসার যে নিক্তি ঠিক করা আছে, তাতে আমার মনের অবস্থা হল, আমি আপনাকে আমার মা-বাবা ছেলে-মেয়ে ও দুনিয়ার সকল কিছুর চাইতে অধিক ভালোবাসি; কিন্তু আমার প্রাণের চেয়ে আপনাকে অধিক ভালোবাসি এ কথায় আমার মন সায় দেয় না। তখন রাসূলে পাক সা. তাঁর বুকে হাত রেখে বললেন, না উমর তাতে হবে না। সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, আমি তোমার কাছে তোমার প্রাণের চেয়েও প্রিয়তম হতে হবে। উমর রা. বুকে নবীজির পবিত্র হাতের পরশ পেলেন। তাঁর বুক শীতল হয়ে গেল এক অপূর্ব অনুভবে। তিনি বলে উঠলেন, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এখন আপনি আমার কাছে আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয়তম।
রাসূলে খোদা সা. এর জমানায় মদীনার সমাজে মুসলমানদের দু’টি পরিচয় ছিল: মুসলমান ও মুনাফিক। মুনাফিকরা অন্তরে অবিশ্বাসী কাফের হলেও মুসলমান হিসেবে পরিচিত ছিল। মুসলমানদের মতো নামাজ-রোজা পালন করত। ইসলামী হুকুম-আহকাম মেনে চলত। তবে সত্যিকার মুসলমানদের সাথে তাদের পার্থক্য ছিল, তাদের অন্তরে রাসূলের প্রতি ভালোবাসা ছিল না; বরং রাসূলের প্রতি চরম শত্রুতা ও বিদ্বেষে তাদের অন্তর কলুষিত ছিল। তাতে বুঝা যায়, মুনাফিক ও মুসলমানের মধ্যে পার্থক্য নির্ণায়ক হল রাসূলে খোদার ভালোবাসা। একথাও সত্য যে, মুখে রাসূলের ভালোবাসার দাবি আর বাস্তব জীবনে রাসূলের সুন্নাত ও আদর্শের বিরুদ্ধাচরণ নিজের সাথেই প্রতারণার শামিল। কারণ, ‘আমি কাউকে ভালোবাসি’ একথা বলার দাবি হচ্ছে শয়নে-স্বপনে কেবল তাকে নিয়েই ভাবতে হবে। তার পছন্দকে নিজের পছন্দ এবং তার অপছন্দকে নিজের অপছন্দ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কাজেই রাসূলে খোদা সা. এর প্রতি ভালোবাসার দাবি হচ্ছে তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ। তাহলেই একজন মুসলমান খাঁটি ঈমানদার বলে গণ্য হবে।
বিশ্বের অমুসলিম জ্ঞানী-গুণীদের অনেকেই প্রফেট মুহাম্মদকে শ্রেষ্ঠ মহামানব হিসেবে স্বীকার করেন। এমনকি রাসূলের আনীত আদর্শের অনেকগুলোই তারা তাদের মতো করে আত্মস্থ করে অনুসরণ করছেন। সভ্য ও সুশৃঙ্খল জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে তাদের খ্যাতির পেছনে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। নবীজির আদর্শ নিয়ে খ্রিস্টান-ইহুদী প-িতদের গবেষণার ধারাবাহিকতায় ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ইসলাম ও আরবির উপর সর্বোচ্চ ডিগ্রীকে কোনোভাবে অবহেলা করা যাবে না; কিন্তু এতকিছুর পরও তারা মুসলিম হিসেবে গণ্য নন। কারণ, তাদের চিন্তা ও বিশ্বাসে একটি উপাদানের অভাব আছে; আর তা হল রাসূলের প্রতি ভালোবাসা এবং সেই ভালোবাসার প্রমাণ স্বরূপ তাঁর আনুগত্য স্বীকার করা।
আমাদের বিশ্বাস, মুসলিম মিল্লাত রাসূল সা. এর ভালোবাসার ছায়াতলেই নবজীবন লাভ করতে পারে। এই ভালোবাসা অর্জন করতে হলে তাঁর অনুপম চরিত্রের সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্যের আলো দিয়ে আমাদের মন, চিন্তা ও চরিত্রকে আলোকিত করতে হবে। সে লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য আমাদের করনীয়:
১। নবী করিম সা. এর যে পরিচয় কুরআন মজীদে আল্লাহ পাক ব্যক্ত করেছেন, তা আমাদের হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। এ সম্পর্কিত আয়াতগুলোর অর্থ ও তাফসীর একাধিক নির্ভরযোগ্য তাফসীর গ্রন্থ থেকে অধ্যয়ন করতে হবে। কুরআন মজীদের একটি আয়াতের [সূরা কাহফ, আয়াত : ১১০] সরল অর্থ অবলম্বনে ‘রাসূলকে আমাদের মতো মানুষ’ বলার বিকৃত রুচি একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে। তারা অপরাপর আয়াতে রাসূলে খোদার মর্যাদার বিষয়টিকে সামনে আনে না। অথচ সাধারণ বুদ্ধিও বলে যে, নবীজি আমাদের মতো মানুষ হতে পারেন না। পাঁচওয়াক্ত আযানে আল্লাহর একত্ববাদের সাথে রাসূলের রিসালাতের যে ঘোষণা প্রতিদিন মসজিদের মিনার হতে ধ্বনিত হয়, যার প্রতি সালাম ও দরূদ পাঠ না করলে নামায হয় না, অসম্পূর্ণ থেকে যায়; তাঁকে আমাদের মতো মামুলী মানুষ বলে কল্পনা করাও জঘন্য পাপ। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন:
‘(হে নবী) আমি তো আপনাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।’ [সূরা আম্বিয়া: আয়াত ১০৭]
কুরআন মজীদেও যেখানেই আল্লাহর আনুগত্য করার জন্য বান্দাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, সেখানে সাথে সাথে রাসূল সা. এর আনুগত্য করারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন :
‘বলুন, তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে জেনে রেখ, আল্লাহ কাফেরদের পছন্দ করেন না।’ [সূরা আলে ইমরান, ৩ : ৫৯]
শুধু তাই নয়, নবীজির আনুগত্যকে আল্লাহর আনুগত্য হিসেবে সাব্যস্ত করে বলা হয়েছে,
‘যে আপনার আনুগত্য করল সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল এবং যে মুখ ফিরিয়ে নিল আমি আপনাকে তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক প্রেরণ করি নাই।’ [সূরা নিসা, ৪ : ৮০]
হাদীস শরীফে এবং বিশেষ করে সাহাবায়ে কেরামের জীবনে অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে, যা প্রমাণ করে, তাঁরা প্রিয়নবীর জন্য জীবনপাত করতে প্রস্তুত ছিলেন। ওয়াকেদীর বর্ণনায় মক্কার কুরাইশরা যখন হযরত খুবাইব রা. কে শূলিতে চড়িয়েছিল তখন কাফেররা তাকে বলেছিল, তোমার কেমন মনে হয়, যদি তুমি তোমার পরিবারের কাছে থাকতে আর মুহাম্মদকে তোমার স্থলে শূলিতে চড়ানো হত। তার কারণেই তো আজ তোমাকে প্রাণ দিতে হচ্ছে। তিনি তখন দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন,
‘রাসূল সা. যেখানে আছেন, সেখানে তাঁর পায়ে একটি কষ্টদায়ক কাঁটা বিদ্ধ হোক, আর আমি আমার পরিবারের কাছে থাকি, তাও আমি পছন্দ করি না।’ নবীজির প্রতি সাহাবায়ে কেরামের এ ধরনের ভালোবাসার অহরহ দৃষ্টান্ত সমাজের সামনে তুলে ধরতে হবে। কেননা, এখানে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, নবীজির সাথে উম্মতের ভালোবাসার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য গভীর চক্রান্তজাল বিস্তৃত হচ্ছে।
২। রাসূলে খোদা সা. এর ভালোবাসায় হৃদয় সিক্ত ও জীবনকে আলোকিত করতে হলে সবচে বড় প্রয়োজন তাঁর জীবনের প্রতিটি বিষয়ের অনুসরণ। ইবাদত-বন্দেগী, আহার-বিহার প্রতিটি ক্ষেত্রে শরীয়তের যাবতীয় হুকুম-আহকাম সানন্দে পালন করা এবং সেগুলো রাসূলে আকরাম সা. এর পদাঙ্ক অনুসারে হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে যতœবান হওয়া। মনে রাখতে হবে, রাসূলকে ভালোবাসলে অবশ্যই তার সুন্নাতকে ভালোবাসতে হবে। তাঁর আহলে বাইত ও সাহাবায়ে কেরামের ভালোবাসা অন্তরে জাগরুক রাখতে হবে। মুখে রাসূলের ভালোবাসার দাবি আর বাস্তবে তাঁর সুন্নাত ও আদর্শের বিপরীত কাজ করা হলে তা মুনাফেকির মধ্যে শামিল হবে।
৩। যুুগে যুগে কবি সাহিত্যিক ও মনীষীগণ রাসূলে পাকের প্রশংসায় যেভাবে নিজের প্রতিভা উজাড় করেছেন, তার চর্চা নতুন করে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারায় রাসূল প্রশস্তির এসব রচনা উম্মতের মহাসম্পদ। রাসূলে খোদার মজলিসে হযরত হাসসান ইবনে সাবেত রা. নবীজির যে প্রশংসা করেছেন এবং সীরাতগ্রন্থসমূহে যা স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে, পরবর্তী যুগের কবি-সহিত্যিকদের রাসূল প্রশস্তি তো তারই অনুকীর্তি। এগুলোকে অস্বীকার করার মানে হবে তো ইসলামের কম্বলের লোম বাছাই করার নামান্তর। বেদাতের চশমা চোখে এগুলোকে অস্বীকার করার ভয়াবহ প্রবণতার পরিণাম সম্পর্কে আমি শংকিত। ইদানিং একটা মানসিকতা তৈরি করা হচ্ছে যে, কুরআন হাদীসের বাইরে যাওয়া যাবে না। আমাদেরও কথা, অবশ্যই কুরআন হাদীসের বাইরে যাওয়া যাবে না। কিন্তু তাদের কথার উদ্দেশ্য হচ্ছে, কুরআন হাদীস ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে চর্চা করা যাবে না। এর জবাবে মদীনা শরীফের দুটি উদাহরণ দিতে চাই।
বনি তামিম গোত্রের লোকেরা মদীনায় এসে তাদের কবিকে দাঁড় করিয়ে দেয় কবিতার মাধ্যমে গোত্রীয় গৌরবগাঁথা বর্ণনার জন্যে। তারা বুঝাতে চাইল, মুহাম্মদ সা. ও মুসলমানদের চাইতে তারা শ্রেষ্ঠ। এই পরিস্থিতিতে নবীজি কুরআন মজীদ তেলাওয়াত করে তাদের জবাব দেয়ার জন্য বলতে পারতেন। কিন্তু জবাব দিলেন কাফেরদের ব্যবহৃত পদ্ধতিতে কবিতার মাধ্যমে। হযরত হাসসান ইবনে সাবেত রা. মসজিদে দাঁড়িয়ে নবী করিম সা ও ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের পক্ষে এমন বলিষ্ঠ কবিতা পাঠ করলেন, যার প্রভাবে বনি তামিম গোত্রের লোকেরা ইসলামের কোলে আশ্রয় নেয়। ঐতিহাসিকরা বলেছেন, হযরত হাসসান রা. বার্ধক্যের কারণে কোনো জিহাদে অংশ নিতে পারেন নি। তার জিহাদ ছিল সাহিত্যের ময়দানে। মক্কার কুরাইশরা নবীজির নিন্দাবাদ করত কবিতা দিয়ে। নবী করিম সা. এর নির্দেশে হযরত হাসসান রা. তাদের সমুচিত জবাব দিতেন। নবীজি ইসলামের প্রতিরক্ষায় হযরত হাসসানের কবিতা চর্চার জন্য মসজিদে মিম্বর তৈরি করে দিয়েছিলেন। তার জন্য দোয়া করেছিলেন, হে আল্লাহ! হাসসান যখন ইসলামের প্রতিরক্ষায় কবিতা চর্চা করে তখন তাকে রূহুল কুদসের মাধ্যমে সাহায্য কর।  এসব ঘটনা প্রমাণ করে নবীজির ভালবাসায় প্রাণ উজাড় করে কবিতা ও সাহিত্য চর্চা করা নবীজির আচরিত সুন্নত এবং পবিত্র ইবাদত।
১। রাসূল সা. এর প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসা নিয়ে বেশি বেশি দরূদ ও সালাম পাঠ করার ঘোষণা কুরআন মজীদ ও হাদীস শরীফে বিদ্যমান। যারা রাসূলের ভালোবাসা বলতে কেবল তাঁর আদর্শ অনুসরণ বলে বুঝেন তাদের বলব, রাসূলের প্রতি দরূদ ও সালাত পাঠের সরল অর্থ তো তার আদর্শের অনুসরণ নয়। অথচ কুরআন মজীদে দরূদ-সালামের নির্দেশটি দেয়ার আগে ভূমিকায় বলা হয়েছে, আল্লাহ ও তাঁর সকল ফেরেশতা নবীর প্রতি সালাত পাঠায়। এরপরই নির্দেশ দেয়া হয়েছে: ওহে যারা ঈমান এনেছ, তোমরাও তাঁর প্রতি সালাত পাঠাও এবং যথাযথভাবে সালাম নিবেদন কর। এরশাদ হয়েছে: ‘আল্লাহ নবীর প্রতি রহমত বর্ষণ করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও নবীর জন্য অহরহ রহমত কামনা করে। হে মু’মিনগণ তোমরাও নবীর জন্য রহমত কামনা কর (দরূদ পাঠ কর) এবং তাঁকে যথাযথভাবে সালাম জানাও।’ [সূরা আহযাব: আয়াত ৫৬]
২। নিঃসন্দেহে এই নির্দেশের পেছনে হেকমত ও দর্শন হচ্ছে মু’মিনের অন্তরে রাসূলের ভালোবাসা লালন করা। এ জন্যেই আযানের দোয়ায় নবীজি মুহাম্মদ সা. কে উসিলা ও মাকামে মাহমুদ দান করার জন্য মোনাজাত করতে শিক্ষা দেয়া হয়েছে প্রত্যেক মুসলমানকে।
বস্তুত রাসূলে খোদার ভালোবাসা মু’মিন জীবনের অতুলনীয় সম্পদ। জগতের যত ওলী-বুজুর্গ, মুসলিম জ্ঞানী-মনীষী সবাই এর চর্চা ও পরিচর্যা করেছেন। এই ভালোবাসার পরশেই ঈমান তাজা হয়। দ্বীনের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রেরণা জাগে। হৃদয় ও জীবন আল্লাহর ভালোবাসায় উদ্বেলিত হয়। মক্কা ও মদীনার সাথে প্রেমের বন্ধন মজবুত হয়। সেই প্রেমের আবহে গোটা বিশ্বে প্রেম-ভালোবাসার সমীরণ প্রবাহিত হয়। আল্লামা ইকবাল জওয়াবে শেকওয়ার শেষভাগে সেই প্রেমে বিশ্ববিপ্লবের ডাক দিয়েছেন। বলেছেন,
‘কুওয়াতে এশ্ক ছে হার পস্ত কূ বা’লা’ কর দে
দাহ্র কু ইস্মে মুহাম্মদ ছে উজালা কর দে’
“প্রেমের শক্তিতে সব কিছু ওলট-পালট করে দাও
মুহাম্মদের নামে দুনিয়াকে আলোকিত  করে দাও।”
অর্থাৎ বিশ্বে একটি বিপ্লব ঘটিয়ে দাও আর সে বিপ্লবের শক্তি নিহিত প্রেমের শক্তির মধ্যে। বিশ্ববিপ্লবের সেই শক্তি কোথায় পাবে তার পথ বলে দিয়েছেন নিচের ছত্রে। অর্থাৎ ‘বিশ্বকে মুহাম্মদের নামে উজালা-আলোকিত করে দাও’।
রাব্বুল আলামীন! দয়া করে আমাদেরকে তোমার সে বান্দাদের মাঝে শামিল করে দাও, যাঁদের সম্পর্কে তোমার প্রিয়নবী বলেছেন :
আনাস ইবনে মালেক রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমার মন চায়, আমি আমার ভাইদের সঙ্গে মিলিত হই। নবীজির সাহাবীগণ তখন বললেন, আমরা কি আপনার ভাই নই? নবীজি বললেন, তোমরা আমার সাহাবী-সাথী; কিন্তু আমার ভাই তারা, যারা আমার প্রতি ঈমান এনেছে; অথচ আমাকে দেখে নি।’ [মুসনাদে আহমদ]
আল্লাহুম্মা সাল্লে আলা সাইয়েদিনা মুহাম্মদ ওয়া আলিহী ওয়া আসহাবিহী ওয়াসাল্লিম ॥
লেখক: সাবেক শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, কলামিস্ট, বহুগ্রন্থ প্রণেতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight