প্রথম রোজার স্মৃতি / ইব্রাহিম হাসান হৃদয়

পড়ালেখার সুবাদে আমাকে নানার বাড়ি থাকতে হতো। তাই জীবনের প্রথম রোজা রেখেছি নানার বাড়িতেই। তখন ছিলো শীতকাল। প্রচ- শীতের মাঝেও প্রতিদিন সেহরি খেতে খেতে উঠতাম। নানু একা বলে আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতেন প্রতিদিনই। নিয়মিত সেহরি খেলেও নানু আমাকে রোজা রাখতে দিতেন না। বলতেন, তুমি এখন ছোট। তুমি দুপুরে একবার খেলে তোমার রোজা দুইটি হবে।
আস্তে আস্তে বুঝতে লাগলাম যে,দিনের বেলায় কিছু খেলে বা পান করলে রোজা হয়না। হ্যাপি আপু ও রহিম মামাসহ সবাই রাখে কিন্তু তারাতো দিনের বেলায় কিছু খায়না। তাই আমি নানুকে বললাম আমিও না খেয়ে রোজা রাখবো। নানু বললেন তুমি এখন ছোট বড় হলে রেখো। এখন খুব কষ্ট হবে। আমিও নাছোড় বান্দা। তাই সেহরি খেয়ে রোজা রাখতে শুরু করলাম। দুপুর পর্যন্ত খুব ভালোই কেটেছিলো। কিন্তু বেলা যত গড়াচ্ছিলো ক্ষুধার তীব্রতা ততই বাড়ছিলো। পিপাসায় গলা শুকিয়ে আসছিলো। আমি খুবই কাতর হয়ে পড়লাম। নানু আমার এই হাল দেখে আমাকে খুব বকা দিলেন। বললেন এখনো রোজা রাখার বয়স হয়নি তবুও রোজা রাখার জন্য পাগল হয়ে আছিস, রাখার বয়স হলে তখন খবরও থাকবে না।
আমি বিছানায় শুয়ে আছি। নানু কিছু খাবার আর পানি রেখে গেলেন এবং আমায় খেয়ে নিতে বললেন। প্রথমে ভাবলাম খাবো না কিন্তু ক্ষুধার জ্বালা সহ্য না হওয়ায় ঐদিন রোজা ভেঙে ফেললাম। আর সিদ্ধান্ত নিলাম আগামীকাল যতই কষ্ট হোক আমি রোজা রাখবোই। পরেরদিন সেহরি খেয়ে আবার রোজা শুরু হলো আমার। কিছুক্ষণ পর পর শুধু ঘড়ি দেখছিলাম। সময় কতটুকু পার হয়েছে। অতঃপর জোহরের আজান হলো। তাই নামা আদায়ের জন্য গোসল করে মসজিদে রওয়ানা হলাম। নামাজ আদায় করে কিছুক্ষণ মুয়াজ্জিন সাহেবের কক্ষে গিয়ে বসলাম। তিনি আমাকে আগ থেকে চিনতেন। আমার চেহারা দেখে হয়তো তিনি বুঝতে পারলেন আমি রোজা রেখেছি। তাই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ভাগিনা, তুমি কী রোজা রেখেছ? আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম, হ্যাঁ। তিনি বললেল, তুমি এখনো ছোট, এত কষ্ট করে রোজা রাখার কী দরকার।
তারপর আমি বাড়ি ফিরে এলাম। নানু আমাকে খানা খাওয়ার জন্য খুব পীড়াপীড়ি করলেন। কিন্তু আমি খেলাম না। সময় কাটানোর জন্য আবদুর রহিম মামার সঙ্গে ঘুরতে বের হলাম। মামা ভাগ্নের আড্ডা শেষ হতে না হতেই মিনার হতে ভেসে এলো মুয়াজ্জিনের সুমধুর ধ্বনি। আসরের নামাজ আদায় করলাম। তারপর ক্ষুধার তীব্রতা বাড়তে লাগলো খুব। তাই দ্রুত বাড়ি ফিরে এসে শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিলাম। আমার ছোট্ট শরীরটা আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে পড়লো। হাঁটার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলি।
সেদিন নানু আর আমাকে রোজা ভাঙতে বলেননি। মাথায় হাত রেখে বললেন, রোজা রাখার সাধ মিটেছে? আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো। সময় বেশি বাকি নেই। কোনোমতে ইফতারি সামনে নিয়ে বসলাম। মাগরিবের আজান হলো। ইফতারি মুখে নিলাম। আর এক নিমিষেই দূর হয়ে গেলো পুরো দিনের সব কষ্ট-ক্লান্তি। তার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ হয়ে গেলো আমার জীবনের প্রথম রোজা। সেই থেকে রোজা থাকতে শুরু করলাম আমি। প্রতি বছর বাড়তে লাগলো আমার রোজার সংখ্যা। প্রাপ্তবয়সে উপনীত হওয়ার আগেই রাখতে শুরু করি পূর্ণ রোজা।
আর আজ অবধি আর কোনো রোজা ভাঙিনি আমি। আল্লাহর মেহেরবানীতে যেন সারাজীবন পরিপূর্ণ রোজা রাখতে পারি। আমিন।

শিক্ষার্থী : দারুল উলুম মহিউসসুন্নাহ নুরপুর মাদ্রাসা,ফুলগাজী, ফেনী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight