পাহাড়ের পাদদেশে / মোস্তফা কামাল গাজী

পাহাড়ের গা ঘেঁসে পিচের সরু রাস্তা। হাজারো গাড়ির সথে এগিয়ে চলছে আমাদের মাইক্রোটাও। পাহাড়ের পাদদেশে বিশাল খাদ। রাস্তার দু’পাশে লোহার রেলিং দেয়া। গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাতে খাদে না পড়ে সেজন্য এ ব্যবস্থা। একটু পরপর বাঁক। মোড় নিতে গেলে গা ছমছম করে। এই বুঝি সামনের কোনো গাড়ির ধাক্কায় খাদে পড়ে যাই! কিন্তু না। রাস্তাটা বিপদজনক হলেও এক্সিডেন্টের হার শূন্যের কোঠায়। মাইক্রোতে আমরা ছজন। যাচ্ছি বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র মলসুরিতে। এর অবস্থান ভারতের উত্তরাখ- প্রদেশে। সমতল ভূমি থেকে প্রায় সাত হাজার ফুট উঁচুতে এ শহর। পর্যটকদের মন ছুঁয়ে নিতে এর বেশ সুনাম রয়েছে। ব্যস্ততার ফাঁকে একটু ঠা-া পরশ নিতে ছুটে আসেন তারা। একের পর এক বাঁকে মোড় নিতে গিয়ে ঝিমিয়ে পড়লাম একসময়। তবুও বাইরের অনিন্দ্য রূপ দেখে এগোতে থাকি। দূরে যোজন যোজন পাহাড়ের সারি। তার পেছনেও শুভ্র পাহাড়। মনে হলো, একবার যদি সেখানটায় যেতে পারতাম! ড্রাইভার বললেন, কাছে দেখা গেলেও পাহাড়টা বেশ দূরে। একটা টি স্টলের সামনে খানিকটা যাত্রাবিরতি দিলেন ড্রাইভার। চা পান করে ফটো তুলে নিলাম কয়েকটা। ফের চড়ে বসলাম গাড়িতে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর পৌঁছুলাম মলসুরির ঝরনার পাদদেশে। গোসলের কাপড় নিয়ে হুড়মুড় করে নামলাম গাড়ি থেকে। সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে এসে দাঁড়ালাম ঝরনার কাছে। এই প্রথম দেখলাম ঝরনা। আনন্দ আর বিস্ময়ের সীমা রইলো না। পাথরের গা ছুঁয়ে অবিরাম গড়াচ্ছে জল। নীরবে, নিভৃতে। এর চেয়ে অভিনব দৃশ্য আর হয় না। ঝরনার পানির ওপর ছোট্ট একটা ব্রিজ। সেখানে ওঠে বন্ধুদের সাথে আনন্দ মেতে রইলাম কতোণ। ঝরনার দৃশ্য নিয়ে ফটো তুলে নিলাম কয়েকটা। আনেকেই গোসল করছে ঝরনার পানিতে। চারপাশটা সুইমিংপুলের মতো টাইলস দিয়ে বাঁধানো। কাপড় বদল করে আমরাও নেমে পড়লাম। ঠা-ায় যেনো বরফ বনে গেলাম। ঠকঠক করে কাঁপছি। আনন্দ একটু কমলো না তবুও। ঝরনায় দাঁড়িয়ে সেলফি তুললাম। সাঁতার কাটলাম মনভরে। পরস্পরে পানি ছিটিয়ে মজা করলাম। গোসলপর্ব শেষ করে আরেকটু ওপর উঠলাম ঝরনার মূল উৎস দেখাবো বলে। সামনে যাওয়ার পথ নেই বলে দেখা হলো না আর। কান্ত দেহ নিয়ে গাড়িতে আসলাম। দুপুরের খাবার শেষ করে গাড়িতে ফের চড়ে বসলাম। ড্রাইভার আমাদের নিয়ে চললেন, মলসুরির মেইন স্পট ‘মালরোড’। ঘণ্টাখানেক পর পৌঁছুলাম সেখানে। পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়া এটি। এক কোণে এসে নিচে তাকালাম। আমি যেনো মহাশূন্যে ভাসছি! হাজর হাজার ফুট উঁচু থেকে নিচের পৃথিবীটা দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশাল দালানগুলোকে মনে হচ্ছিলো সাদা কিছু পলিথিন পড়ে আছে! গাড়িগুলো যেনো ছোট ছোট পিঁপড়া। এখানের জনজীবন খুবই বিচিত্র ও আশ্চর্যকর। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে খোপের মতো ছোট ছোট ঘর। কোনমতো ঝুলে আছে যেনো। জুমচাষ করে কাটে তাদের দিন। ওপর-নিচে বারবার আসা- যাওয়া করেও যে কান্ত হয় না, সেটাই অবাককর বিষয়। পাহাড়ের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠেছে বলেই হয়তো সম্ভব। আমরা হেঁটে হেঁটে পাহাড়ের আরেকটু ওপর ওঠলাম। বর্ষায় নাকি এখানে মেঘেরা ভেসে বেড়ায়। হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়। আজ রৌদ্রজ্জ্বল দিন। মেঘের দেখা মিললো না তাই। সে আফসোসটা রয়েই গেলো।
সূর্যটা হেলে পড়েছে পশ্চিম আকাশে। সন্ধ্যে হতে বাকি নেই। পাহাড়ের অভিনব জগৎটা মনে নিবিড়ভাবে দৃশ্যায়ন করে ফিরে চললাম মাদ্রাসার পথে।
দেওবন্দ, ভারত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight