পবিত্র হজ : তাৎপর্য ও ফযীলত

হজ ইসলামের মৌলিক পাঁচটি স্তম্ভের একটি অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। সময় পরিক্রমায় প্রতি বছর ফিরে আসে এ পূন্যময় ইবাদত পালনের মৌসুম। আর তখন প্রিয় মনিবের নৈকট্য লাভের আশায় ব্যাকুল হয়ে ওঠেন অসংখ্য আনুগত্যশীল বান্দা। নশ্বর এ পৃথিবীর মোহমায়া ভুলে মহান সৃষ্টিকর্তা রাব্বুল আলামিনের প্রেমে পাগলপারা হয়ে যান তাঁরা। একজন সত্যনিষ্ঠ প্রকৃত মুমিন ব্যক্তির জন্য এ এক পরম পাওয়া। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর সামর্থ্যবান লোকদের জন্য আল্লাহর উদ্দেশ্যে বাইতুল্লাহ শরীফের যিয়ারত করা আবশ্যক। আর যে অস্বীকার করে, সে কুফরিতে লিপ্ত এক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা তাবৎ সৃষ্টি হতে অমুখাপেক্ষী। [সুরা আলে ইমরান : আয়াত ৯৭]
উল্লিখিত আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয়, সামর্থ্যবান প্রত্যেক বান্দার জন্যই বাইতুল্লাহর যিয়ারত তথা হজ পালন বাধ্যতামূলক। প্রিয় বান্দাদের পাপের বোঝা হালকা করা এবং পার্থিব এ যাপিত জীবনের পরতে পরতে শয়তানের প্রবঞ্চনায় বান্দাদের থেকে অনাকাক্সিক্ষতভাবে প্রকাশ পেতে থাকা ছোট বড় অসংখ্য পাপ হতে প্রিয় বান্দাদেরকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় নিষ্পাপ মাসুম করে তোলার জন্য হজব্রত দয়াময় আল্লাহপাকের এক সুন্দর ব্যবস্থাপনা।
হজকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত মুসলিম উম্মাহ জমায়েত হয়। মুসলমানদের মাঝে গড়ে ওঠে এক অমায়িক একতা, ঐক্য। বিশ্বময় সৃষ্টি হয় মহাজাগরণ, দৃঢ় উদ্দীপন। হজ মুসলিম ভ্রাতৃত্ব সুসংহত করার উত্তম সময়। এ সময় হজব্রত পালনে আগত মুসলিম ভাইয়েরা একে অপরের কল্যাণসাধনে তৎপর হন। কেউ দাঁড়িয়ে যান হাজি সাহেবদের জমজম কূপের সুমিষ্ট পানি পান করানোর জন্য। বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে ফলমূল ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যদ্রব্য বিতরণ করেন অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে। এভাবেই ফুটে ওঠে মুসলমানদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির দৃশ্য।
ইসলামী শরীয়তে হজ একটি অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ ইবাদত। এর তাৎপর্য ও শিক্ষাও খুবই অর্থবহ। হজের ক্ষেত্রে বাহ্যিক যে ব্যবস্থাপনা ও প্রতীকি আমল রয়েছ, এগুলো যেমন অবশ্যকরণীয় তেমনি এ সকল বাহ্যিক আমলের প্রত্যেকটিরই আছে একটি অভ্যন্তরীণ শিক্ষা। আমাদের বাস্তব জীবনে হজের প্রতিটি শিক্ষাকে প্রয়োগ করতে পারলে পরকালের প্রস্তুতি গ্রহণ করা আমাদের জন্যে অনেক সহজ হয়ে যাবে। অভ্যন্তরীণ শিক্ষাগুলো এরূপ, হজের জন্য ইহরাম তথা সেলাই বিহীন দুটি কাপড় গায়ে জড়িয়ে নিতে হয়, এটা এদিকে ইঙ্গিত করে, আমরা যখন দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে যাবো তখনও আমাদের পরনে এমন সেলাইহীন কয়েক খ- কাপড়ই থাকবে। হজ পালনকারীদের সঙ্গে করে কিছু খাদ্যদ্রব্য ও প্রয়োজনীয় পাথেয় নিয়ে যেতে হয়, এবিষয়টি আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়, পরপারে যাওয়ার জন্য আমাদের এভাবেই সঞ্চয় করা উচিত। যেটা আমাদের পাথেয় হিসেবে কাজ দিবে। এমনিভাবে হজের সময় আমরা যে ‘লাব্বায়িক’ তালবিয়া তাহলিল পড়ে থাকি, এ যেন আমাদের এ কথারই শিক্ষা দিচ্ছে যে আল্লাহর ডাকে আমরা সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে প্রাণ উজাড় করে মাওলায়ে কারীমের আহ্বানে সাড়া দেবো। আবার এহরাম বাঁধা অবস্থায় হজ পালনরতদের একমাত্র আল্লাহর জন্য বৈধ বিষয়াদি থেকেও নিজেকে সংযত রাখতে হয়। যেমন : স্বাভাবিকভাবে তেল, সুগন্ধদ্রব্য, সেলাইকৃত পোশাক পরিধান ইত্যাদির ক্ষেত্রে শরিয়তের কোন বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু আল্লাহর বিধান ও রাসুলের অনুসরণে হাজী সাহেবদের নির্ধারিত বিষয়াবলি থেকে পরহেজ করতে হয়। এর থেকে এ একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আল্লাহর ইচ্ছাই চূড়ান্ত আর রাসুল সা.-এর অনুসরণেই চিরকল্যাণ নিহিত। এমনিভাবে পুণ্যময় ব্রত হজের রয়েছে নানা তাৎপর্য। হজের মৌসুমে প্রত্যেক হাজী সাহেব যেন তাঁর পরিবার, প্রতিবেশী, পাড়া-মহল্লা, সমাজ ও রাষ্ট্রেরে পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হিসেবে বাইতুল্লাহর যিয়ারতে আসেন। তাঁরা আল্লাহর ঘরকে সামনে রেখে গোটা বিশ্বের সকল মুমিন মুমিনাতের জন্যে দুআ করতে থাকেন। আর হাজী সাহেবদের দুআ আল্লাহর দরবারে সহজেই গৃহীত ও মাকবুল হয়ে থাকে। সুতরাং তাঁদের করা দুআর বদৌলতে হজের মৌসুমে সারা পৃথিবীতে শান্তির আবহ বিরাজ করে। বান্দাদের প্রতি অনবরত নাযিল হতে থাকে রহমত, বরকত ও অফুরান কৃপার অবারিত ফল্গুধারা।
মুসলমানমাত্রেরই একান্ত আন্তরিক বাসনা হচ্ছে, একটিবার হলেও মাওলায়ে কারীমের ঘর যিয়ারত করার সৌভাগ্য লাভ করা। এ হচ্ছে আল্লাহর নির্দেশিত পথে রাসুলের ডাকে সাড়া দেওয়া। আল্লাহর ইরশাদ, আপনি [ইবরাহীম আ.] লোকদের মধ্যে হজের ঘোষণা করে দিন। প্রত্যন্ত এলাকা থেকে লোকজন পায়ে হেঁটে এবং দুর্বল, কৃশকায় নানা প্রকার বাহনে আরোহণ করে আপনার কাছে আসবে।’ [সুরা হজ : আয়াত ২৭] পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তাদের এ আগমন হবে তাদের কল্যাণকর স্থানে পৌঁছার জন্য।’ [সুরা হজ : আয়াত ২৮] হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সা.  বলেন, ‘গুনাহমুক্ত গ্রহণযোগ্য হজের প্রতিদান হল একমাত্র জান্নাত।’ [বুখারি, মুসলিম]
হজের এমন অসংখ্য ফযীলত হাদিসে বর্ণিত আছে। এই ফযীলতম-িত অতীব গুরত্বপূর্ণ আমলটি যেন আমরা যথাযথভাবে পালন করতে পারি সেই জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা করা চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Hit Counter provided by Skylight