পিতামাতাকে রাযী-খুশী রাখার কতিপয় নীতিমালা: আবদুল মালেক মুজাহিদ

পিতামাতাকে রাযী ও খুশী রাখতে হলে তাঁদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে। রক্তের সম্পর্ক এরই নাম যে, সম্মানিত মাতা বা শ্রদ্ধেয় পিতার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সাথে সাক্ষাত করতে হবে, তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে এবং তাঁদেরকে প্রেমপূর্ণ ও সুন্দর উপাধি দ্বারা সম্বোধন করতে হবে। যেমন, বলতে হবে চাচাজান, খালুজান, মামুজান ইত্যাদি।
আমাদের সমাজে তো এটা সাধারণ কথা যে, পিতার যত আত্মীয়-স্বজন রয়েছেন তাঁদের সকলকেই চাচা বা আঙ্কেল বলা হয়ে থাকে এবং যত মহিলা আত্মীয়-স্বজন রয়েছেন তাঁদেরকে ফুফু বা আনটি বলা হয়। অনুরূপভাবে মাতার আত্মীয়-স্বজন পুরুষকে মামা এবং মহিলাদেরকে খালা বলা হয়ে থাকে। এখন তো অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে, নচেৎ আমাদের বাল্যকালে নিজের এলাকার যদি কোন মেয়ে অন্য কোন শহর বা গ্রামে কনে রূপে যেত তবে সবাই তাকে নিজের বোন বা কন্যা মনে করত। তার অধিকার সমূহের প্রতি লক্ষ্য রাখত। মোটকথা রক্তের সম্পর্ক এরই নাম যে পিতামাতার আত্মীয়-স্বজনদের সাথে প্রেম-প্রীতি ও সম্মানমূলক আচরণ করতে হবে। যথা সম্ভব তাঁদেরকে উপহার-উপঢৌকন প্রদানে ভূষিত করতে হবে।
মাতার ঘরে যদি আলমারি থাকে অথবা কোন বাক্স থাকে তবে সেখানে শিশুদের জন্যে লাটিম, বিস্কুট, খেলনা ইত্যাদি রেখে দিতে হবে। যখন তাঁর নাতী-নাতনী অথবা নিকটতম আত্মীয়দের শিশুরা তাঁর নিকট আসবে তবে তিনি তাদেরকে এসব খেলনা প্রদান করবেন। এর ফলে শিশু ও দাদী-নানীদের মধ্যে  ও ভালোবাসার সম্পর্ক বেশি গাঢ় ও মজবূত হবে। আর এর ফলে শিশুরা দাদী-নানীদেরকে অত্যন্ত সম্মান করতে শুরু করবে। বড় বড় বৃদ্ধা মহিলারা নাড়–, গুড়, বুট ইত্যাদি লুকিয়ে রাখতেন। আমরা শিশুরা তাঁদের সাথে সাক্ষাত করতে গেলে তাঁরা ঐ খাদ্যগুলি আমাদের সামনে পেশ করতেন। এসব স্বাদ ও আনন্দ এখন দিন দিন উঠে যাচ্ছে! কিন্তু এই রীতি নীতি ও প্রথাগুলি চালু করা আদৌ কঠিন নয়। এখন তো পূর্বের তুলনায় উপায় বহুগুণে বেশি রয়েছে।
ধরুন, আপনার পিতামাতা অন্য কোন শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হচ্ছেন। এ অবস্থাতেও আপনি ইচ্ছা করলে তাঁদের খেদমত করতে পারেন। যেমন, টেলিফোনের মাধ্যমে প্রত্যহ আপনি তাঁদের খোঁজ-খবর নিবেন। এ কাজটি তাঁদের জন্য গৌরবেরও কারণ হয়ে যাবে। তাঁরা যাদের বাড়িতে অবস্থান নিবেন তারা উপলব্ধি করবে যে তাঁদের পুত্র তাঁদের প্রতি কতই সজাগ এবং তাঁদেরকে কতই মুহাব্বাত করে যে, দিনে কয়েকবার টেলিফোন করে তাঁদের খোঁজ-খবর নিচ্ছে!
আল্লাহ না করুন, কোন সময় আপনার উপর কোন বিপদাপদ আসতে পারে অথবা কোন দুঃখজনক খবর আপনি পেতে পারেন, এমতাবস্থায় পিতামাতাকে এ খবর দেয়ার ব্যাপারে বড়ই সতর্কতা ও ধৈর্য অবলম্বন করবেন। তাঁদেরকে বলবেন, এতে চিন্তাম্বিত হওয়ার কোন কারণ নেই। ইনশাআল্লাহ এর মধ্যে কোন মঙ্গল নিহিত রয়েছে। আপনারা নিশ্চিত থাকুন। আল্লাহ তাআলা অতি সত্বরই এই কাঠিন্যকে সহজ করে দিবেন! আপনারা দুআ করুন! তাঁদের সামনে দুঃখজনক খবরও সাধারণভাবে বর্ণনা করার চেষ্টা করবেন।
মনে করুন, আপনার স্ত্রীর সাথে আপনার মনোমালিন্য হয়েছে। সাধারণত, বাড়িতে এরূপ হয়েই থাকে যে, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মতানৈক্য হয়ে যায়। এই অবস্থায় স্বীয় পিতামাতাকে যথা সম্ভব এই তিক্ততার ব্যাপারে কিছুই বলবেন না। আপনি তাঁদের অন্তরের টুকরো। আপনি যদি সামান্য পরিমাণও উদ্বিগ্ন হন তবে তাঁরা আরও বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বেন। এ কারণে আপনি পূর্ণভাবে চেষ্টা করবেন যে, আপনার পারিবারিক জীবনের মতানৈক্য ও দুঃখজনক সংবাদ যেন আপনার পিতামাতা জানতে না পারেন। আপনাদের স্বামী-স্ত্রীর মতানৈক্য ও অন্যান্য দুঃখজনক বিষয় নিজেরাই মীমাংসা করে নিবেন।
মাতার সামনে স্বীয় স্ত্রীর অযথা প্রশংসা করবেন না। মাতাকে অপ্রয়োজনীয় কথা বলা মোটেই উচিত নয় যে, স্বীয় স্ত্রীকে আপনি কি কিনে দিয়েছেন বা আপনার স্ত্রী আপনাকে কি দিয়েছে। আপনি একটু চিন্তা করে দেখুন যে, বিবাহের পূর্বে আপনি আপনার মাতার অতি নিকটে ছিলেন। আপনার প্রত্যেক কাজ কারবারে আপনার মাতা শরীক থাকতেন। এখন হঠাৎ করে একজন মহিলা স্ত্রী হিসেবে আপনার জীবনে প্রবেশ করে গেছে। সে আপনার পিতামাতার মাঝে বাধাযুক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাভাবিক কথা এই যে, পূর্বে যে সময়টা আপনি আপনার মাতাকে দিতেন এখন তাতে ঘাটতি পড়ে গেছে। চেষ্টা করবেন যেন মাতা ও স্ত্রী উভয়ের হক আদায় হয়। তাঁদের উভয়ের মধ্যে প্রেম-প্রীতি ভালোবাসা এবং সম্মানের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করবেন। উভয়কে উপযুক্ত সময় প্রদান করবেন। মাতাকে এটা অনুভব করতে দিবেন না যে, ছেলের বিবাহের পর তাঁর হক হ্রাস পেয়েছে বা এতে অন্য কেউ শরীক হয়ে গেছে। ভাই-বোনদের সাথে আপনার সম্পর্ককে অতি উত্তম করবেন। যদি আপনার ভাই-বোনদের সাথে কোন মতানৈক্য প্রকাশ পায় তবে তা আপনার মাতার সামনে প্রকাশ করবেন না।
যদি আপনার পিতামাতার ধর্মীয় শিক্ষা বেশি না থাকে তবে আপনার উপর দায়িত্বের বোঝা বেড়ে যাবে। সুতরাং তাঁদের সাথে বড়ই নিপুণতা, অত্যন্ত বুঝ ও বিবেক-বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে কথা বলবেন। তাঁদের খেদমত উত্তম পন্থায় চালু রাখবেন। তাঁদের মধ্যে এই অনুভুতি জাগ্রত হতে দিবেন না যে, তাঁদের তো কিছুই জানা নেই। তাঁদের বিদ্যার স্বল্পতা বড়ই সতর্কতা ও সম্মানের সাথে পুরো করতে হবে। কখনও তাঁদের খেদমতে বিশুদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষার কোন উত্তম পুস্তক পেশ করবেন। আবার কখনও কোন আলেমে হক্কানীর বক্তৃতার ক্যাসেট তাঁদেরকে শুনাবেন। কোন জায়গায় দ্বীনি শিক্ষার বৈঠক হলে তাঁদেরকে দ্বীনি শিক্ষা লাভ করে নিজেদের বিদ্যার স্বল্পতা দূর করতে পারেন।
পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের একটি উত্তম সুযোগ হচ্ছে হজ ও উমরা। আপনি এই বড় রুকন আদায় করানোর জন্যে তাঁদের সাথে যাবেন। হজ পালন বড়ই কঠিন কাজ। বিশেষ করে মহিলাদের জন্য তো এটা একটা জিহাদই বটে। আপনি তাঁদের জন্য একজন প্রকৃত রক্ষক হয়ে যাবেন। পদে পদে তাঁদেরকে পথ প্রদর্শন করবেন। স্বীয় কথোপকথন ও কাজ দ্বারা এটা সাব্যস্ত করবেন যে, আপনি তাঁদের একজন প্রকৃত অনুগত পুত্র। এই বিরাট সুযোগকে নিজের জন্যে গণীমত মনে করবেন এবং নিজের পুণ্য বৃদ্ধি করবেন।
যদি কোন দুঃখজনক সংবাদ এসে পড়ে তবে এ সংবাদ পিতামাতাকে তৎক্ষণাৎ শুনাবেন না; বরং সুযোগ ও স্থানের প্রতি লক্ষ্য রেখে উপযুক্ত সময়ে সতর্কতামূলক ভাষায় শুনাবেন। চেষ্টা করবেন যে, যদি কোন দুঃসংবাদ হয় তবে তা হতে সতর্ক করার জন্যে নিজেই তাঁদের খেদমতে হাজির হয়ে যাবেন। তাঁদেরকে অত্যন্ত আদবের সাথে সালাম করবেন।
অতঃপর তাঁদের পাশে বসে যাবেন। যখন কথোপকথন শুরু করবেন তখন ধৈর্যের গুরুত্ব এবং ইসলামে ধৈর্যশীলদের জন্যে মহাপুণ্য ও প্রতিদানের কথা উল্লেখ করে কথোপকথন করবেন। যখন অনুভব করবেন যে, তাঁরা এখন বোধশক্তির উপর ভিত্তি করে দুঃসংবাদ শুনার জন্যে প্রস্তুত হয়ে গেছেন তখন তাঁদেরকে এ খবর বা ঘটনা শুনিয়ে দিবেন।
মানুষের এটা স্বভাব যে, তারা কখনও বৃদ্ধ হতে বা বৃদ্ধ বলে ডাক শুনতে পছন্দ করে না। পুরুষ হোক অথবা মহিলা হোক নিজেদের ব্যাপারে ভালকথা বা ভালো উপাধি শুনতেই ভালোবাসেন। সুতরাং আপনি সর্বদা পিতামাতার উদ্দেশ্যে এরূপ বাক্যই প্রয়োগ করবেন। যেমন বলবেন, “মাশাআল্লাহ! এখনও তো আপনি যুবকই রয়েছেন। আপনাকে কে বলেছে যে, আপনি বৃদ্ধ হয়ে গেছেন? আপনার দৈহিক সুগঠনের কারণে আপনাকে আপনার প্রকৃত বয়সের অপেক্ষা কম বয়সের দেখাচ্ছে। এখন তো আপনি সম্পূর্ণরূপে সুস্থই আছেন! আপনার শব্দ শুনে একেবারে এরূপই মনে হচ্ছে যে, আপনি স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে পূর্ণভাবে সঠিক অবস্থাতেই আছেন। এ ধরণের উৎসাহ দায়ক বাক্যগুলি অতিবৃদ্ধ ও রোগীদেরকেও সুস্থ ও সবল করে তোলে। একবার সিরিয়া সফরে গিয়েছিলাম। সেখানে একিট গ্রামে যাওয়ারও সুযোগ ঘটে আমার। দু’জন সৌদি বন্ধুও আমার সফর সঙ্গী ছিলেন। আমরা ঐ গ্রামের চৌধুরী সাহেবের মেহমান ছিলাম। পাঞ্জাবে যেমন চৌপাল নির্মিত হতো, ঠিক তেমনই ধরণের বড় একটা কক্ষ ছিল যার মধ্যে বসার জন্যে চেয়ারসমূহ রক্ষিত ছিল। গ্রামের লোকেরা যখন জানতে পারে যে, চৌধুরী সাহেবের ওখানে সৌদি আরব হতে মেহমান এসেছেন তখন তারা আমাদের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে দলে দলে আসতে শুরু করে। তাদের মধ্যে সত্তর-আশি বছরের বৃদ্ধ লোকও ছিলেন। যখনই তারা প্রবেশ করতেন তখনই কেউ না কেউ বলে উঠত “মাশাআল্লাহ! “শাবাব” (যুবক) প্রবেশ করেছেন। “শাবাব” শব্দটি শুনে এর ভাবার্থ বুঝতে আমাদের বিলম্ব হচ্ছিল যে, বৃদ্ধদের লালিমা মিশ্রিত চেহারা আরও লাল হয়ে যেত। প্রকাশ থাকে যে, সিরিয়াবাসী বড়ই সুন্দর ও লাল সাদা মিশ্রিত চেহারার অধিকারী হয়ে থাকে।
একথাটি সদা-সর্বদা সামনে রাখতে হবে যে, শিশুদের মত পিতামাতাও নিজেদের প্রশংসা শ্রবণ করা পছন্দ করেন। যদি তাঁরা কোন ভাল পোশাক পরিধান করা পছন্দ করে থাকেন তখন তাঁদেরকে বলতে হবে “ এ কাপড় আপনাকে (পিতামাতাকে) খুব মানাচ্ছে! ঐ সময় দেখতে পাবেন যে, তাঁরা আপনার এ কথা শুনে খুব আনন্দিত হবে। কবিতা বা কবিতাংশ তাঁদের সামনে পাঠ করবেন। যদি আপনার কণ্ঠ মধুর হয় এবং আপনি মধুর সুরে পাঠ করতে সক্ষম হন তবে তাঁদের সামনে ভালো ভালো কবিতাগুলি পাঠ করবেন।
পিতামাতার নিকট নিজের ছেলেদের কণ্ঠস্বরও খুব ভালো লাগে। আমার শৈশবের কথা স্বরণ রয়েছে যে, যখন আমি আমার পিতামাতার সামনে কবিতা পাঠ করতাম তখন তাঁরা অত্যন্ত আনন্দিত হতেন। যখন কিছুটা বড় হলাম তখন চেষ্টা করতাম যে, কোন রসিকতাপূর্ণ কথা তাঁদের সামনে বলে দেব যাতে তাঁরা মুচকি হেসে দিবেন।
মোটকথা, পিতামাতাকে কোনক্রমেই এটা অনুভব করতে দেয়া যাবে না যে, তাঁরা বৃদ্ধ হয়ে গেছেন; বরং তাঁদের মধ্যে এই অনুভুতিই জাগিয়ে তুলতে হবে যে, তাঁরা সম্পূর্ণরূপে সুস্থ্য ও সবল আছেন।
পিতামাতার সামনে অন্য লোকদের শিক্ষা-দীক্ষার উল্লেখ করে বেশি কথোপকথন করা উচিত নয় যে, অমুকের পুত্র উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত বা তাকে উত্তমরূপে লালন-পালন করা হয়েছে। আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা এবং লালন-পালন এভাবে হয়নি। এরূপ কথোপকথনের কারণে তাঁদের অন্তরে এভাবটি আসতে পারে যে, তাঁরা তাঁদের ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার ব্যবস্থা করতে পারেননি অথবা তাঁদের ছেলে তাঁদের লালন-পালনে সন্তুষ্ট নয়। পিতামাতার পাশে বসলে তাঁদের সাথে মুচকী হেসে কথোপকথন করতে হবে। কখনও কখনও যদি রসিকতার উপলক্ষ এসে পড়ে তাহলেও কোন ক্ষতি নেই। তাঁদেরকে মাঝে মাঝে কোন সুন্দর ঘটনা, কোন সত্য কৌতুক বা কোন ভালো কবিতা শুনানো উচিত। এভাবে বাড়ির পরিবেশকে ভালো ও সুন্দর করতে বড়ই সাহায্য পাওয়া যায়। দেশ বা বিশ্বের অবস্থা উল্লেখ করে তাঁদের সাথে কথোপকথন করতে হবে। কোন গুরুত্বপূর্ণ খবর থাকলে তাঁদেরকে অবশ্যই শুনাতে হবে। এর উপর নিজেকেও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে হবে এবং তাঁদেরকেও ফলাফল জানাতে হবে। কতিপয় লোকের পিতামাতা উচ্চ শিক্ষিত হন। তাঁদের জ্ঞান ও আমলের অভিজ্ঞতা থেকে উপকার লাভ করার এটা একটা উত্তম সুযোগ। এর থেকে খুবই উপকৃত হওয়া প্রয়োজন। তাঁদের নিকট আবেদন জানাতে হবে “আপনাদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এবং ব্যাপক পাঠের আলোকে বলুন যে, বর্তমান অবস্থায় আমাদের কি করা উচিত! এর ফলে আপনি অনুভব করতে পারবেন যে, আপনার পিতামাতা আপনার এ কথায় অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছেন। এভাবে তাঁরা আপনার অত্যন্ত নিকটে হয়ে যাবেন। একথাটি স্মরণ রাখতে হবে যে, প্রত্যেক পিতাই চান যে, তাঁর সন্তানগণ তাঁর চেয়ে সম্মুখে এগিয়ে যাক। তিনি আপনার হতে কিছুই গোপন করবেন না। স্বীয় কথোপকথনে বার বার একথাটি উল্লেখ করবেন যে, আপনি যা কিছুই হন না কেন সবই আপনার পিতামাতারই শিক্ষার ফল। এর ফলে পিতামাতা মনে তৃপ্তি লাভ করবেন। এতে তাঁরা অনুভব করবেন যে, তাঁরা নিজেদের সন্তানদেরকে যেভাবে লালন-পালন করেছেন ও তাদেরকে শিক্ষিত করে তুলেছেন তার সুন্দর ফল তাঁদের সামনেই রয়েছে।
আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা, ‘আমি আমার সন্তানদের সাথে হালাল জীবিকার উল্লেখ করে কথা বলেছি, এবং তাদেরকে উপদেশ দিয়েছি সূদের পয়সা কখনও গ্রহণ করবে না, কারও সাথে প্রতারণা করবে না। আমার এই উপদেশ বাণী শুনে আমার ছেলেরা আমাকে উত্তর দেয়, আব্বাজান! আপনি আমাদেরকে যেভাবে লালন-পালন করেছেন ও সুন্দর শিক্ষা দিয়েছেন ইনশাআল্লাহ  আমরা এরই আলোকে আপনার বিশ্বাসের উপর আঘাত হানব না। তারপর কয়েকবার তারা এই কথারই পুনরাবৃত্তি করে। তাদের এই কথায় আমি যে আনন্দ অনুভব করেছিলাম তার শীতলতা আজ আমি আমার বক্ষে অনুভব করছি।
আজ যখন আমি এই শব্দগুলি লিখছি তখন আমার ভালোরূপ অনুমান রয়েছে যে, ছেলেরা উত্তম তরবিয়াতের ফলে ভালো কার্যাবলীর বসন্তকাল পিতামাতার জীবদ্দশাতেই পেশ করে থাকে, তখন এর ফলে তাঁরা সীমাহীন আনন্দ লাভে ধন্য হন। আমাদেরকে এটা স্বীকার করতেই হবে যে, আমরা যা কিছুই হইনা কেন, ওটা পিতামাতার উত্তম শিক্ষা ও লালন-পালনেরই ফল। সমস্ত পিতামাতা নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী নিজেদের সন্তানদের জন্যে সাধ্যের অতিরিক্ত খরচ করে থাকেন। তাঁদের এটাই আকাঙ্খা হয় যে, তাঁদের সন্তানরা যেন সামনে এগিয়ে যায়, উত্তম শিক্ষা লাভ করে, তাদের ভবিষ্যৎ সুন্দর হয় এবং তারা বড় মানুষ হয়ে যায়। এখন, যখন আপনি যৌবনে পদার্পণ করেছেন, আর আপনার পিতামাতা বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন, এমতাবস্থায় তাঁদের তরবিয়ত, তাঁদের পরিশ্রম তাঁদের জন্যে অসীম আনন্দের কারণ হয়ে থাকে। এজন্যে পিতামাতার সামনে তাঁদের সমুদয় ত্যাগের কথা স্বীকার করে নিতে হবে। এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করা চলবে না।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight