প্রতিশোধ অভিযান

Upnnas

খলীফা হুসাইনের কথা শুনে তার বাপের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন এবং বললেন, হ্যাঁ ‘সন্তান পিতার গোপন ভেদ জানে’-এ প্রবাদটি প্রকৃতপক্ষেই সত্য। কারণ এই অভিমতটিই কিছুক্ষণ যাবত ব্যক্ত করছিলেন সেনাপতি জাওহার। আর এখন দেখছি তার ছেলেও পিতার সেই মতটিই আওড়াচ্ছে।.. আচ্ছা হুসাইন, তোমার বাবা বললেন, তুমি নাকি ঐ গাদ্দারদের পিছু ধাওয়া করেছিলে। আশা করি তুমি তাদের নাগাল পেয়েছ?
–    না, জনাব। আমি ওদের ধরতে পারেনি। তবে কিছু লোককে গাদ্দারদের ঐ জায়গার আশপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখে তাদেরকে গ্রেফতার করে নিয়ে এসেছি।..
–    তা কীভাবে?
–    পুরোটা রাত আমি শুধু ঐসকল স্থান চষে বেড়ালাম, যেসব স্থানে সাধারণ মানুষ ও মিসরগামী কাফেলা যাত্রা বিরতি দেয়। এভাবে আমি ‘কায়রাওয়ান’ থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছিলাম।..
–    তুমি কি রাস্তা ভুলে ওখানে চলে গিয়েছিলে?
–     না, বরং ঐ রাস্তা-ই। তার প্রমাণ হলো লিময়ার বর্ণিত সেই পত্রবাহক এবং তার হত্যাকারীর লাশ পাশাপাশি পড়ে থাকতে দেখলাম। এরপর আমি আমার লোকদেরকে ঐ স্থানটি ও তার আশপাশ তল্লাশি করার নির্দেশ দেই।.. ফলে তারা মিসর থেকে আগমণকারী এক কাফেলার সন্ধান পায়। আমি কাফেলার সর্দারকে এখানে নিয়ে এসেছি। যেন আপনি তার সত্যতা যাচাই করতে পারেন।..
–    ও কোথায়?
–    জেলখানায়।
খলীফা হাততালি দিলে; দাড়োয়ান প্রবেশ করল। তাকে কাফেলার সর্দারকে হাযির করার নির্দেশ দিলেন।
একটু পরই দাড়োয়ান ফিরে এল। তার সাথে মিসরীয় পোষাক পরিহিত পৌঢ় বয়সী একজন লোক। প্রচণ্ড ঘাবড়ে গিয়েছিল লোকটি। অনেক অস্থির দেখাচ্ছিল তাকে।
জাওহার তাকে অভয় দিয়ে বললেন, ভয় পেয়ো না। যা যা জিজ্ঞাসা করবো সত্য সত্য বলে দিবে। তুমি কে? কোত্থেকে এসেছ?
লোকটি কাঁপতে কাঁপতে বলল, জাহাপনা! আমি একজন নগণ্য দাস ব্যবসায়ী। মিসর থেকে এখানে এসেছি।..
খলীফা জিজ্ঞাসা করলেন, আমাদের দেশে কি উদ্দেশ্যে এসেছ?
লোকটি বলল, আমাদের মনিবা কাফূরের মেয়ের জন্য দাস-দাসী খরিদ করতে এসেছি।’
খলীফা হেসে বললেন, মিসরের দাস-দাসী কি তার মনঃপুত হয় না। তা কি ফুরিয়ে গেছে।
-না জনাব! তিনি মূলত বিভিন্ন জায়গা থেকে দাসী ক্রয় করে থাকেন। আর এক্ষেত্রে তিনি প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। এমনকি তিনি অধিকাংশ সময় দাস-দাসীদের বাজারে গিয়ে নিজেই পসন্দমত দাসী ক্রয় করে নিয়ে আসেন।..

এসব কথাবার্তার দ্বারা খলীফা বুঝতে পারলেন যে, লোকটি ঠিক তথ্যই দিয়েছে। ফলে তিনি তাকে যেতে নির্দেশ দিলেন।
লোকটি প্রস্থান করার পর খলীফা জাওহারের দিকে বললেন, আসলে আমি মিসর আক্রমণের ব্যাপারে অনেক দ্বিধা ও সংশয়ে ভুগছিলাম। মিসরের সেনাবাহিনী নিয়েও আমি শংকিত ছিলাম। কিন্তু এ লোকটির কথা শুনার পর মিসরের ব্যাপারে আমার সব শঙ্কা ও দ্বিধা দূর হয়ে গিয়েছে। কারণ, কোন দেশের কর্ণধার ও শাসকগণ যদি এমন ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে যায়, তাহলে সে দেশের শক্তি-সামর্থ বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এখন আমাদের মিসর আক্রমণের জন্য যা অতীব প্রয়োজন, তা হলো ‘অর্থ’।
লিময়া বলল, জাহাপনা! সম্পদও তো মজুদ!
এ কথাশুনে সকলেই তার দিকে বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকাল। উম্মুল উমারা বললেন, তা কীভাবে লিময়া!? এবং কোথায় সে সম্পদ?
লিময়া বলল, হ্যাঁ, ঐ সম্পদের তথ্য যা জানি সবই আপনাদেরকে খুলে বলব। ‘একদিন আকস্মিকভাবে আমি ঐ গাদ্দার আবু হামেদের কাছ থেকে একটি কথা শুনলাম। যার মর্ম তখন অনুধাবন করতে পারিনি। কিন্তু যখন তার ধূর্তামি ও খেয়ানত (বিশ্বাসঘাতকতা) প্রকাশ পেল, তখন আমি বুঝতে পারি ঐ কথার উদ্দেশ্য। সে বলছিল, ‘এইকজান’ পর্বতে ‘ফাজ্জুল আখয়ার’ নামে একটি জায়গা আছে। এ জায়গায় একটি ছোট শহরও গড়ে উঠেছে। শহরটির নাম ‘দারুল হুজরাহ’। আবু আব্দুল্লাহ আশশীয়ী এই শহরটি নির্মাণ করেছিল। এবং এস্থানেই সে অনেক সম্পদ জমা করেছিল। খলীফা মাহদীকে হত্যা করে ক্ষমতার মসনদ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘৃণ্য অভিলাষে। কিন্তু মাহদী তার এই ষড়যন্ত্র ধরে ফেলেন এবং তাকে হত্যা করেন। তবে মাহদী ঐ অর্থ-সম্পদ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। ফলে সে সম্পদ আজো সুরক্ষিত রয়ে গেছে।’
এটুকু বলে লিময়া একমুহূর্ত চুপ থেকে আবার বলতে থাকে, আমার বিশ্বাস যে, ‘আবু হামেদ’ এ সম্পদের খোঁজ পেয়েই অত্যাধিক সাহসী হয়েছে এবং এরপর থেকেই সে আপনাদের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র তোড়জোড়ভাবে চালাচ্ছে। সে ভাবছে, এ অর্থের দ্বারা বার্বারী কবিলাগুলোকে বাগিয়ে নেবে এবং তাদের সর্দারদেরকে কিনে নিতে পারবে।’..
খলীফা মুঈয বললেন, ঠিকই বলেছ লিময়া। তুমি যা বর্ণনা দিলে তাও বিলকুল সহীহ। .. এরপর তিনি জাওহারকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমার হয়তো মনে আছে, আবু আব্দুল্লাহ আশশীয়ীর এই ‘গুপ্তধন’ সম্পর্কে পূর্বে তোমার সাথে আলোচনা করেছিলাম?..
-হ্যাঁ, জনাব! তা আমার পুরোপুরি স্মরণ আছে। এই সম্পদের খোঁজে আমার লোকদেরকে সম্ভাব্য সবজায়গায় পাঠিয়েছি। কিন্তু তারা এর কোন সন্ধান পায়নি। তবে এখন তো আমরা লিময়ার বদৌলতে স্থানটি চিহ্নিত করতে পেরেছি। তাই এখন আমাদেরকে শীঘ্রই ঐ জায়গায় অভিযান চালাতে হবে।..
হুসাইন খলীফার দিকে তাকিয়ে বলল, জাহাপনা! এই গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিচালনার দায়িত্বভার আমাকে দিয়ে বাধিত করবেন।..
আরে! তুমি ছাড়া আর কে তা পারবে?! তবে সর্বদা চোখ-কান খোলা রাখবে। এতটুকু অসতর্কতায় ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনবে। আর মনে রাখবে ‘এইকজান’ পর্বত পর্যন্ত পৌঁছা বড়ই দুষ্কর ও বিপদসঙ্কুল।..
– আমীরুল মুমিনীনের খেদমতের বিপরীতে সকল কঠিনই আমার কাছে নগণ্য।..
এবার লিময়া বলল, আর আমি মিসরের অভ্যন্তরীণ অবস্থার খোঁজ-খবর নেওয়ার দায়ীত্ব নিতে চাই।..
উম্মুল উমারা বললেন, লিময়া! তা কী করে সম্ভব! এটা তোমার জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।’
-না আম্মাজান। আল্লাহ তা‘আলার ফযলে আমার জন্য তা অনেক সহজ হবে।  আর আমি অনেক চিন্তা-ফিকিরের পরই এই আব্দার পেশ করছি। এবং আমি আমীরুল মুমিনীনকে এ প্রতিশ্র“তি দিতে পারি যে, আমি তাঁকে মিসরের মাটি সম্পর্কে তাজা ও নির্ভুল তথ্য দিব ইনশাআল্লাহ।’
-‘আল্লাহ তা‘আলা তোমার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল করুন, বেটি। সত্যের পথে তোমাকে আরো দৃঢ়পদ করুন।’..এবলে খলীফা মজলিস থেকে উঠে গেলেন। এরপর জাওহারও প্রস্থান করেন। সবশেষে উম্মুল উমারা উঠলেন। তাঁর পিছুপিছু লিময়া এবং  হুসাইন উঠল।
উম্মুল উমারা বলতে লাগলেন, আজ সত্যিই তোমরা দু’জন আমার অন্তরকে শীতল করে দিয়েছ। আমি তোমাদেরকে নিয়ে গর্বিত। আল্লাহর কাছে দু‘আ করছি। তিনি যেন আমাকে কোনদিন তোমাদেরকে পুরস্কৃত করার তাওফীক দান করেন।
হুসাইন বলল, কোন মানুষকে কি তার দায়িত্ব পালনের প্রতিদান দেওয়া যায়?
লিময়াও তার সাথে সুর মিলিয়ে বলল, হুসাইন ! আপনি বিলকুল  ঠিক বলেছেন। এরপর সে উম্মুল উমারার দিকে ফিরে বলল, আম্মাজানের নিকট আরজি পেশ করতে চাচ্ছি। আশা করি তা পূরণ করবেন। উম্মুল উমারাও কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আরজিটি কী?
– আমি জানতে পেরেছি যে, আমীরুল মুমিনীনকে এই ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের সংবাদদাতা মিসরের অধিবাসী  ‘ইয়াকুব বিন কাল্স’কে কৃতজ্ঞতা পত্র পাঠাবেন।
– হ্যাঁ, তুমি ঠিকই শুনেছ।
– তো আমিই হতে চাই তাঁর পত্রবাহক।
– কিন্তু, এর পিছনে তোমার উদ্দেশ্য কী?
– আমার বিশ্বাস ইয়াকুব বিন কাল্সই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি মিসরের অভ্যন্তরীণ অবস্থা জানার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করতে পারবেন। বিশেষ করে তিনি যখন জানবেন যে, আমি আমীরুল মুমিনীনের পক্ষ থেকে প্রেরিত, তখন তো আমি আরো যতœ ও সমাদর পাবো। …
উম্মুল উমারা তার যুক্তিতে আশ্বস্ত হয়ে ওয়াদা দিলেন যে, ইবনুল কাল্সের কাছে তুমিই পত্র নিয়ে যাবে।
কিন্তু এরপরেই উম্মুল উমারার মনে পড়ে গেল, লিময়া ও হুসাইনের বিয়ের কথা।  ফলে হুসাইনকে লক্ষ্য করে বললেন, আচ্ছা, তোমার বিবাহনুষ্ঠানের কোন দিন-তারিখ ঠিক করেছ?
হুসাইন লিময়ার দিকে তাকিয়ে বলল, না আম্মাজান! আমরা সিদ্ধান্ত  নিয়েছি যে, আরো কিছুদিন পরে আমাদের বিবাহ সম্পন্ন হবে।
উম্মুল উমারা বুঝতে পারলেন যে, লিময়া-ই বিবাহ পেছাতে চাচ্ছে। বললেন, কী ব্যাপার বেটি! এত বিলম্ব কি পিতৃশোকের কারণে?
– না আম্মাজান। ব্যাপারটি এমন নয়। বরং বিয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কাজ আমাদের সামনে এসে গেছে, তাই। তাছাড়া অনেক পূর্বেই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে, আমি খলীফার সাহায্য করবই। তাছাড়া আমি যতদিন পর্যন্ত স্বচক্ষে নীলনদের তীরে খলীফার পতাকা পতপত করে উড়তে না দেখব, ততদিন পর্যন্ত আমি মনে স্বস্তি পাব না।
দ্বিতীয়ত ঐ গাদ্দারদের থেকে আমার পিতার হত্যার প্রতিশোধ নিতে হবে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে হুসাইনের সাথে সমঝোতা হয়েছে। উম্মুল উমারা মুচকে হাসলেন। লিময়ার প্রতি তাঁর আকর্ষণ ও অনুরাগ আরো বেড়ে গেল। বললেন, লিময়া! আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন। তুমি অত্যন্ত বুদ্ধিমতি ও বিচক্ষণা।
এরপর হুসাইনের দিকে ফিরে বললেন, আর হুসাইন! তোমার পরিকল্পনা কী এখন?
– আমি ‘ফাজ্জুল আখয়ার’-এর মিশন সম্পন্ন করে মিসরে গিয়ে লিময়ার সাথে মিলিত হবো।
লিময়াও তার কণ্ঠে তাল মিলিয়ে বলল, হ্যাঁ, মিসর নীলনদের তীরে খলীফা মুঈয লিদীনিল্লাহর রাজপ্রাসাদে’ আমাদের দেখা হবে ইনশাআল্লাহ।
উম্মুল উমারার ললাট উজ্জ্বল হলো। তার দু’চোখ আনন্দাশ্র“তে জ্বলজ্বল করে ওঠল। খুশিতে তিনি দু’হাতে উভয়কে জড়িয়ে নিলেন। এরপর বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহ চাহে তো তোমাদের বিবাহ, বাসর- সব মিসরেই সম্পন্ন হবে। …..
হুসাইন উমারার হাতে চুমু খেল। এবং আদর ও দুআ নিয়ে বিদায় নিল।
পরদিন উম্মুল উমারা ইয়াকুব ইবনে কাল্সের প্রতি আমীরুল মুমিনীনের প্রশংসাপত্র নিয়ে এলেন। পত্রটি তিনি লিময়াকে দিলেন। এদিকে লিময়াও মিসর সফরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোঁজগাছ করল। তার সফর সামগ্রীর মধ্যে ছিল চারটি ঘোড়া। সাথে প্রয়োজনীয় খাবার ও পানি। কাফেলাকে সে এমনভাবে বিন্যাস করে যে, বাহ্যত মনে হবে যেন সে খলীফার পক্ষ থেকে মিসর অধিপতির নিকট গুরুত্বপূর্ণপত্র বহন করে নিয়ে যাচ্ছে।
ভাষান্তর : নজীবুল্লাহ ছিদ্দীকী
শিক্ষাসচিব, আল-মান্হাল মডেল কওমী মাদরাসা, উত্তরা, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight